প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা || ৫ ||
ফারজানারহমানসেতু
🚫 অন্যত্র কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ 🚫
গাড়িতে ফেরার পথে রোজা আর তুবা পিছনের সিটে বসেছে।তুবা এমনিতেই চুপচাপ থাকে, তাই নিরবতা নিতান্তই স্বাভাবিক। তবে রোজার সাথে সে কথায় হ্যাঁ হুমম করছে।
আরেকজন যে, সে তো আর চুপ থাকার বান্দা না। তবে সে ছটফট না করে চুপ করে কেন কথা বলছে,তাই তো বুঝতে পারছে না তূর্জান। যদিও রোজা ছটফট না করে চুপ থাকলেও হাতের মেরুন রঙা চুড়িগুলোর আর চুপ থাকা হচ্ছে না। রোজা বারবার নেড়ে দেখাচ্ছে তুবাকে চুড়িগুলো। চুড়ির ধ্বনি যেন কারো মস্তিস্কে অচেতনাই বারি খাচ্ছে।
বলছে থেকে যেতে, থেকে এই চুড়ির প্রতিধ্বনি শুনতে। মাঝে মাঝে পায়ের পায়েলগুলো শব্দ ছড়িয়ে বলছে থেকে যাও। তূর্জান বুঝতে পারল না, এই মেয়ে এখন খুশি আছে নাকি,মনখারাপ নিয়ে এমন মুখ করে বসে আছে। ছোটদের মন হয়তো এমনই থাকে,একসাথে হাজার ধরণের হাজার অনুভূতি নিয়ে থাকে।
মিরান হালকা হেসে রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই যে ছটফটানি বনু, আজকে ছটফটানি এত কম কেন? ঘুরতে আসার সময় তো ভালোই আনন্দ করছিলে। হঠাৎ এত চুপ,কেউ ঘুরতে এসে এমন চুপ থাকে নাকি?”
রোজা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“আমি কই চুপ আছি, আমি কথা বলছি তো তুবার সাথে!”
মিরান বলল,
“ কথা তো বলছো কিন্তু চুপ করে তাই বললাম।”
তূর্জান একবার মিডেল মিরর থেকে রোজার মুখ দেখে নিল। এই মেয়ে যাই হোক কথায় কখনো পারা যাবে না। তূর্জান একটা জায়গায় গাড়ি পার্কিং করল। পিছনে ঘাড় বাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“ঠিক আছে, এত ছটফটে কথা বলতে হবে না। কিন্তু আইসক্রিম খাওয়া কি বন্ধ?”
রোজা তাকাল একবার তূর্জানের দিকে, তূর্জান ভ্রু উচিয়ে জানান দিল খাবে কি না?রোজা তুবার দিকে তাকিয়ে একসঙ্গে বলে উঠল,
“না… আইসক্রিম খাওয়া বন্ধ না।”
সবাই হেসে উঠল। গাড়ি থেকে নেমে চারজনে রাস্তার পাশের একটা দোকানে গেলো।যার যার ফ্রেভারিট ফ্লেভারের আইসক্রিম নিয়ে চারজন আবার গাড়িতে উঠল। পরিবেশটা হালকা হয়ে গেলেও, কারোর মনে অজানা এক অদ্ভুত চিন্তা রেখার পরিসীমা দেখা গেল।
চারজনের বাড়িতে ফিরতে প্রায় দশটা মতো বাজলো।তূর্জানের আম্মুসহ বাড়ির সবাই যেন তাদের ফিরার আসায় বসে ছিলেন। থাকবেই না কেন? নয় বছর তো আর দেখতে পারবে না। তাই ভেবেছে আজকের ডিনার সবাই একসাথে করবে।গৃহবধূরা কিচেনের কাজ শেষ করে ডাইনিং এ খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তূর্জানরা বাড়িতে ঢুকতেই তূর্জানের বাবা বললেন,
“এই সময় হলো আসার? কাল ফ্লাইট, কারও চিন্তা আছে?”
তূর্জান কিছু বলার আগেই মিরান বলল,
“আছে তো বড় বাবা,তাই তো সবার মন ভালো করে আনলাম।”
তানিয়া নেওয়াজসহ সবাই বাবা ছেলের দৃশ্যটা দেখে মৃদু হাসলেন। বাবা ছেলের জন্য চিন্তা করে এটা সবাই বোঝে, কিন্তু তিনি ছেলের কাছে সর্বদা রাগী হিসাবে পরিচিত হয়ে থাকেন। আবার ছেলে যে বাবার বার্ধকতা তা না বুঝতে দিয়ে অবাধ্যপনার পরিচয় দিতে প্রস্তুত থাকে। তবে এতকিছুর ভিড়ে রোজার মুখে আবার হাসি ফিরেছে এটাই সবার কাছে বড় স্বস্তি।
তূর্জান বেলকনিতে বসে চুপচাপ অর্ধচন্দ্র বিলাস করছে। আকাশে আধখানা চাঁদ আজ বড়ই সুন্দর দেখাচ্ছে, কিন্তু তূর্জানের মনে এই সৌন্দর্য দাগ কাটতে পারছে না।রোজার। পায়েলের চমৎকার আওয়াজ শোনা গেলো আশেপাশে, তূর্জান বেশ বুঝল রোজা রুমে আসতে চায়ছে। তূর্জান পারমিশন দিতেই রোজা রুমে এলো গুটিগুটি পায়ে। তূর্জানের পাশে এসে দাড়ালো। তূর্জান কিছুটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল,
“ এখনো ঘুমাস নি কেন? “
“ ভাইয়া তুমি কাল চলে যাবা?”
“ ঘুমাসনি কেন? “
“ ভাইয়া, তুমি বড় বাবার কথায় কষ্ট পেয়েছো? “
“না! কেন?”
“ বড় বাবা ভেবেছে তুমি তার কথায় রাগ করে যাচ্ছো। তাই বড় বাবা কান্না করছে! আমি এই রুমে আসার সময় দেখলাম বড় বাবা কান্না করছে।“
“ জানি!কিন্তু আমি তোর বড় বাবার কথাই যাচ্ছি না। এমনিতেই যাচ্ছি!”
“ তাহলে বড় বাবাকে বলে আসি, তুমি ইচ্ছে করে যাচ্ছো। বড় বাবার কথায় রাগ করে না।”
“ তোর বড় বাবাকে অনেক বেশি ভালোবাসিস? “
“ হুম, অনেক বেশি ভালোবাসি। বড় মা কেউ ভালোবাসি! সবাইকেই ভালোবাসি। “
“ রোজা!”
“ হুম!”
“ তোর মনে থাকবে আমাকে? “
“ তুমি কথায় কথায় এইটা বলো কেন? আমি একদিন বলতে শুনেছিলাম আম্মুকে, যদি নাই ভুলে যাই, তাহলে আবার মনে আসার প্রশ্ন উঠে কোথা থেকে। আমি তোমাকে ভুলবোই তো না, তাহলে মনে থাকবে না কেন?“
“যদি ভুলে যাস!”
“ উহু ভুলবো না। আমি প্রমিস করলে তা ভুলি না।আমার বাবা আমাকে বলেছিলো কোনো কথা দিয়ে থাকলে তা রাখতে হয়। “
“ তোর সবার কথাই মনে থাকে? “
রোজা কথা পাল্টে বলল,” তুমি যাওয়ার সময় আমাকে জানিয়ে যাবে?”
“ কেন? “
“ এমনিতেই, আ…. “
কথা শেষ না হতেই হঠাৎ তুবা এসে দরজায় নক করল। তূর্জান বোনের উপস্থিতি বুঝে রুমে আসার পারমিশন দিল। তুবা এসে বলল, রোজাকে ডাকছে গ্ৰানি ওষুধ খাওয়ার জন্য। তূর্জান রোজার দিকে তাকাতেই রোজা দৌড়ে গেল ওষুধ খেতে। তূর্জান যেন একটু শ্বাস ফেলল। যাক তার অবুজপনা রানী তার ইশারাই চলছে। তূর্জান তুবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“মন খারাপ?”
তুবা মাথা নেড়ে বোঝাল। “ না “কিন্তু চোখে অন্য কথা দেখা গেল।
“ ভাইয়া তুমি গেলে… বাসাটা ফাঁকা লাগবে।”
তূর্জান শান্ত স্বরে বলল, “ পাগলী বোন, বাসা কখনো ফাঁকা হয় না। মানুষ থাকে, তার স্মৃতি থাকে, তার কথা থাকে। আর আমি তো তোদের সাথে যোগাযোগেই থাকব।”
তুবা ধীরে বলল,
“আমি ভয় পাচ্ছি ভাইয়া, তুমি ছাড়া আমরা কিভাবে স্কুলে যাবো?আমাদের পড়াবে কে?”
তূর্জান বোনের চোখে চেয়ে বলল,
“ভয় এটা স্বাভাবিক, কিন্তু ভয়কে বলবি আমি পারব, আমি কারো সাহায্য ছাড়াই পারবো। তাছাড়া আমি গেলে তোর কতো কাজ? রোজাকে দেখে রাখতে হবে।ঠিক মতো পড়াশোনা করতে হবে!এখনই এভাবে ভেঙে পড়লে হবে?”
তুবা হালকা মাথা নেড়ে বলল,
“তুমি গেলে আমি আর রোজা পড়াশোনা ঠিকমতো করব।
“এই তো আমার সাহসী বোন।,”
★★
বিদায়ের আগের রাতটা অদ্ভুত শান্ত। যেন পুরো বাড়ি ধীরে কথা বলছে। কেউ জোরে হাসছে না, টিভির শব্দ কম, হাঁটার শব্দও নরম।সবকিছুতে অন্য কিছুর আভাস।
রোজা, তুবা আর তার গ্ৰানি একসঙ্গে ঘুমায়। রোজার দিকে তাকিয়ে গ্ৰানি বলল,
“ কিরে ঘুমাবি না?শুয়ে পড় তারাতারি!“
“ ঘুমাবো। “
ওদিকে তূর্জানের ব্যাগ গোছানো প্রায় শেষ । কাগজপত্র, ফাইল, কাপড় সব ঠিকঠাক করে গুছিয়ে নিয়েছে। কিন্তু মাঝেমধ্যে থেমে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে কিছু একটা বাদ পড়েছে।হয়তো কোনো জিনিস না,অনুভূতির নিচে থাকা কোনো মালকিন। যাকে ছেড়ে যাচ্ছে।
“ভিতরে আসব?”
হঠাৎ মায়ের কণ্ঠস্বর পেয়ে তাকালো পিছনে। বলল, “এসো।”
তানিয়া নেওয়াজ যে কেদেছে তা চোখ দেখে স্পষ্ট। হয়তো লুকাতে চাচ্ছে ওই নোনাজলের কণা, কিন্তু তাতে বাধ সাধতে অক্ষম। তূর্জানের মনেও তোলপাড় চলছে। এই এত বছরেও বাড়ির বাইরে থাকেনি সে।তূর্জান সব সাইডে রেখে তানিয়া নেওয়াজ কে বেডে বসিয়ে দিল। নিজ উদ্যোগে শুয়ে পড়ল মায়ের কোলে মাথা রেখে। এবার আর কান্না চেপে রাখতে পারলেন না। কয়েকফোটা গড়িয়ে পড়ল তূর্জানের মুখে। তবুও সে নিশ্চুপ। অনুভূতিহীন কোনো জড় বস্তুর ন্যায় পড়ে থাকল চোখ বন্ধ করে । তানিয়া নেওয়াজ কান্না কিছুটা রোধ করে বললেন,
“বাবার উপর রেগে, মাকে বেশি অপেক্ষা করাবি না তো ? “
“ আমি বাবার প্রতি একটুও রেগে নেই আম্মু। আমিও হয়তো বাবার জায়গায় থাকলে নিজের সন্তানের কথ ভেবে এমনটাই করতাম।তাছাড়া আমি মাত্র নয়বছর থাকবো, তারপর ঠিক ফিরে আসবো! “
“ তোদের কাছে মাত্র নয়বছর হলেও আমার কাছে নয়যুগের বেশি।তবে তোরা নিজেদের স্বার্থে নয়বছরের জন্য বাবা ছেলে মিলে যে,মায়ের অপেক্ষার প্রহর গুনাতে ব্যাস্ত হলি!”
একটু থেমে আবার বলল, “ জানিস তূর্জান
অপেক্ষা জিনিস বড় বেশি কষ্টের! কেউ অপেক্ষা করতে করতে জীবনের মানে ফিরে পায়! কেউ অপেক্ষায় জীবনের মানে হারিয়ে ফেলে!”
ইনশাআল্লাহ চলবে….
আমার পেজ লিংক.
এখন থেকে ইফতারের পরেই গল্প দিবো ইনশাআল্লাহ।
আর আমি যেহেতু নিজে লিখেছি গল্প, তো অন্যদের মতো রোজার পায়েল তূর্জানের জন্য থামাতে পারিনি।এজন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী😂 আই হোপ, সব কথা ভেঙে বোঝাতে হয় না।
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২