Golpo romantic golpo অন্তরালে আগুন

অন্তরালে আগুন পর্ব ৪৫


অন্তরালে_আগুন

পর্ব:৪৫

তানিশা সুলতানা

কোন একটা জরুরী কাজে নওয়ানকে দেশের বাইরে যেতে হবে। তিন দিনের ছোট্ট একটা সফর। সফর শেষে বাসায় ফিরলেই নুপুর নওয়ানের ঘটা করে বিয়ে হবে। গোটা দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় করানো হবে নায়ের তালুকদারের একমাত্র পুত্রবধুর সঙ্গে।
যদিও এই ব্যাপারে নুপুর এখন পর্যন্ত মত প্রকাশ করে নি। তবে তার চুপ থাকাকেই সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। পুরোটাই মজনু তালুকদারের চাল। কিছু একটা চলছে তার মনে। তবে সেটা প্রকাশ করছে না। হয়ত ভয়ংকর কিছু।
আমিনা বেগম বাসায় নেই। আয়াশকে নিয়ে বাবার বাড়িতে গিয়েছে। কয়েকদিন থাকবে সেখানে। কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করে চলে গিয়েছেন উনি। সেখানে পৌঁছে নওয়ান কে কল করে জানিয়েছে। এটা নিয়ে নওয়ানের মাথাব্যথা না থাকলেও নুপুর বেশ চিন্তিত। ওই সরল সহজ মানুষটা স্বামীর অনুমতি ছাড়া এক পা এগোনের সাহস করে না। এখন তার স্বামী বাড়ি নেই তাকে না জানিয়ে কিভাবে চলে গেলো? এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।
স্নেহা চলে যাবে তাই মীরা তার পছন্দের সব জিনিস রান্না করছে। বড়ই ব্যস্ত সে।
কিচেন থেকে সরার সময় পাচ্ছে না। মায়েরা বোধহয় এমনই। এইযে হরেক রকমের খাবার রান্না করছে এগুলো কি একদিনে খেয়ে সাবার করা সম্ভব?
নুপুর বাজি ধরে বলতে পারে এই খাবারের একটা দানাও স্নেহা খাবে না।
তার গলা দিয়ে নামবেই না। মেয়েটা বড্ড সরল আর বোকা।
বোকা মানুষই অন্যের জন্য নিজেকে নিঃশ্বাস করে। আর যারা চালাক তারা প্রতিশোধ পড়ায়ন হয়। নুপুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায় কিচেনে।
ইলিশ ভাপা করছেন মীরা। সবিতা পাশে বসে ভাত খাচ্ছে এবং এটা ওটা বলেই চলেছে। নুপুর যখন গেলো তখন শুনতে পায় সবিতা বলছে
“এতো কিছু রান্না করার কি দরকার ছিলো? তোমার মেয়ে বিদেশে যাচ্ছে মরে তো আর যাচ্ছে না। মরে গেলে নাহয় মেনে নিতাম। বুঝতাম জীবনের শেষ খাওয়া খাবে একটু বেশি করেই খাক।

কথা খানায় মীরার বেশ খারাপ লাগলেও মুখ দিয়ে টু শব্দও বের করেন না। নুপুর স্পষ্ট দেখলো তার চোখের কোণে পানি চিক চিক করছে।
আল্লাহ কিছু মেয়ে মানুষকে প্রচুর পরিমাণ ধৈর্য এবং সহ্য শক্তি দিয়েছেন। গায়ের চামড়াও বোধহয় মোটা তাদের। তাই সব কথা গায়ে লাগে না। তবে গায়ে লাগানো উচিত। নিজের আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়ে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা, কিংবা মানুষের কাছে ভালো থাকার কোনো দরকার নেই। যে তোমাকে সম্মান করতে পারবে না, তুমিও তাকে সম্মান করবে না। ভালোবাসা কিংবা সম্মান যে তোমাকে যতটুকু দেবে তার জন্য ঠিক ততটুকু বরাদ্দ রাখা উচিত।
নুপুর এখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও চলে যেতে পারে না। ঠোঁটের কোণের হাসি চওড়া করে কিচেনের ভেতরে ঢুকে পড়ে।।এবং সবিতা তালুকদারের পাশে বসে মুচকি হেসে বলে
“উয়পোকা চিনেন? খুবই অল্প সময়ের জন্য তারা পৃথিবীতে আসে। মানুষের থাকার ঘরে বাসস্থান তৈরি করে। এবং কোন এক বৃষ্টি মোখর দিনে দুটো ডানা নিয়ে উড়তে থাকে। তারা হয়তো চায় পাখির মতো উড়াল দিয়ে আসমানে যেতে। তবে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কেননা সৃষ্টিকর্তা তাদের ওড়ার জন্য নির্দিষ্ট কিছুটা অংশ দিয়েছে। ওই অংশের বাইরে যেতে পারবে না।
আর তাদের পাখা চিরকাল থাকে না। ধরুন এখন পাখা গজালো তার কয়েক ঘন্টা বা কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা নিঃশেষ হয়ে গেল।
কথায় আছে তো “উইপোকার পাখা গজায় মরিবার তরে”
আপনিও ঠিক উইপোকার মতো। পার্থক্য শুধু এতোটুকুই উইপোকা জানে তার সীমানা ঠিক কতোটা
আই থিংক আপনিও জানেন তবে মানতে চাচ্ছেন না।

নুপুরের কথায় সারাংশ কিংবা সারমর্ম সবটাই সবিতা তালুকদার বুঝতে পারে। স্বভাব সূলত তার এখন প্রচন্ড রেগে যাওয়ার কথা তবে তিনি রাগের না। বরং ঠোঁটের কোণে হাসি বজায় রেখে খাওয়ায় মনোনিবেশন করে। নুপুর পূণরায় বলে
“আল্লাহ আপনাকে নিঃসন্তান রেখেছেন। মাতৃতে স্বাদ উপভোগ করতে পারেননি। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন জানিনা তবে আমার কাছে মনে হয় এটা অভিশাপ। মাতৃত্বের থেকে সুন্দর পৃথিবীতে আর কিছু নেই। ছোট্ট একটা রক্তের অংশ ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে নারীর উদরে, রক্তের দলা থেকে মানুষের রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘ নয় মাস পরে তারা পৃথিবীর আলো দেখে।
ওই একটা প্রাণকে দুনিয়াতে আনার মধ্যেই রয়েছে নারীর স্বার্থকতা।

সবিতা মন দিয়ে শোনে নুপুরের কথা গুলো। আঁখি পল্লব বন্ধ করে ফেলে। কে বলে সে মাতৃত্বের স্বাদ উপভোগ করেননি? কে বলে সে নিঃসন্তান। ছিলো
একটা সময় তারও সংসার, ফুটফুটে একটা বাচ্চা। মজনু তালুকদারের নজরে সবটা ছারখার হয়ে গিয়েছে।
অতীত বড্ড ভয়ংকর। তার থেকেও ভয়ংকর অতীতের সঙ্গে জড়িত মানুষ গুলো। আর পৃথিবীতে সবথেকে সুখী মানুষ তারা যারা খুব সহজেই নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে। নিজেকে খোলা বইয়ে ন্যায় মেলে ধরে সুখ-দুঃখ সবটা উজাড় করে বলে দেয়।
যাক গে সে সব।
সবিতার তেমন মানুষ না থাকলেও চলবে। জীবন তো থেমে থাকছে না।

“মীরা নুপুর কে একটু বেশি করেই খেতে দিও আজকে। চোখ মুখ কেমন শুকিয়ে গিয়েছে মেয়েটার।

কথাখানা যে ভালো মনে বলল না সেটা বোঝার ক্ষমতা নুপুর কিংবা মীরার দুজনেরই রয়েছে। তবে প্রতিত্তোরে কেউই জবাব দেয় না। নুপুর মীরার হাতে হাতে কিছু জিনিস এগিয়ে দিতে থাকে। এমন সময় নওয়ান বাসায় ফেরে।
ক্লান্ত শরীর খানা বিছানায় এলিয়ে দিতে দিতে উচ্চস্বরে স্নেহাকে ডাকে।
নুপুর কপাল কুঁচকায়। এবং এগিয়ে যেতে নেয়। সবিতা বলে
” তোর জামাই দেখছি আমও খাবে আবার আঁটিও চাটবে।

নুপুর আঙুল তুলে বলে
“আমার বর আপনার নাতি। আর স্নেহাও নাতনি। আপনজনদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে শিখুন।

বলেই এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। বড় বড় পা ফেলে চলে যায়।
স্নেহা নিজ কক্ষে বসে ছিলো। নওয়ানের ডাক শুনে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। এবং তখুনি বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসে।

সোফার হাতলে মাথা ঠেকিয়ে আপন মনে সিগারেট টানছে নওয়ান। কানে ব্লুটুথ গোঁজা। স্নেহা এসে পাশে দাঁড়ায় এবং ভয়ে ভয়ে বলে
” কিছু বলবেন?

নওয়ান চোখ খুলে তাকায় স্নেহার মুখ পানে। এই প্রথমবার ভালো করে দেখলো মেয়েটাকে। নিঃসন্দেহে নুপুরের থেকে অধিক বেশি সুন্দরী সে। চোখে মুখে নেই তো তেজ। বড্ড সরল। নিঃসন্দেহে জীবন সঙ্গী হিসেবে সে পারফেক্ট। তাকে যেখানে বসে থাকতে বলা হবে সেখানেই বসে থাকবে।
নওয়ানের হাসি পায়। সে পূণরায় আঁখি পল্লব বন্ধ করে বলে
“স্নেহা
আমি তোকে ভালোবাসলাম কেন বল তো? আমি তোর হলে তুই খুশি থাকতিস
আর তুই আমার হলে আমি বেঁচে থাকতাম।
কি অদ্ভুত ভাগ্য আমাদের।
তুই আমায় হারিয়ে মরলি
আমি তোকে না পেয়ে মরছি।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply