Golpo Love or hate romantic golpo

Love or Hate পর্ব ৩০


Love_or_Hate

|#পর্ব_৩০|

ইভেলিনা_তূর্জ

⛔কপি করা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ
⛔প্রাপ্ত বয়স্ক ও মুক্ত মনস্ক দের জন্যে

⚠️Warning❌গল্পটা একটা ডার্ক-থ্রিলার ফিকশন। গল্পের প্রধান পুরুষ চরিত্রমনস্তত্ত্ব এবং তার ব্যক্তিগত জীবনদর্শন অত্যন্ত জটিল ও নেতিবাচক। ক্ষুদ্র লেখিকা হিসেবে কোনো ধর্ম, বিশ্বাস বা আদর্শকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। গল্পের কাহিনী এবং চরিত্রের কার্যকলাপকে বাস্তব জীবন বা লেখিকার ব্যক্তিগত মতাদর্শের সাথে না মেলানোর জন্য অনুরোধ করা হলো।❌

সময়টা দু’বছর আগেকার।|সাল ২০২৩|

রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রাচীন অর্থোডক্স গির্জার ভেতরে মোমবাতির মৃদু আলো জ্বলে উঠেছে।
সেখানের ​বেদীর সামনে দীর্ঘকায় এক সৌষ্ঠব পুরুষ দেহ দাঁড়িয়ে আছে— ইউভান রিক আলবার্ট।পড়নে কালো ওলভারকোট, গির্জার প্রবীণ ফাদার আন্দ্রেই ধীরপায়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর সাদা দাড়ি আর গভীর কুঁচকানো চোখ নিয়ে ​ফাদার ইউভানকে জিজ্ঞেস করলেন–
“রিক!ডোন্ট ইউ স্টি’ল বিলিভ ইন গড??”

​ইউভান কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি তখন গির্জার রঙিন কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে ঝরতে থাকা ধবধবে সাদা বস্তুর দিকে।
“Tell God to get I want and to erase all old Dark memories from my life.”

​ফাদার আন্দ্রেই এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বাইবেলের ওপর হাত রেখে ভারি গলায় ইংরেজিতে বললেন–
“Whatever God ordains is for the best, Rick. সৃষ্টিকর্তা যা করেন, তা মানুষের মঙ্গলের জন্যই করেন। আমি তোমাকে সেই ছোটবেলা থেকে চিনি। প্রত্যেকবার তুমি এখানে আসো, এই গির্জার চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকো, কিন্তু ভিতরে কখনো পা রাখো না। তোমার এই দূরত্ব আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়।”

​ইউভান এবার ফাদারের দিকে ফিরলো। তার চোখের মণি দুটো তখন হিমশীতল বরফের মতো স্থির। ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের রেখা ফুটিয়ে সে বলল—
​”আমি আপনার কাছে আসি কারণ আমার মৃত বাবা আপনার কাছে আসতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আপনাকে, আর আমার ফাদারের স্মৃতির প্রতি সম্মানটুকু রেখেই আমার এখানে আসা। এছাড়া আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই এখানে ফাদার।”

“সৃষ্টিকর্তার প্রতি এতো বিদ্বেষ চেপে রেখো না রিক।তোমার গ্র্যানির সেন্স ফিরেছে শুনে লি’টরেলি অ্যাম হ্যাপি ট্রাস্ট মি রিক।ইট’স গড পাওয়ার।মেইবি এখন তোমার একটু শান্তি লাগছে??”

ইউভান এতেও কোনো জবাব দিলো না।ধীর পায়ে চলে যেতে নিলে আন্দ্রে ফাদার আটকিয়ে দেয় ইউভানকে।তিনি বাইবেল হাতে ইউভানের গলার ক্রস লকেটটাতে ছুঁয়ে চুমু খেয়ে দেন।যেনো তিনি রুশান উত্তরশরীকে একটু বেশি স্নেহের নজরে দেখেন।আর তিনি বিশ্বাস করেন অনেকদিন পর তার কাছে আসার একটাই কারণ হতে পারে হয়তোবা ইউভান নিজের গ্র্যানির জন্যেই প্রার্থনা করতে এসেছে।এতোবছর পর তার জ্ঞান ফিরেছে সে সুবাধে।
*
ইউভান রাতের মধ্যেই ভোলচর দ্বীপে চলে আসে।রাত্রির নিস্তব্ধতা চিরে ইউভানের স্পিডবোট ভোলচর দ্বীপের কূলে ভিড়লো দ্বীপের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা রয়্যাল বিল্ডিংয়ের লিফট দিয়ে মাটির নিচে স্যাঁতসেঁতে
​মাস্টারের কক্ষে।ভোলচরের প্রতিটি ধূলিকণা যাঁর নামে কাঁপে, যাকে সবাই তটস্থ হয়ে ‘মাস্টার’ বলে সম্বোধন করে, তবে ইউভান কোনো কিছু বলেই সম্মোধন করার প্রয়োজন মনে করে না।
মাস্টারের খাস কামরায় কেবল একটা প্রাচীন গ্রামোফোনের ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে।ইউভানকে দেখে ​মাস্টার অন্ধকারের আড়াল থেকে চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে ধীরলয়ে বললেন।
“কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে ড্রাগ স্মাগলিংয়ের যে নতুন রুটটা তৈরি হয়েছে,তোমাকে সেখানেই যেতে হবে”।কাজটা তোমার মতো মন্সটার বিচ্ এর দ্বারাই সম্ভব। এন্ড আই ট্রাস্ট ইউ।”

সামনে রাখা টেবিল থেকে খামটা হাতে নিলো ইউভান,,,ভেতরে থাকা ছবি আর নথিপত্রগুলো আড়চোখে দেখলো তার চোখে কোনো আগ্রহ নেই, বরং আছে এক তীব্র অবজ্ঞা। সে কর্কশ স্বরে বলল।
“দেখুন আমি যা করি আমার নিজ স্বার্থে,সমুদ্রবন্দরে ড্রাগ আর অস্ত্র ট্রেফিকিং সামলানোর জন্যে দু কটা কুকুর লেলিয়ে দিলেই এনা’ফ।এমন সস্তা কারবারিদের সামলানোর জন্য আপনার পোষা কুকুরগুলোই যথেষ্ট ছিলো।”

​মাস্টার এবার একটু ঝুঁকে এলেন, অন্ধকারের মাঝে তাঁর চোখের মণি দুটো চিকচিক করে উঠল-
“কারণ এবারের টার্গেট সাধারণ কেউ নয়। চট্টগ্রামের এক প্রভাবশালী মহলে এমন এক বিষবৃক্ষ জন্মেছে যাকে উপড়ে ফেলার জন্য তোমাকে প্রয়োজন।নিজে যাবে এন্ড যাস্ট কিল হি’ম। “
মাস্টার ভালো করেই জানতেন।ইউভানের একেকটা কিলিং অত্যন্ত নিঁখুত! যাকে মা*রে তার চিন্হ পুরো দুনিয়া থেকে মুছে দেয়।without any prove!”

ইউভান তার ট্যাটু করা রিং পরিহিত আঙুল গুলো দিয়ে টেবিলে টকটক করলো।
–“ওসব নোংরা জলের দেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই রিকের।ওই দেশে পাঁ রাখতেও বমি উগ্রে বেরিয়ে আসবে আমার।সেখানে যদি রিক আলবার্টকে যেতে হয়,শুধু একটা কেন আরও লাশ পড়ার সম্ভবনা আছে।যদিও রিক যাকে তাকে ধরে হাত নোং/রা করে না!বাট ঔই যে বললাম স্বার্থ হাসিলে রিক নাহয় আজ একটু আবর্জনায় পাঁ ফেলবে।who fucking cares!”

কথাটুকু বলেই ইউভান হনহনিয়ে বেরিয়ে এলো।এসেই ভিআইপি ফ্ল্যাটে ঢুকেই সে তার অত্যাধুনিক ল্যাপটপটি বের করলো স্ক্রিনের নীল আলোয় তার পাথুরে মুখটা আরও বিভী/ষিকাময় লাগছে।এয়ারপিস কানেক্ট করে তুষার আর দামিয়ানকে ডেনমার্কের সব পরিস্হিতি আর তার গ্র্যানিকে সামাল দিতে বলে।যেহেতু এ্যাশ আলবার্ট জানতেন না ইউভান আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে সম্পৃক্ত। সেদিন রাতেই ইউভান ভোলচর থেকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মাটিতে তার পদার্পণ।

রাত তখন গভীর। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউগুলো যেনো গর্জন করে কোনো এক নিষিদ্ধ আগন্তুক আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়াকে স্বাগত জানাচ্ছে। বাংলাদেশের জলসীমায় তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেবল দূরে তেলের ট্যাঙ্কারগুলোর টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের নোনা বাতাস আর পচা শামুকের গন্ধ মাখা সেই নিস্তব্ধতা চিরে এগিয়ে আসছে একটা ব্ল্যাক-আউট স্পিডবোট।
​চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের বহির্নোঙ্গরে বিশাল বিশাল কার্গো জাহাজের আড়ালে ছোট একটা ফিশিং ট্রলার আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো। ইউভান তার কালো হুডির হুড ক্যাপ ফেলে স্পিডবোট থেকে লাফিয়ে পড়লো সেই ট্রলারে। তার বুটের শব্দে তটস্থ হয়ে উঠল ট্রলারে থাকা জীবগুলো।

​কক্সবাজারের ইনানি সৈকতের এক নির্জন কোণে, যেখানে ঝাউবনের ছায়া সমুদ্রের বালুকে আরও অন্ধকার করে রেখেছে, সেখানে নিঃশব্দে ভিড়লো নৌকাটি।
​ইউভান তার পকেট থেকে একটা লাইটার বের করে নিকোটিনের কালো ধোঁয়া ছেঁড়ে অনবরত টানতে শুরু করে।ঠান্ডা বাতাস পুরুষটার সিগারেটে ধোঁয়ায় উড়িয়ে নিচ্ছে আর সে একাই হুডির পকেটে বাঁ হাত রেখে বড় বড় পাঁ ফেলে এগিয়ে চলছে সমুদ্র সৈকতের পথ বেয়ে।


শ্রাবণ মাসের গোধূলিলগ্নের অবাধ্য বৃষ্টি এক পশলা ভিড়িয়ে দিয়ে গেছে তিলোত্তমা চট্টগ্রামকে।সেই সুদূর ঢাকা থেকে তিশা রোজকে তার চাচা চাচির বাড়িতে নিয়ে এসেছে।তার চাচার বড় মেয়ের বিয়ে বৈকি।
তবে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই রোজের বাবা ইতিমধ্যে বিশবার কল করে ফেলেছেন।মেয়েকে একা পাঠিয়ে অস্থির হয়ে। রোজ জীবনের এই প্রথম ঢাকার বাহিরে পাঁ রাখলো।অনেক কষ্টে ইমরান চৌধুরীকে রাজি করিয়ে এসেছে মেয়েটা।তিশার চাচাতো বোন প্রিমা পরশু বিয়ে। প্রিমার পাশেই বসে আছে তার ছোট বোন পিউ পাশে আরও কয়েকজন মেয়ে, পিউ বয়সে রোজ আর তিশার সমসাময়িক এবং স্বভাবে বড্ড চঞ্চল।

মেহেন্দি উৎসবে রোজ একটা কলাপাতা রঙের শাড়ী পড়ে বসে আছে। পিউ অত্যন্ত নিপুণভাবে রোজের হাতের তালুতে একটা বিশদ ‘মান্ডালা’ ডিজাইন আঁকলো। কিন্তু কাজ শেষ করে সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোসের সুরে বলল-
“মাঝের এই গোলকটা তো ফাঁকা রয়ে গেলো রোজ! এখানে কী লিখবো?তোমার তো বরও নেই, তার নামও নেই। আহারে আমার বেচারি রোজ!একটা কাজ করি রোজ লিখে দি??”

-“দাও ডার্ক রোজ লিখে দাও।

“কিহ?ডার্ক রোজ আবার কি??”

“কালো গোলাপ!”

“এ্যাহ, সাদা গোলাপ দেখি কালো গোলাপ হইতে চায়।কি উদ্ভট তুমি রোজ।”

রোজ আনমনে আওড়ালো পিউর কাছে।
“উদ্ভট হবে কেন পিউ? লাল গোলাপের রক্তিম শোভা তো সবাই ভালোবাসে, কিন্তু এই পৃথিবীতে কালো গোলাপকে ক’জন ভালোবাসার সাহস রাখে? আমিও চাই না এই জগতের সাধারণ ভিড় আমার প্রতি আকর্ষিত হোক।”

“কিন্তুু একেবারে কালো গোলাপ তো পৃথিবীতে নেই!হয় না”

“ইউ আর রাইট।ডার্ক রোজ মানে হচ্ছে এক বিরল অস্তিত্ব । ঠিক আমার মতো। এমন এক গোলাপ যাকে চাইলেও কেউ ছুঁতে পারবে না, আর চাইলেই এই পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।” It’s Doesn’t exists in this world!’ রঙিন গোলাপের মায়াবী মোহে সবাই পড়লেও, ডার্ক রোজের ওই বিষাক্ত মোহে পড়ার সাধ্য সবার নেই।তাই যেনো আমাকে পাবার সাধ্যও সবার না হয়!”

পিউ বেশ্ কিছুক্ষণ রোজের হানি ব্রাউন অক্ষিপলে তাকিয়ে রইলো।মেয়েটার চোখের ভাষা বুঝার মতো সাধ্যও তার হলো না।কি অদ্ভুত তার দু নয়নের চাহনি।অতঃপর নিপুন হাতে রোজকে মেহেদী পড়িয়ে দিলো।

মেহেদির উৎসব শেষে ভোজের আসর বসেছে পুরো বাড়ি জুরে। বড় থালা ভর্তি ধোঁয়া ওঠা খাসির মাংসের বিরিয়ানির সুবাসে ঘর ম ম করছে। পিউ চামচ দিয়ে বিরিয়ানি নাড়তে নাড়তে চোখ টিপে রোজ আর তিশাকে ফিসফিসিয়ে বলল–
“শোন তিশু, এই বিরিয়ানি হজম করার জন্য একটু বাইরে যাওয়া দরকার।আমাদের মহেশখালীর রাস্তাটা কি যে দারুণ লাগে তা তোর সই রোজকে দেখাতে চাই! চল না, আমরা মিলে একটু আইসক্রিম আর ফুচকা খেয়ে আসি।”

তিশা:”না ভাই।সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত হয়ে যাচ্ছে তোর মা রাজি হবে না।”

পিউ:”বাড়িতে এতো মেহমান আমরা যাবো আর তাড়াতাড়ি চলে আসবো।কেউ কিচ্ছুটি টের পাবে না।”

পিছন থেকে হুট করে পিউ এর মা রহিলা বেগম ধমক দিলেন,এক প্রকার।যেনো তিনি আড়ি পেতে সব শুনে নিয়েছেন।
“না! একদম না। দিবো একটা থাপ্পড়, এখন বাইরে যাওয়ার দরকার নেই।বেশি ফাজিল হয়েছিস”

​পিউ নাছোড়বান্দা।সে বললে যেতে দিবে না ভেবে রোজের কথা বলে রাজি করানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
“আম্মা প্লিজ যাই।দেখো রোজ বলেছে বিদ্বায় যাচ্ছি।ওও নাকি একটু ঘুরবে।ফুচকা খাবে।সামনেই তো রশিদ মামার দোকান। খাবো আর চলে আসবো।”

পিউ এর কথায় রোজের চক্ষুচরক গাছ।আরে সে কখন বলল যে বাহিরে যেতে চায়।তবে রোজ মুখ বন্ধ রাখলো শুধু রহিলা বেগমের দিকে একবার আড় চোখে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সংযত করে নিলো।রহিলা বেগম কিছুক্ষণ রোজকে পরক করলেন নিভৃত দৃষ্টিতে। মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর।বিভ্রম থেকে বেরিয়ে তিনি রোজকে জিজ্ঞেস করলেন।
“বোরখা পড়ো??”

হঠাৎ এমন প্রশ্নে রোজ কিছুটা বিচলিত হয়ে বলল-
“নাহ!”

“পিউ!রোজকে তোর থেকে একটা বোরকা আর নিকাব দে।রাত্তিরে এমনে বাইর হওয়ার দরকার নাই।মাইয়া মানুষ, আবার রাস্তাঘাট সুবিধার না।আবার এনে নতুন।রাস্তার বখাইট্টারা নজর দিবো।শরীর ঢাইকা গেলে ভালা।”

​রোজ পিউ এর মায়ের কথায় এক ম্লান বিদ্রোপ হাসি হাসলো।
“আন্টি,আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কি বলতে চেয়েছেন। বোরখা পরলে কি আমাদের দেশে মেয়েরা নিরাপদ হয়ে যায়? বোরখা পরা কিংবা শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউই তো আজকাল পিশাচদের হাত থেকে বাদ যাচ্ছে না। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে বলুন?দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ধর্ষ/নের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেরে যাচ্ছে। কিছু নর/খাদকের স্রেফ মাং/সের ক্ষুধা চেনে।রাস্তার পাগলদেরও ছাঁড় দেয় না এরা।” ​ বোরখা যদি পড়তেই হয় তাহলে আমি না-হয় একজন মুসলিম নারী হিসেবেই পড়লাম।–বাক্য শেষ করেই রোজ পিউ এর হাত থেকে বোরখা আর নিকাব গায়ে জড়িয়ে নিলো।এখন শুধু মেয়েটার মায়াবী চোখ দুটো দৃশ্যমান।তবে রোজের কথাগুলো তিশার চাচির কানে যেনো সীসা হয়ে ঢুকলো।এই ষোলো বছরের অল্প বয়সী মেয়েটার মুখে এমন পোড়খাওয়া মানুষের মতো কথা শুনে তিনি হাবার মতো চেয়ে রইলেন।মনে মনে আওড়ালেন। ​”ওরে বাবা! এইটুকুন একখান মাইয়া, অথচ পেটে পেটে কত বুদ্ধি আর এলেম! এই মাইয়াটা দেহি দুনিয়ার তামাম খবর রাহে। কী সপ্রতিভ আর পরিষ্কার জবান! ​
সন্ধ্যা প্রায় শেষ।রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় মহেশখালীর নির্জন রাস্তায় পিউ আর তিশার হাসাহাসির মাঝেই পিউ বলল–
“দেখলে রোজ!আমাদের রশিদ মামার ফুচকা কতো মজা।ফাটাফাটি না??”

রোজ আইসক্রিম খেতে খেতে ধীর পায়ে হেঁটে বলল-
“ঢাকার বেইলি রোডের আমাদের ভিকারুননিসা স্কুলের কাছে ফুচকা আরও বেশি মজা।ঢাকা যেয়ো খাওয়াবো।

তিশা:হুম ঠিক।কিরে পিউ তোর খাওয়া শেষ এখন চল বাসায় যাই।প্রিমা আপু পরশু চলে যাবে স্বামীর বাড়ি।আমাদের উচিৎ আপুর কাছে থাকা।”

পিউ:আপুর জন্যে তো ফুচকা নিলাম।দেখবি মন ভালো হয়ে যাবে।”

রোজ:রাতের শহরের রাস্তা খুবই চমৎকার লাগে তাইনা।রাতে হাঁটতে আমার ভীষণ ভালো লাগে।”

পিউ:”ইন ফউচার হাসবেন্ডকে নিয়ে রাতের বেলা ঘুরবে হাত ধরে হেঁটে। উফফ!ভাই আমার তো মন চায় প্রিমা আপুর জায়গায় নিজে বিয়ের পিড়িতে বসে পড়তে।”
পিউ এর কথায় রোজ আর তিশা দু’জনেই হুহ করে হেঁসে উঠে। তৎক্ষনাৎ পিউ রোজের দিকে উৎফুল্ল চাহনি দিয়ে বলে-
“হেসো না সুন্দরী! দেখবে বিয়ের পর কত্ত মজা আর মজা জামাই নিয়ে ঘুরো ফিরো খাও দাও।আর সবচেয়ে মজা তো রা……..
পিউ বাক্যেক্তি শেষ করার আগেই তিশা মুখ চেপে ধরলো,
” অসভ্য মেয়েএএএএএএএএএএএএ!”

তবে আচমকা পরিস্থিতিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিদ্যুৎবেগে একটা কালো মাইক্রোবাস তাদের একদম ঘেঁষে এসে ব্রেক কষলো টায়ারের ঘর্ষণে বাতাসের বুকে এক ঝাঁঝালো পোড়া গন্ধে ছড়িয়ে পড়লো চারিপাশে।
​পিউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির স্লাইডিং দরজাটা সশব্দে খুলে গেলো। ভেতর থেকে বের হয়ে আসা দুটো শক্ত হাত কোনো পশুর মতো ক্ষিপ্রতায় রাস্তার পাশে থাকা রোজের বোরখার হাতা চেপে ধরলো।
​”কে? ছাড়ুন আমাকে!” রোজ সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু সেই দানবীয় শক্তির কাছে সে এক লতা মাত্র।
​এক বীভৎস হেঁচকা টানে রোজকে চলন্ত গাড়ির ভেতর টেনে তোলা হলো। টানাহ্যাঁচড়ার সময় রোজের পাঁ গাড়ির মেটালের ধারালো কোণায় সজোরে আঘাত খেয়ে মুহূর্তে পাতলা চাম/ড়া চিরে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। সেই তাজা লাল রক্তে ভিজে উঠে রাস্তার ধূলিকণা আর রোজের পরনের কালো বোরখা। ব্যথায় তীক্ষ্ণ এক আর্তচিৎকার করে উঠল সে, কিন্তু তাকে নাকে টিস্যু চেপে অজ্ঞান করিয়ে দেয়া হলো।
​পরক্ষণেই ‘ধড়াম’ করে স্লাইডিং দরজাটা বন্ধ হয়ে গেলো। পিউ আর তিশার তারা কিছু বুঝতে পারার আগেই মাইক্রোবাসটি কালো ধোঁয়া উড়িয়ে ঝড়ের বেগে অন্ধকারের বুক চিরে হারিয়ে গেলো।


কক্সবাজারের সমুদ্রের উত্তাল গর্জনের সমান্তরালে ঝাউবনের আড়ালে দপদপ করছে এক বিষাক্ত রক্তিম আলো। ‘নাইটমেয়ার’ নামক একটা নাইট ক্লাব।নামটা যেমন তার ভেতরটা তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি বীভৎস।এই ক্লাবে মূলত রাতের আঁধারে নারীদের তুলে এনে দেহব্যবসা করানো হয় কিংবা বিদেশি ডিলারদের কাছে পাচার করানো হয়।
​ক্লাবের বিশাল হলঘরে নিয়ন আলোর মাতামাতি। চারদিকের বাতাস ড্রাগের ধোঁয়া আর দামী স্কচের উৎকট গন্ধে ভারী হয়ে আছে। মঞ্চের মাঝখানে অর্ধনগ্ন কিছু মেয়েকে ঘিরে একদল মদ্যপ নরপশু লালসার উল্লাসে মেতেছে। সোনালি জল আর ধবধবে সাদা ড্রা*গের গুঁড়ো টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছিটানো।

​ক্লাবের প্রধান ফটকের সামনে অন্ধকারে এক পাথুরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে ইউভান। তার পড়নে কুচকুচে কালো হুডি, কালো ক্যাপের আড়ালে থাকা চুলগুলো লালাটে লেপ্টে আছে,আর মুখটা মাস্ক দিয়ে ঢাকা, কেবল একজোড়া আগ্নিধূসর অক্ষিপল দৃশ্যমান। ইউভানের কাছের খামের এই নরকপুরীর মালিক জুবায়ের খাঁ-র ছবি।এই জুবায়ের খাঁ এর গলার রগ টেনে ছিঁড়তে এসেছে ইউভান,।
​ইউভান তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক আর তাচ্ছিল্যের রেখা টানলো, যা মাস্কের আড়ালে চাপা পড়া। সামনে ক্লাবের কড়া পাহারা ভারী অস্ত্র হাতে জুবায়েরের বাউন্সারেরা চারদিকে পায়চারি করছে। ইউভান ধীরপায়ে এগোতে থাকলো। ​
এই ক্লাবেরই ​ভেতরে একটা বিশেষ সেকশনে রোজ।তার চারপাশ দিয়ে আরও কিছু মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছে, যাদেরকে আজই ‘বোর্ডিং’ করা হবে।রোজের জ্ঞান পুরোপুরি ফিরেছে, কিন্তু নিকাবের আড়ালে সে যা দেখছে তা তার কল্পনারও বাইরে।
​ দেখলো, স্লিভলেস আর উগ্র পোশাক পরা কিছু মেয়ে যান্ত্রিকভাবে নাচছে, পুরুষ নামক এক পিশাচ মদের বোতল হাতে রোজের দিকে এগিয়ে এলো তার মুখ থেকে বের হওয়া নোংরা গালি আর মদের গন্ধ রোজের পেটের নাড়িভুড়ি ছিঁড়ে বমি আসার উপক্রম। পরমুহূর্তেই ক্লাবের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে রশ্মি রোজের দিকে এগিয়ে এলো।মেয়েটা স্লিভলেস ব্লাউজ আর সিল্কের পাতলা শাড়ি পড়ে আছে।তার শরীরের প্রতিটা ভাঁজ ভাসমান।অঙ্গভঙ্গি সম্পূর্ণ অশ্লীল, লাতানো শরীরটা হেলেডুলে রোজকে পাশ কাটিয়ে বার কাউন্টারের কাছ থেকে মদের গ্লাস নিয়ে একজন ক্রেতার রুমের উদ্দেশ্য গেলো।এসব দেখে রোজ অনবরত আল্লাহ খোদার নাম জবতে লাগলো।মেয়েটা কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।এই বুঝি নিজের ইজ্জত সর্বতরে বিলীন হয়ে যাবে সেই ভেবে খোদা বলে আত্মাচিৎকার দিয়ে অশ্রুবিসর্জন দিতে মন চাইলো।বাবার কথা শুনে যদি চট্টগ্রামে না আসতো তাহলে কোনোদিনও এমন জাহা*ন্নামের মুখোমুখি হতে হতো না তাকে।রোজ নিজের পড়নের বোরখাটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বসে রইলো।

​সময়ের ব্যবধানে দেহের ব্যবসার যে নগ্নতা রোজ দেখছে তা তার মতো শুদ্ধ মেয়ের কাছে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক।যেকোনো মূল্যই হউক এমন জাহান্নামে থেকে বের হতেই হবে তাকে।তবে কিভাবে হবে কড়া পাহাড়ায় ঘেরা চারপাশ।রশ্মি যাওয়ার পর সেই লোকটা পুনঃরায় রোজের কাছে অ*শ্লীল বিচ্ছিরি হাসির রেখা এগিয়ে আসতে লাগলো।

​ঠিক তখনই!

​হঠাৎ করেই হলের বিশাল পাওয়ার গ্রিডে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটলো। ঝলমলে নিয়ন আলোগুলো এক লহমায় নিভে গিয়ে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এলো। থেমে গেলো কান ফাটানো মিউজিক। অন্ধকারের সেই সুযোগটা হাতছাড়া করলো না রোজ। এক ঝটকায় সামনের নেশাক্ত মাতাল লোকটাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো সে। পায়ের ক্ষত থেকে র*ক্ত ঝরছে, তবুও প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে মেয়েটা অন্ধকারের মাঝেই দৌড়াতে শুরু করলো।
​সারা ক্লাবে তখন হুলস্থুল পড়ে গেছে। কেউ ভাবছে শটসার্কিট, কেউ ভাবছে হয়তোবা পুলিশ হানা দিয়েছে, আবার কেউবা ভাবছে ক্লাবে আগুন লেগে গেলো নাকি। প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিকে পারছে ছুটছে। সিকিউরিটি গার্ডদের পাহারার বাঁধ ভেঙে গেছে নিমিষেই।
​রোজ অন্ধকারের ভেতর দিয়ে টলমল পায়ে সামনের দিকে এগোচ্ছিলো,

ঠিক তখনই শ্রাবণের মেঘ ছিঁড়ে ভেসে আসা বাতাস উড়িয়ে রোজের পুরো নারীদেহ ধাক্কা খেলো এক লম্বাটে পুরুষালি দেহের সাথে।তৎক্ষনাৎ রোজের পুরো আপন সত্তায় জাগ্রত হলো যেনো কোনো সাধারণ মানুষ না এক জ্যান্ত হিমশৈলের সাথে ধাক্কা খেয়ে ফেলছে ষোড়শী রমণী।পুরুষালীর সুঠাম শরীরটা কালো হুডিতে ঢাকা ,কালো ক্যাপ আর মাস্কের আড়ালে কেবল দৃশ্যমান একজোড়া ক্রুদ্ধ অগ্নিধূসর অক্ষিপল।মুহূর্তেই রোজের পুরো শরীর হাড় কাঁপুনি দিয়ে উঠলো।
​রোজ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো সেই পানে। রমণীর নিভৃতে দেহের প্রতিটা কোষ মোহভুক্ত হলো যেনো এক নিমিষেই। কিন্তু সেই হুডি পড়া সৌষ্ঠব দেহটা রোজের দিকে একটা বারের জন্যে ফিরেও তাকালো না। যেখানে সকলে ক্লাবের বাইরে দৌড়ে পালাচ্ছে, সেখানে এই লোকটা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। সে অত্যন্ত গাম্ভীর্য পায়ে, অন্ধকারের বুক চিরে সরাসরি ক্লাবের গভীরে প্রবেশ করছে।রোজের কাছে লোকটাকে এই ক্লাবের বলে মনে হলো না,পুরুষটার চাহনিতে ছিলো না কোনো অনুভূতির ল্যাস মাত্র।আর না মৃ*ত্যু ভয়।

রোজ সম্মোহিতের মতো সেই ছায়ামূর্তিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে ভুলেই গেলো যে সে প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছিলো। তার অবচেতন মন যেন সেই অচেনা আগ্নেয়গিরির উ*ত্তাপে জমে গিয়েছিলো। কিন্তু সেই বিস্ময় বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রোজ পিছিয়ে যেতে যেতে হঠাতই বিকট এক শব্দে পুরো ক্লাবের আলো জ্বলে উঠলো। ইমার্জেন্সি জেনারেটর চালু হতেই নিয়ন বাতিগুলো আবার আগের চেয়েও তীব্র হয়ে জ্বলে উঠলো।
​রোজ ক্লাবের মূল দরজা অবধি পৌঁছানোর আগেই থমকে গেলো। পুরো ক্লাবে লাউডস্পিকারে জুবায়ের খাঁর লোকজনের কর্কশ আওয়াজ ভেসে এলো–

“সবাই থামো! কোনো বিস্ফোরণ হয়নি, কোনো আগুন লাগেনি। এটা স্রেফ একটা টেকনিক্যাল ফল্ট ছিলো। কেউ বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করবে না!”

​নিমেষেই সেই বিশৃঙ্খলা আবার কঠোর শৃঙ্খলায় বদলে গেলো। ক্লাবের নিরাপত্তা আগের চেয়েও দশগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হলো। রোজ পালানোর সুযোগটুকুও পেলো না। জুবায়েরের ক্লাবের দুই নারী এসে রোজের দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরলো। ব্যথায় কুকড়িয়ে উঠলো রোজ।
​আলো ফেরার ঠিক সেই মুহূর্তেই রোজের চোখ গেলো সেই ছায়ামূর্তিটার দিকে। কিন্তু একি! সেই পাহাড়ের মতো শক্ত মানুষটা যেনো কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেছে। রোজ দেখলো, ভিড় আর পাহারাদারদের নজর এড়িয়ে সেই ছায়ামূর্তিটি অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় এক নিমেষে জানলা ভেদ করে বাইরে চলে গেলো। চোখের পলকে ঘটে যাওয়া এই দৃশ্যটি রোজকে বিমূঢ় করে দিলো।
​তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে একটা প্রশ্ন হাতুড়ি পেটাতে লাগলো তবে কি এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর বিস্ফোরণ এই লোকটারই কাজ?…..
*
রাত আরও গভীর হচ্ছে। বাইরে সমুদ্রের গর্জন আর শ্রাবণ মাসের বৃষ্টির ঝাপটা শব্দ। রোজকে রশ্মি এক প্রকার হিড়হিড় করে টেনেহিঁচড়ে জুবায়ের খাঁর সেই দুতলার খাস কামরায় নিয়ে আসা হলো,বিশাল কক্ষটি দামী আসবাব আর মদের বোতলে ঠাসা, এক কোণে জুবায়ের খাঁ রেশমি আলখাল্লা পরে সোফায় পা তুলে বসে আছে। তার চোখে শিকারি নেকড়ের মতো কুৎসিত লালসা।
​জুবায়েরের ইশারায় রশ্মী রোজকে ঘরের মাঝখানে ছেড়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা আটকে দিলো। প্রতিদিন এমনি হয়।একেকটা মেয়ে পাঠানো হয় জোবায়েরের রুমে।বাড়িতে বউ রেখে ক্লাবে নারীদেহে লিপ্ত হয়।কক্ষটা সম্পূর্ণ সাউন্ড প্রুফ।তথাকতি জুবায়ের রশ্মিকে ইশারা করলো যেনো এই রাতটা তার কক্ষের চারপাশে কেউ না আসে।জুবায়ের ধীরপায়ে উঠে দাঁড়ালো, তার হাতে একটা জ্বলন্ত চুরুট। সে রোজের দিকে এগোতে এগোতে একটা বিচ্ছিরি হাসি দিলো।রোজের নিকাবে হাত রেখে টানতে লাগলো।

​রোজ দেওয়ালের সাথে মিশে গিয়ে নিষ্প্রাণহীন কন্ঠটা ক্ষিপ্ত স্বরে ব’লে –
“আ…আল্লাহর দোহাই লাগে! আমার শরীরের পবিত্রতা ওই নোং/রা হাত দিয়ে ছুঁলে, হাত পুড়ে ছাই হয়ে যাবে,ব…বলে দিলাম। “

​রোজের এই তীব্র তেজ দেখে জুবায়ের থমকে না গিয়ে বরং আরও অট্টহাসি হাসলো। সে চুরুটের ধোঁয়া রোজের মুখের ওপর ছেড়ে দিলো।বিদঘুটে গন্ধে রোজের বমি চলে এলো এক মূহুর্তে।

“ওরে বাবারে! এই নিকাবের আড়ালে এতো তেজ? তোর কথা শুনে তো আমার বুকের ভেতর আগুন ধরে গেছে।ইশশশ! দেখি, তোর ওই চাঁদমুখখানা দেখি।কত বড় রূপ তোর আর রুপের অহংকার!যে আমি ছুঁলেই জ্বলে যাবো”
​জুবায়ের আবারো রোজের নিকাব ধরে টান দিতে হাত বাড়ালো, রোজ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে টেবিলের ওপর থাকা এক বোতল হুইস্কি তুলে নিলো। চোখের পলকে সে বোতলটা টেবিলের কোণায় মেরে ভেঙে ফেললো। ভাঙা কাঁচের ধারালো ফলার মতো অংশটা সে জুবায়েরের দিকে তাক করে ধরল। তার ক্রন্দনরত চোখ দিয়ে তখন আগুনের ফুলকি ঝরছে।

​”খবরদার! এক পা এগোলে এই কাঁচ পেটে ঢুকিয়ে দেবো!” রোজের গলার স্বর কাঁপছে, কিন্তু সংকল্প তখনো অটুট।

​জুবায়ের তাচ্ছিল্য করে এক পা বাড়ালো, “দে না, দেখি কত জোর তোর হাতে।তোর সাথে রাত কাটিয়ে হেব্বি।একেবারে কড়া।মুখটা না জানি কেমন।লোভ সামলাতে পারছি না।”
​ঠিক সেই মুহূর্তেই বীভৎস এক শব্দ হলো। রোজ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলো, অন্ধকারের বুক চিরে এক তীব্র গতির রূপালি রেখা ধেয়ে এলো। নিখুঁত নিশানায় একটা ধারালো ছুরি এসে বিঁধলো জুবায়ের পিছনের খাঁর গলার মাঝবরাবর। ​পিশাচ জুবায়েরের চোখের মণি দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো, গলা দিয়ে র*ক্তের এক ধারা ফি/নকি দিয়ে রোজের বোরখার ওপর ছিটকে পড়লো।তৎক্ষনাৎ জুবায়ের দুই হাত গলা চেপে ধরে হাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে ধপাস করে পড়ে গেলো।

​রোজ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার হাত থেকে ভাঙা বোতলটা কাঁচ পড়ে গেলো।থরথর করে কাঁপছে হাত। সে বেলকনির দিকে তাকাতেই দেখলো, সেই বিশালদেহী হূডি পরা পুরুষের ছায়ামূর্তি।বেলকনির কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে। তার অগ্নিধূসর চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে জুবায়েরের উপর।

​রোজ ভয়ে আর আতঙ্কে চিৎকার করতে চাইলো, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। সে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো, যেন ভিতরের কলিজাটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে না আসে।বক্ষপিন্জরের দুর্বার যন্ত্রটা যেনো লাফিয়ে বেরাচ্ছে।কোনো কিছএ চিন্তা করারও অবকাশ রইলো না তার।লোকটা কি এবার তাকেও মেরে ফেলবে??গলা শুকিয়ে এলো রোজের।জল তেষ্টায় ম*রন প্রায় অবস্থা। বোরকা ভেদ করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘাম কণা শরীর বেয়ে ঝরতে লাগলো।ভিতরটাকে পুরো আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ আগে দেখা পুরুষটাকে এখন তার খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া কোনো হিংস্র জানোয়ার মনে হচ্ছে। এতো আক্রশ লোকটার মধ্যে। কেননা পুরুষটা রোজের সামনে থেকে জুবায়েরকে টেনে হিঁচড়ে ওয়াশরুমের কাছে নিয়ে যাচ্ছে।যেনো কোনো মানব দেহ না কোনো বস্তা টানতে দেখতে পাচ্ছে রোজ।তবে জুবায়ের নামক নরপিশাচটা থেকে তো বেঁচে গেলো।ভয়ে তার বাকশক্তি লুপ্ত, কেবল গলার কাছে এক দলা কান্না আটকে আছে।

বিস্ফোরিত অক্ষিপলে ভাসছে সুঠামদেহি পুরুষটার করার নরকদৃশ্য।এতো বিভৎস করে কেউ কিভাবে কাউকে মারতে পারে।অন্তরাত্মা পানি শুকিয়ে এলো তার।দেখার মতো বিন্দু পরিমাণ পরিস্থিতি রইলো না।

এদিকে ইউভান জুবায়েরের শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটতে শুরু করলো।তাঁজা তাজা রক্ত তার মুখাবয়বে ছিঁটকে পড়ছে।এতো পৈশাচিকতার পরও তার মুখাবয়বে তার বিন্দুপরিমাণ লেশ মাত্র নেই।যেনো কোনো যন্ত্রমানব নৈঃপুন হাতে সবজি কাটায় ব্যস্থ।রুমে থাকা একটা রমণী যে তার করা নৃশংসতার পুরো দৃশ্য অবকলন করছে সে দিকেও ধ্যান নেই।ইউভান জুবায়েরের আল্লাহর জিহ্বাটা টেনে বের করে ছিঁড়তে নিলে তৎক্ষণাৎ পাশ থেকে বোরকা পড়া রমণীর ফিসফিস করা কান্নার শব্দ ভেসে এলো তার রন্দ্রে যেনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে বাগ্রা দিয়ে ফেলেছে মেয়েটা।

তৎক্ষণাৎ ইউভান হুড পকেট থেকে একটা এয়ারপিস বের করে দু কানে গুজে নিলো।একটা গান লাগিয়ে উচ্চশব্দে শুনতে লাগলো।আর জুবায়েরের মৃত শরীরকে টুকরো টুকরো করতে লাগলো।ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা পৈশাচিকতা।গানের এতো উচ্চ ভলিউম চলছিলো যে এয়ারপিস ভেদ করে তা রোজ হালকা শুনতে পাচ্ছিলো।একটা পুরুষ কতোটা সাইকো মাইন্ডেড হলে খুন করার মুহূর্তে বহিঃরাগত শব্দ যেনো কানে না যায় ,তার তাগিদে এয়ারপিসে গান লাগিয়ে শুনতে শুনতে ক্রাইম করতে পারে।রোজের চোখের মণি কোটায় যেনো এমন বিভসৎতা সাক্ষাৎ কেয়ামত।

Mommy Don’t know Daddy getting hot!
At the body shop,doing something unholy!
He sat back while,She be popping it!
Yeah she put it down!
slowly oh-eh,-,oh-eh,oh ehhhh!

জুবায়েরের গলার রগ কাটতে কাটতে ইউভান হঠাৎ তার অগ্নিধূসর দৃষ্টি বোরখা পড়া রমণীর দিকে ফেরালো। সেই চাউনিতে মৃত্যুবাণ ছিলো। সে তার রক্তমাখা হাত দিয়ে দেয়ালের বড় আয়নাটার ওপর রোজের উদ্দেশ্যে লিখে দিলো- “Your crying is very disgusting! If you want to stay alive, keep quiet! Fuking women!”

​রোজ কাঁপতে কাঁপতে আয়নার লেখাগুলো পড়লো। সে নিজের মুখ দুই হাতে চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল, “আমি মুখ বন্ধ রাখবো, কাউকে কিচ্ছু বলবো না! আমাকে মারবেন না!” তার চোখের মণি তখন সেই দান*বের ওপর স্থির। চোখ বন্ধ করলেও সেই পৈশাচিক দৃশ্য আর অগ্নিধূসর চাউনি ভেসে উঠছে বারবার।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো!এই চরম ত্রাসের মাঝেও রোজের অবচেতন মন একবারের জন্য হলেও সেই মাস্কের আড়ালের মুখটা দেখার তীব্র তৃষ্ণা অনুভব করলো।মুখাবয়ব দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেনো সর্বাঙ্গকে ঘ্রাস করে নিলো তার!

​হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল ‘খট খট’। মূহূর্তেই রোজ আঁতকে উঠলো।হায় খোদা!
ইউভান দরজার লেন্স দিয়ে দেখলো একজন ওয়েটার খাবারের ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,মূলত জুবারের জন্যে আয়েশের খাবার নিয়ে এসেছে।কিন্তু ইউভানের কাজ এখনো অসমাপ্ত।সুঠাম পুরুষালী দেহটা এবার প্রথমবারের মতো রোজের বোরখা পরিহিত আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখলো,উপর থেকে নিচ অব্দি। ইউভান আবার আয়নায় খসখস করে লিখলো-
​”Open the door! Take the food… but before that, just open your dress! Just remember, he shouldn’t know what’s happening inside, or I’ll slit your throat first!”

রক্তা*ক্ত লিখাগুলো পড়ে ​রোজের আত্মা কেঁপে উঠলো। পোশাক খোলার কথা শুনে সে স্তব্ধ হয়ে বড় বড় শ্বাস টানতে থাকলো।হায় খোদা!এখন কি করবে সে।কিন্তু পরমুহূর্তেই ইউভান আবার কর্কশভাবে আয়নায় হাত জোরে বারি মেরে রেখে লিখলো-
“Do as I say, or prepare to die????????????

​মৃত্যুভয় বড় বালাই। রোজ কাঁপতে কাঁপতে নিজের বোরখার বোতামগুলো খুলতে লাগলো। কালো বোরখাটা খসে পড়তেই বেরিয়ে এলো এক অপার্থিব সুষমা। কলাপাতার রঙা একটা সিল্কের শাড়ি, মেহেদি অনুষ্ঠানে পড়া। শাড়ির আঁচলটা তার তন্বী দেহের বাঁকে বাঁকে লুটিয়ে পড়েছে। হাত ভর্তি লাল মেহেদির আর ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা তার তপ্ত কাঞ্চন গায়ের রঙ যেনো বিষাক্ত কক্ষে এক ঝলক শীতল বাতাস বয়ে আনলো।

আয়নার প্রতিফলনে রোজের সেই মোহনীয় রূপ ফুটে উঠলেও ইউভানের সেদিকে খেয়াল ছিল না,সে তখন ওয়াশরুমের ভেতর জুবায়েরের দেহাবশেষ কাছে। রোজ কোনোমতে চোখের জল মুছে দরজাটা একটু ফাঁক করে খাবারের ট্রে-টা ভেতরে নিয়ে নিলো। ওয়েটারকে সে এমনভাবে বিদায় দিলো যেনো ভেতরে জুবায়েরের সাথে তার এক একান্ত মুহূর্ত কাটছে। ​ওয়েটার চলে যাওয়ার পর রোজ খাবারের ট্রে-টা নিয়ে ভেতরের দিকে হাঁটা দিলো। তার খোঁপা করা চুলের নিচ দিয়ে শাড়ির সরু পাড় আর ব্লাউজের বউ করা ফিতের ফাঁক গলে উন্মুক্ত অংশ দিয়ে তার দুগ্ধশুভ্র পিঠের অনেকটা অংশ দৃশ্যমান।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ইউভান ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আয়নার দিকে তাকালো।
​আয়নার প্রতিফলন দিয়ে ইউভানের তীক্ষ্ণ চাউনি সরাসরি গ্রাস করলো রোজের ফিতে ভেদ করা নগ্ন পিঠের ওপর থাকা তিনটা ক্ষুদ্র কালো তিলকে।তাদের মাঝে দূরত্ব থাকলেও ইউভানের অগ্নিধূসর চোখে এক মুহূর্তে আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠলো,কতোটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন সে যে দূরত্ব থাকা রমণীর পিঠের ক্ষুদ্র তিলকও তার চক্ষুর অগচরে গেলো না। তার চাউনি সেই শুভ্র উন্মুক্ত পিঠের ওপর প্রতিষ্ঠা করলো অমোঘ নিশানায়।

বিরাঙ্গনার মতো তেজ দেখানো রোজ মুহূর্তেই এক অসহায় লতা হয়ে কুঁকড়ে গেলো। ওয়েটার চলে যাওয়ার পর সে এক লহমায় নিজের দেহটাকে পুনঃরায় সেই কালো বোরখার আবরণে সযত্নে ঢেকে ফেললো। কিন্তু তার হূৎস্পন্দনের গতি যেনো থামছেই না। থরথর করে কাঁপতে থাকা আঙুল দিয়ে সে বোরখার কাপড়টা খামচে ধরলো। ভয়ে ভয়ে সে পেছনে ফিরে দেখলো সেই ছায়ামূর্তিটা রুমে নেই!

​ইউভানকে দেখতে না পেয়ে রোজের মনে এক বিচিত্র দোটানা শুরু হলো। এই নরকপুরী থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় কি এই সাইকো কিলার টা!জুবায়ের খাঁ তো এখন স্রেফ এক দলা পচা মাং/স। বাইরে তার সশস্ত্র বাহিনী পাহারায়। তারা যদি জুবায়েরের এই বিভী/ষিকাময় পরিণতি দেখে, তবে রোজের রক্ষা নেই!তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে সাগরে ভাসিয়ে দেবে ওরা।নাহলে জোবায়ের খাঁ এর মার্ডারার হিসেবে যেতে হবে জেলে। অথচ ওই ‘দানব’টার হাতেও তো মৃত্যু হতে পারে রোজের। কিন্তু রোজের মস্তিষ্কের এক কোণে অদ্ভুত এক যুক্তি খেলা করলো যদি মারারই হতো, তবে এতক্ষণ এই জাঁদরেল ঘা*তক তাকে জীবিত রাখতো???

​ম*রণভয় যখন মানুষের মগজ চিবিয়ে খেতে থাকে, তখন বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। রোজ এক পাঁ দু পাঁ করে ধীরলয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজার সামান্য ফাঁক দিয়ে যা দেখলো, তাতে তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেলো, নিশ্বাস আটকে গেল কণ্ঠনালিতে।

​ওয়াশরুমের ঝরনা থেকে তপ্ত জলধারা ঝরছে। আর সেই বাষ্পীভূত হ’ট শাওয়ারের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সেই ভয়ংকর সুদর্শন মার্ডারার ‘মনস্টার’ । ইউভান তার ঊর্ধ্বাঙ্গসহ পুরোসর্বাঙ্গ উন্মুক্ত নগ্ন করে ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে নিজের রক্ত দুয়ে সাফ করছে। ষোড়শী রমণীর চোখের সামনে ফুটে উঠলো এক আদিম ভাস্কর্য। পুরুষালীর ফর্সা চওড়া পিঠ জুড়ে কালো কালিতে আঁকা এক মাকড়সার ট্যাটু (Spider Tattoo),রমণীর অক্ষিপলে দৃশ্যমান হলো।রোজ অবচেতন মন আওড়ালো -পিয়ার্সিং করা কানে দুল। কার্টেন-কাট (Curtain cut) হেয়ার। শুধুমাত্র পিছন দিকটা দেখেই রমণীর ​সর্বাঙ্গে এক বিদ্যুৎ কম্পন আছড়ে পড়লো। এই দৃশ্যের তীব্রতা সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই। সে ছিটকে পেছনে সরে এসে দেওয়ালের সাথে মিশে গেলো। চোখ বন্ধ করতেই বারবার সেই মোহনীয় দৃশ্যটা তার চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে। সে কী দেখল?হায়!আল্লাহ তার নয়নযুগল যে পাপ করে বসলো।তবে একজন পুরুষের মাঝে একাধারে ধ্বংস আর সৌন্দর্যের এমন ভয়াবহ মেলবন্ধন কি সম্ভব??।রোজ কি ভ্রমে আছে।নাকি তার সাথে ঘটমান সকল কিছু বাস্তব। রোজ একবার বেলকনি দিয়ে লাফিয়ে নামার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হলো।পুনঃরায় দেয়ালে ঘেষে দাঁড়িয়ে অক্ষিপল বন্ধ করে নিলো।

​ ইউভান ঝরনা থেকে বেরিয়ে এসে তার রক্তমাখা হুডি আর মাস্কটা ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিতে লাগলো। জুবায়েরের আলিশান কামরায় থাকা অত্যাধুনিক ‘হিট-ব্লোয়ার’ আর ‘লন্ড্রি ড্রায়ার’ দিয়ে সে নিমিষেই তার কালো পোশাকগুলো থেকে রক্তের দাগ আর জল মুছে ফেললো।

​ইউভান যখন আবার তার হূডিটা পরে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো, তখন সে আবার সেই আগের মতো প্রাণহীন, যান্ত্রিক এক ঘাতক। তবে এইটুকু টের পেলো না যে এই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সে এক শুদ্ধ রমণীর তপ্ত হৃদয়ে কামনার বিষ আর বিভীষিকার বীজ রোপণ করে দিয়েছে।

​রোজ তখন জানালার পর্দাটা মুষ্টিবদ্ধ করা সমগ্রঃ অস্তিত্ব কাঁপছে। তার মনে হলো, এই পাষাণ মার্ডারার স্পর্শে আসার চেয়ে মৃত্যুও অনেক বেশি শ্রেয়। যদি লোকটা জুবায়েরের মতো তার সাথেও কোনো পাশবিক আচরণ করতে চায়? অথচ পরক্ষণেই রোজের চৈতন্যোদয় হলো এই অন্ধকার অরণ্যে ওই দানবের ছায়া ছাড়া তার প্রাণ বাঁচানোর আর কোনো দ্বিতীয় পথ অবশিষ্ট নেই।

তবে ইউভানের অগ্নিধূসর অক্ষিপল্লবে এই বোরখা পরিহিতা রমণী সম্ভবত একজন অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব আর মার্ডারের একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছাড়া আর কিছুই না।

​ইউভান তার হুডি টেনে নিয়ে বেলকনির কার্নিশের দিকে পা বাড়াতেই রোজের বুক চিরে এক আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। সে টলমল পায়ে এগিয়ে এসে অত্যন্ত ক্ষীণ ও ভয়ে থরথর স্বরে বলে উঠল-
“আ… আমাকে দয়া করে সাহায্য করুন! আমাকে এখানে ফেলে যাবেন না!”

​ইউভানের ঠোঁটের কোণে এক গাম্ভীর্য মেশানো পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠলো। যেনো তার ভেতরের সুপ্ত সত্তাটি এই মোক্ষম সুযোগটির জন্যই ওত পেতে ছিলো। রোজ কান্নায় ভেঙে পড়ে আবার বলল-

“খোদার কসম, আমি কারো কাছে মুখ খুলবো না! আমি এই পাপাচারের আস্তানার কেউ নই। ওই পিশাচটা আমার সর্বনাশ করতে চেয়েছিলো, আমি স্রেফ বেঁচে গিয়েছি,আ..আপনার কারণে,। আপনি আমাকে এই ন*রক থেকে দয়া করে বের করে দিন!কসম আল্লাহ এই মুখ দিয়ে আজকের ঘটনা কথা উচ্চারণও করবো না।”

​ইউভান একবারের জন্যেও পেছন ফিরে তাকালো না। কেবল ঘাড়টা সামান্য কাত করে তার নিঃশব্দ সম্মতি জানালো। এত সহজে এই ঘা*তক রাজি হয়ে যাবে, তা রোজের ক্ষুদ্র মস্তিস্ক ধরতে পারলো না। সে জানত না, ইউভানের মগজে তখন অন্য কোনো জটিল সমীকরণের জাল বোনা হচ্ছে।

অতঃপর দুবছর আগে সেই শ্রাবণের রাতে ​ইউভান অত্যন্ত সুকৌশলে বেলকনির কার্নিশ বেয়ে নিচে নেমে ক্লাব ত্যাগ করে।যা সে আগে থেকে লোকজন দিয়ে প্ল্যানিং করে রেখেছিলো। রোজও তার পিছু পিছু সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ক্লাবের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বাইরে পা রাখতে সক্ষম হয়েছিলো।

জনশূন্য নিঝুম রাতের রাস্তায় ইউভানের দ্রুতগতির হাঁটার সাথে পাল্লা দিতে রোজকে প্রায় দৌড়াতে হচ্ছে। ইউভান পুঃনরায় কানে এয়ারপিস লাগিয়ে নিয়েছে, হুডির ক্যাপটা মাথার ওপর টানা। তার হাঁটার ছন্দে এমন যেনো ঘন্টাখানিক যাবৎ কিছুই ঘটে নি। কিছুই না!নাথিং।

​নির্জন ঝাউবনের ছায়াঘেরা রাস্তায় ষোড়শীর মনে এক নিষিদ্ধ আকর্ষণের শিহরণ খেলে গেলো। সামনে এক নৃ*শংস কিলার,অথচ এই মুহূর্তে তার ছত্রছায়াতেই রোজ নিজেকে সবচেয়ে নিরাপদ বোধ করছে। এ কেমন বিচিত্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব!?অথচ রমণীর ছোট্ট মস্তিষ্ক এইটুকু বুঝলো না এই লোকটা কোনো সাধারণ মার্ডারর ছিলোই না, যে এক আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া।স্পাইডার লিডার।চট্টগ্রামে পাঁ রেখেছে নিজ স্বার্থে আর মিশনে।

​হঠাৎ রোজ নিজের কৌতূহল সামলাতে না পেরে পেছন থেকে ভয়াতুর আনমনে বলে উঠলো–
“আপনি… আপনি কি কোনো সন্ত্রাসের লোক? নাকি কোনো সিরিয়াল কিলার? কে আপনি?ভিনদেশী? “

​ইউভানের দিক থেকে কোনো প্রত্যুত্তর এলো না। সে যেনো এক জ্যান্ত পাথরের মূর্তি।রোজের পা আর চলছিলোনা,কোনো কিছুই চিনে না।এদিকে ভাবতে লাগলো তার বাড়িতে না জানি এখন কি চলছে তাকে না পেয়ে। রোজ এবার একটু উচ্চস্বরেই বলে উঠল-

“বলুন না, আপনি কি কোনো স*ন্ত্রাস? আপনাকে দেখতে ইংলিশ মুভির ভিলেনদের মতো ! এভাবে মুখ ঢেকে রেখেছেন কেন??”

যেনো এই রমণী আকাঙ্ক্ষা শেষ বারের জন্যে হলেও মুখদর্শন করার।ইউভান থেকে সেদিন কোনো প্রতিউত্তর আসেনি।না তার পুরুষালীর কন্ঠটা রোজ শুনতে পেয়েছিলো।

নিঝুম হাইওয়ের পিচঢালা রাস্তায় ইউভান এসে দাঁড়ালো। চারপাশ নিস্তব্ধ। তবুও খনে খনে কিছু গাড়ি চলাচল করছিলো।সেই মুহূর্তেই ইউভান রাস্তার মাঝখান দিয়ে হেঁটে রাস্তাপার হতে লাগলো।,তবে সম্মোহিতের মতো রোজও সেই ইউভানেরি পিছু গেলো।

ইউভান নিখুঁত ক্ষিপ্রতায় রাস্তা পার হয়ে গেলেও, রোজ মাঝপথে এসে থমকে দাঁড়ালো। ঠিক সেই মুহূর্তে এক দানবীয় ট্রাকের তীব্র হেডলাইটের আলো মেয়েটার বিস্ফোরিত বাদামী অক্ষিপল্লবে এসে পড়লো। এক বীভৎস ‘ক্র্যাশে নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গিয়েছিলো সেদিন।একটা বিরাট এক্সিডেন্ট।

​রোজের তন্বী দেহটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন পাঁপড়ির মতো ছিটকে পড়ে রাস্তার পাশে। বোরখা সরে গিয়ে বেরিয়ে আসে তার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত পাঁ।মাথায় প্রচন্ড পরিমাণে আঘাত লাগে। নিকাব চিরে নাক-মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া গাঢ় রক্ত তার মেহেদি রাঙা হাতকে আরও লাল করে দিয়েছে। ইউভান পাঁ থামিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো।আচমকা পিছনে ফিরলো ধীরপায়ে হুডির ক্যাপটা ফেলে দিয়ে রোজের দেহের কাছে আসতে লাগলো।

কিন্তু ভারী অদ্ভুত সেই নিয়তি ষোড়শী মৃত্যুশহ্যায় থেকেও নিভে আসা তার দৃষ্টি তখনো সেই ছায়ামূর্তির দিকে নিবদ্ধ। ইউভান এক পাঁ এক পাঁ করে রক্তাক্ত সেই দেহটার দিকে এগিয়ে এলো। যেনো কোনো যমদূত।হাঁটু গেঁড়ে বসলো রোজের মাথার কাছে।

বরফশীতল আঙুল রোজের নাকের কাছে ধরতে ঝুঁকতেই ইউভানের গলার ক্রস লকেটটা রোজের ললাট ছুঁয়ে যায়।ইউভান নিকাবের উপর দিয়ে দেখলো –নিঃশ্বাস এখনো চলছে।

​হঠাৎ ইউভানের স্থির দৃষ্টি স্থির হলো রোজের অনাবৃত পায়ের ওপর। মেয়েটার বাঁ পায়ের আঙুল ছয়টি এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য।সেদিন সেই নিকাব পরিহিতা মুসলিম নারীর হানি ব্রাউন নেত্রপল্লবে স্হির দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক বিধর্মী আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়ার মুখে অনিচ্ছাকৃত ভাবে প্রতিধ্বনি হয় –
“মাশাআল্লাহ!”

নিয়তির ভবলিলায় প্রত্যক্ষসাক্ষীর জা*ন কুরবান দিতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে নিষ্ঠুরমানবের মস্তিষ্কে স্হির হয়ে গেলো।

কিন্তু তার চেয়েও বেশি কম্পন সৃষ্টি হলো যখন ইউভানের অগ্নিধূসর অক্ষিপল রোজের হাতের তালুতে মেহেদির কারুকাজের মাঝে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা দেখলো
‘Dark Rose’।

​মুহূর্তে ইউভানের ইস্পাতকঠিন শরীরে এক বৈদ্যুতিক শিহরণ খেলে গেলো। তার পুরুষালি ভারী কণ্ঠস্বর থেকে এক হাড়হিম করা গুঞ্জন প্রতিধ্বনিত হলো।
“Dark Rose!?????

​সে তার প্যান্টের পকেট থেকে বের করলো একটা শুকনো কালো গোলাপ।ইউভানের সবচেয়ে অকৃষ্ট করা ফুল।যা সে প্রায়সই সাদা গোলাপকে ডাই স্প্রে করে কালো বানায়।এই পৃথিবীতে কালো গোলাপ কই পাবে??

মৃতপ্রায় রমণীর হাতে তার ডার্করোজ লিখা দেখে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলো বেশকিছুক্ষণ।​এক রক্তিমাভ সূচনালগ্নে ইউভানের পাথুরে মন চাইলো শেষবারের মতো এই রহস্যময়ী রমণীর মুখচ্ছবিটি দেখতে। সে যেই নিকাব সরাতে হাত বাড়ালো, অমনি দূরে পুলিশের সাইরেন আর গাড়ির আলোর রেখা দেখা গেলো।তারা এদিকেই আসছে। মুহূর্তেই সেদিন ইউভান সেই মোহ ত্যাগ করে অন্ধকার ঝাউবনের আড়ালে মিশে গিয়েছিলো।

চলবে?

❌পরবর্তী পর্বেই দু’বছর আগের বাকি অংশটুকু সংক্ষিপ্ত করে অতীত থেকে একেবারে গল্পের প্রথম পর্ব পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে।তারপর স্পষ্ট ধারণা চলে আসবে সবার।কিভাবে কি হলো।⛔

⛔এই পর্বে আপনাদের মনে সংশয় কাজ করতে পারে।
ইউভানকি রোজকে চিনতো???
উঃঅবশ্যই না!

⛔বরং রোজ একটা মার্ডারের উপর ক্রাশ খেয়েছিলো।🤐খু*ন করতে দেখার পরও হ্যাঁ। যাকে সে এখন তীব্রভাবে ঘৃণা আসনে বসিয়েছে।

past to be continue!……

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply