প্রণয়ের_মায়াতৃষ্ণা ||৩||
ফারজানারহমানসেতু
তূর্জান সমুদ্রের পাড় দিয়ে হেটে এগোচ্ছে। আনমনা হাজারো জল্পনা কল্পনা মনে। এই তো কদিন আগেও অচেনা ছিল এই মেয়ে, হঠাৎ কিভাবে এত আপন হলো। তূর্জানের ছোট থেকেই চাঞ্চ্যলতা পছন্দ নয়। তবুও এই নারীর চঞ্চ্যলতা তাকে গ্ৰাস করেছে। একদম পুরোটা পূর্ণভাবে। তূর্জান আনমনেই হেসে উঠল। বলতে লাগলো,
“ খুব তো আমাকে এখন চাইছিস! তাহলে বড় হলে পুরো আমার হতে পারবি তো? নাকি পালানোর ধান্দা খুজবি?“
সামনে একটা হাওয়াই মিঠাইয়ের দোকান থেকে চারটা হাওয়াই মিঠাই নিয়ে নিল। মহারানীর ভীষণ পছন্দের তালিকায় এই মিঠাই। যা হাওয়া লাগলেই শেষ।তূর্জান সেগুলো নিয়ে হাটা ধরল সেই টং দোকানের দিকে। রোজা তূর্জানকে মিঠাই হাতে এগোতে দেখে এক ছুটে তূর্জানের সামনে এলো।পিছন থেকে তাজারুল নেওয়াজ সাবধানে দৌঁড়াতে বলল। তবে এই বিশ্বভ্রমন্ডানে কে শোনে কার কথা। তারপর যদি সামনে প্রিয় জিনিস রেখে আস্তে, সাবধানে চলতে বলা হয়।
রোজার পোশাকে বালুর স্তুপ জমেছে। জমারই কথা,তার মহারানী যে দুষ্টু তার পোশাক ভালো ভালো থাকলে যে সমুদ্রের বালুও কষ্ট পাবে। তূর্জান এগিয়ে আসতেই রোজা হাত পাতলো,
“ দাও, আমার টা!”
“ তোর জন্য তো আনিনি! ইশ! একদম ভুলে গেছি। “
“ তোমার হাতে চারটা। “
“ তো? একটা ভাবির, একটা তুবার আর দুটো আমার। “
“আমার জন্য সত্যিই আনোনি?”
“না, আনিনি। তুই মিঠাই খাস? আমি ভেবেছিলাম দাতে পোঁকা লাগার ভয়ে তুই মনে হয় মিঠাই খাস না। “
বলেই মিটিমিটি হাসল।তবে তা রোজার অগোচরে রয়ে গেল।রোজার ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে। তার পছন্দের জিনিস হাতে ধরে বলছে তার ভাগের টা নেই। এটা মানা যায় না! এটা ঘোর অন্যায়! রোজা মন খারাপ করে আবার ঘুরে সবার কাছে চলে যেতে নিলে তূর্জান হাত টেনে দাড় করালো। রোজা তাও অন্য দিকে মুখ করে দাড়িয়ে থাকলো। তার কারোর সাথে কথা নেই। বলবে না কোনো কথা। তূর্জান রোজার সামনে দাড়াতেই আবার অন্য দিকে ঘুরে তাকালো। তূর্জান যতবারই রোজার সামনে যাওয়ার চেষ্টা করে রোজা বারবার অন্য দিকে ঘুরে যায়। তূর্জান ব্যর্থ এই দশবছরের বাচ্চার রাগ ভাঙাতে। অবশেষে না পেরে কোলে তুলে নিল রোজাকে। রোজা গোমড়া মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে, কিছুতেই সে তাকাবেনা। তূর্জান রোজার মুখ নিজের দিকে করে বলল,
“ কথা বলবি না আমার সাথে? “
“ নাহ!”
“ সত্যিই? কথা বলবি না? “
“হুমম! আমি তোমার উপর রেগে আছি তাই কথা বলবো না। “
“ সত্যিই তো, কথা বলবি না? “
“নাহ! তোমার সাথে আর কথা বলবো না। তুমি পচা, আমার মিঠাই দেওনি!”
“ তাহলে কে আমার সাথে এতক্ষন কথা বলছে শুনি? “
বলেই তূর্জান হেসে ফেলল। হাসারই কথা, বলছে কথ বলবে না, আবার কথা বলেই যাচ্ছে! প্রতিটা কথার উত্তর দিচ্ছে। তূর্জান দুইটা মিঠাই প্রথমে দিয়ে বলল, তুবা আর রাফিয়াকে দিতে। রোজার চোখ ছোট করে তাকানো দেখে তূর্জান মিটিমিটি হেসে রোজার হাতে দুইটা মিঠাই ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“ এই দুইটা তোর। “
“ তুমি যে বললে আমার জন্য আনোনি? “
“ হুমম, তো! তোর জন্য আনিনি আমার বউয়ের জন্য এনেছি। “
রোজা কিছু বুঝল কি না তা বোঝা গেল নি। তবে মিঠাই পেয়ে রোজা বেশ খুশি! সে দুটো মিঠাই পেয়েছে। তূর্জানের কোলে থেকেই কপালে ঠোঁট ছুইয়ে বলল,
“ থ্যাংকস ভাইয়া!”
“ থ্যাংকস কেন? আর কতদিন ভাইয়া ডাকবি? “
“ পিছনে গ্ৰানি (দাদি)!”
হঠাৎ গ্ৰানি শুনেই তূর্জান পিছনে না ফিরেই রোজাকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। মনেমনে বলল, “ ওহ গ্ৰানি দাদা কি তোমায় শুধুমাত্র আমার চোখে রাখার জন্য রেখে গেছে। বিশ্বাস করো এই দুনিয়ায় আমি বাদে আরও অনেক সুন্দর জিনিস আছে। “
রোজা ছাড়া পেয়ে দৌড়ে চল গেছে তার গন্তব্যে। তূর্জান পিছনে ফিরে দেখল, না তার গ্ৰানি আছে, না রোজা। মানে এইটুকু বাচ্চাও তার দুর্বলতা বুঝে আঘাত হানছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মনেহয় তূর্জান নেওয়াজ। গ্ৰানিও সবসময় চোখে চোখে রাখে, আবার তার ছোট্ট বউও তাকে বোকা বানানো শিখে গেছে। কি কপাল!
★★
সন্ধ্যার দিকে রাফেজ, তুবা আর রাফিয়া সমুদ্রে স্পিডবোর্ডে সমুদ্রের জলরাশিতে ঘুরে মাত্র পাড়ে ফিরল। দারুন উচ্ছাস উপচে পড়ছে তাদের মুখ থেকে। তুবা দৌড়ে এলো নেওয়াজ পরিবারের বসা জায়গা, ওই ছোট্ট টং দোকানে। রাফেজ ও রাফিয়াকে হাত ধরে নিয়ে এলো। রাফিয়া আর তুবা আসতেই রোজা তাদের ভাগ বুঝিয়ে দিল।
নেওয়াজ পরিবার আজ আনন্দে আত্মহারা। তারা সবাই মিলে পিকনিক স্পটে এসে মাটিতে বিছানো ত্রিপলে বসে আছে।তাজারুল নেওয়াজ আর মোস্তফা নেওয়াজ দুই ভাই মিলে রান্না করছে।
দুই গৃহিনী তানিয়া নেওয়াজ আর রেহেনা নেওয়াজ মিলে রান্নার কাজে সাহায্য করছে। তূর্জান বাদে,রাহেলা নেওয়াজ আর ছোটরা সবাই মিলে গল্পের আসর জমিয়েছে। রাহেলা নেওয়াজ তার জীবনের গল্প বলছে আর তা শুনে সবাই অট্টহাসিতে মেতে যাচ্ছে।
তুবা আর রোজা যেহেতু ছোট তাই তারা খেলা নামক অন্যকাজে ব্যাস্ত।তুবা গল্পে গল্পে রোজাকে বলল,
“ জানিস আমরা তিনজন স্পিডবোর্ডে উঠেছিলাম? “
রোজার ভীষণ মন খারাপ হলো।একসাথে বেড়াতে এসে তারা ওকে রেখে কিভাবে এক ঘুরে আসতে পারে? “
“ আপুও উঠেছিল? “
তুবা উত্তর দিল, “ হুমম!”
প্রায় সন্ধ্যা রোজা তূর্জানকে খুজতে লাগল। তানিয়া নেওয়াজ রোজাকে ছুটতে নিষেধ করলেন। তবে রোজা তূর্জানের দেখা না পাওয়ার পর্যন্ত শান্ত হতে পারছে না। অনেক খুজে অবশেষে দেখা মিলল কাঙ্খিত মানুষের। রোজা দৌড়ে গিয়ে দাড়াল তূর্জানের সামনে। বলল,
“ আমি স্পিডবোর্ডে উঠব!”
তূর্জান ফোনে কথা বলছিলো, হঠাৎ রোজার কথা শুনে তাকালো। ফোনে কথা শেষ করে বলল,
“ তুই এখানে কেন? আর এই সন্ধ্যায় এভাবে ছুটছিস কেন? “
“ আমি সমুদ্রবিলাস করবো।”
“ একটু আগে করলি তো সমুদ্রবিলাস। “
“ওভাবে নয়!”
“ তাহলে কিভাবে? “
“ আপুদের মতো স্পিডবোর্ডে করে। “
তূর্জান জানে এই মেয়ে যখন যা মনে করে তাই করতে চায়। তূর্জান কথা পাল্টে বলল, “ চল, পিকনিক স্পটে, এভাবে এসেছিস আম্মু বা কেউ তোকে দেখেছে। সবাই চিন্তা করবে। “
“ কথা পাল্টাচ্ছো কেন?”
“ কালকে নিয়ে যাবো। “
“ কিন্তু আমরা তো কালকে ফিরে যাবো? “
“ যাওয়ার আগেই নিয়ে যাবো। “
“ প্রমিস করো। “
তূর্জান বেশ বিপাকে পড়েছে। এই মেয়ে কথায় কথায় প্রমিস প্রমিস করে। তূর্জান রোজাকে একটানে কোলে তুলে হাটা ধরল। রোজা তূর্জানকে খোচাতে লাগল, অবশেষে হার মেনে বলল,
“ প্রমিস করবো, তার পরিবর্তে আমাকে কি দিবি?”
“ তুমি তো পচা মানুষ, আমি একটা জিনিস চাইলেই তুমি আরেকটা চাও। “
“ আমি শোধবোধ পছন্দ করি। তুই না দিলে আমি ও প্রমিস করবো না। “
“ আচ্ছা দিবো। এবার বলো আমাকে কালকে ঘরতে নিয়ে যাবা? “
“ হুম! নিয়ে যাব। এবার তুই প্রমিস কর, আমাকে না দেখলে তুই ভুলে যাবি না। “
“ তুমি কথায় কথায় এটা বলো কেন? আমি তোমাকে ভুলবো কেন? “
“ আমি বিদেশ যাবো, মাত্র নয় বছরের জন্য, পড়াশোনা শেষ করে আবার ফিরে আসব। তুই কথা দে ততদিন আমায় মনে রাখবি। “
“ ভাইয়া তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাবা? “
“ উহু, তোকে ছেড়ে যাবো না। আমি তো তোর মাঝেই থাকবো। “
ইনশাআল্লাহ চলবে….
📌ভাইয়া, আপুরা কেমন হয়েছে জানিনা। আমার হেডেকের সমস্যা আছে। অল্পতেই মাথা ব্যাথা শুরু হয়।পরীক্ষা দেওয়ার কারণে আমার প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করছিল। আর পরীক্ষা দিয়ে এসে হঠাৎ একটু সমস্যা হওয়ায় দেরি হয়ে গেল। সরি আমি, তোমাদের এতক্ষন অপেক্ষা করানোর জন্য। মনে হয় আজকের পর্ব তোমাদের ওতটা ভালো লাগবে না।কালকের পর্ব বড় করে দিব ইনশাআল্লাহ।
Share On:
TAGS: প্রণয়ের মায়াতৃষ্ণা, ফারজানা রহমান সেতু
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE