অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৬
সোফিয়া_সাফা
কোলের ওপর গিটার রেখে ড্রইংরুমে বসে টুংটাং আওয়াজ তুলে প্র্যাক্টিস করছে আবেশ। মেহেক ফ্রেস হয়ে নিচে এলো। পরপরই উদ্যান, ফুল আর উর্বীও একে একে আবির্ভূত হলো।
রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে ফুল দেখল মাহবুবা সুলতানা রান্না করায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। ফুল গিয়ে উদ্যানের জন্য চায়ের পানি বসালো।
ওদিকে উদ্যান ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ফোনে নিমগ্ন। আবেশের সম্পূর্ণ মনোযোগ তখনো গিটারের তারে। মেহেক অনেকক্ষণ গড়িমসি করে একসময় বলল, “তুমি কি গিটার বাজাতে পারো আবেশ ভাই?”
মেহেকের প্রশ্ন শুনে উদ্যান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে। সেই চাহনির গূঢ় অর্থ মেহেক বুঝতে পারল না। আবেশ শুধু নিস্পৃহভাবে ‘হুঁ’ শব্দ উচ্চারণ করল। সুযোগ পেয়ে মেহেক আবদার করে বসল, “আবেশ ভাই, একটা গান শোনাও না।”
উর্বীও উৎসাহের সাথে সায় দিল, “হ্যাঁ, গান শুনতে ভালো লাগে আমারও।”
আবেশের কানে যেন কারও কথাই পৌঁছালো না। সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজের মতো গিটারের তারে আঙুল বুলিয়ে চলল। তন্মধ্যেই সবার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে এলো ফুল। প্রথমে উদ্যানের দিকে ‘আইসড টি’-র কাপটা এগিয়ে দিল। ডান হাতে ফোন থাকায়, উদ্যান বাম হাতে কাপটা হাতে নিল। আবেশ অন্যমনস্ক চোখে তাকাতেই উদ্যানের কনিষ্ঠা আঙুলে থাকা আংটির ওপর আটকে গেল। তার কানে বাজতে লাগল অতীতে ফুলের বলা কথা গুলো।
অতীত…
“আংটিটা আমার খুব পছন্দের আবেশ ভাই। খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত বাড়িতে যেতে পারবো না। তুমি একটু খুঁজতে সাহায্য করো না।”
“আমি তোকে ঠিক ওমন দেখতেই একটা আংটি বানিয়ে দেবো ফুল। দয়া করে বাড়িতে চল, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। এরপর দারোয়ান ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করবে।”
“না আবেশ ভাই, ওটা না পেলে যেতে পারব না।”
ফুলের ঠোঁট ভেঙে কান্না এলো। আবেশ তাকে ধরে বেঞ্চে বসিয়ে দিল।
“আচ্ছা, আচ্ছা কাঁদিস না। আমি খুঁজে দেখছি।”
দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আবেশ আংটিটা খুঁজে পেল ক্লাসরুমের কোণে পড়ে থাকা এক ময়লার ঝুড়িতে। সে ফিরে এসে দেখল ফুল এখনো বেঞ্চের নিচে ধুলোবালির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে আংটিটা খুঁজছে। এভাবে খোঁজার কারণে তার নীল রঙা স্কুল ড্রেসটা ধুলোবালিতে ভরে গেছে। আংটিটা হাতের মুঠোয় নিয়ে আবেশ নিঃশব্দে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।
“এহেম…এহেম!”
ফুল কনুই দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে পেছনে তাকাল। রুদ্ধশ্বাসে শুধাল, “পেয়েছ আবেশ ভাই?”
আবেশ দুষ্টুমি করে মাথা নাড়ল, “না রে! আমার মনে হয় কেউ কুড়িয়ে পেয়ে নিয়ে গেছে। দামী জিনিস হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যায় নাকি? রাত হয়ে গেছে, বাড়িতে ফিরে চল।”
ফুলের গাল বেয়ে অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ল ঝরঝর করে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেল তার। জেদ ধরে বলল, “তুমি চাইলে চলে যেতে পারো। আমি ওটা খুঁজে না পেলে যাবো না।”
ফুল আবারও খুঁজতে গেলে আবেশ তার হাত ধরে টেনে ওঠাল। তার জামার ধুলোবালি ঝেড়ে দিতে দিতে বলল, “খুঁজে পেয়ে গেছি। চল এবার!”
ফুলের একটু সময় লাগল বিশ্বাস করতে। আবেশ তার হাতে আংটিটা তুলে দিতেই সে খুশিতে নেচে উঠল, “ধন্যবাদ আবেশ ভাই। কোথায় পেলে?”
“ডাস্টবিনে।”
“ওহহো! মনে হয় ডাস্টবিনে কাগজ ফেলার সময় খুলে পড়ে গিয়েছিল।”
আবেশ ফুলের মাথায় টোকা দিয়ে বলল, “এতোক্ষণ মনে করতে পারলি না?”
“অতো সামান্য জিনিস মনে থাকে নাকি বলো। আংটিটা আমার আঙুলের তুলনায় সাইজে বড়। মনে হচ্ছে এটা পরার জন্য খেয়েদেয়ে মোটা হতেই হবে।”
“কিহ! তুই আরও মোটা হতে চাস? দেখ ফুল তুই এখনই অনেক মোটা; তার চেয়ে ভালো আংটিটা আমাকে দিস, কেঁটে ছোট করে আনবো।”
ফুলের কান্নাভেজা চোখে মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠল। “কী বললে, আমি মোটা? যাও আর কথা বলবো না তোমার সাথে।”
ফুল রাগ দেখিয়ে হাঁটা ধরল। আবেশ ফিক করে হেসে তার পিছু নিল। “ইশ! কান্না করলে আর রাগ দেখালে তোকে যে কী অসুন্দর দেখায়—দাঁড়া একটা ছবি তুলে রাখি।”
ফুলের রাগ তরতর করে বেড়ে গেল। বাড়িতে ফেরার পুরোটা রাস্তা ফুল আর কোনো কথা বলল না তার সাথে।
বর্তমান…
“আবেশ ভাই, কাপটা ধরো। কী এতো ভাবছো বলো তো।” ফুলের ডাকে আবেশ শান্ত চোখে তাকায় চায়ের কাপের দিকে।
পাশ দেখে মেহেক ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “আবেশ ভাই, চা খায়না ফুল।”
ফুল অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে এটা কীভাবে ভুলে গেল? ইদানীং স্মৃতিগুলো যেন বালির মতো আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যাচ্ছে। নইলে এই সাধারণ বিষয়টাও ভুলে যাওয়ার কোনো মানেই হয়না। ফুল জিভ কেটে চায়ের কাপটা মেহেককে দিয়ে দিল।
উর্বীকে তার কাপটা বুঝিয়ে দিয়ে বলল, “আমি নাস্তা বানিয়ে আনছি।” বলতে বলতেই দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে এগিয়ে যেতে নিল সে। ঠিক সেই মুহূর্তে আবেশ গিটারের তারে এক বিষণ্ণ সুর তুলল। ড্রয়িংরুমের নিস্তব্ধতা চিরে তার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“হো হো হো
কাভি শাম ঢালে তো
মেরে দিল মেঁ আ জানা…
ও লাগে গাম গালে তো
মেরে দিল মেঁ আ জানা…”
ফুল একমুহূর্তে স্থবির হয়ে পড়ল। তবুও পিছু ফিরে চাইল না। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলে নিল। ওদিকে আবেশ গেয়ে চলেছে—
“মেরা ঘার জ্বালানে ওয়ালে, সুন মেরি
ও তেরা ঘার জ্বালে তো
মেরে দিল মেঁ আ জানা…
মাগার আনা ইস তারাহ সে
কে ফির লট কে না জানা…”
উদ্যান সবকিছু পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে চায়ের স্বাদ উপভোগ করছে। মেহেক চোখে আবেশের দিকে তাকিয়ে আছে। উর্বী একবার আবেশের দিকে তো আরেকবার ফুলের দিকে তাকাচ্ছে। ফুল আর সহ্য করতে পারল না, লম্বা এক শ্বাস টেনে প্রায় দৌড়ে কিচেনে চলে গেল।
মাহবুবা সুলতানা রাতের জন্য হরেক রকম পদ রান্না করছেন। তার সাহায্যে দুজন কাজের লোক নিয়োজিত আছে। টেবিলের ওপর চোখ বুলিয়ে ফুল দেখল কিছু চিকেনের টুকরো অবশিষ্ট আছে। সে চিকেন ললিপপ বানানোর উদ্দেশ্যে কোমরে ওড়না গুঁজে নিল।
“তুই গিয়ে বোস, আমি বানিয়ে দিচ্ছি।” মাহবুবা সুলতানার প্রস্তাব নাকচ করে দিল ফুল। সে যে রান্না করার অজুহাত দিয়েই কিচেনে এসেছে, রান্না তো তাকেই করতে হবে।
চিকেন ললিপপের জন্য মাংসগুলো সেদ্ধ হতে দিয়ে ফুল চপিং বোর্ডে পেঁয়াজ কাটতে শুরু করল। ঠিক তখনই আবারও আবেশের কণ্ঠ ভেসে এল—
“যাব তেরে আপনে ভি
তুঝে ছোড় কে জায়েঙ্গে
অর পানি মে মিলা কে
জেহের পিলায়েঙ্গে”
গানের কথাগুলো যেন তীরের মতো ফুলের কানে বিঁধল। পেয়াজের গায়ে চালানো ধারালো ছুরিটা হঠাৎ তার আঙুলের নরম চামড়া ছুঁয়ে গেল। সুক্ষ্ম ব্যাথা ছড়িয়ে পড়ল ফুলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তীব্র ব্যথায় ককিয়ে উঠল সে। অবচেতন মনেই ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে এল, “উহ্! মা!”
তার আর্তনাদ শুনে মাহবুবা সুলতানা উৎকণ্ঠিত হয়ে এগিয়ে এলেন, “কী হয়েছে ফুল?”
তিনি একটু জোরেই বললেন, “একটু দেখে কাজ করবি না?”
তার কথাটা কিচেন ছাপিয়ে উদ্যানের কানে পৌঁছাল। সে ফোনটা পকেটে গুঁজে কিচেনে চলে এলো। ফুলের হাতটা টেনে নিয়ে মাহবুবা সুলতানার উদ্দেশ্যে নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল, “তাকিয়ে না থেকে ফার্স্ট এইড দিন।”
ফুলের চোখের কার্নিশে জল টলমল করছে। বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। তাকে হাঁসফাঁস করতে দেখে উদ্যান জগ থেকে পানি ঢেলে ফুলের ঠোঁটের সামনে ধরল। ফুল পানি মুখে নিতেই আবারও ভেসে এল—
“ও যাব তেরে আপনে ভি…
তুঝে ছোড় কে জায়েঙ্গে
অর পানি মে মিলা কে…
তুঝে জেহের পিলায়েঙ্গে”
অশ্রুসিক্ত নয়নে ফুল তাকাল উদ্যানের দিকে। উদ্যান তার দৃষ্টি এড়িয়ে ফার্স্ট এইড থেকে অয়েন্টমেন্ট বের করে আঙুলে লাগিয়ে দিতে লাগল। তার ছোঁয়া যেন কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটার মতো কাজ করল। উদ্যান এর আগে হয়তো কখনোই কারো ক্ষততে মলম লাগিয়ে দেয়নি। নইলে একটু হলেও দয়া দেখতো, এভাবে ক্ষততে মলমের প্রলেপ চেপে ধরতো না। ফুল দাঁতে দাঁত চেপে কষ্ট টুকু সহ্য করে নিল। উদ্যান একই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে ড্রেসিং টেপ লাগিয়ে দিতে লাগল। আবেশের গান তখনো শেষ হয়নি:
“ওয়াহি হাথ কাটেঙ্গে তেরে
জো হাথ মিলায়েঙ্গে
জিনহে জান জান ক্যাহতে হো
ওয়াহি জান লে জায়েঙ্গে
কৌন আপনা হ্যায় তেরা, কৌন পারায়া
ও ইয়ে না পাতা চালে তো
মেরে দিল মেঁ আ জানা…
মাগার আনা ইস তারা সে
কে ফির লট কে না জানা…”
টেপ লাগানো শেষে উদ্যান ফুলের হাত ছেড়ে দিল। বরফশীতল গলায় বলল, “কাল ফিরে যাচ্ছি আমরা। তোমার আবেশ ভাই সুস্থ হয়ে গেছে, ক্লিয়ার!”
উদ্যান হনহনিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। তার চলে যাওয়ার রেশটুকু মিলিয়ে যেতেই ফুল বিধ্বস্তের মতো কিচেনের টুলের ওপর ধপাস করে বসে পড়ল।
↓↑
রাতের নিস্তব্ধতা তখন চরাচরে জেঁকে বসেছে। ডিনার শেষে ফুল ধীর পায়ে উদ্যানের রুমে এসে দাঁড়াল। মনের ভেতর একরাশ দ্বিধা নিয়ে অতি কষ্টে উচ্চারণ করল, “আরও কয়েকটি দিন থাকা যায়না?”
ফুলের আবদারে উদ্যানের কপালে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট হলো। “অলরেডি পাঁচ দিন হয়ে গেছে। আরও কতো দিন থাকতে চাইছ?”
কান্না গুলো ফুলের গলায় দলা পাকিয়ে গেল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। দেখতে ইচ্ছা করছে তাকে। আর দুটো দিন থাকি। তিনি নিশ্চয়ই পরশুদিনের মধ্যে ফিরে আসবে।”
উদ্যান বিছানায় আধশোয়া হয়ে কপালের ওপর হাত রেখে ফোন টিপছিল। ফুলের কান্নার শব্দে সে এবার উঠে বসল। পাশের শূন্য জায়গাটা হাত দিয়ে চাপড়ে ইশারায় বলল, “এখানে এসে বসো।”
ফুল কাঁপতে কাঁপতে উদ্যানের পাশে গিয়ে বসল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই উদ্যান তার মাথাটা নিজের চওড়া কাঁধের ওপর টেনে রাখল। একহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতের আঙুলগুলো ফুলের নরম গালে বুলিয়ে দিতে লাগল। নিচু স্বরে প্রশ্ন করল, “মায়ের কথা মনে পড়লে কাঁদতে হয় বুঝি?”
ফুল ঠোঁট চেপে কান্না নিবারণের আপ্রাণ চেষ্টা করল। ধরা গলায় বলল, “কাঁদতে হয় কিনা জানিনা। কিন্তু আমি কাঁদি। খুব কাঁদি, কান্না আটকে রাখতে পারিনা।”
“যারা কাঁদতে জানেনা তাদের কী করা উচিত?”
“আপনি কি নিজের কথা বলছেন?”
উদ্যান জবাব দিলো না। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “আমরা আরও দুদিন থাকবো। কথা দাও, দুদিন পরেও সে না ফিরলে তুমি খুশিমনে ফিরে যাবে আমার সাথে। একটুও মন খারাপ করবে না।”
ফুল উদ্যানের উরুর ওপর আনমনেই আঁকিবুঁকি করতে করতে কোমল স্বরে বলল, “আমার মন খারাপ থাকলে আপনারও ভালো লাগবে না তাইনা?”
“ভালো লাগবে না কারণ এই ব্যাপারটা নিয়ে তোমার মুড অফ থাকবে, তোমার কাছাকাছি গিয়ে আমি মজা পাবো না।”
ফুলের চোখ বড়বড় হয়ে গেল। কান্না করতেও যেন ভুলে গেল মেয়েটা। উদ্যান যোগ করল, “আমি সব জিনিস নিজের ভালো লাগার ছাঁচে ফেলে গড়ে নিই। সেই জন্যেই তোমার এইসব অনর্থক আবদার মেনে নিতে হচ্ছে।”
ফুলের ভেতরটা মুহূর্তেই বিষিয়ে উঠল। সে প্রবল এক আকুলতায় উদ্যানের বাহু আঁকড়ে ধরে তার চোখে চোখ রাখল। প্রাণহীন কণ্ঠে শুধাল, “একটুও ভালোবাসেন না আমাকে তাইনা?”
উদ্যান চোখ নামিয়ে ফুলের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বলল, “খুব ভালোবাসি তোমাকে।”
“আমার কেন মনে হয়না?”
“ভালোবাসতেই দিচ্ছো না, মনে হবে কীভাবে?”
“শরীর স্পর্শ করাকেই কি ভালোবাসা বলে?”
উদ্যান চুপ হয়ে গেল। তার এই নিস্তব্ধতা ফুলকে ভীষণ যন্ত্রণা দিল। সেও আর কথা বাড়াল না, শুধু শুধু নিজের জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে ফেলার কোনো মানেই হয়না। সে আবারও উদ্যানের কাধে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজল।
উর্বী ফুলকে খুঁজতে খুঁজতে উদ্যানের রুমের সামনে এসে থামল। ডাকার জন্য মুখ খুলতেই উদ্যান তর্জনী আঙুল ঠোঁটে চেপে ইশারায় চুপ থাকতে বলল। পাশ ফিরে ফুলকে আলগোছে শুইয়ে দিয়ে বিছানা ছাড়ল সে। বাইরে বেরিয়ে এসে দরজাটা আলতো হাতে ভিড়িয়ে রাখল। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, “ও ঘুমিয়ে গেছে, ডেকো না। তুমিও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”
উর্বী কথা বাড়াল না, শুধু মাথা হেলিয়ে উল্টো ঘুরে চলে গেল।
↓↑
মেহেক আবেশের রুমের সামনে এসে উঁকি মেরে দেখল আবেশ হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। রুমের লাইট জ্বলছে, গিটার টা আবেশের একপাশে রাখা।
“আবেশ ভাই, ঘুমিয়ে গেছো?”
আবেশ চোখ মেলে তাকাল। হয়তো আবারও ফুলের সাথে মেহেককে গুলিয়ে ফেলেছিল সে। দরজার দিকে চোখ ফিরিয়ে মেহেককে দেখে আবেশ পুনরায় চোখ বুজে বলল, “বিরক্ত করিস না, যা ওখান থেকে।”
তার খিটখিটে কণ্ঠ শুনে মেহেক শুকনো ঢোক গিলল। রিনরিনিয়ে বলল, “আজ তোমার জন্মদিন, সেই জন্য একটা গিফট কিনেছিলাম তোমার জন্য। গিফট টা দিয়েই চলে যাবো। ভেতরে আসবো?”
আবেশ অনুমতি দিল। “টেবিলের ওপর রেখে যা।”
মেহেক পা টিপে টিপে ভেতরে এসে, লাল রঙের র্যাপিং পেপারে মোড়ানো গিফট বক্সটা টেবিলে রাখল।
“কী হলো এতোক্ষণ লাগছে কেন?”
মেহেক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত কচলাচ্ছিল। আবেশের বিরক্তিমাখা কণ্ঠ শুনে মেহেক দমকে গেল। দ্রুত পায়ে রুম ত্যাগ করল মেয়েটা।
পরপরই আবেশও উঠে পড়ল। হঠাৎ কেমন যেন মনটা আনচান আনচান করছে। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটা হারিয়ে ফেলার তীব্র আশঙ্কা তার মন মস্তিস্ককে শান্তি দিচ্ছে না। বালিশের নিচে হাত ঠেলে দিয়ে আবেশ সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করল। স্লিপারে পা গলিয়ে ধীরপায়ে ছাদের দোরগোড়ায় এসে থামল। অন্যমনস্ক হয়ে রেলিঙের দিকে এগোতে এগোতে এক ছায়ামূর্তি আবিষ্কার করল সে। রসকষহীন কণ্ঠে বেজায় অখুশি নিয়ে বলল, “আপনি এখানে কী করছেন?”
উদ্যান তার দিকে ফেরাটা দরকারী মনে করল না। সিগারেটের নীলচে ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুমি যা করতে এসেছো, আমিও তাই করতে এসেছি।”
হাতে থাকা সিগারেটের প্যাকেটটা মুষ্টিবদ্ধ করে নিল আবেশ। রাগে গজরাতে গজরাতে বলল, “আপনি কী করেছেন ফুলের সাথে? কেন ও এমন অদ্ভুত বিহেভ করছে?”
উদ্যান ভাবলেশহীন কণ্ঠে জবাব দিল, “তুমি সেদিন যেটা করার ধান্দা নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলে আমি সেটাই করতে সফল হয়ে গেছি। আর বেশি কিছু করিনি।”
পাজোড়া অসাড় হয়ে এলো আবেশের। রুদ্ধ স্বরে জানতে চাইল, “কী করতে গিয়েছিলাম আমি?”
ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট রেখে পকেটে হাত দিল উদ্যান। ফোনটা বের করে খুঁজে বের করল কোনো একটা নির্দিষ্ট ভিডিও। সেটা প্লে করে আবেশের সামনে ধরতেই আবেশের বুকে শুরু হলো তোলপাড়। দিকবিদিশ হারিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগল সেই দিনকার দৃশ্য যেদিন সে নিজ সত্তার ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। জীবনে একবারই কেবল তার সাথে হয়েছিল তেমন। কিন্তু এই দৃশ্য উদ্যান ফোনে ধারণ করেছে কীভাবে? তার ভাবনার মাঝেই উদ্যান নিয়ে নিল ফোনটা।
“পেটালের চোখে তুমি খুব মহৎ আবেশ। ও কখনো কল্পনাও করতে পারেনা তুমি ওকে নিয়ে এমন বদ চিন্তায় মশগুল থাকো। ওকে ভিডিওটা দেখিয়ে তোমার প্রতি গড়ে ওঠা অন্ধ বিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে ফেলা উচিত, কী বলো?”
আবেশের কণ্ঠ কাঁপল, “আপনি এটা কোথায় পেলেন?”
“কোথায় পেয়েছি সেটা ফ্যাক্ট নয়।” উদ্যান সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বলল, “তোমার ইনটেনশন যে খারাপ ছিল সেটাই মস্ত বড় ফ্যাক্ট।”
আবেশ আর পারল না নিজেকে ধরে রাখতে। মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা হাতটা দিয়েই উদ্যানকে ঘুষি মারতে উদ্যত হলো সে। উদ্যান তৎক্ষনাৎ তার উড়ে আসা হাতটা ক্ষিপ্র গতিতে ধরে ফেলল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “বারবার পেটালের দিকে চলে যাওয়ার কারণে আমি তোমার হাত ভেঙে ফেলতে পারি আবেশ। বাট আমি এমনটা করবো না, কারণ পেটালের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে এইমুহূর্তে চাইনা আমি।”
আবেশের হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে উদ্যান নিচে নেমে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল আবেশ। শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল, “ফুল… আমি যদি বলি আমার খারাপ কোনো ইনটেনশন ছিল না, তুই বিশ্বাস করবি তো আমার কথা? আমি শুধু কিছুক্ষণের জন্য মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলেও নিতাম, কখনোই তোর ঘুমের সুযোগ নিতাম না।”
রুমে এসে উদ্যান আর ফুলকে খুঁজে পেল না। হয়তো মেয়েটার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, তারপর নিজের রুমে চলে গেছে।
↓↑
পরেরদিন, বিকালবেলা ড্রইংরুমে বসে সবাই চা-নাস্তা খাচ্ছিল। এমন সময় উদ্যান বলে উঠল, “আমরা আগামীকাল ফিরে যাবো।”
মাহবুবা সুলতানা আবেশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, ছেলেটা ফুলের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে আছে। ফুল মাথা নিচু করে রেখেছে।
“আপনারা মানে, আপনি আর ওই মেয়েটা চলে যাবেন রাইট?” আবেশ কথাটা উর্বীর দিকে ইঙ্গিত করে বলল।
উদ্যান পরক্ষনেই বলল, “পেটালও যাবে আমাদের সঙ্গে।”
আবেশ বসা থেকে সটান হয়ে উঠে দাঁড়াল। তেজি কণ্ঠে বলল, “ও যাবে না আপনাদের সঙ্গে। আপনি ওকে জোর করে নিয়ে যেতে পারবেন না।”
উদ্যান আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “আমি জোর করে নিয়ে যাবো না। ও স্বইচ্ছায় যাবে।”
“অসম্ভব! ফুল নিজ ইচ্ছায় কখনোই যাবে না আপনার সঙ্গে।”
উদ্যান চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে ধীরস্বরে বলল, “ওকেই জিজ্ঞেস কিরে দেখো, যাবে কী যাবে না।”
আবেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, “জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। আমি বলেছি যাবে না মানে যাবে না।”
“আমি যাবো আবেশ ভাই।” ফুলের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি উত্তাপ ছড়াল।
আবেশ ঝড়ের বেগে ঘুরে গিয়ে ফুলের সামনে দাঁড়াল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুই যাবিনা।”
ফুল মাথা তুলল না। বিড়বিড়িয়ে আবারও বলল, “আমি যাবো।”
আবেশ গর্জে উঠল, “কেন যাবি তুই? উনি তোর সাথে কী কী করেছে সব ভুলে গেলি?”
ফুল এবার মুখ তুলল। তার শান্ত চোখে ধরা দিল এক অদ্ভুত স্থিরতা। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “যাইনি, কেউ ভুলে যায়না আবেশ ভাই। আমি ক্ষমা করে দিয়েছি তাকে। উনি এখন ভালোবাসেন আমাকে।”
আবেশের চোখ লাল হয়ে এলো। ফুলের মনোভাব সম্পর্কে পূর্বে ধারণা পেলেও এখন ফুলের মুখে সরাসরি কথাগুলো শুনে তার হৃৎপিণ্ড সংকুচিত হয়ে আসছে। সে চরম হতাশায় নিজের চুল খামচে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে আর্তনাদের মতো করে বলল, “আমিও তোকে ভালোবাসি ফুল। শুধু উনি ভালোবাসেন বলেই তুই আমার সাথে অন্যায় করে চলে যেতে পারিস না।”
ফুল নিমিষেই চোখ বন্ধ করে নিল। নিজেকে ধাতস্থ করে পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। আবেশের মুখোমুখি হয়ে বলল, “শুধু সে ভালোবাসে বলেই যাচ্ছিনা। আমিও তাকে ভালোবাসি। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি।”
কথাটা শোনামাত্রই আবেশের পুরো দুনিয়া উল্টে গেল যেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফুলকে সে যেন চিনতেই পারছে না। মনে হচ্ছে এ তার ফুল নয়। এ অন্য কেউ; এমন কেউ যার মাঝে হৃদয়, মায়া, আবেগ, অনুভূতি কিচ্ছু নেই। যদি থাকতো তাহলে কখনো কি পারতো এতোটা নিষ্ঠুরভাবে আবেশের বুকে ছুরি ঢুকিয়ে দিতে? পারতো না। তার ফুল হলে পারতো না।
“তুই কী বললি মাত্র… তুই ওকে ভালোবাসিস?” আবেশ পিছু হটলো।
ফুল যেন কোনো এক সম্মোহনে আচ্ছন্ন। সে যান্ত্রিক ভঙ্গিতে আবারও উচ্চারণ করল, “হ্যাঁ ভালোবাসি তাকে, খুব খুব ভালোবাসি।”
খেই হারাল আবেশ। চোখের পলকেই টেবিলের ওপর থাকা সবকিছু আছড়ে ফেলল ফ্লোরে। বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। মাহবুবা সুলতানা গিয়ে ছেলেকে সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু পারলেন না, আবেশ হাতের সামনে যা পেল সব ভেঙেচুরে তছনছ করে ফেলল। ফুল এখনো একভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ দক্ষযজ্ঞ চালানোর পর আবেশ ক্লান্ত হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
“তুই কীভাবে পারলি আমার সামনে এই বাক্যটা উচ্চারণ করতে? একবারও ভাবলি না এটা শোনার পর কতটা কষ্ট হবে আমার? কীভাবে পারলি অন্যকাউকে ভালোবাসতে। আমি একজীবনে শুধু তোর মনের দখলটুকু চেয়েছিলাম। আর কিছুই চাইনি। চেয়েছি বল? সেটাও কেন দিতে পারলি না। সবকিছু হারিয়ে ফেলেও শুধু তোকে খুঁজে ফিরেছি। পরিশেষে তুইও বেইমানি করলি?”
মাহবুবা সুলতানা ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন। আবেশ কেঁদেকেটে উদ্ভ্রান্তের মতো করছে। ছেলের উন্মাদনা দেখে মাহবুবা সুলতানা কান্না চেপে রাখতে পারলেন না। আবেশ মায়ের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে টলতে টলতে ফুলের সামনে এসে দাঁড়াল।
“আমাকে কেন ভালোবাসলি না ফুল?”
এই একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ফুল ভাষা হারিয়ে ফেলল। পাথরের মতো প্রাণহীন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল সে। আবেশের চোখ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে বিরতিহীন। সে করুণ স্বরে মিনতি করল, “প্লিজ আমাকে ভালো না বাসার একটা কারণ দেখা। যাতে আমিও নিজের মনকে বোঝাতে পারি আমার মাঝেও কমতি ছিল, ভুল ছিল আমারও।”
ফুলের নিরবতা আবেশের মনকে বিষিয়ে তুলল। সে অভিযোগের সুরে বলল, “ঠিক আছে, লেট মি গেস। কারণটা বলতে গিয়ে তোর একটু কষ্ট হচ্ছে হয়তো তাইনা? আমিই বলে দিচ্ছি, কারণটা হলো, আমি কোনো উচ্চবংশীয় পরিবার থেকে বিলং করিনা।”
ফুলের মাঝে টনক নড়ল। সে চমকিত নয়নে তাকাল আবেশের দিকে। আবেশ পাগলের মতো হাসতে হাসতে যোগ করল, “যখন তুই জানতে পারলি খানজাদা বংশের সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক নেই তখনই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিস তাইনা? তবে কি আমার জন্মটাই ভুল ছিল বুনোফুল… ওহ সরি, তুই আমার বুনোফুল নোস। যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম সে হারিয়ে গেছে।”
“তুমি আমাকে যা খুশি বলতে পারো আবেশ ভাই। আমি তোমার জীবনের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হতেও প্রস্তুত আছি। শুধু ভালোবেসো না আমায়, কষ্ট পেও না আমার জন্য। দয়া করে আর কখনো খুঁজো না আমায়। আমি হারিয়ে গেছি এমন কোথাও যেখান থেকে ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”
আবেশ এবার ধপ করে ফুলের পায়ের কাছে বসে পড়ল। মাথা নত করে ঝরঝরিয়ে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল। আটকে আসা কণ্ঠে প্রায় নিঃশব্দে বলল, “আমার ভালোবাসা তোর ভালো থাকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না ফুল। আমি কষ্টে জর্জরিত হয়ে মরণাপন্ন হলেও তোর খারাপ চেয়ে তোকে বদদোয়া করবো না। শুধু মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে যেকোনো একটা পথ ধরে ফিরে আসিস। আমি কথা দিচ্ছি, যখন আমার কাছে ফিরে আসতে চাইবি তখন যেই পথ ধরে হাঁটা ধরিস না কেন সেই পথের শেষেই আমাকে পেয়ে যাবি। কারণ তোকে খুঁজে পাওয়ার আশা এই একজন্মে ছাড়তে পারবো না আমি।”
ফুলের কান্না পেলেও সে শক্ত গলায় বলল, “আমি চাইনা তুমি আমাকে খোঁজো কিংবা আমার জন্য কষ্টে থাকো। আমি চাই তুমি খুব ভালো থাকো।”
“সত্যিই যদি সেটা চাইতিস, তবে থেকে যেতিস।”
“আমি সত্যিই চাই আবেশ ভাই। তুমি ভালো থাকো, খুব ভালো থাকো। কিন্তু আমি যেখানে অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলেছি সেখানে তোমার সাথে থেকে গেলেও তুমি ভালো থাকবে না। আমার কথা নাহয় বাদই দিলাম আমি যাকে ভালোবাসি সেও ভালো থাকবে না। আমরা কেউ ভালো থাকবো না। তার চেয়ে মিথ্যা ধোঁয়াশার মধ্যে আমাকে খুঁজে না ফিরে তুমি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মেনে নাও যে আমাকে তুমি কখনোই খুঁজে পাবেনা।”
আবেশের শরীরটা নিস্তেজ হয়ে এলো। সে বহু কষ্টে নিজের অবসন্ন দেহটাকে টেনেটুনে তুলে নিয়ে রুমের দিকে রওনা হলো।
↓↑
ড্রইংরুম জুড়ে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। মেহেকের মনটা অজানা কারণে ভারী হয়ে উঠল। আবেশকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখাটা তার জন্য বড়সড় একটা ধাক্কা ছিল। সে দুঃস্বপ্নেও এমন কিছু কল্পনা করেনি কখনো।
আবেশের আহাজারি উপস্থিত সবার হৃদয়ে দাগ কাটলেও উদ্যানকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারেনি। মাহবুবা সুলতানা পড়ে গেলেন দোটানায়, একবার ভাবছেন ছেলের পিছুপিছু যাবেন আবার ভাবছেন ছেলে হয়তো তাকে দেখে আরও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাবে। মনে সংসয় থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে আটকে রাখতে পারলেন না।
দুয়ারের অভিমুখে এসে তিনি দেখলেন আবেশ বিছানার ওপর নিজেকে আঁকড়ে ধরে এক কুঁকড়ে যাওয়া অস্তিত্বের মতো বসে আছে।
“আ…বেশ!”
মায়ের কণ্ঠ শুনে আবেশ মুখ তুলল। অযত্নে বেড়ে ওঠা অবিন্যস্ত চুল-দাড়িতে তাকে এমনিতেই মানসিক রোগীর মতো দেখাতো তার ওপর আজ যেন একদম রাস্তার পাগলের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে মুখাবয়বে। মাহবুবা সুলতানা ছুটে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন, “শান্ত হ বাবা। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
মায়ের কোলে মুখ গুজে ডুকরে কেঁদে উঠল আবেশ। “কিচ্ছু ঠিক হবেনা মম। ফুল আমাকে ভালোবাসে না, এই কথাটা শুরু থেকেই জানতাম আমি। কিন্তু কখনো কল্পনাও করতে পারিনি ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য কাউকে ভালোবাসার কথা বলবে। আমি এই দিন দেখতে চাইনি। আমাকে তুমি মে’রে ফেলো মম, আমি আর বাঁচতে চাইনা।”
মাহবুবা সুলতানার চোখের সামনে টা ঝাপসা হয়ে এলো। তিনি আবেশের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। “তুই কেন ম’রে যেতে চাইছিস? ফুল অন্য কাউকে ভালোবেসে ফেলেছে এতে তোর তো কোনো দোষ নেই। তুই তো নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছিলি ওকে ধরে রাখতে। কিন্তু কখনো জানতে চেয়েছিলি কি ও থাকতে চায় কিনা তোর কাছে?”
আবেশের কণ্ঠে শ্লেষ ঝরে পড়ল। “আমি জানতে চাইনি মম। কারণ আমি জানতাম ও থাকতে চায়না আমার কাছে। শুরু থেকেই ও আমার ব্যাপারে উদাসীন ছিল। কিন্তু আমি নিজের সবটুকু দিয়ে ওকে নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলাম। ওর মনটা আমার দিকে ফিরেওছিল। তখনই আবারও ডেভিলটা এসে ছিনিয়ে নিয়ে গেল আমার ফুলকে। ওর জন্যই আমার সাজানো গোছানো স্বপ্নগুলো ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ও আমাদের জীবনে না এলে ফুল বিয়ে করে নিতো আমাকে, আমাদের একটা সংসার হতো।”
“তুই যে ফুলকে এতো ভালোবাসিস আমি বুঝতে পারিনি আবেশ। যদি বুঝতে পারতাম আমি কিছুতেই ফুল আর উদ্যানের বিয়েটা হতে দিতাম না।”
“বোঝার চেষ্টা করোনি মম, কেন করলে না? ও হারিয়ে গেল।”
ছেলের কষ্ট সইতে না পেরে মাহবুবা সুলতানা এবার একটু কঠোর হলেন, “ফুলের মনে তোর জন্য জায়গা ছিল না আবেশ। যদি থাকতো তাহলে এতো তাড়াতাড়ি উদ্যানকে ভালোবেসে ফেলতে পারতো না।”
আবেশ হঠাৎ মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল। হন্তদন্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে আলমারি খুলল। মাহবুবা সুলতানা জিজ্ঞাসু কণ্ঠে শুধালেন, “কী হলো?”
আবেশ জবাব দিল না। আলমারির ড্রয়ার খুলে কয়েকটা ছবি বের করে মাহবুবা সুলতানার চোখের সামনে ধরল। ছবিগুলো দেখামাত্রই মাহবুবা সুলতানার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
“তুই উদ্যানের এই ছবিগুলো কোথায় পেলি? এগুলো তো স্টোররুমে লক করা ছিলো।”
আবেশ পা তুলে খাটে বসল। ছবিগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “এগুলো আমি ফুলের বালিশের নিচে পেয়েছিলাম।”
“কীহ! কবে?”
“ডেভিলটা ফুলকে বিয়ে করে নিয়ে চলে যাওয়ার পর তো আমি ফুলের ঘরেই থাকতাম। তখনই পেয়েছিলাম।”
“কিন্তু ছবিগুলো ফুল পেলো কোথায়?”
“স্টোর রুম থেকেই নিয়েছিল হয়তো।”
“কিন্তু কেন?”
আবেশ তিক্ততা মিশিয়ে বলল, “ডেভিলটাকে নিয়ে ওর কৌতুহল বরাবরই তুঙ্গে ছিল মম। খুব সম্ভবত সেই কৌতুহল মেটাতেই নিয়েছিল। আমি এই ছবিগুলো পাওয়ার পরেই সতর্ক হয়ে গিয়েছিলাম, ভয় হচ্ছিল এটা ভেবে যে ডেভিলটা ফুলের সাথে একটু ভালো ব্যবহার করলেই ফুল হয়তো প্রেমে পড়ে যাবে। আর দেখো, আমি যে ভয়টা পেয়েছিলাম সেটাই হলো।”
আবেশ কথাগুলো বলতে বলতেই ছবিগুলো ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলল।
“মম একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে? ঘুমিয়ে পড়তে চাই, বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে।” ছেলের এই করুণ আবদার মাহবুবা সুলতানা ফেরাতে পারলেন না। আবেশ বালিশে মাথা রাখতেই তিনি তার চুলে আঙুল চালিয়ে বিলি কাটতে লাগলেন।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৬০০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৮