Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৭


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৩৭)

সোফিয়া_সাফা

​বিকেলের রোদ তখন আর তীব্র নেই। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে নামতে আলোটা হয়ে উঠেছে সোনালি, বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ভেজা মাটির সোদা গন্ধ। দুপুরের অন্তিম ক্ষণে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়েছিল কিছুক্ষণ। সেই বৃষ্টিজলে চারদিকের সবুজাভ অরণ্য আরও সতেজ হয়ে উঠেছে। হাভেলির সামনে দাঁড়িয়ে আছে মজবুত গড়ন ও উঁচু চাকা বিশিষ্ট কালো রঙের দুটো Jeep Wrangler JK Armor। পাহাড়ি পথের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এবং ভ্রমণের আমেজে অদ্ভুতভাবে প্রাণবন্ত। উদ্যান ছাড়া বাকিরা জিপের সামনে অপেক্ষা করছে। ফুল দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে, তার পরণে প্যাস্টেল শেডের ফার্সি স্যুট; সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারিতে সাজানো। সঙ্গে ফ্লেয়ারড প্লাজো। প্রায় পনেরো মিনিট একভাবে দাঁড়িয়ে থেকে সে এবার বিরক্তিতে ঠোঁট উল্টে বলল, “উনি কি স্পেশাল মেক-আপ করতে গিয়ে এত সময় নিচ্ছেন?”

​সোহম প্রত্যুত্তর করতে গিয়ে জিভ কেটে ডানে-বামে মাথা নাড়ল। যদিও সে জানে উদ্যানের কেন এত সময় লাগছে, তবুও সে ফুলের সামনে সত্যিটা মুখে আনতে পারবে না। উদ্যান যদি এসে জানতে পারে তার ড্রিংকস করার কথা সোহম বলে দিয়েছে, তাহলে এবার ফুলও তাকে পানিশড হওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে না।

​উত্তর না পেয়ে ফুল উল্টো পথে হাঁটা ধরল। সে এবার নিজে গিয়ে দেখবে দানবটা ঠিক কী করছে। দু-পা এগোতেই থেমে যায় সে। উদ্যান বড় বড় পা ফেলে তার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে। ফুল কোমরে হাত রেখে দানবটাকে ওপর-নিচ পরখ করতে লাগল। উদ্যানের পরণে ম্যাট ব্ল্যাক শার্ট, তার ওপর চারকোল টোনের হেভি জ্যাকেট। নিচে ব্ল্যাক স্লিম-ফিট ডেনিম। এলোমেলো চুলে হেডব্যান্ড পরা। কয়েক গোছা চুল কপালের পাশে অবাধ্যভাবে নেমে এসেছে। গালের খোঁচা খোঁচা চাপদাড়ি যেন অন্যভাবে ফুলের নজর কেড়ে নিল। ফুলকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় উদ্যান সামান্য ঝুঁকে এল; এতটাই কাছাকাছি যে তার নিচু কণ্ঠটা শুধু ফুলের কানে পৌঁছাল। “ইউ আর লুকিং গর্জিয়াস, লেটস মুভ।”

​কথাটা বলে সে এক মুহূর্তও থামল না। সোজা হয়ে সামনে এগিয়ে গেল, তার মুখনিসৃত দুটো শব্দই ফুলের হৃদয়ানুভূতির ভারসাম্য নাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট ছিল। ফুল সামনে ফিরে বলল, “কী করছিলেন এতক্ষণ? চেহারা দেখে মেক-আপ করেছেন বলেও তো মনে হচ্ছে না। তিন-তিনটা মেয়েসহ বাড়ির সবাই রেডি হয়ে গেল আর আপনি আধা ঘণ্টা পর এসে তাড়া দিচ্ছেন?”

​উদ্যান ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “ওয়াইফির সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার খুশিতে অজ্ঞান হয়েছিলাম কিছুক্ষণ, তাই দেরি হয়ে গেছে। আরও দেরি করতে না চাইলে চলো তাড়াতাড়ি। রাত নামার আগেই নীলগিরি পৌঁছাতে হবে।”

​লুহানের ড্রাইভ করার কথা থাকলেও আপাতত সে নিজের ব্যর্থতা নিয়ে মনে মনে অনেক অনুতপ্ত। তাই তার মনের অবস্থা অনুধাবন করে সোহম ড্রাইভিং সিটে বসার জন্য ডোর ওপেন করল, কিন্তু তখনই উদ্যানের নির্ভার কণ্ঠ ভেসে এল।
“আজ আমি ড্রাইভ করব। তুই গিয়ে ব্যাকসিটে বোস।”
​সোহম অযথাই কথা বাড়াল না। কিন্তু ফুল চট করে বলল, “আপনি হাতের ব্যথা নিয়ে গাড়ি চালাবেন কীভাবে?”

​উদ্যান গাড়ির একপাশ ঘুরে এসে ফ্রন্ট সিটের দরজা খুলে দিয়ে নিচু স্বরে আওড়াল, “এখানে এসে বোসো, সরাসরি দেখতে পারবে কীভাবে কার ড্রাইভ করব।”

​ফুল আর কিছু বলল না। বাধ্য মেয়ের মতো গিয়ে বসে পড়ল। শুধু শুধু উদ্যানের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে সময় নষ্ট করতে চায় না সে। উদ্যান কবেই বা তার বাধানিষেধ আমলে নিয়েছে? মাঝের সারিতে অনি, অনিলা আর মেলো জায়গা নিল। লুহান আর সোহম উঠে বসল একেবারে পেছনের সিটে। ঠিক তাদের পেছনেই আরেকটি গাড়িতে গার্ডদের দল ইতিমধ্যেই অবস্থান নিয়েছে।
​ইঞ্জিন চালু হতেই গাড়িটি মৃদু গুঞ্জনে এগোতে শুরু করল। জানালার বাইরে সারি সারি গাছপালা যেন চোখের সামনে ক্ষণিকের জন্য এসে মিলিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতরে পিনপতন নীরবতা। সেই নীরবতার বুক চিরে কেবল ভেসে আসছে ল্যাটিন জাজের কোমল সুর, যা পরিবেশকে আরও অদ্ভুতভাবে ভারী করে তুলছে।
​অনি আর মেলোর মাঝখানে বসে অনিলা ভীষণ বোর হচ্ছিল। গাড়ির ভেতরের নীরবতা তার অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। এমন সময় জানালার বাইরে চোখ যেতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল রাস্তার পাশে বয়ে চলা নদীর দিকে। মুহূর্তেই তার উৎসুক নয়নজোড়া বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। নদীর বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নৌকা, পর্যটকেরা হাসি-আড্ডায় মেতে নৌকাভ্রমণ করছে। দৃশ্যটা এতটাই মনকাড়া যে অনিলা নিজেকে সামলাতে পারল না। মেলোর গা ঘেঁষে সামনের দিকে ঝুঁকে জানালার কাছে চলে গেল। এই আচমকা ঝোঁকে মেলোর মনোযোগে ছেদ পড়ল। খানিকটা বিরক্ত হয়ে সে বলে উঠল, “তুমি আমার কোলে উঠে যাচ্ছো কেন, অনিলা?”

​কথাটা শুনেই অনিলা যেন চমকে উঠল। নিজের উচ্ছ্বাস এক মুহূর্তে গিলে নিয়ে সে ধপ করে নিজের গদিতে বসে পড়ল। মুখ ভার করে সিটে ঢলে পড়ল, চোখে নেমে এল অনভিপ্রেত অভিমানের ছায়া। অনির তখনো চোখ ছিল ফোনের স্ক্রিনে। কিন্তু গেম খেলতে খেলতেও মেলোর আচরণটা খেয়াল করল সে। ফোন নামিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? তুই ওকে ধমক দিলি কেন?”

​মেলো হকচকিয়ে গেল। সে মূলত নিজের কাজে এতটাই ডুবে ছিল যে অনিলার সাথে অজান্তেই রুক্ষ আচরণ করে ফেলেছে। ফোন সরিয়ে রেখে অনিলার দিকে তাকিয়ে সে নরম স্বরে বলল, “সরি অনিলা। আসলে তোমার হঠাৎ ঝুঁকে পড়ায় আমার মাথার সব কনক্লুশন এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। তাই না ভেবেই ওভাবে বলে ফেলেছি।”

​অনিলা জোর করে একফোঁটা হাসি ঠোঁটে এঁকে বলল, “আমি কিছুই মনে করিনি, মেলো। তুমি তোমার কাজে মনোযোগ দাও।”
​ফুল ঘাড় ফিরিয়ে তাদের কথোপকথন শুনছিল। নৌকাভ্রমণে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকলেও সে অনিলার মনোভাব বুঝতে পেরেছে। সে বুদ্ধিদীপ্ত কণ্ঠে বলল, “অনি স্যার, অনিলা আপু বোধহয় নৌকাভ্রমণ করতে চাইছে।”

​অনি প্রশ্নবিদ্ধ চোখে অনিলার ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। কিন্তু অনিলা প্রত্যুত্তরে কিছুই বলল না। অনি কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপ থেকে উদ্যানের উদ্দেশ্যে বলল, “কিছুক্ষণের জন্য গাড়িটা থামাতে পারবি?”

​প্রথমে কোনো উত্তর এল না। অনি ভাবল, হয়তো উদ্যান এখন বিরতি নিতে চাইছে না। কিন্তু মুহূর্ত পরেই উদ্যান গাড়িটা সাইডে এনে ধীরেসুস্থে ব্রেক করল। সবগুলো দরজা আনলক করে দিয়ে নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে বলল, “তিরিশ মিনিটের বেশি সময় ওয়েস্ট করা যাবে না।”

​অনি হালকা হেসে নেমে গেল। সাথে সাথে অনিলা, সোহম, লুহানও বেরিয়ে এল।
“কিরে, থামালি কেন?” লুহানের প্রশ্নের জবাবে অনি বলল, “অনিলা সাঙ্গু নদীর বুকে নৌকাভ্রমণ করতে চাইছে।”
​লুহান ভ্রু উঁচিয়ে নদীর পানে চাইল। “আইডিয়া খারাপ না। আমরাও যাবো, চল।”

উদ্যান আর মেলোকে গাড়িতেই বসে থাকতে দেখে ফুল প্রশ্ন করল, “আপনারা দুজন যাবেন না?”
উদ্যান গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল, “তোমাকে রেখে কীভাবে যাব?”
​ফুল থমকে গেল। “আপনি আমার জন্য যাবেন না?”
উদ্যান দৃষ্টি এড়িয়ে আওড়াল, “হ্যাঁ, তুমি যেহেতু সাঁতার জানো না, সেহেতু নিশ্চয়ই নৌকায় উঠতে চাইবে না?”

​ফুলের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। তার জন্য উদ্যান নৌকাভ্রমণ উপভোগ করতে পারবে না, এটা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সে ঠোঁট চেপে বলল, “আমিও নৌকায় উঠব। চলুন তাদের সাথে যাই।”
​উদ্যান ঘোর আপত্তিতে মাথা নেড়ে বলল, “তোমার জন্য বোটে ওঠা সেফ না। যেতে হবে না। আমরা নীলগিরি গিয়ে অন্য কিছু উপভোগ করব।”

​ফুল কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই লুহান মেলোর পাশের জানালার কাছে মাথা নামাল। মেলো বিরক্ত হয়ে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল। লুহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তুই আসছিস না কেন? পানি দেখে ভয় পাচ্ছিস নাকি?”
মেলো বিড়বিড়িয়ে বলল, “আমি সাঁতার জানি, হাতির বাচ্চা।”
“তাহলে সমস্যা কী?”
দাঁতে দাঁত চেপে মেলো বলল, “দেখতে পাচ্ছিস না, আমি কাজ করছি?”
​লুহান খোঁচা মেরে মিনমিনিয়ে বলল, “কাজের নামে অজুহাত দিচ্ছিস। আদতে তুই পানি দেখেই ভয় পাচ্ছিস।”
​মেলো ঠাস করে দরজা খুলে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেল। লুহান তৎক্ষণাৎ সরে না গেলে নির্ঘাত দরজার আঘাতে তার চাপার দাঁত ভেঙে যেত। মেলোও বুঝে গেছে লুহানের জ্বালায় সে শান্তিতে বসে কাজ করতে পারবে না। তাই সে কথা না বাড়িয়ে নদীর তীরের দিকে এগিয়ে গেল।

​উদ্যান তখনও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে আছে। গাড়ির ভেতরে জমে থাকা নীরবতা ভাঙল ফুলই। সে সিটবেল্ট খুলে ঠোঁট নেড়ে বলল, “নৌকাভ্রমণের সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না, চলুন।”
​ফুল দরজা ঠেলে নেমে দাঁড়াল। উদ্যান গালের ভেতরের চামড়া শক্ত করে কামড়ে ধরল। একফোঁটা বিরক্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল ঠোঁটের ফাঁক গলে। মূলত তার ইচ্ছাই করছিল না সেখানে যেতে, কিন্তু ফুলের মুখের ওপর না-ও বলতে পারছে না।

​এস্টেটবৃন্দ সকলে একটা বড়সড় ইঞ্জিনচালিত বোট ভাড়া করল। অনিলা আর ফুলের হাতে হাওয়াই মিঠাই। অনিলা মিঠাইয়ের মিষ্টতার সঙ্গে সঙ্গে নৌকাভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনে ব্যস্ত। অন্যদিকে নৌকা যতবার স্রোতের ছন্দে দুলে উঠছে, ততবারই ফুলের শ্বাস আটকে আসছে। বারবার মনে হচ্ছে, এই বুঝি নৌকাটা উল্টে যাবে, আর তারা সবাই ঝপাৎ করে সাঙ্গুর অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে। গায়ে সেফটি জ্যাকেট থাকলেও ফুলের অস্থিরতা একচুলও কমছে না। উদ্যান নৌকার কিনারা ছাড়িয়ে দূরে দৃষ্টি স্থির রেখে ভাবনার নিকষ কালো অন্ধকারে বিচরণ করছিল; হঠাৎ নৌকাটা একটু বেশি জোরে দুলে উঠল। ঘটনার আকস্মিকতায় ফুল চোখ-মুখ শক্ত করে উদ্যানের হাত খাবলে ধরল। উদ্যান যেন আচমকাই ভাবনার জগৎ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। মনঃসংযম ভেঙে তড়াক করে দৃষ্টি ফেরাল অত্যন্ত কাছে বসে থাকা আতঙ্কিত রমণীর মুখটার দিকে। ভয়ে রীতিমতো ছটফট করছে মেয়েটা। মিঠাই ততক্ষণে গলে গিয়ে উদ্যানের হাঁটুর সাথে চিপকে গেছে। কিছুক্ষণ স্থবিরতার পর ফুল আধো আধো চোখে তাকাতেই উদ্যানের মুখশ্রী ভেসে উঠল। সে আঁতকে উঠে সরে গেল অনেকটা। ওড়না মুঠোয় নিয়ে উদ্যানের হাঁটু পরিষ্কার করতে লাগল। শুকনো ঢোক গিলে বলল, “আমি বাড়িতে ফিরে ধুয়ে দেব। আপনি রেগে যাবেন না প্লিজ। আমি… আমি আসলে দেখিনি।”

​উদ্যানের চাহনি গভীর থেকে গভীরতম হলো। ফুলের শরীর অনিয়ন্ত্রিত তালে কাঁপছে। সে নৌকার মেঝেতে দৃষ্টি নামিয়ে রিনরিনিয়ে বলল, “আপনি সানগ্লাস ব্যবহার করতে পারেন না?”
উদ্যান মুখ ঘুরিয়ে আগের ভঙ্গিতে বসল। ফুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে যেই একটু স্বাভাবিক হতে যাবে, অমনি উদ্যান অকস্মাৎ ফুলের হাত চেপে ধরল। এমন আক্রমণে ফুলের হৃদয় ছলকে উঠল। মুখ ফসকে ভয়ানক গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এল।

​“কী হয়েছে ফুল? তুমি কি খুব বেশি ভয় পাচ্ছো?” অনিলা অন্য সারি থেকে প্রশ্ন ছুড়তেই ফুল হাঁসফাঁস করতে করতে না-বোধক মাথা নাড়ল। আপাতত সে নৌকার দুলুনির কথা ভুলেই গেছে। মন-মস্তিষ্ক জুড়ে স্রেফ উদ্যানের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অনুভূতি হন্যে হয়ে ছুটোছুটি করছে। উদ্যান তখনও ফুলের হাত ছাড়েনি। এমনভাবে বল প্রয়োগ করছে যেন ওটা ফুলের হাত নয়, কোনো তুলতুলে খেলনা; যেটার ওপর ইচ্ছামতো জোর খাটানো যায়।
ফুলের সহ্যশক্তি ফুরিয়ে এলে সে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে বহু কষ্টে উচ্চারণ করল, “এমনভাবে কেন কষ্ট দিচ্ছেন? ছাড়ুন আমার হাত।”
​উদ্যান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তুমিও আমাকে কষ্ট দিচ্ছো। বিন্দুমাত্র ছাড় দিচ্ছো না।”
ফুল হড়বড়িয়ে গেল। “আমি কখন কষ্ট দিলাম?”
উদ্যান চাপা গলায় বলল, “প্রয়োজনে কাছে আসছো, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে দূরে সরে যাচ্ছো।”
​ফুলের কণ্ঠরোধ হয়ে এল। শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয় নেড়ে কোনোমতে বলল, “আর যাব না আপনার কাছাকাছি, ছেড়ে দিন। আমি অন্য কোথাও গিয়ে বসছি।”
উদ্যান ঘাড় কাত করে চোখ বুজে বলল, “সাধ্য থাকলে গিয়ে দেখাও অন্য কোথাও।”
ফুল হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। “হাত না ছাড়লে কীভাবে যাব?”
“আমি এক শর্তে হাত ছাড়ব।”

​ফুলের চোখজোড়া পানিতে টইটম্বুর। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শুধাল, “কী শর্ত?”
উদ্যান চোখ খুলে দুর্বোধ্য হেসে বলল, “তুমি ততক্ষণ আমার হাত ধরে রাখবে যতক্ষণ না আমি ছাড়তে বলব।”
​উদ্যানের হাসি হাসি মুখটা ফুলের চক্ষুগোচর হয়নি, কারণ দানবটা অন্যদিকে ফিরে আছে। এদিকে হাতের অসহনীয় ব্যথার বিপরীতে তার জুড়ে দেওয়া শর্তটাও ফুলের কদাচিৎ বোধগম্য হয়নি। তবুও ওপর-নিচ মাথা দোলাল সে। কিন্তু হাত ছেড়ে দিতেই মেয়েটা প্রাণ হাতে নিয়ে পেছনের দিকে দৌড় দিল।

​বোটে শুধুমাত্র সোহমের পাশের সিটটাই খালি ছিল। মেলোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও লুহান বেহায়ার মতো তার পাশেই বসে আছে। গাড়িতে মেলোর পাশে বসার সুযোগ পায়নি সে, তাই এই সুযোগটা হাতছাড়া করেনি। ফুল দিশেহারা হয়ে কপালের ঘাম মুছতে লাগল। সে আর যাই হোক সোহমের পাশে গিয়ে বসতে পারবে না। কিন্তু এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাও অসম্ভব, এমনিতেই আতঙ্কের ঠেলায় তার প্রাণ যায়-যায় অবস্থা।
ফুল নিজেকে সামলে নিয়ে লুহানের উদ্দেশ্যে বলল, “লুহান স্যার, আপনি এই সিটটা আমাকে দিয়ে দিন।”
হঠাৎ ফুলের অযাচিত আর্জিতে লুহানের ভ্রু কুঁচকে গেল। “তেহুর পাশের এক্সক্লুসিভ সিট রেখে এখানে বসতে চাইছো কেন?”

​ফুল পিছু ফিরে উদ্যানের চোখে চোখ রাখার দুঃসাহস দেখাল না। তবুও সে দানবটার জ্বলন্ত দৃষ্টি অনুভব করতে পারছে। সেই দৃষ্টির প্রেক্ষিতে ফুলের পিঠটাও যেন জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।
“লুহান স্যার, দয়া করে আপনি অন্য কোথাও গিয়ে বসুন।”

​লুহান মানল না। মেলো আড়চোখে একনজর দেখে নিল ফুলকে। মেয়েটা তার পাশে কেন বসতে চাইছে সেটাই বুঝতে পারছে না। লুহান বাচ্চাদের মতো জেদ ধরে বলল, “এটা আমার সিট, আমি কেন তোমাকে দিতে যাবো?”

​ফুলের বুকের ভেতর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। সে বিশদভাবে বোঝানোর মতো পরিস্থিতিতে নেই। তাই তার মুখে যা এল সে তাই বলে দিল। “এই সিটে কি আপনার নাম লেখা আছে? থাকলে দেখান।”
​লুহান নাক কুঁচকে বলল, “আমি আগে বসেছি তাই এই সিট আমার। নাম-পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। তুমি গিয়ে নিজের সিট সামলাও।”

​ফুলের মেজাজ এমনভাবে বিগড়ে গেল যে সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আজকাল ভালো মানুষের কদর কেউ করে না। সকালেই আমি আপনাকে দানবের হাত থেকে বাঁচালাম আর সন্ধ্যা হতেই আপনি আমাকে দানবের গুহায় ঠেলে দিচ্ছেন? সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকুও নেই আপনার মাঝে। আমি এখনই গিয়ে তাকে বলব, আমার হাত চেপে না ধরে আপনার হাত ভর্তা বানিয়ে ফেলতে। আমি কিচ্ছু বলব না; আপনার মতো জেদি হাতির বাচ্চাকে ভর্তা না বানালে মানুষ হবেন না।”

​লুহান তব্দা খেয়ে হা হয়ে গেল। বুঝে উঠতে পারল না ফুল খোটা দিল নাকি ব্ল্যাকমেইল করল। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারল এই সিট আঁকড়ে ধরে থাকা তার জন্য ঘোর অমঙ্গলের। সে সঙ্গে সঙ্গে অতিনাটকীয় ভঙ্গিতে দু হাত জোড় করল, মাথা সামান্য নিচু করে এমন এক স্বরে বলল যেন পুরোনো কোনো রাজসভায় ক্ষমা চাইছে। “ক্ষমা প্রার্থনা করছি, হে মহামাতা। তখন আপনি আমাকে যেভাবে রক্ষা করেছিলেন, তাতে আমার চৌদ্দপুরুষ তো বটেই, পেছনের দু-এক প্রজন্মও আপনার কাছে আজীবন ঋণী থাকবে।”

​কথা শেষ করেই সে এমন ভাব ধরল যেন এখান থেকে সরে যাওয়াই তার জীবনের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত। ফুল বুকভরে শ্বাস টেনে নিয়ে মেলোর পাশে বসে পড়ল। মেলো তখনও অবিশ্বাসী চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা তার পাশে বসার জন্য লুহানকে ব্ল্যাকমেইল করল? ব্যাপারটা ঠিক হজম হলো না। তবুও লুহানকে সরিয়ে মেয়েটা প্রশংসনীয় কাজ করেছে।
​উদ্যানের দৃষ্টি এখনো ফুলের ওপরেই আটকে আছে। ফুল আর সহ্য করতে না পেরে সামনের সিটের সাথে মাথা ঠেকিয়ে চেহারা আড়াল করে নিল। ইতোমধ্যেই উদ্যানের হৃদয় বিদ্ধকারী চাহনির উত্তাপ তাকে অকল্পনীয় যন্ত্রণায় ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে।

চলবে,,,

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply