Born to be villains Golpo romantic golpo

born to be villains পর্ব ২১


born_to_be_villains

methuburi_মিথুবুড়ি

পর্ব_২১

❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ❌

‘সেই অদ্ভুত বিয়ের আজ নবম দিন। অথচ সবকিছু এখন কেমন অস্বস্তিকরভাবে স্বাভাবিক। ইমান ওয়াসিম আর মেয়ের সামনে আসেনি৷ হয়তো লজ্জায়, হয়তো অপরাধবোধে। আর মিসেস নীহারিকা… অনুতাপ আর আত্মগ্লানি তার চোখের কোণে স্থায়ী ছায়া হয়ে বসে আছে। প্রতিটি কাজে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে তার ভার স্পষ্ট।

‘এলিজাবেথ চেষ্টা করছে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে,ল। সব অস্বস্তি পাশ কাটিয়ে চলতে। অজান্তেই সে অনুভব করছে নতুন অচেনা প্রশান্তি। একটি হালাল সম্পর্কের নরম, মিষ্ট স্বাদ ধীরে ধীরে তার ভেতর জেগে উঠছে শান্ত, স্থির, নির্ভরতার মতো। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের ভেতরের অস্থিরতা কেউ নিঃশব্দে হাত বুলিয়ে থামিয়ে দিয়েছে। এটা কি সেই মানুষটার অদৃশ্য কোনো দৈবগুণ? নাকি বৈধ ভালোবাসার স্বচ্ছ আশ্রয়? এলিজাবেথ নিজেও নিশ্চিত নয়। তবে সে বুঝতে পারছে সেই অদ্ভুত বিয়ের পর থেকেই বুকের ভেতর জমে থাকা ভার যেন হালকা হয়ে গেছে। অতীতের কঠিন সত্য জেনেও মনটা অকারণেই প্রফুল্ল, অকারণেই আলোকিত।

‘এলিজাবেথ নয়দিন পর আজ ভার্সিটিতে এলো। হিয়া অসুস্থ, তাই সে আসেনি। ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকতেই ইবরাতের সঙ্গে দেখা। এলিজাবেথকে দেখামাত্রই ইবরাত প্রায় দৌড়ে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

“কিরে… কিরে, তুই এতোদিন ক্যাম্পাসে আসিসনি কেন? ফোনও ঠিকমতো ধরছিলি না। সমস্যাটা কী তোর? বিয়ে করতে না করতেই আমাদের ভুলে গেলি? এই ছিল তোর বন্ধুত্ব? ছি!”

‘এক নিঃশ্বাসে বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর ক্ষোভ উগরে দিয়ে থামল ইবরাত। বিয়ের খবরটা সেদিনই বন্ধুদের জানিয়েছিল এলিজাবেথ। প্রথমে অবাক হলেও কেউই বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। নীরব, অচেনা সেই মানুষটা কখন যে এলিজাবেথের মতোই তাদের মনেও নিঃশব্দে জায়গা করে নিয়েছে তা কেউ টেরই পায়নি। ঠিক এলিজাবেথের মতো করেই।

‘ইবরাতের কথায় এলিজাবেথ শুকনো একটুখানি হাসল।

“অসুস্থ ছিলাম রে।”

‘ইবরাত ভুরু কুঁচকে তাকাল,”অসুস্থ? হঠাৎ?”

“আরে, সেদিন রাতে কী হলো বুঝতেই পারিনি। একদম সুস্থভাবে ঘুমিয়েছিলাম। আমি তো সাধারণত এতো ঘুমাই না। কিন্তু সেদিন চোখ খুলল বিকেলে। ঘুমের ভেতর বারবার মনে হচ্ছিল, কিছু একটা হচ্ছে… কিন্তু ঠিক কী, বুঝতে পারছিলাম না। মনে হলো যেন খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। অথচ জেগে ওঠার পর কিছুই মনে করতে পারিনি। সুস্থ শরীরে ঘুমালেও ঘুম ভাঙার পর নড়তে পারছিলাম না। গায়ে প্রচণ্ড জ্বর, পুরো শরীর ব্যথায় ভেঙে যাচ্ছিল।”

‘ইবরাত চোখ সরু করে তাকিয়ে ছিল এলিজাবেথের দিকে। দুই ভ্রুর মাঝখানে চিন্তার গভীর ভাঁজ। পুরো কথাটা শুনেও সে আটকে গেল এক জায়গাতেই। সন্দেহভরা গলায় জিজ্ঞেস করল,”বাজে স্বপ্ন বলতে?”

‘এলিজাবেথ সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল। চোখমুখ কুঁচকে এমন ভঙ্গি করল যেন প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চায়। ওর সেই অস্বস্তিই বরং ইবরাতের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিল। এলিজাবেথ পা বাড়াতেই ইবরাত তাড়াতাড়ি সামনে গিয়ে ওড পথ রোধ করল।

“এই, থাম! কিছু তো আছেই। বলবি না?”

‘চাপের মুখে পড়ে এলিজাবেথ শেষ পর্যন্ত হার মানল। লজ্জায় গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,”এডাল্ট ড্রিম…”

‘কথাটা বলেই দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলল সে। তবে সে চেপে গেল আরেকটা বিষয়—সেই রাতে ঘুমানোর আগে আংটিটা সে বালিশের পাশে রেখে দিয়েছিল। সকালে উঠে দেখে সেটা তার আঙুলে পরা। হয়তো ঘুমের ঘোরেই নিজে পরেছে এভাবেই ভেবে আর গভীরে যায়নি।

‘ইবরাত একটু দূরে সরে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,”একটা স্বপ্ন দেখে নয়দিন অসুস্থ! তুই তো দেখি কঠিন নষ্ট রে!”

‘ইবরাতের কণ্ঠ এমনিতেই চড়া। তার ওপর এখন সে এমন জোরে কথা বলছিল যে আশপাশের কয়েকজন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে শুরু করেছে৷ লজ্জায় লাল হয়ে এলিজাবেথ তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ইবরাতের মুখ চেপে ধরে। চোখ রাঙিয়ে ফিসফিস করে বলল, “চুপ!”

‘ইবরাত ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে এখনও সেই দুষ্টু, লোলুপ হাসি লেগে আছে। ভ্রু নাচিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ গলায় বলল,

চতবে মানতেই হবে, তোর স্বপ্নের জোর কিন্তু কম না। অন্তত তোর না দেখা স্বামীর থেকেও…..

‘কথাটা শেষ করার আগেই এলিজাবেথ আবারও ওর মুখ চেপে ধরল। ওদের এভাবে চিপকাচিপকি কটতে দেখে দূর থেকে গৌরব চিৎকার করে উঠল,”এই যে, কী চলছে ওখানে?”গৌরব আর অর্ক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে আসছিল। গৌরবের ঠোঁটেও দুষ্টু হাসি। কাছে এসেই মজা করে বলল,

“কিরে, লেসবুন্নেসার দল! প্রকাশ্যেই শুরু করে দিয়েছিস ?একটুআড়াল-আবডাল বলে কিছু আছে তো নাকি?”

‘এলিজাবেথ সঙ্গে সঙ্গে ইবরাতের কাছ থেকে সরে দাঁড়াল, অস্বস্তিতে চুল ঠিক করতে লাগল। কিন্তু ইবরাত তো চুপ করে থাকার মেয়ে নয়। সুযোগ পেলে কথার বোমা ছুড়বেই। সে গৌরবের কাঁধে রাখা অর্কের হাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“কিরে গেউতজ্জামানের দল,তোদের দিকেও তো দৃশ্য মন্দ না! মাঠেই ম্যাচ বসিয়ে দিয়েছিস বুঝি? আড়াল খুঁজে পাওনি আজ?”

‘গৌরব আর অর্ক দু’জনেই থতমত খেয়ে গেল। যেন হঠাৎ বিদ্যুতের ঝটকা খেয়েছে এমনভাবে তৎক্ষণাৎ দূরে সরে দাঁড়াল। দৃশ্যটা দেখে এলিজাবেথ ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল। ইবরাত উদাস ভঙ্গিতে তার হাত ধরে সামনে হাঁটা দিল। অর্কও পেছন পেছন যেতে উদ্যত হতেই গৌরব পিছন থেকে গলা চড়িয়ে ডাকল,

“এই ধনকূপ!”

‘অর্ক বিরক্ত মুখে ফিরে তাকাল,”কী?”

‘গৌরব ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,”ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস? আমার সঙ্গে চল—অসুস্থ বউটাকে একটু দেখে আসি।”

অর্ক ভ্রু বাঁকায়,”বউয়ের সঙ্গে শুধু দেখা করতে যাবি?”

‘গৌরব এগিয়ে এসে অর্কের ঘাড়ে হাত পেঁচিয়ে ধরল। হাঁটতে হাঁটতে নবলল,”না, ভিন্ন কিছু করতে।”


‘নববর্ষ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম আলো, শব্দ আর মানুষের কোলাহলে মুখর। এলিজাবেথ আর ইবরাত গিয়ে বসল একেবারে সামনের সারিতে। স্টেজের দিকে চোখ যেতেই এলিজাবেথের দৃষ্টি আটকে গেল। প্রফেসর আনামের সঙ্গে চোখাচোখি। মুহূর্তেই সে চোখ সরিয়ে নিল। কিন্তু প্রফেসরের দৃষ্টি সরল না। একগুঁয়ে, অস্বস্তিকর স্থিরতায় তিনি তাকিয়েই রইল এলিজাবেথের
দিকে।

‘অনেকক্ষণ পরও যখন এলিজাবেথ আর তার দিকে ফিরল না, প্রফেসর আনাম ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। অডিটোরিয়ামের গুঞ্জন ভেদ করে তিনি মাইক তুলে নিলেন হাতে। ঠান্ডা অথচ কৃত্রিম গাম্ভীর্যে উচ্চারণ করলেন,

“এখন স্টেজে আসবে মিস ইমামা।”

‘নিজের নাম মাইকে ভেসে উঠতেই এলিজাবেথ যেন ভেতর থেকে কেঁপে উঠল। বিরক্তি আর অস্বস্তি মেশানো চোখে তাকাল প্রফেসরের দিকে। আনামের চোখে অদ্ভুত প্রলুব্ধ ঝিলিক। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে নিষ্ঠুর এক হাসি। সময় গড়িয়ে যায়। এলিজাবেথ উঠে দাঁড়ায় না। অডিটোরিয়ামের ভিড়ের ভেতর চাপা ফিসফাস ছড়িয়ে পড়ে। প্রফেসর আনাম আবারও মাইকে তার নাম ডাকতে উদ্যত, ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো অডিটোরিয়াম কেঁপে ওঠে ভয়ংকর এক বিস্ফোরণের শব্দে। আলো ঝাঁপসা হয়ে যায়। মানুষ চিৎকার করে ওঠে। ধোঁয়ার ভেতর স্পিকারে ভেসে আসে গর্জে ওঠে এক কর্কশ কণ্ঠ…ধাতব, সতর্ক, হুমকিতে ভরা,

“She is my lady.”

‘পুরো অডিটোরিয়াম যেন একসঙ্গে শিউরে উঠল। উপস্থিত সবাই চমকে চারদিকে তাকাতে লাগল। এলিজাবেথের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কণ্ঠটা সে চিনেছে। খুব ভালো করেই চিনেছে। চারপাশের মানুষ আড়চোখে তাকাতে শুরু করল তার দিকে। ফিসফাস ছড়িয়ে পড়ছে ঢেউয়ের মতো। ইবরাত শক্ত করে চেপে ধরল এলিজাবেথের হাত। তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে। কপালে জমছে ঘাম, আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে আসছে।

‘এদিকে প্রফেসর আনাম অস্থির চোখে চারপাশে তাকাচ্ছে। অডিটোরিয়ামের ভিড়, আলো, ধোঁয়া সব কিছুর ভেতর তিনি খুঁজতে চাইছে সেই অদৃশ্য কণ্ঠের মালিককে। গলা শুকিয়ে এলেও জোর করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,”কে আপনি?”

‘এক মুহূর্তের থমথমে নীরবতা। তারপর আরেক দফা বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল হলরুম। শব্দ থামতেই স্পিকারে ভেসে এল একটাই নাম, একটি বজ্রপাত,

“রিচার্ড কায়নাত!”

‘নামটা বাতাস চিরে ছড়িয়ে পড়তেই দর্শকদের ভেতর যেনো বিদ্যুৎ খেলে গেল। যারা ইতিহাস জানে, আন্তর্জাতিক সংবাদে চোখ রাখে তাদের কাছে নামটি শুধু পরিচিত নয়। এক গর্ব, এক কিংবদন্তি। এক তৃতীয়াংশ মানুষ প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। সকলের চোখে বিস্ময়, মুখে শ্রদ্ধার ছাপ। কেউ ফিসফিস করছে, কেউ নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে সামনে।

‘এতক্ষণ যার চোয়ালে জমাট রাগ ছিল, সেই প্রফেসর আনামের চোখে এখন স্পষ্ট বিস্ময়। অবিশ্বাস। আর সেই বিস্ময়ের তীর গিয়ে থামল এলিজাবেথের ওপর।
শুধু তিনিই নন! এখন অডিটোরিয়ামের অগণিত চোখ একই প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই দৃষ্টি এলিজাবেথের শরীরে কাঁটার মতো বিঁধতে লাগল। বুক ধড়ফড় করছে। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ইবরাতের হাত শক্ত করে ধরে দ্রুত বেরিয়ে গেল অডিটোরিয়াম থেকে। একপ্রকার পালিয়ে গেল।


‘ইবরাত কপাল কুঁচকে এলিজাবেথের দিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নিচু কিন্তু চাপা কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,

“তুই সত্যিই রিচার্ড কায়নাত সম্পর্কে কিছু জানিস না?”

‘এলিজাবেথ মাথা নাড়ল,”উঁহু। কে এই রিচার্ড কায়নাত?”

‘অফিসার প্রেমের কাছ থেকে এলিজাবেথ যতটুকু জেনেছে, লোকটার অনেকগুলো নাম আছে। ছদ্মনাম, আড়াল, পরিচয়ের ভেতর আরেক পরিচয়। সেই হিসেবেই মিলতে পারে আর. কে. মানে রিচার্ড কায়নাত।

“তুই আন্দিজের প্লেন ক্র্যাশের কাহিনীও শুনিসনি?”

‘এলিজাবেথ চুপ। সে জানে না।

‘ইবরাতের চোখে বিরক্তির ছায়া ফুটে উঠল,”Alive (1993) মুভি? Stranded? Society of the Snow? এগুলাও দেখিসনি?”

‘এবার এলিজাবেথের ধৈর্য ভাঙল। ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতা কণ্ঠে ঘন হয়ে উঠল।

“না! কিন্তু সবাই এমন প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে কেন? কে এই রিচার্ড কায়নাত, খুলে বলবি?”

‘ইবরাত গভীর শ্বাস নিল। তারপর ধীরে, স্পষ্ট করে বলল,

“Richard Kaynat is an ex–fighter pilot… who holds the Victoria Cross.”

‘এক্স ফাইটার পাইলট… ভিক্টোরিয়া ক্রস? বিস্ময়ে এলিজাবেথের চোয়াল সামান্য খুলে গেল। কয়েক সেকেন্ড শব্দ খুঁজে পেল না সে। ততধিক বিস্ময়ে ফিসফিস করে বলল,

“তুই মজা করছিস না তো?”

“আজব! আমি মজা করব কেন?”

‘এলিজাবেথের মাথার ভেতর সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। অফিসার মাহেশ বলেছিল লোকটা ড্রাগন গ্রুপের সিইও। অন্ধকার জগতের সঙ্গেও জড়িত। আর সে নিজে বলেছিল সে একজন গ্যাংস্টার। আর এখন যুদ্ধবীর? ভিক্টোরিয়া ক্রস প্রাপ্ত সাবেক ফাইটার পাইলট? বাস্তব আর পরিচয়ের মাঝখানে যেন এক ধোঁয়াটে দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে। এলিজাবেথ ধীরে ধীরে ইবরাতের হাত চেপে ধরল। চোখে আতঙ্ক আর কৌতূহলের মিশ্র ছায়া। গলা শুকিয়ে এলেও জোর করে বলল,

“তুই এসব জানলি কীভাবে… প্লিজ, খুলে বল ইবরাত।”

‘ইবরাত সবটা খুলে বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওর ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে খবর আসে ওর প্রিয় বিড়ালটা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে ইবরাত চলে যায়।কিন্তু এলিজাবেথের ভেতরের ঝড় থামল না। মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কী করবে, কোথা থেকে সত্যটা জানবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। ইউটিউবে আন্দিজের প্লেন ক্র্যাশ নিয়ে যা পেয়েছে, তা কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে, কমায়নি। তাছাড়া ও জানে ওখানে সব তথ্য প্রামাণ্য নয়। সত্যিকারের তথ্য জানতে হলে বই পড়তে হবে, গবেষণাভিত্তিক লেখা ঘাঁটতে হবে… অথচ এই মুহূর্তে তার হাতে না আছে সময়, না আছে ধৈর্য। হঠাৎই কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ফোনটা তুলে নিল সে। ডায়াল করল প্রেমের নাম্বার।

‘প্রেম তখন গভীর ঘুমে। আধো অন্ধকার ঘরে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে ছিল, তার বুকে নগ্ন লাড়া। ফোনের কম্পনে বিরক্ত মুখে কল রিসিভ করল সে।
কিন্তু এলিজাবেথের কণ্ঠ কানে যেতেই ঘুম উধাও।
সে এক ঝটকায় উঠে বসল।

‘এলিজাবেথ বলল, “অফিসার, আপনি কি ব্যস্ত? সেদিনের পর থেকে আর কোনো সাড়া পাইনি। আচ্ছা, আমি খুব দরকারে ফোন দিয়েছি। একটু কথা বলা যাবে?”

‘প্রেম আলগোছে লাড়াকে বালিশের উপর রেখে বারান্দায় চলে গেল। বলল, “ব্যস্ত নই। হানিমুনে আছি। ইমারজেন্সি বেসিসে বিয়ে করেছি, তাই আপনাকে জানানো হয়নি।”

‘প্রেমের বিয়ের সংবাদে এলিজাবেথ কিছুটা অবাক হলো। তবে খুব ভাবল না; কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মাথা ঘামানো ভালো ম্যানার্সের মধ্যে পড়ে না।

‘প্রেম বলল, “তারপর, আপনার সেই সাইকো দেওয়ানার কোনো আপডেট আছে?”

“এখনও পর্যন্ত না।”

“পায়ে দু’দুটো গুলি লেগেছে। সুস্থ হতে তো একটু সময় লাগবেই। সাইকোটা সুস্থ হতে হতে আমার হানিমুনের কাজও শেষ হয়ে যাবে।”

“অফিসার, একটা বিষয়ে জানতে ফোন দিয়েছি।”

“হা, শিওর। বলুন না।”

“আন্দিজের প্লেইনক্ল্যাসের কথা জানেন আপনি?”

“ও মাইগড, এটা জানব না। রুদ্ধশ্বাসকর একটা ঘটনা।”

“আমি সবটা জানতে চাই, অফিসার। প্লিজ, আমাকে সবটা খুলে বলুন।”

‘প্রেম একটু অবাক হলো সকাল সকাল এলিজাবেথের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে। কিন্তু এলিজাবেথের কণ্ঠে কাঁপন আর অস্থিরতা টের পেয়ে, সে আর ঘাটল না। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে রক্ত হীম করা ঘটনা বলতে শুরু করল,

‘ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পল ড্রোমান আজ থেকে তিন বছর আগে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল করেছিলেন। সেই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে শক্তিশালী করপোরেট গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা। প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে জমে ওঠে চাপা প্রতিশোধের আগুন। তারপর থেকেই অচেনা নম্বর থেকে আসতে থাকে একের পর এক হুমকি। কখনো ধূর্ত কৌশলে, কখনো নিখুঁত পরিকল্পনায় প্রেসিডেন্টের ওপর চালানো হয় একাধিক হামলা। প্রতিবারই অল্পের জন্য মৃত্যুকে ফাঁকি দেন তিনি। তবুও তার চারপাশে ঘনীভূত হয়ে থাকে টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশনের স্থায়ী আশঙ্কা। এমনই এক উত্তপ্ত সময়ে একটি বিশেষ সফরে প্রেসিডেন্টের চিলি যাওয়ার কথা ছিল। প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ঠিক তখনই তার এক ঘনিষ্ঠ সূত্রের হাতে এসে পৌঁছায় ভয়ংকর এক তথ্য,’পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আপনি বিমানবন্দরে পৌঁছালেই প্রাণহানি ঘটতে পারে।’

‘মুহূর্তেই পরিস্থিতির রঙ বদলে যায়। সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। অদৃশ্য মৃত্যুর ছায়া ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসে।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ জরুরি বিবেচনায় নিয়ে সরাসরি ফ্লাইটের পাইলট শেষ মুহূর্তে বদলে দেওয়া হয়। সাধারণ সিভিলিয়ান পাইলটদের ওপরও তখন আর আস্থা রাখা যায় না। আশঙ্কা ছিল বাণিজ্যিক পাইলটদের ভেতরে লিক থাকতে পারে, এমনকি অটোপাইলট বা নেভিগেশন সিস্টেম হ্যাক হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না।
ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পুরো ফ্লাইটটি মিলিটারি অপারেশন হিসেবে পরিচালিত হবে। প্রেসিডেন্টের বিমানে থাকবে একজন সিভিল কো-পাইলট (আনঅফিশিয়ালি)। কিন্তু কমান্ড থাকবে একজন ফাইটার পাইলটের হাতে।

‘সেই দায়িত্বে নির্বাচিত হন রিচার্ড কায়নাত। সাবেক এয়ারফোর্স এলিট ফাইটার পাইলট। অতীতে একাধিক মিলিটারি অপারেশন, কনফিডেনশিয়াল ফ্লাইট এবং হাই-রিস্ক ডেসেন্টে তার দক্ষতা প্রমাণিত। রিচার্ড শুধু একজন ফাইটার পাইলটই নয়; মিলিটারি ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি সে সিভিল এভিয়েশন ট্রেনিং সম্পন্ন করেছে এবং নির্দিষ্ট এয়ারক্রাফটের প্রয়োজনীয় টাইপ রেটিংও তার ছিল। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আরেকটি বিষয়, তা হলো রিচার্ড ছিল ভয়ংকর রকম বেপরোয়া ও সাহসী। ট্রেনিংয়ের সময়ই বিষয়টি ট্রেইনারদের নজরে আসে। সে যেমন বাজপাখির মতো আকাশে রাজ করতো, তেমনি জমিনেও হিংস্রের ন্যায় ছিল তার চলন৷ আর ঠিক সেই কারণেই এই ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে বিশ্বাস করে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তার কাঁধে।

‘প্রেসিডেন্ট ও তার দশজন বিশ্বস্ত গার্ডকে নিয়ে একটি প্রাইভেট জেট আর্জেন্টিনা থেকে চিলির উদ্দেশ্যে আকাশে ভাসে। সুনীল আকাশ চিরে স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে চলছিল বিমানটি। কিন্তু আন্দিজ পর্বতমালার কাছাকাছি পৌঁছাতেই দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। চেনা মুখগুলো হঠাৎ অচেনা, ভয়ংকর রূপ নেয়। কেবিনের বাতাস আচমকা ভারী হয়ে ওঠে। এমন ভারী যেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে বারুদের গন্ধ ঢুকে পড়েছে৷ যাদের বিশ্বাস করে প্রেসিডেন্ট একেবারে কাছে রেখেছিলেন, মুহূর্তের ব্যবধানে তারাই মৃত্যুর ছায়া হয়ে দাঁড়ায়। চোখের পলকে খুলে যায় শুভচিন্তকের মুখোশ। বেরিয়ে আসে নির্মম হিংস্রতা। হঠাৎ করেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রেসিডেন্টের ওপর।

‘ককপিটে থাকা রিচার্ড কিছু একটা অস্বাভাবিকতা টের পায়। অভিজ্ঞতা তাকে সতর্ক করে এটা সাধারণ কোনো বিশৃঙ্খলা নয়। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় চিৎকার করে জানিয়ে দেয় পিছনে কিছু একটা ভয়ংকর ঘটছে। আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে সে কন্ট্রোল কো-পাইলটের হাতে দিয়ে নিজের পার্সোনাল গান তুলে নেয়। বজ্রগতিতে ছুটে যায় কেবিনের দিকে। পরের মুহূর্তগুলো যেন ছিল স্লো-মোশন অ্যাকশন।
প্রেসিডেন্টের দিকে ছুটে আসা প্রথম হামলাকারীর কবজি ভেঙে যায় রিচার্ডের বজ্রঘাতে। দ্বিতীয় জন মেঝেতে পড়ার আগেই গলার গ্রিপে তার শ্বাস থেমে যায়। তৃতীয় জন অস্ত্র তুলতে গিয়েও পারেনি। রিচার্ডের একটি ঘূর্ণি আর একটি নিখুঁত কিকে সে নিথর হয়ে পড়ে।

‘একাই সবার বিরুদ্ধে লড়ে যায় রিচার্ড কায়নাত।
প্রেসিডেন্টের গায়ে একফোঁটা আঁচও লাগতে দেয় না সে। কিন্তু ঠিক তখনই একটা বিকট শব্দ ছেঁটে এলো কেবিনে। আচমকা ছুটে আসা একটি গুলি বিদ্ধ করল রিচার্ডের উরু। উরু থেকে রক্ত ঝরে পড়ল, পা কেঁপে উঠল। সাধারণ মানুষের হলে এখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু রিচার্ড থামার জন্য তৈরি ছিল না। দাঁত কামড়ে ব্যথাকে গিলে ফেলল সে। তার উপর আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ল ট্রেনিংপ্রাপ্ত দশজন গার্ড। সংখ্যায় তারা এগিয়ে থাকলেও তাদের চোখে ভয় ছিল স্পষ্ট। তারা ছিল সংখ্যায় এগিয়ে আর রিচার্ড দক্ষতায়। তআহত পা নিয়েই রিচার্ড একাই ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ওপর। কেউ পড়ল তার বলশালী হাতের তীব্র ঘুষিতে, কেউ ছিটকে গেল কেবিনের দেয়ালে, কেউ আবার নিজের অস্ত্রেই কাবু হয়ে গেল। প্রতিটা মুভই ছিল নিখুঁত, প্রতিটা আঘাতই ছিল প্রাণঘাতী। রক্তে ভেজা পা মেঝেতে দাগ কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু তখনও তার চোখে ছিল একটাই লক্ষ্য ছিল; প্রেসিডেন্টকে বাঁচাতে হবে।

‘ইতিমধ্যে একাই চারজনকে কাবু করে ফেলেছিল রিচার্ড। ঠিক তখনই বিপত্তি বাঁধে। আন্দিজ পর্বতমালা অতিক্রম করতে গিয়ে বিমান ঢুকে পড়ে ঘন মেঘ আর হঠাৎ তীব্র টার্বুলেন্সে। GPS ভুল ডাটা দেখাতে শুরু করে, অ্যানালগ ইনস্ট্রুমেন্টেও দেখা দেয় মারাত্মক ত্রুটি। কো-পাইলট ভুল হিসাব করে ধরে নেয় পাহাড় পেরোনো হয়ে গেছে। অথচ জেট তখনো আন্দিজের বুকের গভীরেই। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এক ভয়ংকর শব্দ হয়। প্লেইনের ডানার একটি অংশ পাহাড়ে আঘাত করে ছিটকে যায়। তারপর আরেকটি।
শেষ পর্যন্ত বরফে ঢাকা পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে প্রাইভেট জেটটি।

‘তেরো জনের মধ্যে চারজন জেটের ভেতরেই রিচার্ডের আঘাতে মারা গিয়েছিল। আর যখন জেটটি আন্দিজের পর্বতমালার গায়ে আঁচড়ে পড়ে, তখন লোলুপ গার্ডদের আরও চারজন সঙ্গে সঙ্গেই প্রাণ হারায়। শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে মাত্র পাঁচজন—দু’জন গার্ড, প্রেসিডেন্ট, রিচার্ড এবং কো-পাইলট। তবে সবার মধ্যে কো-পাইলটের অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলে ছিল সে। যারা বেঁচে ছিল তারা নিজেদের আবিষ্কার করল এক আতঙ্কিত নীরবতার মধ্যে। চারপাশে শুধু অসীম সাদা বরফ, আকাশছোঁয়া পাহাড় আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। রাতে তাপমাত্রা নেমে যেত মাইনাস ত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অক্সিজেন ছিল অপ্রতুল। শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। আর ক্ষুধা রূপ নিচ্ছিল নিষ্ঠুর যন্ত্রণায়। তারা আটকে পড়েছিল এমন এক দুর্গম স্থানে, যেখানে উদ্ধার অভিযান পৌঁছায় না। যার দরুণ বিধ্বস্ত একটি জেটের ধ্বংসস্তূপই হয়ে উঠেছিল তাদের একমাত্র আশ্রয়।

‘সবার শরীরেই আঘাত। সবার পেটে হাহাকার করা ক্ষুধা। এই অবস্থায় প্রতিশোধ, ষড়যন্ত্র, মিশন সবকিছুই ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে, ফিকে হতে থাকে। বেঁচে থাকার তাগিদে প্রত্যেকে যখন নিজের মতো করে মরিয়া, ঠিক তখন রিচার্ড যেন ভিন্ন ছিল। সে নিজেই আহত, রক্তক্ষরণে ক্লান্ত।তাও সে সবার জন্য হোস্টেজ হয়েও হোস্ট হয়ে উঠেছিল। তখনের পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ অদ্ভুতভাবে তার হাতেই রয়ে যায়। সে নিজের হাতে সকলের প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে। বিধ্বস্ত জেটটিকে বসবাসের যোগ্য করার ক্ষীণ প্রয়াস চালায়। তার গুরুগম্ভীর ভারি কণ্ঠে সকলের মনে বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।

‘তার উপর প্রেসিডেন্টের নির্দেশ ছিল স্পষ্ট ও কঠোর, যে করেই হোক এই লোলুপ গার্ডদের মধ্যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত গার্ড, যে ছিল তার বডিগার্ড, তাকে যে করেই হোক বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বাকি হিসাব পরে হবে। তবে এই পাহাড়ের বুকে নয়৷ পরবর্তীতে মুখোমুখি হয়ে তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে বোঝাপড়া প্রেসিডেন্ট নিজেই করবেন। আঘাতপ্রাপ্ত গার্ডরাও যখন বুঝে যায় এই অবস্থায় প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা আর সম্ভব নয়; তার সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং রিচার্ড। আর তার ওপর তারা সবাই আটকে আছে আন্দিজের বুকে বিধ্বস্ত একটি জেটে। অতঃপর আর কারও মুখ তুলে তাকানোর শক্তি থাকে না। অপরাধবোধ আর অসহায়তা একসঙ্গে তাদের মাথা নুইয়ে দেয়। শত্রুতা গলে গিয়ে সবাই যেন অনিচ্ছায় এক কাতারে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেই মুহূর্তে সবার একটাই কামনা যেভাবেই হোক এই মৃত্যুফাঁদ পর্বতমালা থেকে উদ্ধার পাওয়া।

‘কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। প্রেসিডেন্টের এই সফরটি রাষ্ট্রীয় নয়, ছিল সম্পূর্ণ গুপ্ত। ফলে একজন প্রেসিডেন্ট নিখোঁজ হওয়ার পরও শুরুতে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। সময় গড়িয়ে গেলে ধীরে ধীরে সবকিছু উন্মোচিত হতে থাকে। তবু বিস্তীর্ণ আন্দিজ তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি। পাহাড়ের নীরবতায় তারা রয়ে যায় জীবিত, কিন্তু পৃথিবীর চোখের আড়ালে। হঠাৎ একদিন রেডিওর ভাঙা শব্দের ফাঁক গলে তারা শুনতে পেল ভয়ংকর ঘোষণাটা। তাদের খোঁজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব ধরে নিয়েছে, এই তাঁরা কেউ আর বেঁচে নেই। সেই মুহূর্তে বেঁচে থাকার শেষ আলোটুকুও নিভে গেল।

‘বিধ্বস্ত জেটে খাবার বলতে ছিল হাতে গোনা কয়েকটা চকলেট, সামান্য ওয়াইন আর কিছু বিস্কুট। কয়েক দিনের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়। ফার্স্টএইড দিয়ে ক্ষতগুলো সাময়িকভাবে বেঁধে রাখা গেল। কিন্তু পেটের ক্ষুধা? তাকে তো আর বেঁধে রাখা যায় না। তখনই শুরু হয় আসল যুদ্ধ। ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ! চারপাশে শুধু বরফ। কোনো গাছ নেই, কোনো প্রাণ নেই। বাইরে বরফ আর বরফ। দিগন্তজোড়া সাদা নীরবতা আর তার মাঝখানে পড়ে থাকা মৃত গার্ডদের নিথর দেহ। প্রথমে সবাই চুপ করে থাকে। কেউই সেই নিষিদ্ধ কথাটা মুখে আনার সাহস পায় না। কিন্তু ক্ষুধা নৈতিকতা বোঝে না। ধর্ম, সমাজ, মানবিকতা এসব কিছুই তার কাছে যুক্তি নয়।

‘শেষ পর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত নেয় মরার বদলে বাঁচবে। মৃতদের শরীর থেকেই জীবন টেনে নেবে। সিদ্ধান্তটা ছিল নিষ্ঠুর, অমানবিক, সভ্যতার সব নিয়মের বিরুদ্ধে। তবে এটা না করলে কেউই বাঁচবে না। বরফে ঢাকা সেই পাহাড়ে, মৃতদেহের মাংস খেয়েই তারা টিকে ছিল। বেঁচে ছিল। কিন্তু প্রতিটা দিন ছিল একেকটা নীরব অপরাধবোধের ভার। দুর্ঘটনার প্রায় এক মাস পর হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর তুষারধস নেমে আসে। জেটের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা তারা সেদিন বরফের নিচে চাপা পড়েও, মরার মুখ থেকে বেঁচে যায়। বেঁচে থাকা মানুষের মানসিক অবস্থা তখন ভাঙনের এক শেষ প্রান্তে। কো-পাইলট হতাশার কাছে হাল ছেড়ে দিয়ে কেঁদে ভেঙে পড়েন। বাকি দুজন গার্ডও একইভাবে অস্থির ও দুর্বল হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট নিজের ভেতরের ভঙ্গুরতা প্রকাশ না করলেও, তার চোখে ফুটে ওঠে সবকিছু। সেই নীরবতা, সেই বরফে ঢাকা শূন্যতায় তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুধুই বুঝতে পারে এই বিপদের মধ্যে বেঁচে থাকা মানেই এক চরম মানসিক যাত্রা। যতোই তারা নিজেদের মানষিক ভাবে শক্ত করে, ক্ষিধের জ্বালা ততই তাদের দূর্বল করে দেয়।

‘ইতিমধ্যে মৃতদেহগুলোর মাংসও শেষ হয়ে গিয়েছিল। আবারও আসে ক্ষুধার অমানবিক জ্বালা। একরাতে সবাই ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ অচেনা, ভীতিকর মাংস চিবানোর শব্দে রিচার্ডের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ খোলার পর যা দেখল, তা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য। সেদিন দ্বিতীয় বারের মতো সে ক্ষুধার জ্বালা কতটা ভয়ংকর, তা অনুভব করেঢ়িল। কো-পাইলট, ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে এক গার্ডকে হত্যা করে তার মাংস খেতে শুরু করেছে, সবাই ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়। পূর্বের মৃতদেহগুলো বরফে জমে থাকলেও, একজন জীবিত মানুষের প্রাণ নষ্ট করে তার মাংস খাওয়া ছিল এক প্রকার অমানবিক দৃশ্য। তবে পরিস্থিতিই এমন ছিল, যা মানসিকভাবে সবাইকে ভেঙে দেয়। সে দ্রুত কো-পাইলটকে ধাক্কা দিয়ে গার্ডের কাছ থেকে সরিয়ে আনে। নিজের হাতে মুছে দেয় মুখের রক্ত। কো-পাইলট আর সহ্য করতে না পেরে রিচার্ডকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেছিল সেদিন।

‘এরপর থেকে কেউ রাতে নিশ্চিতে ঘুমাতে পারত না। সকলের মনে ভয় দানা বাঁধে।পরবর্তীতে রিচার্ড এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতিদিন রাতে সবার হাত বেঁধে দিতেো। নিজের হাতও দাঁতের সাহায্য নিয়ে বেঁধে রাখতো। ভয়, ক্ষুধা, অস্থিরতা সব মিলিয়ে এটাই একমাত্র উপায় ছিল বেঁচে থাকার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ।
এভাবে আরও কয়েকদিন কাটে। ততদিনে বেঁচে থাকা সবাই জীবনের প্রতি মনোবল হারিয়ে ফেলে। আর কেউ বাঁচতে চায় না। মরতে চায় এই চরম ঠান্ডা, ক্ষুধার জ্বালা আর নির্জন শীত থেকে। কিন্তু রিচার্ড! শক্ত নার্ভের রিচার্ড তখনও মনোবল হারায়নি। সে উঠে দাঁড়ায়। যদিও রিচার্ড এর আগে অনেকবার চেষ্টা করেছে, একা বেরিয়ে পথ খুঁজে পেতে। চারপাশে শুধুই বরফের রাজ্য৷ সাদা নির্জনতা, দিগন্তজোড়া পাহাড় আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। তার কাছে কোনো মানচিত্রও ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে একবার পথচলায় বেশিদূর চলে গেলে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের দিকে। তবুও, রিচার্ড বহুবার নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে একা বেরিয়েছে। কিন্তু সে কখনোই চাইহি সবাইকে ফেলে শুধু নিজের জন্য এগোতে। সবার জীবন তার কাঁধে ছিল। আর একা হলেও দায়িত্ব সে কখনো ত্যাগ করেননি।

‘পাশে আছে নান্দো পাররাডো ও রোবের্তো কানেসা। সে সিদ্ধান্ত নেয় কেউ যদি সাহায্য না পাঠায়, তবে তাদেরই পাহাড় পেরোতে হবে। হাতে কোনো মানচিত্র নেই, নেই ঠিকঠাক পোশাক। ছিল শুধু মৃতদের চামড়া দিয়ে বানানো জুতো আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। দশ দিন ধরে তারা হেঁটে চলে বরফ আর পাথরের রাজ্যে। অনেকবার মনে হয় আর এক পা ফেললেই মৃত্যু নিশ্চিত। মৃত্যুও আসে। পথিমধ্যেই কো-পাইলট মারা যায়। বেঁচে থাকে শুধু রিচার্ড, প্রেসিডেন্ট এবং তার বডিগার্ড। প্রেসিডেন্ট বয়সে প্রবীণ। নাজুক শরীর। আর হাঁটতে পারছিলেন না তিনি। কিন্তু তখনও তার একটাই আর্জি বডিগার্ডকে যেভাবেই হোক বাঁচাতে হবে।

[🚫 পাঠকদের উদ্দেশ্য কিছু কথা—মাংস খাওয়া নিয়ে হয়তো অনেকেই নাক সিটকাতে পারেন। সেনসেটিভ মাইন্ডের যারা আছেন, তাদের উপর বাজে প্রভাব পড়তে পারে। তাই তাদের জন্য বলি, আজকের পুরো ঘটনা সম্পূর্ণ সত্যি। ১৯৭৫ সালে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা একটু রিসার্চ করলেই খুঁজে পাওয়া যাবে। আমি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কিছু কল্পনা জুড়ে দিয়েছি, গল্পের চরিত্র ও কাহিনিকে আরও প্রাণবন্ত করার জন্য। আশা করি, এতে কোনো পাঠকের মনে কোনো বাজে প্রভাব পড়বে না। যদি পড়ে মনে হয়, তবে আমি কাহিনি পরিবর্তন করে দেব।]

‘রিচার্ড কখনো দায়িত্বের অবহেলা করে না। শীত, ক্ষুধা, একাকিত্ব কোনো কিছুই তার মনোবলকে আঁচ দিতে পারে না। সে বডিগার্ডের হাত একসাথে বেঁধে দড়ি অংশ নিজের কোমরের সঙ্গে জুড়ে দেয়, যাতে কেউ পিছিয়ে যেতে না পারে, পালিয়ে যেতে না পারে। তারপর নিজেই প্রেসিডেন্টকে কাঁধে তুলে বরফে ঢাকা পর্বতমালা পেরিয়ে এগোতে থাকে। শুধুমাত্র রিচার্ডের দৃঢ় মনোবল এবং অটল আত্মবিশ্বাসের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত সবুজ উপত্যকা দেখতে পায়। একজন চিলিয়ান রাখালের নজরে পড়েছিল তারা। সেখান থেকেই খবর পৌঁছে যায় কর্তৃপক্ষের কাছে। ৭২ দিন পর হেলিকপ্টার আসে। বরফের বুক চিরে উদ্ধার করা হয় মাত্র তাদের তিনজনকে। এই ঘটনাকে ইতিহাসে মনে রাখা হয় “Miracle of the Andes” নামে। এটা শুধু একটি প্লেন দুর্ঘটনার গল্প ছিল না। এটা ছিল মানুষের বেঁচে থাকার সাহসের এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির নির্মম গল্প।

‘আর এই ঘটনা আজও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অম্লান। এ নিয়ে অসংখ্য বই, ডকুমেন্টারি ও সিনেমা তৈরি হয়েছে, কিন্তু কোথাও রিচার্ডের ছবি বা পরিচয় প্রকাশের অনুমতি দেয়নি সে নিজেই। রিচার্ড কখনো হিরো হতে চায়নি। সে চেয়েছে কেবল তার স্বপ্নের পেশায় গৌরব অর্জন করতে। সে চেয়েছে আকাশের রাজা হতে, আন্দিজের নয়। উদ্ধারের পর তার অসামান্য সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে Victoria Cross (VC)—ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ বীরত্বের সম্মান প্রদান করা হয়। এটি যেকোনো ফাইটার পাইলট বা সৈনিকের জন্য পাওয়া সম্ভব, কেবল সত্যিকারের নিঃসন্দেহ সাহসিকতার জন্য। রিচার্ড এই সম্মান পায় আজ থেকে আরও তিন বছর আগে।

‘শুধু তাই নয়, তার সাহস, দৃঢ় মনোবল এবং নিখাদ ন্যায়বোধে মুগ্ধ হয়ে প্রেসিডেন্ট বিশেষ ভাবে তাকে Trusted Personal Aide হওয়ার প্রস্তাবও দেন। কিন্তু হঠাৎই রিচার্ড সেই প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করে তার স্বপ্নের পেশা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ রহস্যময়ভাবে লাপাত্তা হয়ে যায়। এ কারণে ইতিহাসে তার নাম থাকলেও তার পরিচয় ও বৃত্তান্ত আজও অজানা। রিচার্ডের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া এখনও এক চিরন্তন রহস্য।

ভুলক্রূটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক দেওয়া হয়নি। সকলের রেসপন্স কামনা।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply