Golpo romantic golpo She is my Obsession

She is my Obsession পর্ব ৩৪


She_is_my_obsession

পর্ব:৩৪

লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি

ফারিসের আর্ট স্টুডিও তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা রকম আর্টের সরঞ্জাম।

তিনতলা বিশিষ্ট প্যালেসের এই বিশাল রুমটার পুরোটাই আর্টের জিনিসের জন্য বরাদ্দ। দক্ষিণ দিকে কাঁচের দেয়াল। যার জন্য দিনের বেলাতে কৃত্রিম বাতির আলোর প্রয়োজন পড়ে না।

এক পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি ইজল, তার ওপর ঠেসে রাখা ফাঁকা ক্যানভাস। তার সামনে ছোট একটি টুল। টেবিলের ওপর এলোমেলো ভাবে রাখা রঙ মেশানোর প্যালেট। বিভিন্ন মাপের পেইন্টব্রাশিজ, রঙভর্তি অ্যাক্রিলিক পেইন্টস, আর অয়েল পেইন্টস। পাশে অর্ধেক ভেজা একটি স্কেচবুক তার কাছেই জলভরা ওয়াটার জার।

জারের পাশে আছে কিছু পেন্সিল, চারকোল আর ইরেজার। কোণের দিকে তাকের ওপর গুছিয়ে রাখা আর্ট সাপ্লাইজ , কয়েকখানা পুরনো ক্যানভাস বোর্ড আর ভাঁজ করা ড্রয়িং পেপার। দেয়ালের পাশে ঠেস দিয়ে রাখা একটি গিটার, সেটা অবশ্য ধরা হয় কিনা অজানা। গিটারের তার গুলোতে বালু জমেছে মোটা স্তরে।

ফারিসের আর্ট রুমের মাঝে ছোটো টুলে বসে আছে ইসরাহ। এই মুহূর্তে তার পাতলা গড়নের শরীরে সাদা তোয়ালে ব্যতীত পুরোটা অনাআবৃত। তার সামনে উদোম শরীরে ফারিস দাঁড়িয়ে। তাদের দুজনের মাঝে, ইজলে গেঁথে রাখা ক্যানভাস। টেবিলের উপর প্যালেট ভরা লাল তরল। ফারিস ইসরাহর পোর্ট্রেট পেইন্টিং করছে।

ক্যানভাস থেকে চোখ সরিয়ে ইসরাহর দিকে তাকালো ফারিস। ইসরাহ থুতনি নামিয়ে গলায় ঠেকিয়েছে। বিয়ের এতোদিন ফেরোনোর পর ও এই বেশে ফারিসের সামনে বসে থাকতে অস্বস্তি বোধ হচ্ছে তার। পা থেকে মাথার চুল অব্দি কেমন শির শির করছে। লজ্জায় ইচ্ছে করছে টেবিলের নিচে ঢুকে পড়তে।

–” রাইট সাইডের হেয়ার গুলো সরাও তো লিটল গার্ল।”

আলতো হাতে ঘাড়ের পাশের চুল গুলো সরিয়ে দিলো ইসরাহ।

–” আর কতক্ষণ সময় লাগবে ফারিস?”

ফারিস জবাব দিলো না। ব্যস্ত হাতে প্যালেটের রঙ ঘষলো ক্যানভাসে। ইসরাহ এবারে কিঞ্চিত বিরক্ত হলো। আজ – কাল মাঝে মধ্যে পেট ব্যথা করে। অল্পতেই যে কোনো কিছুতে বিরক্তি ধরে যায় ইসরাহর। এই যে ফারিস এখন তাকে বসিয়ে রেখেছে। এই নিয়ে ও বেশ বিরক্ত সে। না পারতে দ্রুত পায়ে উঠে এসে ফারিসের পাশে দাঁড়ালো ইসরাহ।

রাগী কন্ঠে সুধালো সে;-

–” কথা বলছেন না কেন ফারিস? রঙ গুলো আপনার মাথায় ঢেলে দিবো কিন্তু..!”

–” পেন্টিং টা কেমন হয়েছে লিটল গার্ল?”

ইসরাহর তীরের মতো নাকটার পাটাতন ফুলিয়ে, মনোযোগ সহকারে ফারিসের হাতে ধরা পোর্ট্রেট পেইন্টিং টা দেখলো। তারপর প্যালেটের অবশিষ্ট রঙের দিকে তাকালো সে। ইসরাহ স্পষ্ট মনে পড়ছে। ফারিস যখন রঙ গুলো কৌটৌ থেকে ঢেলে ছিলো, তখন রঙ সম্পূর্ণ লাল ছিলো। এখন কালো খয়েরি হয়ে গেছে। এতেও বিরক্ত হলো ইসরাহ।

–” ধীরে ধীরে যেনো ছবিটার রং পাল্টে যাচ্ছে। রেড থেকে কেমন ডার্ক মেরুন হয়ে যাচ্ছে। দেখুন ফারিস,”

ফারিস ফিচেল হাসলো, নিজ মনে আওড়ালো সে।

–” র*ক্তের রঙ তো বদলাবেই লিটল কুইন। তোমার জায়গা দখল করতে চেয়েছিলো। আমি সরিয়ে দিয়েছি পৃথিবী থেকে।”

–” কি বললেন?”

ফারিস ভ্রু দ্বয় কুঁচকে, পেপার টা ইজেলে গেঁথে ইসরাহ দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। কোমর চেপে টেবিলে উঠিয়ে বসালো ইসরাহ কে। অতঃপর নিজে হাঁটু মুড়ে বসলো তার সামনে। ইসরাহ ডান পা হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো হাতে ম্যাসাজ করতে শুরু করলো সে।

–” লিটল গার্ল?”

–” হু?”

–” পা শিরশির করছে? বসতে কষ্ট হচ্ছে জান?”

–” বলবো না আপনাকে!”

ফারিস মিটিমিটি হাসলো। তার বউটা বড্ড বাচ্চা বাচ্চা আচরণ করছে। তার অবশ্য ভালোই লাগছে। ধীর কন্ঠে ফারিস আওড়ালো;-

–” মুড সুইং হচ্ছে? প্যালেসে বসে থাকতে অসহ্য লাগছে জান?”

ইসরাহ নাক কুঁচকে বললো,

–” জানি না।”

ফারিস কোমল হাসলো। তপ্ত ঠোঁট জোড়া বাড়িয়ে চুমু খেলো ইসরাহর পায়ে।

–” পাহাড়ে ঘুরতে যাবে?”

ফারিসের হাত থেকে পা ছাড়িয়ে; টেবিল থেকে নেমে এসে ইসরাহ তার পাশে বসে পড়ল। তবে মেঝেতে বসার আগেই ফারিস তাকে টেনে নিল নিজের কোলে।

ফারিস ইসরাহর ঘাড়ের চুল সরিয়ে মুখ লুকোলো ইসরাহর গলার নরম ভাঁজে। হঠাৎ, সে কেঁপে উঠে একটু সরে গেল। ফারিস চোখ তুলে তাকাতেই দু’জনের দৃষ্টি মিলে গেলো। ইসরাহ ঠোঁট ফুলিয়ে ফারিসের গলা জড়িয়ে ধরল। ক্ষণ বিলম্ব না করেই তার বুক ভেঙে ঝরঝর করে কান্নারা নেমে এলো।

–“ আমার ভালো লাগছে না, ফারিস। মনে হচ্ছে আপনি ধীরে ধীরে আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। আপনাকে আমি হারাতে চাই না, ফারিস জাওয়ান… সত্যিই হারাতে চাই না।”

ফারিস বুঝতে পারল ইসরাহর মনের অস্থিরতা। আগের দিন সে, গুগলে সার্চ করেছিল প্রেগন্যান্সির সময় মেয়েদের মানসিক পরিবর্তন নিয়ে। সেখানে দেখেছিল, গর্ভাবস্থার কারণে মুড মুহূর্তে মূহুর্তে বদলায়। যারা নতুন মা হবেন, তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না। কখন মন কি চায়।

ইসরাহর গর্ভাবস্থার প্রথম ধাপ হওয়ায়। এখন তার মনে ভয়ের স্রোত জেগেছে ফারিস কে হারানোর। সান্ত্বনার স্বরে ফারিস বললো;-

–” বেবি গার্ল, কেঁদো না প্লিজ।”

ইসরাহ থামলো না। বরং মনের মাধুরী মিশিয়ে কতক্ষণ কাঁদলো সে। ফারিস তাকে বাহুতে জড়িয়ে স্থির বসে রইলো। ইসরাহ ফারিসের জীবনে আসার পর থেকে তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সময়ের তারতম্য না করা ফারিস এখন সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট রেডি করে।

দুপুর দুটোর আগে টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে থাকে। রাত দশটার আগে ইসরাহর খাবার আর ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দেয় তাকে। সব মিলিয়ে ছন্নছাড়া ফারিস এখন দায়িত্ব বান হাজবেন্ড।

ইসরাহ মুখ তুলে, চোখ মুছে নিলো। ফারিসের কোল ছেড়ে মেঝেতে বসে আদুরে বিড়াল ছানার ন্যায় সুধালো;-

–” ওই বড় পাহাড়টায় ঘুরতে যাবো ফারিস।”

ফারিস নিষেধ করলো না। এতে আবার ইসরাহ কেঁদে উঠতে পারে।

–” ওকে, ওভার কোর্ট আর মাপলার গলায় পেঁচিয়ে আসো। আমি বাইরে ওয়েট করছি।”

খুশিতে চিকচিক করে উঠলো ইসরাহ চোখ। তড়িৎ বেগে ফারিস আর নিজের জন্য বরাদ্দ বেডরুমের দিকে দৌড় দিলো সে। ফারিস চেঁচিয়ে উঠলো;-

–” এই লিটল গার্ল! ধীরে হেঁটে যাও বলছি। নয়তো পাহাড়ে যাবো না বলে দিলাম।”

–” সরি, হেঁটে যাচ্ছি।”


কুয়াশায় আছন্ন পাহাড়ের উঁচু নীচু রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে ফারিস, ইসরাহ।

ফারিসের হাতে ঝুড়ি ভর্তি ফল, ব্রেড, জুস। পায়ে শক্ত বুট জুতা। মাথায় ক্যাপ। কুয়াশার আলো আঁধারিতে তার চোখের রঙ কেমন রহস্যময় বর্ণ ধারণ করেছে। ইসরাহ পরণে লেডি ওভার কোর্ট থাকলে ও ফারিস সাদা শার্টের উপর ডেনিম জ্যাকেট পরে এসেছে।

মাইনাস ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হওয়ায়। পাহাড়ি রাস্তায় কুয়াশা পড়ে পিচ্ছিল হয়ে আছে। রাস্তার পাশটাতে ব্যারিকেড দেওয়া। সেগুলো ধরেই হাঁটছে ইসরাহ। খালি জায়গা দেখে থামলো সে।

পুরোনো একটা শুকনো গাছের গুঁড়ি দেখে সেথায় বসে পড়লো ইসরাহ। এখন আর আগের মতো হাঁটা চলা করতে পারে না। একটু হাঁটলেই হাঁপিয়ে উঠে। দৌড়ানো সম্পূর্ণ নিষেধ ফারিসের। ইসরাহর পাশে খাবারের ঝুড়ি টা রেখে ব্যারিকেড ঘেঁষে দাঁড়ালো ফারিস। ইসরাহর সেদিকে খেয়াল নেই। সে ব্যস্ত ঘন জঙ্গল দেখতে। কি ভয়ংকর লাগছে বড় গাছপালা গুলোকে।

যেনো গাছ গুলো হাতড়ে অজানা কোনো পশু বেরিয়ে এসে তাদের উপর হামলা করবে। অথচ তেমন কিছুই ঘটলো না। অবাক কন্ঠে ইসরাহ বললো;-

–” আপনি এই জঙ্গলে একা থাকতেন কিভাবে ফারিস? শহরে ওই ফ্ল্যাট থাকতে এখানে থাকেন কেনো?”

ফারিস দীঘ শ্বাস চাপলো। পাহাড়ের চূড়ার পানে চেয়ে সুধালো সে;-

–” তোমাকে ছেড়ে আসার পর; নিজেকে এক ঘরে বন্ধ করে ফেলেছিলাম। আংকেলদের বাসায় থাকলে ও ওনাদের সাথে কথা বলতাম না। নিজের ভিন্ন পৃথিবী গড়ে নিয়ে ছিলাম। ভার্সিটি থেকে ফিরে সারাদিন একা ঘরে থাকতাম। ধীরে ধীরে তোমাকে ছেড়ে আসার কষ্ট কমলো।”

ফারিস থামলো, মলিন হেসে আবার বলতে শুরু করলো সে।

–” কমলো বলতে সহ্য হয়ে এলো। কিন্তু মানুষ দেখলেই তখন অসহ্য লাগতো। ততো দিনে আর্ট করে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলাম। টাকা ও হয়েছে। তারপর ওনাদের ফ্ল্যাট ছেড়ে এই প্যালেস টা কিনে নিলাম। অতঃপর এখানে পার্মানেন্ট থাকতে শুরু করলাম।”

–” তখন কি আপনি আমাকে খুব মিস করে ছিলেন?”

ফারিস ঘুরে তাকালো ইসরাহ দিকে। দুজনের চোখাচোখি হলো। কিন্তু কেউই দৃষ্টি নত করলো না।

–” তখন বিয়ে, সংসার, সম্পর্ক এসবের মানে আমি বুঝলেও তুমি অবুঝ ছিলে। হাজবেন্ডের মানেই বুঝতে না তুমি। কিন্তু তোমাকে হারানোর ভয়ে আমি ভুল করে বসলাম। আট বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কে বিয়ে করে নিলাম। যে কিনা আমার ই স্টেপ সিস্টার। বাবা আর তোমার মা মানতে পারলেন না বিয়েটাকে। কেউ ই পারবে না। এটাই স্বাভাবিক। সৎ বোনকে বিয়ে করা তোমাদের অন্ধ সমাজের চোখে পাপ। অথচ বুদ্ধু গুলো এটাই জানে না। যে র*ক্তের সর্ম্পক না থাকলে বিয়ের সম্পর্ক বৈধ। ওনারা ভাবলেন আমি দেশে থাকলে তোমার উপর অধিকার খাটাতে পারি। আবেগের বয়স ভুল করতেই পারি। দুজনের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।”

ইসরাহ ডাগর ডাগর চোখে ফারিসের দিকে তাকিয়ে তার কথা শুনছে। ফারিস এগিয়ে এসে ইসরাহ পাশে বসলো। উঁচু করে জুটি বাঁধা চুল গুলোতে নাক ডুবিয়ে শ্যাম্পুর ঘ্রাণ শুঁকে বললো সে;-

–” জোর করে আমাকে আমেরিকা পাঠিয়ে দিলো বাবা আর তোমার মা। একটা বার আমার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না। ভাবলো আমাকে বাইরে পাঠিয়ে দিলেই তোমাকে ভুলে যাবো। কিন্তু তারা জানতো না। লাভ অ্যান্ড লাইকিং মে ফেইড উইথ টাইম, বাট আনহেলদি অবসেশন নেভার ট্রুলি ফেইডস। দূরত্বে সেই নেশা দ্বিগুণ বাড়িয়ে তোলে। ধ্বংসাত্মক শক্তি জেগে ওঠে মস্তিষ্কে। তখন সেই অবসেশন কে আপন করে নিতে পাপ কে ও সঠিক পথ মনে হয়।”

চলবে

( প্রিয় পাঠক মহল
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! রাইটিং ব্লকে আছে। কাল সারাদিন ভেবে ও গল্প মেলাতে পারিনি। যা লিখছি তাও কেটে দিয়েছিলাম। অতঃপর আজ সারাদিন লিখে এখন দিলাম। আর কয়েক পর্ব পরে গল্পে ইতি টানবো, ইনশাল্লাহ।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply