খাঁচায়বন্দীফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৪৩
তুমুলের বিষয়ে ওয়াহাব চৌধুরী অবগত নয়। তাই ওর ঘোরাফেরায় তার কেমন কিছু না লাগলেও হাসান চৌধুরী, আঞ্জুমান, সায়রার কাছে বড় বিরক্ত আর চিন্তার বিষয় বলে মনে হচ্ছে। সায়রা তো ভেবে পাচ্ছে না, এই ছেলে নদীর বিয়ে হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনো কেন কিছু বলছে না। এ আবার মনে মনে বড়সড়ো কোন ছক কষে বসে নেই তো? একে আগে বিদায় করতে হবে।
সায়রা সাইফ এর কাছে গেল এই কথাটা বলতে ।
সাইফ তখন অদিতি, দীঘি আর ফুলমালার ছবি তুলে দিতে ব্যস্ত। সায়রা সাইফ এর হাত ধরে টেনে দূরে সরিয়ে নিয়ে এলো। সাইফ কিছুটা অবাক হয়ে বলল
“কি হয়েছে ছোট মা? এভাবে টানাটানি করছো কেন? কোন সমস্যা?”
সায়রা বিরক্তি নিয়ে বলল
“এই তোরা কি চোখে দেখতে পাস না? ওই ছেলেটা সেই সকাল থেকে এসে ঘুরঘুর করছে, কিছু বলছিস না কেন ওকে? পরে বড়সড় কোন গন্ডগোল হয়ে গেলে তখন কি হবে বলতো”
সাইফ বুঝল আসলে এখন বিষয়টা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তুমুলের এখন যাওয়া উচিত। আর সকলকে দেখানোর জন্য হলেও তার শাসন করা উচিত। সাইফ বেশ একটা রাগী ভাব নিয়ে কাকি কে বলল
“চলো তো আমার সাথে।”
সায়রা কে সাথে নিয়ে তুমুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। প্রথমে তুমুলকে চোখ মারলো। তারপর বলতে শুরু করলো
“তোমার সমস্যাটা কি বলোতো। কেন এসেছো আমার বোনের বিয়েতে বাগড়া দিতে? এক্ষুনি বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও বলছি। নইলে খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম।”
তুমুল বুঝলো সায়রা কে বোঝাতে সাইফ নাটক করছে। সে মাথা নিচু করে বলল
“ যাচ্ছি ভাইজান আর আসবো না। ভুল হয়ে গেছে ক্ষমা করে দিন”
“হ্যাঁ এখন কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ চলে যাও আর রাতে এসো”
সায়রা বড় বড় চোখ করে সাইফের দিকে তাকালো
“রাতে আসবে মানে?”
“ইয়ে ইয়ে মানে হ্যাঁ তাইতো। রাতে কেন আসবে? এই রাতে কেন আসবে? রাতে এসো না যাও, কাল সকালে এসো”
সায়রা ফের বলল
“মানে ও সকালে কেন আসবে?”
সাইফ তুমুলকে ঠেলে বার করে দিলো
“যাও তো যাও। যতসব পাগল ছাগল কোত্থেকে চলে আসে। কাকিয়া মা তুমি চলো। চলো মা।”
সায়রা বলল
“কি করছিস, কি বলছিস আমি কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না।”
“অতো বুঝতে হবে না চলো”
সায়রা কে দেখে সাইফ গেল ওর দাদাভাইয়ের ঘরে। সবটা বলতে হবে তাকে। তুযা মাত্র গোসল করে নতুন পাঞ্জাবি পরে আয়নার সামনে রেডি হচ্ছিলো। সাইফ রুমের সামনে থেকে বলল
“আসবো দাদাভাই?”
তুযা গলা উচিয়ে বলে
“এ বালের ফর্মালিটি আমার সামনে দেখাবি না তো। আমি কি ঘরে নেংটা হয়ে থাকি? যে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে”
সাইফ মিটিমিটি হেসে রুমের মধ্যে ঢুকলো। তুযা বলল
“কি বলবি বল। ওদিকের কোন খবর আছে? আর তুমুল কোথায়? ওকে খাইয়ে পাঠিয়েছিস?”
সাইফ বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল
“ আপাতত ছোট কাকির ধাওয়া খেয়েছে। আরেকটু হলে বাড়ির সকলের ধাওয়া খেত। তাই আগেভাগে তাড়িয়ে দিয়েছি”
তুযা কিছু বলবে এমন সময় দরজায় কেউ টোকা দিল। তুযা বিরক্তি নিয়ে বলল
“দরজা খোলা দেখেও বালগুলো টোকাটুকি করে কেন? এদের সমস্যা কি? এ কে তুই ভিতরে আয়”
রিশা ভেতরে ঢুকতেই সাইফ এক চিৎকার দিয়ে খাট থেকে উঠে বসলো। তুযা পিছন দিকে ঘুরে চুল আঁচড়াচ্ছিল বিদায় দেখে নি। সাইফের চিৎকার শুনে পিছনে ঘুরে সে নিজেও চিৎকার করে উঠলো।
কালো কাতান শাড়ি পড়ে চুল খুলে চোখে মোটা করে কাজল পরে আর বেগুনি লিপস্টিক পরে দাঁড়িয়ে আছে রিশা৷ সাইফ নিজের বুকে থুথু নিয়ে বিছানার ওইপাশে চলে গেল। তুযা মাথায় হাত দিয়ে বলল
“লাংচুন্নি কামডা করছে কি? ওই শালি। দিনে দুপুরে ডর দেহাইয়া মারবি?”
রিশার হেসে কিছু বলতে নিবে তার আগেই সাইফ বলে উঠলো
“আরে হাসিস না। দাদাভাই ওরে হাসতে মানা করো। আরো ভয়ংকর লাগে হাসলে”
রিশা প্রথমে ভাবলো ওরা শয়তানি করছে। আরো খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তুযা ফুলদানি টা নিয়ে এগিয়ে গেল ওর মাথায় মারার জন্য
“শালীর ঘরের শালী আইজ তোরে খাইছি, আমারে ভূত সাইজা ডর দেখানো? আজ তোর জন্মের শিক্ষা দিমু”
রিশা তুযার হাত থেকে বাঁচতে দিলো এক দৌড়। কিন্তু শাড়ি পরে কি আর সিড়ি দৌড়ানো যায়? শাড়িতে পারা লেগে উল্টে পড়লো সিরি তে। তুযা ওকে পড়তে দেখেই ফিরে গেলো। সাইফ ও চলে গেলো ওখান থেকে। নয়তো ওর পড়ার দায় নিতে হবে।
রিশা কে উল্টে পড়তে দেখে সকলে জড়ো হলো সেখানে। ভালো রকম ব্যাথা পেয়েছে। সবাই ওর এমন অদ্ভুত সাজ দেখে অবাক হলো। দীঘি আর ফুলমালা হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। সাইফ হেসে তুযা কে বলল
“এই মেয়ে কি পাগল নাকি?”
তুযা কুটিল হাসলো।
“মেয়ে ঠিকই আছে।”
চোখ ইশারা করে দেখালো দীঘি কে
“এই কাজ আমার জাওড়া বইন ছাড়া কারোর না”
—
সারাদিনের অনুষ্ঠান শেষ করে অদিতি বড্ড ক্লান্ত। জামাকাপড় পাল্টে ফ্রেশ হয়ে নিলো। ঘাড়ের ব্যাথাটা টনটন করছে। খাটে বসে খাটের স্ট্যান্ডে হেলান দিয়ে চোখ বুজলো। সাইফের আসার খবর নেই। রাত ১২ টার কাটা পেরিয়ে একটায় ছুতে চলল। বসে থাকতে থাকতে ঘুমের ভর করল অদিতির দুই চোখে। ওভাবে ঘুমিয়ে পড়ল। সাইফ ঘরে আসলো রাত তিনটায়। রুমে ঢুকে দেখল তার প্রিয় স্ত্রীর মুখশ্রী। কি সুন্দর খাটের স্টয়ান্ডে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে। এই মেয়েটা ঘুমালেও কত সুন্দর লাগে। সাইফ এগিয়ে যায়, অদিতির পাশে বসে। চোখে মুখে উড়ে আসা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে ঘুমন্ত স্ত্রীর কপালে চুমু খেলো।
কপালে শীতল স্পর্শ পেতে অদিতি একটু একটু করে চোখ খুলল। চোখ খুলে দেখলো সাইফ হাস্যজ্জল মুখে তার সামনে বসে। কিন্তু অদিতির মুখে হাসি নেই। ভীষণ মলিন লাগছে মুখটা। চোখে মুখে অসম্ভব ক্লান্তি। সাইফ হাত বুলিয়ে দিল অদিতির গালে।
“কি হয়েছে আমার বাচ্চা বিড়ালটার? এত ক্লান্ত লাগছে কেন তোমাকে? সারাদিন কত ছোটাছুটি করো বলো”
সাইফ একটা বালিশ ঠিক করে দিয়ে অদিতিকে বালিশে মাথা দিয়ে শোয়ালো। অদিতি চোখ বন্ধ করেই বলল
“ঘাড়ে খুব যন্ত্রণা করছে। ভীষণ ব্যথা করছে। মাথাটা ধরে আছে বড্ড। একদম ভালো লাগছে না আমার। আপনি একটু আমার পাশে শুবেন? আপনাকে জড়িয়ে ধরে একটু ঘুমাবো”
সাইফ অদিতির পাশে শুয়ে পড়লো। অদিতি আলতো করে মাথা রাখলো সাইফের বুকে। সাইফ অদিতির ঘাড় মাসাজ করে দিচ্ছে। অদিতি পরম আবেশে চোখ বুজে নিলো। চোখ বন্ধ রেখেই বলল
“ কাল আপুর বিয়ে, আপনারা ভেবেছেন কিছু? কি করছেন বুঝতে পারছি না কিন্তু। ভীষণ টেনশন হচ্ছে আমার”
“তুমি একদম টেনশন করো না। সব ভাবা আছে। তুমি ঘুমাও তো”
সকাল হতেই বাড়িতে ধুম পড়ে যায় বিয়ের। চারিদিকে আত্মীয় স্বজন, লোকজন, বাবুর্চিদের রান্না বান্না সব মিলিয়ে বিশাল পরিবেশ। সকলে ভীষণ ব্যস্ত। এদিক-ওদিক চলছে সব ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা দেখার জন্য। নদী গুটি শুটি মেরে বসে আছে ঘরের এক কোণে। এখনো সে জানেনা কি হতে চলেছে তার সাথে। কেবল সাইফ আর তুযার কথার ভরসার সে এত নিশ্চিত আছে।
আঞ্জুমান আর অদিতি আসে রুমে দই আর চিড়ে নিয়ে। নদীকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে আঞ্জুমান বলে,
“কিরে মুখ ভার করে বসে আছিস কেন? একটু পর তোর বিয়ে। শোন বিয়ে হওয়া পর্যন্ত কিছু খেতে পারবি না, এখন এটা খেয়ে নে মা। তারপর পার্লারের লোকজন আসবে সাজাতে”
আঞ্জুমান অদিতির হাতে দই চিড়ের বাটি টা দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। অদিতিকে বলে গেলো খাইয়ে দিতে নদীকে।
বেলা দশটা বাজে পার্লারের লোক এলো। নদীকে তারা রুমের মধ্যে সাজাচ্ছে। তুযা আর সাইফ কোথাও একটা গেছে। অদিতি রুমের মধ্যে পায়চারি করছে। কি হবে ভেবে পাচ্ছে না । একটু পরে বরযাত্রীরা সব চলে আসবে। কিন্তু তুযা আর সাইফ এখনো নিরুদ্দেগ। ফুলমালা সেজেগুজে ফুলটুসি টি হয়ে ঘুরছে। কিন্তু তার নাগরকে খুঁজে পাচ্ছে না দেখানোর জন্য। মুখ ভার করে গেল দীঘির কাছে। দীঘি এখন উল্টে ঘুমাচ্ছে। বেলা বাজে দশটা এখনো ওঠার নাম নেই। ফুলমালা গিয়ে টেনে তুললো দীঘিকে। দীঘি উঠে আরমোরা ভেঙ্গে উঠে বলল
“আরে বাহ তোকে তো খুব সুন্দর লাগছে। বেশ সুন্দর করে সেজেছিস তো”
ফুলমালা লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল
“যানো আপা কাল কি হইছে?”
দীঘিস স্মিত হেসে বলল
“আচ্ছা বল শুনি কি হয়েছে”
“ওই খচ্চর ব্যাটারে চা বানায় দেওন এর জন্যে, তুযা ভাই আমার সাথে সেই রহমের রাগ। এর মনে হয় হিংসা হইতাছিল। তাই না আপা?”
দিঘী ভ্রু গুটিয়ে কিছু ভাবল তারপর বলল
“হতেই পারে। আচ্ছা তারমানে দাদাভাইও তোকে পছন্দ করে? বাহ। তাহলে আপুর পরে কিন্তু তোদের পালা”
ফুল মালা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সত্যিই তাঁর পছন্দের মানুষের সাথে তার বিয়ে হবে? এই ঘরের বউ হবে সে? ভাবতেই কেমন খুশিতে মনটা ভরে যাচ্ছে। দীঘি উঠে গেলো ফ্রেশ হতে।
বর যাত্রীদের জন্য সকল কিছু রেডি করা হয়ে গেছে। এই এলো বলে। নদীকে রেডি করিয়ে বসিয়ে রেখেছে। সাইফ আর তুযা বাড়িতে ফিরলো। দুই ভাই এক রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে। সাইফ দুটো লাল রঙের জারবেরা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। অদিতি আয়নার সামনে মুখ ভার করে বসে আছে। সাইফ গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরতেই অদিতি পিছনে ফিরল।
অদিতি কিছু বলার আগে সাইফ ফুল দুটো অদিতির সামনে ধরলো। অদিতি অল্প একটু হাসলো। ফুলগুলো হাতে নিয়ে বলল
“সব কিছু ঠিক আছে তো?”
সাইফ অদিতিকে আয়নার দিকে ঘুরিয়ে দিল “তোমাকে বলেছি না অতো কিছু ভাবতে হবে না। এখন ফুল দুটো চুলে লাগাও দেখি কেমন লাগে আমার মিষ্টি বিড়াল বাচ্চাকে।”
সাইফ নিজ হাতে অদিতির খোঁপায় জারবেরা দুটো গেথে দিলো। তারপর অদিতিকে আয়নার দিকে দেখিয়ে বলল
“দেখোতো আমার বউকে কেমন লাগছে?”
অদিতি লাজুক হেসে বলল
“আপনার বউয়ের কথা আপনিই বলুন। আমি জানিনা কেমন লাগছে। সরুন কাজ আছে আমার”
“হ্যাঁ আমি এলেই তোমার কাজ এসে যায়। কোথাও যাবে না। তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। এখন আমি মন ভরে একটু প্রেম করবো। তারপর বাইরে গেলে যাবে।”
“কি আশ্চর্য! বাড়ি ভর্তি মানুষজন”
“তো কি হয়েছে? মানুষ জনের জন্য কি প্রেম করা বাদ দিয়ে বসে থাকবো? আশ্চর্য”
নিচতলা থেকে কারো চেঁচামেচির গুঞ্জন ভেসে আসে। দীঘি এসে সাইফ কে ডাকলো
“ভাইয়া নিচে আইসো তো। বড় আব্বু ডাকছে”
সাইফ বিরক্তি নিয়ে নিচে গেল ওয়াহাব চৌধুরী হাবিব চৌধুরী এবং হাসান চৌধুরীর মুখ গোমরা করে বসে আছে। তুযা কে যাচ্ছে না। ওয়াহাব চৌধুরি সাইফ কে বলল
“বেলা ৪:০০ টা বেজে গেলো। এখনো বরযাত্রীদের কেউ এসে পৌঁছালো না। তুমি একটু খোঁজ নাও তো। ওদের তো বেলা একটায় চলে আসার। এতটা তো দেরি করার কথা না”
চলবে?
[আগের পর্বে ১.৭k হয় নি এখনো 🙂]
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৪