অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৪৩
দীর্ঘ যাত্রার পর জিয়ান নয়না পৌঁছাল সমুদ্রের শহর কক্সবাজারে।
পড়ন্ত বিকেলে গোধূলির সোনালি আভায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। সূর্য পালাই পালাই করছে। সব মানুষ অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে সূর্য অস্ত যাওয়ার সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্য।
জিয়ান ড্রাইভারকে দিয়ে রিসোর্টে সব ব্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছে। জিয়ান নয়নার হাত ধরে নিজের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে বলল, “আজকের অস্তমিত সূর্যকে সাক্ষী রেখে কথা দিচ্ছি, আমি এ জন্মে কোনোদিন তোমার কষ্টের কারণ হব না। বাকি জীবন তোমাকে দেওয়া পেছনের কষ্টগুলোর নিরাময় হয়ে উঠব।”
সামনে বিশাল নীল জলরাশি। অসীম, অনন্ত ঢেউগুলো একের পর এক তীরে এসে ভাঙছে। কেমন দৃষ্টি শীতল করা এক মনোরম দৃশ্য।
নয়না নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি সমুদ্রের জলরাশির দিকে স্থির। নয়নার সামনের চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করছে নয়না। জিয়ানের কথাগুলো যেন সে শুনতেই পাচ্ছে না। এই মুহূর্তটাকে মনোযোগ দিয়ে অনুভব করতে ব্যস্ত সে।
জিয়ান নয়নার পাশে এসে দাঁড়াল। নয়নার কাঁধে হাত রেখে বলল, “আমি পাশে থাকতে এভাবে কী দেখছো? আমার কিন্তু এই সমুদ্রের বহমান জলরাশিকে বড্ড হিংসে হচ্ছে, বাটার মাশরুম।”
নয়না তবুও কিছু বলল না। সেভাবেই মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল সমুদ্রের দিকে।
জিয়ান আরও কাছে এসে কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, “কী ভাবছো জান?”
নয়না শান্ত স্বরে বলল, “মনে হচ্ছে সব কষ্ট যেন এই ঢেউগুলোর সাথে হারিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের অতল গহ্বরে। এক একটা ঢেউ এসে যেন আমার দুঃখগুলোকে টেনে দূর থেকে বহু দূরে নিয়ে যাচ্ছে।”
জিয়ান তাকিয়ে রইল নয়নার দিকে। নয়নার কানের লতিতে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে বলল, “আমি যদি বলি তোমার সব কষ্ট আমার নামে দলিল করে দাও?”
নয়না মুচকি হাসল। চাপা কণ্ঠে বলল, “তুমিই তো আমার সব কষ্টের কারণ। তোমার কাছে যে সুখ আশা করা বারণ। মন বলে, তোমাকে নিয়ে ভালো থাকি। মস্তিষ্ক বলে, তুমি আবার নতুন করে দুঃখ দেবে। যে সব দুঃখের কারণ, তাকে কী করে দুঃখ দলিল করে দিয়ে বিনিময়ে সুখ আশা করি?”
জিয়ান মাথা নিচু করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। এই বিশাল সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে বলল, “আমি কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন কোনো দুঃখ তোমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। এখন থেকে আমি তোমার সকল সুখ ও শান্তির কারণ হয়ে উঠতে চাই।”
সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। রক্তিম আভা বিলুপ্ত হয়ে আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সারাদিন রোদের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাঁদটা উঁকি দিচ্ছে স্নিগ্ধ রশ্মি ছড়িয়ে। চাঁদের চারপাশে হাজারো নক্ষত্ররা তাদের অপরূপ সৌন্দর্য মেলে ধরতে ব্যস্ত।
নয়না কোনো কথার উত্তর না দিয়ে জুতো খুলে খালি পায়ে হাঁটছে বালুর ওপর। ঢেউ এসে তার পা ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার। কী শীতল অনুভূতি! হঠাৎ একটা ঢেউ এসে জিয়ানকেও ভিজিয়ে দিল।
নয়না হুট করে শব্দ করে হেসে উঠল—একটা নির্মল, প্রাণখোলা হাসি।
জিয়ান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল নয়নার হাসোজ্জ্বল মুখশ্রীর পানে। যেন জগতে এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য জিয়ান কখনো দেখেনি।
জিয়ান বুকে হাত রেখে বলল, “হায়! আমাকে হত্যা করার জন্য তোমার এই হাসিই যথেষ্ট। এই হাসিটা আমি অনেকদিন পর দেখলাম। অনেক মিস করেছি তোমার এই নিষ্পাপ স্নিগ্ধ হাসিটাকে। সব সময় এভাবেই হাসবে। আমি বারবার, শতবার তোমার হাসিমাখা মুখের প্রেমে পড়তে চাই।”
নয়না থেমে গেল। এরপর জিয়ানের কোলে বসে পড়ল। জিয়ানের চোখে চোখ রেখে বলল, “সবকিছু কি আবার আগের মতো হতে পারে, জিয়ান?”
জিয়ান অবাক হলো। ভীষণ সাথে ভিন্ন রকম এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল তার হৃদয় জুড়ে। জিয়ান নয়নার দৃষ্টিতে নিজের দৃষ্টি স্থির করে বলল, “না, আগের মতো না।”
নয়নার চোখে জল চিকচিক করছে। আশাহত কণ্ঠে আওড়াল, “তাহলে?”
জিয়ান নিজের দু’হাত নয়নার গালে আলতো করে চেপে ধরল। চোখে চোখ রেখে বলল, “এর থেকেও সুন্দর হবে, যদি তুমি আমাকে সুযোগ দাও।”
রাত বাড়ছে ধীরে ধীরে। মানুষের সমাগম কিছুটা কমে এসেছে। নয়না বেশিক্ষণ নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আশেপাশের সব ভুলে জিয়ানের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। দীর্ঘ চুমু শেষ করে জিয়ান নয়নাকে কোলে তুলে নিল। সমুদ্রের পানির দিকে নিচে নামতে লাগল।
“এই, কী করছো? আবার আমাকে মেরে টেরে ফেলবে না তো?”
জিয়ান হেসে বলল, “মারব কীভাবে! তুমি কি জানো না, প্রেমের মরা জলে ডোবে না? বোকা মেয়ে, প্রেমে মরে আবার জলে ডুবেও মরতে চাও?”
“এখন একদম মজা করবে না। চলো, উপরের দিকে।”
জিয়ান নয়নাকে কোল থেকে নামিয়ে নিজের পায়ের ওপর দাঁড় করিয়ে একহাতে নয়নার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। এরপর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “সমুদ্রের জলে বাসর করার ফিলিংস কেমন হয় জান?”
নয়না সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলল। লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠল। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াও হঠাৎ যেন বেড়ে গেল। জিয়ানের শার্ট শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
জিয়ান ক্ষীণ স্বরে বলল, “তোমাকে আমি গভীর ভালোবাসায় তলিয়ে দিতে চাই, অথচ তুমি সামান্য ছোঁয়ায় মূর্ছা যাচ্ছো কেন! এমন হলে তো আমি আরও বেসামাল হয়ে যাব। তখন কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারব না। এমনিতেই এতদিনের উপোস।”
নয়না শক্ত করে জড়িয়ে ধরল জিয়ানকে। জিয়ান নয়নার শ্বাসের উর্ধ্বগতি টের পাচ্ছে। টের পাচ্ছে লাজুকলতা বৌয়ের তৃষ্ণা। যেন নয়নার পুরো দেহমন তাকে একযোগে কাছে টানছে চুম্বকের মতো।
🌿
অন্তর নিজের বাসায় বসে আছে। কিছু একটা ভাবছে সে। হঠাৎ তার ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল। সাথে সাথে রিসিভ করে কানে ধরতেই নীলাঞ্জনার কণ্ঠ ভেসে এল, “আসসালামু আলাইকুম।”
অন্তর দ্রুত জবাব দিল, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম। কী হলো, তুমি কিছু বলছো না কেন?”
নীলাঞ্জনা বেশ অবাক হল। সবে সালাম দিল, আর ওপাশ বলছে কিছু বলছো না কেন! “আমি তোমাকে বিয়ে করব না।”
“আমি তো এটা শুনতে চাইনি। আমি চাই তোমার মন যেটা বলছে তুমি সেটাই বলো, নিজের মুখে স্পষ্টভাবে।”
“এই বিয়েতে তুমি-আমি দুজনেই সুখী হতে পারব না। বিয়ে মানে পবিত্র বন্ধন। বিয়ে হলে আমার হয়ত ইচ্ছে করবে তোমাকে পূর্ণভাবে কাছে পেতে বা তোমার আদুরে স্ত্রী হতে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি এই বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি।”
অন্তর চোখ বন্ধ করল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তুষির সাথে শেষ দেখার রাতটা। তার বউ রূপে কবুল বলার পর তুষীর চোখেমুখে যে আনন্দ আর যে তৃপ্তি সে দেখেছিল, তা যেন এখনো তার চোখে আটকে আছে। অন্তরের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, “কারো জন্য তো জীবন থেমে থাকে না। জীবনের নিয়মে জীবন চলে তার ধারাবাহিকতায়। আজ হোক বা কাল, বিয়ে তো করতেই হবে। সেটা না হয় তুমিই হলে, নীলাঞ্জনা।”
নীলাঞ্জনা বুঝতে পারল অন্তর কাঁদছে। নরম স্বরে বলল, “যাকে এত ভালোবাসো, তাকে ভুলে কখনো কি আমাকে কাছে টানতে পারবে? তার ওপর আমি ডিভোর্সি, আমার একটা বেবিও আছে।”
অন্তর কল মিউট করে জোরে একটা চিৎকার দিল। এরপর প্রায় এক মিনিট পর আবার কল চালু করল। নিজেকে সামলানোর বৃথা চেষ্টা করে বলল, “আমি সব জেনেই তোমাকে বিয়ে করতে রাজি। তবে কোনোদিন বলবে না তুষীকে ভুলে যেতে। তুষী আমার স্ত্রী, আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি যতদিন বেঁচে আছি, তুষী আমার অন্তরের একটা স্থানে সব সময় বেঁচে থাকবে। তবে তার জন্য তোমার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্যে কখনো আঁচ আসবে না।”
নীলাঞ্জনা আর কথা বাড়াল না। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলল, “তাহলে আগামী শুক্রবার কাজি নিয়ে চলে এসো। আমি আমার জন্য কিছু চাই না। শুধু আমার ছেলেটাকে নিজের ভালোবাসা দিয়ে, নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করে আগলে রেখো।”
অন্তর উত্তর দেওয়ার আগেই কল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল ওপাশ থেকে। অন্তর মোবাইল রেখে ফ্লোরে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
অন্তরের মা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে আর নিজের চোখের জল আঁচলে মুছছে। মনে মনে বলে, “এভাবে কেঁদে নিজেকে হালকা কর। হয়ত তোর বেঁচে থাকা কিছুটা সহজ হবে।”
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২০+২১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৪