Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল পর্ব)


ডিজায়ার_আনলিশড (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল পর্ব)

✍️ সাবিলা সাবি

তানভিয়ান স্পেশাল পর্ব💐✨
.
.
.

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১২টা ছুঁইছুঁই। ক্যালেন্ডারের পাতায় সবেমাত্র পা রেখেছে ১৪ই ফেব্রুয়ারি—আজ ভালোবাসা দিবস। পাহাড়ের সেই বিভীষিকাময় রাত আর দীর্ঘ সফরের ধকল তান্বীর শরীরে বিষের মতো জেঁকে বসেছে। সকালে ফেরার পর থেকে সে বিছানা ছেড়ে এক কদমও নড়তে পারেনি। জাভিয়ানই তাকে বাচ্চার মতো কোলে করে বাথরুমে নিয়ে গেছে, আবার নিজ হাতে বিছানায় খাবার খাইয়ে দিয়েছে। তান্বীর পুরো শরীর ব্যথায় নীল হয়ে আছে, নড়ার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট তার নেই।

নিস্তব্ধ কক্ষে হঠাৎ জাভিয়ানের ভারী পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। সে তান্বীর শিয়রে এসে দাঁড়াল। পরনে তার সিল্কের নেভি ব্লু শার্ট আর তার ওপরে মেরুন রঙের ব্লেজার। হাতে দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি আর সাথে সাদ ডায়মন্ডের ব্রেসলেটটা, ঘাড়ের মধ্যে এখনও তান্বী লেখা ট্যাটুটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

জাভিয়ান নিচু গলায় বলল, “জিন্নীয়া, ওঠো। চলো একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”

তান্বী আধবোজা চোখে আতঙ্কিত হয়ে তাকাল। সে চাদরটা গায়ের ওপর আরও টেনে নিয়ে করুণ স্বরে বলল, “প্লিজ জাভিয়ান, আমার শরীরের প্রতিটি হাড় ভাঙা মনে হচ্ছে। আমি নড়তেও পারছি না। আজ থাক না!”

জাভিয়ান এক চিলতে হাসল, যে হাসিতে কিছুটা রহস্য লুকিয়ে আছে।সে নিচু হয়ে তান্বীর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, “আজ বিশেষ দিন জিন্নীয়া। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”

‘সারপ্রাইজ’ শব্দটা শুনতেই তান্বীর রক্ত হিম হয়ে গেল। জাভিয়ানের সারপ্রাইজ মানেই তো ভয়ংকর কিছু!একবার সাবমেরিন তো আরেকবার পাহাড়ে ঝুলন্ত হ্যামক। সে পাগলের মতো মাথা নাড়তে শুরু করল, “না না না! আপনার সারপ্রাইজ মানেই ভয়াবহ কিছু। আমি যাব না জাভিয়ান, খোদার দোহাই লাগে আমাকে আর কোনো চমক দেবেন না। আমি এই বিছানায় মরতে রাজি, তাও আপনার সারপ্রাইজ দেখতে যাব না!”

জাভিয়ান কোনো কথা কানে তুলল না। সে এক ঝটকায় তান্বীর গায়ের চাদরটা সরিয়ে দিয়ে তাকে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। তান্বী যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলেও জাভিয়ানের বাহুডোর লোহার মতো শক্ত হয়ে রইল। সে তান্বীকে কোলে করেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল পার্কিং জোনের দিকে। গাড়ির দরজাটা খুলে তাকে পরম মমতায় ড্রাইভিং সিটের পাশের সামনের সিটে বসিয়ে দিল। এরপর নিজের শরীর থেকে দামী ব্লেজারটি খুলে তান্বীর গায়ে জড়িয়ে দিল যাতে ওর ঠান্ডা না লাগে।

গাড়ি যখন চলতে শুরু করল, তান্বী ভয়ে চোখ বন্ধ করে শুধু প্রার্থনাই করছিল। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়ি থামতেই জাভিয়ান বলল, “চোখ খোলো জিন্নীয়া।”

তান্বী চোখ মেলতেই একেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার চোখের সামনে যা দৃশ্যমান হলো তা কোনো আতঙ্কের নয়, বরং এক স্বর্গীয় সুন্দরের বহিঃপ্রকাশ। রাস্তার ঠিক মাঝখানে বিশাল এক লরি দাঁড়িয়ে আছে, যার ওপর কয়েক হাজার টকটকে লাল গোলাপের এক দানবীয় তোড়া যা দেখে মনে হচ্ছে আস্ত এক বাগান তুলে আনা হয়েছে। এর পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা রঙের এক স্পোর্টস কার, যার ভেতর থেকে লাল গোলাপের পাপড়ি উপচে পড়ে রাস্তায় এক রক্তিম গালিচা তৈরি করেছে। সেখানে পাপড়ি দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা— “I LOVE YOU”

সবকিছু ছাপিয়ে তান্বীর নজর কাড়ল তাদের জিপের পেছনের অংশটি।জাভিয়ান ডিকির লকটা খুলতেই আকাশ রাঙিয়ে বেরিয়ে এল বিশাল এক গুচ্ছ লাল হৃদপিণ্ড আকৃতির বেলুন। সেগুলো সুতোর টানে গাড়ির ঠিক ওপরেই স্থির হয়ে এক অপার্থিব লাল মেঘের মতো দুলতে লাগল। বাতাসে গোলাপের তীব্র সুবাস আর মাথার ওপরে দোদুল্যমান ওই লাল হৃদপিণ্ডগুলোর নিচে এক জাদুকরী স্তব্ধতা নেমে এল।

তান্বী উত্তর দিতে ভুলে গেল। সে আজীবন সিনেমাতে এমন দৃশ্য দেখেছে, যদিও সিনেমাতেও কখনো এমন অকল্পনীয় আয়োজন দেখায়নি যেমনটা জাভিয়ান বাস্তবে করেছে। সে বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাংলাদেশের এক মধ্যবিত্ত ঘরে বেড়ে ওঠা সাধারণ এক মেয়ের জীবনে কি সত্যি এত কিছু প্রাপ্য ছিল?

হঠাৎ করেই জাভিয়ান তান্বীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে তার পকেট থেকে একটি মখমলের ছোট বাক্স বের করল। ঢাকনা খুলতেই ধবধবে সাদা হিরের একটি আংটি চাঁদের আলোয় ঝিলিক দিয়ে উঠল। জাভিয়ান অত্যন্ত গম্ভীর কিন্তু রুদ্ধকণ্ঠে বলতে শুরু করল “জিন্নীয়া, আমি তোমাকে কোনো সস্তা প্রেমিকের মতো রূপকথার গল্প শোনাব না। আমি শুধু জানতে চাইতুমি কি সারাজীবন এই কঠিন মানুষটার ছায়া হয়ে থাকবে? বৃদ্ধ বয়সে আমি যখন হসপিটালের বেডে নিথর হয়ে পড়ে থাকব তখনও কি তুমি আমার হাতটা এভাবে ধরে রাখবে? শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত কি তুমি আমার পাশে থাকবে?”

তান্বীর চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। সে আবেগে জাভিয়ানকে জড়িয়ে ধরার জন্য এক পা এগোতে চাইল, কিন্তু শরীরের তীব্র ব্যথায় সে কুঁকড়ে গেল, এক কদমও নড়ার শক্তি পেল না। জাভিয়ান তা বুঝতে পেরে মৃদু হাসল এবং তান্বীর কাঁপা কাঁপা হাতটি ধরে অনামিকায় সেই হিরের আংটিটি পরিয়ে দিল। এরপর সে নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে তান্বীকে পরম আবেশে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। তান্বী জাভিয়ানের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।

জাভিয়ান ওর কপালে একটি দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল, “কাঁদলে আজকের ডিনারটা মাটি হয়ে যাবে। চলো,রাতটা এখনো বাকি।”

জাভিয়ান আবারও তাকে কোলে তুলে নিয়ে একটু দূরে সাজানো একটি বিশেষ জোনে নিয়ে গেল। সেখানে মায়াবী হলুদ আলোর লাইটিং আর লাল গোলাপের পাপড়ি দিয়ে পুরো জায়গাটা সাজানো। এক কোণে নিওন সাইনে জ্বলজ্বল করছে— “HAPPY VALENTINE’S DAY, JINNIYA”।

আরেক পাশে একটি কাঁচের টেবিল, তার ওপর সুগন্ধি ক্যান্ডেল জ্বলছে। দুটি রাজকীয় চেয়ার আর টেবিলভর্তি তান্বীর প্রিয় সব খাবার। রাতের নিস্তব্ধতায় এই মায়াবী আলো আর ফুলের সুবাসে মনে হচ্ছে যেন কোনো স্বপ্নপুরী।

জাভিয়ান তান্বীকে খুব সাবধানে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজে তার উল্টো দিকে বসল। সে তান্বীর চোখের জল মুছে দিয়ে গ্লাসে রেড ওয়াইন ঢালতে ঢালতে বলল, “আজকের এই দিনটাও শুধু তোমার আর আমার।”

কিন্তু তান্বী যখন টেবিলের ওপর রাখা খাবারের দিকে তাকাল, ওর চোখজোড়া বিস্ময়ে কপালে উঠল।সাধারণ কোনো ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে মানুষ যা আশা করে পাস্তা, পিৎজা বা স্টেক—এখানে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং পুরো টেবিলজুড়ে সাজানো রয়েছে মেক্সিকোর সবচেয়ে দামী এবং পুষ্টিকর সব খাবার। জাভিয়ান নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে। সে চায় না তান্বী দুর্বল হয়ে পড়ুক, কারণ রাতে তার আবার ‘জিন্নীয়া’কে প্রয়োজন।

টেবিলে সাজানো রয়েছে কাঁচা বাদাম, অ্যাভোকাডো, সামুদ্রিক ঝিনুক (Oysters), গ্রিলড স্যালমন মাছ এবং প্রচুর পরিমাণে লাল মাংস। পাশে রাখা আছে এক গ্লাস ঘন ডার্ক চকলেট শেক, যাতে মেশানো হয়েছে বিশেষ কিছু ভেষজ নির্যাস।

তান্বী অবাক হয়ে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “জাভিয়ান, এতো সব কী? আমরা কি ডিনারে কোনো জিম ডায়েট করছি?”

জাভিয়ান অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে নিজের প্লেটটা সরিয়ে রেখে একদৃষ্টিতে তান্বীর দিকে তাকাল। ওর চোখে সেই পরিচিত শিকারী চাউনি, কিন্তু তাতে আজ এক অদ্ভুত বন্যতা মিশে আছে। সে গম্ভীর গলায় বলল “কাল রাতে পাহাড়ের সেই ঝড়ে তোমার এনার্জি একদম শেষ হয়ে গেছে জিন্নীয়া। খাবার সবটুকু শেষ করো। আমি চাই না কালকের মতো আজ রাতেও তুমি মাঝপথে দুর্বল হয়ে পড়ো। তোমার শরীরের প্রতিটি কোষে শক্তি চাই, কারণ আজ রাতের ঝড় কালকের চেয়েও ভয়াবহ হবে।”

তান্বী জাভিয়ানের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় মাথা নিচু করে ফেলল। জাভিয়ানের প্রতিটি কথায় রয়েছে অমোঘ হুকুম। তান্বী এক চামচ স্যুপ মুখে নিতেই জাভিয়ান তার হাতটা ধরল। সে নিজেই চামচটা কেড়ে নিয়ে তান্বীকে খাওয়াতে শুরু করল।

জাভিয়ান তাকে প্রতিটি খাবার গেলাতে গেলাতে বলতে লাগল, “এই সি-ফুড আর রেড মিট তোমার এনার্জি বাড়াবে। আমি তোমাকে শুধু আদর করতে চাই না, আমি তোমাকে আমার যোগ্য করে গড়ে তুলতে চাই। তুমি যত বেশি পুষ্টিকর খাবার খাবে, আমার বন্যতা সহ্য করার ক্ষমতা তোমার তত বাড়বে। আমি চাই আমার জিন্নীয়া হবে এই শহরের সবচেয়ে লাবণ্যময়ী নারী।”

সে প্রায় জোর করেই তান্বীকে দামী ক্যাভিয়ার (মাছের ডিম) আর প্রচুর ফলমূল খাওয়াতে লাগল। তান্বীর পেট ভরে গেলেও জাভিয়ান থামছে না। মনে হচ্ছে সে তাকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে ‘প্রস্তুত’ করছে। জাভিয়ান ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে নিচু স্বরে বলল
“খেয়ে নাও জান। কারণ এই ক্যালরিগুলো পোড়ানোর দায়িত্ব আমার। আমি নিশ্চিত করব যাতে এক ফোঁটা ক্যালোরিও তোমার শরীরে অবশিষ্ট না থাকে।”

মায়াবী আলোর নিচে, গোলাপের সুবাসে ঘেরা এই নির্জনতায় তান্বী অনুভব করল জাভিয়ান চৌধুরী তাকে তিল তিল করে নিজের বন্যতার জন্য গড়ে পিটে নিতে চায়। বাইরে তখনো সেই লাল বেলুনগুলো দুলছে, আর বাতাসের কানে কানে জাভিয়ানের সেই ঘোষণা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— আজকের রাতটা কেবল শুরু।

জাভিয়ান যখন জোরাজুরি করে তান্বীকে দামী ক্যাভিয়ার আর প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবারগুলো খাওয়াচ্ছিল, তখন তান্বীর বুকের ভেতরটা ভয়ে আর লজ্জায় দুরুদুরু কাঁপছিল। সে চামচটা নামিয়ে রেখে কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। ওর চাউনি এতটাই ধারালো যে মনে হচ্ছে তান্বীর হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে নেবে।

তান্বী অতি ক্ষীণ স্বরে বলল, “তার মানে কি… আজ রাতেও আপনি আবার…?”

জাভিয়ান থামল না। সে গ্লাসে রেড ওয়াইন ঢালতে ঢালতে শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় পালটা প্রশ্ন করল, “হ্যাঁ, কেন? কোনো সমস্যা?”

তান্বী মাথা নিচু করে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল, “কিন্তু কাল রাতটা তো কেবল শেষ হলো। আমি এখনো ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারছি না জাভিয়ান।”

জাভিয়ান ওয়াইনের গ্লাসটা ঠোঁটে ছোঁয়ালো না, বরং সেটা টেবিলের ওপর রেখে তান্বীর দিকে আরও ঝুঁকে এল। ওর গলার স্বর এখন অনেক বেশি গভীর আর নেশাতুর। “দেখো তান্বী, আমি আগে কখনোই এই স্বাদের খোঁজ পাইনি। যেদিন থেকে আমি তোমার প্রেমে পড়েছি, সেদিন থেকেই আমি তোমাকে নিজের করে চেয়েছি। কিন্তু প্রতিবার তোমার কথা ভেবে আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি, আগলে রেখেছি তোমাকে। কিন্তু এখন আমি এটার আসল টেস্ট পেয়ে গেছি। এখন আমি চাইলেও আর নিজেকে আটকাতে পারছি না। এটা আমার কাছে এখন মরণ নেশার মতো হয়ে গেছে।”

সে ওয়াইনের গ্লাসটা হাতে নিয়ে সেটার লাল রঙের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। “এই যে ওয়াইন পান করছি, এটাতে এখন আর আমার নেশা ধরছে না জিন্নীয়া। কাল রাতে তোমার মাঝে যে নেশাটা ছিল, আমি ওটা আজকেও চাই। আমি আজ আবারও তোমার গভীরে হারাতে চাই।”

তান্বী আর্তনাদ করে ওঠার মতো গলায় বলল, “কিন্তু জাভিয়ান, আমি তো অসুস্থ! আমার সারা শরীর ব্যথায় নীল হয়ে আছে।”

জাভিয়ান এবার উঠে দাঁড়াল। সে ধীর পায়ে তান্বীর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল এবং ওর কাঁধে নিজের পাথরের মতো শক্ত হাত দুটো রাখল। তান্বীর কানের কাছে মুখ নামিয়ে সে ফিসফিস করে বলল—”আমি জানি তুমি অসুস্থ। সেজন্যই তোমার জন্য বিশেষ মেডিসিনও আনিয়ে রেখেছি। আর আমি তো আছিই। তোমার শরীরের প্রতিটি ব্যথার যত্ন যেমন আমি নেব, তেমনি তোমার স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখাও এখন আমার দায়িত্ব। কিন্তু আজ রাতে কোনো অজুহাত চলবে না। আমি তোমাকে এমনভাবে নিরাময় করব যে তুমি নিজেই এই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে।”

জাভিয়ানের তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর ঘাড়ে আছড়ে পড়তেই সে শিউরে উঠল। চারদিকের হাজারো গোলাপ আর জ্বলন্ত ক্যান্ডেলগুলো এই আসন্ন ঝড়ের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাভিয়ান যখন পরম নিশ্চিন্তে তার পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তান্বীর মস্তিষ্কে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছে।

তান্বী মুখ নিচু করে খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল—”কিছু একটা তো করতে হবে! এই লোকটার হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই? ও তো আমাকে মেরেই ফেলবে! এই জীবনে আমিই বোধহয় প্রথম নারী, যে তার স্বামীর ভালোবাসার চেয়ে তার আদরকে বেশি ভয় পাচ্ছে।”

তান্বীর মনে পড়ে গেল কাল রাতের সেই বিধ্বংসী স্মৃতি।জাভিয়ানের সেই বন্যতা, সেই অনিয়ন্ত্রিত নেশা যা ওকে চুরমার করে দিয়েছিল। সে ভাবতেও পারেনি এই পাথুরে মানুষটার ভেতরে এমন এক আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে।

তান্বী নিজের অজান্তেই শিউরে উঠে ভাবল— “আগে যদি জানতাম এই লোকটা এতোটা হাঙ্গরি, তবে শত বিপদে পড়লেও কোনোদিন ওর কাছে ধরা দিতাম না। ও আমাকে আগলে রাখছে ঠিকই, কিন্তু সেই আগলে রাখার মাঝেও যে আমাকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছে!”

সে আড়চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। জাভিয়ান তখন খুব শান্তভাবে তার গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে, সে জানে তার শিকার আজ কোথাও পালাতে পারবে না। তান্বী বুঝতে পারল, এই সাজানো বাগান, এই দামী ক্যাভিয়ার আর এই মায়াবী আলো—সবই আসলে ওকে পরবর্তী ‘ঝড়’ এর জন্য চাঙ্গা করার এক নিষ্ঠুর আয়োজন।

জাভিয়ান হঠাৎ তান্বীর থুতনিটা ধরে মুখটা সামান্য ওপরে তুলল। ওর চোখে এক পৈশাচিক সৌন্দর্য। সে ধীর স্বরে বলল, “কী ভাবছো জিন্নীয়া? পালানোর পথ খুঁজছো? এই প্রান্তরে আজ আমি আর তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। তোমার প্রতিটি নিশ্বাস এখন আমার নিয়ন্ত্রণে।”

তান্বী অসহায়ভাবে চোখ বুজল। সে জানে, আজ রাতে এই গোলাপের গালিচায় তার হার মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।

জাভিয়ান তান্বীকে কোলে করে নিয়ে গেলো গাড়ির সামনে, কোল থেকে নামিয়ে সেই সাদা রঙের বিলাসবহুল স্পোর্টস কারটির কাছে নিয়ে গেল। গাড়িটির ওপরের অংশ (Convertible) খোলা, যার ভেতরে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে এক নরম বিছানা তৈরি করা হয়েছে। খোলা আকাশের নিচে, হাজারো লাল বেলুনের ছায়ায় আজ রাতে এটাই তাদের বাসর।

জাভিয়ান তান্বীকে খুব সন্তর্পণে গাড়ির ভেতর শুইয়ে দিল। ওর দামী ব্লেজারটা একপাশে সরিয়ে রেখে সে তান্বীর ওপর ঝুঁকে এল। বাতাসের আদ্রতা আর দূরে পাহাড়ের নিস্তব্ধতা সাক্ষী রেখে জাভিয়ান তান্বীর কপালে, গালে এবং সবশেষে ওর কাঁপা ঠোঁটে নিজের অধিকার স্থাপন করল।

তান্বী অনুভব করল জাভিয়ানের স্পর্শে সেই পরিচিত আদিম নেশা। ওর প্রতিটি চুম্বনে এক একটি আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ছে। তান্বী মনে মনে ভাবল, “এভাবে চললে তো আজকেও ও আমাকে শেষ করে দেবে! কালকের ব্যথা এখনো শরীর থেকে যায়নি।”

একপর্যায়ে জাভিয়ানের আলিঙ্গন যখন আরও গাঢ় হলো, তান্বী শরীরটাকে এক নিমেষে শিথিল করে দিল। সে তার চোখের পাতা শক্ত করে বন্ধ করে মাথাটা একপাশে এলিয়ে দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার নাটক করল। আগে জাভিয়ানের ছোঁয়ার তীব্রতায় সে সত্যি সত্যি জ্ঞান হারাত, কিন্তু আজকের এই নিথর হয়ে যাওয়াটা ছিল কেবল তার আত্মরক্ষার এক ব্যর্থ কৌশল।

জাভিয়ান হঠাৎ থেমে গেল। তান্বীর নিস্পন্দ দেহটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর তীক্ষ্ণ চোখকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়। সে তান্বীর নিশ্বাসের গতি আর চোখের পাতার সামান্য কাঁপুনি দেখেই ধরে ফেলল যে জিন্নীয়া তার সাথে ছলনা করছে।

জাভিয়ান জানত, তান্বী ওকে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু আজ এই বিশেষ রাতে তান্বীর এই মেকি অভিনয় জাভিয়ানের পুরুষালী অহংকারে কোথাও গিয়ে আঘাত করল। সে চাইলেই ওকে এই নাটক করার জন্য শাস্তি দিতে পারত, কিন্তু সে কিছুই বলল না।

জাভিয়ান ধীর পায়ে তান্বীর ওপর থেকে সরে এল। সে গাড়ির বডির ওপর এক হাত রেখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ওর চোখে এক অদ্ভুত অভিমান খেলা করছে। যে মানুষটা পুরো শহরকে নিজের পায়ের নিচে রাখে, সে আজ তার প্রিয়তমার সামান্য একটা নাটকের কাছে হেরে গেল।

সে শান্ত গলায় কিন্তু ধরা গলায় বলল, “জেগে ওঠো জিন্নীয়া। আমি জানি তুমি অজ্ঞান হওনি। আমার ভালোবাসা যদি তোমার কাছে এতোটাই আতঙ্কের হয়, তবে আজ রাতে আমি আর তোমাকে ছোঁব না।”

তান্বী চোখ না তুলেও অনুভব করতে পারল জাভিয়ানের কণ্ঠের সেই চাপা কষ্ট। এই ভয়ংকর মানুষটার অভিমান যে কতটা ভারী হতে পারে, তা ভেবে তান্বীর বুকটা ডুকরে উঠল।
.
.
.
ভোরের আলো যখন পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সমতলে এসে পড়ল, তখন চারপাশের লাল বেলুনগুলো শিশিরে ভিজে কিছুটা নুইয়ে পড়েছে। কাল রাতে জাভিয়ান নিজের হাতে তান্বীকে ব্যথানাশক মেডিসিন খাইয়ে দিয়েছিল। সেই ওষুধের কড়া ঘুমে তান্বী গাড়ির ভেতরেই হারিয়ে গিয়েছিল গভীর নিস্তব্ধতায়।

সূর্য যখন পুব আকাশে উঁকি দিল, তান্বীর চোখ মেলতেই শরীরটা একটু হালকা মনে হলো। সে ধড়ফড় করে উঠে বসল। সাদা স্পোর্টস কারের সিটে সে একা শুয়ে আছে, গায়ে জাভিয়ানের সেই দামী ব্লেজারটা জড়ানো। কিন্তু জাভিয়ান পাশে নেই। ড্রাইভিং সিটটা শূন্য। চারপাশটা একদম নিঝুম, কেবল বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।

তান্বীর বুকে হঠাৎ এক অজানা ভয় মোচড় দিয়ে উঠল। কালকের সেই নাটক, জাভিয়ানের সেই চাপা অভিমানী কণ্ঠস্বর সবই ঝাপসা হয়ে মনে পড়ছে। সে কোনোমতে টলমলে পায়ে গাড়ি থেকে নেমে রিসোর্টের ভেতরের দিকে দৌড়ে গেল।

“জাভিয়ান! আপনি কোথায়?”
সে হন্যে হয়ে প্রতিটি রুম খুঁজল। ড্রয়িংরুম, কিচেন এমনকি কাল রাতের সেই ডিনার টেবিলটার কাছেও গেল কিন্তু কোথাও সেই দীর্ঘদেহী মানুষটার দেখা নেই।

তান্বীর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে কি তবে খুব বেশি রাগ করেছে?

অবশেষে হতাশ হয়ে তান্বী বেডরুমের লাগোয়া বিশাল বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিচে তাকাতেই ওর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।

নিচে রিসোর্টের নীল জলের সুইমিংপুলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জাভিয়ান। কনকনে ঠান্ডা জল ওর কোমর পর্যন্ত ছুঁয়ে আছে। জাভিয়ানের ঊর্ধ্বাঙ্গ পুরোপুরি খালি গায়ে, পেশিবহুল পিঠে ভোরের আলো পড়ে চিকচিক করছে। তার এক হাতে জ্বলন্ত দামী সিগার, যা থেকে ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

জাভিয়ান নড়ছে না, পাথরের মূর্তির মতো সে সামনের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, আর চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত শূন্যতা। ঠান্ডায় শরীর নীল হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। সে নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরিটাকে এই বরফশীতল জলে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

বারান্দা থেকে জাভিয়ানকে ওই অবস্থায় দেখে তান্বীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এল। সুইমিংপুলের পাড়ে যখন সে পৌঁছাল, জাভিয়ান একবারের জন্যও ওর দিকে তাকাল না। সে আগের মতোই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সিগার টানছে, যেন তান্বীর অস্তিত্ব ওর কাছে আজ গৌণ।

তান্বী পুলের কিনারায় দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে ডাকল, “জাভিয়ান…”

কোনো উত্তর নেই। জাভিয়ান ধোঁয়ার এক দীর্ঘ কুণ্ডলী ছেড়ে পুলের অন্য প্রান্তের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর এই নীরবতা চাবুকের চেয়েও বেশি আঘাত করছে তান্বীকে। সে বুঝতে পারল, কাল রাতের সেই নাটক জাভিয়ানের পুরুষালি অহংকারে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
তান্বী সাহস সঞ্চয় করে পুলের সিঁড়ি দিয়ে সামান্য নিচে নামল। ঠান্ডা জল ওর পায়ের পাতা ছুঁতেই সে শিউরে উঠল। সে জাভিয়ানের কাছাকাছি গিয়ে ওর পেশিবহুল পিঠে হাত রাখতে গিয়েও থমকে গেল।

“জাভিয়ান, আপনিখি সারা রাত এখানে ছিলেন? শরীর খারাপ করবে তো। প্লিজ, উঠে আসুন।”

জাভিয়ান এবারও কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে—হয়তো অনিদ্রায়, নয়তো অভিমানে। সে তান্বীর চোখের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে পুলের ওপরে উঠে গেল। পানির ফোঁটা ওর শরীর বেয়ে টপ টপ করে পড়ছে। সে চেয়ারের ওপর রাখা সাদা তোয়ালেটা তুলে নিয়ে শরীর মুছতে হাঁটা শুরু করলো এমনভাবে যেনো তান্বী সেখানে নেই-ই।

তান্বী ওর পিছু পিছু এল। ও জাভিয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে হাত দুটো ধরে ফেলল। “আম সরি জাভিয়ান। কাল ওটা আমি…”

জাভিয়ান এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তারপর রুমে চলে গেলো।
.
.
.

সারাটা দিন জাভিয়ান যেন এক জ্যান্ত পাথর হয়ে রইল। তান্বী শত চেষ্টা করেও ওর ঠোঁট থেকে একটা শব্দ বের করতে পারেনি। ডিনার টেবিল থেকে শুরু করে বসার ঘর—জাভিয়ান ওকে এমনভাবে এড়িয়ে গেছে যেন তান্বী এই বিশাল রিসোর্টের কোনো অদৃশ্য দেওয়াল। ওর এই নিঃশব্দ অবজ্ঞা তান্বীর ভেতরের ভয়কে জেদে রূপান্তরিত করল।

তান্বী বুঝতে পারল, জাভিয়ান চৌধুরীকে বশ করা সহজ, কিন্তু তার অভিমান ভাঙানো হিমালয় জয়ের চেয়েও কঠিন।
.
.
.
রাত গভীর হয়েছে। আকাশে একফালি চাঁদ উঠেছে, যার আলোয় বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা জাভিয়ানের অবয়বটা কোনো এক বিষণ্ণ গ্রীক দেবতার মতো লাগছে। ওর হাতে যথারীতি জ্বলন্ত সিগার। তান্বী আর সইতে পারল না। সে ঝড়ের বেগে বারান্দায় এসে জাভিয়ানের মুখোমুখি দাঁড়াল।

“আপনার সমস্যা কী জাভিয়ান? কেন আমাকে এভাবে ইগনোর করছেন?” তান্বীর গলার স্বর রাগে কাঁপছে।

জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে নির্বিকারভাবে সিগারের ধোঁয়া ছাড়ল আকাশের দিকে। ওর এই নির্লিপ্ততা তান্বীর ধৈর্যের শেষ বাঁধটা ভেঙে দিল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল—
“বুঝতে পেরেছি! আসলে সব পুরুষই এক, আপনিও তার ব্যতিক্রম নন। আপনার কাছে আমার কোনো মূল্য নেই, আপনিও কেবল আমার দেহকেই ভালোবাসেন! কাল রাতে দেহ দেইনি বলে, নাটক করে আপনাকে থামিয়েছি বলে এখন আর আমাকে ভালো লাগছে না আপনার? এই কি আপনার ভালোবাসার দৌড়?”

কথাটা শেষ হতেই চারপাশের বাতাস যেন জমে বরফ হয়ে গেল। জাভিয়ান ধীরপায়ে ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখের মণি দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে, যেন সেখান থেকে এখনই আগ্নেয়গিরির লাভা বেরিয়ে আসবে। তান্বী বুঝতে পারল সে ভুল করে বাঘের লেজে পা দিয়ে ফেলেছে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

জাভিয়ান এক হ্যাঁচকায় তান্বীর ঘাড় ধরে ওকে বারান্দার পিলারের সাথে চেপে ধরল। ওর হাতের জ্বলন্ত সিগারটা তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে। জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে চরম আক্রোশে বলল, “আমি দেহের পাগল? আমার ভালোবাসাকে তুমি এই সস্তা তকমা দিলে?”

বলতে বলতেই জাভিয়ান চরম উন্মাদনায় হাতের জ্বলন্ত সিগারের আগুনটা তান্বীর ঠোঁটের কোণায় চেপে ধরল। আগুনের তাপে তান্বী যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ানের হাতের চাপে ওর মুখ দিয়ে গোঙানি ছাড়া কিছু বেরোল না। জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর এখন নরকের আগুনের মতো তপ্ত “আমি যদি দেহের পাগল হতাম, তবে তোমাকে ভিলা এস্পেরেন্জার ঘরণী বানিয়ে আনতাম না। টাকা দিয়ে তোমাকে রক্ষিতা হিসেবে কিনে আনতাম! এই শহরের দামী ক্লাবগুলোতে হাজার হাজার মেয়ে আমার এক ইশারায় বিছানায় নগ্ন হওয়ার জন্য লাইন দিয়ে থাকে। আমি যদি দেহের নেশায় থাকতাম, তবে যেদিন তোমাকে তুলে এনে বিয়ে করেছি সেদিন রাতেই তোমাকে রেইপ করতাম! তুমি জ্ঞান হারাতে কি না মরতে,তা দেখার দরকার মনে করতাম না নিজের পুরুষত্ব চালিয়ে যেতাম!”

জাভিয়ান সিগারটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তান্বীর মুখটা আরও জোরে চিপে ধরল। ওর চোখের দৃষ্টিতে তখন এক ভয়ংকর বন্যতা। “আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম জিন্নীয়া,কিন্তু তুমি আজ প্রমাণ করলি, তুমি কেবল আমার ক্রোধেরই যোগ্য। আজ থেকে তবে তাই হবে।”

তান্বী থরথর করে কাঁপছে। জাভিয়ানের চোখে যে আগুন সে আজ দেখল, তা কাল রাতের চেয়েও হাজার গুণ বেশি বিধ্বংসী। সে বুঝতে পারল, নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে গিয়ে সে আজ জাভিয়ানের ভেতরের আসল দানবটাকে জাগিয়ে তুলেছে।

বারান্দার সেই দমবন্ধ করা পরিবেশে জাভিয়ানের রুদ্রমূর্তি দেখে তান্বী পাথর হয়ে গিয়েছিল। ওর ঠোঁটের এক কোণ জাভিয়ানের সিগারেটের আগুনের তাপে পুড়ে লাল হয়ে গেছে। তীব্র যন্ত্রণায় চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, কথা বলা তো দূর—নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে ওর। তবুও সেই ব্যথার মাঝেই তান্বী অস্ফুট স্বরে, ভাঙা গলায় কোনোমতে বলে উঠল
“তাহলে… তাহলে কেন আমাকে ইগনোর করছেন? কেন কথা বলছেন না?”

তান্বীর এই অসহায় প্রশ্নে জাভিয়ানের চোয়াল সামান্য শিথিল হলো, কিন্তু চোখের সেই বিধ্বংসী আগুন নিভল না। সে তান্বীর চিবুকটা আরও জোরে চেপে ধরে ওকে নিজের চোখের একদম কাছে টেনে আনল।

জাভিয়ানের গলার স্বর এখন ভাঙা, কিন্তু তাতে এক আকাশ সমান আক্ষেপ মিশে আছে। “তুমি আমাকে ভয় পাও জিন্নীয়া? আমি এটা মেনে নিতে পারছি না! পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ জাভিয়ান চৌধুরীকে যমের মতো ভয় পাবে, সেটা আমার কাছে গর্বের। কিন্তু আমার ভালোবাসা, আমার ছোঁয়া তোমার কাছে কেবলই আতঙ্কের নাম এটা আমি নিতে পারছি না!”

জাভিয়ান ওর কপাল তান্বীর কপালে ঠেকিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বলতে লাগল “পুরো দুনিয়া আমাকে ভয় পেলেও আমি তোমার ওই হিরন্ময়ী চোখে আমার জন্য এক বিন্দু আতঙ্ক দেখতে চাই না। আমি চাই ওই চোখে শুধু আমার জন্য ভালোবাসা থাকবে, আমাকে চরমভাবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকবে। কিন্তু তুমি? তুমি আমার আদর থেকে বাঁচতে অজ্ঞান হওয়ার নাটক করলে? তুমি কি জানো এটা আমার পৌরুষে কতটা বড় আঘাত?”

জাভিয়ানের তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর দগ্ধ ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে। সে আরো যন্ত্রণায় আর অভিমানে নীল হয়ে যাচ্ছে।

জাভিয়ান আবার বলল “আমি চাই তুমি আমাকে দেখে শিউরে উঠবে ঠিকই, কিন্তু ভয়ে নয় তীব্র আকুলতায়। আমার জন্য ওই চোখে শুধু তৃষ্ণা দেখতে চাই আমি। অথচ তুমি আমাকে একটা দানব বানিয়ে দিলে জিন্নীয়া। কাল রাতের পর আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার মনের ভাষা পড়বে, কিন্তু তুমি তো আমাকে কেবল দেহের পাগল ভাবলে!”

জাভিয়ানের সেই হাহাকার মেশানো কথাগুলো তান্বীর হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝতে পারল, এই ভয়ংকর মানুষটার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভীষণ একাকী ছেলে। তান্বী যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা অবস্থাতেই ওর হাত দুটো জাভিয়ানের প্রশস্ত বুকে রাখল। ভেজা চোখে, ধরা গলায় বলল—”সরি… আর কখনো এমন হবে না জাভিয়ান। আমি বুঝতে পারিনি…”

‘সরি’ শব্দটা কানে যেতেই জাভিয়ানের ভেতরের সেই রুদ্রমূর্তি মুহূর্তেই বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ল। ওর শক্ত হাত দুটো আলগা হয়ে এল। যখন ওর নজর গেল তান্বীর সেই লাল হয়ে যাওয়া দগ্ধ ঠোঁটটার দিকে, জাভিয়ানের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। নিজের ওপর এক তীব্র ঘৃণা জেঁকে বসল ওর। রাগের মাথায় ও কী করে ফেলল এটা? নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া এই জানোয়ারটাকে ও নিজেও ঘৃণা করে।

জাভিয়ান আসলে ভালোবাসার কাঙাল। ছোটবেলা থেকে অনেক আভিজাত্য দেখেছে, কিন্তু বাবা-মায়ের স্নেহ পায়নি। মেধাবী ছাত্র হিসেবে সবসময় সবার উপরে থাকলেও ওর কোনো ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ ছিল না। যে বয়সে ছেলেরা প্রেমে পড়ে, জাভিয়ান তখন নিজের সাম্রাজ্য গড়তে ব্যস্ত ছিল। কোনো নারীর সান্নিধ্যে সে কোনোদিন আসেনি, শরীর আর মনের এই আদিম টান তার কাছে একদম নতুন। তাই তো তান্বীর প্রতি ওর এই টানটা অনেকটা নেশার মতো, যা ও সামলাতে পারছে না।

জাভিয়ান কাঁপাকাঁপা আঙুলে তান্বীর পুড়ে যাওয়া ঠোঁটটা স্পর্শ করল।সে ফিসফিস করে বলল—
“কেন তুমি আমাকে এতোটা রাগিয়ে দাও জিন্নীয়া? আমি তো তোমাকে ব্যথা দিতে চাইনি। এই হাত দুটো দিয়ে আমি সারা জীবন শুধু তোমাকে আগলে রাখতে চাই, অথচ আজ এই হাত দিয়েই তোমাকে পুড়িয়ে দিলাম!”

জাভিয়ান পরম মমতায় তান্বীকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। ওর চিবুক তান্বীর মাথার ওপর রেখে সে অপরাধবোধে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। যে মানুষটা কোনোদিন কারো কাছে মাথা নত করেনি, সে আজ নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে হেরে যাচ্ছে।

সে তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে করুণ সুরে বলল, “ছোটবেলা থেকে কেউ আমাকে ভালোবাসেনি জিন্নীয়া। আমি জানি না কীভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয়। আমার কাছে অধিকার মানেই শাসন, আর শাসন মানেই বন্যতা। আমি তোমাকে হারানোর ভয়ে পাগল হয়ে যাই, তাই হয়তো মাঝেমধ্যে দানব হয়ে উঠি। আমাকে ক্ষমা করে দাও।”

তান্বী অনুভব করল জাভিয়ানের শরীরের কম্পন। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা যতটা না ভয়ংকর, তার চেয়ে অনেক বেশি অসহায়। সে জাভিয়ানের পিঠ জড়িয়ে ধরে ওকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। আজকের এই দগ্ধ ঠোঁটের যন্ত্রণা জাভিয়ানের এই নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণের কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল।

যে মানুষটা এক ইশারায় শহর তছনছ করে দিতে পারে, সে আজ তান্বীর ওই এক চিমটি পোড়া দাগ দেখে দিশেহারা। সে দ্রুত তান্বীকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে বিছানায় বসাল। ওর হাত দুটো তখনো কাঁপছে।

সে আলমারি থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে আনল। বিছানায় তান্বীর খুব কাছে বসে সে একটা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম আর কটন বাড বের করল। ওর চোখের সেই বন্যতা এখন এক অদ্ভুত শান্ত আর করুণ দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

জাভিয়ান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, যেন ফুলের পাপড়িতে ছোঁয়া দিচ্ছে এমনভাবে তান্বীর দগ্ধ ঠোঁটে মলমটা লাগাতে শুরু করল। মলমের ছোঁয়ায় তান্বী খানিকটা শিউরে উঠতেই জাভিয়ান মুখ নামিয়ে সেখানে আলতো করে ফুঁ দিতে লাগল। ওর তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর ঠোঁটে আছড়ে পড়ছে, তবে এবার সেখানে কোনো দাহ নেই, আছে প্রশান্তি।

সে তান্বীর হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে চুমু খেল। জাভিয়ানের চোখে তখন অদ্ভুত এক অসহায়ত্ব। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল “মাঝে মাঝে মনে হয় তোমাকে ছেড়ে দিই, তুমি মুক্তি পাও এই নরক থেকে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় তোমাকে ছাড়া এই জাভিয়ান চৌধুরী তো এক মুহূর্তও বাঁচবে না। তুমিই তো আমার অন্ধকার জীবনের একমাত্র আলো।”

তান্বী অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে দেখতে পেল, এই ভয়ংকর কোনো জাভিয়ান নয় তার সামনে আজ কেবল এক তৃষ্ণার্ত, নিঃস্ব প্রেমিক বসে আছে। তান্বী নিজের হাত বাড়িয়ে জাভিয়ানের গালটা স্পর্শ করল। পুড়ে যাওয়া ঠোঁটে মলমের চেয়েও জাভিয়ানের এই আর্তি তাকে বেশি সুস্থ করে তুলছে।

সে খুব আস্তে করে বলল, “আমাকে মুক্তি দেবেন না জাভিয়ান। আপনার এই অবাধ্য ভালোবাসার মধ্যেই আমি বন্দি থাকতে চাই। শুধু মাঝে মাঝে একটু নরম হবেন, এইটুকুই চাওয়া।”

জাভিয়ান যখন পরম মমতায় তখনও তান্বীর ঠোঁটে মলম লাগিয়ে দিচ্ছিল, তখন আশেপাশে সাজানো লাল গোলাপের তীব্র ঘ্রাণে তান্বীর নাকে অস্বস্তি হচ্ছিল। সে নাক কুঁচকে মৃদু স্বরে বলেছিল “জাভিয়ান, ওই লাল গোলাপগুলো সরিয়ে দিন। ওগুলোতে আমার ভীষণ অ্যালার্জি, আর সত্যি বলতে লাল রঙের চেয়ে আমার কাছে ‘কালো গোলাপ’ অনেক বেশি প্রিয়। ওটা রহস্যময়, ঠিক আপনার মতোই।”

জাভিয়ান তখন কোনো উত্তর দেয়নি, শুধু তান্বীর চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। সে মনে মনে অবাক হয়েছিল যে তার মতো অন্ধকার জগতের মানুষের সাথে তান্বী কালো গোলাপের মিল খুঁজে পায়।
জাভিয়ান কিছু বললো না তার পুরো মনোযোগ এখন কেবল তান্বীর ওই ছোট্ট ক্ষতটার দিকে। জাভিয়ান যখন এতটা কাছে থাকে, তখন ওর চারপাশ থেকে দামী পারফিউম আর সিগারের একটা মিশ্র উগ্র কিন্তু নেশাতুর ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তান্বী যন্ত্রণার কথা ভুলে গিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জাভিয়ানের মুখের দিকে।

এই মুখটা সে কতবার দেখেছে! কখনো ভয়ে, কখনো বিস্ময়ে। কিন্তু আজ এই নরম আলোয় জাভিয়ানের মুখটা তান্বীর কাছে এক রহস্যময় উপন্যাসের মতো মনে হলো। জাভিয়ানের চেহারায় কয়েকটা তিল আছে, যা তান্বীর ভীষণ পছন্দের। সে মনে মনে জাভিয়ানের তিলগুলোর মানচিত্র আঁকতে লাগল

প্রথমটি ওর ডান চোখের পাতার ঠিক ওপরে, যা চোখ বন্ধ করলে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করে। দ্বিতীয়টি ওর নাকের ঠিক ডান পাশে, যা ওর তীক্ষ্ণ নাকটাকে আরও ব্যক্তিত্বময় করে তোলে। আর সবশেষে, ওর ঠোঁটের ঠিক ডান পাশের কোণায় থাকা সেই ছোট্ট তিলটি, যা জাভিয়ান হাসলে বা বাঁকা কথা বললে এক অদ্ভুত আবেদনের সৃষ্টি করে।

তান্বী নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে জাভিয়ানের নাকের পাশের তিলটি ছুঁতে গেল। জাভিয়ান থমকে গেল। সে মলম লাগানো থামিয়ে তান্বীর চোখের দিকে তাকাল। ওর সেই বাদামী চোখের মণি এখন অনেক শান্ত।

সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছো জিন্নীয়া?”

তান্বী লজ্জিত হয়ে হাত সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ান ওর কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তান্বী নিচু স্বরে বলল, “আপনার এই তিলগুলো… আমার খুব ভালো লাগে। বিশেষ করে ঠোঁটের পাশের এই তিলটা।”

জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল, যার কথা তান্বী কেবল ভাবছিল। সে তান্বীর হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে গিয়ে সেই তিলটার ওপর তান্বীর আঙুলটা চেপে ধরল।

জাভিয়ান গভীর গলায় বলল, “আমার শরীরের প্রতিটি অংশ এখন তোমার মালিকানাধীন জিন্নীয়া। এই তিল থেকে শুরু করে আমার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন—সবই তোমার নামে লিখে দিয়েছি। এখন তুমিই বলো, তোমার এই মালিককে তুমি কীভাবে শাসন করবে?”

তান্বীর সারা শরীরে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। জাভিয়ানের এই শান্ত রূপটা ওর বন্য রূপের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটা সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করে। জাভিয়ানের সেই নেশাতুর কথাগুলো তান্বীর হৃদয়ে এক অদ্ভুত সাহসের জন্ম দিল। সে আজ আর ভয় পেতে চায় না, পালাতে চায় না। জাভিয়ানের এই অসহায় আত্মসমর্পণ তাকে আজ এক অন্যরকম অধিকারবোধে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তান্বী খুব ধীরে ধীরে নিজের মুখটা জাভিয়ানের মুখের আরও কাছে নিয়ে গেল।

জাভিয়ান স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবতেও পারেনি এই মেয়েটি, যে কয়েক মুহূর্ত আগে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সে আজ নিজে থেকে তার এত কাছে আসবে।

তান্বী প্রথমে তার কম্পিত ঠোঁটজোড়া জাভিয়ানের ডান চোখের পাতার সেই ছোট্ট তিলটির ওপর রাখল। এক অতি সূক্ষ্ম আর পবিত্র ছোঁয়া। জাভিয়ান নিজের অজান্তেই চোখ দুটো বুজে ফেলল। তার সারা শরীরে এক আশ্চর্য শীতল স্রোত বয়ে গেল। যে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীকে পুরো শহর যমের মতো ভয় পায়, সে আজ তান্বীর এক সামান্য চুম্বনের কাছে একদম নিথর হয়ে গেছে।

এরপর তান্বী তার ঠোঁট সরিয়ে আনল জাভিয়ানের নাকের ডান পাশে থাকা সেই তিলটিতে। সেখানে খুব আলতো করে নিজের ভালোবাসা এঁকে দিল সে। জাভিয়ানের নিশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে। তার বুকের ধুকপুকানি তখন তান্বীর হাতের তালুতে স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে।

সবশেষে তান্বী থামল জাভিয়ানের ঠোঁটের ঠিক ডান পাশের কোণায় থাকা সেই তিলটির ওপর। যেখানে জাভিয়ানের সেই উদ্ধত অহংকার আর বন্যতা লুকিয়ে থাকে। তান্বী সেখানে দীর্ঘক্ষণ নিজের ঠোঁট চেপে ধরে রাখল। এই চুম্বনে কোনো ভয় ছিল না, ছিল না কোনো নাটক ছিল কেবল এক নিঃস্বার্থ সমর্পণ।

জাভিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় তান্বীর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তার চোখ দুটো এখন আর লাল নয়, বরং এক গভীর মায়ায় টলমল করছে। সে ধরা গলায় বলল, “তুমি কি জানো জিন্নীয়া? এই সামান্য চুমুগুলো আমার কাছে পৃথিবীর সমস্ত সাম্রাজ্যের চেয়েও দামি।”

তান্বী জাভিয়ানের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজল। পুড়ে যাওয়া ঠোঁটের যন্ত্রণা এই মুহূর্তে এক স্বর্গীয় সুখে পরিণত হয়েছে। কাল রাতের সেই অপূর্ণতা আজ এই রাতে, এক টুকরো মলম আর কয়েকটা তিলের ওপর আঁকা চুম্বনের মাধ্যমে পূর্ণতা পেতে চাইলো।

জাভিয়ানের শরীরের উষ্ণতা আর তার গায়ের উগ্র পারফিউমের ঘ্রাণে তান্বীর জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা। জাভিয়ান এবার খুব ধীরে ধীরে তান্বীর গলার কাছে মুখ নামিয়ে নিল। তার তপ্ত নিশ্বাস তান্বীর সংবেদনশীল ত্বকে আছড়ে পড়তেই তান্বী মৃদু আর্তনাদ করে জাভিয়ানের শার্টের কলারটা খামচে ধরল।

জাভিয়ান তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল তান্বীর ঘাড়ের বাঁ পাশে। সেখানে এক গভীর ও তৃষ্ণার্ত চুমু এঁকে দিতে দিতে সে আরও নিচে নেমে এল। তার প্রতিটি ছোঁয়ায় ছিল এক উন্মাদনা, যা এতোক্ষণ সে নিজের অবদমিত রাগের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল। তান্বীর সারা শরীরে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার নিশ্বাসের গতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে, জাভিয়ানের এই হুট করে জেগে ওঠা বন্যতায় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে।

জাভিয়ান এবার তান্বীর কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজ থেকে তোমার সব ভয় আমার, আর তোমার প্রতিটা অনুভূতি শুধুই আমার জিন্নীয়া।”

তান্বীর সারা শরীর কাঁপছে। জাভিয়ানের হাত দুটো এখন ওর পিঠের ওপর দিয়ে বিচরণ করছে। এই প্রথম তান্বী অনুভব করল, জাভিয়ানের ভালোবাসা শুধু শাসনের নয়, তা এক তীব্র দহনের মতো যা এক নিমিষেই তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে।

জাভিয়ান যত বেশি তান্বীর গলার কাছে নিজের অধিকার দাবি করছিল, তান্বী তত বেশি তার বাহুডোরে মিশে যাচ্ছিল। দীর্ঘক্ষণের জমানো তৃষ্ণা যেন বাঁধ ভেঙেছে।

জাভিয়ানের প্রতিটি স্পর্শে ছিল এক তীব্র দহন, যা তান্বীর শরীরের শিরায় শিরায় আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ঠিক যখন উত্তেজনার পারদ চরমে, যখন জাভিয়ানের ঠোঁট তান্বীর ঠোঁটের খুব কাছাকাছি—ঠিক তখনই সে হঠাৎ স্থবির হয়ে গেল।

জাভিয়ানের নজর গেল তান্বীর সেই ছোট্ট ক্ষতটার দিকে। তার হাতের সিগারেটে পুড়ে যাওয়া সেই রাঙা ঠোঁটটার এক কোণ এখন ফুলে লাল হয়ে আছে। মলম লাগানো থাকলেও কালচে ছোপটা স্পষ্ট। জাভিয়ানের মস্তিস্কে এক মুহূর্তের জন্য সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল যখন সে রাগের মাথায় এই পবিত্র মুখে আগুন চেপে ধরেছিল।

এক তীব্র ঘৃণা আর অপরাধবোধে জাভিয়ান নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। তার ভারী নিশ্বাসগুলো এখনো তান্বীর মুখে আছড়ে পড়ছে, কিন্তু তার চোখ দুটো এখন আর তৃষ্ণার্ত নয় সেখানে এখন কেবল অনুশোচনা।

তান্বী তখনো ঘোরের মধ্যে। সে আধা-বোজা চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকাল। তার সারা শরীর তখনো কাঁপছে। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “জাভিয়ান…”

জাভিয়ান তার কপাল তান্বীর কপালে ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার দুহাত তান্বীর গাল আগলে রাখল খুব সাবধানে, যেন এই মুখে আর একটুও ব্যথা না লাগে। সে ফিসফিস করে বলল—”আমি তোমাকে পুড়িয়েছি জিন্নীয়া। এই ঠোঁটজোড়া আজ আমার কাছে নিষিদ্ধ।”

জাভিয়ান বিছানা থেকে নেমে গিয়ে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। তান্বী বিছানায় শুয়ে অবাক হয়ে দেখল এই মানুষটাকে। যে মানুষটা এক মুহূর্ত আগে বন্য হয়ে উঠেছিল, সে কেবল তান্বীর সামান্য ব্যথার কথা ভেবে নিজের চরম হর্নি অবস্থা থেকেও নিজেকে টেনে সরিয়ে নিল।
.
.
.
সকালবেলা। রিসোর্টের জানালা দিয়ে আসা রোদের মিষ্টি আভা তান্বীর চোখে পড়তেই তার ঘুম ভেঙে গেল। পরশু রাতের সেই ভয়ংকর ঝড় আর তারপর কাল রাতের জাভিয়ানের সেই আবেগপ্রবণ আত্মসমর্পণের কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠল।

তবে তান্বীর সবচেয়ে বড় অবাক হওয়া বাকি ছিল। সে দেখল জাভিয়ান ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছে। ওর পরনে একটা ধবধবে সাদা শার্ট, কিন্তু সেই শার্টের নকশা দেখে তান্বীর চোখের পলক পড়ছিল না। শার্টের বুকের দুপাশে চমৎকারভাবে কালো সুতো দিয়ে কালো গোলাপের কাজ করা।

তান্বী বিছানা ছেড়ে উঠে ওর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। জাভিয়ান আয়নায় তান্বীর প্রতিফলন দেখে মৃদু হাসল।
“কেমন লাগছে জিন্নীয়া?” জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর আজ অনেক বেশি শান্ত।

তান্বী অবাক হয়ে বলল, “আমি তো কাল রাতে আপনাকে শুধু একবার বলেছিলাম যে আমার লাল গোলাপে এলার্জি আর আমার কালো গোলাপ ভিষণ প্রিয়!”

জাভিয়ান ঘুরে দাঁড়িয়ে তান্বীর দুকাঁধে হাত রাখল। “আমি তোমাকে ভালোবাসি জিন্নীয়া। আর জাভিয়ান চৌধুরী যাকে ভালোবাসে, তার প্রতিটা কথা সে হৃদপিণ্ডে গেঁথে রাখে। কাল রাতে তোমার ওই যন্ত্রণার মাঝেও তুমি যখন তোমার পছন্দের কথা বলেছিলে, আমি তখনই আমার ডিজাইনারকে বলে এই কাস্টোমাইজড শার্টটা রেডি করিয়েছি। রাতারাতি এটা ঢাকা থেকে আনিয়েছি।”

তান্বী শার্টের সেই কালো গোলাপের বুননগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। তার মনে পড়ল, কাল রাতে ডিনার টেবিলের পাশে সাজানো লাল গোলাপের তোড়া দেখে সে একবার হাঁচি দিয়েছিল আর রাতে একবার বলেছিলো তার করো গোলাপ পছন্দের। জাভিয়ান যে এত দ্রুত সেই বিরক্তিকে ভালোবাসায় বদলে দেবে, তা সে ভাবতেও পারেনি।

“আপনি সত্যিই পাগল জাভিয়ান,” তান্বী নিচু স্বরে বলল।

“হ্যাঁ, তোমার জন্য পাগল।” জাভিয়ান তান্বীর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। “আজ থেকে তোমার যা কিছু অপছন্দ, তা জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরীর জীবন থেকেও ডিলিট হয়ে যাবে। আর তোমার যা পছন্দ, তা আমি আকাশ থেকে হলেও ছিঁড়ে আনব।”

চলবে……..

(৩৩ নাম্বার পর্বে ২ হাজার+ রিয়েক্ট আসলেই ৩৪ নাম্বার পর্ব দিবো আর আজকে বিশেষ দিন উপলক্ষে এই পর্বটা দিলাম অবশ্যই সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করবেন)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply