অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৩৮
“তুমি ভেঙে ফেলেছ ভালোবাসার সব চুক্তি।
আমি তোমার কপালে জুতার বাড়ি মেরে দিয়ে দিলাম তোমায় মুক্তি।
জুতার বাড়ি মনে রেখো, আমার থেকে দূরে থেকো।”
নয়নার স্ট্যাটাস দেখে জিয়ান হাসবে, কাঁদবে নাকি রাগ করবে—বুঝে উঠতে পারছে না। একটা মানুষ কী পরিমাণ দুষ্ট হলে এমন পোস্ট করতে পারে! জিয়ান মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে রেখে বলে, “বুঝেছি, তোমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে তুমি হিটলারের নানি হয়ে গেছো। তোমার সাথে হিটলারের বস হতে হবে, নয়তো জেতা সম্ভব না।” ডান হাতে নিজের চুল ঠিক করে বলে, “শালার ছুটিও শেষ! এখন চাকরি সামলাবো নাকি বউ সামলাবো। বউ ছাড়া চাকরি দিয়ে কী করবো? চাকরি না থাকলে বউ আমাকে দিয়ে কী করবে?”
এমন ফাটা বাঁশের চিপায় মানুষ কেমনে পড়ে? কিছু ভাব জিয়ান, কিছু ভাব। এমন প্ল্যান তৈরি কর যাতে রানি আর রাজসিংহাসন—দুটোই তোর থাকে। চাকরিও ঠিক, বউও যাতে ঠিক থাকে।
এর মধ্যেই জিয়ানের ফোনটা বেজে উঠলো।
ফোনটা রিসিভ করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে মেহনুর বলে, “প্লিজ জিয়ান, কথা শেষ না করে কল কেটে দিয়ো না। আমি জানি তুমি অনেক ডিস্টার্বড আছো। আমি তোমাকে আর ডিস্টার্ব করতে চাই না, কিন্তু আমি নিরুপায়। এই সমস্যার সমাধান তুমি ছাড়া সম্ভব নয়।”
“যা বলার ডাইরেক্ট বলো, এতো গোল গোল পেঁচানোর দরকার নেই।”
“বাবা তো চলে যাচ্ছে, প্লিজ কিছু করো?”
“যখন আম্মু উল্টোপাল্টা জেদ, ওয়াদা, ব্ল্যাকমেইল করছিলো আমাকে, তুমিও তো সেদিন কিছু করতে পারতে মেহনুর। কিন্তু তুমি কি কিছু করেছিলে? তুমি সেদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলে। তখন সময়টা তোমার ফেভারে ছিলো, এখন সময়টা আমার ফেভারে।”
“আমি জানি আমি স্বার্থপরের মতো নিজের অনাগত সন্তানের কথা চিন্তা করেছি। জাহিন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হলেও এটাই তো সত্য যে ওই জঘন্য মানুষটা আমার সন্তানের বাবা, আমার হাজব্যান্ড। বাবার ভালোবাসাহীন বড় হওয়া সন্তান আমি। তাই আমি জানি পৃথিবীতে সন্তানের মাথার উপর বাবার ছায়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি যে অবহেলা-অনাদরে বড় হয়েছি, সেই একই যন্ত্রণা আমার সন্তানকে কী করে দিতাম বলো?”
“বাহ! তোমাকে তো নোবেল দেওয়া উচিত। আমার মনে হচ্ছে বাবার চলে যাওয়া আটকানোর পেছনে তোমার কোনো স্বার্থ আছে। নয়তো স্বার্থ ছাড়া তো এক পা নড়ো না তুমি।”
মেহনুর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে উত্তর দিলো, “আমার সন্তান তার দাদুভাইয়ের জন্য পাগল। বাবা চলে গেলে আমার ছেলেটাকে এভাবে কে ভালোবাসবে জিয়ান?”
জিয়ান কোনো কথার উত্তর না দিয়ে কলটা কেটে দিয়ে মোবাইল প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো। রোডসাইড একটা ফুডকোর্টের বেঞ্চে বসলো। খানিকক্ষণ চিন্তা করলো—এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ ন্যায়-নীতির ঊর্ধ্বে নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে। তারা সবাই নীতিবাদী, কিন্তু নিজের স্বার্থ তাদের নীতিকেও গলাটিপে মেরে ফেলে। আমার মতো বোকারা যারা নিজের স্বার্থবাদ দিয়ে সবার ভালোর কথা চিন্তা করে, দিন শেষে তাদের কপালেই কিছু জোটে না। এক আকাশ হতাশা আর শূন্যতা ছাড়া।
দোকানদার জিজ্ঞেস করলো, “ভাই কী দিব?”
জিয়ান সাথে সাথে উত্তর দিলো, “কোল্ড কফি।”
জিয়ান মোবাইল বের করে নাজিম চৌধুরীকে কল করলো। জিয়ান শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বলা শুরু করলো, “শোনো বাবা, নিজের সংসারের ঝামেলায় জর্জরিত। এখন তোমাদের সংসারের ঝামেলা মিটমাট করার সময় নেই। তুমি বাসায় যাও, ভালো ভালো খাও আর আরামে ঘুম দাও। তুমি তোমার বউয়ের সঙ্গে চল্লিশ বছর সংসার করেছো, এখন আমাকে আমার বউয়ের সঙ্গে চল্লিশ বছর সংসার করতে দাও। বহুত প্যারায় আছি, বাবা—প্লিজ, নতুন করে প্যারা দিয়ো না।”
নাজিম সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না অথবা সুযোগ পেলেন না কিছু বলার। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। এই হাসিতে যেনো তার হৃদয় জুড়ে প্রশান্তি বয়ে যাচ্ছে। মনে মনে বললেন, “আমি চাই তোরা একশ বছর একসাথে থাক, সব সময় ভালোবেসে একে অপরের হয়ে থাক।”
জিয়ান কফি মগে চুমুক দিতে দিতে ভাবে, তার বাবা একজন জেন্টলম্যান। জ্ঞানী আর ঠান্ডা মেজাজের অমায়িক একজন মানুষ। কফি শেষ করে নয়নার আইডিতে ঢুকে ফেক আইডি থেকে কমেন্ট করলো, “ময়নার মা প্লিজ, Louis Vuitton ব্র্যান্ডের একজোড়া জুতা সংগ্রহ করো। দামি জুতার বাড়ি খেতেও কপাল লাগে। শীঘ্রই দেখা হবে আর সুইট একটা ফ্রেশ চুমু হবে। আই লাভ দামি ব্র্যান্ডের জুতার বাড়ি উইথ তরতাজা লিপ কিস।”
🌿
নয়না বাসায় এসে দেখে নীলাঞ্জনা নাবিলের সাথে খেলছে। নয়না টোটোব্যাগটা কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে টেবিলের উপর রেখে সোফায় গা এলিয়ে দিলো।
নীলাঞ্জনা সার্ভেন্টকে ডেকে বলল, “ফ্রেশ অরেঞ্জ জুস করে দিন, সামান্য বরফকুচি দিয়ে।” তারপর নয়নাকে বলল, “তোকে বড্ড ক্লান্ত লাগছে, কিছু হয়েছে ভার্সিটিতে?”
“নাহ, বাইরে এতো রোদের জন্য ক্লান্ত লাগছে।”
“আজ অন্তর এসেছিলো তোর সাথে দেখা করতে।”
“অন্তর ভাই?”
“হুম।”
“কী বললো?”
“বলল, আমি রাজি থাকলে আমাকে বিয়ে করবে।”
নয়না এক লাফে উঠে বসলো। চোখ কচলে বলে, “আসলেই?”
“আমারও বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু ছেলেটা বলল, ও নাকি সিরিয়াস।”
নয়না চোখ বন্ধ করে বলে, “ছেলে মানুষ আর সিরিয়াস! আচ্ছা, ভাইয়া তো মেবি তোমার দুই বছরের জুনিয়র। তো কী ভাবলে করবে বিয়ে? জুনিয়র বরকে উঠতে-বসতে ঝাড়ির উপর রাখতে পারবে। সাত পাঁচ না ভেবে রাজি হয়ে যাও।”
“তোর কি মাথা খারাপ? এসব বিয়ে-টিয়ে আর করবো না। নাবিলকে বড় করবো, আমাদের মা-পুতের জীবন সুন্দর কাটছে এখানে। নতুন করে কোনো ঝঞ্ঝাট চাই না।”
“জীবন তোমাকে প্লেটে সাজিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ দিচ্ছে আর তুমি তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছো! আমি হলে নাচতে নাচতে বিয়ে করে নিতাম।”
সূচনা এসে বলে, “তোমরা আর কত বিয়ে করবে! এবার আমার বিয়ের ব্যবস্থা করে দাও।”
সার্ভেন্ট নয়নার দিকে জুসের গ্লাস বাড়িয়ে দিলো। নয়না হাত বাড়িয়ে জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বলে, “এই তোর যেনো বয়স কত বুড়ি কোথাকার? বড়দের কথার মধ্যে তোর কী? যাহ, এখান থেকে।”
“তুমি বড় আব্বুকে বলে আমাকে শুধু কোরিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করে দাও। বিয়ে আমি নিজেই করে নেবো, বর তো ঠিক করাই আছে।”
নয়না একটানে জুস শেষ করে গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলে, “এখান থেকে যা, নয়তো এই গ্লাস তোর মাথায় ভাঙবো।”
“জানি তোমাদের হিংসা হচ্ছে আমার বর এতো সুদর্শন হবে এজন্য। আমার বরের কাছে তো বাংলাদেশের ছেলেরা কিছুই না। সে যাইহোক, মনে রেখো আমি জাংকুককে বিয়ে করেই ছাড়বো।”
সূচনা চলে যেতেই নয়না বলল, “ছোট আম্মু ওকে মাইর লাগায় না কেন! ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে একটা চড় লাগাই, ফাজিল হচ্ছে দিনদিন।”
“মেরে কী হবে? এর চেয়ে পড়ে থাকুক জাংকুক নিয়ে। বড় হয়ে নিজেই বুঝবে ওসব শুধু কল্পনা, বাস্তবতা ভিন্ন। এতো লাভও আছে আমার মতো প্রেম করে নিজের জীবন বরবাদ করবে না।”
“নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করো। যা হওয়ার হয়ে গেছে, ওসব বাদ দিয়ে অন্তর ভাইয়াকে বিয়ে করে জুনিয়র হাজব্যান্ড বানিয়ে নাও। আচ্ছা, এটা বলো তো—জিয়ানের কি কোনো ইগো বা কোনো লজ্জা-টজ্জা নেই? ওই শালা কি আগে থেকেই বেশরম আর নির্লজ্জ?”
নীলাঞ্জনা হেসে বলে, “নেই মানে! ওর তো পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরোটাই ইগোতে মোড়ানো। বাপরে! ওর আবার ইগো নেই! ইগো আর অহংকার ছাড়া আর কিছু নেই। এতোদিন পর জিয়ানের প্রসঙ্গ কেন তুললি?”
ফট করে পেছন থেকে একজন বলল, “তুলবেই তো আপু। আপনার বোন তো আমাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসে। নয়তো আমার এক্সের কাছে আমার সম্পর্কে জানতে চায়? উফফ, স্যরি—বর্তমান বড় আপু।”
“শয়তানের নাম নিতে দেরি, শয়তান হাজির হতে দেরি নাই। এখানে কী? বাবা আসার আগে বের হোন, নয়ত বেইজ্জত হয়ে বের হতে হবে।”
জিয়ান নয়নার দিকে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিয়ে বলে, “তোমার জন্য বেইজ্জত হতে রাজি, শুধু তুমি যদি থাকো আমাকে ভালোবাসতে রাজি।”
“কী সমস্যা জিয়ান, তুমি কেন ওরে বিরক্ত করছো! দেখো, শেষ মানে শেষ আর শেষটা তুমি নিজেই করেছো। এখন এসব ছেবলামি বাদ দাও।”
“আপু প্লিজ রুমে চলে যান। অনেক বছর পর বউকে কাছে পেয়েছি, কখন কী ছেবলামি করে বসবো তার কোনো ঠিক নাই। বেহুদা লজ্জা পাবেন।”
“তুমি কি আসলেই সেই জিয়ান রেজা চৌধুরী! ভাবতে অবাক লাগছে একটা মানুষের এতোটা অধঃপতন কী করে হয়?”
“একদম না। আমি সেই ইগোস্টিক জিয়ান রেজা চৌধুরী নেই। আমি হলাম নয়নার পাগলু জিয়ান রেজা চৌধুরী—ছোট করে প্লেন ড্রাইভার, শুধু মাত্র আমার বাটার মাশরুমের প্লেন ড্রাইভার।”
নীলাঞ্জনা কিছু বলবে তার আগেই জিয়ান হুট করে নয়নার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দিলো।
নীলাঞ্জনা দ্রুত নাবিলকে কোলে তুলে নিয়ে চলে গেলো রুমে।
নয়না ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলে, “কী হচ্ছে এসব?”
“তোমার বড় বোনকে তাড়ানোর কৌশল অবলম্বন করলাম পাখি। ডিস্টার্ব করছিলো, বোঝে না কেন তোমার বর তোমাকে ভালোবাসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।”
চলবে
বিঃদ্রঃ-গতকাল পরবর্তী পর্ব দেয়ার কথা ছিলো কিন্তু গতকাল আমার এক আত্মীয় মারা গেছেন। সকলে তার জন্য দোয়া করবেন আল্লাহ তায়ালা যেনো ওনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৬