অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪৫)
সোফিয়া_সাফা
আবেশের রুদ্ধ দ্বারের সামনে এসে বুক ভরে শ্বাস নিল ফুল। উর্বীকে নিজের ঘরে রেখে এলেও উদ্যান ছায়ার মতো ওর পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে। ফুল ঘুরে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আপনি এখানেই থাকুন।”
“কেন?” উদ্যানের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন।
“আপনি গেলে আবেশ ভাই রিঅ্যাক্ট করতে পারে।”
উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “করলে করুক। আই ডোন্ট কেয়ার। আমি তোমাকে একা যেতে দিচ্ছিনা।”
ফুল কিছুটা বিরক্ত হলো, “আপনি তাকে আঘাত করেছিলেন, সেটা ভুলে যাবেন না।”
“ভুলে যাচ্ছিনা। শুধু তোমার সাথে সাথে থাকতে চাইছি।”
ফুল এবার সন্দিহান চোখে তাকাল, “আমাকে বিশ্বাস করেন না আপনি?”
উদ্যান দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, “নিজেকে জিজ্ঞেস করো। তুমি কতগুলো দিন আবেশের সাথে কাটিয়ে এসেছে তারপরেও কি আমি তোমাকে অবিশ্বাস করেছি?”
“তাহলে?”
“আবেশকে বিশ্বাস করিনা আমি। ও তোমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবে।”
ফুল নিচের ঠোঁট চেপে ধরে ফ্লোরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। “আচ্ছা আপনি এখানে দাঁড়িয়ে দেখবেন, সে কী করে আর আমি কী করি ঠিক আছে?”
উদ্যান একটু ভেবে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। ফুল সামনে ফিরে দরজার ছিটকিনি খুলতেই অন্ধকার আচ্ছন্ন রুমটা উন্মুক্ত হলো। আশ্চর্য হলেও এটাই সত্যি যে ঘরটাতে আলোর কোনো ছিঁটেফোঁটাও নেই। অথচ বাইরে এখনো আঁধার নামেনি। ফুল একটা শুকনো ঢোক গিলে ডাকল, “আবেশ…ভাই?”
আবেশ মেঝেতে অগোছালোভাবে শুয়ে ছিল। ফুলের ডাক শুনে সে দরজার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তীক্ষ্ণ আলোর ছটা চোখের সংস্পর্শে আসতেই তার মুখ কুচকে গেল। ফুল দেয়াল হাতড়ে সুইচ অন করতেই ঘরময় আলোকিত হয়ে উঠল। আবেশ দুহাতে মুখ ঢেকে আড়ষ্ট হয়ে উঠে বসল।
ফুল জানালার পর্দা সরিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো আবেশের দিকে। হাঁটু মুড়ে বসে কোমল সুরে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো আবেশ ভাই?”
তৎক্ষনাৎ হাত সরিয়ে ফুলের দিকে তাকাল আবেশ। ফুলের মুখটা দেখে হেসে উঠল তার হৃদয়। এদিকে আবেশের চেহারা দেখে ফুলের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। কী হাল হয়েছে আবেশের, চোখেমুখে যেন রাজ্যের বিষন্নতা লেগে আছে। আবেশ কনুই দিয়ে কপালে ঘাম মুছে উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, “ফুল তুই এসেছিস? তুই আজ দিনের বেলাতেও এসেছিস আমাকে দেখতে?”
ফুল আলতো করে মাথা নাড়ল। “কী হয়েছে আবেশ ভাই? কেন করছো এমন? এই দেখো আমি ভালো আছি তো! তুমিও ভালো থাকো না।”
আবেশ সোজা হয়ে বসল। “তোর অপেক্ষায় আমি অন্ধকারে বসতি গড়েছি ফুল। বলনা কিসের এতো বিমুখতা তোর? কেন তুই আলোতে আসতে ভয় পাস?”
“আমি আলোতে আসতে ভয় পাইনা আর। এই দেখো, ভয় ভেঙে গেছে আমার। তুমিও এবার আলোতে চলো আবেশ ভাই।”
আবেশ হাসতে লাগল, “তুই সত্যি নোস ফুল। তুই শুধুই আমার কল্পনা, কিছুক্ষণ পরেই হয়তো হারিয়ে যাবি। শুধু চলে যাওয়ার আগে বলে যা না কোথায় গেলে আমি সত্যিই খুঁজে পাবো তোকে।”
ফুল মলিন চোখে চেয়ে রইল। “আমাকে খুঁজতে চেওনা আবেশ ভাই। আমাকে খুঁজতে গেলে তুমি নিজেই হারিয়ে যাবে। তুমি হারিয়ে যেও না আবেশ ভাই। তুমি হারিয়ে গেলে আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না।”
ফুলের মাথার ব্যান্ডেজটা মাত্রই চোখে পড়ল আবেশের। যে আনমনেই ব্যান্ডেজ স্পর্শ করতে গেলে ফুল ছিটকে দূরে সরে যায়। “আমাকে স্পর্শ কোরো না আবেশ ভাই। যদি করো তবে আর কখনো কল্পনাতেও আসবো না তোমার।”
আবেশ অস্থির হয়ে পড়ল। “আমি স্পর্শ করতে চাইনি, কী হয়েছে তোর মাথায়? ব্যাথা পেয়েছিস কীভাবে?”
ফুল নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “তুমি আমার ব্যাথা পাওয়ার কারণও জানতে চেওনা। জাস্ট সুস্থ হয়ে যাও, আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও।”
আবেশ কাতর কণ্ঠে বলল, “আমাকে তুই নামক অসুখে ধরেছে ফুল। তোকে পেয়ে গেলেই সুস্থ হয়ে যাবো। হারিয়ে যাসনা, তোকে খুঁজতে খুঁজতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আর পারছি না।”
ফুল শান্ত হয়ে হাঁটু ভাজ করে বসল। “আমি যাচ্ছিনা, তুমি সুস্থ হও, একটা কথা বলার আছে তোমায়। যা শুধু তুমি সুস্থ হলেই বলতে পারবো। অন্তত আমার কথা শোনার জন্য হলেও সুস্থ হয়ে যাও।”
আবেশ বিষন্ন হাসল, “তোর কথাগুলো আজ বাস্তব বলে মনে হচ্ছে। আমি কি খুব মারাত্মক অবস্থায় চলে গেছি ফুল?”
ফুল আর পারল না সহ্য করতে। সে উঠে দাঁড়াল। এক ছুটে রুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমে এলো। উদ্যান আবেশের রুমের দরজা আটকে দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।
বিকেল গড়িয়েছে। ফুল উর্বীকে সাথে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেহেকের রুমের সামনে হাজির হলো। মেহেক তখন বারান্দা থেকে শুকনো কাপড়চোপড় এনে ভাঁজ করে রাখছিল। ফুলকে দেখেও বিশেষ গুরুত্ব দিল না সে।
“আসব মেহেক?”
“হ্যাঁ এসো।” অনুমতি পেয়ে ফুল উর্বীকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল।
ফুল বুঝতে পারল না কীভাবে কথা শুরু করবে। মেহেকও একদম চুপচাপ আছে। তাই ফুল সরাসরি আবেশের প্রসঙ্গে না গিয়ে অন্য কথা তুলল, “তুমি প্রতিদিনই ক্লাস করো?”
মেহেক সংক্ষেপে বলল, “হ্যাঁ, পড়াশোনার জন্যই তো এখানে আছি।”
“তোমার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে আমি সবসময় ভাবতাম তুমি হয়তো টিচার কিংবা ডাক্তার টাইপের কিছু হতে চাও।”
মেহেক বিরস কণ্ঠে বলল, “আমিও ভাবতাম তুমি আবেশ ভাইকে ভালোবাসো। সেটা যেখানে ভুল প্রমাণিত হলো সেখানে আমার ডিজাইনার হওয়ার ইচ্ছা থাকাটা অতোটাও বিস্ময়কর নয়।”
ফুলের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। “আমি কি কখনো আবেশ ভাইয়ের প্রতি অতি আগ্রহ দেখিয়ে ফেলেছিলাম মেহেক, যার জন্য তোমার এমনটা মনে হয়েছিল?”
“তা দেখাওনি তবে আবেশ ভাইয়ের ভালোবাসা তোমাকে প্রভাবিত করবে না এটা ভাবতেও পারিনি।”
ফুল পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “এতো ভালো স্টুডেন্ট হওয়ার পরেও টিচার কিংবা ডাক্তার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তোমাকে কেন প্রভাবিত করতে পারল না তবে?”
মেহেক কিছুটা ক্ষুব্ধ হলো, “ফুল, তুমি তুচ্ছ বিষয়ের সঙ্গে আবেশ ভাইয়ের ভালোবাসার তুলনা করবে না।”
“তোমার কাছে যেটা বৃহত্তর বিষয় সেটা সবার কাছে বৃহত্তর নাও হতে পারে মেহেক। তোমরা সবাই আমাকে দোষারোপ করছো, আমি অনেক ভেবে দেখলাম, সবার চোখে যখন আমিই অপরাধী তখন আর আত্মপক্ষ সমর্থন করে কিছু বলবো না। মেনে নিলাম সব দোষ আমার, এখন বলো কী করা উচিত আমার।”
মেহেক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “খালামনি বলল, তোমার স্বামী নাকি ভালোবাসে তোমায়। তো সেই ভালোবাসা নিয়েই ভালো থাকতে, আবেশ ভাইয়ের কথা কেন ভাবছো।”
ফুল হালকা হাসল, “জানিনা, হয়তো চরিত্র খারাপ বলেই তাকে নিয়ে ভাবছি।”
মেহেক হতচকিত নয়নে তাকাল। ফুল ঠাট্টার ছলে আরও যোগ করল, “যে যেভাবে পারছে আমাকে দোষারোপ করছে। নাও এবার আমিও নিজেকে দোষারোপ করে দিলাম।”
মেহেক এবার নরম হলো, “তোমাকে আমি দোষারোপ করিনি ফুল। আমিও জানি সবার পছন্দ এক নয়। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে ভালোবাসাও যায়না কাউকে।”
“আমি মেনে নিলাম আবেশ ভাইকে নিজের সাথে জড়ানোটা অপরাধ ছিল আমার। আসলে সাহায্য চাওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাইনি তখন। আমি হয়তো খুব স্বার্থপর তাইনা? আমি সব স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেব, শুধু আবেশ ভাই সুস্থ হয়ে যাক। আমি আর কখনো সাহায্যের জন্য তার দ্বারে আসবো না।”
ফুল ব্যাকুল হয়ে মেহেকের হাত আঁকড়ে ধরল, “কথা দিচ্ছি, সজ্ঞানে আর কখনো তার মুখোমুখি পর্যন্ত হবো না। শুধু আমি চাইনা, আমার জন্য তার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাক। আমি ভালো থাকার, সুখী হওয়ার সব ইচ্ছা ত্যাগ করেছি মেহেক। মেনে নিয়েছি ভাগ্যকে, এই দূর্ভাগ্য শুধুমাত্র আমার, আবেশ ভাই সুখে থাকুক। আমার কালোছায়া তার ওপর আর কখনো না পড়ুক।”
মেহেক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তুমি নিজের কথা রাখবে তো ফুল?”
“আমি রাখবো মেহেক। তুমি আমাকে সাহায্য করবে তো? তাকে সুস্থ করতে?”
মেহেক ধীরলয়ে উপরনিচ মাথা নাড়ল। উর্বী শুধু শুনে গেল, কিছুই বলল না। ফুল উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম করেও আবার পিছন ফিরল। ইতস্তত করে বলল, “বাড়িতে আরও একজনের থাকার কথা ছিল। তাকে কোথাও দেখছি না। তার ঘরটাও লক করা, কোথায় গেছেন তিনি?”
মেহেক বুঝতে পারল ফুল কার কথা বলছে, তবুও না বোঝার ভান করে শুধাল, “কার কথা বলছো?”
ফুল আনমনেই উচ্চারণ করল, “মা… কোথায় তিনি?”
“জানিনা ফুল, আজ তিনদিন হলো সে বাড়িতে নেই। হঠাৎ উধাও হয়ে গেছেন। খালামণিকে জিজ্ঞেস করার পর বলল, সেও জানেনা।”
ফুলের কণ্ঠরোধ হয়ে এলো। মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল, “একটু ফোন করবে তাকে? বলবে আমি এসেছি?”
মেহেক ছোট্ট শ্বাস ফেলল, “সে ফোন নিয়ে যায়নি। একটা ব্যাপারে অবাক হলাম, খালামণি বিষয়টা নিয়ে একটুও চিন্তিত নন। তার মতে, তোমার মা নাকি প্রায়ই কাউকে কিছু না বলেই চলে যান কোথাও। তুমিও কি জানো না কোথায় যান তিনি?”
ফুল মাথা নেড়ে ‘না’ জানাল। “আমিও জানিনা, তবে ১ দিনের বেশি তো কোথাও গিয়ে থাকেন নি তিনি। এবার কী হলো?”
“তোমার বাবার বাড়ির কারো সাথে সম্পর্ক নেই তোমাদের? তেমন কোনো পরিচিত আত্মীয় স্বজন নেই? থাকলে সেখানে খোঁজ নিয়ে দেখা যেতো।”
ফুল মিনমিনিয়ে বলল, “মা বলেছিল, বাবা মা’রা যাওয়ার পর বাবার আত্মীদের সাথেও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। আমি কখনো তাদের কাউকে দেখিনি। চিনিও না কাউকে।”
“থাক তুমি চিন্তা কোরো না। যেহেতু বেশিদিন গিয়ে থাকেননি কোথাও সেহেতু ফিরে আসবেন শীঘ্রই।”
ফুল নিঃশব্দে মাথা নেড়ে উর্বীকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
↓
রাত গভীর হয়েছে। মাহবুবা সুলতানা আর মেহেককে সাথে নিয়ে ফুল এসে দাঁড়াল আবেশের রুদ্ধ দ্বারের সামনে। দরজার হাতলে হাত রাখতেই ভেতর থেকে আবেশের গুনগুনানি ভেসে এল। বিচ্ছেদের সুর তুলে সে গাইছে:
Tere jaane ka gham
Aur na aane ka gham
Phir zamaane ka gham
Kya karein?
Raah dekhe nazar
Raat bhar jaag kar
Par teri toh khabar na mile
Bahut aayi gayi yaadein
Magar iss baar tum hi aana
Iraade phir se jaane ke nahi laana
Tum hi aana!
ফুলের হাত দরজার হাতলেই থমকে গেল। সে মাহবুবা সুলতানা আর মেহেকের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে শুধাল, “আবেশ ভাই গান গাইছে?”
মেহেক বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ সে বলেছে তোমার জন্যই নাকি গান শিখেছে। তার অনেক শখ ছিল সে গান গাইবে আর তুমি সেই গানের তালে নাচবে।”
কথাটা শুনে ফুলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। হাতের খাবারের ট্রে-টা তড়িঘড়ি করে মেহেকের হাতে দিয়ে সে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, “আমার মনে হচ্ছে না এখন তার কাছে যাওয়া ঠিক হবে। তোমার দুজন মিলে তাকে খাইয়ে দিও। আমি নাহয় সকাল বেলা যাবো।”
ফুল হাঁটা ধরতেই মেহেক বলল, “পালিয়ে যাচ্ছো?”
ফুল ক্ষণকাল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর পিছু ফিরে তাকাল। “যাচ্ছিনা, তার কাছে যাওয়ার অন্য পথ খুঁজছি।”
ফুল বড়বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে এলো। দেখল উর্বী ততক্ষণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ফুল লাইট অফ করে ডিম লাইট অন করল। তারপর শুয়ে পড়ল উর্বীর পাশেই। অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পরেও তার চোখে ঘুম ধরা দিল না। সে শুধু ভেবেই যাচ্ছে কীভাবে সে আবেশকে সুস্থ করে তুলবে।
↓
এভাবেই কেটে গেল দুদিন। কিন্তু ফুল কোনোভাবেই আবেশের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। কেন যেন তার যেতেই ইচ্ছা করেনা আবেশের সামনে। সন্ধ্যার পরপরই ফুল ঠিক করল আজ সে আবেশকে ওই রুম থেকে বাইরে বের করে আনবে। ভাবতে ভাবতেই কিচেনে চলে এলো সে। চুলায় গরম পানি বসিয়ে উদ্যানের জন্য ব্ল্যাক টি বানাতে লাগল।
কোনো একটা বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করে বসে আছে উদ্যান। মাঝেমধ্যেই পড়তে পড়তে তার ভ্রু কিঞ্চিৎ পরিমাণে কুচকে যাচ্ছে। তন্মধ্যেই দরজায় কেউ নক করল। সে অভ্যাসবশত অ্যালেক্সকে আদেশ করতে গিয়ে মনে পড়ল সে সোলার এস্টেটে নেই। অগত্যা উঠে গিয়ে তাকেই দরজা খুলে দিতে হলো। দরজার বাইরে ফুলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সরে দাঁড়াল উদ্যান। ফুল চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে খাটের দিকে তাকাতেই বইটা নজরে এলো। বইয়ের নামটা ঠিকভাবে লক্ষ্য করার আগেই উদ্যান চিলের মতো ছোঁ মেরে বইটা টেনে বালিশের নিচে রেখে দিল।
“আপনার বই পড়ার শখ আছে?” ফুলের সরাসরি প্রশ্ন।
উদ্যান এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাতে কপাল চুলকাতে লাগল। কিছুটা অপ্রস্তুত স্বরে বলল, “এই টপিকের বই পড়ার শখ না থাকলেও প্রয়োজন আছে। তাই মাঝেমধ্যে পড়তে হয়।”
ফুল ধাঁধায় পড়ে গেল। এই লোকটার কথার অর্থ উদ্ধার করা তার পক্ষে সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। উদ্যান ঘুরে গিয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিল, “কিছু বলবে?”
ফুল ধীর পায়ে উদ্যানের দিকে এগিয়ে এলো। কপালের ব্যান্ডেজ খুলে ফেলেছে সে। ক্ষতটা অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। উদ্যান চা খেতে খেতে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। ফুল চুপ থাকায় উদ্যানই বলল, “কাল ফিরে যাচ্ছি আমরা পেটাল।”
ফুল চমকে তাকাল। “ফিরে যাচ্ছি মানে? যেই কাজে আসলাম সেটাই তো করা হলো না।”
“সেটা তোমার ব্যর্থতা, আমি কী করবো? কাল আমার কাজ আছে, যেতেই হবে।”
“কী কাজ আছে আপনার?”
উদ্যান বিরক্ত হলো। “তা জেনে তুমি কী করবে পেটাল?”
ফুল সেই প্রসঙ্গে না গিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল, “দেখুন আবেশ ভাই সুস্থ হওয়ার আগেই চলে গেলে কী লাভ হবে বলুন? আবারও দুদিন পর আসতে হবে আমাদেরকে।”
“ভুলে যাও, কখনো আর এখানে আসার নাম নেবে না, বলে দিলাম।”
“সেই জন্যই তো বললাম। আরও কটা দিন থেকে তারপর যাই। এখনো আমি আবেশ ভাইকে আসল কথাটাই বলতে পারিনি। সে সুস্থ না হলে বলতেও পারবো না।”
উদ্যান এক মুহূর্তের জন্য থামল। তারপর তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে প্রশ্ন করল, “কী এমন কথা শুনি?”
“তা জেনে আপনার কাজ নেই। আপনি বরং আমার সাথে চলুন আবেশ ভাইয়ের কাছে।”
উদ্যান তর্জনী আঙুল নিজের দিকে তাক করে অবাক গলায় বলল, “আমাকে যেতে বলছো?”
“হ্যাঁ, চলুন।”
“আমাকে যেতে বলছো কেন? গিয়ে কী করবো আমি? দুদিন আগে না বললে আমি গেলে ও রিঅ্যাক্ট করবে?”
ফুল মৃদু হেসে বলল, “ঠিক এটাই, সে রিঅ্যাক্ট করবে। আর রিঅ্যাক্ট করা মানেই তার সবকিছু মনে পড়ে যাবে। এটাই সুস্থ হওয়ার প্রথম ধাপ। উর্বী আপুও এভাবেই সুস্থ হয়ে উঠছে কিন্তু।”
ফুল উদ্যানের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে টেবিলে রেখে দিল। তারপর বলল, “ফিরে এসে আবারও চা বানিয়ে খাওয়াবো, এখন চলুন তো।”
বলতে বলতেই উদ্যানের হাত ধরে টানতে লাগল ফুল। কিন্তু উদ্যানকে এক ইঞ্চিও নড়াতে পারল না। বিরক্ত সূচক শব্দ উচ্চারণ করল ফুল। “আরে চলুন না। এমন করছেন কেন? তখন না যেতে চেয়েছিলেন?”
উদ্যান আচমকা ফুলের কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের দেহের সাথে লেপ্টে নিল। তপ্ত স্বরে হিসহিসিয়ে বলল, “তখন যেতে চাওয়াটা আমার নিজের ইচ্ছা ছিল। এখন এটা তোমার ইচ্ছা। আর তুমি খুব ভালো করেই জানো আমি এমনি এমনি কারো ইচ্ছা পূরণ করিনা। কিছু দাও আমাকে, তারপরেই যাবো।”
ফুল অস্বস্তিতে পড়ে গেল। মাথা নিচু করে মিনমিনিয়ে বলল, “চা বানিয়ে খাইয়েছি না? আর কী চাই?”
উদ্যান ফুলের মুখটা হাতের আঁজলায় নিয়ে তাকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করল। হাস্কিটোনে বলল, “চায়ের থেকেও অ্যাটিক্টেড কিছুর স্বাদ পেয়ে গেছি আমি। তাই চা খাইয়ে এখন আর কাজ হবেনা।”
উদ্যানের ইঙ্গিত বুঝতে পেরে ফুল লজ্জায় ঠোঁট কামড়ে চোখ বুজল। উদ্যান হালকা হেসে ওর গাল চেপে ধরল, “এমন করলে যাবো না আমি। শো মি ইওর লিপস। কিয়েরো উন বেসো।”
ফুল দুই হাত দিয়ে উদ্যানকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। লজ্জায় তার গাল দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে। উদ্যান মজা করে বলল, “আমি কি তোমাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছি? এতো নড়াচড়া করছো কেন? পরে কিন্তু চুমুতেও কাজ হবেনা।”
ফুল শেষমেশ হার মেনে ঠোঁট বের করল। পরক্ষণেই উদ্যান তার ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। দীর্ঘ সময় ধরে দলিতমথিত হতে লাগল ফুলের অধর যুগল। উদ্যান যেন ক্রমশই শরীরের সম্পূর্ণ ভার ফুলের ওপর ছেড়ে দিতে চাইছে। ফুল ভারসাম্য হারিয়ে পেছনে ঢলে পড়তে নিলে উদ্যান নিজের উন্মুখতায় সংযম টানে।
ছাড়া পেয়েই ফুল দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল। হাত উল্টে ঠোঁট মুছে স্বাভাবিক গলায় বলল, “এবার চলুন।”
ফুল এমন ভাবে বলল যেন মাত্রই তাদের মধ্যে উন্মত্ত কিছুই ঘটেনি। উদ্যান পকেটে হাত গুজে যান্ত্রিক পায়ে হাঁটা ধরল। মাহবুবা সুলতানা আর মেহেক তখন আবেশের জন্য ডিনার নিয়ে যাচ্ছিল। ফুল উদ্যানকে নিয়ে তাদের অনুসরণ করে হেঁটে এলো।
“মেহেক, তুমি খাবার নিয়ে যেওনা। আজ আবেশ ভাই আমাদের সবার সাথে বসে খাবার খাবে।” ফুলের কথায় মেহেক বিস্মিত হলো।
মাহবুবা সুলতানা বললেন, “আগে বাইরে আসতে চাইলেও এখন ও নিজে থেকেই বাইরে আসতে চায়না ফুল।”
“দেখি কী করা যায়।” বলতে বলতেই ফুল দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। ঘরের আলো জ্বালিয়ে দেখল, আবেশ জানালার রেলিং ধরে একমনে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
“আবেশ ভাই।”
ফুলের ডাকে রেলিং ছেড়ে দিয়ে চোখ ফেরায় আবেশ। ফুলের মুখটা দেখে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, “তুই এসে গেছিস?”
কাছে এগিয়ে আসতে নেয় আবেশ। আনমনেই কয়েকপা পিছিয়ে যায় ফুল। দরজার দিকে ইশারা করে বলে, “আমি আজ একা আসিনি আবেশ ভাই। আরও একজনকে নিয়ে এসেছি। যাকে দেখে তুমি বুঝতে পারবে এসব কোনো কিছুই তোমার কল্পনা নয়।”
আবেশ কৌতূহলী চোখে দরজার দিকে তাকাতেই উদ্যান অবিচল পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। উদ্যানকে দেখেই আবেশের চোখমুখ শক্ত হয়ে উঠল। ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলল, “ও কেন এসেছে এখানে? চলে যেতে বল ওকে।”
ফুল আবেশের মুখভঙ্গি খুঁটিয়ে দেখে সান্ত্বনার সুরে বলল, “সব ঠিক হয়ে গেছে আবেশ ভাই। সে আর আমার গায়ে হাত তোলে না। অপমানও করেনা, আমি খুব ভালো আছি। দেখো তোমার কাছেও নিয়ে এসেছে সে আমাকে।”
আবেশের গলা শুকিয়ে এলো। হতভম্বতার একপর্যায়ে সে ধপ করে খাটে বসে পড়ল। পালাক্রমে একবার ফুলের দিকে তো আরেকবার উদ্যানের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে সে। ফুল তার সামনে এসে মৃদু স্বরে বলল, “আমি জানি ওনার ওপর রেগে আছো তুমি। রেগে থাকাটাই যুক্তিযুক্ত। তোমাকে অকারণেই শাস্তি দিয়েছিল যে। বিশ্বাস করো তোমাকে আঘাত করার কারণে তাকেও আঘাত করেছিলাম আমি।”
আবেশের চোখের মণি উদ্যানের ওপর স্থির হলো। উদ্যানও মন্থর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তারই দিকে। নিস্তব্ধতা ভেঙে আবেশ বিদ্রূপের সুরে বলল, “ও ডেভিল থেকে এঞ্জেল হয়ে গেছে?”
উদ্যান বেশ অনাগ্রহী হয়ে উঠল। ফুল হাসি চেপে মাথা নাড়ল। আবেশ এতো ধৈর্য সহকারে কথা বলবে ভাবতে পারেনি সে। আবেশ হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে উদ্যানের সামনে গিয়ে ফুলকে আড়াল করে দাঁড়াল। শক্ত গলায় বলল, “তোকে রেখে গিয়ে প্রমাণ করে দিক সে সত্যিই নিজের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।”
উদ্যানের দৃষ্টি তৎক্ষনাৎ জ্বলে উঠল। পরিস্থিতির অবনতি হতে দেখে ফুল দ্রুত আবেশের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বুকভরে শ্বাস নিয়ে বলল, “উনি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে, আবেশ ভাই।”
আবেশের মুখে দুর্বোধ্য হাসি ফুটে উঠল। উদ্যান তখনও নির্বিকার, যেন কোনো কিছুই প্রভাবিত করছে না তাকে।
“ও ভালোবেসে ফেলেছে, আর আমি তোকে শুরু থেকেই ভালোবাসি। সেই হিসেবে তোর ওপর আমার অধিকারই সবচেয়ে বেশি। আর তুই যেহেতু কাউকে ভালোবাসিস না, তাই যে তোকে প্রথম থেকে ভালোবেসেছে, তোর উচিত তার কাছেই থাকা। ঠিক তো? ওকে বলে দে, ও যেন এখনই এখান থেকে চলে যায়।”
ফুল বলে দিতেই যাচ্ছিল সেও উদ্যানকে ভালোবাসে তখনই তার মনে পড়ে গেল আবেশ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কথাটা বলতে পারবে না সে। এখনই বলে দিলে আবেশ আরও ভেঙে পড়বে। সে নিরপেক্ষ স্বরে বলল, “উনি আরও কয়েকদিন থাকবেন আবেশ ভাই। আর আমরা ওনাকে চলে যেতে বলতে পারিনা কারণ বাড়িটার অর্ধেক এখনো ওনার।”
উদ্যান কঠোর চোখে তাকাল ফুলের দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ফুল মুহূর্তেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলল, “এসব কথা এখন ভালো লাগছে না, ক্ষুধা লেগেছে ভীষণ। আবেশ ভাই তুমিও চলো। একসাথে বসে ডিনার করবো। যাবে তো?”
আবেশ ম্লান হাসল, “আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুই সত্যিই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। একটু পরীক্ষা করে দেখব?”
বলেই আবেশ হাত উঁচিয়ে ফুলের গাল টেনে দিতে উদ্যত হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে উদ্যান ছোঁ মেরে আবেশের হাতটা মাঝপথেই ধরে ফেলল। কাঠখোট্টা গলায় বলে উঠল, “এতো ছুঁইছুঁই করো কেন? কী সমস্যা তোমার?”
আবেশ ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল। বিরক্ত স্বরে বলল, “আপনি কোন দিকে ইঙ্গিত করছেন? ফুল আর আমি একসাথে বড় হয়েছি। খাইয়ে দিয়েছি, কোলেও নিয়েছি। বাইকে চড়ে একসাথে ঘুরেও বেরিয়েছি।”
“ও ছোটো ছিল তখন, এখন বড় হয়েছে। হাত বাড়াবে না ওর দিকে।”
“আপনি দুদিনের আগন্তুক হয়ে আমাকে আদেশ করছেন? আর আপনার ধারণা আমি সেই আদেশ মানবো?”
উদ্যানের দৃষ্টি তলোয়ারের মতো ধারালো হয়ে উঠল। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “আমি দুদিনের আগন্তুক হলেও আমি বিহীন ও অস্তিত্বহীন।”
আবেশ মুখ খোলার আগেই ফুল দুহাত তুলে দুজনকেই থামিয়ে দিল। “চুপ করো দুজনেই। আর আবেশ ভাই খেতে চলো।”
বলেই ফুল উদ্যানের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইল। উদ্যানও অযথা তর্কাতর্কি না করে তার সাথে পা মেলালো। আবেশ ফুলের ধরে রাখা হাতের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে প্রায় মাসখানেক পর রুমের বাইরে পা রাখল।
মাহবুবা সুলতানা খাবার বেড়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখছিলেন আর বারবার সিঁড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন। মেহেক চেয়ারে বসে খাবার নাড়াচাড়া করছিল। তখনই উদ্যান, ফুল, উর্বীর সাথে আবেশকে দেখে মাহবুবা সুলতানা আনন্দিত হয়ে গেলেন। সাহস করে এগিয়ে গেলেন ছেলের দিকে। আবেশ প্রতিক্রিয়া করছে না দেখে তিনি ছেলের বাহু জড়িয়ে ধরলেন, “বাবা আমার!”
আবেশ জড় বস্তুর ন্যায় দাঁড়িয়ে রইল। মাহবুবা সুলতানা ছেলেকে নিয়ে টেবিলে বসিয়ে দিলেন।
সবাই একত্রে খেতে বসল। ফুল বারবার উদ্যানের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করছিল তার কিছু লাগবে কি না। মাহবুবা সুলতানা দেখলেন ফুল উদ্যানের প্লেটে ভাতের সাথে শুধু চিকেন দিয়েছে। তিনি আসন ছেড়ে আবেশের পাতে ইলিশ মাছ তুলে দিয়ে উদ্যানের পাতেও দিতে উদ্যত হলেন। পরপরই ফুল তড়িঘড়ি করে বলল, “মামি সরিষাতে ওনার এলার্জি আছে।”
মাহবুবা সুলতানা সরষে ইলিশের বাটিটা রেখে গরুর মাংসের বাটিটা হাতে নিলেন। ঘন ঝোল থেকে মাংস তুলে উদ্যানের প্লেটে দিতে যাবেন; ফুল আবারও বাধা দিয়ে বলল, “ওটায় নাগা মরিচ দেওয়া হয়েছে মামি। উনি অতিরিক্ত ঝাল খেতে পারেন না।”
মাহবুবা সুলতানা নিজের আসনে বসে পড়লেন। উদ্যানকে খাবার বেড়ে দেওয়ার সাধ আপাতত মিটে গেছে তার। অথচ তিনি জানতেনই না উদ্যানের কিসে এলার্জি আছে বা উদ্যান কোন কোন খাবার খেতে পারে না। অন্যদিকে আবেশের ব্যাপারে সব জানেন তিনি।
উদ্যান নির্বিঘ্নে খাবার খাচ্ছে। আবেশ একদৃষ্টে ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে। ফুল উদ্দেশ্যহীন ভাবে তাকাতেই তাদের চোখাচোখি হয়ে যায়। ফুল হালকা হেসে মাথা নিচু করে নেয়। কিন্তু আবেশ পুরোটা সময় তার দিকেই তাকিয়ে থাকে।
খাবার শেষ করে উদ্যান আগেভাগেই নিজের রুমে চলে গেল।
আবেশকে একটু ভারসাম্যপূর্ণ হতে দেখে মেহেকের মনে প্রশান্তি বয়ে গেল। দৃশ্যটা এখন এমন যে, ফুল প্লেটের দিকে তাকিয়ে আছে, আবেশ আছে তার দিকে তাকিয়ে আর মেহেকের দৃষ্টি আটকে আছে আবেশের ওপর। উর্বী নিবিষ্ট চোখে তাদের পরখ করে চলেছে। ফুল কোনোমতে খাবার শেষ করে কিচেনে চলে গেল, ওর পিছু পিছু গেল উর্বীও। একে একে উঠে গেলেন মেহেক আর মাহবুবা সুলতানাও।
সবশেষে আবেশ ধীরস্থিরভাবে হাত ধুয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। এরইমধ্যে মেহেক হাতে কতগুলো ঔষধ নিয়ে ঝট করে ছুটে এলো। সেগুলো আবেশের দিকে বাড়িয়ে দিল, “এগুলো খেয়ে নাও, আবেশ ভাই।”
নিঃস্পন্দ দৃষ্টিতে আবেশ তাকাল তার দিকে। পরক্ষনেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। কেমন যেন রুষ্ট স্বরে বলল, “মেহেক তুই?”
হকচকিয়ে গেল মেহেক। বুঝতে পারল, লাইটের আলোয় আবেশ তাকে চিনে ফেলেছে। বিষয়টা ভালো লাগল তার। মনে হলো কতযুগ পর যেন আবেশ তার নাম ধরে ডেকেছে। “হ্যাঁ, আবেশ ভাই। এগুলো তোমার রাতের ঔষধ, খেয়ে নাও।”
আবেশ তার বাড়িয়ে রাখা হাত সরিয়ে দিল। “ফুল এসে গেছে, এখন আর ঔষধের প্রয়োজন নেই আমার। এমনিতেই সুস্থ হয়ে যাবো।”
মেহেকের উজ্জ্বল হয়ে ওঠা মুখটায় নিমিষেই অন্ধকারের ছায়া পড়ল। আবেশ তাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
গরম পানিতে চা পাতা দিয়ে অপেক্ষা করছিল ফুল। উর্বী তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল, “ওই ছেলেটাকে চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছিলাম।”
চুলা থেকে সসপ্যান নামিয়ে কাপে চা ঢালতে ঢালতে ফুল প্রত্যুত্তর করল, “তুমি দেখেছিলে তাকে, তাই চেনা চেনা লাগছে।”
“কোথায় দেখেছিলাম?”
“আমাকে নিতে সে থানায় গিয়েছিল সেখানেই দেখেছিলে।”
উর্বী আর কোনো প্রশ্ন করল না, তবে নিজ মনেই সে পুরোনো স্মৃতিগুলো হাতড়াতে লাগল।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৩৫০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২২