অর্ধাঙ্গিনী ( দ্বিতীয় পরিচ্ছদ)
নুসাইবা_ইভানা
পর্ব -৩১
জিয়ানের বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছে। এই কারণেই সে দেশে ফিরতে চায়নি। অথচ দেশে ফিরেই সবার আগে নয়নার সাথে দেখা হলো! তার নয়না, তার অর্ধাঙ্গিনী—একবারের জন্যও তার দিকে ফিরেও তাকালো না!
জিয়ান নিজের মনকে বোঝাতে লাগল, নয়না আমাকে দেখেনি। দেখলে কোনোভাবেই আমাকে এভাবে ইগনোর করতে পারত না। যেন আমি সেখানে ছিলামই না!
সিএনজির সাথে সাথে শহরের আলোছায়া দৌড়ে যাচ্ছে, অথচ তার মনে হচ্ছে এই শহরের কোথাও তার জায়গা নেই। এত মানুষ, এত ব্যস্ত শহরে সে যেন ইনভিজিবল। তার কোনো অস্তিত্ব নেই।
সিএনজির ঝাঁকুনির সাথে সাথে জিয়ানের মনে ভেসে উঠল নয়নার মুখটা। নয়না যেন আগের চেয়ে আরও সুন্দর হয়ে গেছে। শিশিরভেজা স্নিগ্ধ সকালের ফুটন্ত গোলাপের মতো সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে নয়নার মুখশ্রী জুড়ে।
ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, “ভাই, কোথায় যাবেন?”
জিয়ান নিজের ভাবনা থেকে বের হয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “যেখানে গেলে কাউকে মনে পড়বে না, এমন কোনো জায়গা আছে?”
ড্রাইভার অবাক হয়ে তাকাল, তারপর বোকার মতো লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে রইল। এরপর আমতা-আমতা করে বলল, “তাইলে ধানমন্ডি লেক?”
জিয়ান ম্লান হাসল। “না। হোটেল। যেকোনো ভালো হোটেলে নিয়ে চলেন।
ড্রাইভার বলল,“ভাইয়ের বউ কি আরেক বেডার লগে ভেগে গেছে? কিছু মনে করবেন না। বিদেশি বেডাগো বউরা এমন করে তো।”
জিয়ান হেসে বলল, “নাহ্, আমার বউ এমন না।”
“তাইলে আপনের কিসের কষ্ট, স্যার?”
“তেমন কিছু না। মামা, আপনি মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করেন।”
ড্রাইভার আর কোনো কথা বলল না। চুপচাপ ড্রাইভ করতে লাগল।
জিয়ান চোখ বন্ধ করে মনে মনে আওড়াল,
“বাটার মাশরুম, কেমন আছো তুমি?”
🌿
অনিকেতের গাড়িতে চুপচাপ বসে আছে নয়না। গাড়িতে ওঠার পর থেকে মুখ থেকে একটা শব্দও বের করেনি। সূচনা আর ঈশান গল্পে মেতে উঠলেও নয়না একদম চুপ। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করছে।
সে কি ঠিক দেখেছে, নাকি চোখের ভুল? মনে মনে বলল, পৃথিবী গোল, সত্যি হতেও পারে… অথবা চোখের ভুল।
নয়না চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস নিচ্ছে। হঠাৎ তার মনে হলো যেন কেউ খুব কাছ থেকে ডাকছে, কিন্তু সে ফিরেও তাকাতে পারছে না। চেষ্টা করেও সাড়া দিতে পারছে না চিরচেনা সেই ডাকে।
“বাটার মাশরুম, কেমন আছো তুমি?”
নয়না দ্রুত চোখ খুলে জোরে জোরে নিশ্বাস নিল। তারপর বলল, “ভাইয়া!”
অনিকেত আয়নায় তাকিয়ে বলল, “হুম?”
“এয়ারপোর্টে পরিচিত কাউকে কি দেখেছ?”
অনিকেতের হাতটা স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “কাউকে মানে? ঈশান আর সূচনাকে। তুই কার কথা বলছিস?”
নয়না স্থির কণ্ঠে বলল, “না, মানে… আমার কেমন মনে হলো ওখানে জিয়ান ছিল।”
অনেক কষ্টে অনিকেত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, “তোর চোখের ভ্রম। তোর মাথা এখনো ঠিক নেই। তাই কী দেখতে কী দেখেছিস। ভুলে যা সেসব।”
নয়না আর কিছু বলল না। কিন্তু তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা কমল না। আসলেই ভ্রম? ভ্রম এত স্পষ্ট হতে পারে? সেই গভীর দৃষ্টির চাহনি—সেসব কি কেবল ভ্রম?
নয়না আর কথা বাড়াল না।
ঈশান বলল,“চাচা কেমন আছে?”
“কে?”
“থলামুয়ানা।”
নয়না বলল, “বাবা ভালো আছেন। একবার দেখে এসেছি আমরা সবাই। আপনার কথা অনেক জিজ্ঞেস করেছে। বলেছে, আপনি ফিরলে বাবা আসবে নারায়ণগঞ্জ।”
“আমিও ওনাকে অনেক মিস করি। আর আপনার কী খবর? আমাকে দেখে খুশি হননি?”
“আপনি কি ঈদের চাঁদ যে আপনাকে দেখে খুশি হতে হবে?”
ঈশান মিনমিন করে বলল, “কথার তেজের কাছে কেউ টিকতে পারবে না। ধানিলঙ্কা।”
সূচনা হেসে বলল, “হুম, তালুকদার বংশের মেয়েদের সাথে কথায় জেতা এত সহজ না।”
অনিকেত বলল, “তোকে কি ভার্সিটিতে নামিয়ে দিব নয়না?”
“নাহ্, আজ আর ক্লাসে যাব না। সোজা বাসায় চলো।”
🌿
হোটেলে রুম বুক করে সোজা ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল জিয়ান। বাসায় যাবে না—সেটা আগেই ঠিক করে রেখেছিল।
ঘুম থেকে উঠে নয়নার গানের ভিডিওটা আবার অন করল। খেয়াল করে দেখল ভিডিওটা ভাইরাল হয়ে গেছে। ওয়ান মিলিয়ন ভিউ, সাত লাখ রিয়্যাক্ট, চার হাজার কমেন্ট।
জিয়ানের রাগ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে এক্ষুনি কল করে অনিকেতকে ঝাড়তে। ভিডিওর দিকে তাকিয়ে বলল, “কে বলেছিল এই মেয়েটাকে এত সুন্দর হতে! আবার এত সুন্দর শাড়ি পরে কেন গান গাইতে হবে! মাথার চুল টেনে বলল, গান গাওয়ার দরকার কী!”
বারকয়েক ভিডিওটা দেখে গানের শেষ লাইনে এসে সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল, “আমি তো চুপিসারে তাকিয়েছিলাম, বাটার মাশরুম… তুমি দেখেও কেন দেখলে না!”
হঠাৎ জিয়ানের ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল। অপরিচিত নম্বর থেকে।
“ভালো আছো?”
জিয়ানের বুকটা ধক করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো এটা নিশ্চয়ই নয়না। দ্রুত রিপ্লাই করল— “কে?”
কয়েক সেকেন্ড পর রিপ্লাই এল— “যে মানুষটাকে তুমি একদিন সবকিছুর চেয়ে বেশি চিনতে। এখন চিনতে পারছ না!”
জিয়ান কাঁপা কাঁপা হাতে টাইপ করল, “সুনয়না? আমার বাটার মাশরুম?”
অনেকক্ষণ কোনো রিপ্লাই এল না।
ঠিক যখন সে ভাবল সবই তার ভুল ধারণা, তখন মেসেজ এল— “আমি মেহনূর।”
জিয়ানের চোখ ভিজে গেল। কেন মেহনূর হলো নামটা? কেন সুনয়না হলো না?
জিয়ান টাইপ করল, “তোমাকে মনে রাখতে হবে এমন কোনো সম্পর্ক আমাদের মধ্যে কখনো ছিল বলে তো আমার মনে পড়ছে না।”
ওপাশ থেকে আর কোনো মেসেজ এল না।
নয়না ফোনটা বুকে চেপে ধরে বিছানায় বসে আছে। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। “কেন আমি বেহায়ার মতো টেক্সট করলাম? কেন তুমি আমার নামটা লিখলে? কেন ডাকলে বাটার মাশরুম? এখন যে এই ডাকনামকে আমি ঘৃণা করি। কেন প্রমাণ করলে তুমি আমাকে এখনো মনে রেখেছ? আমি তোমাকে আর কোনোদিন জড়িয়ে ধরতে পারব না। অথচ তোমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারলেই আমার দুঃখ অর্ধেক কমে যেত। এত ভালোবাসার পরেও কীভাবে ছেড়ে চলে গেলে! আমাদের ভালোবাসাকে কেন একটা ব্যারিকেডে আটকে দিলে!”
ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল। সূচনা ডাকল, “নয়না, আপি! তুমি জেগে আছ? থাকলে একটু বাইরে এসো।”
নয়না দ্রুত চোখ মুছে বলল, “হ্যাঁ, জেগে আছি। আসছি।”
ফোনটা বালিশের নিচে রেখে উঠে দাঁড়াল। নয়না এখন নিশ্চিত—জিয়ান দেশে ফিরে এসেছে। নইলে জিয়ানের ফোন নম্বরে টেক্সট করা যেত না।
একই রাতে, একই শহরের দুই প্রান্তে
দু’জন মানুষ একই আকাশের দিকে তাকিয়ে একে অপরের বিরহে অশ্রু ফেলছে।
একজন বাস্তবতা থেকে পালাতে চায়,
অন্যজন নিজেকে বোঝাতে চায়—সব শেষ, এখন আর কিছুই ঠিক হবে না।
কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে শেষ হয়?
🌿
মেহনূর নিজের ছেলে জারিফকে ভাত খাওয়াচ্ছে। মিতা বেগম এসে বলল, “কাল রাত থেকে ছেলেটাকে ফোনে পাচ্ছি না। তোমার শ্বশুর তো আমার কথা শোনে না। তুমি কি একবার কল করে দেখবে? অথবা তোমার পরিচিত কারো কাছ থেকে একটু খোঁজ নাও আমার ছেলেটা কেমন আছে? একটা মেয়ের জন্য আমার দুই ছেলেই আজ আমার কোল ছাড়া। জীবনে ওই মেয়ের ভালো হবে না।”
মেহনূর বলল, “আম্মি, তুমি এখনো নয়নাকে কেন দোষ দাও? সব ছেড়ে চলে গেছে যে মানুষটাকে, তাকে আর টেনে আনার কী দরকার?”
“তোর শ্বশুরের মতো তুইও বলতে চাইছিস সব দোষ আমার? নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে বল, তোর ছেলের জীবন নাকি তার অন্যায় মা হিসেবে—কোনটা মেনে নিবি?”
“আম্মি, আমি শুধু বলতে চাইছি নয়নাকে আর টানবেন না। আপনি যে সেদিন ভয়েস মেসেজ পাঠালেন জারিফের অবস্থা ভালো না—তারপর থেকে আর কোনো রিপ্লাই নেই। আচ্ছা, জিয়ান কি দেশে এসেছে?”
“ওরকম কপাল তো আর আমার নাই। শকুনের নজরে সব ধ্বংস হয়ে গেছে।”
“জিয়ানের দেশি নম্বরে একটা কল করে দেখুন।”
জারিফ আধো-আধো বুলি আওড়াল, “বাবা আসবে না মাম্মা?”
এই প্রশ্নের উত্তরে মেহনূর চুপ হয়ে যায়। কী করে বোঝাবে তার বাবা এই পৃথিবীতে নেই।
চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৩
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ১৯
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩০