অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৪৮
তানিশা সুলতানা
“কেনো চলে আসলে আব্বা? তুমি কি বুঝতে পারছো না আমরা কতটা সমস্যায় আছি?
নওয়ান বাবার চোখে চোখ রেখে জবাব দেয় না। বরং সিগারেটে দীর্ঘ টান দিয়ে আঁখি পল্লব বন্ধ করে ফেলে। মজনু তালুকদার বেজায় বিরক্ত। তার সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেলো।
রাশেদুল বলে
” ভাই তোমার এই ছেলেই ডোবাবে আমাদের।
তার মতিগতি মোটেও সুবিধের লাগছে না।
এবার নওয়ান জবাব দেয়
“আমি চাঁদকে ছেড়ে যেতে পারবো না।
ওকে না দেখে একটা সেকেন্ড থাকতে পারি না।
নায়েব দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে
” ওই মেয়েকে আমি খু/ন করে দিবো।
“তবে দুটো কবর খুঁড়ো বাবা।
সে না থাকলে আমাকে আর বাঁচাতে পারবে না।
নওয়ান চলে যায়। পেছনে রেখে যায় স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা বাবা চাচা এবং দাদাকে। তার আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে ভবিষ্যতে ভীষণ বাজে কিছু হতে যাচ্ছে।
আমিনা বেগম আয়াশকে নিয়ে ফিরে এসেছে। ভীষণ মন খারাপ তার। বাবা মা তো পৃথিবীতে নেই। তবে দুটো ভাই রয়েছে। বড় ভাই কঠিন রোগে আক্রান্ত। তার সুচিকিৎসার দরকার। তার জন্য প্রচুর টাকা লাগবে৷ কিন্তু তাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। আমিনার ইচ্ছে করে তাকে কিছু টাকা দিয়ে আসতে। কিন্তু তার হাতেও যে টাকা নেই। সেই স্বামী বা সন্তানের কাছে হাত পাততে হবে। হাত পেতে টাকা নিতে বড্ড আত্মসম্মানে বাঁধে তার। এই জন্যই প্রতিটা নারীর কিছু না কিছু করা উচিত। শুধুমাত্র সংসারের বেড়াজালে আটকে রাখলে নিজেদের শেষ পরিণতি ভয়ংকর হয়।
আয়াশ বড্ড খুশি। তার নানা বাড়ি একদম পছন্দ হয়নি। ধুর সেখানে থাকা যায় নাকি?
নওয়ান ড্রয়িং রুমে বসে ফোন দেখছে বর সিগারেট খাচ্ছে। আয়াশ এসে তার পাশে বসে। বড্ড ইনোসেন্ট ভঙ্গিমায় বলে
“ভাইয়া আমাকে একটা ফোন কিনে দিবা?
নওয়ান সিগারেট এর ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে বলে
” আম্মুর ফোন দেখিও
“উহু
আম্মু গেমস খেলতে দিতে চায় না। তুমি কিনে দিও?
আমাকে তো কিছুই দিলে না।
” ঠিক আছে দিবো।
আয়াশ খুশি মনে চলে যায়। এটা সবাইকে বলতে হবে তো।
আমিনা এক গ্লাস দুধ হরলিক্স দিয়ে গুলে নিয়ে আসে নওয়ান এর কাছে।
“আব্বা দুধ টুকু খেয়ে নাও।
নওয়ান মায়ের মুখ পানে তাকায়।
” আম্মু বড় মামা কেমন আছে?
আমিনা একটুখানি অবাকই হলো। তার ছেলে মামার খোঁজ নিচ্ছে?
“হুমম ভালোই আছে।
” চাঁদকে তো দেখে নি।
তো আমি ভাবছিলাম ঘুরে আসবো মামা বাড়ি থেকে।
কপাল কুঁচকায় আমিনা
“কাল সকাল সকাল রেডি থেকো।
সারাদিন থেকে আসবো।
বলেই দুধ টুকু সাবাড় করে ফেলে। গ্লাস আমিনার হাতে দিয়ে আঁচলে মুখ মুছে৷ তারপর চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে
” চাঁদ কলেজ যাবে। জলদি আসতে বলো তাকে।
আমিনা হাসে। আঁখি পল্লবে অশ্রু কণা জমে গিয়েছে। তবুও একটু অপূর্ণতা রয়েই গেছে। নায়েব তালুকদারও যদি এভাবে বলতো।
বহুদিন বাদে কলেজে যাবো নূপুর। সকাল সকাল গোসল সেরে কলেজ ড্রেস পড়ে তৈরি হয়ে নিয়েছে। সাদা রংয়ের হিজাব দ্বারা মাথা ঢাকা। তারপর কলেজ ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বেড়িয়ে পড়ে কক্ষ থেকে।
বাড়ির মূল ফটকে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলো নওয়ান। তবে নুপুরের আজকে গাড়ি করে যেতে ইচ্ছে করছে না। তাই গাড়ির কাছাকাছি গিয়ে বলে
“মিস্টার নেতা গাড়িতে যাবো না। বাইক আনুন।
নওয়ান তখুনি গাড়ি থেকে নেমে গ্যারেজে ঢোকে। সেখানে বিভিন্ন ব্যান্ডের বাইক রয়েছে। কালো রংয়ের সুজুকি বাইকটা ভালো লাগছে আজকে। সেটাই বের করে।
নুপুরের কাছাকাছি এসে নিজের সানগ্লাসটা নুপুরকে পড়িয়ে দিয়ে হেলমেট পড়ে নেয়। নুপুর নওয়ান এর কাঁধে হাত রেখে বাইকে বসে। দুই হাতে পেট জড়িয়ে কাঁধে মাথা রেখে বলে
” চলুন
পেছনে অনেক গুলো গার্ড তারাও যেতে যায় ওদের পেছন পেছন। তবে নুপুর স্পষ্ট ভাষায় বলে
“কেউ আসবে না পেছন পেছন।
নওয়ানও ভ্রু বাঁকিয়ে তাকিয়ে বোঝায় ” চাঁদ যা বলছে তাই হবে”
ব্যাসস আর কোনো গার্ড এর সাহস নেই তাদের পেছনে যাওয়ার।
স্নেহা তার কক্ষের বারান্দা থেকে গোটা বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করে। ভালোই লাগছে।।
তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। প্রিয় মানুষদের খুশি দেখার মধ্যেও আলাদা এক ধরনের শান্তি রয়েছে। প্রশান্তিতে বুকটা ভরে ওঠে।
“আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখুক নওয়ান। এই পৃথিবীর সব সুখ আপনার হোক। আমি না হয় একটা জীবন আপনার খুশিতে খুশি থেকেই কাটিয়ে দিলাম।
তারপর কল করে বল্টুকে। গার্ডরা না যেতে পারলেও বল্টু ঠিক যেতে পারবে।
দেবেন্দ্র কলেজের মাঠের মধ্যে নওয়ান এর বাইক থামে। নুপুর বাইক থেকে নেমে সানগ্লাস খুলে নওয়ান এর সাদা রংয়ের শার্টের বাটন এর সাথে রাখে। হেলমেট পড়ার ফলে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। নিজ হাতে চুল ঠিক করে দিয়ে শার্টের কলার ঠিক করে দেয়।
তারপর মিষ্টি হেসে বলে
” একটা নাগাদ ছুটি হবে।
এক সাথে ফিরবো দুজন।
নওয়ান মাথা নেরে সম্মতি জানায়৷ নুপুর চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে কলেজের সব ছেলেপুলে এসে নওয়ানকে ঘিরে ধরে। তাদের খুশির শেষ নেই। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে বলে কথা। তাছাড়া সব ছেলেদের আইডল নওয়ান। বল্টু ও ততক্ষণে চলে এসেছে।
নওয়ান সকলের সঙ্গে আলাপ করতে থাকে। কার কি সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনে।
তারপর সবাই অনুরোধ করে একটা গান শোনানোর জন্য। কতদিন হয়ে গেল শহীদ মিনারের সামনে বসে গান ধরে না নওয়ান।
ইতিমধ্যে কয়েকজন শহীদ মিনারের সামনেটা পরিষ্কার করার কাজে লেগে পড়েছে। একজন ছুটেছে গিটারের ব্যবস্থা করতে।
নওয়ান ওদের আবদার ফেলতে পারেনা। তাছাড়া গান তার ইমোশন। কারণে-অকারণে সব সময় সে গান গাইতে প্রস্তুত।
ঠোঁটের ভাজে থাকা সিগারেট ফেলে দিয়ে শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে বসে।
সকলেই ওকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ও গিটারের টুংটাং আওয়াজ তুলে মুহূর্তে পরিবেশটাকে স্তব্ধ এবং শান্ত করে দেয়। নুপুর সবে ক্লাসে ঢুকেছে। এমন মুহূর্তে গিটারের আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে বারান্দায় চলে আসে। ওর সঙ্গে প্রত্যেকটা ক্লাসের প্রত্যেকটা মেয়েই বেরিয়ে আসে। মুহূর্তেই দেবেন্দ্র কলেজ এর মাঠ টা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় মানুষ জনে।
“আমি হবো রাত আর
তুই হবি চাঁদ
জোছনায় ঘর আমাদের
তুই হলে রোদ
আমি রং ধনু হই
ছিলো সে শহর আমাদের
(তুই হবি চাঁদ)
লাইনটা গাইতে গাইতে নুপুরের দিকে আঙুল তাগ করে। এত এত মানুষের মধ্যেও নুপুর কে চিনে নিতে একটু অসুবিধা হয় না নওয়ান।
ফিক করে হেসে ওঠে নুপুর। সকলের নজর ওর দিকে। কেউ কেউ আফসোস করে।
” ইসস কতোটা ভাগ্যবতী নুপুর শিকদার”
নওয়ান গোটা গানটা নুপুরের দিকে তাকিয়ে শেষ করে। মনটা তার বড্ড ফুরফুরে। আর কি চাই? এভাবেই আরামসে একটা জীবন কেটে যাক।
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে শুধু দুঃখ পাওয়ার জন্য। প্রকৃতির নিয়মে খুবই যত্ন সহকারে দুঃখ দেওয়া হয়।
তাদেরকে কপালপোড়া বলা হয়। ঠিক তেমনি কপাল পোড়া স্নেহা। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম তার। বাবা চাচারা মাথায় করে বড় করেছে। পৃথিবীর কোনো দুঃখ তার সংস্পর্শে আসার সাহস করে না। অভাব কাকে বলে সেটা সে জানেই না। ও চাইলে আসমানের চাঁদটাও তার সামনে হাজির হয়ে যাবে। অথচ এই মেয়েটি সর্ব দুঃখী। পৃথিবীর কোনো সুখ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। তার চোখের অশ্রু শেষ হয় না। অশান্ত হৃদয়টাকে শান্ত করার ক্ষমতা পৃথিবীর কারো নেই। সেই জন্যই বলা হয়েছে
“সুখ বড়ই কঠিন জিনিস
জোর করে কেউ সেটা উপভোগ করতে পারে না।
সুখে থাকতে গেলেও কপাল লাগে।
যেটা তার নেই।
এই মুহূর্তে নবীনগরে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্নেহা। সাদা রঙের থ্রি পিচের ওড়না দিয়ে পরম যত্নে মাথা ঢেকে রেখেছে। ভয়ানক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। শুক্রবার হওয়ার সুবিধার্থে গিজগিজ করছে মানুষজন।
যদিও অন্যান্য দিনও ভালোই মানুষের সোরগোল থাকে। সকাল থেকে এক ফোঁটা পানিও তার পেটে পড়ে নি। সুন্দর মুখ খানা শুকিয়ে গিয়েছে।
তামিম স্নেহার দুহাত দূরে। তারও বেশ ভয় করছে। কাউকে জানি আসা হয়নি। শক্রর অভাব নেই। কখন কোন দিক থেকে আক্রমণ করল বসবে বলা দায়।
এইতো ঘন্টাখানেক আগে স্নেহা তাকে কল করলো। প্রচন্ড তারা দিয়ে বলল
“তামিম ভাইয়া আমি একটু বেরোবো আপনি আমার সঙ্গে যাবেন?
স্নেহাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা তামিমের নেই। যাদের খেয়ে বেঁচে আছে তাদের কথা অমান্য করবে? এত বড় সাধ্য কার হতে পারে?
তাছাড়া স্নেহার প্রতি তার দুর্বলতা রয়েছে।
অগাত্য তিনটে বেজে ৫ মিনিটে ওরা রওনা দেয়। বাড়ির গাড়ি নিয়েই এসেছে।
এখন চারটা বাজে।
পাঁচটায় স্মৃতি শোধ বন্ধ হয়ে যাবে।
“আমরা আর কতক্ষণ থাকবো এখানে?
” আর একটু প্লিজজজ
অসহায় ভঙ্গিমায় বলে স্নেহা।
তখনই একটা গাড়ি এসে থামে ওদের সামনে। গাড়ি উইনড্রো কাঁচ খুলে অভি বলে
“গাড়িতে উঠুন স্নেহা৷
তামিম কপাল কুঁচকায়। উনি এখানে কি করছে? তার মনে প্রশ্ন জাগে। তবে জবাব পায় না।
স্নেহা গাড়িতে উঠে পড়েছে ততক্ষণে। তামিমকে বলে
” আপনি গাড়ি নিয়ে চলে যায়। আমাকে অভি ড্রপ করে দিবে।
কথাটা মোটেও পছন্দ হলো না তামিমের। তবুও কোনো কথা না বলে মেনে নেয়।
অভি ড্রাইভার আনে নি। নিজেই ড্রাইভ করে এসেছে। স্নেহা উঠতেই গাড়ি স্ট্রাট করে। নবিনগর থেকে বাইপেল যাওয়ার পথে গাড়ি ঢোকায়।
সেই রাস্তায় ফাঁকা জায়গায় পেতেই সেখানে গাড়ি থামায়।
“আমায় বিয়ে করবেন অভি?
অদ্ভুত প্রস্তাব। অভি জানে এই মেয়েটা পাগলের মতো ভালোবাসে নওয়ান তালুকদারকে। তবুও তাকে বিয়ে করতে চায়?
” আমি সুন্দরী
আর পাঁচটা মেয়ের থেকে একটু বেশিই সুন্দর। কিন্তু আমার ভাগ্য অসুন্দর। নওয়ান তালুকদারকে অসম্ভব ভালোবাসি। কিন্তু সে চাঁদকে ভালোবাসে।
ইদানীং চাঁদ আপনার সাথে একটু বেশিই মেলামেশা করছে। যেটা ঠিক না।
আমায় বিয়ে করুন
আর নুপুরের সাথে কন্টাক্ট বাদ দিয়ে দিন।
আমার এসব ভালো লাগছে না। ওনারও বোধহয় এসব সহ্য হচ্ছে না।
না পাওয়ার যন্ত্রণা আমি বুঝি
প্রিয় মানুষটার পাশে অন্য মানুষকে দেখার কষ্টটাও অনুভব করেছি।
আমি চাই না এমন মরণ যন্ত্রণা নওয়ান উপভোগ করুক।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩১
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৫
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২২