Golpo Love or hate romantic golpo

Love or Hate পর্ব ৩১


Love_or_Hate

|#পর্ব_৩১|

ইভেলিনা_তূর্জ

⛔কপি করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ
⛔প্রাপ্ত বয়স্ক ও মুক্ত মনস্ক দের জন্যে

শ্রাবণের মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকারে ঝাউবনের আড়ালে মিশে যেতে যেতে ইউভান পিছনে শুধু একটা বাক্যে রেখে গিয়েছিলো-

“পৃথিবীটা চক্রাকার। নিয়তির অমোঘ টানে যদি প্রাণ বেঁচে থাকে, তবে আমাদের আবার দেখা হবে, অন্য কোনো র’ক্তিম মোড়ে, ধ্বং’সের কোনো নতুন উৎসবে। আর যদি আজই ইতি ঘটে তোমার জীবনকাব্যে… তবে চিরতরে আল-বিদা!”

সেদিন যদি ইউভান সেই অপরিচিতা ষোড়শীর মায়াবী নেত্রপল্লবের মায়াজালে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ না হতো, তবে হয়তো শ্রাবণের সেই মেঘলা রাতটিই হতো তন্বী রমণীর জীবনের শেষ পরিচ্ছেদ।ইউভানের ওই চিরাচরিত উপেক্ষা কিংবা হিমশীতল নির্লিপ্ততা সেদিন অনায়াসেই লিখে দিতে পারতো রমণীর অন্তিম অধ্যায়। কিন্তু নিয়তি সেদিন ইউভানের হাত দিয়ে এক অন্যরকম চিত্রনাট্য লিখিয়ে নিলো।অপরিচিতাকে রেখে গেলো এক অদ্ভুত জীবন আর মৃ*ত্যুর সন্ধিক্ষণে।ধরিয়ে দিলো ধ্বংসের এক নতুন নিমন্ত্রণপত্র।যার উত্তর মহাকালের অন্য কোনো র,’ক্তিম মোড়ে খচিত।

পুলিশের গাড়ির নীল-লাল আলোর ঝলকানি আর অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র সাইরেনে সেদিন পুরো রাস্তা কেঁপে উঠেছিলো। রোজকে পিষে ফেলা ঘাতক ট্রাকটাও সেসময় ব্রেক ফেল করে রাস্তার ধারের বিশাল এক গাছের সজোরে ধাক্কা খেয়েছিলো। জানা গিয়েছিলো, স্টিয়ারিং হাতে থাকা চালকটা তৎক্ষণাৎ না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন।

​এদিকে পিউয়ের বাবা তিশা পুলিশের গাড়ি নিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রোজকে খুঁজতে খুঁজতে, রাস্তার ধারের ধুলোবালি মেখে নিথর হয়ে পড়ে থাকা রোজকে দ্রুত উদ্ধার করে তাকে নিয়ে যায় বন্দরনগরীর ব্যস্ততম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
​রোজের ক্ষতবিক্ষত শরীরের অবস্থা দেখে ডাক্তারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। এতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর কোনো মানুষের বেঁচে থাকা কি আদতে সম্ভব? বিজ্ঞানের ভাষায় অলৌকিক কিছু না ঘটলে ফেরার পথ যেনো রুদ্ধ।এতো বড় মস্তিষ্কের আঘাতের পর হৃদস্পন্দন সচল থাকাটাও যেনো বিজ্ঞানের কাছে এক পরম বিস্ময়। চট্টগ্রামের চিকিৎসকেরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেন এখানে রোজের চিকিৎসা সম্ভব নয়।

​ততক্ষণে রাজধানীর অভিজাত পাড়ায় রোজের বাবা শিল্পপতি ইমরান চৌধুরীর কাছে দুঃসংবাদ পৌঁছে যায়। কালক্ষেপণ না করে, মুমূর্ষু রোজকে লাইফ সাপোর্টে রেখেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স করে নিয়ে আসা হলো রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে অত্যাধুনিক বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে।

হাসপাতালের একটা বিশেষ ফ্লোর খালি করে দেওয়া হলো। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সব নিউজ পেপার টিভি চ্যানেল থেকে তথ্য গোপন রাখা হলো যাতে কাকপক্ষীও টের না পায় যে ইমরান চৌধুরীর একমাত্র কন্যা লাইফ সাপোর্টে,কেননা এখানেও ছিলো পলি’টিক্স,রাজনীতির সংঘর্ষতা। কোনো সংবাদমাধ্যম কিংবা সাধারণ কর্মীরাও জানলো না।

​​রোজ তূর্জ চৌধুরীকে বিদেশে নেওয়ার মতো সময় হাতে ছিলো না। তাই সিদ্ধান্ত হলো, রোজকে বাইরে পাঠানো নয়, বরং বহিঃবিশ্বের শ্রেষ্ঠ নিউরোসার্জনদেরই আনা হবে ঢাকায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বিশেষ বিমানে করে আনা হলো উন্নত প্রযুক্তির সরঞ্জাম এবং বিশেষজ্ঞ দল। শুরু হলো জটিল নিউরসার্জারি( ক্র্যানিওটমি)।

অতঃপর অপারেশনের পর রোজের জ্ঞান ফিরার পর ডাক্তাররা পরীক্ষা করে এক বিষণ্ণ সত্যের মুখোমুখি হলেন। রোজের মস্তিষ্কের সেই মর*ণঘাতী আঘাত মেয়েটার জীবনের সাম্প্রতিক ক্যালেন্ডার থেকে গত পাঁচ বছরকে এক নিমিষেই ছিঁড়ে ফেলেছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে রেট্রোগ্রেড অ্যামনেশিয়া (Retrograde Amnesia)।
তবে ​বিস্ময়করভাবে, রোজ তার শৈশবের সব স্মৃতিগুলো ঠিকই মনে করতে পারলেও এক্সিডেন্টের মুহূর্ত থেকে পিছনের পাঁচ বছরের সব ভুলে যায়।যা[ Temporal Gradient’]।অ্যামেনেশিয়া গত ১৮২৫টি দিন তার জীবন থেকে নিপুণভাবে মুছে দিয়েছিলো।রোজ ভুলেই গেলো সে চট্টগ্রামে বিয়ে খেতে গিয়েছিলো।

​ইমরান চৌধুরীও মেয়ের এই স্মৃতিভ্রমের খবরটি বাইরের এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে আড়াল করে ফেললেন।রোজকেও বলা হলো না।ব্রেই’ন হেমা’রেজ হতে পারে সেই ভয়ে। শুধু জানালেন কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ছোটখাটো এক্সিডেন্টের আঘাত। রোজ পুরোপুরি সচেতন হওয়ার আগেই, রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত গোপনে তাকে নিয়ে আসা হলো তাদের আভিজাত তূর্জ হাউসে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আর নার্সরা সেখানে রোজের সেবা করতেন।তবে ইমরান চৌধুরী অত্যন্ত কৌশলে মেয়ের জীবন পুনঃরায় স্বাভাবিক করতে লাগলেন।তবে রোজের শরীর সুস্থ ব্যথা ঘায়েল হতে কয়েকমাস লেগে যায়।

|বর্তমান |

সান্তা ক্লারার সমুদ্রতট তখন গোধূলির ম্লান আলোয় সিক্ত। উত্তাল প্রশান্ত মহাসাগরের লোনা বাতাস আর ঢেউয়ের গর্জনে এক গুমোট নিস্তব্ধতা। বালুর ওপর দিয়ে টলটলায়মান পায়ে হেঁটে চলেছে ইউভান। তার বাঁ হাতে একটি সাইলেন্সারযুক্ত Colt Python .357 Magnum আর ডান হাতে রেড ওয়াইনের গ্লাস। সে এমনভাবে হাঁটছে যেন এই পৃথিবীর সাথে তার সব চেনা পথ ফুরিয়ে গেছে।ইউভান দিক বেদিক ভঙ্গিমায় হাঁটছে আর তার দু পাঁ পিছনে দামিয়ান হাঁটছে। সমুদ্রের নোনাজল পায়ে স্পর্শ করতেই দামিয়ান বিভ্রম থেকে বেরিয়ে এলো।অনেকটাই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে যেনো।অবচিত মনে কতো ভাবনাই না আটি পাতলো।নিষ্পলক চাহনিতে তাকিয়ে রইলো সামনে থাকা গুরুগম্ভীর পুরুষটার দিকে নিজের বন্ধুর পানে।যার মন মস্তিষ্কে কতো কিছুই না লুকায়িত রাখে,যার মস্তিস্ক যেনো নিজেই এক গোলকধাঁধা।দামিয়ান নিজেই দ্বিধায় ভুগে ইউভান আসলে চায় টা কি!কথাগুলো যেনো তার শীড়দাড়া নাড়িয়ে দিলো।দু হাত প্যান্টের পকেটে রেখে কিছুটা কৌতূহলবশত কিছুটা কৌতূহল আর অনেকটা দ্বিধা নিয়ে দামিয়ান নীরবতা ভাঙলো।জিজ্ঞেস করলো ইউভানকে।

“তাহলে ডার্ক রোজের রহস্য এইটাই??তুই কি সত্যিই জানতিস না কক্সবাজারের বোরকায় গাঁ ঢাকা মেয়েটা কে??”

ইউভান রিভলভারের নলে একবার আঙুল বুলালো। কোনো দ্বিধা ছাড়াই নির্লিপ্ত গলায় পরিষ্কার স্বীকারোক্তি।
-“না!”

“যদি জানতিস সেদিনই মে’রে দিতিস?? “

ইউভান থামল। সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মদের গ্লাসে চুমুক দিলো।
—-“না চিনেই তো মেরে দিতে চেয়েছিলাম।বোকা মেয়ে একটা কিলারের কাছে সাহায্যে চায় কিভাবে।এতো বিশ্বাস করতে কে বলেছিলো আমায়??এতো বিশ্বাস তো রিক আলবার্ট নিজেকেও করেনি কোনোদিন!…..তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলো।শালী বান্দীই প্রথম মানুষ যাকে রিক আলবার্ট চেয়েও মা’রতে পারে নি।কেন জানি না অপরিচিতাকে শেষ সুযোগ দিয়ে এসেছিলাম সেদিন।”

“ক্যায়া বাত হে বস্ জান কু’রবান দিতে গিয়ে নিজেই কুর’বানী হয়ে গেলি!ব’লির পাঠা হয়ে ফিরলি!”

“যাস্ট সাট আপ বিচ্!”

“ডার্ক রোজ যে রোজ তূর্জ চৌধুরী তা কিভাবে জানলি??”

“ইমরান চৌধুরীর আর তার মেয়েকে মারতে গিয়েছিলাম!দ্যান।”

“এ্যাহ!”

“এ্যাহ না হ্যাঁ!”

“তুই কি রোজকে কখনোও দেখিস নি??”

“না!শুধু জানতাম চৌধুরী বংশে এখনো দু-জন জ্যান্ত জী-বাশ্ম বেঁচে আছে এক ইমরান চৌধুরী আর তার মেয়ে।উহুম!বেঁচে আছে না মরে গিয়েছে আই ডোন্ট নো।বাংলাদেশে যাওয়ার কথা কোনোদিনও মাথায় আনিও নি তাই ইনফরমেশন নেয়ার মানে হয় না।যাদের শুধু ঘৃণা করা যায় তাদের ধরে হাত নোং*রা করার ইচ্ছা কোনো কালেই ছিলো না।

ইউভান ম’দের বোতলটা শেষ করে বালিতে ছুঁড়ে ফেললো। কাঁচ ভাঙার একটা তীক্ষ্ণ শব্দ সমুদ্রের গর্জনে মিলিয়ে গেলো।
​”কিন্তু বাংলাদেশে গিয়ে সব পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে গেলো। ঢাকা যাওয়ার জন্যে মনঃস্থির করলাম।বাংলাদেশর মাটিতে পা রাখার পর ভেতরের দগদগে ক্ষতগুলো পুনঃরায় তাজা হতে শুরু হলো। সেই নিস্তব্ধ যন্ত্রণা, সেই অবজ্ঞা…জেদ চেপে গেলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পাতাল থেকে সব খবর বের করবো। ইউভান রিক আলবার্ট কখনো গল্পের শেষ পাতা বাকি রাখে না!কোনোদিনও না।”

“যদি মারারি হতো রিক তুই এই কাজ দশবছর আগেই করতে পারতি তাই না,স্পাইডার গ্রুপে অভিষেক হওয়ার পরপরই???”

ইউভান তাচ্ছিল্যে হাসলো।
-” প্রয়োজন মনে করিনি তাই মা’রিনি!নোং’রা স্লাট ধরে হাত নোং’রা করার রিক আলবার্টের সাথে যায় না!”

“তারপর???”

শান্তা ক্লারার উত্তরের হিমশীতল বায়ু ইউভানের লালাটে পরে থাকা চুলগুলো নিমিষেই উড়িয়ে দিলো।পুরুষটার মুখাবয়বে নেই কোনো অনূভুতির ল্যাসমাত্র।
**
|অতীত,২০২৩|

চট্টগ্রামের সেই ঘটনার ঠিক দুই মাস পর। ইউভান আবার বাংলাদেশে পাঁ রাখলো।তবে এবার সমুদ্রের নোনা বাতাসে নয়, তাকে স্বাগত জানালো পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলির গন্ধ মাখা তপ্ত বাতাস।পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি গলির মোড়ে ইউভানের গাড়িটা যখন প্রায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, তখন সে স্টিয়ারিংয়ে সজোরে একটা ঘুষি বসালো। বাইরের রিকশার টুংটাং আর মানুষের চিৎকার তার স্নায়ুর ওপর দিয়ে যেনো করাত চালাচ্ছে।এতো কেচ-কেচানীর শব্দ!রাজধানীর যানজটের এমন বেহাল অবস্থা দেখে ইউভান মুখে শ-খানিক অকাট্য ভাষাই বেরিয়ে এলো।

“শালার ফা’কিং জ্যাম!এই নাটকের জ্যাম কি কোনোদিন শেষ হবে না? আমি কি এখানে রাস্তা মাপতে এসেছি নাকি? দেশটা চালায় কোন ড্যা’ন্ডি?দেশের সরকার কি কোনো মহিলা?ডাইনিং টেবিলে বসে দেশ চালানোর তা’ন্দুরি রেসিপি দেয় নাকি?? আর এদিকে পুরো শহর জ্যামে সেদ্ধ হচ্ছে!এতো গরম কেন বা’ল!…..ফ্রা”ই হয়ে গেলাম।”

ইউভান জানালার কাঁচটা সামান্য নামিয়ে বাইরের বিশৃঙ্খলার দিকে তাকিয়ে একটা বিশ্রী হাসি দিলো। তারপর আবার বলতে শুরু করলো–

“ধুলোবালি দিয়ে মেকআপ হয়ে যাবে! কী দারুণ ম্যানেজমেন্ট! ড্যা’ময়েইন সিউর দেশটা কোনো বিউটি পার্লারের মালকিন চালাচ্ছে!যাস্ট ফা*কিং রিডি’কুলাস!”

অতঃপর মার্সিডিজের পাশে থাকা এক রিকশাওয়ালাকে বিরক্তিস্বরে বলল-
“হুয়াট হেপেন্ড দ্যা’য়ার??”

রিকশাওয়ালা তৎক্ষনাৎ ইউভানের কথায় গলার গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে তাজ্জব বনে গেলো।
“কি হাপ্পেন??হাপ্পেন কই পামু মামু?? আপনে চাইলে ঐ যে সামনের গলিতে ভ্যান এর মধ্যে আলমগীর কাকার লুঙ্গি পাইয়া যাইবেন।”

ইউভানের মেজাজটা তড়তড় করে আরও সাত আসমান ছাড়িয়ে মহাকাশে পৌঁছে গেলো।ধপ্ করে উইন্ডোর গ্লাসটা লাগিয়ে দিলো।
-“ফা’ক অফ!বিডির রাজধানী সত্যিই একটা ওপেন-এয়ার মেন্টাল হসপিটাল।যারা থাকে এখানে সেই কীটগুলোও ম্যান্টাল।”

প্রায় দুঘন্টার জ্যাম শেষ করে ​ইউভান দাঁড়িয়ে আছে ‘শ্যাডো এম্পায়ার’-এর বিশাল লোহার গেটের সামনে।যেনো ধৈর্য পরীক্ষায় ফেইল হওয়া স্টুডেন্ট প্রথমবারের মতো বিডিতে এসে চরম লেভেলের পাস হয়ে গিয়েছে। এতো ধৈর্য নিয়ে গাড়িতে বসে কখনোই থাকতো না যদি এটা ডেনমার্ক হতো।

পুরান ঢাকার শ্যাডো এম্পায়ারটা দেশ স্বাধীনেরও আগে ইংরেজদের এক জমিদারের কাছ থেকে ইউভানের দাদা কিনে নিয়েছিলেন এই বিশালাকায় মহল। দুই যুগ ধরে এখানে মানুষের ছায়া পড়েনি। ইউভান পকেট থেকে সেই প্রাচীন চাবিটা বের করলো, যা সে এ্যাশ আলবার্টকে না জানিয়ে এক প্রকার চুরি করেই নিয়ে এসেছে। এ্যাশ জানলে রিককে কোনোদিন এই বিষাক্ত মাটির ত্রিসীমানায় আসতে দিতো না।​ভারী চাবিটা ঘোরাতেই এক বিকট ধাতব শব্দে সদর দরজা খুলে গেলো। ভেতরটা যেন এক অন্ধকার পাতালপুরী। ধুলোর আস্তরণ এত পুরু যে পায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সিলিং থেকে ঝুলে আছে পুরনো মাকড়সার জাল, আসবাবপত্রগুলো সাদা কাপড়ে ঢাকা, কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে ঘরের আনাচে-কানাচে। ভ্যাপসা গন্ধ আর চামচিকার ডানার ঝটপটানি শব্দ।
​ইউভান ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলো। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ক্রূর হাসি।

​পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ শ্যাডো এম্পায়ারের খোলস বদলে গেলো। কর্মীদের দিয়ে কাজ করানো হলো অত্যন্ত গোপনে। প্রাচীন কাঠামোর ভেতর বসানো হলো অত্যাধুনিক সিকিউরিটি সিস্টেম, সিসিটিভি আর লেজার প্রোটেকশন। মহলের নিচতলায় ধুলোবালি সরিয়ে গড়ে তোলা হলো এক গোপন অস্ত্রাগার এবং জিম। পুরনো আসবাব সরিয়ে জায়গা করে নিলো ইতালিয়ান মার্বেল আর দামি চামড়ার সোফা।জমিদার আমলের পুরনো বাড়ি রূপ নিলো বর্তমান সময়ের ডুপ্লেক্স আধুনিকতার সংমিশ্রণের এক নতুনত্বে।

​গভীর রাত। শ্যাডো এম্পায়ারের দোতলার সুসজ্জিত করিডরের শেষপ্রান্তে।রুমে নিস্তব্ধতা ভাঙছে কেবল এসির মৃদু শব্দপ। ইউভানের সামনে রাখা ল্যাপটপের নীল আলো তার ধারালো মুখাবয়বে এক ভৌতিক আভা তৈরি করেছে যেনো। কি-বোর্ডে আঙুল চালাতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো শিল্পপতি ইমরান চৌধুরীর বিস্তারিত সকল তথ্য।

​স্ক্রিনে একের পর এক ফাইল খুলছে:
​– রাজধানী ঢাকার শীর্ষ পাঁচ শিল্পপতির একজন। তূর্জ গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ-এর মালিক।
​–ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় বিশাল অট্টালিকা ‘তূর্জ হাউস’, তিনটি টেক্সটাইল মিল, দুটি রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট এবং বিদেশে অফশোর অ্যাকাউন্ট।
​– রাজনীতির উচ্চমহলে তার অবাধ বিচরণ। প্রশাসনের অনেক রাঘববোয়াল তার হাতের পুতুল।গুলশানের বিভিন্ন নাইটবারে ৫০-৮০%শেয়ার ও আছে তার নামে।
–​তার একমাত্র কন্যা, রোজ তূর্জ চৌধুরী।

​ইউভান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হুইস্কির গ্লাসে শেষ চুমুক দিলো।ইমরান চৌধুরীর মেয়ের নাম দেখে ঠোঁটের কোণে পৈশাচিকতা ফুটিয়ে হাসলো।মেয়ে হলো কবে!জোশ্ তো!……রাগে ক্ষোভে চোয়াল শক্ত করেই ল্যাপটপের আলোয় ইমরান চৌধুরীর হাসিমুখের ছবির দিকে তাকিয়ে সে বিড়বিড় করলো—
​”ঢাকায় দেখি নিজের সাম্রাজ্য ভালোই বড় করেছিস। ইমরান চৌধুরী, কিন্তু আফসোস ভিত্তিটা নড়বড়ে।এসব দখল নিতে রিক আলবার্টের ন্যানো সেকেন্ডও লাগবে না!নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমানোর সময় ফুরিয়ে এসেছে তোর।”

​হঠাৎ ইউভান ল্যাপটপটা সজোরে বন্ধ করে দিলো।পুরো রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেলো। অতঃপর ইউভান জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরের অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে পুরান ঢাকার ভাঙাচোরা ছাদগুলো। ইউভানের হাতে থাকা ছুরিটা তার নিজের বুড়ো আঙুলে হালকা করে ঘষলো সে। এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে আসতেই ইউভান সেটা জিভ্ দিয়ে চে’টে নিলো।অগ্নিধূসর চোখের মণি তখন এক পৈশাচিক উন্মা’দনায় কাঁপছে।


রাত বাড়ছে। গুলশানের অভিজাত তূর্জ হাউসের সুপরিসর বেলকনিতে একা বসে আছে রোজ। কানে ইয়ারফোন গোঁজা, গান শুনছে আর গুনগুন করে গান গাইছে।বাইরের বাগানে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূর থেকে আসা শহরের অস্পষ্ট কোলাহল তাকে আজ বড্ড বিষণ্ণ করে তুলেছে ।রাতের খাবার শেষ করে কিয়ঃৎক্ষণ পূর্বেই রুমে এসেছে।পুরো রুম পিংক ডেকোরেশনে সাজানো।একদম পরিপাটি করা।ইদানীং রোজের কিছুই ভালো লাগে না। বাবা তাকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু বাহিরের কোলাহল তার মাথায় তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। মনে হয়, জীবনের বিশাল একটা পাতা কেউ ছিঁড়ে নিয়ে গেছে, যার শূন্যস্থান কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। রোজ বরাবরই ছিলো একরোখা আর জেদি, কিন্তু দুর্ঘটনার পর সেই স্বভাব যেনো আরও উগ্র হয়ে উঠেছে। মানুষ দেখলেই এখন তার আরও বিরক্তি লাগে। সারাদিন অন্ধকার রুমে ফোন আর ল্যাপটপের নীল আলোয় ঘাপটি মেরে বসে থাকে।Chatgpt, Twitter, Instagram, C.ai,wattpad এসব নিয়েই পড়ে থাকে।
​হঠাৎ এক ঝলক হিমেল বাতাস বেলকনিতে আছড়ে পড়তেই রোজ উঠে দাঁড়ালো।হাতে একটা তেঁতুল চাট’নির খোসা।খাওয়া শেষ সেই কখন! খোসাটা ফেলে দিয়ে রুমে স্টাডি টেবিলের ওপর রাখা জিওগ্রাফি বইটা তাকে রাখা দরকার সেই ভেবে অগোছালো হাতে বইটা রাখতে গিয়েই ঘটে গেলো বিপত্তি। স্তূপীকৃত সব ক’টি বই হুড়মুড় করে মেঝেতে পড়ে গেলো।
​রোজ একবার বানুকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো। নিজেই নিচু হয়ে বইগুলো কুড়াতে শুরু করল সে। ঠিক তখনই একটা ডায়েরি থেকে খসে পড়লো সোনালি রঙের একটা খাম।খামটার উপরে সাল দেয়া ২০২১।

​কিসের খাম তা মনে করতে পারলো না রোজ।ভেতরে থাকা কাগজটি বের করতেই দেখলো একদম পরিচিত হাতের লেখা। নিজের লেখা দেখে সে থমকে গেলো। ‘এটা আমি লিখেছিলাম? কিন্তু কবে?’
​যা দেখে মনে হলো খামটা হয়-তোবা গন্তব্য অব্দি পৌঁছাতে পারে নি।লিখাগুলো এমন ছিলো যে-

​”আমি আপনাকে ভালোবাসি না রায়হান ভাই। ভালোবাসা আসলে কী তা আমি জানি না! তবে এটাও চাই না যে, আমার জন্যে পাগলামি করে আপনি নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিন। আন্টি আপনাকে কতটা ভালোবাসেন, তা তো জানেনই।অনেক তো পাগলামি করেছেন পিছু ছাড়লেন না আমার, এখন আপনার উচিৎ নিজের আর পরিবারের স্বপ্নগুলো পূরণ করা। দু’দিন পরেই আপনার আমেরিকার ফ্লাইট। আশা করবো, আপনি জীবনের নতুন এই পরিচ্ছেদটা খুব সুন্দর করে গুছিয়ে নেবেন।

​জানেন??, মানুষ জাতি তাদের মন বড়ই পরিবর্তনশীল। সময় আর স্রোত সবকিছু বদলে দেয়। তবুও, যদি আপনার মন কখনো পরিবর্তন না হয়।ভুলতে না পারেন আমায়।তবে ডাক্তার হয়ে ফিরে এসে আমার বাবার কাছে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে দাঁড়াবেন। আমার বাবা যা বলবেন, আমি তা হাসিমুখে মেনে নেব। কারণ বাবার সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সাধ্য আমার নেই।

~নিজেকে অযত্নে রাখবেন না!​নিজের খেয়াল রাখবেন। ভালো থাকবেন।খুব ভালো।~

হঠাৎ নিচ থেকে জোরে তার বাবার ডাক পড়ে যায়।হঠাৎ রাতে তাকে ডাকছে ভেবেই রোজ তড়িঘড়ি করে খামটা টেবিলের উপরেই রেখে ছুটে যায়।খামটা পড়ে থাকে টেবিলের কার্ণিশে।


রাতের প্রথম প্রহর। গুলশানের ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে হলুদ আলোয় ভিজে আছে পিচঢালা রাস্তা।​রাস্তার একপাশ দিয়ে হেঁটে আসছে এক দীর্ঘকায় ছায়া। পড়নে ব্ল্যাক ডেনিম জ্যাকেট, মাথায় ক্যাপ আর মুখ ঢাকা কালো মাস্কে। ইউভান। তার হাঁটার ধরণটা স্বাভাবিক মানুষের মতো নয় যেনো ক্ষুধার্ত নেকড়ে তার শিকারের গন্ধ পেয়ে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তার এক হাতে একটা দামী বিদেশি ব্র্যান্ডের ইলেকট্রিক সিগারেট। ডিভাইসের ডগা থেকে বেরিয়ে আসা নীলচে ধোঁয়া তার মাস্কের ওপর দিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে।

​ইউভানের মস্তিস্কে তখন ব্লু-প্রিন্ট আঁকা হয়ে গেছে। আজ রাতেই সে ইমরান চৌধুরীর সাথে হিসেব চুকিয়ে দেবে। এমন এক ‘বৈঠক’ হবে, যার শেষ পরিণতি কেবল ‘ইন্নালিল্লাহ’। তূর্জ হাউসের ম্যাপ তার নখদর্পণে। দোতলার ঠিক কোথায় ইমরান চৌধুরী নাক ডেকে ঘুমায়, তা সে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কয়েক ঘণ্টা আগেই মুখস্থ করে নিয়েছে।

​তূর্জ হাউসের বিশাল সীমানা প্রাচীরের সামনে এসে থামলো ইউভান। সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো তার আগেই হ্যাক করা। এক নিপুণ লাফে ইউভান দেয়াল টপকে চতুরতা সমেত ভেতরে প্রবেশ করলো। চারপাশ নিঝুম নিস্তব্ধতা। ইউভান পাইপ বেয়ে অত্যন্ত সাবলীলভাবে দোতলার সেই নির্দিষ্ট বেলকনির দিকে উঠতে লাগলো।

​ভারী বুটের নিঃশব্দ পদক্ষেপে ইউভান বেলকনির গ্রিল গলে ভেতরে পা রাখলো। কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা আগেই আধখোলা ছিলো।​কিন্তু ভেতরে ঢুকতেই ইউভানের ভ্রু কুঁচকে গেলো। রুমের পরিবেশটা কেমন যেনো অদ্ভুত। চারদিকে পারফিউমের উগ্র গন্ধ নেই, বরং আছে হালকা স্ট্রবেরি আর হিমেল বাতাসের এক মিষ্টি মিশ্রণ। পুরো রুমটা মৃদু গোলাপি আলোয় আচ্ছন্ন।

ইমরান চৌধুরী কি ইদানীং গোলাপি কম্ফোর্টারে শোয়া শুরু করেছে?

​ চাদরের ভাঁজে ইমরান চৌধুরী নয়, বরং শুয়ে আছে এক পরীসম তরুণী। এলোমেলো চুলগুলো বালিশে ছড়িয়ে আছে, আর তার ফর্সা লালচে আভার মুখে ভোরের শিশিরের মতো এক পবিত্র প্রশান্তি।ইউভানের অক্ষিপলের সামনে বহিঃরাগত চাঁদের আলোয় মেয়েটার মুখশ্রী এতোটা স্নিগ্ধ আর কোমল লাগলো যা কয়েকটা ব্যাঞ্জনধ্বনি আর স্বরধ্বনি দিয়ে প্রকাশ করা খুব কঠিন।

তারমানে ইউভান আগেই রোজের রুমেই ঢুকে পড়েছে!

আচমকা বেলকনির পর্দাগলে ঠান্ডা বায়ু ​টেবিলের ওপর রাখা সেই খোলা সোনালী খামটা বাতাসের ঝাপটায় ইউভানের পায়ের কাছে এসে পড়লো।ইউভান খামটা তুলে চোখ বুলালো তাতে।পরমুহূর্তেই কাগজটা দুমড়ে মুচড়ে বেলকনি দিয়ে ছুঁড়ে মারলো দূরে।

ইউভান নিচু হয়ে রোজের মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেলো।খুব কাছে। রোজের ওষ্ঠাধরের সামান্য কম্পন আর উষ্ণ নিঃশ্বাস ইউভানের মাস্কের ওপর আছড়ে পড়ছে।
​হঠাৎ রোজ ঘুমের ঘোরে কিছুটা নড়ে উঠতেই তার চোখের পাতা সামান্য আলগা হলো। ওই তো! আধবোজা চোখের সেই হানি-ব্রাউন মণি। ইউভানের ভেতর একটা হাতুড়ির ঘা পড়লো।এক নিমেষের জন্য তার খুনে মস্তিস্ক স্থবির হয়ে গেলো।এই হরিনী অক্ষিপল তো বোরকা পরিহিতা রমণীর মতো! ডেনমার্ক যাওয়ার পর ইউভান নিজের সিক্রেট রুমে এই নয়ন জোড়ার পেন্টিংও করেছিলো।মস্তিষ্কে হানা দিতো প্রতিনিয়ত।

সমীকরণ!

​ইউভানের ভেতরের পৈশাচিক আকাঙ্ক্ষাটা এবার অন্য পথে মোড় নিলো। সে ধীর হাতে রোজের উপরের সিল্কি কমফোর্টারটা নিচের দিকে টেনে সরিয়ে দিলো। রোজের শুভ্র বাঁ পাঁ টাও একি রকম!…ইউভান নিজের গ্লাভস পরা আঙুল দিয়ে সেই পায়ের অতিরিক্ত কনিষ্ঠা আঙুলে খুব আলতো করে স্পর্শ করলো। একটা শীতল শিহরণ রোজের শরীর বেয়ে যেনো ইউভানের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিলো।

​ইউভানের দৃষ্টি তখন কামুক আর হিংস্র।ইউভান আরও স্পষ্ট হতে চাইলো।

কলা পাতা রঙের শাড়ির ব্লাউজের ফাকে পিঠে তিনটে কালো তিলের কথা মনে পরতেই ইউভানের আঙুলগুলো রোজের কামিজের কলারের দিকে এগোতেই রুমের ভেতর এক তীব্র উত্তে*জনার পারদ চড়ে গেলো। ইউভানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। কাম আর ঘৃণা যখন একসাথে তার ধমনীতে টগবগ করে ফুটছে, তখন সে নিজেকে সামলে নেওয়াটা কঠিন মনে করলো। সে কি এখনই ছিঁড়ে খাবে এই কোমল শরীরটাকে? নাকি তার সাম্রাজ্য দখলের আগে এই তূর্জকন্যার ওপর চালাবে এক মানসিক টর্চার?ঘৃণা আর কামণার বেড়াজাল পড়লো অতৃপ্ত আত্মার মাঝে।

ইউভান নিচু হয়ে রোজের সংকির্ণে ঝুঁকলো কানের লতিতে ওষ্ঠ স্পর্শ করল না ঠিকই, কিন্তু তার তপ্ত নিঃশ্বাস রোজের গলায় এক মরণঘাতী শিহরণ জাগিয়ে তুললো। বাইরে তখন বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, আর ভেতরে এক পৈশাচিক নিস্তব্ধতা। ইউভান তার মাস্ক খুলে দিয়েই রোজের কানের কাছে মুখ নিয়ে তিব্র ঘৃণার যন্ত্রণায় ফিসফিস করে উঠলো, সেই স্বরে মিশে আছে বছরের পর বছর জমে থাকা তীব্র ঘৃণা।

​”এক নারী আবারো আমার সামনে ম’রতে চলে এসেছে!তাও ভিন্ন রূপে।ডার্ক রোজ ওহহহ নো!রোজ তূর্জ চৌধুরী।”

” তুই তাহলে সেদিন আমায় তোর রক্ষক ভেবেছিলি? তোর জন্য রক্ষক নই,ভক্ষক আমি! এতটা বিশ্বাস তো রিক আলবার্ট নিজের ছায়াকেও করে না!”

​ইউভানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠলো। সে নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে রোজের নরম ঠোঁটের ওপর একটা নিষ্ঠুর চাপ দিলো। রোজ ঘুমের ঘোরেই যন্ত্রণায় সামান্য কুঁচকে উঠলো, কিন্তু তার চেতনার জগৎ তখন অনেক দূরে।

​”বলেছিলাম না! বেঁচে থাকলে তোকে ধ্বংস করে ছাড়বো। তবে তুই যে চৌধুরীর র’ক্ত, তা তো আমার জানা ছিলো না। ই’টস ন’ট অ্যা কো-ইন্সিডেন্স.It’s your darkest destiny!”

​ইউভান তার কোমরের খাপ থেকে ভারী সাইলেন্সারযুক্ত রিভলবারটা বের করলো। বন্দুকের নলের শীতল স্পর্শ রোজের কপালে ঠেকিয়ে সে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার আঙুল ট্রিগারের ওপর। এক নিমিষেই শেষ করে দেওয়া যায় এই চৌধুরী বংশের শেষ প্রদীপকে। এক মুহূর্তের ট্রিগার চাপ, আর এই সুন্দর মুখটা নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়বে।

​রাত গড়িয়ে চলল। প্রথম প্রহর শেষ হয়ে দ্বিতীয়, তারপর শেষ প্রহর। ঘড়ির কাঁটার শব্দ যেনো ইউভানের প্রতিটি সেকেন্ডকে বিদ্রূপ করছে। এক ঘণ্টা… দুই ঘণ্টা… তিন ঘণ্টা। ইউভান একটুও নড়লো না। মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকল রোজের শিয়রে, ঠিক তার কপাল বরাবর তাক করা বন্দুকে।তবে একটা গুলিও বের করতে পারলো না।ট্রিগার প্রেস করতে পারলো না ইউভান।ততক্ষণাৎ হিংস্র পশুর মতো সাইকোপ্যাথিক সত্তায় উন্মাদ হয়ে রিভলবার নিজের মাথা চুলে ঘষতে লাগলো।পুরুষালী হাস্কি স্বরে বলল-

“Death is too merciful for you. I want to kill you every single day, in every single breath, until you beg for the end”

ইউভান রোজের পুরো রুম অদ্ভুতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।রোজের স্টাডি টেবিলের সামনে গিয়ে বসলো। চারদিকে বই আর খাতার এক অদ্ভুত সুবাস, কিন্তু ইউভানের লক্ষ্য অন্য কিছু। সে রোজের ল্যাপটপটা হাতে নিয়ে স্ক্রিন অন করতেই দেখলো কোনো পাসওয়ার্ড দেওয়া নেই।এতোটা অসতর্ক কেউ হয় কী করে!
​ইউভান মুহূর্তের মধ্যে ল্যাপটপটি হ্যাক করে তার নিজের ফোনের সাথে সম্পূর্ণ কানেক্ট করে নিলো। এখন থেকে রোজের ল্যাপটপের প্রতিটি ফাইল, তার প্রতিটি মুভমেন্ট এমনকি তার সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্ত অ্যাকাউন্ট ইউভানের হাতের মুঠোয়। রোজ জানলোই না, তার ডিজিটাল জগতের সমস্ত চাবিকাঠি এখন এক দয়াহীন শিকারির হাতে।
​হঠাৎ ল্যাপটপের ওয়ালপেপারের দিকে নজর পড়তেই ইউভান থমকে গেলো। একটা ওয়াইন রেড স্পোর্টস কারের ছবি স্ক্রিন জুড়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
​”Car lover girl! Interesting…!”

ভোরের আলো দিগন্তে আছড়ে পরার আগেই সেদিন ইউভান নিজের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা ভেদ করে তূর্জ হাউজ ত্যাগ করে তবে তার পরদিন ইউভানকে ভোলচরে যেতে হয় তবে যাওয়ার আগের ইউভান রোজ তূর্জ চৌধুরী সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সকল ইনফরমেশন বের করে। এক তিল পরিমাণ তথ্যেও বাদ রাখলো না।তথ্যের এক বিশাল অরণ্য সে সাজিয়ে তুলল তার ডেরায়।স্টক করতে শুরু করলো।আর সবচেয়ে বড় টোপ ফেলে গেলো গভীর রাতে আবার গেলো তূর্জ হাউসে রোজের রুমের ফুলদানি হতে শুরু করে ওয়াশরুমের কেবিনেটে,বেনিটির কার্ণিশে নিজের স্পাই হিডেন ক্যামেরা ফিট করে গেলো।রোজ কোনোদিনও জানতেও পারলো না তার রুমে তাকে প্রতিনিয়ত একজন স্টক করেই চলছে।”A Devil Stalker”
**
ইউভানের এই দুই বছরের অপেক্ষার পেছনে ছিলো এক বিষাক্ত আভিজাত্য আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক সুনিপুণ ‘মাস্টারপ্ল্যান’।কিভাবে তিলে তিলে শেষ করা যায় তার দম্ভ।ইউভান জানতো, তূর্জ হাউসের দেয়াল টপকে রোজকে তুলে আনা রিক আলবার্টের জন্য মাত্র কয়েক মিনিটের কাজ। কিন্তু তাতে কেবল প্রতিশোধ ঘৃণা আর ক্ষোভ মিশে থাকতো , বিজয় আসত না। ইউভান তো চেয়েছিলো ‘টোটাল অ্যানিহিলেশন’

যত সময়ের বহমান হতে লাগলো ইউভানের অক্ষিপলে সেই পৈশাচিক উম্মা’দনা আরও প্রখর হলো। আন্ডারওয়ার্ল্ড মিশনে থেকেও রোজকে হান্ট করতো প্রতিনিয়ত।আলবার্ট ম্যানশনের নিজের গুপ্ত রুমে যেতোই রোজকে দেখতে। বাংলাদেশে রাখা স্পাই এর মাধ্যেমে রোজের ছবি কালেক্ট করে সাজালো পুরো দেয়াল জুড়ে।সর্বশেষ ছবিটা ছিলো নীল শাড়ি পড়া।রোজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের ফ্যায়ারওয়েলের।যেটাতে নিপুন হাতে রেড মার্ক করলো ইউভান।

পরিকল্পনা অনুযায়ী সবগুলো অফশোর অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করলো।তূর্জ সাম্রাজ্যের পতনের কাউন্টডাউন শুরু হোলো। দীর্ঘকার পর ইউভান আবার ঢাকা যাবে।

ইউভান নিজের গলার ক্রস লকেটটা ছিঁড়ে ফেললো।জাত কূল বিসর্জন দিয়ে নিজের মায়ের ধর্ম সাথে ইউভান রিক আলবার্টের জায়গায় ইউভান রিক চৌধুরীতে পদার্পণ করলো।ধর্মীয় সকল রীতিনীতি মেনে।

পাঠ করলো পবিত্র কালিমা।
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ…

এই পবিত্র শব্দগুলো যখন এক ঘৃণায় মত্ত মানবের ঠোঁট দিয়ে বেরিয়ে আসছিলো,যেনো পৃথিবীর সমস্ত ক্ল্যাশও কম্পিভূত হলো। ইউভান ধর্ম পরিবর্তন করলো স্রষ্টারই এক সৃষ্টিকে ন*রকযন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। রোজ তূর্জ চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে বড় ‘কালবৈশাখী’ হয়ে ওঠার জন্য সে নিজেকে এই নিষিদ্ধ রূপান্তরের আগুনে পুড়িয়ে ফেললো।

তূর্জ হাউসের প্রতিটি সিকিউরিটি সিস্টেম শাটডাউন করা হলো। ইমরান চৌধুরীর শেষ তুরুপের তাসটাও এখন ইউভানের কব্জায়।ইউভানের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ক্রূর হাসি।ছিনিয়ে নেয়ার ইউভান খুব ভালো করে জানে তবে সে চাইলো ইমরান চৌধুরী যেনো স্ব-ইচ্ছায় নিজের কন্যাকে ইউভানের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়।

রোজের চোখ দুটো যখন ইউভানকে দেখবে, তখন সে ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না যে এই মানুষটাই দিনের পর দিন তার প্রতিটা নিশ্বাসের হিসাব রেখেছে।


চৌধুরি গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের সিক্সটি-নাইনথ ফ্লোর। কাঁচের দেয়াল ভেদ করে ঢাকার ধূসর আকাশটা আজ বড্ড নিস্প্রাণ লাগছে। বিশাল ক্যাবিনেটের ভেতর এসির হিমশীতল বাতাস বইছে, কিন্তু পরিবেশটা যেনো তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ঠান্ডা।
​ইমরান চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছেন। পরনে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি, কপালে চিন্তার ভাঁজ আর ঘাম। গত চব্বিশ ঘণ্টায় তার সাজানো সাম্রাজ্যে ভূমিকম্প হয়ে গেছে। অফশোর অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ, শেয়ার বাজারে ধস, আর রহস্যময় এক ‘ইনভেস্টর’ তার সবকটি প্রজেক্ট টেক-ওভার করে নিয়েছে।তার বাড়ির দলিলপত্র ও গায়েব।

​ক্যাবিনেটের দরজায় দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ডদের আজ দেখা গেলো না। ইমরান চৌধুরী বিরক্তিতে গজগজ করতে করতে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন।

​”হোয়াট ইজ গোয়িং অন! আমার পারমিশন ছাড়া কে ভেতরে ঢু—”

​কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি। নিজের বিশাল লেদার রিভলভিং চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো।
​চেয়ারটিতে বসে আছে এক দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী পুরুষ। পরনে ইতালিয়ান ব্ল্যাক স্যুট, ভেতরে স্লেট রঙের শার্ট।

ইউভান টেবিলের ওপর দুই পা তুলে দিয়ে পরম আয়েশে বসে আছে। এক হাতে দামী কিউবান সিগার, যার ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে ক্যাবিনেটের সিলিংয়ে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে।

​ইমরান চৌধুরী কয়েক সেকেন্ড থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন।
​”কে? আমার চেয়ারে এভাবে বসে থাকার সাহস হলো কিভাবে?”

ইউভান ব্ল্যাক স্যুটটা ঠিক করে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। তার দীর্ঘ শরীরটা যখন ইমরান চৌধুরীর সামনে মূর্ত হলো,সে এক পা এক পা করে এগোলো ইমরান চৌধুরীর দিকে।ইমরান চৌধুরীর চোখে সামনে অবহয়ব টা আবছা পরিচিত মনে হলো।কোথায় দেখেছে দেখেছে।

​ইউভানের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ক্রূর হাসি। সে তার পকেট থেকে একটা ফোল্ডার বের করে টেবিলের ওপর ছুড়ে মারলো।​ইমরান চৌধুরী নামটা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।

“কে তুমি????কে?মুখটা চেনা মনে হচ্ছে।”

​ইউভান আরও এক ধাপ এগিয়ে এলো। ইমরান চৌধুরীর খুব কাছে এসে তার ঘাড়ের কাছে তপ্ত নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বললো—
“ইশশশশশশ!ইশশশ!ইউভান রিক আলবার্টকে তো চিনিস??নাকি রুশান আলবার্ট?? নাকি তোর ওয়ান এন্ড ওনলি সিস্টার ইভেলিনা তূর্জ চৌধুরী তাকে??

​ইউভান তার পকেট থেকে একটা আইপ্যাড বের করে রোজের একটা লাইভ ফুটেজ দেখালো। রোজ তখন তার রুমে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছে। ইমরান চৌধুরী শিউরে উঠলেন।
​”ইউ….ইউভান তুমি!আর আমার মে…য়ে! তুমি কেনো এসেছো????…এদেশে কেনো এসেছো???”

​ইউভান এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল নরকের প্রতিধ্বনি। সে ইমরান চৌধুরীর পাঞ্জাবির কলারটা খামচে ধরে নিজের চোখের খুব কাছে নিয়ে এলো।
​”হ্যাঁ আমি, আমাকে চেনার জন্যে আপনাকে আরও কিছুক্ষণ সময় দেবো। তবে মনে রাখবেন ইমরান চৌধুরী, কালকের সূর্য আপনার জেলখানায় উঠতে পারে, অথবা…..আপনার মেয়ের কবরের উপর!অথবা…..

তারপর রোজের ছবির দিকে তাকিয়ে ক্রূর হেসে বললো “অথবা আপনি চাইলে, আপনাকে দুটো অপশান দিতে পারি……..

হয় নিজের আর নিজের মেয়ের কবর খোঁড়ার জন্যে প্রস্তুুত হন।

নাহলে আপনার মেয়ে রোজ’-কে আমার হাতে সঁপে দিয়ে এই সাম্রাজ্য ফেরত নিন। চয়েস ইজ ইয়োরস, ফাদার-ইন-ল!”

ইমরান চৌধুরী আতঙ্কে নীল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন
“হুয়াট!কোনোদিনও না।তাও তোমার কাছে?? রুশান আলবার্টের ছেলের কাছে আমি আমার মেয়ে কখনোই দিবো না।ভয় দেখিও না ইউভান।সম্পর্ক ভুলে যেতে পারো না তুমি।”

ইউভান বজ্রাঘাতের মতো হামলে পড়ে ইমরান চৌধুরীর কপালে বন্দুক তাক করলো-
“সম্পর্ক??রিক আলবার্টের কাছে না কোনো সম্পর্কের মূল্যে কোনোদিনও ছিলো আর না আছে আর না থাকবে।কি বললেন মেয়েকে দিবেন না আমার কাছে???কেনো দেবেন না???আমি কোন দিক থেকে খারাপ বলুন???”

ইউভান হাড়হিম করা এক হুঙ্কার দিয়ে উঠল। তার চোখের মণি তখন এক উন্মাদের মতো কাঁপছে।
“একেবারে মুখ ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবো।আপনার প্রোপার্টির বদলেই তো আপনার মেয়েকে চাইছি।আপনার মেয়ের কোনো যোগ্যতা আছে রিক আলবার্টকে পাওয়ার বলুন???বলুন????নষ্টা মহিলার নষ্টা ভা’ইঝি।আমার তো মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় রোজ আপনার মেয়ে তো???

আপনার ঐ বউ কি যেনো নাম- সুলতানা দীপ্তী শাহ!
ঐ ধান্দাবাজ মহিলার সাথে তো কোনো বিশ্বাস নেই।যেই মহিলা টাকার জন্যে নিজের ননদের স্বামীর বেডে যেতে পারে তার পক্ষে কোনো কিছুই অসম্ভব না।না জানি কতো পুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছে!… ছিহ্ঃ! ছিহ্ঃ! ছিহ্ঃ! “

“কি যাতা কথা বলছো ইউভান। মুখ বন্ধ করো।”

ইউভান এক মুহূর্ত থামল না। ঘৃণার থুতু ছিটানোর মতো করে সে বলতে লাগলো,
“কেনো কেনো???ভাগ্যে ভালো মহিলা আগে ভাগেই ইন্না-লিল্লাহ হয়ে গিয়েছে না-হলে আমার হাতেই মরতো।একটা নষ্ট বংশের মেয়েকে স্ব ইচ্ছায় চাইলাম।তাতে এতো তেজ দেখাচ্ছেন???শান্ত হোন।আমি চাইলে আপনাকে আর আপনার মেয়েকে মাটিতে গেঁথে দিতে পারি তবে তা করছি না।আপনার মেয়েকে চাই আমার।শুনতে পেয়েছেন???

আপনার মেয়েকে চাই আমার!চাই মানে চাই।আর কোনো কথা হবে না!”

“রোজ তোমার সাথে কখনোই যাবে না।”

“ফাক!শালী চাক বা না চাক হু ফাকিং কেয়ারস।রিক আলবার্ট জানে কীভাবে নিজের শিকারকে খাঁচায় ভরতে হয়।”

যা বলছি কান খোলে শোনে রাখুন।আমি যা চাই তা হবে।নিজের মেয়েকে আমার সম্পর্কে একটা শব্দ বলার চেষ্টাও করবেন না।আপনার আর আমার মধ্যেকার ডিলের কথা যেনো রোজ তূর্জ চৌধুরীর কানে না যায়।মাইন্ড ইট।

কি চাইছো তুমি???

ইউভান তার কোট পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে টেবিলের ওপর সজোরে আছড়ে মারলো।
“এটাতে আপনার মেয়ের সাইন নিয়ে নিবেন।তবে যেনো না জানতে পারে।দু’দিন পর এসে নিয়ে যাবো সারাজীবনের জন্যে। তারপর থেকে রোজের উপর আপনার আর কোনো অধিকার থাকবে না।”

ইমরান চৌধুরী কাঁপা হাতে কাগজটা তুলে নিলেন।
“কি এটা??”

“রেজিস্টার পেপার।”

“কিহ! কি যাতা কথা বলছো।”

“কোল ডাউন।কোল ডাউন। পেপারে আমার নামটা খুব সুন্দর করে লিখা আছে পড়ে নিন।”

“ইমরান চৌধুরী ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন।তার কপালে ঘাম জমে উঠেছে। “
“তুমি আসলে চাইছো টা কি বাবা??”

“আপনার মেয়েকে!……………যন্ত্রণার সাগরে চু’বাতে।”
“আপনার মেয়েকে চাই!……….বাসর করতে!”
“আপনার মেয়েকে চাই!…………চুমু খেতে!”

“দেখুন আপনার থেকে কয়েকগুন বেশি সম্পত্তি আমার আছে।কি নেই আমার???”

“সেগুলোও নিশ্চয়ই তোমার বাবার মতো নারী পাচার, অবৈধ অস্ত্র আর ড্রা’গ সাপ্লাই দিয়ে???”

“তা আপনার গুলো কি??আপনার মেয়ে জানে তো তার বাবার নাইটবারগুলোতে প্রতি রাতে কী হয়? আপনি নিজে সেখানে গিয়ে কী কী কু*কীর্তি করেন, সেগুলো ফাঁস করে দেবো?”

“ইউভান!”

“রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন “ফাদার-ইন-ল”।”

ইউভান এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি দিয়ে আবার বললো, “আর শোনোন!… তিশাকে বিয়ে করুন!”

“কীহ!”

“হ্যাঁ!”

“সমাজে আমার একটা ইমেজ আছে ইউভান!পলিটিক্স ক্যারিয়ার আছে আমার!নিজের মেয়ের বয়সী একটা মেয়েকে বিয়ে করতে বলছো??”

“আচ্ছা তাই??হ্যাঁ! আপনার মেয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড তো! তাকেই বিয়ে করুন। আপনার পলিটিক্স ক্যারিয়ার আর ইমেজের ভয় পাচ্ছেন? নাইটবারের ভিডিও ফুটেজগুলো আমার কাছে আছে। ওগুলো যদি লিক করে দিই, সমাজ তো আপনাকে জ্যান্ত পোড়াবে। সেখানে গিয়ে রাত কাটাতে পারলে নিজের মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করতেও আপনার অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।”

​ইউভান সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কোটটা ঠিক করলো। দরজার দিকে এগোতে এগোতে শেষবারের মতো ফিরে তাকালো।
“আমি হারামি হতে পারি, কিন্তু মানুষ হিসেবে এখনো পবিত্র! তাই আপনাকে এতগুলো অপশন দিচ্ছি। এমন ব্যবস্থা করুন যেন আপনার মেয়ের এই রিক ছাড়া পৃথিবীতে আর কোথাও ঠাঁই না মেলে। কেমন? সি ইউ ইন টু ডেইজ!”
“​ইউভানের চলে যাওয়ার শব্দে পুরো কক্ষটি এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেলো।”


ডেনমার্কের আলবার্ট ম্যানশনে ইউভানের গোপন কক্ষে মাঝখানে রাখা বিশাল এলইডি মনিটরের নীলচে আলো ইউভানের পাথুরে মুখে এক অতিপ্রাকৃত আভা তৈরি করেছে। ইউভান তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, হাতে রেড ওয়াইনের গ্লাস। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে লাইভ ফুটেজটির ওপর।​মনিটরে দেখা যাচ্ছে তূর্জ হাউসের সেই পিঙ্ক ডেকোরেশনের রুমটা ইমরান চৌধুরী তিনি রোজের সামনে ইউভানের দেয়া পেপারটা এগিয়ে দিলেন। রোজ কোনো কিছু না বুঝেই, বাবার ওপর অগাধ বিশ্বাস নিয়ে কলমটা হাতে নিলো।রুমটা অন্ধকার শুধু ল্যাম্পলাইটের টিমটিমে হলদেটে আলো।
​ইউভান মনিটরের দিকে ঝুঁকে এলো। তার শ্বাস-প্রশ্বাস এখন উত্তেজনায় দ্রুততর। রোজ যখন আলতো করে নিজের নামটা সেই পেপারে সই করলো, ইউভানের ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক বিজয়ের হাসি ফুটে উঠলো। শিকার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে খাঁচায় বন্দি। নিজের অজান্তেই রোজ তার জীবনটা লিখে দিলো এক উন্মাদের নামে।
​রোজের সেই সই করার মুহূর্তটি দেখে ইউভান গ্লাসের শেষ চুমুকটুকু গলায় ঢেলে দিলো।বিড়বিড় করলো-
​”লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিউল আজিম!”

“little Dark Rose, the countdown is over. Welcome to my hell.”
**
|বর্তমান|

ইউভানের হাঁটার ভঙ্গিতে এক অবিন্যস্ত আভিজাত্য, যেনো সে এই পৃথিবীর ধূলিকণাগুলোকেও তুচ্ছজ্ঞান করছে।​দামিয়ান দু পা পিছিয়ে থেকে ইউভানের এই আত্মধ্বংসী রূপ দেখছে সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিদ্রূপের সুরে বলে উঠলো-

​”মোর‍্যাল অফ দ্য স্টোরি–ভাইয়া থেকে ছাইয়া হওয়ার জার্নিটা মোটেও সহজ ছিল না! অ্যাম আই রাইট রিক? শালার জিন্দেগী! না আছে একটা সিস্টার, আর না করতে পারলাম বিয়ে। একবারেও কপালে জুটলো না, আর দু-বার বিয়ে তো আমার কাছে বিলাসিতা!”

​ইউভানের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। রেড ওয়াইনের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে সে তার কোমর থেকে ভারী রিভলভারটা বের করে সমুদ্রের অসীম নীল জলরাশির দিকে পয়েন্ট-আপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
​”শাট আপ দামিয়ান! ক্লাবে চল!”

​দামিয়ান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে ইউভানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ভারি গলায় বলল, “লাস্ট একটা কথা বলি বন্ধু! আর কত? এবার তো থাম। এভাবে নিজের গলায় বিষ ঢালতে থাকলে প্রতিশোধ নেওয়ার আগে নিজেই তো ওপারে চলে যাবি। এবার অন্তত এই মদের বোতলটাকে রেহাই দে বাপ্। থুক্কু নানা! তোর বউ তো আবার সম্পর্কে আমার নানি লাগে, ভুলেই গিয়েছিলাম।”

“নানি লাগে নানি। রোজ নামটাও যেনো তোর মুখে না আসে।গলায় চিপ খেতে না চাইলে নানি ডাকবি।”

“মহব্বতের সরবত খাবি রিক??”

“তুই খা।”

“তোকে খাওয়াবো।দেখবি চোখে মুখে শুধু ভালোবাসা দেখবি। আই নো তোর হার্ট এখন বিট করে ধুক পুক! ধুকপুক! “

​ইউভান আর কোনো উত্তর দিল না। হঠাৎ যেন এক অসহ্য ক্লান্তি তার শরীর আর মস্তিষ্ককে গ্রাস করে নিলো। সে বালুর ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো। চোখের সামনে অনন্ত আকাশ, যেখানে কোনো নক্ষত্র নেই ঠিক তার জীবনের মতোই অন্ধকার।আনমনে বিড়বিড় করতে লাগলো ইউভান – “চেয়েছিলাম মেয়েটার জীবনটা মরুভূমি করে দিতে, কিন্তু উল্টো সে আমার মরুভূমি জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে। আমি না পারি ওকে আগলে রাখতে, না পারি ছেড়ে দিতে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ, এক নারী হাত ইউভানের সিল্কি চুলের ফাঁকে নিজের আঙুলগুলো আলতো করে ঢুকিয়ে দিলো।

চলবে??

শান্তি?? নিন অর্ধেক গল্পে এসে ইউভানের শাশুড়ীর নাম রিভিল হলো।সেই খুশিতে রিয়েক্ট না দিয়ে কেউ যাবেন না।রেসপন্স না আসলে সবগুলোকে ইন্না-লিল্লাহ করে দিমু🔪!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply