রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_৪৪
নিলুফানাজমিননীলা
★★★
হাসপাতালে সবসময়ের মতোই আজও ভিড় উপচে পড়ছে। চারদিকে এক অস্থির কর্মব্যস্ততা। কেউ নিজের প্রিয়জনের জন্য ওষুধের ফর্দ হাতে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে, কেউ বা করিডোরের বেঞ্চে আকাশসমান বিষণ্ণতা নিয়ে পাথরের মতো বসে আছে। এর মাঝেই নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রম চোখে পড়ার মতো। এত কিছুর পরও রোগীদের অভিযোগের অন্ত নেই, যেন অভিযোগ করাই হাসপাতালের অঘোষিত নিয়ম।
তৃণা আর আরিয়ান ধীরপায়ে উমর হাওলাদারের কেবিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আরিয়ানের মুখভঙ্গি এখনো মেঘলা, তৌহিদের কাছে যাওয়ার বিরক্তিটা সে লুকাতেও পারছে না।
হঠাৎ একটি কেবিনের সামনে এসে তৃণার পা জোড়া থমকে গেল। একটি মেয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছে। মেয়েটি বোধহয় তৃণার সমবয়সীই হবে। তার গগনবিদারী চিৎকার পুরো করিডোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। তৃণা একটু এগিয়ে যেতেই মেয়েটির ভাঙা কণ্ঠের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেল,
“আব্বু! আমাকে এভাবে একা ফেলে তুমি কী করে চলে যেতে পারলে? এভাবে এতিম করে দিয়ে গেলে আমায়!”
কান্নার বেগে মেয়েটির বাকি কথাগুলো অস্পষ্ট হয়ে এল। সেই দৃশ্য দেখে তৃণার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। মুহূর্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নিজের হিরো বাবার মুখটা। উমর হাওলাদারের মাথার চুলগুলো এখন অনেকটা পেকে সাদা হয়ে এসেছে, দাড়িগুলোতেও রুপালি আভা। মুখে বয়সের ছাপ স্পষ্ট।
তৃণা না চাইতেও ওই মেয়েটির জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে ফেলল। এক নিমিষেই তার সারা শরীর হিম হয়ে এল। সে অনুভব করল, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে তার বাবা ছাড়া সে কতটা অসহায়, কতটা নিঃসঙ্গ। বাবার অস্তিত্বই যেন তার জীবনের একমাত্র ছাদ।
তৃণা তার বাবার মধ্যেই নিজের মা এবং বাবা দুজনের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। হঠাৎ ওই মেয়েটির হাহাকার তৃণার মনের সবটুকু শক্তি কেড়ে নিল। তার চোখ বেয়ে অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
আরিয়ান তৃণার মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পারল। সে জানে তৃণা তার বাবার জন্য কতটা পাগল। আরিয়ান আলতো করে তৃণার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,
“শান্ত হও তৃণা। চলো, এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকো না।”
আরিয়ান তৃণার হাত ধরে উমর সাহেবের কেবিনে প্রবেশ করল। ঘরে ঢুকে দেখল তিনি সেখানে নেই, হয়তো রোগি দেখতে গেছেন। তৃণা অস্থির হয়ে কেবিনের সোফায় বসল। কিছুক্ষণ পরই উমর হাওলাদার কেবিনে ঢুকলেন।
বাবার ক্লান্ত মুখটার দিকে তাকাতেই তৃণার বুকটা আবার হু হু করে উঠল। ফর্সা দাড়িযুক্ত সেই চেনা চেহারার মানুষটির মুখ আজ বড্ড ভাঙা দেখাচ্ছে। বয়সের ভার আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট,চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। আরিয়ান আর তৃণা দুজনেই শ্রদ্ধাভরে উঠে দাঁড়াল। বেশ কিছুদিন উমর হাওলাদারে র সাথে তৃণার সরাসরি দেখা হয়নি, যদিও ফোনে কথা হতো নিয়মিত।
তৃণার ঠোঁটজোড়া আবেগে কাঁপছে। সে কোনোমতে কাঁপা গলায় ডাকল,
“আব্বু!”
উমর সাহেব ম্লান হাসার চেষ্টা করে বললেন,
“কী হয়েছে মা আমার? কাঁদছিস কেন?”
তৃণা কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে ঝাপটে ধরে বাবার বুকে মাথা রাখল। নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে চলল কিছুক্ষণ। তার কানে এখনো বাজছে করিডরের সেই মেয়েটির আর্তনাদ ‘আব্বু আমাকে ছেড়ে তুমি কীভাবে যেতে পারো!’
তৃণা মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করল, ‘আমার বাবাকে আমার মাথার ওপর ছায়া করে আজীবন বাঁচিয়ে রেখো। আমি তো ওনাকে ছাড়া জ্যান্ত লাশ হয়ে যাব।’
উমর হাওলাদার তৃণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
উমর হাওলাদার মেয়ের চিবুক ধরে পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে মা? তোকে কি কেউ কিছু বলেছে?”
তৃণা চোখের জল মুছে ছোট করে বলল,
“না আব্বু।”
“তাহলে আমার মা-মণি কাঁদছে কেন?”
“কতদিন ধরে তোমাকে দেখি না, তাই।”
উমর হাওলাদার তৃণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে হেসে উঠলেন।
“পাগলী মেয়ে! এর জন্য কেউ এভাবে কাঁদে? এই তো আমি তোর সামনেই আছি।”
তিনি সযত্নে তৃণার দুচোখের কোণ মোছালেন। তৃণা একটু অভিমানী স্বরে বলল,
“তুমি যে অসুস্থ, সেটা তো আমাকে বললে না!”
উমর হাওলাদার স্বাভাবিক থাকার ভান করে বললেন,
“কে বলল আমি অসুস্থ? এই দেখ, আমি একদম ফিট আছি।”
তৃণা স্থির দৃষ্টিতে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বাবারা বোধহয় এমনই হয় ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেলেও সন্তানদের সামনে শক্ত পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আরিয়ান এবার এগিয়ে এসে শ্বশুরকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করল। তারপর বিনীত স্বরে বলল,
“বাবা, আপনি তো আমাদের বাড়িতেই চলে আসতে পারেন। হাওলাদার বাড়িতে তো এখন আপনি একা। এই বয়সে রান্না-বান্না থেকে শুরু করে সব একা সামলানো কি সম্ভব?”
উমর হাওলাদার ম্লান হেসে জবাব দিলেন,
“মেয়ের বাড়িতে এসে থাকা কি আমাকে সাজে বাবা? আর তেমন সমস্যা হচ্ছে না, বাড়িতে একটা কাজের ছেলে আছে, সেই সব সামলে দেয়।”
বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পর তৃণা তৌহিদের কেবিনের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। উমর হাওলাদার আগেই বলে দিয়েছেন যে তৌহিদ চার নম্বর ওয়ার্ডের তিন নম্বর কেবিনে আছে। আরিয়ান পাশে হাঁটতে হাঁটতে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তৃণা, চলো না বাড়ি চলে যাই! তৌহিদ তো এখন ভালোই আছে।¡
তৃণা থেমে গেল। আরিয়ানের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল,
“আপনি এত চটফট করছেন কেন? আপনি কি হিংসা করছেন? জেলাসি ফিল হচ্ছে?”
তৃণা আবার হাঁটতে শুরু করল। পেছনে থাকা আরিয়ানের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিল আরও একটা তির,
“বউ হিসেবে আমাকে মানেন না, অথচ জেলাসি দেখাচ্ছেন। বিষয়টা বেশ হাস্যকর না?”
আরিয়ান এবার একটু রেগে গিয়েই বলল,
“এক কথা দিয়ে আর কত খোঁটা দেবে? বললাম তো তোমাকে আমি বউ হিসেবে মানি। এখন কি বউ হিসেবে মানার প্রমাণ দেওয়ার জন্য তোমাকে একটা বাচ্চা উপহার দিতে হবে?”
তৃণা ঝট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে নাক কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“নির্লজ্জ কোথাকার!”
আরিয়ান এবার নাছোড়বান্দার মতো বলল,
“ভালো কথা বললেও এখন মানুষ নির্লজ্জ হয়ে যায়? তোমার মুখ থেকে এই নির্লজ্জ শব্দ শুনতে শুনতে আমার কান ঝাঝরা হয়ে যাচ্ছে।”
তৃণা আর তর্কে না জড়িয়ে তৌহিদের কেবিনে ঢুকে গেল।
আরিয়ান কেবিনের ভেতরে ঢুকল না। সে দরজার আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে উঁকি মেরে দাঁড়িয়ে রইল। তার শুনতে হবে তৃণা আর তৌহিদের মাঝে আসলে কী কথা হয়, সেটা তাকে জানতেই হবে।
তৃণা ভেতরে ঢুকেই দেখল সাদা বিছানায় চোখ বন্ধ করে নিথর হয়ে শুয়ে আছে তৌহিদ। হাতে স্যালাইন চলছে, আর কবজির সেই সাদা ব্যান্ডেজটা জানান দিচ্ছে গতরাতের ভয়াবহতার কথা। তৃণা পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল। কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে তৌহিদ ধীরলয়ে চোখ মেলল। চোখের সামনে তৃণাকে দেখেই তার ফ্যাকাসে মুখটা বিস্ময়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তৃণা বেডের খুব কাছে গেল না, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেই স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তারপর খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছেন?”
তৌহিদ ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। তৃণা হাত বাড়িয়ে বাধা দিয়ে বলল,
“উঠবেন না, শুয়ে থাকুন।”
তৌহিদ তৃণার কথা শুনল না। কষ্ট করে কিছুটা সোজা হয়ে বিছানার সাথে হেলান দিয়ে বসল। তৃণার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল,
“অনেক ভালো আছি। তোমাকে চোখের সামনে দেখলে কেউ কি আর খারাপ থাকতে পারে?”
তৃণা গম্ভীর গলায় বলল,
“এসব কেন করলেন? নিজের জীবনের প্রতি এত বিদ্বেষ কিসের আপনার?”
তৌহিদ এবার একটু শব্দ করেই হাসল, তবে সেই হাসিতে কান্নার সুর মিশে ছিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বিদ্বেষ! কিসের বিদ্বেষ সেটা আমার নিজেরও জানা নেই। তবে এতটুকু বুঝি এক জীবনে তোমাকে না পাওয়ার আক্ষেপ থেকেই হয়তো এই জীবনটার ওপর ঘৃণা জন্মেছে।”
তৃণা তড়িৎ উত্তর দিল,
“অন্যের স্ত্রীকে এভাবে চাওয়াটা কতটা ঠিক?”
তৌহিদ সহসা প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল,
“আমি তো তোমাকে অনেক আগেই চেয়েছিলাম তৃণা। আরিয়ান আসার ঢের আগে থেকে তোমাকে ভালোবেসেছি। কিন্তু তুমিই তো আমার হলে না।”
তৃণা এক বুক শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। তারপর তৌহিদের চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল,
“এগুলো স্রেফ পাগলামি তৌহিদ। আজ যদি আপনি সত্যিই মরে যেতেন, তাতে লাভটা কার হতো? আমাকে কি পেয়ে যেতেন? নাকি এখন আমাকে পেয়ে গেছেন?”
তৌহিদ অবহেলার সুরে বলল,
“আ”ত্মহ”ত্যা কি মানুষ সাধে করে? জীবনের অসহ্য যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য এর চেয়ে সহজ পথ আর কী আছে বলো?”
তৃণা এবার দরাজ গলায় বলল,
“আ”ত্মহ”ত্যা কেবল পাগলরা করে। যাদের বিবেকে কিছু নেই, তারা করে। আল্লাহ্’র দেওয়া এই সুন্দর জীবন যারা নিজ হাতে ধ্বংস করে, তাদের মতো গর্দভ আর এই পৃথিবীতে নেই। ওরা এক জীবনের সামান্য কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য পরকালের চিরস্থায়ী জাহান্নামের শাস্তি কিনে নেয়।”
তৌহিদ আর কোনো কথা বলল না। তৃণার যুক্তির সামনে সে যেন নির্বাক হয়ে গেল।
আরিয়ান দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে তৃণার কথাগুলো শুনছিল আর ভেতরে ভেতরে খুশিতে গদগদ হচ্ছিল। তৃণার কড়া জবাব শুনে সে মনে মনে বলে উঠল, ‘এই না হলে আমার বউ! উম্মাহ বউ, উম্মাহ!’
তৃণা তৌহিদকে শেষবারের মতো বুঝিয়ে বলল,
“দেখুন, জীবনে যা হওয়ার হয়েছে। ওসব ভুলে গিয়ে নিজের জীবনটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিন।”
তৌহিদকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তৃণা হনহন করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
তৃণা দৃষ্টির আড়াল হতেই আরিয়ান বুক ফুলিয়ে ধীরপায়ে কেবিনে ঢুকল। আরিয়ানকে এভাবে অতর্কিতে ঢুকতে দেখে তৌহিদ যেন আকাশ থেকে পড়ল। আরিয়ান দাঁত বের করে একগাল হেসে বলল,
“হাই ব্রো! কেমন আছো? শরীর-স্বাস্থ্য সব ঠিকঠাক তো?”
তৌহিদ বোকার মতো তাকিয়ে রইল, মুখে কোনো কথা সরল না। আরিয়ান নিজের ঘরের মতোই আয়েশ করে তৌহিদের বেডের পাশে একটা টুল টেনে বসল। তারপর তৌহিদের সেই ব্যান্ডেজ করা জায়গায় আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে মায়াবী স্বরে বলল,
“আহা ব্রো! আমার সোনার ভাইটার বুঝি খুব ব্যথা লেগেছে, না?”
ব্যথা পাওয়া জায়গায় আরিয়ানের হাতের চাপে তৌহিদ যন্ত্রণায় উঁহ করে শব্দ করে উঠল।
আরিয়ান এবার নিজের স্বভাবসুলভ থেকে বের হয়ে ভাব নিয়ে বলল,
“তৌহিদ ভাই আমার, দেরি না করে চটপট একটা বিয়ে করে ফেলো। তাহলে আমার মতো জীবনে আসমান সমান সুখ পাবে।”
তৌহিদ ভ্রু কুঁচকে তপ্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কেমন সুখ শুনি?”
আরিয়ান নিজের শার্টের কলারটা একটু টেনে ঠিক করে নিল। তারপর দুনিয়ার সব গর্ব নিয়ে বলতে শুরু করল,
“এই ধরো, আমার বউ প্রতিদিন সকালে আমার কপালে একটা আর দুই গালে দুটো গভীর চুমু দিয়ে আমাকে ঘুম থেকে জাগায়। চোখ মেলতেই দেখি বউ আমার এক কাপ কফি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজ হাতে খাইয়ে না দিলে তো আমার সকালটাই মাটি হয়! শুধু তাই নয়, প্যান্ট…. না মানে শার্টটাও আমার নিজ হাতে পরতে হয় না বউ বড় আদর করে পরিয়ে দেয়। আহা! একবার বিয়েটা করে দেখো, জীবনে কী যে শান্তি! সুখ আর সুখ, বুঝলে?”
তৌহিদ বিস্ফোরিত চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হতে লাগল, আরিয়ান কি সত্যিই তাকে সুখের গল্প শোনাচ্ছে নাকি তার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিয়ে তাকে মানসিক টর্চার করছে?
আরিয়ান তৌহিদের চোখের ওপর চোখ রেখে খুব আয়েশি ভঙ্গিতে আবারও বলল,
“শোনো ব্রো, আগামী বছর আমার সন্তান হওয়ার খুশিতে অনেক বড় একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করব। ভাবলাম তোমাকে অগ্রিম দাওয়াতটা দিয়েই রাখি।”
তৌহিদ যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ বড় বড় করে অস্ফুট স্বরে বলল,
“তৃণা… তৃণা কি প্রেগন্যান্ট?”
আরিয়ান বাঁকা হেসে জবাব দিল,
“আরে প্রেগন্যান্ট হতে আর কতক্ষণ! জাস্ট সময়ের ব্যাপার।”
ঠিক সেই মুহূর্তে আরিয়ান তার কাঁধে কারও হাতের স্পর্শ অনুভব করল। মুখে সেই বিজয়ী হাসি বজায় রেখেই সে পেছন ফিরল। কিন্তু পেছনের মানুষটিকে দেখা মাত্রই আরিয়ানের কলিজা শুকিয়ে কাঠ! তৃণা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আরিয়ান এক মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারল না কী করবে,সে একটা শুকনো ঢোক গিলে টুল ছেড়ে তড়িৎ উঠে দাঁড়াল।
তৃণা দাঁতে দাঁত চেপে শুধু একটা শব্দই বলল,
“চলুন!”
আরিয়ান যাওয়ার আগে তৌহিদের দিকে তাকিয়ে সেই চিরচেনা বিটকেল হাসিটা দিয়ে বলল,
“যাই ব্রো! আর হ্যাঁ, দাওয়াতের কথা ভুলো না কিন্তু। সামনের বছর একদম টাইমমতো চলে এসো।”
তৃণা এবার আর কোনো সুযোগ দিল না। আরিয়ানের হাত ধরে প্রায় টেনেই কেবিন থেকে বের করে নিয়ে গেল। ওদিকে তৌহিদ পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে ভাবছে তবে কি সত্যি আরিয়ান আর তৃণার মাঝে এত গভীর রসায়ন তৈরি হয়ে গেছে?
করিডোরে আসতেই তৃণা আরিয়ানের হাত এক ঝটকায় ছেড়ে দিল। রাগে আঙুল উঁচিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“সমস্যা কী আপনার? কী সব আজেবাজে কথা বলছিলেন ভেতরে? ছেলেটা এমনিতেই হাসপাতালে পড়ে আছে, আর আপনি সেখানে গিয়ে মিথ্যে গল্পের নাটক করছেন?”
আরিয়ান এবার বেশ বিজ্ঞের মতো ভাব নিয়ে বলল,
“আরে বোঝো না কেন! এসব বলার মূল কারণ হলো যাতে তৌহিদ তোমাকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করে জীবনটা সুন্দর করে নেয়। বলো তো, আমার বুদ্ধিটা কি খুব খারাপ?”
তৃণা চরম বিরক্তি নিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে আরিয়ানকে পেছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করল। রাগত স্বরে বলল,
“যত্তসব আজাইরা বুদ্ধি! নিজের কোনো কাজ নেই তো, তাই মানুষের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে গেছেন।”
আরিয়ান দমার পাত্র নয়। সে দ্রুত পা চালিয়ে তৃণার পিছু পিছু যেতে যেতে আদুরে গলায় বলল,
“বউ, রাগ করো না। বাড়ি যাওয়ার পথে তোমাকে বড় দেখে একটা ডেইরি মিল্ক চকলেট কিনে দেব। সত্যি বলছি, একদম প্রমিজ!”
তৃণা কোমরে দুই হাত দিয়ে আরিয়ানের দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সে কোনো চিড়িয়াখানার অদ্ভুত প্রাণী দেখছে। সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি কি ছোট বাচ্চা? চকলেট দিয়ে ভোলাতে চাইছেন?”
আরিয়ান দাঁত বের করে হেসে জবাব দিল,
“আরে না, ছোট বাচ্চা হতে যাবে কেন? তুমি হলে আমার আদুরে পিচ্ছি বউ।”
তৃণা এবার কয়েক পা এগিয়ে এসে আরিয়ানের চোখের খুব কাছে নিজের চোখ রাখল। গভীর সংশয় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সত্যি করে বলুন তো, আপনার শরীর ঠিক আছে তো? আগের সেই গম্ভীর রাগি সাহেবের সাথে এখনকার আপনাকে আমি কোনোভাবেই মিলাতে পারছি না। আপনি কি সত্যিই সেই লোক?”
আরিয়ান এবার একটু নিচু হলো, তৃণার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“আগে ছিলাম রাগী আরিয়ান মির্জা, আর এখন আমি আমার এই শ্যামলিনীর পাগল স্বামী। সব মান-অভিমান ছেড়ে একবার বলো না, ভালোবাসি!”
তৃণা তড়িৎ আরিয়ানের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিল। গাল দুটো লাল করে বলল,
“ভালোবাসি না, একদম বাসি না!”
তৃণা গটগট করে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আরিয়ান সেখানে দাঁড়িয়ে তৃণার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে গুনগুন করে গেয়ে উঠল,
“দূরের আকাশ নীল থেকে লাল
গল্পটা পুরনো…
ডুবে ডুবে ভালোবাসি
তুমি না বাসলেও আমি বাসি।”
হাসপাতালের করিডোরে আরিয়ানের দরাজ গলার এই গান শুনে তৃণা হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। সে ধীর পায়ে পেছন ফিরল। আরিয়ান ভেবেছিল তৃণা হয়তো আবার বকা দেবে, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে তৃণার ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি ফুটে উঠল।
তৃণার সেই হাসি দেখে আরিয়ান নিজের বুকের বাম পাশে হাত চেপে ধরল। চোখ বড় বড় করে বলল,
“হায় আল্লাহ! এ তো পুরো কলিজাটাই নিয়ে নিল। দিলো তো, একদম পাগল করে দিলো!”
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২