Golpo Love or hate romantic golpo

Love or hate পর্ব ১৬


Love_or_Hate

|#পর্ব_১৬|

ইভেলিনা_তূর্জ

কপি করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ ❌

কারাহিসারের ডিসেম্বারের সকালটা যেন শীতের গায়ে মিশে থাকা দগদগে কবিতা।গতকাল সন্ধ্যার পর থেকেই স্থানীয় নিউজ চ্যানেলগুলো একটাই খবর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছে, সারা দেশে দু’দিন প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করবে। রাতজুড়ে ভারী তুষারপাত, বাইরে বের না হওয়ার অনুরোধ।

প্রভাত এখনো শুরু হয়নি, একফালি রুপালি আলো দিগন্তের কিনারে জমে আছে, যেন সূর্যও দ্বিধায় ভুগছে এই ঠাণ্ডা শহরের বুকে ফিরে আসবে কি আসবে না। সমুদ্রের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো সেই পাহাড়ি শহর শীতের কুয়াশায় ঢেকে আছে, দূরে নীলাভ চূড়াগুলো বরফের গলায় শান্ত শোকগাথা গায়, আর বাতাসে ঝরে পড়ে হালকা সাগর-লবণের গন্ধ। রাস্তা প্রায় শুনশান,তবে দূর মসজিদ মিনার থেকে ধোঁয়ার মতো উঠে আসে আজানের সুর।

পেন্টহাউসের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে মিরাব

রান্নাঘর ভরে আছে রসুন আর জলপাই তেলের গন্ধে। মিরাব কাঠের চামচ দিয়ে হালকা নাড়তে নাড়তে প্যানে ঢেলে দিচ্ছে মরিচ-গুঁড়ো, ক্রাশ করা কালো গোলমরিচ, আর অল্প লবণ। পিঁয়াজের সোনালি রং তেলে ভাসতে শুরু করতেই সে একপাশে রাখা টমেটো পিউরি ঢেলে দেয়।বড় সসপ্যানে তখন ফুটছে পাস্তা।রান্না শেষ করে মিরাব চুলা বন্ধ করে থালা সাজাতে যায় পেন্ট হাউসের কাঁচ-ঘেরা ডাইনিং হলে।গলা থেকে লাল রঙের স্কার্ফটা খোলে ধপাস্ করে চেয়ার টেনে বসে গলা খাঁকড়ি উঠে,
-“শুনলাম রাতে নাকি প্রচন্ড তুষারপাত হবে।তাহলে তো ক্লিনিকে আর যাওয়া হবে না দু-দিন আমার।”

ফায়ারপ্লেসের কাছ থেকে একটা পুরুষের জোড়ালো শক্ত কন্ঠ স্বর এসে প্রতিধ্বনি হয় মিরাবের কানে,
-“ক্লিনিকে যাওয়ার কি দরকার, আগে ঘরে যে আছে তার ট্রিটমেন্ট কর,কেয়ার’ফুলি”

মিরাব চিন্তিত মনে ব্ল্যাক কফির কাপটা ঠোঁটে পুরে এক চুমুক দিয়ে প্রশ্নসূচক বলল,
-“মেয়েটাকে ইউ এস থেকে নিয়ে এলি কেন? সেখানে বে’টার ট্রিটমেন্ট হতো।

মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে আবার বললো মিরাব,

-“কাল রাতে হঠাৎ তোকে এতোমাস পড় তুরস্কতে দেখে অ্যাম লিটা’রালি শক’ড এড’শ।”

“-আমেরিকায় আমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী ডক্টর ছিলো তবে গিয়ে দেখি সে নাকি নেই।আর আমি যার তার হাতে ওর ট্রিটমেন্ট কি করে করাতাম।মেয়েটা সে’ইফ না কোনো জায়গাতেই না।দ্যা’টস হুআই আই ক্যাইম টু তুর্কি।বিক’উস আই ট্রাস্ট ইউ মিরাব।”

মিরাব মৃদুস্বরে হাসলো।
-“স্যালাইন তো চলছে।আমি মেডিসিন ও দিয়ে দিয়েছি।বাট হু ইজ্ সি,এটাতো ক্লিয়ার করলি না এড’শ[ AD.S]!”

“-বলবো।সেন্স ফিরবে কখন??”
“ঠিক ভাবে বলতে পারছি না।আই হো’প হি ই’জ আউট অফ ডে’ঞ্জার “

মিরাব কাল সারারাত ঘুমোতে পারেনি চোখ দুটো কেমন ঘুমে টলটল করছে।তার উপরে সকাল হতে না হতেই উঠে ব্রেকফাস্ট রেডি করে নিয়েছে।রাতের শেষ প্রহরে একটু নি ঘুমিয়েছিলো তবে ভোরের আলো ফুটতেই উঠে পড়েছে।বেশি সকাল করে ঘুমায় না সে।শীত চলছে আবার তুরস্কতে হিমশীতল করা ঠান্ডা না হলে সেই কখন মর্নিং ওয়াকে চলে যেতো।টেবিলের উপর প্লেট ভর্তি পাস্তা থাকলেও ডক্টর মি’রাব দু টুকরো শসার স্লাইশ,হাফ কুচি করা গাজর,ব্রকলি,একটা আধ টুকরো ডিম প্লেটে সাজিয়ে রেখেছে নিজের জন্যে।ব্ল্যাক কফি পুরোটা খেয়ে নিজে নিজেই বিড়বিড় করতে লাগলো চোখ মুখ কুঁচকিয়ে,
-“ইউ নো এড’শ।গুড হেল’থ ইজ্ মাস্ট বি ইম্পরট্যান্ট মোর দ্যান এনিথিং!”

মেয়েটা যে স্বাস্থ্য সচেতন তা তার খাবারের ডায়েটচার্ট দেখলে বুঝতে পারা যায়।হবেই বা না কেন।একজন ডক্টর স্বাস্থ্য সচেতন হবে এটা তো অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ডেনমার্কে তখন সূর্য লম্বালম্বি ভাবে কিরণ দিচ্ছিলো।হোটেল গ্রেন্ড থেকে আগতো একটা শ’কড খবর পৌঁছাতেই দামিয়ান তড়িঘড়ি করে চলে এসেছে।ইউভানের সেন্স ফিরেনি এখনো। তবে তার অগচরে আর.সি এর আওতাভুক্ত হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরের জেমস্ ওয়াশরুমে একটা মাথা কা/টা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।মিডিয়ার লোকজন ঘিরে ধরে আছে হোটেলকে।দামিয়ান হোটেলের একজন ফিমেল স্টাফের সাথে ওয়াশরুমের দিকে এগুতে থাকে।দামিয়ানের উপস্থিতিতে ওয়াশরুমের পথ ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সবাই।লাশটা থেকে একটা বিদঘুটে দুর্গন্ধ ভেসে আসতে দামিয়ান পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে মুখ চেপে ধরে নেয়।দরজাটা ঠেলে ঢুকতেই মৃদু একটা ধাতব গন্ধ নাকে এসে লাগলো,লোহার, রক্তের, আর নোংরা ক্লোরিনের মিশ্র গন্ধ।দামিয়ানের চোখে সর্বপ্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়লো,তা হলো হাই-কমোডের সামনে গড়িয়ে থাকা একটা অদ্ভুত ছায়া।১৫ সেকেন্ড পর মাথাটা বুঝে আসে সেটা রিজভীর জুতো।আর.সি এর হোটেল ম্যানেজার রিজভী।লোকটা ইন্ডিয়ান ছিলো।ইউভানের সাথে সেদিন লাস্ট কথপকথন হওয়ার পর তিনি দু’দিন নিরুদ্দেশ ছিলো।দামিয়ান আরো সামনে গিয়ে দেখে কমোডের ঢাকনা পুরো খোলা,আর রিজভীর মুখ পুরোটা পানির ভেতর চুবানো, যেনো তাকে ইচ্ছা করেই মুখ নিচে চেপে চুবানো হয়েছে।কিন্তু ভয়ের আসল অংশটা তখনো বাকি ছিলো।তার গলা প্রশস্ত করে কা/টা হয়েছে। চামড়ার নিচে নীলচে, লাল রঙের দাগ, আর পানির ভেতর সেই রক্ত জমে গাঢ় বাদামি হয়ে গেছে।দেয়ালের ওপর তাকালে দেখা যায়, রক্তের ছিটে দিয়ে টেনে দেওয়া তিনটি লম্বা দাগ,
যা দেখে মনে হয় ম*রার আগে রিজভী দেয়ালে নখ দিয়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা করেছিলো।হাতদুটো পেছনে বাঁধা।কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে ইনভেস্টিগেশন এর জন্যে ম্যানেজার রিজভীর লাশটা নিয়ে চলে যায়।রিজভীর লাশ হোটেল থেকে সরিয়ে নেওয়ার আধঘণ্টাপরেই,ডেনমার্কের শীতল রাত আরও ভয়া ভহতায় রূপ নিলো।হাড়-হিম হওয়া ডেনিশ রাতটা তখন অস্বাভাবিক নীরব, যেনো অন্ধকার আকাশের ওপর ঝুলে থাকা ঠাণ্ডা চাঁদও আজ কোনো আলো নামাতে ভয় পাচ্ছে। আরহুস হসপিটালের করিডোরে ম্লান আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা তুষার নিজের বুকের ভেতর সেই অস্বস্তিটাকে আরও গভীরভাবে টের পাচ্ছিলো যা দিনভর তাকে কুরে কুরে খেয়ে যাচ্ছে।আরহুসের হসপিটালে হাই সিকিউরিটি গার্ড সাথে তুষার সর্বক্ষণ ইউভানের ক্রিটিকাল কেয়ার রুমের সামনে রাত দিন পার করছিলো,কারণ তুষারের দীর্ঘবিশ্বাস ইউভানের বাইক এক্সিডেন্ট করতেই পারে না।তুষারের সিক্স সেন্স এ বিষয় মানতে নারাজ।তাই হসপিটালের সর্বত্র কড়া পাহাড়ার ব্যাবস্থা করে রেখেছে।তারউপরে কিছুক্ষণ আগেই ম্যানেজার রিজভীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়েই সেখানে দামিয়ানকে পাঠিয়ে দিয়েছিলো।

তুষার ছোট থেকে চতুর ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যাক্তিত্বের অধিকারী। ইউভান রিক চৌধুরীর ডান হাত বলে কথা।তবে তুষার কখনোই হুটহাট রেগে যায় না।সিক্স সেন্স দিয়ে ভেবে চিন্তে সকল সিদ্ধান্ত নেয়।তুষারের জায়গায় ইউভান থাকলে এতোক্ষণে ম্যানেজার রিজভীর লাশটা পুলিশ অব্দি পৌঁছাতে দিতো না।তবে তুষার খুব ভেবেচিন্তে মিডিয়ার লোকদের শান্ত করতে লাশ ময়নাতদন্তের জন্যে নিয়ে যাওয়ার পারমিশন দিয়ে দেয়।যদিও ইউভানের সেন্স ফিরে আসার পর খবর পেলে শাস্তি পেতে হবে তুষারকে।

মিসেস এ্যাশকে হসপিটালে আনার জন্যে গাড়ি পাঠিয়েছিলো।তবে তিনি এখনো এসে পৌছায় নি দেখে ভিষণ বিচলিত হলো তুষার।মিসেস এ্যাশের কাল রাতে আসার কথা তবে এখনো এলেন না।তুষারকে খুব বেশি চিন্তিত দেখায় না তবে পাঁচআঙুল সমান কপালে কেমন যেনো ভাঁজ পড়ে আছে।কপাল বেয়ে গুড়ি গুড়ি ঘাম বেয়ে পড়তেই গাঁয়ের কালো জ্যাকেটটা খুলে হাতে নিতেই রাহা এগিয়ে এসে তুষারের সামনে দাঁড়ায়।এতোক্ষণ বিপরীত পাশে দেয়ালে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো।
“-তুষার তাইওয়ান কি হয়েছে।আপনাকে এতো টেনস্,দেখাচ্ছে কেনো।হুয়াট হেপেন্ড? “

রাহা কখনো তুষারকে সম্মান দিয়ে কথা বলে তো না তার উপরে তুষার রাহার বয়সে এতো বড়,অন্যসময়ের মতো তুষার কিঞ্চিৎ বিরক্তবোধ করলেও আজ কোনো রিয়েক্ট না করে রাহার লাল হয়ে যাওয়া মুখের পানে তাকিয়ে জবাব দেয়।
-“তোমার গ্র্যানির সাথে কথা হয়েছে।তিনি কিছু বলেছিলেন?”

রাহা সঙ্গে সঙ্গেই এক পাঁ এগিয়ে তুষারের হাত থেকে ডেনিম কালো জ্যাকেটটা নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নেয়।
-“সরি।আমার শীত করছে অনেক।বাই দ্যা ওয়ে,আপনি যেনো কি বলছিলেন।গ্র্যানির সাথে আমার কাল রাতে লাস্ট কথা হয়েছিলো।চার্চ থেকে তো এতোক্ষণে আরহুসে চলে আসার কথা। “
রাহা বাক্যউক্তি খন্ডন করার আগেই নীল বেঞ্চিতে বসে থাকারত লিসা চ’ট করে ব’লে উঠে,
-“ম্যাম তো আমায় বলেছিলেন,ম্যামের ইম্পরট্যান্ট কাজ পড়ে গিয়েছে তিনি ম্যানশনে যাবেন তারপর সেখান থেকে আরহুসে ব্যাক করবেন।কেনো স্যার কি হয়েছে।”

তুষার দেয়ালে পিঠ ঘেষে দাঁড়িয়ে কপালের উপর কুঁকড়ে থাকা তামাটে চুলগুলো আঙুল দিয়ে পিছনে নিয়ে বলল,
-“উইু!নাথিং। “

প্রায় মিনিট দশেক পর হঠাৎ তুষারের ফোনটা কাঁপতে কাঁপতে বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো—”Albert Mansion – Gate Security”।
তুষারের গলা হালকা শুকিয়ে এলো। হাতের অর্ধ খাওয়া সিগারেটটা ফেলে পাঁ দিয়ে পিষে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো হাঁপাতে থাকা, আতঙ্কে গলা শুকিয়ে যাওয়া মৃত্যুর দারপ্রান্তে থাকা এক পুরুষের কাঁপা কণ্ঠ-
-“”Help us, Boss, someone broke in they’re killing everyone!”

শেষ শব্দটার মাঝখানেই ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার।
তারপর শুধু,
থপ্! থপ্!
কোনো ভারী কিছু মাটিতে পড়ে যাওয়ার আওয়াজ।ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড শুধু শ্বাসের মতন একটা ভৌতিক শব্দ, তারপর নিস্তব্ধতা।ওপাশ থেকে কলটা আচমকাই সুইচ স্টপ হয়ে যায়।তুষারের শিরদাঁড়া বেয়ে রক্ত মুহূর্তেই টগবগ করে উঠে।বিদ্যুৎ গতির ন্যায় পকেট থেকে এয়ার’পিস বের করে কানে গুজে দেয়।পরপর দামিয়ানের ফোনে অনবরত কল করতে করতে কোপেনহেগেন এর উদ্দেশ্য যাওয়ার জন্যে পা বাড়াবে তার আগে ঘুরে রাহার দিকে এগিয়ে আসে,রাহা ততক্ষণে ছলছল
নয়নে তুষারের দিকে দৃষ্টি ফেলে ঠোঁট গলে শব্দ বের করার আগে তুষার রাহার কাঁধে হাত রাখে।অনুমতি বিহীন।লম্বা হওয়ার তরুণ একটু ঝুঁকে রক্তিম আভার দৃষ্টি দিয়ে কর্কশ গলা নিচু স্বরে বলল,
“-ফোকাস অন মি ইনায়া।লিসেন্ট।ডুন্ট গো আউট সাইট।স্টে ইনসা’ইড।আন্ডারস্ট্যান্ড??”
কথাটুকু শেষ করে তুষার লিসার পানে একটা বাক্যে ছুঁড়ে হনহনিয়ে বড় বড় পা ফেলে চলে যেতে থাকে।
-“ইনায়ার খেয়াল রাখবে।আই উইল কাম ব্যাক সো’ন।তবে সন্দেহবাজন কিছু দেখলে।যাস্ট ইনফর্ম মি।”

তারপর তুষার সোজা আরহুসের হসপিটালের র’ফটপ এ চলে আসে।সেখানে আগে থেকে হেলিকপ্টার রেডি ছিলো।তুষারের সাথে বেশ্ কয়েকজন কালো পোশাকধারী হাতির ন্যায় লোক পরপর পাঁচটা হেলিকপ্টার নিয়ে কোপেনহেগেন এর উদ্দেশ্য রওনা হয়ে পড়ে।

|কারাহিসার, তুরস্ক |

রাত তখন প্রায় নিস্তব্ধ।অঅন্ধকার রাতের মেঘগুলো এতো নিচে নেমে এসেছে যেনো হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়। পেন্টহাউসের বিশাল কাচের জানালার বাইরে হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোর আলো দূরে ছোট ছোট তারার মতো টিমটিম করছিলো। ভেতরে কেবল ফায়ারপ্লেসে অল্প অল্প করে কাঠের ফাটার শব্দ।রোজ শুয়ে আছে বাদামী রঙের মখমলে কিংসাইজের বিছানা।কপালে গুঁড়িগুড়ি ঘাম।চোখের পাতাদুটো হালকা কেঁপে কেঁপে উঠে, বেলকনির পর্দা গলে আগতো বায়ু প্রবাহের সাথে। হাতে ক্যানোলা লাগানো।কপালে ব্যান্ডেজ করা।হাতের কিছু কিছু অংশে গভীর ক্ষতোর দাগ।ঠান্ডা বাতাস শরীর বেয়ে যেতেই ক্যানোলাযুক্ত হাত হালকা নড়ে উঠে, গাঁ কাঁপুনি দিয়ে উঠে,মুহূর্তে মস্তিষ্ক ফেটে যাওয়ার ন্যায় অচেতন অবস্থায় নিজের এক্সিডেন্টের দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতে শুরু করে,

রেললাইন,
বিশাল বড় পাইন গাছ।
কালো মার্সিডিজ কার।

সব কিছু চোখের সামনে ভাসতে শুরো করে বিভৎসভাবে।মস্তিষ্ক ফেটে যাচ্ছে বাদামী চোখের অধিকারী সপ্তদশীর।চারদিকে শুধু আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে।চলন্ত ট্রেন আসার আগ মূহুর্তে যখন রোজ হঠাৎ করে গাড়ির ব্রেক, এক্সেলেটরে চাপ প্রয়োগ করে তখন কালো মার্সিডিজ কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রেকফেল করে স্টেশনের অপরপ্রান্তে থাকা বড় পাইনগাছের সাথে ধাক্কা খেতেই রোজ প্রচন্ড জোড়ে কপালে আঘাত পায়।গাড়িটা সাইড অ্যাঙ্গেলে কাঁত হয়ে পড়তে রোজ গাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ছিটকে পড়ে,গাড়ির দরজা ভেঙ্গে চুরমার।কাঁচ গুলো ভেঙ্গে রোজের শরীরে গেঁথে যায়। মরণ যন্ত্রণায় ভেজা ঘাসগুলো আঁকড়ে ধরে রোজ।পাঁ দুটো ভাঙ্গা সিটে আটকে গিয়েছে।নড়ার ক্ষমতা যে হারিয়ে বসে আছে।সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়ির টায়ারে তখন আগুন ধরতে শুরু করে, মুখ থেকে গলগল করে গরম র’ক্ত পড়তেই আর্তনাদ করে শীৎকার দিয়ে উঠে,এই বুঝি দেহের মনিকোঠায় আটকে থাকা প্রাণ পাখিটা দেহ ছেড়ে পালাবে।

জীবনের শেষ সুযোগ একবার হলেও কাজে লাগানো উচিত।নতুন করে বাঁচার শেষ সুযোগ।নিঃশব্দে কেঁদে উঠে শেষ সুযোগ কাজে লাগালো হাতের তালুতে থাকা কাচঁ ভাঙ্গাটা র’ক্তমিশ্রিত লালা ঠোঁট দিয়ে টান দিয়ে খুলে গাড়ি থেকে বের হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। পারছে না আর রোজ নামক নামটা দুনিয়া থেকে এই বুঝি মুছতে চললো চিরতরে।টায়ারে আগুন মূহুর্তেই বাড়তে শুরু করতেই, রোজ চিৎকার করে পাঁ টানতে শুরু করে হাত দিয়ে।মৃত্যু যন্ত্রণা ঠিক কতোটা ভয়ংকর হতে পারে তা যারা মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরতে পারে তারা অনুভব করতে পারে।কার এক্সিডেন্টের মিনিটের মধ্যে পুরো কার ব্লাস্ট হয়ে যায়।যা ট্রেন মাস্টার সহ আরও বেশ্ কিছু অসহায় মানুষ চলন্ত ট্রেনের অপর প্রান্ত থেকে দেখেছিলো।তবে কার ক্র্যাশ হওয়ার আগে রোজের চোখের সামনে একটা গাড়ির হেডলাইট পড়তেই সেদিন আচমকা অতি উচ্চশব্দে কেঁদে উঠেছিলো।শুষ্ক হাতের স্পর্শ তাকে গাড়ির ভিতর বাহিরে বের করে নেয়।চোখ দুটো তখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।তবে ঝাঁপসা চোখে দেখেছিলো মুখখানা।পুরো শরীর র’ক্তাক্ত হয়ে ভিজিয়ে দিয়েছিলো অপরপ্রান্তের লোকটার শার্টটাকে।জ্ঞান হারানোর আগে কাঁপা গলায় বলে,

-“আমি বোধয় বাঁচবো না। মরে যাবো।খুব যন্ত্রণা হচ্ছে পুরো শরীরে,কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে পারছি না।”

হঠাৎই রোজের বুক প্রচণ্ড ধড়ফড় করতে শুরু করলো।রোজ চিৎকার করে উঠে বসলো।মাথাটা চেপে ধরলো।তার চোখ ভয়ে ছটফট করছে, শ্বাস দ্রুত, গলা শুকিয়ে কাঠ।হঠাৎ তার কাঁপতে থাকা অপর হাতটা বিছানার প্রান্তে থাকা পানির গ্লাসে লেগে যেতে কাঁপা হাতে পানির গ্লাস তুলে এক ঢুকে খেয়ে নিলো।হাতের স্যালাইনটা একটানে খুলে নিলো।আচমকা খুলতেই হাত দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে।রোজ কিছু বুঝে উঠার আগে দেখতে পায় বিছানার নিচে লুকিয়ে দুটো চোখ তাকে দেখছে।বিছানার চাদর খামচে ধরে আছে।রোজ হঠাৎ উঠায় হয়তোবা ভয় পেয়েছে। মিরাবের রাখা গরম স্যাুপ ঠান্ডা হয়ে জমে আছে।

রোজ ঘার একটু নুইয়ে কাঁপা কন্ঠে বিছানার পাশে কে জানতে ব’লে,
-“কে… কে ওখানে।বেরিয়ে এসো।”

রোজ ভয় পেয়ে আছে দেখে উঠে দাঁড়ায়। রোজ দেখতে পায় এটাতো একটা বাচ্চা ছেলে।শরীরটা এখনো রিকোভার হয়নি তার,কোথায় আছে তাও বুঝতে পারছে না তার উপরে এখানে একটা বাচ্চা ছেলে।রোজ হাত দিয়ে ইশারা করে তার কাছে আসতে বলে।যেই না রোজ অনুমতি দিয়ে দেয়।বাচ্চা ছেলেটা মহা খুশি।সবকপাটি দাঁত বের করে হেঁসে লাপিয়ে বিছানায় উঠে ব’সে,পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে রোজের মুখের সামনে ধরে ব’লে,
-“নাও চকলেট।আর কেঁদো না।ইউ ক্রাইং।ঘুমের মধ্যে কেউ কাঁদে। আমি তো তোমাকে চুমু দিয়েছিলাম,যেনো না কাঁদো, কিন্তু তুমি অনেক ব্যাড।আমাকে ধাক্কা দিয়ে বেড থেকে ফেলে দিয়েছো।”

রোজ গালে হাত রাখলো।সত্যিই তার গাল চ্যাট চ্যাট হয়ে আছে।আবার চকলেট লেগে আছে।রোজ একটু হলেও বুঝতে পারলোনা।কে এই ছেলে।তার পরেও জিজ্ঞেস করে বসলো।
“-নাম কি তোমার”
-“বলবো না।আগে সরি বলো।”

রোজ একটু কষ্ট করে বিছানায় হেলে বসলো।মৃদুস্বরে বলল,
-“হুম।সরি।এবার তো বলো”

ছেলেটা যে বেশ্ পাকা স্বভাবের তা রোজের বুঝতে আর বাকি রইলো না।বিছানার উপর একটা ড্রয়িংবুক রাখা।সাদা পৃষ্ঠার উপর হাবিজাবি করে একটা ছবি আকাঁ। বিছানার উপর একটা মেয়ে শুয়ে আছে এরকম কিছু আঁকতে চেয়েছিলো।কাঁচা হাতের অংকন হলেও রোজ বাঁকা হাসলো।ছেলেটা বোধয় তাকেই আঁকার চেষ্টা করছিলো।
রোজ ঠোঁটে হাসি রেখা টেনে আবার সুধালো,
-“কি হলো বললে না যে তোমার নাম।”

-“Anan shah karahisar….তুমি আমার নামটাও জানো না।বাট আমি তোমার নাম জানি।”

-“কিভাবে জানো?”

-“বলবো না।”

“-তাই??তোমার নামটা খুব সুন্দর.. আচ্ছা,ওনি কোথায়?”

আনান রোজের কাছে এসে ভ্রু সরু করে গালে এক আঙুল রেখে বললো,
-“ওনি আবার কে।”
“-বাড়িটা তো নিশ্চয়ই তোমার তাই না।??
-” হুম।মাই হাউস।”

-“তাহলে তোমার বাড়িতে আমাকে যিনি নিয়ে এসেছে।আমি যার সাথে এসেছি।তিনি কোথায়?”

-“তুমি তো আমার পা’পার সাথে এসেছো।”

-“পাপা!-রোজ কিছুটা অবাক হলো।ছোটো বাচ্চাতো তাই হয়তো বুঝতে পারেনি।ওকে বেশি কিছু জিজ্ঞেস করেও লাভ হবে না।আশেপাশে কাউকে দেখতেও পারছে না রোজ।আনানের গালে আলতো করে হাত রাখলো রোজ।
-“আচ্ছা।আনান বেবির পাপা কে?”

-“রিয়েলি।ওহহ নো।তুমি জানো না??……আমার পা’পার নাম A.D.S এড’শ………
.
.
.

চলবে

|পরবর্তী পর্ব পেতে অবশ্যই রেসপন্স করবেন। হ্যাঁ অবশ্যই গঠনমূলক কমেন্ট |

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply