প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৪||
ফারজানারহমানসেতু
রোজা পিকনিক থেকে আসার পর থেকে তূর্জানের সাথে কথা বলছে না। এমনকি কাল সন্ধ্যার পর থেকে তূর্জানের সাথে কথাই বলেনি। তূর্জান যা বলেছে, শুধু হ্যাঁ হু করেছে। তূর্জান ভেবে পায় না এইটুকু মেয়ের এত রাগ, অভিমান আসে কোথা থেকে। তূর্জানের মতে, সে রোজাকে বকেনি, রাগ ও করেনি। বরং আসার আগে ঘুরতে নিয়ে যেতে চাইছিল তাও যায়নি।এসেই তার পাশ ঘেষছে না।দূরে দূরে থাকছে। এমন না যে, রোজা সবসময় তূর্জানের পাশে থাকে, তবে আজ যেমন দূরে রয়েছে তাও তো থাকে না। তূর্জান ফ্লাইটের সকল কাগজপত্র সেরে মাত্র বাড়িতে ফিরছে। কাল তার ফ্লাইট। হয়তো সে কয়েক বছর এই বাড়িতে পা মারাবে না। ভাবনার মাঝেই তূর্জান বাড়িতে প্রবেশ করল।
তাজারুল নেওয়াজ আর মোস্তফা নেওয়াজ
ব্যাবসার গল্পে মেতেছে।
বাড়ির ছোটরা, রাফেজ আর মিরান ড্রয়িং রুমে বসে গল্প মেতেছে।গৃহিনীরা সন্ধ্যায় নাস্তা বানানোর কাজে ব্যাস্ত। তূর্জানকে আসতে দেখে রোজা কিছুর বাহানা দিয়ে দৌতালায় চলে গেল তুবাকে নিয়ে। তূর্জানকে দেখে মোস্তফা নেওয়াজ বললেন,
“ কতদূর তোমার কাজ? “
“ এই তো কাকামনি শেষ করে এলাম। কাল ফ্লাইট। “
“ হুমম ভালো! “
তাজারুল নেওয়াজ বললেন, “ তুমি কি এখনো আমার উপর রেগে? “
“ তোমার উপর রাগবো কেন? “
“ আমি তোমার ভালোর জন্যই করেছি সব, একদিন ঠিক বুঝতে পারবে। “
একটু থেমে সিড়ির দিকে রোজা আর তুবার দিকে তাকিয়ে বলল, “ তুমি ওকে বিদেশ যাওয়ার কথা না বললেও পারতে। মেয়েটা এমনিতেই অসুস্থ, তার উপর এতদিন পর ওর কান্ডিশন একটু ভালো বলেছে ডাক্তার, তারমধ্যেই আবার হাসিখুশি ছেড়ে গোমরা মুখে বেড়াচ্ছে সারাদিন। তুমি যাওয়ার পর ঠিকই একাই বুঝতে পারতো। “
“ আমি বলে যাচ্ছি তাই ও অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলছো, তাহলে আমি না বলে গেলে হঠাৎ শুনে কতটা অসুস্থ হতো তা ভেবে দেখেছো। “
তাজারুল নেওয়াজ সত্যিই এতদূর ভাবেনি। তিনি ভেবেছিলেন হয়তো রোজা তূর্জানকে না দেখতে দেখতে একাই ঠিক হয়ে যাবে। মোস্তফা নেওয়াজ ও বললেন,
“ ভাইজান আমার মনে হয় তূর্জান ঠিক বলছে। পরে শুনলেই আরো বেশি অসুস্থ হতো। রোজাকে তূর্জান এখন জানিয়ে গেলে ও ওত রিয়েক্ট করবে না। “
তূর্জান কথা বাড়ালো না।তানিয়া নেওয়াজ কে কফি দিতে বলে,ক্লান্ত শরীরে সিড়ি বেয়ে উঠতে লাগলো। বাড়ি ফিরে এসে থেকেই বাইরে সে। রেস্ট নেওয়ার ফুরসৎ পায়নি।
মহারানীর রাগ ভাঙানোর জন্য নিজের রুমে না গিয়ে রাহেলা নেওয়াজের রুমে গেল। তুবা আর রোজা কিছু নিয়ে কথা বলছে। তূর্জানকে দেখে তুবা চুপ করে গেলেও রোজা তূর্জানের দিকে পিঠ দিয়ে বসায় কথা বলেই যাচ্ছে।তূর্জান তুবাকে বলল,
“ আমার জন্য এককাপ কফি দিতে বলেছি আম্মুকে, বল খাব না এখন কফি।”
তুবা মাথা নাড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। রোজা মুখ অন্যদিকে দিয়ে বসে রয়েছে। যার অর্থ এখন তূর্জানকে তার রাগ ভাঙাতে হবে। তূর্জানও তাই করে। রোজার সামনে গিয়ে কোনো কথা ছাড়াই একটানে কোলে তুলে নিজের রুমে হাটা ধরল।
রোজা ছটফটিয়ে কোল থেকে নামতে চাইল। তবে নগন্য শক্তি দ্বারা তূর্জানের সাথে পারল না। না পেরে তূর্জানের বাহুতেই কামড়ে দিল। ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে নিল।রোজা বলল,
“ ছাড়ো আমায়! আমি তোমার কোলে উঠবো না। নামাও!”
তূর্জান বলল,
“ ফেলে দিব কিন্তু,সত্যি! সত্যিই!তারপর সারাদিন কোলেই থাকতে হবে। তখন তো বলবি কোলে নাও। কোলে নাও! একটুও নেব না কিন্তু তখন। “
“ তুমি তো চলেই যাচ্ছো, তাহলে আমার কোমড় ভাঙলেই আমাকে তুমি কো…
বাকি কথা শেষ করার আগেই তূর্জান হাত ঢিলা করল। রোজা ভয়ে গলা জড়িয়ে ধরল। বুঝতে পারল তূর্জান তাকে কথা বলতে নিষেধ করছে।
রোজা আর কোনো কথা বলছে না। কথা বলা ঠিকও না। তার কথা তূর্জান শুনতে চায়ছে না।
সে তো অসুস্থ তূর্জান জানে। এবং ডাক্তার বলেছে রোজা যার সাথে থাকতে পছন্দ করে তার সাথে থাকলেই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবে। তাও তূর্জান কেন তাকে ছেড়ে বিদেশ যাবে? তূর্জান রুমে এসে দরজা লক করে দিল। যেন তার অসভ্য ছোট বউ না যেতে পারে রুম থেকে। রোজাকে বেডে বসিয়ে ফ্রেশ হতে গেল।ফ্রেশ হতে গিয়ে একবারে শাওয়ার নিয়ে এসে রোজাকে বলল,
“ বেডে উঠে দাড়া। “
“ উঠবো না। দাড়াবোও না। “
রোজার হাতে জোর করে টাওয়াল ধরিয়ে দিয়ে নিজে বেডে বসল। ভেজা মাথা থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে কান, নাকের উপর দিয়ে নামছে। তূর্জান একপলক দেখে নিল রোজাকে এই মেয়ের জেদ অতিমাত্রা। তবে তূর্জানের এই মেয়ের রাগ, জেদ, অভিমান বড্ড ভালো লাগে।তাইতো সব অপছন্দের জিনিসও ইদানিং পছন্দের তালিক যুক্ত হচ্ছে। তূর্জান রোজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ আমার ঠান্ডা লাগলে কিন্তু তোর দোষ। দেখ ভিজে গেছি। “
রোজা তাকিয়ে দেখল সত্যিই তূর্জানের টিশার্ট ভিজে যাচ্ছে।কথা না বলে উঠে দাড়াল। মাথা মুছে দিতে লাগলো ছোট্ট দুহাতে।মাথা মুছে টাওয়াল নিজেই নিদিষ্ট স্থানে রেখে এসে বলল,
“ দরজা খুলে দাও, বাইরে যাবো। “
“ যদি না খুলি। “
“ আমি চিৎকার করবো। “
“ লোকে তো অন্য কিছু ভাববে। “
ছোটো মাথায় কিছু ঢুকল কি না কে জানে? রোজা চুপ করে দাড়ালো। তারপর আস্তে করে তূ্র্জানের সামনে দাড়িয়ে বলল,
“ ভাইয়া, তুমি সত্যিই চলে যাবে? “
তূর্জান চুপ করে রইলো। এই করুন শুরের কাছে সে নিশ্চল, নির্বিকার। তবে তাকে তো যেতেই হবে। তাই তূর্জান সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাওয়ার আগে রোজাকে বুঝিয়ে বলে রোজার পারমিশন নিয়ে তারপর যাবে। যদিও বিদেশে যাওয়ার সকল কাজ তার বাবা আগেই করেছিল। সে শুধু একসপ্তাহ আগে জেনেছে। তবে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও বাধ্য সন্তানরা নাকি বাবা মায়ের ইচ্ছার প্রাধান্য দেয়। তূর্জানের ক্ষেত্রেও তাই। সে কাউকেই কষ্ট দিতে পারবে না। তূর্জান আগে না মানলেও এখন মানে বাবা মা কোনো সন্তানের খারাপ চায়না। নয়তো সেদিন বাবা মায়ের জন্যই তো আজ এই দশ বছরের মেয়ে তার মস্তিস্ক সহ পুরো হৃদপিন্ডে অবস্থান করছে।
তূর্জান হেসে বলল, “ হুমম! কিন্তু মাত্র নয় বছরের জন্য। “
“ আমি কার সাথে থাকবো? “
“ বাড়িতে তো সবাই থাকবে। তাছাড়া আমি প্রতিদিন তোর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলব। “
“ বিদেশে গিয়ে ভুলে যাবে না আমায়? “
“ কেউ কি তার জীবন বাঁচাতে নিশ্বাস নিতে ভুলে যায়। যেইদিন শুনবি লোকে অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারছে, সেইদিন নাহয় এই প্রশ্ন করিস। “
রোজা চুপ থেকে বলল, “ তাহলে আমাকে একটা বেবি দিয়ে যাও। আমি তার সঙ্গে খেলবো। “
তূর্জান শুষ্ক গলায় বিষম খেল। এই মেয়ে কি শুরু করেছে। যদিও দোষটা রোজার নয়। বড়রা যখন কথা বলবে তাদের উচিত সাবধানে কথা বলা। তূর্জান প্রসঙ্গ পাল্টালো। এই বিষয়ে আর কথা বলতে চায় না। রোজা ছোট তাই তাকে বোঝালেও সে কিয়ৎক্ষনের জন্য বুঝবে।
“ ঘুরতে যাবি? “
“ এখন তো সন্ধ্যা। “
“ ঘুরতে গেলে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। “
ছোটরা ঘুরতেই বেশি ভালোবাসে। তাই ঘুরতে যাওয়ার কথা শুনে রোজাও অভিমান ভুলে গেল।
“ তুবাকে আর মিরান ভাইয়াকেও নিয়ে যাবো? “
“ হুম, যা। তাড়াতাড়ি করবি। “
রোজাকে আর পায় কে? সে দৌড়ে গিয়ে তুবার সঙ্গে রেডি হয়ে নিল। দুজনেই পিংক ফ্রক পরলো। মিরান তূর্জানের চেয়ে একবছরের ছোট। চারজনকে রেডি হয়ে সিড়ি বেয়ে নামতে দেখে তাজারুল নেওয়াজ বললেন,
“ কোথায় যাচ্ছো তোমরা? “
তূর্জান বলার আগেই তুবা আর রোজা বলল,
“ ভাইয়া আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছে।”
তাজারুল নেওয়াজ রোজার হাসিমুখ দেখে আর কিছু বলল না। তিনিও তো রোজার মধ্যে তার প্রাণপ্রিয় বন্ধুর অস্তিত্ব দেখতে পান। তানিয়া নেওয়াজ তাদেরকে যেতে নিষেধ করলেন। একে তো সন্ধ্যা তারপর কালকে তূর্জানের ফ্লাইট। তানিয়া নেওয়াজ কে থামিয়ে তাজারুল নেওয়াজ তূর্জানের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“বেশি রাত যেন না হয়। ছোটদের নিয়ে যাচ্ছো, দুইভাই দেখে রেখ। “
বলেই তিনি গাড়ির চাবি এনে এগিয়ে দিলেন। তূর্জান মায়ের কাছে বলে চলে গেল, অজানা গন্তব্যে ঘুরতে।তানিয়া নেওয়াজ ভেবে পায়না এই বাপ ছেলের ব্যাপার স্যাপার। তাদেরকে দেখলে মনে হয় তাদের মধ্যে কোনো মিল নেই। কথা বলে মেপে মেপে প্রয়োজনে। আবার দুজন দুজনকে ভীষণ ভালোবাসে।
“পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পর্ক বুঝি একেই বলে বাবা মায়ের সাথে ছেলে মেয়ের সম্পর্ক। যেই সম্পর্কে ভালোবাসা ভীষণ, কিন্তু বহিঃপ্রকাশ কম। “
★★
তূর্জানরা নদীর পার ঘেঁষে থাকা এক ছোট্ট রেস্টুরেন্টে এসেছে। এখানে রাতের অপরুপ সৌন্দর্য দেওয়ার জন্যই রেস্টুরেন্ট ভীষণ জনপ্রিয়। সবাই মিলে ঘুরে এখানে বসেছে ডিনার করার জন্য। ডিনার সেরে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরোনোর আগে তুবা ওয়াশরুমে যেতে চাইলে মিরান তাকে নিয়ে গেল।রোজা যেতে চাইল তূর্জান তাকে থামিয়ে দিল। মিরানকে বলল তুবাকে নিয়ে এসে গাড়িতে বসতে। তূর্জান রোজার হাত ধরে অন্যদিকে একটা চুড়ির দোকানে নিয়ে গেলো। পছন্দের দুইখাপ চুড়ি কিনে নিজ উদ্যোগে পড়িয়ে দিল রোজার হাতে। মেরুন রঙা চুড়ি যেন রোজার ফর্সা হাতে জলজল করছে।তুবার জন্যেও নিল দুইখাপ।টাকা মিটিয়ে দিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে পায়েল বের করে হাটুমুড়ে রোজার পায়ে পড়িয়ে দিল সযত্নে।বড় হওয়ায় দুইপ্যাচ দিতে হলো।
বলল,
“ আমি যতদিন না আসি ততদিন এই পায়েল দুইটা খুলবি না। আমি আসার পর পায়েল পাল্টে দিবো। “
রোজা বেশ খুশি হয়েছিল। কিন্তু আবার চলে যাওয়ার কথা শুনতেই চুপ হয়ে গেল। তূর্জান বলল,
“ তুই আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিবি না? “
রোজা কথা বলছে না দেখে তূর্জান বলল, “ বেশ আমি যাবো না। বাবাকে বলে ম্যানেজ করে নিব।”
“ বাবা তোমায় যেতে বলেছে? “
“ হুমম!”
“ তাহলে যাও। আমি বাবাকে কষ্ট দিতে পারবো না। “
তূর্জান রোজার মনের কথা বুঝতে চেয়ে বলল, “সত্যিই যাবো?”
“হুমম!”
“ তাহলে এবার একটু হাঁসতো। বলতেই দুজনে একসাথে হেসে উঠল।
ইনশাআল্লাহ চলবে….
আজকের পর্ব আমি ঘুমাইতে ঘুমাইতে লেখছি। আর রিচেক দেওয়া হয়নি। কেমন হয়েছে জানিনা। হয়তো তেমন ভালো হয়নি। তোমাদের একটা কথা বলি, পারলে তোমরা একটু এই গল্পের ফার্স্ট পার্টে রিয়েক্ট দিয়ে দিও।আর আবদ্ধ প্রণয় পেরিয়ে গল্পটা পড়ো।
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ২
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ৩
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা পর্ব ১
-
প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা গল্পের লিংক