She_is_my_obsession
পর্ব:৩৫
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
বিকেলের শেষ সময়।
বাইরে নিঃশব্দ আকাশ বৃষ্টির অনুকূলে বরফ ঢেলে দিচ্ছে। বরফের কণাগুলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে পৃথিবীর বুকে। শীতের মৃদু স্পর্শে চারপাশ ভরে দিচ্ছে এক অপার্থিব শান্তি আর ভয়ংকরতায়। ঘন্টা খানেক ধরে তুষার ঝড় হচ্ছে। ফারিসের বেড রুমে জানলার কার্নিশে চেপে চেয়ার নিয়ে বসে আছে ইসরাহ।
ফারিস প্যালেসে নেই। নয়ন যুগল সামনে অবস্থিত পাহাড়ের কোলে স্থিত। পাহাড়ের চূড়ায় বরফ পড়ে সবুজ পাহাড় টা সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। বরফের ছোঁয়ায় পাতা গুলো কেমন নির্জীব হয়ে গেছে। আলগোছে কফির মগ হাতে নিয়ে ও। কাপ টা জানলার কার্নিশে রেখে দিলো ইসরাহ। মন ভালো নেই তার। ফারিস প্যালেসে না থাকায় বড্ড একা লাগছে। শরীর মন জুড়ে অদ্ভুত এক বিষন্নতা।
বেডে রাখা ফোনটা বেজে উঠতে ইসরাহ ধ্যান ভাঙলো। চেয়ার ছেড়ে বেড থেকে ফোন টা নিলো। আসফা বেগম ভিডিও কল দিয়েছেন। কল রিসিভ করে আগের জায়গায় এসে বসলো ইসরাহ। আসফা বেগম আদুরে কন্ঠে সুধালেন,-
–” কেমন আছো আম্মু?”
ইসরাহ মলিন হাসলো।
–” ভালো আম্মু, তুমি?”
–” আমি ও ভালো আছি মা।”
–” বাবা কেমন আছে?”
–” তোমার বাবাও ভালো আছে। তোমার শরীর কেমন আছে? চেকাপ করিয়েছো? ডাক্তার কি বলেছেন?”
–” হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।”
আসফা বেগম চুপটি করে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আগের থেকে মাংস বেড়েছে ইসরাহ গালে। কি মিষ্টি লাগছে মেয়েটাকে। চোখ সরিয়ে নিলেন তিনি। মায়েদের ও নাকি নজর লাগে। ওনি চান না মেয়ে বা অগত নাতি/ নাতনির উপর ওনার নজর লাগুক। আবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকালেন আসফা। ইসরাহ দিকে না তাকিয়ে পেছনে তাকালেন ওনি। অতঃপর দাঁতে দাঁত চেপে বললেন;-
–” ওই বজ্জাত ছেলেটা কই? আজ দেখছি বাগড়া দিতে আসছে না।”
আসফা বেগম ইশারায় ফারিসের কথা জিজ্ঞেস করেছেন। বুঝে ও না বোঝার ভান করে। ফের জিজ্ঞেস করলো ইসরাহ;-
–” কাকে খুঁজছ আম্মু? রিজভি ভাইয়া কে? ওনি তো আমাদের সাথে থাকেন না।”
–” রিজভি না, ওই ছেলেটা।”
–” কোন ছেলেটা? আর কোনো ছেলে তো আমাদের সাথে থাকে না!”
মেয়ের উল্টো প্রশ্ন বিরক্ত হলেন আসফা। না চাইতে ও বিরক্তি নিয়ে ফারিসের নাম আওড়ালেন তিনি।
–” ফারিসের কথা বলছি। যে কিনা দ্বিতীয় বার বাচ্চার বাপ হওয়ার দরুন তার লজ্জা লাগছে না। এবং খুব বিজ্ঞ ও তিনি।”
মায়ের কথা শুনে মুখচোরা হাসলো ইসরাহ। তার মানে ফারিসের একার দোষ না। তার মা ও ফারিসের সাথে বাচ্চামোতে স্বায় দেন। এতোদিন ইসরাহ ভাবতো। ফারিস এতো গম্ভীর হওয়া শর্তে ও আসফা বেগমের সাথে হেয়ালিপনা করে কেন? আসলে তো গোড়াতেই গলদ। আসফা বেগম ও মনে মনে ফারিস কে আস্কারা দেন। কিন্তু দেখান তিনি ফারিস কে দেখতে পারে না। ভাবনা রেখে ইসরাহ বললো;-
–” ফারিস বাসায় নেই। জুনোতে সন্ধ্যায় একটা আর্ট একজিবিশন আছে। সেখানে গিয়েছে।”
আসফা বেগম চোখ বড় করে নিলেন। বজ্জাত ছেলেটা তার মেয়ে কে একা রেখে চলে গিয়েছে? এই সময় কিভাবে পারলো ইসরাহ কে একা রেখে যেতে? সারাদিন তো ঠিকই মুখে বড় বড় বুলি ছুঁড়ে।
–” কোন আক্কেলে তোমাকে এই অবস্থায় একা রেখে গেছে ছেলেটা? তোমাকে সাথে নিলেই হতো। আমার কাছ থেকে আমার মেয়ে কে কেড়ে নিয়ে গেছে। এখন ঠিক মতো যত্ন নিতে পারছে না?”
–” চিন্তা করো না আম্মু। ফারিস রাতের মধ্যে ফিরে আসবে। আর সে আমার খুব যত্ন নেয়। রান্না টা পর্যন্ত ফারিস নিজে করে। মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। আমাকে একটু ও কষ্ট করতে হয় না।”
–” তোমাকে নিয়ে চিন্তা হয় আম্মু।”
কথা শেষ করতে পারলেন না আসফা। তার আগে কাপড়ের আঁচলে চোখ মুছলেন। এতোদিন যাও নিজেকে সামলাতে পারতেন। যখন থেকে শুনেছেন; ওনার ছোট্ট মেয়ে টা মা হবে। সেই থেকে ইসরাহর জন্য খুব মন পোড়ে। তার ফাঁকা রুমটাতে গেলে বুক খা খা করে উঠে। সারাদিন বাড়িতে পাখির মতো কিচির মিচির করা মেয়ে টা এখন এতো দূরে। মা কে কাঁদতে দেখে চোখে পানি জমলো ইসরাহর। গাল বেয়ে পড়ার আগেই মুছে নিলো পানিটুকু। নিজেকে সামলে বলে;-
–” তোমাকে প্যালেস ঘুরিয়ে দেখাই আম্মু। জানো, ফারিসের প্যালেস টা খুব বড়। অথচ এতো বড় প্যালেসে মাত্র আমরা দুজন থাকি।”
কান্না চেপে ঠোঁট এলিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন আসফা।
–” দেখাও আম্মু।”
ইসরাহ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো। মিলিয়ে রাখা দরজা টা খুলে বেরিয়ে এলো দোতলার ব্যালকনির লম্বা জায়গাটাতে। দোতলায় চারটে কক্ষ। সবচেয়ে বড় ফারিসের রুম। দ্বিতীয় রুম টা ফারিসের পেন্টিং রুম। তৃতীয় রুম টা সাধারণ আসবাব দিয়ে সাজিয়ে রাখা। মাঝে মধ্যে রিজভি এসে ফ্রেশ হয় এই রুমে। বাকি সময় ফাঁকা পড়ে থাকে।
বাকি রুম টা রুম কম ছাদ খোলা ব্যালকনি মনে হয় বেশি। ইচ্ছে হলে কাঁচের স্লাইডিং ছাদ টেনে দেওয়া যায়। ইসরাহ একে একে সব গুলো ঘর আসফা বেগম কে দেখালেন। তিনিও হাসি মুখে দেখলেন। দোতলার রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে নিচতলায় ফোকাস দিলো ইসরাহ।
সাদা দেয়ালগুলো খোলামেলা, নির্মল। কোনো ভীড় বা ভারী পেইন্টিং নেই। দেয়ালে ঝুলানো দামী পেইন্টিংগুলো সরল রূপে সাজানো, প্রতিটি শিল্পকর্ম আধুনিকতার নিখুঁত ছোঁয়া বহন করছে। শোপিজ গুলো সুক্ষ্ম, মার্জিত, ডিজাইনের হয়ে ও। ঘরের নান্দনিকতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মৃদ্যু আলো ছায়া দেয়ালে পড়ে সাদা রঙ নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে পুরো পরিবেশ কে শান্ত, পরিস্কার, এবং আধুনিক করে তুলেছে। ফারিসের প্যালেসে বিলাসিতা যেন সরল রূপে নিহিত। গজির্য়াস রঙ বা সামগ্রী নেই, তবুও নিখুঁত, পরিমিত সৌন্দর্যের বহন করছে।
ড্রাইনিং স্পেসে লম্বা একটা টেবিল। দুপাশে তিনটে করে মোট আটখানা চেয়ার পাতা। তার পাশে সাদা সোফা সেট সুবিন্যস্তে সজ্জিত। গদগদ কন্ঠে ইসরাহ সুধালো;-
–” নিচে লাইভ কিচেন, ড্রয়িং, ডাইনিং আর বিশাল এক লাইব্রেরি আছে। লাইব্রেরি পরে একদিন দেখাবো তোমাকে। এখন নিচে যেতে ইচ্ছে করছে না।”
ইসরাহর কথায় ভ্রু কুঁচকে এলো আসফা বেগমের। সন্দিহান কন্ঠে বললেন তিনি;-
–” লাইব্রেরি মানে? ওই ছেলে কি করে এতো বই দিয়ে?”
ইসরাহ কোমল হাসলো। ফারিসের হয়ে বললো;-
–” ফারিস অবসরে বই পড়ে আম্মু। ওসব বাদ দাও। চলো তোমাকে উপরের তলা দেখাবো। যদিও আমি এখনো উপরে যাইনি।”
–” তবে থাক, এখন আর তোর উপরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।”
–” সমস্যা নেই আম্মু।”
ব্যালকনি পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে, তৃতীয় তলায় পা রাখলো ইসরাহ। উপরে উঠতেই অবাক হলো ইসরাহ। পুরো তিনতলা জুড়ে কেবল একটাই রুম। কি আশ্চর্য। নিজেকে সামলে দরজার কাছে এগিয়ে এলো ইসরাহ। বাইরে থেকে ছিটকিনি দেওয়া রুমটাতে। ফোন বাম হাতে নিয়ে। ডান হাতে শক্ত ছিটকিনি টা খুললো ইসরাহ। রুম টা অন্ধকার। দমকা বাতাসে কেমন শ্বেতশ্যাতে, আঁশটে গন্ধ নাকে লাগলো তার। মূহুর্তে নাক চেপে ধরলো ইসরাহ। মেয়ে কে নাকে হাত চাপতে দেখে আসফা বেগম জিজ্ঞেস করলেন;-
–” কি হয়েছে ইসু?”
মায়ের ডাকে হুঁশ ফিরলো ইসরাহর। রুমের ভেতর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ফোনের স্ক্রিনের তাকালো।
–” হু হু, বলো আম্মু?”
–” কি হয়েছে তোর? মুখ এমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে কেনো?”
হাসার চেষ্টা করলো ইসরাহ।
–” কিছু হয়নি। তোমাকে একটু পরে কল দিচ্ছি। এখন রাখলাম, বেঁচে থাকলে ইনশাল্লাহ কথা হবে।”
কল কেটে দিলো ইসরাহ। অদ্ভুত উত্তেজনার বশে তার শরীর কাঁপছে। মন বলছে রুমটাতে তার যাওয়া উচিত হবে না। এই ঘরে যা থাকবে সে তা সহ্য করতে পারবে না। মস্তিষ্ক শুনলো না সেই কথা।
চলবে ( প্রথম খন্ডের সমাপ্তি)
( প্রিয় পাঠক মহল,
বলেন তো এই ঘরে কি আছে? ইসরাহ কি সব জেনে যাবে? যারা পড়বেন রেসপন্স করবেন প্লিজ! আপনাদের রেসপন্স আমার লেখার উৎসাহ বাড়ায়। আর দ্বিতীয় খন্ড আরো কয়েকদিন পর শুরু হবে। এই পর্ব কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু!)
Share On:
TAGS: She is my obsession, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ১৭
-
She is my Obsession পর্ব ৩১
-
She is my Obsession পর্ব ৩
-
She is my Obsession পর্ব ২৩
-
She is my Obsession পর্ব ১২
-
She is my Obsession পর্ব ১৬
-
She is my Obsession পর্ব ২২
-
She is my Obsession পর্ব ২৮
-
She is my Obsession পর্ব ৩০
-
She is my Obsession পর্ব ১৩