Born to be villains Golpo romantic golpo

born to be villains পর্ব ২৪


born_to_be_villains

methuburi_মিথুবুড়ি

পর্ব_২৪

❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌

পিয়ানোর নরম, ঝরঝরে সুরে চোখ মেলে ধরার চেষ্টা করল এলিজাবেথ। কিন্তু ঘুমের ইনজেকশনের তীব্রতায় চোখের পাতা পুরোপুরি খুলে না। ঝাপসা দৃষ্টির ভেতর কেবল বোঝা যায় কেউ একজন উল্টো দিকে বসে পিয়ানো বাজাচ্ছে। নড়তে চাইল সে। শরীর সাড়া দিল না। নিজের অস্তিত্ব আবিষ্কার করল একটি চেয়ারে বন্দি অবস্থায়। হাতল আঁকড়ে ধরে উঠতে চাইল, তাও পারল না। শরীরে একবিন্দু শক্তিও নেই। বারবার চেষ্টা করতে গিয়ে পেটের কাচা সেলাইয়ের জায়গায় চাপ পড়তেই মৃদু আর্তনাদ বেরিয়ে এলো,

“আহহহ!”

‘এলিজাবেথের ব্যথাতুর শব্দে থমকে গেল তার আঙুল। থেমে গেল পিয়ানোর নরম স্বর। সে ধীরে পিছন ফিরে তাকাল। এলিজাবেথের মাথা বারবার কাত হয়ে পড়ছে। সোজা হয়ে বসে থাকতে পারছে না। কালো ওভারকোট পরা লোকটি সামনে এসে একটি চেয়ার টেনে নিল। একদম কাছে এসে বসল। খুব কাছে। যতোটা কাছে থাকলে একজনের নিঃশ্বাস আরেকজনের মুখে পড়ে। পুরুষালি বিমুগ্ধকর চাহনিতে চেয়ে সে সামনের অগোছালো চুল সরাতে হাত বাড়াতেই এলিজাবেথের হাত বাঁধা দিয়ে উঠল। বিরক্তবোধ করল সে। এলিজাবেথ জড়ানো কণ্ঠে কিছু বলতে চাইলে সে হিসহিস করে থামিয়ে দিল,

“উঁহু… নড়ো না। আমাকে দেখতে দাও। দুই বছরের তৃষ্ণা মেটাতে দাও, লিলি। তোমার চোখে চোখ রেখে মরতে দাও আমায়। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে দাও। একটু ব্যথাহীন বাঁচতে দাও আমায়৷”

‘এলিজাবেথ তাকাতে পারছে না। মানুষটার মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে না চোখে। ভেতরে ভেতরে যে ছটফটানি, যে আতঙ্ক তা প্রকাশের কোনো উপায়ও নেই। শরীর অবশ, কণ্ঠ স্তব্ধ।

সামনের মানুষটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে এলিজাবেথের দিকে। তৃষ্ণাত চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তৃষিত কণ্ঠে বলে ওঠে,

“তুমি হারিয়ে যাওয়ার পর পথ তো ছিল অনেক।
কিন্তু পা এগোয়নি। চোখ মুগ্ধতা খুঁজে পায়নি, হৃদয় কোনো টান অনুভব করেনি। থমকে যাওয়া মস্তিষ্ক শুধু তোমাকেই খুঁজে গেছে। দেখো, খুঁজতে খুঁজতে আজ তোমাকেই পেয়ে গেছি। কে বলে স্রষ্টার কানে সৃষ্টির আর্তনাদ পৌঁছায় না? ভালোবাসায় যদি স্বচ্ছতা থাকে, তবে অসম্ভবও একদিন সম্ভব হয়ে যায়।”

‘কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ ছলছল করে ওঠে। একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে এলিজাবেথের হাতের ওপর। এলিজাবেথ কেঁপে ওঠে। নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায়, কিন্তু শরীর আজ তার সঙ্গে চরম বেঈমানি করছে। কণ্ঠটা চেনা চেনা। ভয়ংকরভাবে চেনা। হঠাৎই সব পরিষ্কার হয়ে যায় তার ভেতরে। এটা সুরাকার। সেই শয়তান।

কাঁপছে সুরাকারের গলা,”স্যরি, লিলি… স্যরি। খুব করে স্যরি। আমাকে ভুল বোঝার জন্য স্যরি,তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য স্যরি, তোমাকে কাঁদানোর জন্য স্যরি,
তোমাকে ব্যথা দেওয়ার জন্য স্যরি…”বলতে বলতে সে এলিজাবেথের পায়ের পাতায় হাত রাখল। নিগূঢ় ঠোঁটের স্পর্শ ছুঁইয়ে দিল সেখানে। তারপর জড়িয়ে আসা কণ্ঠে আবারও ফিসফিস করে বলল,”তোমাকে ভুল বোঝার জন্য আবারও স্যরি।”

‘মুখ তুলে তাকাল সে। চোখে একরাশ ভাঙা আফসোস।

“সত্যিই আমি বোকা, লিলি। নইলে কীভাবে ভাবি আমার লিলি ফুল আমাকে ছেড়ে পালিয়ে এসেছে।”

‘তারপর হঠাৎ করে কিছু যপন ভেঙে গেল তার ভেতরে। মুহূর্তের মধ্যে সে একটা হকিস্টিক তুলে চারপাশে যা ছিল, একে একে সব ভাঙচুর শুরু করল। হিংস্র গর্জনের সাথেত কণ্ঠ ফেটে বেরোতে লাগল,

“তোমার নিঃশ্বাসে যদি আমার নাম না থাকে, বিশ্বাস করো—তোমার নিঃশ্বাস চলবে না। এক মুহূর্তও বাঁচতে দেব না আমি।”

হঠাৎ সে থামল। আবার এগিয়ে এলো এলিজাবেথের কাছে। হাঁটু গেড়ে বসল। দু’হাতের আজলায় এলিজাবেথের মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,

“ভয় পেও না, জান। আমি কীভাবে মারি তোমায়?
তোমায় খুব ভালোবাসি যে…”

‘তার ছোঁয়ায় এলিজাবেথের অস্বস্তি ক্রমশ বাড়তে থাকে। সে তীব্র চেষ্টা করে মুখ তুলে তার চোখের দিকে তাকানোর। কিন্তু তার আগেই সুরাকার এলিজাবেথের কপাল ঠেকিয়ে দিল তার কাঁধে। ভেজা গলায় অনুনয়ের সাথে ফিসফিস করল,

“যে খেলায় নেমেছি… মরতে তো হবেই। মরার আগে চলো না, কিছুদিন একসাথে বাঁচি। এককে অপরের বাহুতে মিশে থাকি… ঠিক যেভাবে নারীর অঙ্গে মিশে থাকে কলঙ্ক।”

‘সে আরও ঘনিষ্ঠ হতে যাবার মুহূর্তে নিচ থেকে হঠাৎ পায়ের শব্দ ভেসে এলো। সর্তক হয়ে সুরাকার ওঠে দাঁড়াল। জানালার দিকে নজর দিয়ে দেখতে পেল রিচার্ড দ্রুত দৌড়ে আসছে। আজকে দ্বিতীয়বার সে রিচার্ডকে দেখে। সেদিনের মতো আজকের দৃশ্যটি তার মস্তিষ্কে চাপ ফেলে। যার ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। চোখের সামনে সবকিছু ক্রমশ ঝাপসা হতে লাগল। অজ্ঞাত মস্তিষ্ক চেষ্টা করলেও বুঝতে পারছে না, রিচার্ড কীভাবে এত দ্রুত পৌঁছে গেল। হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল এলিজাবেথের গলায়। একটা রিং।
এই রিংটি রিচার্ডই বিয়ের দিন দিয়েছিল। পরবর্তীতে সেটি চেইনের সঙ্গে ঝুলিয়ে এলিজাবেথ গলায় রাখে। সুরাকার বুঝতে পারল, এই রিংয়ের ভেতরই নিশ্চয় কোনো ডিভাইস আছে,যেটা দিয়ে ট্র্যাক করে রিচার্ড এতো দ্রুত এখানে পৌঁচেছে। পায়ের শব্দ ক্রমশ কাছে আসছে। মস্তিষ্কের চাপ বাড়ছে।দূর্বল অবস্থায় শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলা করা নিছক বোকামি। সুরাকার দ্রুত জানালা দিয়ে নিচে লাফ দিল। রিচার্ড যখন উপরে পৌঁছাল, দেখতে পেল কেউ ঝাঁপ দিয়ে নিচে নেমেছে। কিন্তু সে সরাসরি সেই দিকে ছুটল না। ঝড়ের বেগে দৌড়ে গিয়ে এলিজাবেথের কাঁধে ড্রাগস পুস করতেই সে তার বুকে ঢলে পড়ল।

রিচার্ড আলতো করে এলিজাবেথকে চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর কাকে যেন দ্রুত ফোন করে নির্দেশ দিল ওকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এরপর আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। শিকারী যেমন ঝড়ের গতিতে শিকারের পিছু নেয়, ঠিক তেমনই সে নেমে পড়ল শিকার ধরতে। ছুটে গিয়ে বাইকে চড়ল। যেদিক থেকে আগে বাইকের শব্দ ভেসে এসেছিল, সেদিকেই ধেয়ে গেল। স্পিড মিটারে চোখ রাখতেই দেখা গেল প্রথম ধাপেই স্পিড সত্তর প্লাস।

অন্যদিকে, মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে রক্ত চলাচল হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠায় সুরাকার প্রথমে বাইকে গতি তুলতে পারছিল না। কিন্তু পেছন থেকে আরেকটি বাইকের এক্সেলেটরের হিংস্র গর্জন কানে আসতেই তড়িৎ মস্তিষ্ক সজাগ হয়। রিয়ার মিররে তাকিয়ে দেখল পিছনে রিচার্ড। হেলমেটের আড়ালে মুখ দেখা না গেলেও যে উন্মত্ত গতিতে সে এগিয়ে আসছে তাতে স্পষ্ট সে আর কেউ নয়—ব্লাডিবিস্ট রিচার্ড কায়নাত। সঙ্গে সঙ্গে ম্যাডবিস্টের ঠোঁটের কোণে খেলে গেল এক চিলতে হাসি। আজ খেলা জমেনি সেটা ঠিক। তবুও দীর্ঘদিন পর যে রাইডটা জমতে চলেছে এটুকুই তার জন্য যথেষ্ট। অনেকদিন রেস হয়নি। আজ শিকার আর শিকারীর মাঝখানে রাস্তাই হবে অ্যারেনা।

পরমুহূর্তেই সুরাকার পেশাদার রাইডারের নিখুঁত ভঙ্গিতে বাইকের থ্রটল চেপে ধরল। ইঞ্জিনের গর্জন মুহূর্তের মধ্যেই বাতাসের কোমলতা ছিঁড়ে দেয়। তবে পেছনে রিচার্ড একচুলও দমল না গ্রিপে বলশালী দু’হাত শক্ত করে ধরে এক ঝটকায় স্পিড বাড়াল। তার তীক্ষ্ণ চোখের শিকারী দৃষ্টি স্থির হয়ে সামনে থাকা ম্যাডবিস্টের ওপর গেঁথে আছে।

আজ আর কোনো স্পোর্টস বাইক নয়।
দেশি বাইক হয়েও ম্যাডবিস্ট যেভাবে মেশিনটাকে নাচাচ্ছে, মনে হয় এটা তার প্রিয় খেলনা। এক্সেলেটরের বিকট চিৎকার আর চাকার কর্কশ ঘর্ষণে চারপাশের সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে আছে। কারোর মধ্যে সিগন্যাল মানার কোনো বালাই নেই। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল তিনশো ফিট রোডের দিকে। বাংলাদেশের হাতে-গোনা জ্যামমুক্ত সড়কের মধ্যে তিনশো ফিট একটি। এটাকে বলা যেতে পারে মৃত্যু-স্ট্রিপ।

তিনশো ফিটে ঢোকার ঠিক আগমুহূর্তে কুড়িল বিশ্বরোডে একজন ট্রাফিক পুলিশ হাত তুলে থামতে বলল। ম্যাডবিস্ট ব্রেক টানল না। উল্টো বাইক ছুটিয়ে দিল তার দিকেই। শেষ সেকেন্ডে পুলিশটা ঝাঁপ দিয়ে সরে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায়। সামনে ম্যাডবিস্ট গুলির মতো মিলিয়ে গেল। পিছনে পড়ে রইল রিচার্ড। আরেকজন পুলিশ তুমুল গতিতে এগিয়ে এসে বাধা দিতে চাইলে রিচার্ড এক মুহূর্তও ভাবল না। সোজা টুলবক্সের ওপর দিয়েই বাইক তুলে দিল। আর তারপরই শুরু হলো ভয়ংকর এক রেস। রাস্তা সংকুচিত হচ্ছে। স্পিড বাড়ছে। বাতাস ছুরি হয়ে গাল কাটছে। দুইটা বাইক, দুইটা শিকারী একটা রোডে ধোঁয়া আর মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়ে ছুটছে শুধু। তবে ম্যাডবিস্ট ছিল এগিয়ে। সে থ্রটল পুরো খুলে দেয়। বাইকটা এবার যেন হাওয়ার ওপর ভাসছে। সামনে ফাঁকা তিনশো ফিট। স্পিডোমিটারের কাঁটা লাল দাগ ছুঁয়ে কাঁপছে।

পিছনে থাকা রিচার্ড অধরের এক কোণ বাঁ’পাশে হেলিয়ে হাসল। তারপর এক হাতে গ্রিপ শক্ত করে ধরে, অন্য হাতে কোমর থেকে পিস্তল বের করে আনে। এরপরই গুলির শব্দ বাতাস ফেটে বেরোয়। কিন্তু সামনের জনও যে কম যায় না। আত্মরক্ষার্থে ম্যাডবিস্ট মাথা নিচু করে বাইক ঝুঁকিয়ে দেয়। গুলির ঝাঁঝ তার কানের পাশ ঘেঁষে সাইনবোর্ডে আঘাত করে। পরমুহূর্তেই সে হঠাৎ ব্রেক ট্যাপ করে সাইড-স্লিপ দেয়। ধুলো আর ধোঁয়ার পর্দা তুলে দেয় রিচার্ডের সামনে। এতেও রিচার্ড দমে না। মুভির নির্বিক হিরোর মতো সে ফুটরেস্টে দাঁড়িয়ে পড়ে। শরীর একপাশে হেলিয়ে ধুলো ভেদ করে আরেক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। ম্যাডবিস্ট বাইকটা প্রায় শুইয়ে ফেলে। চাকা আর অ্যাসফল্টের মাঝে একচুল ফাঁক রেখে গুলি এড়িয়ে যায়। এক সেকেন্ডের জন্য দু’জনের চোখ লক হয় শিকার আর শিকারীর নীরব চ্যালেঞ্জ। তারপর হঠাৎই ম্যাডবিস্ট ডান লেন কাট করে। বাঁ দিকে ফ্লাইওভারের ছায়া। রিচার্ড ঝাঁপিয়ে পড়ে তার পিছু নেয়। স্পিড এত বেশি যে রাস্তার লাইটগুলো স্ট্রোব লাইটের মতো ভেঙে ভেঙে ঝলসে উঠছে। সামনে একটা তীক্ষ্ণ বাঁক। শেষ মুহূর্তে ম্যাডবিস্ট হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ড্রিফট দেয়। সাথে সাথে পিছনের চাকা আঁচড় কেটে আগুনের ফুলকি ছিটিয়ে দেয় । রিচার্ডও থামে না। বাইকটা প্রায় উল্টে বাঁক নেয়। তার কাঁধ ছুঁয়ে যায় গার্ডরেল। এরপরই আরেকটা ঠাস শব্দ। ম্যাডবিস্ট দ্রুত বাইক সোজা করে নেয়। হঠাৎ গতি বাড়িয়ে গুলির লাইনের বাইরে চলে যায়। তবে দৃষ্টিসীমা ছাড়াই না। সে যেন ইচ্ছে করেই ধরা দিচ্ছে না, আবার পালিয়েও যাচ্ছে না।

আর কিছুদূর যেতেই হঠাৎ করেই রিচার্ডের বাইকের চাকা পাঞ্জার হয়ে যায়। ব্লাডিবিস্ট থেকে ম্যাডবিস্ট এমনিতেই অনেকটা এগিয়ে ছিল। তার ওপর এবার বাইকও বিকল। রাগ আর ক্ষোভে রিচার্ড নিজের চুল খামচে ধরে। পরপর কয়েকবার সজোরে লাথি মারে বাইকের চাকায়।

রিচার্ড দুর্দান্ত এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও স্বীকার করতেই হয়, সুরাকারের বাইক রাইডিং স্কিল একদম অন টপ। রিচার্ডের মতো আরও কয়েকজন দুর্ধর্ষ রাইডারের সঙ্গেও টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। প্রশিক্ষিত স্পোর্টস রাইডারের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে সে বাইক চালায়। প্রকৃতিও বাধ্য হয়ে মেনে নেয় ফাইটার পাইলট রিচার্ড আকাশের রাজা হলেও, বাইকার সুরাকারই জমিনের রাজা।

“বস! হেয়ার ইজ ইয়্যুর টয়।”

‘খাঁ খাঁ করা বিরক্তিকর নিস্তব্ধতার মাঝেই ভেসে এল চেনা সেই স্বর। রিচার্ড কপালে কুঞ্চন ফেলে পিছনে ফিরল। দেখতে পেল লুকাস আর ন্যাসোকে। লুকাস ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে ন্যাসোর গাড়ির দিকে এগোতে এগোতেই চাবিটা ছুড়ে দিল রিচার্ডের দিকে। বাঁকা হাসিতে চোখ টিপল সে।
মুহূর্তের মধ্যেই রিচার্ডের চোয়ালে ফিরে এল বিজয়ের ঝলক। নিখুঁত এক ক্যাচে চাবিটা ধরে ফেলল সে। অতঃপর আর এক দণ্ডও দেরি না করে গিয়ে বসল তার পছন্দের বিএমডব্লিউতে। সে যেমন দুর্দান্ত ফাইটার পাইলট, তেমনি খাঁটি কার ফ্রিক। হাইস্কুল লেভেল থেকেই স্পোর্টস কার চালায়। বাইকের প্রতি আলাদা শখ না থাকলেও, অল্প বয়সেই ড্রাইভিংয়ের দক্ষতা সে নিখুঁতভাবে আয়ত্তে এনেছিল।

‘তারপর? এবার শুরু হবে আসল খেলা। সঙ্গে তার প্রিয় গাড়ি, প্রিয় সঙ্গী আর কীই বা লাগে? এবার তারা আর মানুষ কিংবা বসে বডিগার্ড হয়ে নয়, বাজপাখির দলের মতো একসাথে চাকার কর্কশ আর্তনাদ তুলে শিকারীর পেছনে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। সামনে কালো ছায়ার মতো ছুটে চলেছে সুরাকার। তখনও তার বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন বাতাস চিরে দিচ্ছে, টায়ারের ঘর্ষণে কেঁপে উঠছে রাস্তা। হেলমেটের ভেতর হ্যাজেল চোখ দুটো সামনে স্থির। পেছনে তাকানোর কোনো প্রয়োজনই বোধ করছে না।

‘তখনি হঠাৎ পেছনে রিচার্ডের গাড়ি গর্জে ওঠে। স্টিয়ারিংয়ে দু’হাত শক্ত করে চেপে ধরে প্যাডেলে চাপ বাড়ায় সে। স্পিডোমিটারের কাঁটা দাউদাউ করে লাফিয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই সুরাকারের খুব কাছে পৌঁছে গেল রিচার্ড। তার গাড়ির পাশাপাশি ছুটছে ন্যাসোর গাড়ি। লুকাস সিটবেল্ট আঁকড়ে বসে আছে। ভয়ে তটস্থ সে। ন্যাসো জানালা নামিয়ে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে,

“ডান লেনে কাটবে, বস!”

‘ঠিক সেই মুহূর্তে সুরাকার হঠাৎ লেন বদলায়। এক ঝাঁকুনিতে বাইকটা ট্রাফিকের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেল। রিচার্ডের চোখে আগুন জ্বলে ওঠে। রক্তঝরা ক্রোধে
চোয়াল শক্ত হয়ে মটমট করে। দাঁতে দাঁত চেপে স্টিয়ারিং ঘোরায় সে। গাড়ির চাকা চিৎকার করে উঠলেও কন্ট্রোল ছাড়ে না। রাতের শেষ প্রহরে রাস্তাজুড়ে হর্ন, ব্রেক আর আতঙ্ক একসাথে ভেজা শিশিরের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

সুরাকার সামনে যা পাচ্ছে, তাকেই অস্ত্র বানাচ্ছে। কখনো বাসের গা ঘেঁষে, কখনো ট্রাকের নিচে প্রায় ঢুকে গিয়ে আবার বেরিয়ে আসছে। রাগ, ক্ষোভ আর উত্তেজনায় ন্যাসো দাঁতে দাঁত পিষে চিৎকার করে করে বলল,

“বস, ও আমাদের খেলাচ্ছে।”

“না”, রিচার্ডের দৃষ্টি তখনও স্থির, শীতল। বাজপাখির মতো শাণিত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে সুরাকারের বাইকের দিকে। কণ্ঠে বরফঝরা শীতলতা, “ও আমাদের লিড দিচ্ছে।”

‘পরক্ষণেই সে ধ্বংসাত্মক থাবায় গিয়ার নামাল। এক ঝটকায় গাড়িটা বিপদসীমা ছাড়িয়ে গিয়ে চূড়ান্ত স্পিড তুলল। ধীরে ধীরে কমতে লাগল দূরত্ব। বাইক আর গাড়ির মাঝখানের ফাঁকটা এবার আর আগের মতো নিরাপদ রইল না। ঠিক তখনই আকাশে ভেসে উঠল একটি হেলিকপ্টার। যা ম্যাডবিস্টের বাইককে ফলো করছে। এটি আর কেউ নয়, অফিসার প্রেম। একই সঙ্গে ন্যাসো যেন হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। চারপাশ হঠাৎ অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ঢেকে গেল। শব্দ থেমে গেল, বাতাস থমকে দাঁড়াল।

তবে তার পরই হঠাৎ সামনে থেকে প্রলয়ের মতো ঝাঁপিয়ে এল ন্যাসোর গাড়ি। পেছন থেকে তেড়ে এল রিচার্ড। দূর থেকে চোখে চোখ রেখে দু’জনেই বাঁকা ঠোঁটের হিংস্র হাসি দিল। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো স্পিড বাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে আসতে লাগল সুরাকারের দিকে। সামনে-পেছনে রাস্তা রুদ্ধ। সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সুরাকার বুঝতে পারে এই শিকারিরা সাধারণ কেউ নয়। রিচার্ড আর ন্যাসো একসাথে প্রস্তুত। পরিস্থিতি এমন যে খেলা এখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ শেষটা কেমন হবে, সেটা কেউ জানে না। তারা যে তাকে পিষে ফেলার প্ল্যান করেছে এই সত্য বুঝে সুরাকার নিম্ন অধর কামড়ে কুটিল হাসল। চোখেমুখে একফোঁটাও ভয় নেই। যারা তাকে জীবন্ত চূর্ণ করতে আসছে, তাদের থেকেও যে সে ভয়ংকর এ বিশ্বাস তার রক্তে।

হঠাৎ শরীর ঝুঁকিয়ে সে নেয় শেষ এক রিস্কি মুভ।
নিখুঁত এক বাঁকে দুই গাড়ির মাঝখান থেকে সরে যেতেই তুমুল গতিতে ছুটে আসা গাড়ি দু’টো একসাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তে উল্টেপাল্টে যায় দু’টোই। দূর থেকে দৃশ্যটা দেখে সুরাকার বাঁকা হাসল। কিন্তু ঠিক তখনই অনুভব করল বুকের বাঁ পাশে অজান্তেই চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। সে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। এবার পিছু ছাড়াতে হবে অফিসার প্রেমকে। আর তাকে কীভাবে পিছু ছাড়াতে হয় সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। পরক্ষণেই সুরাকার ছুটে ঢুকে পড়ল জঙ্গলপথে। যাওয়ার আগে তাদের উপর তাচ্ছিল্য করে বলে গেল,

“এ বাইক? ইট’স নট জাস্ট এ মেশিন—ইট’স মাই ফেভারিট টয়।”


‘এলিজাবেথ একদৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে নেই প্রাণ, নেই সজীবতা। তার অপারেশন সাকসেসফুলি সফল হয়েছে আজ আঠারো দিন। ডিস্টার্চ আরও চারদিক আগেই দেওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক ভাবে এলিজাবেথের শরীরে ড্রাগস পাওয়া যায়। তবে তা কোনো ক্ষতিকর ড্রাগস ছিল না। মানব মস্তিষ্ক থেকে ক্ষণিকের কিছু স্মৃতি ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য এই ড্রাগস ব্যবহার করা হয়। ড্রাগসের ব্যাপারে এলিজাবেথ কিছুই জানে না।

ছোটবেলা থেকেই এলিজাবেথের দু’টো কিডনি তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি ধীরে ধীরে অকেজো হতে শুরু করেছিল। তবুও খনোই এলিজাবেথ অপারেশন করাতে রাজি হয়নি। ইমান ওয়াসিম বারবার চেষ্টা করেছিলেন, সব আয়োজন করেছিলেল। কিন্তু এলিজাবেথ কখনোই তার জীবন অন্য কারোর ঝুঁকিতে ফেলার বিনিময়ে সুস্থ থাকতে চায়নি। কিন্তু এবার যা হলো, তা এলিজাবেথের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সবাই ভেবেছিল জ্ঞান ফেরার পর সে হয়তো চিৎকার চেচামেচি শুরু করবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে এলিজাবেথ নিস্তব্ধ থেকেছে। চোখ খুলেই সে শুধু হালকা কণ্ঠে ছোট্ট করে হিয়ার কাছে জানতে চেয়েছে সে এসেছে কিনা।

হিয়ার উত্তর ছিল ব্যথায় জড়ানো। সেই ব্যথা বুকে চেপে নিয়েই সে দু’দিন ধরে অপেক্ষা করে আছে। অপেক্ষা, স্বামী নামক অচেনা মানুষটা যদি একবার আসে। একবারই। স্ত্রীর অসুস্থতার খবর পেয়ে যদি ছুটে আসে। তার শক্ত বুকে যদি তাকে জড়িয়ে ধরে। চাওয়া তো কেবল এটুকুই ছিল৷ এর বেশি কিছু না। তবু লোকটা এলো না। এত বড় একটা অপারেশন হয়ে গেল, তারপরও না। প্রিয়ার প্রতি প্রিয়োর কি এতটাই পাষাণ হওয়া জায়েজ?

অর্ক, গৌরব, হিয়া আর ইবরাত স্নান মুখে এলিজাবেথের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রতিদিন তিনবেলা করে তারা এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা করতে আসে। কিন্তু একদিনও কোনো কথা হয় না। এলিজাবেথ যেন থেকেও নেই। ওরা আসে, অসহায় চোখে দেখে ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হতে থাকা এলিজাবেথকে, তারপর নীরবে ফিরে যায়।

‘দীর্ঘক্ষণের একগুঁয়ে নির্জীব দৃষ্টি ভঙ্গ করে এলিজাবেথ তাকাল ইবরাতের দিকে। গলায় জোর নেই, তাও ক্ষীণ স্বরে ফের বেহায়ার মতো জানতে চাইল,

“সে আসেনি?”

‘ইবরাত বিরস মুখে মাথা নাড়ায়। এলিজাবেথ চোখবুঁজে। বিরহের ভারে তাচ্ছিল্য করে ঠোঁটের এক কোণ কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো। অথচ নিরস মুখের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল যন্ত্রণা মাখা অশ্রু।

তখনই কেবিনে প্রবেশ করল ইমান ওয়াসিম আর মিসেস নীহারিকা। বাবার উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্র চোখ বন্ধ অবস্থাতেই অকস্মাৎ এলিজাবেথ বলে উঠল,

“আব্বু আমি বিয়ে করব।”

‘ইমান ওয়াসিম চমকান, আতঙ্কিত হোন। তার বিস্ফোরিত দৃষ্টি ছিটকে গেল এলিজাবেথের রক্তশূণ্য মুখে। এলিজাবেথ নির্লিপ্ত৷ অনুভূতিশূণ্য চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইমান ওয়াসিমের কণ্ঠে কম্পন,

“কা–কে?”

‘এলিজাবেথ তাকাল অর্কের দিকে। এমনিতেই সকলে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারমধ্যে আবার এলিজাবেথ অর্কের দিকে তাকাতেই অর্কের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। রসগোল্লার মতো বড়ো বড়ো যায় অর্ধনিমীলিত চোখ। অর্ক আতঙ্কিত মুখে মাথা নাড়াতে থাকে।

এলিজাবেথ বলল,”অর্ককে।”

হাড়হিম করা আতঙ্কে অর্ক চিৎকার করে ওঠে,”কুত্তার বাচ্চা, আমার সংসার ভাঙিস না ভাই। আমি মইরা যামু বউ ছাড়া৷”

বলতে বলতে অর্ক ঢলে পড়ে। গৌরব দ্রুত ছুটে গিয়ে অর্ককে আগলে ধরে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ইবরাত কিছুটা নড়ে উঠল। ঢোক গিলে শুকনো চৌচিরে গলাটা সিক্ত করল প্রথমে। তারপর শান্তমূর্তি এলিজাবেথের দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো তেজদীপ্ত স্বরে খেঁকিয়ে উঠল,

“ও শালি! এটা আমার ভাই। ভাইকে দুলাভাই হিসেবে মানতে পারবো না আমি।”

হিয়া নিরব দর্শক। বিস্ময়ের তরঙ্গ তার চোখে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে স্পন্দন তুলছে অবিশ্রাম। গৌরব অর্ককে পাশের বেডে শুইয়ে। বুলেটের গতিতে যায় মুখ চলে, বিস্ময়ে বিবর্জিত হয়ে আজ সেও আমতা-আমতা করে,

“আ-আআআআ… আম..আমিও। আমিও পারবো না এই গেউতজ্জামানকে বোনের জামাই হিসেবে মেনে নিতে। তাছাড়া এই কালেম জন্মের কিপটে। বিয়ের পর তোকে হানিমুনে নিয়ে যাওয়া তো দূর, আমাদের গেইটের টাকায় দিবে না। এই বিয়ে অসম্ভব!”

“এই বিয়ে হবে। আমার মেয়ে যা চাই, তাই হবে। অর্ক পরিবারের সাথে কথা বলুন, ইমনের বাবা।”

সকলে চমকে মিসেস নীহারিকার দিকে তাকাল। মিসেস নীহারিকা দৃঢ়তাপূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে। এলিজাবেথের মধ্যে এখনও কোনো নড়চড় নেই। মাঝ থেকে ইবরাত লাফিয়ে ওঠে বলল,

“আন্টি অর্ক গে।”

ওর পরপরই চেঁচিয়ে উঠল গৌরব,”নাআ না না… আন্টি অর্ক বাই।”

“কি-হ?”

ইবরাত আর গৌরব একসাথে মিসেস নীহারিকার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একযোগে মাথা নাড়িয়ে কণ্ঠনালির লম্বা হাড় বৃদ্ধাঙ্গুল আর তর্জনী দিয়ে চেপে ধরে বলল,

“জি আন্টি। সত্যি বলছি। একদম কালকার কসম৷”

‘ওদের ছলাকলা বুঝতে পেরে মিসেস নীহারিকা গম্ভীর হয়ে উঠলেন,”তোমরা কি সবাই মিলে আমার সাথে মস্করা করছো?”

“না আন্টি। বন্ধুর জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছি৷”

মিসেস নীহারিকা এবার কিছু তিক্ত বাক্য ছুড়তে যাবে তার আগেই সকলের কথার মাঝে ফুলস্টপ বসিয়ে দিলেন ইমান ওয়াসিম,

“এই বিয়ে হবে।”

‘আপনারা যারা নিয়মিত পাঠক আছেন, তারা একটা করে রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন। রেসপন্স করবেন। রিচ একদম না থাকলে মানা যায়। কিন্তু এক পোস্টে খুব, আরেক পোস্টে কিছুই না; এই বিষয়টা খুবই ডিস্টার্বিং। লেখার গতি হারিয়ে ফেলি প্রতিবার। ভূলক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দেওয়া হয়নি৷

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply