She_is_my_Obsession
পর্ব সংখ্যা:০৪
লেখনীতেনবনীতাচৌধুরি
রাত দুটো বাজে!
শহরের অর্ধেক মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছে। পিনপতন নীরবতায় চেয়ে আছে আলাস্কা শহর।
প্যালেসের সবচেয়ে উপরের ঘরটা ফারিসের পেইন্টিং রুম। চারটে বড় বড় টেবিলের উপর পেইন্টিং এর জিনিস থরে থরে সাজানো। তুলি, প্যালেট, ক্যানভাস, পেন্সিল, রাবার থেকে রঙ। সব ই আছে তার সংগ্রহে। পেইন্টিং রুমের মাঝ বরাবর টুলে বসে পেইন্টিং করছে ফারিস জাওয়ান। তার সামনে প্যালেট ভর্তি তরল রক্ত আর তুলি রাখা। তাজা রক্তের বাজে উটকো গন্ধে ভরে আছে ঘরটা। এটা স্টিফেনের র*ক্ত।
তার লাশ টা টুকরো টুকরো করার আগে ফারিস রক্ত টা তুলে রেখেছিলো ; তার রঙ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। তুলিতে রক্ত নিয়ে নাকের সামনে ধরলো ফারিস। তাজা র*ক্তের ঝাঁঝালো গন্ধ। ঘ্রাণ টা শুঁকে তুলিটা দিয়ে আঁচড় কাটলো ক্যানভাসে। দক্ষ হাতে সাদা ক্যানভাসে স্টিফেনের ছবি আঁকছে ফারিস।
শীতের মাঝে ও ফারিসের মুখ জুড়ে ঘামের ফোঁটা ফোঁটা অস্তিত্ব। ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে কপালের ঘাম মোছার দরুন রক্তের ছোপ ছোপ দাগ ফারিসের শুভ্র মুখ জুড়ে বিস্তৃত হয়ে আছে। উদোম শরীরের পেটের কাছেও রক্তের অস্তিত্ব। ক্যানভাসের ছবিটা আঁকা প্রায় শেষের দিকে। শেষ টাচ আপ টা দিয়ে সোজা হয়ে বসলো ফারিস।
নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে রইলো নিক্ষুত হাতে আঁকা ছবিটার দিকে। পর পর ইজেল থেকে ক্যানভাস টা খুলে পাশের টেবিলে সাজিয়ে রাখলো ফারিস জাওয়ান। তার আরো একটা প্রাপ্তি। পর পর বিশ টা মানুষের ছবি সাজানো টেবিলটাতে। প্রতিটা খুন করার পর সেই ব্যাক্তির র*ক্ত দিয়ে ই তার প্রতিকৃতি এঁকে রাখা ফারিসের শখ বা ফ্যাশন বলা চলে।
ভার্সিটির মাঠে বসে আছে ইসরাহ , জাইমা , আর রবিন। তাদের ক্লাস শুরু হতে আরো পনেরো মিনিট বাকি। তিনজনের হাতেই তিনটে কোকের ক্যান। জাইমা মাঠে আসা যাওয়া করা ছাএ – ছাত্রী গুলো কে একবার দেখে কোকের ক্যানে চুমুক দিলো। পর পর ইসরাহ কে বললো;-
–” শুনেছি , আমাদের ডিপার্টমেন্টে নতুন প্রফেসর এসেছে ইসু।”
উদাসীন কন্ঠে ইসরাহ বললো;-
–” তাতে আমার কি। ক্লাস করতে পারলেই হলো।”
ইসরাহর উত্তর শুনে জাইমার আগেই রবিন বলে উঠলো;-
–” বুঝিস না ইসরাহ। আবার স্যারের পিছনে লাগবে জাইমা।”
রবিনের কথায় তার পিঠে কিল বসালো জাইমা। বসা থেকে উঠতে উঠতে রাগী কন্ঠে বললো সে:-
–” তোর মতো নষ্ট নজর না। যে বুড়ি ম্যামদের পেছনে লাগবো।”
–” তাও ভালো তোর মতো কুঁড়িদের পিছনে ঘুরি না। মাথা ভর্তি গু নিয়ে ভাব ধরে। ম্যামদের থেকে একটু শিখ। ব্যাগ ভর্তি টাকা আর টাকা।”
অপসোসের কন্ঠে ইসরাহ সুধালো;-
–” তোদের দুইটার পছন্দ ই বাজে।”
–” একদম আমার পছন্দ কে বাজে বলবি না ইসরাহ। সম্মান দিয়ে কথা বলবি।”
জাইমার ধমকে হাত বাড়িয়ে জাইমার সামনে জোড়া করে ধরলো ইসরাহ। চোখ পিটপিট করে মার্জিত কন্ঠে সুধালো সে;-
–” বিনীত অনুরোধ ম্যাম। আপনার বস্তা পঁচা পছন্দ গুলোর কথা আমার সামনে আর বলবেন না , প্লিজ।”
–” বিশিষ্ট জাইমা ম্যামের জন্য আমার একলাইন গান। ইসরাহ তুই চাইলে কানে হাত চাপতে পারিস!”
রবিনের কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো ইসরাহ। দাঁত কেলিয়ে রবিন কে বললো:-
–” প্রয়োজন নেই। তুই শুরু কর।”
ইসরাহর থেকে অভয় পেয়ে গলা পরিষ্কার করে সোজা হয়ে বসলো রবিন। জাইমা ব্যাগ টা পাশে রেখে বসলো রবিনের গান শুনতে।
–” মনটা আমার উড়ু উড়ু,,,,,
বুক কাঁপে যে দুরু দুরু,,,,
ভার্সিটিতে নতুন গুরু এলো রে! জাইমার নতুন মুরগি এলো রেএএএ।”
রবিন বাকিটা শেষ করার আগেই জাইমা মুখ চেপে ধরলো রবিনের। মুঠো ভর্তি রবিনের চুল গুলো নিয়ে টেনে ধরলো দু’হাতে। ইসরাহ পেট চেপে হেসে চলেছে। এমন উদ্ভট গান কেবল রবিনের দ্বারাই সম্ভব। জাইমা কটমট করে তাকিয়ে বললো:-
–” রবিইন্না আল্লাহ্ তোর বিচার করুক।”
রবিন ইনোসেন্ট ফেইস করে ইসরাহ দিকে চাইলো। পর পর বোকা বোকা কন্ঠে সুধালো ইসরাহ কে;-
–” ইসরাহ বস তুই ই বল! আমার গানটা কেমন হয়েছে?”
হাসি থামিয়ে ইসরাহ বললো;-
–” অসাধারণ।”
তাদের কথোপকথনের মাঝেই ক্লাসের বেল বেজে উঠলো। তিনজনেই তড়িঘড়ি করে উঠে ছুটলো ক্লাসের উদ্দেশ্যে। মাঠ থেকে তিন তলায় উঠতে উঠতে না ক্লাস শুরু হয়ে যায়।
আলাস্কার বুকে দুপুর পড়ে এসেছে। শীতের মৌসুম হওয়াতে রোদের তাপ টা তেমন গায়ে লাগে না। দিনের বেশির ভাগ সময় ই এখানে শীত পড়ে। শীতের মোটা পোশাক না পরে ঘর থেকে বেরোনো মুশকিল।
কালো ঘোড়াটার লাগাম টেনে সারা রেসিং ট্র্যাক জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ফারিস জাওয়ান। ফারিসের ঘোড়ার খুরের শব্দে মাটি কম্পনমান। তার চারপাশে ধুলোর আস্তরণে আশেপাশের সবকিছু অস্পষ্ট। পুরো রেসিং ট্র্যাক জুড়ে আরো দু’বার চক্কর কাটলো ফারিস।
অতঃপর শান্ত চোখে সামনের তাকিয়ে লাগাম টেনে থামালো ঘোড়াটা। আকাশের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করলো ফারিস। ঘোড়াটার পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে ; লাফিয়ে নেমে পড়লো সে। সারা শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে ফারিসের। ফর্সা পিঠ বেয়ে নেমে গেছে ঘামের রেখা।
হালকা রোদের তাপে ফারিসের কপালের ঘামের বিন্দু গুলো চকচক করছে। গার্ড এগিয়ে গিয়ে টাওয়াল টা বাড়িয়ে দিলো ফারিসের দিকে। বলিষ্ঠ পেট সহ বাহু গুলো টাওয়াল দিয়ে মুছে নিলো ফারিস। টাওয়াল টা ঘাড়ে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো রেসিং ট্র্যাক থেকে।
ফারিস বেরোতেই ড্রাইভার দৌড়ে এসে গাড়ির দরজাটা খুলে দিলো। আয়েশের ভঙ্গিতে গাড়িতে চড়ে বসলো ফারিস জাওয়ান। মূহুর্তেই গাড়ি টা ধুলো উড়িয়ে চলে গেলো রেসিং ট্র্যাকের ফটক পেরিয়ে।
বিকেল পড়ে এসেছে!
ক্লান্ত শরীরে সবে ভার্সিটি থেকে ফিরেছে ইসরাহ। সদর দরজা পেরিয়ে ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই কারো হাসির শব্দে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। এই সময় বাড়িতে গেস্ট এসেছে? কিন্তু ইসরাহ জানামতে কেউ তো আসার কথা না। ইসরাহ দু’পা এগিয়ে এসে উঁকি দিলো ড্রয়িং রুমে। কালকের ছেলেটা বসে আছে আরহাম সিকদারের সামনে। তার পাশেই মধ্যে বয়স্ক দুজন নরনারী। গত কালকের ঘটনা টা মনে পড়তেই তেতে উঠলো ইসরাহ। কাঁধের ব্যাগ টা মেঝেতে ছুঁড়ে লোক গুলোর সামনে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সে;-
–” কি সমস্যা আপনার? কালকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে আমার ব্যাগ ফেলে দিয়ে ছিলেন। এখন আবার বাড়িতে এসে দাঁত কেলিয়ে চা খাচ্ছেন।”
ইসরাহর চিৎকারে ভদ্র লোক আর ভদ্র মহিলা দুজনেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। মেয়ের এমন ব্যবহারে থতমত খেলেন আরহাম সিকদার। তিনি উঠে এসে ইসরাহ মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন;-
–” কি হয়েছে আম্মু? এমন আচরণ করছো কেন?”
–” বাবা এই লোকটা কালকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে আমার ব্যাগ ফেলে দিয়ে ছিলো। আরেকটু হলে আমিই পড়ে যেতাম।”
ইসরাহর অভিযোগে রওনাফ উঠে এলো। কাঁচুমাচু মুখে সুধালো সে;-
–” কালকের ঘটনা টা ভুল ক্রমেই ঘটেছিলো। এর মধ্যে আমার কোনো হাত ছিলো না। যাইহোক তার জন্য আমি সরি।”
–” আপনার সরি আপনার পকেটে রাখুন।”
ইসরাহর চিৎকার চেঁচামেচিতে কিচেন থেকে ছুটে আসলেন আসফা। কুটুমের সাথে ইসরাহর এমন বাজে ব্যবহার দেখে রাগে মাথা গরম হয়ে উঠলো ওনার। মেয়ের হাত টেনে ধরবেন ভেবে হাত বাড়ালেন তিনি। তার আগেই রওনাফের মা উঠৈ এলেন। আলতো হাতে ইসরাহর হাত ধরে অমায়িক হাসলেন তিনি। ইসরাহ কে টেনে নিজের পাশে বসালেন ভদ্র মহিলা। কোমল কন্ঠে তিনি বললেন:-
–” আমার ছেলের ব্যবহারের জন্য আমি দুঃখিত মা। আগে বসো , একটু পানি পান করো।”
নরম চোখে ভদ্র মহিলার দিকে তাকালো ইসরাহ। ওনার কথার প্রতিউত্তর কি দিবে ভেবে ফেলো না সে। এতো কোমল কন্ঠের আর্জির বিপরীতে কি বলা যায়?
–” আমি আমি দুঃখিত আন্টি। এমন বাজে ব্যবহার করা আমার উচিত হয় নি। আসলে….”
ইসরাহর কে নিজের দিকে টেনে নিলেন আতিফা ভূঁইয়া। হাসি হাসি মুখে বললো:-
–” আমি কিচ্ছুটি মনে করিনি মেয়ে। শান্ত হও।”
–” জ্…জ্বি।”
মায়ের আর ইসরাহর এমন মিষ্টি কথোপকথন গুলো সামনের সোফায় বসা রওনাফ গভীর চোখে চেয়ে দেখলো। মেয়েটা এতো কোমল কন্ঠে ও কথা বলতে পারে? উফফ ,,,,, রওনাফের কানে কানে কেউ জেনো বলে গেলো! রওনাফ তুই শেষ। রওনাফ ভূঁইয়া কে গায়েল করার জন্যই আল্লাহ্ এই মেয়ে কে তৈরি করেছে।
আতিফা ভূঁইয়া আরহাম সিকদারের দিকে তাকিয়ে মার্জিত ভঙ্গিমায় বললেন;-
–” ভাই সাহেব! এই মিষ্টি মেয়েটাকে আমার চাই। বড্ড যত্ন করে সাজিয়ে রাখবো আমার শোকেসে। এমন একটা পুতুল বহু দিন ধরে খুঁজছিলাম আমার রওনাফের জন্য। দিবেন এই মেয়েটাকে? তাহলে আমার চাঁদের পাশে আরেকটা চাঁদ উঠবে। “
আচানক চোখ তুলে আতিফা বেগমের দিকে তাকালেন সবাই। ইসরাহ অবাক হয়ে ভাবলো এতো দরদ মিশিয়ে কথা বলে কেন মহিলাটা?তার মুখোমুখি বসা রওনাফের দিকে চাইলো ইসরাহ। যে কি না তার দিকেই তাকিয়ে আছে।লোকটার পরণে সাদা পাঞ্জাবী – পাজামা। ইসরাহ মাথায় আসলো না রওনাফের এই বেশের কারণ। গতকাল ও তো ফরর্মাল লুকে ঘুরছিলো। সাথে গলা উঁচিয়ে ঝামেলাও করছিলো। তাহলে আজ এমন বিড়াল সেজে বসে আছে কেন!
আরহাম সিকদার উত্তর দেওয়ার আগেই আসফা এগিয়ে এলেন। মিষ্টি সুরে বললেন;-
–” আমাদের ও রওনাফ কে ভালো লেগেছে আপা। সত্যিই বলতে এমন সুপাত্র কেউই হাত ছাড়া করবে না।”
অর্ধাঙ্গনীর সাথে তাল মিলিয়ে আরহাম সিকদার ও বললেন;-
–” তাহলে তো কোনো সমস্যা নেই!”
–” না ভাই সাহেব। আরো একটা সমস্যা আছে।”
আতিফার কথায় অন্ধকার হয়ে এলো আসফা বেগমের মুখ। আবার কি সমস্যা হলো।
–” কি সমস্যা আপা?”
–” ইসরাহ তুমি রাজি? কেমন লাগলো তোমার রওনাফ কে?”
ইসরাহ আড়চোখে আরেকবার তাকালো রওনাফের দিকে। লোকটা তার দিকেই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। লাজুক কন্ঠে ইসরাহ সুধালো:-
–” আম্মু বাবা জানেন।”
–” আমাদের আপত্তি নেই আপা।”
–” আপনারা অনুমতি দিলে ইসরাহ কে এক জোড়া বালা পরাতাম আমি।”
মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালেন সবাই। আতিফা ব্যাগ থেকে সোনার মোটা বালা জোড়া বের করলেন। ইসরাহর চিকন হাত জোড়া টেনে সোনার বালা জোড়া পরিয়ে চুমু খেলেন হাতে।
তৃপ্তির হাসি হাসলো রওনাফ। সব এতো সহজ হবে ভাবতে পারেনি সে। এই ঝাঁঝের রানী ও কোমল কন্ঠে কথা বলতে পারে , বাহ।
নিজের ঘরে বসে এস্যাইনমেন্ট বানাচ্ছে ইসরাহ। আর কয়েকটা লাইন লিখলেই সমাধান হয়ে যাবে এস্যাইনমেন্ট টা। হাতের গতি বাড়ালো সে। শেষ শব্দ টা লিখে। কলম টা টেবিলে রেখে পড়ার টেবিলেই মাথা নামিয়ে শুয়ে পড়লো ইসরাহ। পিঠ থেকে কোমর অব্দি ব্যথায় টনটন করছে।
চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু? একদিনে দুটো গল্প দেওয়া নিশ্চয়ই সহজ কথা নয়। থিম ভাবনা চিন্তার সাথে। লেখালেখির ও একটা কথা আছে। আমার ডান হাত ব্যথায় নাড়াতে পারছি না। কি যে ব্যথা করছে। চোখ মেলে রাখাও দায়। মাথা ব্যথায়। গল্প দিবো যেহেতু বলেছি। কথা ভাঙবো না। তাই ভয় পাবেন না।)
Share On:
TAGS: She is my obsession, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ২৯
-
She is my Obsession পর্ব ২২
-
She is my Obsession পর্ব ৩০
-
She is my Obsession পর্ব ১১
-
She is my Obsession পর্ব ৩৩
-
She is my Obsession পর্ব ৩৫
-
She is my Obsession golper link
-
She is my Obsession পর্ব ১৭
-
She is my Obsession পর্ব ৩১
-
She is my Obsession পর্ব ২১