Love_or_Hate
|#পর্ব২১|
ইভেলিনা_তূর্জ
🚫কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
🚫প্রাপ্ত বয়স্ক ও মুক্তমনস্কদের জন্যে।
Time and tied wait for none- প্রবাদ বাক্যেটা যে চিরন্তন সত্যে।সময় কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিশীল নয় সে নির্দয়ভাবে এগিয়ে চলে।
এই যে দেখতে দেখতে কতগুলো দিন পার হয়ে গিয়েছে। একটা নতুন বছরের সূচনা। একটা নতুন সময় লগ্ন।অষ্টাদশীর জন্মদিনের পর কেটে গিয়েছে প্রায় সপ্তাখানিক।সাথে পুরো বছরের সমাপ্তি ঘটেছে নিঃশ্বেসে।এত’দিনে ইউভান নামক কালো ছায়া রোজের জীবনে না পড়ার ফলে রোজ একটু সন্তুষ্টিতে নিঃশ্বাস নিতে পারছে।একটু বেশি। একটা নতুন পরিবার।যেখানে নেই কোনো র’ক্তের টান তাও কতো আপন মনে হয় রোজের। আদ্রিয়ানের কথা মস্তিষ্কে হানা দিতেই রোজ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে।বয়সের তারতম্য অনেক হলেও এখন সে আদ্রিয়ানকে বন্ধু মনে করে।লোকটা ভালো।বিশ্বাসের যোগ্য। হ্যাঁ রোজ বিশ্বাস করে আদ্রিয়ানকে, ভরসা করতে পারে।কিন্তুু,
সেদিনের পর থেকে রোজের সাথে আদ্রিয়ানের কথা তো দূরের থাক দেখাই কম হতো।জন্মদিনের সারপ্রাইজের পর সকালে রোজ আদ্রিয়ানের রুমে নিজেকে আবিষ্কার করে, কিছুটা অনুশোচনায় ভুগেছিলো,যে তার জন্যে লোকটা অন্যে রুমে ঘুমোতে হয়েছিলো।তবে ফুলের বিষয়টা নিয়ে রোজ কথা বলতে পারে নি আদ্রিয়ানের দেখা মিলতো না ,কারণ সাপ্তাহখানিক আদ্রিয়ান প্যান্টহাউসে ছিলোই না।কোথায় ছিলো তা জানা নেই।দু’দিন এসেছিলো প্যান্টহাউসে,তবে আদ্রিয়ান রাতের শেষ প্রহরে আসতো আর এসেই দেখতো রোজ ঘুমে বিভোর।
সকাল সকাল রোজের কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গেছে ফোনের এলার্মে।রোজের একটা বদ অভ্যাস হলো সে এলার্ম দিবে তো দিবে একবার না দু’বারও না পাঁচমিনিট পরপর।ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রোজ ব্যানিটির সামনের বড় আয়নাটায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখছে।হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকোতে শুকোতে নিজেকে ঘুড়ে ঘুড়ে দেখতে থাকে। ঠিক আগের মতো।ফুরফুরা মেজাজের রোজ তূর্জ চৌধুরী। নিজেকে নতুন করে গুছানোতে বিভোর রোজ।পরমুহূর্তেই আয়নার দিকে খানিক ঝুকলো,এক আঙুল মিররের গ্লাসে স্পর্শ করে নিজেকেই নিজে ফ্লাইং কি’স দিয়ে মৃদুস্বরে হাসলো,
-“হ্যালো মিস্…..
বাক্যেটা সম্পূর্ণ করতে গিয়ে আচমকা চোখজোড়া বন্ধ করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস টানলো রোজ।মিস্ না মিসেস্ এর বেড়াজাল এ আবদ্ধ রোজ কোনো কিছুই সংযুক্ত না করে ব’লে,
“-হ্যালো রোজ।হ্যাপি নিউ ইয়ার।”-” নিজেই নিজেকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে রুম থেকে বের হলো।নতুন বছরের সকালের আলোটা তখনো পুরোপুরি শক্ত হয়নি। প্যান্টহাউসের শীতের ভেতরে নরম রোদের রেখা মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।রোজ রুম থেকে বেরোতেই ডাইনিং টেবিলের দিক থেকে পরিচিত কোলাহল কানে আসে।আনান চেয়ারটায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। এক পা ভাঁজ করা, আরেকটা বাতাসে দোল খাচ্ছে। গালে আজও খাবারের দাগ, হাতে খেলনা গাড়ি।মিরাব টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে, এক হাতে প্লেট, আরেক হাতে তার ধৈর্য।
আনান রোজকে দেখেই চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে উঠলো।
—”রোজজজজজজজ!!! ইউ আর ভেরি ব্যাড।তোমার ডোরে অনেক বার নক করে এসেছি খোলোনি কেনো??”
রোজ হেসে চেয়ার টেনে বসলো।
—”মিস্টার ড্রামা কিং,আমি ওয়াশরুমে ছিলাম।
আনান নাক কুঁচকে বললো,
—”আমি ড্রামা করি না। আমি ইমোশনাল ছেলে,তোমাকে না পেলে কেঁদেই দিতাম।
মিরাব চোখ উল্টে দিলো।
—”ইমোশনাল না, তুই ভয়ংকর বদমাইশ আনান।
আনান সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে ফেটে পড়লো—
—”মিমি! রোজ শুনছে! আমার ইমেজ নষ্ট করো না।”
রোজ হেসে আনানের দিকে ঝুঁকে পড়লো।
—”ইমেজ? তুই আবার কবে থেকে ইমেজ সচেতন হলি?”
আনান গম্ভীর মুখ করে বললো—
—”নতুন বছর। নিউ রেজোলিউশন। আমি এখন থেকে একদম জেন্টালম্যান হয়ে গিয়েছি।”
এই কথা শুনে মিরাব আর রোজ একসাথে হেসে ফেললো।রোজ টেবিলের উপর ঝুঁকে আলতো করে আনানের কপালে টোকা দিলো।
—”হ্যাপি নিউ ইয়ার মিস্টার ড্রামা কিং।”
আনান হঠাৎ চুপ করে গেলো। কয়েক সেকেন্ড পর খুব সিরিয়াস গলায় বললো।
—”লাভ ইউ রোজজজজ!ইট’স অ্যা বেস্ট নিউ ইয়ার ইন মাই লাইফ!!”
রোজের বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে উঠলো।আনান রোজের গলা জড়িয়ে ধরতেই রোজ আনানকে জড়িয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো।
—”লাভ ইউ সো সো মাচচচচচ্!ড্রামা কিং।”
মিরাব চোখ সরু করে চোখের চশমাটা ঠিক করলো।
“-আচ্ছা! আচ্ছা!আমিও যে এখানে আছি তা মনে হয় আপনারা ভুলেই গিয়েছেন।ফাইন আজ বিকেলে আমি না-হয় একাই নিউ ইয়ার ফেস্টিভ্যাল থেকে ঘুরে আসবো।
মিরাব মুখ বাকিয়ে আপেল কাটতে লাগলো।ফেস্টিভ্যাল এর কথা শুনতেই রোজ কৌতূহল প্রবণ হয়ে উঠলো।রোজ কিছু বলার আগেই কথা কাটিয়ে আনান বললো।
-” নোহহহহহ!মিমি!আমিও যাবো। ইস্তাম্বুলে।”
রোজ আনানকে নিজের উরুর উপর বসিয়ে পিছন থেকে জরিয়ে ধরে মিরাবকে ব’লে উঠলো।
-“আপি!নিউ ইয়ারে কি শহরে অনেক বড় ফেস্টিভ্যাল হয়??আমরা কি সেখানে যাবো আজ???”
“-যাবো এড’শ বললো তোমাদের নিয়ে যেতে, আনান বেবি আমরা প্রতিবছর যাই।”
-“আনানের পাপা?উনি কোথায়?উনি কি যাবেন না??”
-“ডুন্ট নো!আমি তো রিকুয়েষ্ট করেছি যেতে কয়েকবার কিছুই তো বললো না।তুমি বলে দেখতে পারো।আমার কথা শুনেছে কবে সে।আমি কি কেউ হই তার!হাহ!”
রোজ আলতো হাতে আনানের সোনালী সিল্কি চুলে হাত বুলাতে বুলাতে উপরের করিডরের দিকে নিষ্পলক তাকালো।
-“আনানের পাপা কি রাতে বাড়ি ফিরেছে??”
-“হুম!”
রোজ আনানকে হাত ধরে এগিয়ে আসে আদ্রিয়ানের রুমের দিকে। দরজাটা আধখোলা অস্বাভাবিকভাবে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাথরুমের ভেতর থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে আদ্রিয়ান। ন’গ্ন নয়, অথচ সম্পূর্ণ অসতর্ক কোমরের নিচে সাদা তোয়ালে জড়ানো, ভেজা চুল থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে কাঁধ, বুক, পেটের পেশিবহুল রেখা বেয়ে। তার শরীর থেকে উষ্ণ পানির বাষ্পর গন্ধ মিলে একটা অদ্ভুত স্থিরতা তৈরি করে।
রোজের চোখ এক সেকেন্ডের বেশি স্থির থাকে না। লজ্জায়, বিস্ময়ে, অপ্রস্তুততায় সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে দেয়, রুমের ভেতরে পা না বাড়িয়ে দেয়ালের দিকে ফিরে দাঁড়ায়।
আর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আনান কপালে হাত ঠেকিয়ে নাটকীয়ভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিৎকার করে ওঠে,
—পাপা! ডোর লক করতে কি ভুলে যাও নাকি আজকাল? আমার প্রেস্টিজ একেবারে পাংচার করে দিলে! ছিঃ! তোমার লজ্জা হওয়া উচিত!
আনানের কণ্ঠে বিরক্তি, কিন্তু চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। আদ্রিয়ান তখনো রোজকে খেয়াল করেনি। সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আনানের সামনে ঝুঁকে দাঁড়ায়। শরীর থেকে এখনো জল গড়িয়ে পড়ছে, তোয়ালের প্রান্ত ভিজে ভারী হয়ে আছে। শান্ত অথচ ক্লান্ত গলায় বলে ওঠে,
—বস্, অনেক পাকাপাকা কথা হয়ে গেছে। শাওয়ার নিতে চলুন।
আনান চোখ কুঁচকে মুখ বাঁকিয়ে বলে,
—চিন্তা করো না পাপা! তোমাকে একটা মেয়ে এভাবে দেখে নিয়েছে।এই ভাবনাতেই আমি ট্রমাটাইজড! উফ্! ওহ্ নো!
—”চুপ আনান।”-রোজ আনানের দিকে চোখ বড়বড় করে তাকায়।
ঠিক তখনই রোজের কন্ঠস্বর শুনতেই মাথা ঘুরিয়ে দরজার বাইরে তাকায় আদ্রিয়ান । দেয়ালের পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রোজকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে বিস্ময়ের ছায়া পড়ে। কোনো কথা না বলে, কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েএক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা নিয়ে সে সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের দিকে ঘুরে যায়।রোজ তখনো দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে।আনানকে নিজের ঘরে নিয়ে আদ্রিয়ান তাড়াহুড়ো করে একটা সাদা টি-শার্ট আর গাঢ় রঙের ট্রাউজার গায়ে জড়িয়ে নেয়। ভেজা চুল থেকে তখনও ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে মেঝেতে, রোজ ঠিক তখনই সরে যেতে উদ্যত হয়, চোখ নামিয়ে,
কিন্তু দরজার ফ্রেম ছুঁয়ে পা বাড়াতেই আদ্রিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠ তাকে থামিয়ে দেয়।
“ম্যাডাম, দাঁড়ান।”
রোজ থমকে দাঁড়ায়। কণ্ঠে স্বাভাবিকতা রাখার চেষ্টা করে-
“সরি”… সরি,সরি,আমার নক করা উচিত ছিল।”
আদ্রিয়ান ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একচিলতে হাসি টেনে বলে,
-“আচ্ছা তাই? নোটেড। নতুন বছরের প্রথম ভুল।বাই দ্যা ওয়ে, হ্যাপি নিউ ইয়ার, রেড রোজ।
“জ্বি আপনাকেও। একটু থেমে, দ্বিধা পেরিয়ে রোজ প্রশ্নটা করে ফেলে,
-“আপনি কি আজ আমাদের সঙ্গে যাবেন?”
আদ্রিয়ান ঘরের ভেতরে ফিরে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘড়িটা হাতে তোলে। স্ট্র্যাপ পরাতে পরাতে অনাসক্ত স্বরে বলে—
-“মেবি না। কেন?”
রোজ “ওহ” বলে দরজার দিকে এক পা বাড়িয়েও থেমে যায়। হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে—
“আপনার, লাল গোলাপ কি খুব পছন্দ?”
ঘড়ির ক্লিপটা ঠিক করতে করতে আদ্রিয়ান আয়নার ভেতর তাকায় নিজের দিকে না, যেনো কথাটার ভেতরের অর্থের দিকে। গলার স্বর শান্ত, কিন্তু স্পষ্ট।
“I only like roses. No matter what colour.”
রোজ কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর হালকা মাথা নেড়ে বলে,
-“ধন্যবাদ দিবো না। কিছু জানতেও চাই না। প্রয়োজনবোধ করি না।”
আদ্রিয়ান এবার ঘুরে তাকায়। দৃষ্টি স্থির, গভীর।
“কিসের জন্য?”
রোজ অদ্ভুত একটা জোড়ালো হাসির রেখা টানে শুষ্ক হওয়া ঠোঁটে,
-“পৃথিবীতে একটা সুন্দরতম ব্যপার কি জানেন??মেনে নেয়া।হয়তো-বা এই মেনে নেয়ার মধ্যেই আছে সব অশান্তির শেষ সীমা!আমি বুঝেছি সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।সব কষ্টের ব্যাখ্যা থাকে না।তেমনি আমাদের জীবনে কিছু ঘটনা শুধু ঘটে যা হওয়ার ছিলো।সব কিছুর অর্থ খোঁজা এখন বৃথা মনে হয়।
আদ্রিয়ান একচিলতে হাসলো।তবে কোনো প্রতিউত্তর করলো না।ততক্ষণাৎ কপালো দু আঙুল স্লাইড করতে করতে বলে,
-” বক্সটা খুলে দেখেছিলে?
রোজ মাথা নাড়ে।
-“না।”
-“কেন?”
আদ্রিয়ান একটু থেমে আবার বলে
-“জানি, হয়তো খুব ভালো লাগেনি। তবুও একবার খুলে দেখার অনুরোধ।
রোজ অবাক হয়ে তাকায়।
-“এভাবে রিকোয়েস্ট করছেন? কী আছে ওটায়?”
আদ্রিয়ান মৃদু হাসে।
“-নিজেই দেখে নিও।পড়বে। পড়লে খুশি হবো। এইটুকুই।”
|রাশিয়া,ভোলচর দ্বীপ|
ভোলচর দ্বীপের আকাশে সূর্য উঠলেও আলো পৌঁছায় না। বরফ আর কুয়াশার চাদরে মোড়া এই নিষ্ঠুর ভূমিতে জীবন মানে কেবল টিকে থাকার যুদ্ধ। ঠিক এই অমানবিক পরিবেশেই ইউভান দাঁড়িয়ে আছে।
“কালো গোলাপ আমার ভীষণ পছন্দ।”
“People think black roses symbolize death.
They’re wrong.
it symbolize what survives after killing everything soft”
কালো গ্লাভসে মোড়ানো ভয়ানক নিশানাবাজের হাতে একটা কালো রঙের গোলাপ।সিম্বলিক অর্থে যা খুবই রে’য়ার।অস্বাভাবিক, ভয়ংকর, নীরব হিংস্রতার প্রতীক।তবে এই ভলচর দ্বীপের জঙ্গলে কালো গোলাপ কই পেলো ইউভান।সম্পূর্ণ কালো গোলাপ কি হয়?কালো গোলাপ প্রকৃতিতে দুর্লভ প্রায় অসম্ভব। সম্পূর্ণ কালো বলে কিছু নেই, বড়জোর ডার্ক পার্পল হয়। তবে মাফিয়া বস্ ইউভানের হাতে এ যেনো সদ্য ফোটা কালো রঙের গোলাপ। দ্যা র’য়াল বিল্ডিং এর পিছনের কিছু কিছু জায়গায় আনাচে-কানাচে সাদা গোলাপ ফুটে ছিলো, আর ইউভান সেই সাদা গোলাপেই কালো রঙের ডাই স্পে ব্যবহার করে সাদা গোলাপকে কালো গোলাপে রূপ দিয়েছে । ধীরে ধীরে গোলাপের পাপড়িগুলো ছুঁলো ইউভান,যেনো পরীক্ষা করে দেখছে শক্তি কোথায়। ইউভানের প্রতিটি স্পর্শেই মনে হয় পৃথিবীর র*ক্ত স্তব্ধ হয়ে গেছে। তার হাতের আন্দোলন এক রূপক, যা শুধুমাত্র তার নিজের নিয়ন্ত্রণের মতো নিখুঁত এবং নির্মম। ইউভান চোখে অদ্ভুত নেশা, ভয়ঙ্কর হাসির রেখা যেন প্রাণকে কেঁটে দিচ্ছে বারবার। তার দেহে শক্তি প্রবাহিত হচ্ছে, প্রতিটি মাং/সপেশি। হাত বাড়িয়ে গোলাপের পাপড়ি ছিঁড়তে লাগলো একটা একটা করে। ইউভানের ফেলা প্রতিটা নিঃশ্বাসকে যেনো বাতাসও ভয় পাচ্ছে।
ক্রোধের তাড়নায় কাঁপছে ইউভান।ফর্সা মুখশ্রীতে তাজা রক্তের নিদারুণ উপস্থিতি। মেঝেতে রক্তাক্ত পড়ে আছে ইউভানের নিজের একজন স্পাই। দামিয়ান হাঁটু ভাঁজ করে স্পাই ফ্রেডরিকের পার্লস চ্যাক করতে লাগলো।না নিঃস্বাসের ছিটেফোঁটাও নেই।
-“মেরে ফেললি?”-দামিয়ান ব্যতিগ্রস্থ হয়ে ইউভানের পানে চক্ষু স্থির রেখে শুধালো।ততক্ষাৎ ইউভান দামিয়ানের কথা পাঁশ কাটিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করলো-
-“মরে গিয়েছে?? “
-“তুই তো মেরে ফেললি”!
ইউভান র*ক্তবর্ণ ধারণ করা মণিকোঠায় আবদ্ধ চোখজোড়া নিক্ষেপ করলো প্রাণহীণ দেহটার দিকে,
-“মরলো কেন?এতো দূর্বল হলে কীভাবে হবে?আমি তো শুধু নতুন বছরের শুরুতে ছুরির ধার চে’ক করছিলাম।ধার আছে কি না!
ইউভানের দেহ ক্রোধে প্রতিটা অঙ্গ উত্তেজনা শীর্ষে অবস্থান করছে। রক্তে ভিজে চ্যাট চ্যাট হওয়া ছুড়িটার ফ্রেডরিকের শার্টের অংশে মুছে সা’ফ করে নিলো।অন্তর ঠিক কতোটা নিষ্ঠুর নির্দয় তা সে চাক্ষুষ অবলোকন করেছে।ইউভান মানুষত্যকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে ছু মেরে তীক্ষ্ণ ধারযুক্ত ছুড়িটা দামিয়ানে সংকির্পণে ছুঁড়ে মেরে আউড়ালো-
-“গলাটা কেটে দে!তীব্র টানে ছিঁড়ে দে জিহ্বাটা”
-“ফ্রেডরিক অনেক বিশ্বস্ত স্পাই ছিলো রিক!ওকে মা’রা কি ঠিক হলো??”
-“আরেএএ আমি মা’রলাম কই!শালা নিজেই মরে’ছে।কোনো কাজেরি না স্যাচ্ অ্যা ফা*কার”
-“গলার শিড়া কে’টে দিয়েছিস, আর বলছিস মারি*স নি!”
দামিয়ান ছুড়িড়া ফেলে র*ক্ত সাগরে পরিপূর্ণ দেহটা ডিঙিয়ে ইউভানের মুখোমুখি দাঁড়ালো।হাতের আই প্যাডটা ইউভানের সামনে ধরলো।
-“তুই এটা দেখেছিস??নে’ট দুনিয়ায় চারদিকে এখন তোকে নিয়ে নিউজ্!তোর এখন সম্পূর্ণভাবে হিড্যান থাকতে হবে।!”
ইউভান আই প্যাডটা হাতে নিলো।অসীম অন্ধকারে ছেয়ে যাওয়া ইউভানের ভয়ানক হাসি প্রতিফলিতো হলো কামরার হালকা টিউবলাইটের রশ্মিতে-
-“সো হুয়াট???উত্তেজ*নাময় পরিবেশকে কি করে দ্বিগুন করতে হয় তা আমি খুব ভালো করে জানি।”
-“নিশির রাতের ডিল টা কি আজ রাতের? নিউ ইয়ার প্ল্যান ছিলো??”
ইউভান পড়ণের শার্ট খুলতে লাগলো।ছয়টি শক্ত পোলা ফোলা ভাঁজ দৃশ্যমাণ হতেই নৈঃশব্দে উঠে দাঁড়িয়ে নিকোটিনের ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে অনূভুতিহীন হাসির রেখা টেনে বলল,
-“তাতে আমার কি??
“Women trafficking” [নারীপাচার] এ আমার হাত ছিলো কবে??আমি তো শুধু ডিলে সাইন করেছি ব্যাস!
ইউভান নিজের হাতের তর্জুনী দিয়ে কালো গোলাপের পাঁপড়ি স্লাইড করতে লাগলো।নাকের ডগায় এনে জোড়ালো নিঃশ্বাস টানলো যেনো গোলাপের চেয়ে সুভাস ছড়ানো কোনো কিছু এ পৃথিবীতে নেই,অথচ গোলাপের সুভাস যে বড়ই ঠুংকো।
-“আমার তো শুধু ব্ল্যাক মা’নি দরকার। দ্যা’টস ইট।কালো নোটের ঘ্রাণ আরও ভয়ংকর,যেমন ভয়ানক ঘ্রাণ এই রোজের,ডার্ক রোজ!।
“Legal Or illegal, money is always money!”
কথাটা শেষ করেই স্বগোতক্তিতে হাঁটা ধরলো ইউভান। তৎক্ষণাৎ নিজের ভারী পায়ের লম্বা কদম থামিয়ে গায়ে একটা কালো কোর্ট জড়িয়ে নিলো।পিছন থেকে দামিয়ান ভারী কন্ঠে শুধালো-
“-কোথায় যাচ্ছিস”!
ইউভানের গলদেশে ফ্রেডরিকের তাজা র*ক্ত লেপ্টে আছে, তবে ইউভান তা মোছার প্রয়োজনবোধ না করে দাঁতে দাঁত পিষে ধাঁরালো গলায় ব’লে,
—-” প্রতিটা মুহূর্তের ইনফরমেশন আমার চাই, অবজারভেশনে রাখ,যতক্ষণ আমি না ফিরছি।লোকেশন ট্রেকিংয়ে গোলমাল হলে, যাস্ট ইনফর্ম মি!”
—-“কার??রোজের?
—-“না তোর নানীর”!
ইউভান রুম ত্যাগ করতেই দামিয়ান দু ঠোঁট ফাঁক হয়ে একটা বড়সড় শুকনো ঢুক গিলে বিড়বিড় করে উঠে-
—“হুয়াট!লাইক সিরিয়াসলি! “-চক্ষুদ্বয় বন্ধ করে কপাল স্লাইড করতে থাকে দামিয়ান।চেয়ার টেনে মনিটরের সামনে বসলো দামিয়ান।ঘাড় ঘুড়িয়ে বিষ্ময়কর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ফ্রেডরিকের দেহটার দিকে,তারপর নিজের গলায় হাত রেখে অবচেতন মনে আওড়ালো-
“—-দামিয়ান রেএএএ এই নানা নানির চক্করে পড়ে কবে না জানি তোর গর্দান টাও যায়।ওহহহ গড সেইভ মি!”
দ্যা রয়াল বিল্ডিংয়ের মাটির নিচের স্তরের সিঁড়িগুলো আলোহীন। ধাপে ধাপে নামতে নামতে শব্দ বদলে যায় উপরে যেখানে হাওয়া আর বরফের শব্দ, নিচে সেখানে শুধু নিঃশ্বাসের প্রতিধ্বনি। প্রতিটা স্তর যেন একেকটা গোপন শপথ, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।
শেষ স্তরে পৌঁছাতেই বিশাল এক দরজা খুলে যায়।
ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায় এটা কোনো সাধারণ কক্ষ নয়।পাথরের তৈরি উঁচু ছাদ, দেয়ালজুড়ে পুরনো রাশিয়ান নকশা, অদ্ভুত সব প্রতীক খোদাই করা। মাঝখানে কালো মার্বেলের মেঝে, আর ঠিক তার কেন্দ্রস্থলে বিশাল এক দাবার কাঠের টেবিল মানুষের বুকসমান উঁচু।সাদা আর কালো গুটিগুলো নিখুঁতভাবে সাজানো, ইউভান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে একটুখানি থেমে যায়।
তারপর।
একটা ভারী চেয়ারে বসে পড়ে।এক পা তুলে আরেক পায়ের উপর রাখে।দাবার গুটিতে হাত রেখে একটা চাল দেয়।
ঠিক তখনই।
দেয়ালের ছায়া থেকে একটা অবয়ব আলাদা হয়ে আসে।লোকটা দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।দু’হাত পেছনে নেওয়া।পিছন দিকে ফিরে ইউভানের দিকে ফিরলো না।ছায়ামানবটার অবয়ব স্পষ্ট হলো না।তার অর্ধ শরীর আলোতে বাকি অংশটুকু অন্ধকারে। ইউভানকে চুপ থাকতে দেখে শান্ত কন্ঠস্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।
——“এতগুলো দিন হলো ভোলচরে এসেছো,তবে আজ হঠাৎ আমার কাছে কি মনে করে এলে??
ইউভান চোখ তোলে না।আরেকটা গুটির চাল দেয়।ভিতরের ক্রোধের আগুন ক্রমশো বৃদ্ধি পাচ্ছে। অত্যধিক ক্রোধে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ইউভান,গুটিতে রাখা হাতটা কাঁপছে, তবে দাঁতে দাঁত পিষে ক্ষোভগুলো নিয়ন্ত্রণের বৃথা চেষ্টা চালিয়ে এক ধ্যাণে দবা খেলায় মগ্ন ইউভান,খানিক্ষন পর ঘাড়ে ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ছায়ামানবটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
——-” আমাকে কি এতটাই বোকা ভাবেন?আমার সম্পর্কে কি ধারণা নেই আপনার??
——–“নিজের গড়াজিনিসের উপর ধারণা পাগল ব্যাতিত সকলের থাকে।কি বলতে এসেছো, সেটা বলো।
এই মুহূর্তে ইউভানের শরীরের ভেতর কিছু একটা ভেঙে যায়।তার চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।
হাতের আঙুল দাবার গুটির উপর শক্ত হয়ে চেপে বসে।হঠাৎ করে সে দাঁড়িয়ে পড়ে।শক্ত হাতের চাপের প্রয়োগে একটা একটা গুটি মেঝেতে পড়তে থাকে।দাবার বোর্ডটা ছুঁড়ে মারে পাশের দেয়ালে।ক্রোধান্বিতো ইউভান হাত চুলকোতে থাকে সাথে নেই কোনো রিভলবার কোনো প্রাণঘাতি অস্ত্র।কারণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে তাই ভেবে এসেছে সম্পূর্ণ খালি হাতে।গলার শিড়াগুলো ততক্ষণে ফুলে উঠেছে, সিংহের ন্যায় গর্জন তুলে ব’লে,
—-“I know. I know everything”
ইউভান ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্য হাসির রেখা টেনে শান্ত হলো।চেয়ার টেনে আবার বসলো পায়ের উপর পাঁ তোলে।চেয়ারের হাতলে ডান হাত ভর দিয়ে ঘাড় কাত করে বলল,
—-“গ্র্যানির মার্ডারে আপনার হাত আছে তাই তো??
ইউভান বাঁকা হাসলো।চক্ষুদ্বয়ে নির্লিপ্ততা নির্জীবতা।
—“ভোলকভ নিজেকে খুব বেশি চালাক মনে করে,স্যাচ্ অ্যা ফাকিং বাস্টার্ড।আর আপনি ভোলকভকে খুব ভালো করে চিনেন তাই না??
কুত্তাগুলোর দৌড় শুধু ইউভানের পিঠপিছে ছুড়ি মারার, সামনে এসে হেডম দেখাতে আর পারবে না।
কক্ষটা হঠাৎ নিস্তব্ধ।ইউভানের কণ্ঠ কাঁপছে রাগে।
—–“আই সো’য়্যার আমার সন্দেহ যদি সঠিক হয় না, জেনে রাখুন সব কিছু জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিবো।
ছায়ামানবের দিক থেকে উত্তর আসে ধীর, নির্লিপ্ত।
——–“ভলকভকে আমি নিজেও দেখিনি, রিক।”
ইউভান হেসে ওঠে।সে হাসি ভয়ানক।
——–“মিথ্যে, মিথ্যে, মিথ্যে!আমি কি হাওয়া খেয়ে বড় হয়েছি,নাকি ফি’ডার খাই???কেমন পরিস্থিতিতে এই রিক আলবার্ট বড় হয়েছে তা আপনার থেকে ভালো আর কে জানবে??”
আমাকে আরও শয়তানে পরিণত করবেন না!ধ্বংস হয়ে যাবে সব কিছু।
এক পা এগিয়ে আসে ইউভান।দু হাত মুষ্টিবদ্ধ।হাতের গিট এতোটাই শক্ত করে চেপে ধরা যে গিটগিলো সাদা হয়ে গিয়েছে।
——“ভোলকভের একজন আমাকে আক্রমণ করেছিলো হসপিটালে।সেটার খবর নিশ্চয়ই জানেন??
ইউভান কথা শেষ করার আগেই ছায়ামূর্তির কণ্ঠ কেটে আসে।যে এখনো একইভাবে স্থির।
——-“কে মরলো কে বাঁচলো তা নিয়ে বিচলিত কেনো হচ্ছো রিক।নিজের মধ্যো মনুষত্ব জাগিয়ে তুলার চেষ্টাও করো না।মায়া, দুর্বলতা এইসব ধ্বংসের বীজ।
ইউভানের শিৎকারে পুরো কামরা কেঁপে উঠে। ছায়া মানবের কথাটা ইউভান হজম করতে পারে নি।
——–“রিক অ্যালবার্টের মনে কারো জন্য মায়া জন্মায় না।আর না আছে কোনো দুর্বলতা নেই।এসব ইউ’জলেস ফা*কিং কথা আমার সামবে বলবেন না।নাহলে সম্পর্ক ভুলতে দু সেকেন্ড ও সময় লাগবে না।
—–“গ্রেট! এই তো নিজের ফর্মে চলে এসেছো।সম্পর্ক বলতে কিছু হয় না।এই দুনিয়াতে কেউ কারোর আপন না।”-কথা শেষ করার আগেই ছায়ামানবটা পাশ কাটিয়ে ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। পিছন থেকে জিনিসপত্র ভাংচুরের কান ফাটানো শব্দধ্বনি বাতাসে মিশ্রিতো হতে থাকে। একের পর এক দেয়ালের পেইন্টিং গুলো ইউভানের হাতের আঘাতে পাথুরে ফ্লোরে পড়তে থাকে।
|তুরস্ক,কারাহিসার|
গোধূলি বেলা।দিন আর রাতের মাঝখানের সেই ক্ষণিকের সময়। নতুন বছরের প্রথম শীত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।তবে কারাহিসারের তুলনায় ইস্তাম্বুলে শীতের তাপমাত্রা নিম্ন। শহরের দিকটায় তুষারপাতের পরিমাণও কম।যেহেতু রোজরা সবাই আজ নিউ ইয়ার ফেস্টিভ্যালে ইস্তাম্বুল শহরেই যাবে।তাই রোজ সেই কখন থেকে ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার জন্যে রেডি হচ্ছে।গাঢ় সমুদ্র নীল রঙা একটা শাড়ির আঁচল কাঁধ স্পর্শ করলো রোজের।মিরাব রোজকে একটা তুর্কি ট্রে’ডিশনাল জামা কিনে দিয়েছে। আজ ফেস্টিভ্যালে তুর্কীশ মেয়েরা এধরণের জামাই পড়বে তবে রোজ নিজেকে বাঙালি নারীদের মতো শাড়ীতে জড়িয়েছে।স্লিভলেস ব্লাউজ তার উপরের ফর্সা পিঠ অধিকাংশ নজরকাড়ার মতো।
নীল শাড়িতে রোজকে নীলাম্বরী সৌন্দর্যে ছেয়ে ফেলেছে। ব্লাউজের ফিতাটা মিরাব শক্ত করে বেঁধে দিচ্ছে বৌআকারে।
রোজ বেনিটির বিশাল মিররের দিকে মৃদু হেসে পোলাপি ঠোঁটজোড়ায় গাঢ় লাল লিপস্টিক দিতে দিতে ঘুড়ে দাঁড়িয়ে মিরাবের দিকে তাকিয়ে উচ্চশব্দে হেসে ফেললো।তবে হাসিটা যে জোরপূর্বক ছিলো তা মিরাবের বুঝতে বাকি রইলো না।তবে রোজকে আজ অপূর্ব সুন্দর লাগছে।মিরাব বেডের উপর বসে রোজের দিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, অবচেতন মনে ভাবতে লাগলো,মেয়েটা সত্যিই নজরকাড়ার মতো সুন্দর, যেকোনো পুরুষের মনে ঝড় তোলার মতো রুপ তার।ফর্সা গড়ণ তো তার ও তবে রোজের মুখখানা যে মায়ায় ভরপুর যা ক’জন নারীর বা থাকে।
“—-এভাবে কি দেখছো আপু…”রোজের হঠাৎ প্রশ্নক্তিতে মিরাবের ধ্যান ভাঙ্গলো।রোজ ততক্ষণে নিজের হাঁটুঅব্দী লম্বাচুল গুলো ঘাড়ের এক পাশে এনে কানে দুটো তাজা লাল গোলাপ গুঁজে নিয়েছে।মিরাব কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল,
—–” তুমি নজর লাগার মতো সুন্দর রোজ।ভাগ্যিস আমি ছেলে না।উফফ!”
মিরাব মুখে হাত রেখে মিটমিট করে হাসতে লাগলো।মিরাব ফর্মাল ড্রেস পড়তেই বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করে তাই আজও তার ব্যতিক্রম না।চুলগুলো বেশ্ বড় না হলেও সুন্দর করে গুছিয়ে পোনি’টেল করা।রোজ মিরাবের কথায় কিঞ্চিৎ হেসে উঠলেও চুপ হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বসে।মুখে বাঁকা হাসির রেখা প্রতিফলিতো হয় নীলাম্বরী রমণীর।
—-“আচ্ছা নারীর সৌন্দর্যে কি পুরুষ ধ্বংস হয়??”
রোজের হঠাৎ এমন কথায় মিরাব কিছুটা বিচলিত হলেও মৃদুস্বরে হাসলো।
“—–না!নারী সৌন্দর্যে পুরুষ ধ্বংস হয় না।অত্যোধিক সৌন্দর্যে ধ্বংস হয় নারী।পুরুষ তো ধ্বংস হয় নারীর মায়ায়।”
কথার মাঝে হঠাৎ রোজের রুমের বাতাস বেয়ে একটা চমৎকার কন্ঠস্বর ভেসে আসে।যেনো কেউ নিজের মনের মাধুর্য মিশিয়ে গলা ছেড়েছে।একটা পিয়ানুর শব্দ। টুংটাং শব্দের মাঝে একদল বাক্যের ঝাঁক-
পূর্নিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনীগন্ধায়।
রূপসাগরের পাড়ের পানে উদাসীমন দায়।
তোমার প্রজাপতির পাখায়,
আমার আকাশ চাওয়া মুগ্ধ চোখে
রঙিন -সপ্ন -মাখা
তোমার চাঁদের আলোয়,
মিলায় আমার দুঃখসুখের
সকল অবসান।
ভিনদেশের মাটিতে এমন বাংলা গানের শব্দে রোজ অবাক হলো।কন্ঠস্বর টা মিরাব চিনতে পারলো।ভারী পায়ে রুম থেকে বের হয়ে করিডরের সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ালো।রোজ ও শাড়ির আচলখানা সামলিয়ে এসে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো,নিচের ডাইনিং হলের এক কোণে আটপৌড়ে ধাচের পিয়ানুটার সামনে টোল টেনে বসা আদ্রিয়ান। সাদা সুভ্রূ রঙা পাঞ্জাবি গায়ে জড়িয়ে পিয়ানুতেএলোমেলো হাত চালিয়ে সুর তোলছে।পুরনো পিয়ানু।একটা ভারী চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছিলো পিয়ানো টাকে মিরাব।মূলত এটা তারই।আজ অনেক গুলো বছর ছুঁয়েও দেখা হয়নি।তবে আদ্রিয়ানকে এমন রূপে দেখে মিরাবের চোখে শান্তির ঢেউ খেলতে শুরু করে।আদ্রিয়ানের পরিবর্তনটাও বেশ্ নজরকাড়া মনে হচ্ছে তার।
এদিকে রোজ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে, আঁচল পিছলিয়ে পড়ে যাওয়ার ভয়ে আলতো পায়ে ধীর গতিতো নামছে।রোজের নজর পিয়ানোর উপর বসে থাকা আনানের দিকে।একদম রোজোর সাথে ম্যাচ্ করা সমুদ্র নীল রঙা শার্ট। জেন্টেলম্যানের মতো বসে বসে ওা দোলাচ্ছে। রোজ আদ্রিয়ানের পিছনে দাঁড়িয়ে মুখে হাত নিয়ে গলা খাঁকড়ানি দেয়।
—-“বাহ্!আপনি যাবেন তাহলে!নিজের ছেলের জন্যে এবার বিজিনেস’টা কমলো।”
পিছন থেকে মিরাব এসে আনানকে কোলে তুলে নিলো।নিজের হাতের ওয়াচ্ টায় টাইম থেকে চক্ষুদ্বয় কুঁচকিয়ে বললো।
-“আই থিংক হুই’য়ি আর লেইট গাইজ্”
বাক্যে শেষ করতেই মিরাব আনানকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে রোজও আনানের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকিয়ে যেতে থাকলো পিছু পিছু। রোজ প্যান্টহাউসের সদর দরজায় পাঁ ফেলার আগেই পিছন থেকে একটা পুরুষালীর শক্ত গলার স্বর ভেসে আসতেই রোজ পাঁ থামিয়ে ফেলে,গলার স্বরটা কেমন কাঁপন ধরানো অস্থির করা-
-“শাড়িটা পড়েছো তাহলে!”
রোজ পিছনে না তাকিয়ে জবাব দিলো।
-“খুব সুন্দর ।ধন্যবাদ দিয়ে ছুটো করতে চাচ্ছি না আপনাকে।”
আদ্রিয়ান যে নিজের মনপাজরের অভিব্যাক্তি প্রকাশে বড়ই কাঁচা তবে তার তিলকালো মণি জোড়া যে নীলাম্বরীতে আবিষ্ট হয়ে আছে।বিতৃষ্ণা হৃদয়কে শক্ত করে চেপে ধরে রাখার মতো যন্ত্রণা যে আর কিছু নেই।আদ্রিয়ান না চেয়েও বারবার একটা ভিনদেশীতে মত্ত হয়ে পড়ছে।নিজের কাছে অদ্ভুত ঠেকে।এমনটা হওয়ার কথা ছিলো না কোনো কালেই।নারী অনেক দেখেছে,নারীর মোহনীয় রূপ অনেক দেখেছে তবে কখনোতো এমনকরে মনের মনিকোঠায় বাস করা হৃদযন্ত্র কেঁপে উঠে নি।পুরো পৃথিবীটা আজ থেমে যাচ্ছে।সময়টা থেকে থাকুক এভাবে।আদ্রিয়ান কোনো কালেই নারীর মায়ায় পড়তে চায় নি,তবে এ কেমন আসক্তি বিরাজ করছে তার মাঝে। আদ্রিয়ান পাঞ্জাবির পকেটে লুকিয়ে ফেলে নিজের কাঁপন ধরা হাত গুলো।রোজের পিছনে এসে দাঁড়িয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে আওড়ালো।
—-“তুমি ঠিক চাঁদের মতো সুন্দর! দূর থেকেও মুগ্ধ করছো আমায় প্রতিনিয়তো।শুকতারা “
আদ্রিয়ানের বিড়বিড় করা কথাটা রোজের কানে ঠিকি পৌঁছালো। ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি টেনে ফিরলো মুখোমুখি হলো আদ্রিয়ান শাহের দিকে,
—–“আমি মুগ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি, আমি শুধু তিক্ততা বাড়াই।”
কাজলচেরা চোখদুটোর পানে দৃষ্টি রাখার সাহস হয়ে উঠছে না আদ্রিয়ানের, যেনো মুহূর্তেই উত্তাপ ছড়িয়ে জ্বলসে যাবে।বিভ্রম থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলো আদ্রিয়ান।
—-“তিক্ততা মাঝে শান্তি খুঁজে পেলে, পৃথিবীজুড়ে তিক্ততাই ছড়িয়ে পড়ুক।”
রোজ কোনো অভিব্যাক্তি প্রকাশ করলো না।যেনো নিজের মাঝে নেই।কিছু কিছু মানুষ জোরপূর্বক নিজের মাঝে কঠোরতার স্থান দিতে চায় রোজ তার ঝলন্ত প্রমাণ। হালকা ব্রাউনিশ টোনের শালটা কাঁধে আড়ষ্ট করে পুনরায় বললো।
—-“আপনি আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন!এটাও নিশ্চয়ই জানেন কলঙ্কিত জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি আমি।
নিজেকে অনেক কষ্টে বুঝাতে হয়।তবে একটা কথা কি জানেন চাইলেও সব ভুলা যায় না।তবে আমার এখন ব্যথা অনূভুত হয় না,দীর্ঘশ্বাসগুলো ধৈর্যের পরিণত হচ্ছে,এটাকে কি বলে জানি না হয়তোবা ধ্বংসের শেষ প্রান্ত।
আদ্রিয়ান এক পাঁ এগুলো।ভেতরের যেনো ঘূর্ণিঝড়ের লীলা খেলা ঘটছে বিপরীত পাশে দাঁড়ানো রমণীর মুখশ্রীর পানে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বলল,
—–“থাকুক না কলঙ্ক। আফসোস নেই!
চাঁদের গায়ে দাগ থাকলে কি সৌন্দর্য কমে!আমি না-হয় সেই দাগে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে ধ্বংস হলাম।”
রোজ মৃদু হাসলো।
—–“অভাগাকে মায়া দেখালে মরে যেতে হয়।”
—–“মরতে হয়??মারতে হয় না??”
রোজ এক পা পিছালো। সঙ্গোক্তি করে নিচুস্বরে বিড়বিড় করে একটা বাক্যে ছুঁড়ে শাড়ির আঁচল টেনে বড় বড় কদম ফেলে হেঁটে চলে যায়।
—-“মারতে পারবেন তো!”
আদ্রিয়ান ধীরে চোখ বন্ধ করলো।নিজেকে সামলাতে চাইলো।কিন্তু কিছু অনুভূতি এমন, যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না শুধু চেপে রাখা যায়, যতক্ষণ না বিস্ফোরণ ঘটে।পার্কিং ফ্লোরে ঠান্ডা কংক্রিটের গন্ধ নাকে এসে লাগলো।
আন্ডারগ্রাউন্ড লাইটগুলো সাদা আলো ছড়ালো।
কালো রঙের গাড়িটা লো, ভারী, নিরব ঠিক যেন তার মনেরই এক প্রতিরূপ।দরজাটা খুলে ভেতরে বসলো আদ্রিয়ান। গাড়ির ব্যাকসিটে রোজ আনান আর তার পাশের সিটে মিরাব।লুকিং গ্লাসে চোখ রেখে একবার রোজের দিকে দৃষ্টি ফেললো।
ইঞ্জিন স্টার্টের শব্দটা অস্বাভাবিক জোরে মনে হলো রোজের কানে।তবে রোজ ভাবলেশহীন চুপ মেরে বসে রইলো গাড়িতে।আদ্রিয়ান হাত দুটো স্টিয়ারিংয়ে রাখতেই বুঝলো আঙুলগুলো কাঁপছে।
সে হাসলো।হালকা, তিক্ত, আত্মবিদ্রূপে ভরা হাসি।
” একটা নারীর কথায় আদ্রিয়ান শাহ’র হাত কাঁপছে!কী হাস্যকর!
গাড়িটা ধীরে ধীরে পেন্টহাউস ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।
ভলচর দ্বীপটার ঘন জঙ্গলের মাঝে হওয়ায় তথাকথিত প্রায়সই বুনো নেকড়ে আর শৃগালের শব্দ হানা দেয়।এ হিডেন দ্বীপপুঞ্জে বিশেষ কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়াদের যাতায়াত।ইউভান এখন পর্যন্ত কোনো মাফিয়াদের সাথে কথার জালে জড়ায় নি।নিজের প্রয়োজন ব্যতীতো জেনো নিঃশ্বাসটা নিতেও কয়েকবার ভেবে নেয়।রয়াল বিল্ডিংয়ের পেছনে, লতাপাতা আর বুনো গুল্মে ঘেরা এক নিভৃত বাগান। মাঝখানে রাখা পুরনো এক সোফা।ইউভান সেটাতেই বসে আছে।হাতে অর্ধ খাওয়া সিগারেটের শলাকা টা ঠোঁটে পুড়ে ধোঁয়া ছেড়ে দেয় বা হাতের স্পর্শে থাকা আই প্যাডটাতে।চোখ দুটো উত্তাল জলোচ্ছ্বাসসেরা যেনো ক্লান্ত হচ্ছে না।তার নিস্প্রভ অক্ষি সেই আইপ্যাডের স্ক্রিনে ভাসমান এক জোড়া চক্ষুদ্বয়ের দিকে আবদ্ধ। ব্রাউনিশ চোখজোড়া পুরো প্যাডে ঝুম করা। ইউভান ছাড়া এ চক্ষু্দ্বয় কার কোন রমণীর তা চেনার কোনো উপায়ন্তর কারোর নেই।ইউভান সিগারেট ধোঁয়া ছুঁড়লো পুনরায়,কন্ঠটা স্বাভাবিক রেখে বিড়বিড় করলো-
—-“শাস্তিতো নিজেকেই দিয়ে যাচ্ছি আমি। ঘৃণিতো বস্তুু কাছে টানার আকাঙ্ক্ষা যদি শাস্তিযোগ্যে হয়,আমি রিক প্রতিনিয়ত অপরাধ করে যাচ্ছি।”
এক মুহূর্ত থেমে যায়।
চোখ ফেরায় না স্ক্রিন থেকে।
—“এত কিছুর পরেও শান্তি পাচ্ছি না আমি।…”
ইউভান স্ক্রিনে হাত রাখলো।ধোঁয়ার আড়ালে তার মুখটা আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
—–“বিশ্বযদ্ধ দেখি নি।জানি না হিরোশিমা।ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়াবহতা।তবে এই নয়নযুগল আমাকে সর্বহারা করার ক্ষমতা রাখে,আমি নিজে নিজের ধ্বংস ডেকে আনতে পারি না।”
ইউভানের চোখদুটোতে মুহূর্তেই লালাভ রেখা প্রতিফলিত হয়েছে। ক্রোধের তাড়না আকাশ ছুঁই ছুঁই।ইউভান নিজের হাতের আই প্যাডটাই আঁচড়ে ফেলে ভেজা মাটিতে। প্যাডটা গড়িয়ে গিয়ে এক জোড়া পদতলে অবতরণ হয়।ক্যাটরিনা হাত গুটিয়ে কপালে চারভাজ করে তাকিয়ে আছে।ভেজা মাটির উপর আইপ্যাডটা তুলে নেওয়ার মুহূর্তে ক্যাটরিনার আঙুলে কাদা লেগে যায়। সে তাতে ভ্রুক্ষেপও করে না। ধীরে আইপ্যাড টা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তবে ততক্ষণে সেটার স্ক্রিন অফ হয়ে গিয়েছে।
চারপাশের জঙ্গল তখন আরও ঘন হয়ে উঠেছে।নেকড়ের ডাক শোনা যাচ্ছে শুধু।রুশ কণ্যা ক্যাটরিনা কয়েক কদম এগিয়ে আসে।
ইউভান তখনো নড়েনি।তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মাফিয়া বস্ টা যে কারোর উপস্থিতি খুব সহজে বুঝতে পারে।তাই তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলো না।
তুষারপাতের মাঝে বাতাসে তার শার্টের কলার নড়ছে, চোয়ালের পেশিগুলো এখনো শক্ত হয়ে আছে। চোখের লালাভ রেখা এখনো মুছে যায়নি।বরং আরও গভীর, আরও হিংস্র। ক্যাটরিনা ইউভানের সামনে দাড়ালো। আইপ্যাডটা সোফার উপর রাখতে রাখতে ঠোঁট বাকায়।
—–“কে ডিজগাস্টিং রিক??”
ইউভান একটু ঝুঁকলো,ইউভানের হঠাৎ কাছে আসায় ক্যাটরিনা ঠোঁট কামড়ে হাসলো।কিঞ্চিৎ দূরত্বের মাঝে ইউভান ব্রু কুচকিয়ে ত্যাক্তস্বরে হুঙ্কার দেয়-
—-“ইউ বা*স্টার্ড!!! “
আচমকা একটা গুলির আওয়াজ বিস্ফোরিত হয়ে মাটিঘাত করে।ক্যাটরিনা ভাবে তার পাঁয়ে গুলি করে দিয়েছে ইউভান। তবে বুলেট ক্যাটরিনার পাঁ স্পর্শ করেনি বুঝে উঠার আগেই ঘন কুয়াশার ধোঁয়ার মাঝে মিলিয়ে যায় ইউভান। অবচেতন মনে যেতে যেতে আওড়ালো,
—-“সা’ম ওয়ান হু ট্রাইয়িং টু ফা*কিং ডিস্ট্রোয় মি!
“লক্ষ্যভ্রষ্ঠ হচ্ছি।এটা যন্ত্রনাদায়ক বড্ড!”
ইউভানকে যেতে দেখে ক্যাটরিনা উচ্চশব্দে চিল্লিয়ে উঠে –
–“উফফ রিককককক!”
রাগে গজগজ করতে করতে ক্যাটরিনা ইউভানের পদাঘাত অনুকরণ করতে করতে সেদিকেই যেতে থাকে।
|ইস্তান্বুল,তুরস্ক |
সন্ধ্যা নেমেছে ইস্তাম্বুল শহরের বুকে, কিন্তু অন্ধকার নামেনি।এই শহরে আজ রাত নামলেও আলো নেভে নি শুধু রঙ বদলিয়েছে।
বসফরাসের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা হাওয়া আজ অন্যরকম। তাতে শীতের কাঁপুনি আছে, আবার উৎসবের উন্মা’দনাও মিশে আছে। আকাশের গায়ে ঝুলে থাকা হাজারো ফেইরি লাইট যেনো তারা হয়ে নামতে চায় শহরের রাস্তায়। নীল, সোনালি, রক্তিম আলো একসাথে মিশে ইস্তাম্বুলকে আজ কোনো নগর নয় একটা জীবন্ত স্বপ্নে পরিণত করেছে।
রাস্তাঘাটে মানুষের ঢল।
হাসি, কোলাহল, ভাষার মিশ্রণ তুর্কি, ইংরেজি, আরবী সব একাকার হয়ে গেছে। চারপাশে তুর্কি মিউজিকের তালে তালে হৃদস্পন্দন দুলে ওঠে। দূরে কোনো ব্যান্ড লাইভ পারফর্ম করছে, ঢোলের শব্দ আর ইলেকট্রিক বিট একসাথে শহরের বুকে ধাক্কা দিচ্ছে। বাতাসে ভাসছে ভাজা চেস্টনাট আর মিষ্টি লোকুমের গন্ধ।
বসফরাস ব্রিজটা আজ আলোয় মোড়া এক রাজকীয় সিংহাসন। প্রতিটা ফেইরি লাইট পানিতে প্রতিফলিত হয়ে আছে।
ব্রিজের ওপর মানুষের কোলাহুল একটু পর ফায়ারওয়ার্কস হবে।সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে আনান সমেত সকলে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজের উপর।কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে হঠাৎ আদ্রিয়ানের কাঁধে একটা শক্ত পুরুষালীর হাত স্পর্শ করতেই আদ্রিয়ান ঘুরে তাকায়, অচেনা কন্ঠধ্বনি কানে আসতেই রোজও তাকায়।রোজের তর্জনী শক্ত করে ধরে রেখেছে আনান।আদ্রিয়ান লোকটাকে চিনতে পেরে হ্যান্ড’শেক করলো।লোকটা আদ্রিয়ানের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী নাম আতেশ কারাহান। ইস্তান্বুলের নামকরা ব্যবসায়ী, সামাজিক বৃত্তে পরিচিত মুখ। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বি লাভ’ড ওয়াইফি মিসেস আতেশ কারাহান,সুঠাম গড়ন, পরিপাটি সাজ, চোখে অভিজাত ভদ্রতার দীপ্তি।আতেশের দৃষ্টি স্বাভাবিকভাবেই সরে গেল আদ্রিয়ানের পাশের নারীর দিকে।নীল শাড়িতে মোড়া রোজ আলোর ভিড়ে থেকেও আলাদা হয়ে থাকা এক অস্তিত্ব। ফায়ারওয়ার্কসের আগমুহূর্তের আলো তার চোখে-মুখে এমনভাবে পড়ছে যে, তাকে শহরের আর পাঁচটা নারীর ভিড়ে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
মিসেস কারাহানের ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠলো। সেই হাসিতে কোনো প্রশ্ন নেই, আছে কেবল নিশ্চিত ধারণা।তিনি এক পা এগিয়ে এসে রোজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
——-“ওহ! ইউ মাস্ট বি হিজ ওয়াইফ। ইউ লুক ডিফরেন্ট। সো প্রিটি।”
শব্দগুলো বাতাসে ভাসতেই রোজের আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে এলো। মুহূর্তের জন্য সে আদ্রিয়ানের দিকে তাকাতে চাইলো যেনো এই ভুল ভাঙানো তার দায়িত্ব নয়, আদ্রিয়ানের।
তবে আদ্রিয়ানকে চুপ থাকতে দেখে রোজ ঠোঁট খুলতেই আদ্রিয়ানের শীতল হাতটা দৃঢ়ভাবে রোজের কব্জিতে এসে থামলো।একটা সূক্ষ্ম সংকেত।একটা নিঃশব্দ আদেশ।রোজের চোখে প্রশ্ন জ্বলে উঠলো।কিন্তু আদ্রিয়ান চোখ ফেরাল না।
আদ্রিয়ান আতেশ আর তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শুধু মৃদু হেসে বললো,
——“নিউ ইয়ার নাইট… ইস্তান্বুলে ভুল বোঝাবুঝি খুব স্বাভাবিক।যাস্ট এন’জয় “
কথাটা কোনো সংশোধন নয়।কোনো স্বীকারোক্তিও নয়।মিসেস কারাহান সন্তুষ্টির নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখে রোজ ইতিমধ্যেই মিসেস শাহ হয়ে গিয়েছে একজন গম্ভীর, অভিজাত পুরুষের পাশে মানানসই নীরব সঙ্গী।
রোজ মিসেস কারাহানের দিকে পাল্টা হাসির রেশ্ ধরে রেখে তাদেরকে কথা বলতে দিয়ে পাশ কাটিয়ে ব্রিজের অপরপ্রান্তে যেতে উদ্ধৃত হলো।
—-“এক্স’কিউজ মি”
আদ্রিয়ান রোজকে বাঁধা দিলো না।মিস্টার কারাহানের সাথে কথায় মাঝেও তার দৃষ্টি রোজের দিকে।রোজের অস্তিত্ববোধ করছে তা আদ্রিয়ান বুঝতে পারলো।রোজ হেঁটে যেতেই বসফরাসের বুক চিরে দ্বিতীয় দফা ফায়ারওয়ার্কস আকাশে ছুঁটে ওঠে। রক্তিম, নীল, সোনালি আগুনের ফুল একে অপরকে ছাপিয়ে বিস্ফোরিত হতে থাকে। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে ব্রিজের লোহার শরীর, আর সেই সঙ্গে কেঁপে ওঠে মানুষের ভিড়। কে কোথা থেকে ছুটে আসছে বোঝা যায় না শুধু মনে হয় জনসমুদ্র হঠাৎ জলোচ্ছ্বাসে পরিণত হয়েছে। হাসি, চিৎকার, মোবাইল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, তুর্কি সংগীতের তীব্র বিট সব মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খল, উন্মত্ত, নিশ্বাসরুদ্ধকর।রোজ নিজেকে সামলাতে পারছিল না।
হঠাৎ পেছন থেকে কারোর শরীরের ধাক্কা এসে পড়ে রোজের উপর শাড়ির আঁচল হাতছাড়া হয়ে যায়, পায়ের ভারসাম্য ভেঙে পড়ে প্রায়। ঠিক তখনই ব্রিজের ঠান্ডা লোহার রেলিং আঁকড়ে ধরে নিজেকে টিকিয়ে রাখে। তবে তার শরীরের স্পর্শের ধাক্কায় একজন ব্রিজের মেঝেতে পড়ে যায়।
একজন মহিলা।মহিলাটি তুর্কি পোশাকে। গাঢ় রঙের লম্বা জামা, আর তার উপর অদ্ভুতভাবে বড় এক স্কার্ফ এতটাই বড় যে মুখের বেশিরভাগটাই ঢেকে গেছে,ইচ্ছেকৃত ঢেকে রাখার চেষ্টা। চোখে কালো সানগ্লাস, যদিও রাত। অস্বাভাবিক। রোজের চোখে প্রথমেই সেটাই লাগে। মহিলাটি স্পষ্টতই তাড়াহুড়ো করে কোথাও যেতে চাইছিলেন, কিন্তু ভিড়ের স্রোত তাকে আটকে দিয়েছে।
রোজ সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসে।বুঝতে খুনাক্ষরও অসুবিধে হলো না যে তার সাথে তিব্র ধাক্কায় মহিলাটা পড়ে গিয়েছে।
——-“সরি!সরি!আম এক্সট্রি’মলি সরি আন্টি!”
রোজ হাত বাড়িয়ে মহিলাটিকে ধরে তুলতে চায়।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে মহিলা হঠাৎ করেই রোজের হাতটা সরিয়ে দেন।তিনি নিজ থেকে উঠার চেষ্টা করে রোজের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে পরিলক্ষিত হয় মহিলাটার শরীরী ভাষা বলে দেয় তিনি ভীষণ টেনশনে আছেন।মহিলাটা তুর্কিশ ভাষায় কিছু একটা বিড়বিড় করে বলে, তবে কিন্তু সেই শব্দ রোজের কানে পৌঁছায় না।চারপাশে তখন তুর্কি মিউজিকের তীব্র আওয়াজ, ফায়ারওয়ার্কসের বিস্ফোরণ, মানুষের চিৎকার সব একসাথে এমন এক শব্দপ্রাচীর গড়ে তোলে যে কোনো মানবিক কণ্ঠ তার ভেতরে হারিয়ে যায়।
রোজ একটু ঝুঁকে সামনে আসে।
কানে হাত রেখে উচ্চস্বরে বলে ওঠে-
—-“প্লিজ সে লাউ’ডলি, আই ক্যান্ট হেয়ার ইউ।”
ঠিক তখনই,
আদ্রিয়ান দৌড়ে আসে।ভিড় ঠেলে, কাঁধ সরিয়ে, এক মুহূর্তেই রোজের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার প্রথম দৃষ্টি রোজের মুখে, তারপর হাত, তারপর পায়ে কোথাও আঘাত পেয়েছে কি না, সেটা বোঝার চেষ্টা। চোখে উদ্বেগের ছায়া, কণ্ঠে চাপা অস্থিরতা।
——-“আর ইউ অল রাইট!তুমি ঠিক আছো?…দেখি তো কোথায় ব্যথা পেয়েছো!”
রোজ কিছু বলার আগেই আবার ফায়ারওয়ার্কস ফেটে ওঠে। আলোয় চারদিক সাদা হয়ে যায়।
আর সেই আলো নিভতেই।মহিলাটি আর নেই।
ভিড়ের ভেতরে তিনি মিলিয়ে গিয়েছেন।রোজ হতভম্ব হয়ে সেই দিকেই তাকিয়ে থাকে। সানগ্লাস, বড় স্কার্ফ, তাড়াহুড়ো করা ছায়াটা যেন চোখের সামনে থেকেও নেই।
রোজ ধীরে আদ্রিয়ানের দিকে ফিরে তাকায়।
কণ্ঠে এখনো বিস্ময়ের রেশ।
——-“না! তেমন কিছু না। আমার কিছু হয়নি।তবে উনি খুব অদ্ভুত আচরণ করছিলেন জানেন?”
—-“কে??”-আদ্রিয়ান সেই দিকটায় তাকায়, যেখানে ভিড় এখনো ঢেউ খেলাচ্ছে।কিন্তু সেখানে কাউকে আলাদা করে আর চেনা যাওয়ার উপায় ছিলো না । আদ্রিয়ান আর এক মুহুর্তও দেরি না করে রোজকে নিয়ে ব্রিজের কোলাহল থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে।রোজ, আদ্রিয়ান, মিরাব এবং আনান বসফরাসের পাশে মেলার ভিড়ে মিশে যাওয়া এক তুর্কি রেস্টুরেন্টের বাইরে, যেখানে স্থানীয়দের হাতে হাত মেশানো গরম কেবাব, ভাজা চেস্টনাট, মিষ্টি লোকুম আর দারচিনি-মাখা কফির সুবাস বাতাসে ভাসছে। রেস্টুরেন্টের নাম
——-“Ortaköy’s Midnight Feast”।
আদ্রিয়ানের কোলে আনান পাশে মিরাব।রোজ একটি পিছন পিছন হেঁটে সেদিকেই যাচ্ছে,শাড়ি সামলিয়ে হাঁটা দূরস্থ হয়ে যাচ্ছে অষ্টাদশীর।তবে আশেপাশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রোজের কেন যেনো অস্তিত্ববোধ হচ্ছিলো।বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠতে থাকে বারবার।ভিড়ের মাঝে মাঝে রঙবেরঙের লোকসমাবেশের মাঝে রোজ যেনো কিছু কালো পোশাকধারী কিছু লোক দেখতে পায়।রোজ কিছু বোঝতে পারার আগে কেমন যেনো সব হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে। শাড়ির আঁচল টা টেনে স্লিভলেস ব্লাউজের পিঠ ঢেকে দেয় রোজ। রোজ একবার কি মনে করে যেনো আনানের দিকে তাকায়। বাচ্চা ছেলেটা এক মনে আশেপাশের জাঁকজমকপূর্ণ দৃশ্যে তাকিয়ে আছে।রোজ আনানের আঙুল ধরতে আরেকটু সামনে এগুতেই হঠাৎ চোখ পড়ে একটা মেয়ে যাকে রোজ মাএই ভিড়ের মাঝে খেয়াল করেছিলো মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়।মেয়েটাকে রোজ মাত্রই দেখেছে তাহলে!
রোজ ভারী হিলে দু কদম এগুতেই সামনে আদ্রিয়ানদের আর দেখতে পায় না।রোজ তৎক্ষনাৎ এক প্রকার তাড়াহুড়ায় হাই হিল সামলিয়ে হাঁটতে লাগে।এতো ভিড়ের মাঝে রোজ বুঝতে পারে না যে পথটা ভিন্ন, নীরব একটি সরু গলিতে প্রবেশ করে ফেলেছে। মেলায় লোকের কোলাহল, উৎসবের আওয়াজ, ফায়ারওয়ার্কসের গর্জন সব যেনো এক মুহূর্তে দূরে থেকে আসে। রোজ অচেতনভাবে গলির অন্ধকারে ঢুকে পড়েছে। গলিটা অস্বাভাবিকভাবে নীরব। রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো পাথরের দেয়ালগুলো যেন সময়ের ক্ষয়ে কালচে হয়ে উঠেছে, ভেজা কংক্রিটের গন্ধ বাতাসে ভারী হয়ে আছে। দূরে মাত্র একটি দুর্বল হলদেটে বাতি টিমটিম করে জ্বলছে, আলো নয় বরং অন্ধকারকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে। অচেতনভাবেই রোজ সেই অন্ধকারের ভেতর আরও কয়েক কদম এগিয়ে যায়, যেন পা দুটো আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।নিজেকে সামলাতে রোজ ঠান্ডা মাথায় একটুখানি গভীর শ্বাস নেয়।
পার্লের পার্সের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মোবাইল ফোনটা বের করে। স্ক্রিন জ্বলে ওঠে কিন্তু সিগন্যাল নেই। নেটওয়ার্ক নেই। বুকের ভেতর অস্বস্তির ঢেউ ওঠে। সে তড়িঘড়ি আদ্রিয়ানের নাম খোঁজে, কল দিতে চায়, অথচ ফোনের স্ক্রিনে কেবল একটি ক্ষীণ লো-সিগন্যাল আইকন ঝলমল করতে থাকে।
রোজ এবার ধীরে পা ফেলে সামনে এগোয়। রাত যত বাড়ছে, ঠান্ডার তীব্রতাও তত বাড়ছে। শীতল বাতাস শরীর ছুঁতেই তার কাঁধে হালকা কাঁপন খেলে যায়। শ্বাস ভারী হয়ে আসে, বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট শোনা যায়। বাতাসে উড়তে থাকা চুল এসে মুখের ওপর আছড়ে পড়ে, চোখে পড়ে অস্বস্তি। এক হাতে চুল সরিয়ে কানে গুঁজতেই হঠাৎ রোজের চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে যায়।
সামনে এক বিশাল দেয়াল।
কোনো পথ নেই।
কোনো রাস্তা অবশিষ্ট নেই।
হলদেটে টিমটিমে আলোয় পাথরের মেঝেতে তখনই তার চোখে পড়ে দুটো অস্বাভাবিক ছায়ামূর্তি। ছায়া নয় কেমন যেন দানবীয়, বিকৃত অবয়ব। পেছনে ফিরে তাকানোর মতো মনোবলও জাগে না রোজের ভেতরে। আতঙ্কে শাড়ির আঁচলটা টেনে শক্ত করে ধরে সে। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার হাতের ফোনের স্ক্রিনে আলো জ্বলে ওঠে সিগন্যাল ফিরে এসেছে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটাই নাম-অ্যাড’শ।
রোজ ফোন রিসিভ করতে যাবে,
তার আগেই, হঠাৎ পেছন থেকে এক হিংস্র, দানবাকৃতির হাত তার মুখের ওপর চেপে ধরে। নাকে-মুখে চাপা পড়ে অচেনা তীব্র গন্ধ। এক মুহূর্তেই তার আঙুল আলগা হয়ে যায়, ফোনটা মেঝেতে পড়ে বন্ধ হয়ে যায় নিঃশব্দে। কোনো চিৎকার বেরিয়ে আসে না, নিজের গলা যেনো মুহূর্তেই বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে আছে রোজের সাথে ।
চোখের সামনে পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে যায়। শব্দ হারিয়ে যায়, আলো ভেঙে পড়ে। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে, শক্তি ফুরিয়ে যেতে থাকে। চেতনার শেষ বিন্দুটুকু মিলিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে কেবল অন্ধকার ঘন, নিঃশ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকার, রোজের চক্ষুদ্বয় সম্পূর্ণ গ্রাস করে নেয়।
|রাশিয়া|
ইউভান কানের ই’য়ারপিসটা ছুঁড়ে মারে ফ্লোরে। ইউভান তুষারের দিকে কঠোর দৃষ্টি অভ্যহত রাখলো চোখে আগুন ঝড়া হিংস্রতা।ইউভান স্বগোতক্তিতে হাটা ধরলে তুষার ব্যাতিগ্রস্থ হয়ে ইউভানকে থামিয়ে বলল,
“—–“আমি হ্যান্ডল করে নিচ্ছি ব্যাপারটা।যাস্ট কোল ডাউন।”
তুষার মনিটরের কিবোর্ডে কয়েকটা বাটন চাপলো।তবে নো সিগন্যাল পুনরায়,সিগন্যাল পুরোপুরি ডে’ড।ডিভাইস অফলাইন।একাধিক স্ক্রিন জ্বলে আছে মানচিত্র, কোড, নিস্তেজ গ্রাফ।তুষার ইউভানের দিকে দৃষ্টিপাত করলো ততক্ষণে ইউভানের চোখের মণি দুটো আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত লাভায় গলে মণিকোঠা থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।
—-“Fu*ckkkkkkk!-সামনে এসে মনিটরের সামনে এসে চেয়ার টেনে বসে পড়ে।সত্যিই নেটওয়ার্ক পিং ফেইল। অ্যাক্টিভিটি লগ ফ্রিজড। লোকেশন ট্রেস ডেড। কারণ রোজের এর ফোন বন্ধ।ইউভান দাঁতে দাঁত পিষে হিংস্র পশুর মতো শীৎকার দিয়ে উঠে-
—-” জানোয়ারের বাচ্চা!কুত্তার বাচ্চা।নিজেকে খুব বেশি চালাক মনে করে ঐ বান্দী!এক থাপ্পড়ে পৃথিবীর মানচিত্র চিনিয়ে দিবো।ফাক অফ!সাচ্ অ্যা বুলশিট! মন চাচ্ছে এখুনি গিয়ে গলা চিপে মেরে দিতে!”
—–“তুই তো স্পাইকেও মেরে ফেললি।ওকে পাঠানো যেতো। রাতে কি মনে আছে নিশ্চয়ই! রাতটা ওয়েট করতে হবে।,,,,আর তোর হিডেন থাকা প্রয়োজন।,আপাতত দ্বীপ ছেড়ে যাওয়া বোকামি হবে।”
ইউভান শক্ত হাতে চাপ প্রয়োগ করে কিবোর্ডে।
—-“ইউ আর ভেরি ক্লেভার উইমেন ডার্করোজ!আমার থেকে বেশি না।একবারে গিলে খেয়ে নিতে না দু-সেকেন্ডও লাগবে না।”
বাক্যে শেষ করার আগেই আচমকা তুষার কেঁশে উঠে।ইউভান যে রোজের ইন্সটাগ্রাম আইডি পর্যন্ত হ্যাক করে চালিয়েছে তা তুষারের অজানা না।অথচ রোজ কোনোদিনও খুনাক্ষরে টেরও পায় নি।
—-“হুম অনেক চালাক।একবারে তারিফ করার মতো।”
—–“সাট আপ !লোকেশন ট্রেক করার চেষ্টা কর ফাস্ট।”
রুমের এক কর্ণারে কালো স্টিলের র্যাকের সামনে এসে দাঁড়ায় ইউভান।কালো স্টিলের র্যাক জুড়ে সারি সারি অস্ত্র, কিছু পুরনো, কিছু আধুনিক।পুরো রুম জুড়ে প্রাণঘাতি অস্ত্রের সমাচার।ইউভান সেখান থেকে একটা রাইফেল হাতে তুলে নেয়।ইউভানের মাথায় সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু চলছে,যা কল্পনারও উর্ধ্বে।
কোলোফর্মের ঝাঁঝালো গন্ধের প্রভাবে রোজ অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে।রোজের শাড়িটা এলোমেলো, ভাঁজগুলো আর সৌন্দর্য নয়
বরং অগোছালো।এলোমেলো অবস্থায়। একটা অন্ধকারে আবদ্ধ করা কক্ষ।যার অবস্থান মানচিত্রে নেই।
চারদিক ঘিরে থাকা দেয়ালগুলো কেবল পাথর নয়।নীরবতার মোটা স্তর,যেখানে শব্দও যেন অনুমতি ছাড়া ঢুকতে পারে না।ফুল সাউন্ড প্রুফ।
একটা ম্লান হলদেটে আলো ছাদ থেকে ঝরে পড়ে,
তার নিচে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা নারী দেহ।
রোজের মাথার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে সুঠাম দেহির লম্বা শরীরে হাঁটু অব্দি বোল্ড ড্রেসে এক রুশ লেডি…….
চলবে??
পরবর্তী পর্ব পেতে রেসপন্স করবেন।
Share On:
TAGS: Love or hate, ইভেলিনা তূর্জ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
Love or hate পর্ব ৬
-
Love or hate পর্ব ১৪
-
Love or hate পর্ব ২৩
-
Love or hate পর্ব ১৩
-
Love or hate পর্ব ১১
-
Love or hate পর্ব ২
-
Love or hate পর্ব ২৬
-
Love or hate গল্পের লিংক
-
Love or hate পর্ব ৭
-
Love or hate পর্ব ৮