born_to_be_villains
methuburi_মিথুবুড়ি
পর্ব ১৯
❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌ কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌
‘অকস্মাৎ মনে হলো নিদ্রায় আচ্ছন্ন সে শূন্যে ভাসছে। নিদ্রায় জমাট বাঁধা সংবেদনশীল দেহটা দুলছে, ভারসাম্য হারাচ্ছে। ফিসফিসানির আওয়াজ আর মিটিমিটি হাসির শব্দ সুর সুর করে প্রবেশ করছে শ্রুতিপথ ধরে। মস্তিষ্ক বুঝতে পারছে, বৈসাদৃশ্যপূর্ণ কিছু একটা হচ্ছে, কিন্তু অন্তর্গত ঘুম নিজের সুখঘন সুপ্তি ভেঙে বিষয়টা ঘাঁটিয়ে দেখতে নারাজ।
‘তারপর হঠাৎই দিবালোকের নরম রোদ উঁকি দিয়ে তার গায়ে ছুঁয়ে দিল। চোখের পাতায় আঠার মতো লেগে থাকা ঘুমে মিহি রোদের উষ্ণতা আঁচ ফেলতেই ইমামার চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। কিন্তু চোখ খোলার আগেই তার শরীর ছুঁড়ে দেওয়া হলো শূন্যে। দিকবিদিকশুন্য শরীরটি কনকনে শীতে ছুটে চলল, অবশেষে ঠান্ডা সুইমিং পুলের পানিতে আঁচড়ে পড়ে ভেসে উঠল।
‘নাকের অন্তঃস্থল এবং শ্রবণতন্ত্রে বরফোজ্জ্বল পানির আতঙ্কিত ছোঁয়া লাগতেই কাঁপন দিয়ে উঠল সর্বাঙ্গ। ইমামা কঙ্গারুর জোয়ির মতো লাফিয়ে পানির ভেতর থেকে দাঁড়াল। পুলের পানি তার বুক পর্যন্ত। শীতের এই সকালে বরফ ঠাণ্ডা পানিতে শরীর জবুথবু কাঁপছিল। দু’হাতে নিজেকে আঁকড়ে ধরে,রণমূর্তি ন্যায় সামনে তাকিয়ে চোখের সামনে যে দৃশ্য তা দেখে সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। নতুন করে বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হল। গৌরব আর অর্ক পুলের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে শৈশবে খেলাধুলোয় ছলকারী কৌশল খাটানো, দুষ্টুমি মেশানো সেই শয়তানি হাসি। ওদের আকস্মিক ঝড়ের অনুরূপভাবে অপ্রত্যাশিত উপস্থিতি পুলের বরফ জলকেও যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য জমে যেতে বাধ্য করল। বিস্ময়ের আভা ছড়ানো মুখে
স্তম্ভিত হয়ে ওদের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে ইমামা।
কিন্তু সে অবস্থা খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হাড়কাঁপানো এক কাঁপন সবাঙ্গে ঢেউয়ের মতো আঁচড়ে পড়তেই ইমামা চিৎকার করে উঠল,”তোরা কি মানুষ?”
‘পুরুষালী, টগবগে কণ্ঠ দু’টো একসাথে আওয়াজ দিয়ে উঠল,”না… আমরা কুত্তা।”
‘একে তো ঠান্ডায় শরীর কাঁপছে, তার উপর এদের এহেন নির্লিপ্ত আচরণ। রাগেক্ষোভে ফেটে পড়ল সে,
“কুত্তাও তোদের থেকে ভালো। ওই প্রাণীগুলোরও ঘুমন্ত মানুষের ওপর সহমর্মিতা কাজ করে। তোল আমাকে!”
‘ইমামা হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ওরা হাত গুটিয়ে নেয়। একজন আরেকজনের কাঁধে পিঠ ঠেকিয়ে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে ঠোঁট উল্টায়,
“তো কুত্তা ডাকি তোকে তোলার জন্য।”
‘ওদের অনাসক্ত মুখ আর উদাসীন অঙ্গভঙ্গি দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ইমামা। সে জানে, ঘাড়ত্যাড়ামির ওপর এদের পিএইচডি করা। ত্যাড়াদের সাথে ত্যাড়ামি করলে হয় না। এদের নরম হয়ে বোঝাতে হয়। ইমামা অসহায়ের মতো মুখ করে অনুনয় করে,
“কাম অন ইয়ার। ইয়ার ইন্ড এটা। বেশিক্ষণ ঠান্ডা পানিতে থাকলে নিউমোনিয়া হয়ে মরবো৷”
‘গৌরব কপাল কুঁচকায়,”তো?”
‘অবাক হয় ইমামা,”মানে?”
‘গৌরব নির্বিকার গলায় বলল,”তুই মরলে আমাদের কী? এই দুনিয়ায় একই চেহারার মানুষ সাতজন আছে। তুই মরে গেলে তোর আরেকটা ডুপ্লিকেট খুঁজে নেব। আমাদের অহংকারী, দেমাগি, আত্মগরিমায় ভরা কোনো বন্ধুর দরকার নেই।”
‘মুহূর্তেই ইমামার মুখটা বাসি ফুলের মতো মলিন হয়ে গেল। অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে ফেলল সে। অর্ক সোজা হয়ে দাঁড়াল। গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করল,
“আচ্ছা ইমামা, তুই মন থেকে বল তো আমাদের জায়গায় থাকলে তুই কী করতি? কারিব আমাদের জন্য কী ছিল, সেটা তো জানিস। জানতি না? ও তো শুধু আমাদের বন্ধু ছিল না, আমাদের ভাই ছিল। সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিল। এই সম্পর্ক তো একদিনের ছিল না। ছোটবেলা থেকে আমরা একসঙ্গে। বন্ধুত্বের মানে বুঝতে শেখার পর থেকেই আমরা বন্ধু। একসঙ্গে বড় হয়েছি—স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি সব জায়গায়। কতজন আমাদের দলে ঢুকতে চেয়েছে, কিন্তু আমরা ঢুকাইনি। বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। কিন্তু যখন সেই সার্কেল থেকে একজন হারিয়ে গেল, আর তার পেছনে আমাদেরই একজন… তখন কী করতি বল তো?তোর তো বোঝা উচিত ছিল, আমরা কতটা কষ্ট পেয়েছি। তোর উচিত ছিল আমাদের মাঝের সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা। কিন্তু তুই সেটা করলি না। অভিযোগকে অভিমানে বদলে উল্টে তুই দূরে সরে গেলি। আমরাও কাছে এলাম না, তুইও ডাকলি না।’
‘ইমামা নিশ্চুপ। জবাব দেওয়ার মতো কোনো শব্দ খুঁজে পায় না সে। সত্যিই তো সে চেষ্টা করেনি। ক’দিন যোগাযোগ করতে চেয়েছিল, কিন্তু যখন বুঝেছিল ওরা ইচ্ছুক নয়, তখন নিজেই সরে এসেছে। ছোট থেকেই সে বড্ড অভিমানী, একরোখা। নিজের জায়গায় সে ঠিক থাকার পরও যদি কেউ যদি তাকে ভুল বোঝে, সে সেই ভুল ভাঙাতে যায় না। উল্টে অভিমান বুকে নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। দূরত্ব বাড়ায়।
ঠিক যেমনটা বাবার সাথেও করেছে।
‘বন্ধুদের ভিড়ে ইমামা যেমন গায়ের রং, চুলের রং আর চেহারায় আলাদা, তেমনি স্বভাবেও। সে ভীষণ চাপা। কষ্ট, রাগ, অভিমান কিছুই ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। হিয়া,অর্কও তার সাদৃশ্য। এই দলের সবচেয়ে আবেগী হিয়া আর গৌরব।
‘ইমামার হঠাৎ মনে পড়ে গেল মুসলিম বন্ধুর জানাজার পেছনে দাঁড়িয়ে হিন্দু বন্ধুটির সেই কান্নাভেজা আকুতি,”আমার বন্ধু যদি কোনো ভুল করে থাকে, আমার বন্ধুকে তুমি মাফ করে দিও।” জানাজার পেছনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে গৌরব কাঁদছিল সেদিন,”তোমার ধর্মের সাধ নেওয়ার সুযোগ হয়তো এই অধমের হয়নি, তবুও তোমার কাছেই চাই আমার বন্ধুকে তুমি জান্নাত দিও, খোদা। তুমি আমার ভাইকে নিয়ে গেছো, আমি তোমার ওপর খুব রেগে আছি। আমার রাগ তখনই কমবে, যেদিন আমার ভাই আমার স্বপ্নে আসবে৷ হাসিমুখে বলবে, ‘আমি ভালো আছি রে গৌরব।’
তুমি কিন্তু আমার কথা রাখবা, আল্লাহ। শুনেছি তুমি কাউকে ফিরিয়ে দাও না। আমাকেও ফিরিয়ে দিও । তোমার তো অনেক ক্ষমতা, অনেক দয়া। আমার বন্ধুকে নিজের কাছে ভালো রেখো। আমার ভাইকে যত্নে রেখো তুমি। ধর্মের ভেদাভেদের আগেও আমরা বন্ধু ছিলাম। আজ সেই বন্ধুর জন্য নিজের ধর্মের শিকল ছিঁড়ে আমি তোমার কাছে হাত জোড় করছি। আমার বন্ধুকে তুমি মাফ করে দিও। ওকে ভালো রেখো তুমি।”
‘মনের অজান্তেই চোখের কোল ভারি হয়ে উঠল ইমামার। অনুভূতির দাবানলে পুড়তে পুড়তে শীতের তীব্রতাও ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সেদিন শপিং মলের ঘটনার পর থেকে ভেতরটা কোথাও যেন ভেঙে চুরমার হয়ে ছিল তার। শয়তানটার জন্য অপ্রত্যাশিত এক মায়া জন্ম নিয়েছিল মনে। যেটা নিজেকেই অবাক করেছিল। প্রশ্নের পর প্রশ্ন মস্তিষ্কের ধূসর প্রতিটি কোষে আন্দোলন তুলছিল। আর সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে রূপ নেয়, যখন কাঙ্ক্ষিত মানুষটির কোনো সাড়া মেলে না। ইমামার অগাধ বিশ্বাস ছিল, খানিকটা ভেঙে পড়া এই মানুষটাকে বাড়ি ফিরলেই সে লোকটা আবার আগের মতো শক্ত করে তুলবে। ধমক দিয়ে হোক, কিংবা নরম গলাল যেভাবেই হোক, ওর মনোবলটা ঠিক করে দেবে।
‘লোকটা তো কথা দিয়েছিল,’ পুরো পৃথিবীও যদি তাকে ভাঙতে চায়, সে তাকে গড়ে তুলবে। অথচ এবার সে তা করল না। উল্টো তিন দিন ধরে একেবারে লাপাত্তা।
ওই লোকটার চোখের আড়ালে তো কিছুই যাওয়ার কথা না। সে তো দেখেছিল মলে ঠিক কী হয়েছিল! শয়তানটা তার পেটে ছুঁয়েছিল, তবুও সে কীভাবে এতটা স্থির থাকতে পারল? তার ক্রোধ কেন আকাশছোঁয়া হলো না? ব্যস্ত বলেই কি এতটাই ব্যস্ত থাকা যায়, যে একবার ফোন করাও সম্ভব হয় না?
‘ইমামা ছোট নয়, অবুঝও নয়। সে বোঝে মানুষের জীবনে ব্যস্ততা থাকতেই পারে। কিন্তু প্রেমে গভীর ডুবে থাকা তার মন সেই ব্যস্ততাকে মেনে নিতে চায় না। প্রেয়সীর চেয়ে মূল্যবান কিছু কি সত্যিই হয়? আচ্ছা, একদিন ব্যস্ত থাকা যায়। দুইদিনও হয়তো মানা যায়। কিন্তু তিনদিন? যে মানুষটাকে মেসেজ পাঠালে মনে হতো, সে রিপ্লাই দেওয়ার জন্য ফোন হাতে নিয়েই বসে থাকে; সে মানুষটা তিন দিনে একবারও তার খোঁজ নিল না। প্রেমিক মন কি কখনো এটা মেনে নিতে পারে? না! ইমামাও পারেনি। ধীরে ধীরে তার আশা রূপ নেয় অভিমানে। আর সেই অভিমানেই সেও আর কল দেয়নি তাকে। অভিমানে রাত দীর্ঘ হয়, চোখে ঘুম আসে না। তৃষ্ণার্ত মন চেয়ে থাকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে। লোকটার শূন্যতা তাকে এমনভাবে পুড়িয়ে দিচ্ছিল, যে এতদিন পর ফিরে পাওয়া বন্ধুদের উপস্থিতিও সেই আগুন নেভাতে পারল না।
“কিরে রাশিয়ান, তুই পানিতে কী করিস? তোর তো থাকার কথা আকাশে।”
‘ইবরাতের কণ্ঠে আচমকাই ভেঙে গেল ইমামার অন্তর্গত ভাবনার সুতো। চোখ তুলে তাকাতেই সে দেখল ইবরাত আর হিয়া পুলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সেদিনের পর ইমামা কারো ফোন ধরেনি, ভার্সিটিতেও যায়নি। যে কারণেই আজ ওরা সরাসরি তার বাড়িতে হাজির।
“চুপ।”
‘ইবরাত এগিয়ে এসে পুলের কিনারায় এক হাঁটু ভেঙে বসল। ঠোঁটের কোণে সেই চেনা লম্পট হাসি। ভ্রু উঁচিয়ে, রাগান্বিত ইমামার দিকে তাকিয়ে বলল,”আকাশের পরি তুমি সাতসকালে সুইমিং পুলের বরফ-ঠান্ডা পানিতে কী করছ,জান?”
‘শীতের কাঁপুনি আবারও বেয়ে ওঠে ইমামার শরীরে। সে চোখ রাঙিয়ে তাকায়,”একদম ফ্লার্ট করবি না। তোলো আমাকে, প্লিজ। আমি জমে যাচ্ছি।”
‘ইবরাত পাড়ার বখাটে ছেলেদের মতো ঠোঁট কামড়ে ধরে,”ভাই, সকাল সকাল তোকে দেখে লোভ লেগে যাচ্ছে আমার। মাইরি, কী যে দেখতে তুই! ছেলে হলে এতদিনে ঘটনা একটা ঘটিয়েই ফেলতাম।”
‘ইমামার দৃষ্টি আরও শক্ত হয়। সেটা দেখে ইবরাত আবার ঠোঁট কামড়ায়, হাসি চওড়া করে,”এইভাবে মুখ বাঁকাস না। বিশ্বাস কর, আমি ছেলে হলে তুই এতদিনে আমার চার বাচ্চার মা হতি। তোকে দেখলেই ছেলে হবার ইচ্ছা জেগে ওঠে আমার।”
“চুপপপপপ!”
“উফফ, সো হট!”
‘অসহায় ইমামা হিয়ার দিকে তাকায়,”হিয়া, প্লিজ… অন্তত তুই তো হেল্প কর।”
‘হিয়া হেসে নুয়ে পড়ে, হাত বাড়িয়ে দেয়,”হাহাহা… হাত ধর”
‘কিন্তু তাতে জ্বলে ওঠে গৌরব,”হাত ধরাচ্ছিস?”হিয়ার দিকে তেড়ে যায় সে,”ডিভোর্স তো তোকে দিতে পারব না। কিন্তু ঠান্ডা পানিতে চুবাতে পারব ঠিকই।”দাঁতে দাঁত চেপে বলে,”বান্ধবীর জন্য জামাইকে ব্লক করে দেওয়া নাকি?”
‘বলেই এক ঝটকায় হিয়াকে ধাক্কা দিয়ে পুলে ফেলে দেয়। হিয়া পানির ভেতর থেকে মাথা তুলে চিৎকার করে ওঠে”
“আমার শুধু একটু জ্বর আসুক। ঈশ্বরের নামে বলছি, তোকে ডিভোর্স দেব আমি!”
‘গৌরব পুলের ধারে দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত বেঁধে নেয়। গলায় বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই। উলটে ভ্রু উচাঁয়,”ডিভোর্স তো বাদই দে। আরেকবার শুধু আমাকে ব্লক করে দেখ। কিস্তি তুলে হলেও লোক ভাড়া করে তোর বাড়িতে আগুন লাগাব আমি। কথা নেই, বার্তা নেই ঠাসঠাস ব্লক! কী সাহস রে বাবা…”
‘হিয়া আর ইমামা রাগে, অপমানে, শীতে দু’জনই থরথর করে কাঁপছে। আর ওদিকে অর্ক আর ইবরাত মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসছে।
‘গৌরব হঠাৎ ভদ্রলোকের মুখোশ পরে হিয়ার দিকে হাত বাড়ায়,”জান, উঠো।”
‘হিয়া গর্জে ওঠে,”একদম চুপ!”
“ঠোঁটের সঙ্গে ঠোঁট না লাগিয়ে কি চুপ করানো যায়, জান।”
“অসভ্য!”
“বিয়ে করা বউ আমার। একটু অসভ্যতা না করলে চলে?”
“তাই বলে সবার সামনে?”
“সবার সামনে?” গৌরব ভ্রু কুঁচকে নাটক করে,”এত বড় অপবাদ দিও না, টুনিবউ। তোমাকে আদর করার সব কাজ আমি লাইট বন্ধ করেই করি। একটু শব্দ শোনা যেতে পারে, কিন্তু দেখা যায় না ট্রাস্ট মি, জান।”
‘গৌরবের কথা শুনে হঠাৎ অর্ক শব্দ করে হেসে উঠল। তার সেই হাসি দেখে রাগে গৌরব ওকেও পানিতে ঠেলে দিল। ছিটকে ওঠা পানি এসে আঁচড়ে পড়ল ইবরাতের একেবারে নতুন জামায়। মুখ বিকৃত করে কাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে ইবরাত বলে,
“শুধু আমার বন্ধুগুলোই কুত্তা না, আমার ভাগ্যটাও কুত্তা ভাগ্য!”
‘গৌরব মাথা দোলায়,”সহমত, সহমত, সহমত, সহমত।”
“বি সিরিয়াস দোস্ত,” ইবরাত একটু মনখারাপ করে বলে,”মন খারাপ করে বলেছি, একটু তো শান্তনা দে।”
“শান্তনা লাগবে? ওয়েট৷” গৌরব কৌশলে এগিয়ে এসে হঠাৎ ইবরাতকেও পানিতে ছুড়ে মারে। কিন্তু নিজেকেও সামলাতে না। কথার মাঝেই কখন যে ওদের অগোচরে ইমামা আর হিয়া এগিয়ে এসেছিল তা টের পায়নি কেউ। দু’জনে একসাথে গৌরবের দুই পা ধরে টান দিয়ে তাকেও পানিতে ফেলে দেয়। এরপর ইবরাত আর অর্ক মনের জমে থাকা ক্ষোভ মেটাতে গৌরবকে পানিতে চুবোতে থাকে। তাতে যোগ দেয় হিয়া আর ইমামাও। দীর্ঘদিনপর চারদিক ভরে ওঠে ওদের খিলখিলে হাসিতে৷ অনেকদিন পর সব আজ বাদর’ একসাথে হয়েছে। ওই হাসির শব্দে মিসেস নীহারিকা বারান্দায় এসে দাঁড়ান। ইমামাকে এভাবে মন খুলে হাসতে দেখে অজান্তেই তার ঠোঁটেও একটুকরো হাসি ফুটে ওঠে।
‘বন্ধুত্বের কী অপার সৌন্দর্য! এমন দৃশ্য দেখলে হয়তো শত্রুরও হিংসা জাগে। শুদ্ধতম বন্ধুত্বের চেয়ে খাঁটি আর কী-ই বা হতে পারে এই পৃথিবীতে? তবু ভেঙে যাওয়া সেই সম্পর্কগুলো জোড়া লাগানোর কারিগরের প্রতিই একবুক অভিমান জমিয়ে রেখেছে বিষণ্নসুন্দরীর। অথচ তার চোখের আড়ালেই কত কিছু ঘটে যায়, যার বিন্দুমাত্র খবরও তার থাকে না।
আচ্ছা, নিয়ম করে দিনে তিনবার ‘ভালোবাসি’ বললেই কি ভালোবাসা পূর্ণ হয়? নাকি ভালোবাসা জন্ম নেয় নীরব যত্নে, আড়াল থেকে হাসিয়ে তোলার ক্ষমতায়। আর অদৃশ্যভাবে আগলে রাখার নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতিতে? ভালোবাসা কি কেবল শব্দে, নাকি সেই অমূল্য রত্নের মতো। যাকে বলা যায় না, শুধু বাঁচিয়ে রাখতে হয়? সে তো কাছে না থেকেই ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে যায় নৈঃশব্দে। আর এবার যে হঠাৎই লাপাত্তা হয়ে গেছে, এর পিছনেও কি ভালোবাসার কি কোনো মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে, বা কারণ!
‘ইবরাত হিয়ার কাছে যেমন একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে কল গিয়েছিল। গম্ভীর কণ্ঠে তুলে ধরা হয়েছিল ইন্ট্রোভার্ট ইমামার অপারগতা, তার না বলা কষ্ট, বোঝাতে না পারা যন্ত্রণা ঠিক তেমনই অর্ক আর গৌরবের কাছেও কল গিয়েছিল। সেখানে শুধু কথা বলা হয়নি। অনুভব করানো হয়েছিল বন্ধুত্বের শূন্যতা, প্রিয় সখীর নিঃসঙ্গতার গভীরতা।
‘অপরপক্ষও যেন এমনই একটি কণ্ঠের অপেক্ষায় ছিল। অপেক্ষায় ছিল চিরায়িত গম্ভীরতায় মোড়া কিছু গুরুগম্ভীর বাক্যের। ছেলে হয়েও তারা মুগ্ধ হয়েছিল সেই অচেনা পুরুষের কণ্ঠে, মুগ্ধ হয়েছিল তার বোধে, তার গভীরতায়। শান্তি পেয়েছিল এই ভেবে যে কেউ একজন তাদের প্রিয় ইমামাকে নিয়ো এতটা গভীরভাবে ভাবছে, এতটা যত্ন নিয়ে বুঝতে চাইছে।
‘এই অজ্ঞাত রহস্যময় মানুষটির কণ্ঠে যেমন প্রকাশ পেয়েছিল নিঃশব্দ ভালোবাসা, তেমনি উন্মোচিত হয়েছিল অর্ক আর গৌরবের নিগূঢ় বন্ধুত্বও। নইলে উপহার হিসেবে হাই হাইসি–র স্পোর্টস বাইক অফার করা হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করে ছুটে আসতো না কেবল বন্ধুত্বের টানে কেবল একজন প্রিয় মানুষের জন্য।
‘নিউরোলজিস্ট আহাদের কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরে ঢুকল ইমামা। আহাদ ইমামার ফুপাতো ভাই। সব ভাইবোনের মধ্যে ওর সাথেই সম্পর্কটা সবচেয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ। বয়সের ব্যবধান থাকলেও দু’জনের বন্ডিং দারুণ। ইমামাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে আহাদ সোজা হয়ে বসল। মুখে সৌজন্যতাপূর্ণ একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই যখন সে দেখল, ইমামা ডান পাশের চেয়ারে না বসে বাম পাশের চেয়ারে বসছে।
‘ইমামা বসতেই আহাদ ডাকল,”রুশ।”
‘ইমামা তাকাল। ছোটবেলা থেকেই আহাদ তাকে ‘রুশ’ বলে ডাকে। আহাদ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে স্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,”সব ঠিকঠাক?”
‘ইমামা মাথা নাড়ে। নিউরোলজিক্যাল শান্ত স্বরে আহাদ আবার বলল,”তুই তো সবসময় রাইট সাইডে বসতিস।”
‘তৎক্ষণাৎ ইমামা পাশের খালি চেয়ারটার দিকে তাকাল। চোখেমুখে ভয় ছড়িয়ে পড়ল। উদ্বেগ চেপে ধরল বুক। আহাদ দ্রুত ওকে আশ্বস্ত করে বলল,”রিপোর্টগুলো এনেছিস?”
‘ইমামা সায় জানিয়ে হাতের ফাইলটা এগিয়ে দিল। নিউরোলজিস্ট ফাইল খুলে দেখতে দেখতে গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চায়,
“গ্র্যাজুয়েশনের পর প্ল্যান কী?”
‘ইমামা শান্ত মুখে উত্তর দিল,”নিজের বিজনেস রান করবো।”
‘অন্য সময় হলে সে বলত পিএইচডির জন্য বাইরে যাবে। আহাদ সামান্য মাথা নেড়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ল,”বিয়ের প্ল্যান আছে?”
“এসব নিয়ে এখনো ভাবিনি।”
‘অথচ ইমামা সবসময় বলত, সে কখনো বিয়ে করবে না। আহাদ তেরছাভাবে তার দিকে তাকাল।
“তোর জন্মদিন তো চলে গেল। ব্যস্ততার জন্য দেখা করা হলো না। আমার জন্মদিন তো আসছে… মনে আছে তো?”
“হুমম, মনে আছে, ভাইয়া।”
‘আহাদ ফাইলটা রেখে সোজা ইমামার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,”বল তো, কবে আমার জন্মদিন?”
‘ইমামাকে কয়েক সেকেন্ড ভাবতে হলো “সতেরোই জানুয়ারি…”
‘আহাদ ভারি নিঃশ্বাস ছাড়ল,”আমার জন্মদিন একুশে জানুয়ারি, রুশ।”
‘ইমামা চুপ। যেন বরফের মতো জমে গেছে। আহাদ আবার বলল,”ইমনের পছন্দের স্পোর্টস কোনটা, বল তো রুশ?”
“ক্রিকেট।”
“নোপ। ফুটবল, রুশ।”
‘ইমামা ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে থাকে। তবু নিজেকে শক্ত করে জমিয়ে রেখেছে। আহাদ কিছুক্ষণ পর আবার বলল,”তোর তো কখনোই বিয়েশাদি করার প্ল্যান ছিল না, রুশ। তুই পড়তে চেয়েছিস। দেশ, পরিবার সব ছাড়তে চেয়েছিস সবসময়।”
‘ইমামা তখনও স্থির। কিন্তু ধীরে ধীরে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। আহাদ শান্ত কণ্ঠে বলতে থাকে,
“দেখ রুশ, তোর মধ্যে অ্যালঝাইমার ধরা পড়ার পর থেকেই আমি তোর পাশে আছি। এই বিষয়ে কেউ না জানলেও, একজন ডক্টর হিসেবে আমি জানি ভবিষ্যতে কী হতে পারে। তোর রোগটা এখন মাঝামাঝি পর্যায়ে। তুই জানিস এর কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই। তবে নিয়মিত ওষুধে এটাকে কিছুটা সীমায় রাখা যায়।”
‘আহাদ একটা ডায়েরি এগিয়ে দিল ইমামার দিকে,”আমি তোকে অসুস্থ বলছি না। বলছি এখন থেকে তোর এই ডায়েরিটা খুব দরকার। আর দরকার এমন একজন মানুষ, যে তুই নিজেকে ভুলে গেলেও সে তোকে ভুলবে না। ডায়েরিতে লেখা তোর স্বপ্নগুলো একদিন বাস্তব করবে সে। তুই ভুলে গেলেও, সে ভুলবে না। হাতে সময় যে খুব সীমিত।”
‘ইমামা নিরুত্তর। হয়তো ভেতরে ভেতরে খুব বেশি ভেঙে পড়ছে বলেই আজ এত চুপ। সে ডায়েরিটা হাতে নিল। আহাদ আবার বলল,”আশা করি আজ থেকে এই ডায়েরিটাই তোর সঙ্গী হবে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব লিখবি এখানে। বলা তো যায় না… একদিন তুই নিজেকে ভুলে গেলেও ডায়েরিটা তোকে ভুলতে দেবে না।”
‘ইমামা ভারী নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে যাবে এমন সময় আহাদ পেছন থেকে ডেকে উঠল। ইমামা ফিরে তাকাতেই আহাদ বলল,”জীবন একটাই। আমাদের ধর্মে পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই। এই এক জন্মেই বাঁচার মতো করে বেঁচে নে। অপারেশনটা এবার করিয়ে নে।”
‘ইমামা বেরিয়ে গেল। কোনো প্রত্যুত্তর করল না। ও চলে যেতেই আড়াল থেকে একটি ছদ্মবেশী ছায়ামানব বেরিয়ে এল। যার চোখে-মুখে টলমলে বিস্ময়। অন্যের ভর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তবুও অশ্রু ভেজা চোখে ঠোঁটে একফোঁটা হাসি টানল সে।
“তার মানে রেড ওয়াইন আমাকে ঠকায়নি… ওর রোগ আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছে, নিক।”
‘অশ্রুসিক্ত চোখে ম্যাডবিস্ট তার সহচরের দিকে তাকাল। নিক নৈঃশব্দ্যে হেসে ধীরে মাথা নাড়াল। হঠাৎই ম্যাডবিস্টের এতদিনের শূন্য হৃদয় ভরে উঠল এক অদ্ভুত সুখে। ভেতরে নতুন করে জেগে উঠল আশা। আলো–ছায়া মেশানো দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইল ইমামার চলে যাওয়ার পথে। মনে মনে উচ্চারণ করে উঠে,
“বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও বলতে চাই, নতুন বছরেও আমার তোমাকেই চাই, রেড ওয়াইন।”
‘জীবন একটাই। আমাদের ধর্মে পুনর্জন্ম বলে কিছু নেই। এই এক জন্মেই বাঁচার মতো করে বেঁচে নে।’ কথাগুলো হয়গো ইমামার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে। তাই তো সারা রাস্তা গাড়িতে বসে সে ডায়েরিতে লিখতে থাকে তার স্বপ্ন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, অতীতের সব ব্যথা… সব, সব, সব। সেই লেখার ফাঁকেই এক বিশাল সিদ্ধান্তও নেয় সে। অপারেশন করাবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়েই সব মান-অভিমান ভুলে বাবার কাছে যায় অপারেশনের কথা বলতে।
‘কিন্তু বাবা-মেয়ে মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তেই ইমন এগিয়ে এসে ইমামার হাতে একটি রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়। সেটি একটি ডিএনএ রিপোর্ট। ডিএনএ টেস্টের ফলাফলের দিকে তাকাতেই ইমামার হাত থেকে রিপোর্টটা ঝরে পড়ে। চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসে একফোঁটা অশ্রু।
❌
‘আপনারা যারা নিয়মিত পাঠক আছেন, তারা একটা করে রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন। রেসপন্স করবেন। রিচ একদম না থাকলে মানা যায়। কিন্তু এক পোস্টে খুব, আরেক পোস্টে কিছুই না; এই বিষয়টা খুবই ডিস্টার্বিং। লেখার গতি হারিয়ে ফেলি প্রতিবার। ভূলক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দেওয়া হয়নি৷
Share On:
TAGS: born to be villains, মিথুবুড়ি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
Born to be villains পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
Born to be villains পর্ব ৩
-
Born to be villains পর্ব ১২
-
born to be villains পর্ব ১৭
-
Born to be villains পর্ব ৭
-
Born to be villains পর্ব ১৫
-
Born to be villains পর্ব ১১
-
Born to be villains পর্ব ৯
-
Born to be villains পর্ব ১৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)+বোনাস
-
Born to be villains পর্ব ৮