Golpo romantic golpo দিশেহারা

দিশেহারা পর্ব ৫৯


দিশেহারা (৫৯)

সানা_শেখ

মাগরিবের পর পর ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে শ্রবণ। দুপুরে খাওয়াদাওয়া করে বেরিয়েছিল।
সোহা রান্নাঘর থেকে বেডরুমের দিকে এগিয়ে আসছে। শ্রবণকে দেখে ড্রয়িং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায়। শ্রবণের হাতে একটা লাল টকটকে গোলাপ আর বেলি ফুলের মালা।
সোহার চোখমুখ চকচক করছে খুশিতে। শ্রবণ গতকালও ওকে ফুল এনে দিয়েছিল, আবার আজকেও নিয়ে এসেছে।
সোহা শ্রবণের কাছে এগিয়ে এসে হাসি মুখে বলে,

“এগুলো আমার?”

“নাহ। আমার বাচ্চার মা-র।”

শ্রবণের মুখে ‘না’ শুনে সোহার মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল, ‘আমার বাচ্চার মা-র’ শুনে সেই হাসি আবার ফিরে এসেছে মুহূর্তেই।

শ্রবণ ফুলগুলো সোহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে স্বভাব সুলভ গম্ভীর গলায় বলে,

“রেডি হ।”

“কেন?”

“দুপুরে না বললি এক জায়গায় থাকতে থাকতে ভালো লাগছে না, চল বাইরে নিয়ে যাব।”

কথাগুলো বলেই শ্রবণ রুমের দিকে এগিয়ে যায়। সোহা বেলি ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে রুমের দিকে আগায়। দিন দিন শ্রবণ চৌধুরী ওর মন মতো হয়ে উঠছে। শ্রবণ যে কোনোদিন পরিবর্তন হবে এটা কী সোহা ভেবেছিল? উঁহু, একদমই ভাবেনি।

সোহা রুমে এসে ফুলগুলো রেখে গায়ের ওড়নাটা হিজাবের মতো করে পেঁচিয়ে নেয়। কাবার্ড থেকে চাদর বের করে গায়ে জড়িয়ে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আমার হয়ে গেছে।”

শ্রবণ ফোন থেকে মুখ তুলে সোহার দিকে তাকায়। বসা থেকে উঠে ফোন পকেটে ভরে গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
সোহা দ্রুত পায়ে শ্রবণের পেছন পেছন হাঁটা ধরে।
ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সোহার ডান হাতটা মুঠো করে ধরে শ্রবণ। লিফটের সামনে এসে দেখে লিফট নিচে রয়েছে।

লিফট উপরে এসে থামে। দরজা খুলে যেতেই দেখা যায় ভেতরে সেই ভদ্র মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। শ্রবণ যখন ফ্ল্যাটে ফিরল তখন ভদ্র মহিলা নিচে যাওয়ার জন্য লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছু নেওয়ার জন্য হয়তো নিচে গিয়েছিলেন, হাতে কীসের যেন প্যাকেট।

লিফট থেকে বের হতে হতে দুজনের উপর নজর বুলান। মিষ্টি হেসে সোহার দিকে তাকিয়ে বলেন,

“সোহা, তুমি প্রেগন্যান্ট?”

সোহা মাথা নাড়ায়। ভদ্র মহিলা আরো কিছু বলতে চাইছিলেন কিন্তু তার আগেই লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।

শ্রবণ নিজের গাড়িটা পার্কিং জোনে দাঁড় করিয়ে সোহাকে নিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। সোহা আশপাশে নজর বুলায়। রাতের শহর দেখতে মন্দ লাগছে না ওর।
শ্রবণ সোহার হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। শো শো বাতাসে সোহার ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। এত বাতাস কেন এখানে? আশপাশে অনেক মানুষ আছে, সবাই কোনো না কোনোভাবে ব্যস্ত। সোহার কাছে জায়গাটা অপরিচিত। এর আগে কোনোদিন এখানে এসেছে বলে মনে পড়ছে না। ফুচকার দোকান দেখে সোহার পা দুটো থেমে গেছে। জিভে জল চলে এসেছে মুহূর্তেই। মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকাতেই দেখে শ্রবণ ওর দিকে তাকিয়ে আছে কপাল ভ্রু কুঁচকে।

“কী হয়েছে?”

সোহা দুদিকে মাথা নাড়ায়। পুনরায় হাঁটতে শুরু করে ধীর পায়ে। শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলে,

“কিছু খাবি?”

সোহা আবার মুখ তুলে তাকায়। শ্রবণ আগের মতোই বলে,

“কিছু খাবি?”

সোহা এরই অপেক্ষা করছিল, শ্রবণ কখন বলবে ‘কি খাবি’। সাহস করে আগ বাড়িতে কিছু খাওয়ার কথা বলতে পারছিল না, শ্রবণ যদি ধমক দেয় এই ভয়ে। কিছু খেতে চাইলে দেখা গেলো রাম ধমক দিয়ে বলছে, “বাইরের কিছু খাওয়া যাবে না, একদম চুপ।”

“কথা বলছিস না কেন?”

সোহা হাত তুলে ফুচকার দোকান দেখিয়ে দিয়ে বলে,

“ফুচকা খাব।”

শ্রবণ ছ্যাত করে ওঠে। কাঠকাঠ গলায় বলে,

“ফুচকা খাওয়া যাবে না, অন্য কিছু খা।”

“আমার ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে।”

“ইচ্ছে করলেই খাওয়া যাবে না।”

“কী হবে খেলে?”

“ফুচকা কীভাবে বানায় জানিস তুই? অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ইদুর, তেলাপোকা হাঁটাহাঁটি করে, হাগু-মুতু করে। কেঁচো চারপাশে ছড়িয়ে থাকে। আরো কত নোংরা, ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া দিয়ে ভর্তি। এসব খাওয়ার কথা একদম বলবি না।”

শ্রবণের কথাগুলো সোহার উপর তেমন একটা ইফেক্ট ফেলতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সোহা অনুরোধের সুরে বলে,

“অল্প খাব। খাই না প্লীজ, কিনে দাও না।”

“একদম না। চল এদিক থেকে।”

সোহা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। শ্রবণ পেছন ফিরে তাকাতেই সোহা ওর ডান হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে বলে,

“এমন করছো কেন?”

“এসব খেলে অসুস্থ হয়ে পড়বি।”

“একটা খাব, একটা এনে দাও।”

“ওটা তোর বাপ-ভাইয়ের দোকান যে একটা বিক্রি করবে?”

সোহা ঠোঁট উল্টে বলে,

“তাহলে এক প্লেট এনে দাও।”

“অসুস্থ হয়ে পড়বি, পেট ব্যথা করবে।”

“করবে না, আগেও খেয়েছি তো। ও বাবুর আব্বু, দাও না এক প্লেট কিনে।”

শ্রবণের আর সাধ্য আছে নিষেধ করার? উঁহু একদমই নেই। আগের শ্রবণ চৌধুরী হলে নিশ্চিত এবারেও নিষেধ করে ফেলত, কিন্তু শ্রবণ চৌধুরী তো আগের সেই শ্রবণ চৌধুরী নেই।
সোহার বাম হাতটা ধরে নিজের বুকের বাম পাশে চেপে ধরে। সোহা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে শ্রবণের হৃৎস্পন্দন অনেক দ্রুত গতিতে ছুটছে। শ্রবণের মুখের দিকে তাকাতেই শ্রবণ ওর হাত ধরে ফুচকার দোকানের দিকে পা বাড়ায়। সোহার ঠোঁটে বিস্তর হাসি দেখা যায়।

ফুচকার দোকানের কাছে এসে দাঁড়ায় দুজন। বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সকলের হাতেই ফুসকা আর ঝাল মুড়ি।
শ্রবণ ফুচকাওয়ালা মামার দিকে তাকিয়ে বলে,

“মামা, এক প্লেট ফুচকা দিয়েন।”

পাশ থেকে সোহা চঞ্চল গলায় বলে,

“মামা, ঝাল বেশি দিয়েন।”

শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“এমন ঝাল দেবেন যাতে কানে জলপট্টি লাগাতে হয়।”

শ্রবণের কথা শুনে সোহার মুখ শুকিয়ে গেলেও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যে থেকে তিনজন ফিক করে হেসে উঠেছে। ফুচকাওয়ালা মামা নিজেও মুচকি হাসেন।
ফুচকার প্লেট হাতে পেয়ে সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“একটা খাও।”

শ্রবণ নাক সিটকে বলে,

“জীবনেও না।”

সোহা আর কিছু না বলে খাওয়া শুরু করে। ইশ, কী মজা! কত্তদিন হয়ে গেছে ফুচকা খায়নি। আহ, কী স্বাদ! উম, মজাহ!
সোহার খাওয়া দেখে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে শ্রবণ। সোহার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ফুচকা নয়, অমৃত খাচ্ছে।

প্লেটের ফুচকা শেষ হতেই শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল করুণ চোখে। শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে,

“মামা, আরেক প্লেট দিয়েন।”

সোহার ইচ্ছে করছে শ্রবণকে জাপটে ধরতে কিন্তু এত মানুষের সামনে ধরা যাবে না। সোহা খুশিতে তো কল্পনায় পাখনা মেলে উড়ছে রীতিমতো।

সোহা ফুচকাওয়ালা মামার দিকে তাকিয়ে বলে,

“মামা, ঝাল আরেকটু বেশি দিয়েন।”

কথাগুলো বলে ভয়ে ভয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে আছে ওর মুখের দিকে। সোহার হাসি হাসি মুখটা চুপসে যায়। হাতের খালি প্লেট রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল দ্বিতীয় প্লেট ফুচকা খাওয়ার আশায়।

দ্বিতীয় প্লেট ফুচকা খেয়ে সোহার অবস্থা খারাপ। ঝালে কান আর মাথা দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে যেন। চোখে পানি টলমল করছে, জিহ্বায় যেন আগুন ধরে গেছে। শ্রবণের কথা অনুযায়ী ওর এখন সত্যি সত্যিই মাথায় আর কানে জলপট্টি লাগাতে ইচ্ছে করছে। শ্রবণ একটা পানির বোতল কিনে সোহাকে পানি খাওয়ায়। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

“আরো খা ঝাল।”

“আ, উফ ঝাল। আআআ।”

“এখন উহ আহ ইশ করছিস কেন? ঝাল খাওয়ার সময় মনে ছিল না?”

সোহা কথা বলতে পারছে না। শ্রবণ আবার পানি খাওয়ায় ওকে। আশপাশে নজর বুলিয়ে মিষ্টি জাতীয় কিছু আছে নাকি খোঁজ করে। দূরে একজন হাওয়াই মিঠাইওয়ালাকে দেখতে পায়। পানির বোতলটা সোহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,

“তুই পানি খেতে থাক, আমি আসছি।”

“আমাকে একা রেখে কোথায় যাচ্ছ?”

“হাওয়াই মিঠাই নিয়ে আসি।”

শ্রবণ দ্রুত পায়ে বড়ো বড়ো কদম ফেলে হাওয়াই মিঠাই-এর কাছে এসে দাঁড়ায়। একশ টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলে,

“মামা, হাওয়াই মিঠাই দিন দ্রুত।”

“কয়টা দেবো, মামা?”

“যে কটা পাওয়া যাবে দিয়ে দিন।”

লোকটা পাঁচটা হাওয়াই মিঠাই শ্রবণের দিকে এগিয়ে দেয়। শ্রবণ হাওয়াই মিঠাই হাতে নিয়ে দ্রুত পায়ে সোহার কাছে ফিরে আসে। চারটা বেঞ্চের ওপর রেখে একটা খুলে অর্ধেক টুকু দলা বানিয়ে সোহার মুখে পুরে দেয়।
মিষ্টি কিছু মুখে নিলেও সোহার ঝাল কমছে না। হাওয়াই মিঠাই গিলে হা করে রইল। চোখজোড়া হতে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে ঝালের চোটে। শ্রবণ ঝুঁকে সোহার মুখের ভেতর ফুঁ দেয়, এবার একটু আরাম পায় সোহা। ফুঁ দেওয়ায় মুখের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। আরো বেশ কয়েকবার ফুঁ দিয়ে বলে,

“মুখে পানি নিয়ে বসে থাক।”

“পানি গরম হয়ে যায়। আআআ।”

“আরেক প্লেট নিয়ে আসি বোম্বাই মরিচ দিয়ে?”

সোহা দুদিকে মাথা নেড়ে মুখে পানি নেয়। শ্রবণ ওর পাশে বসতে বসতে বলে,

“পানি একটু গরম হলেই ফেলে দিয়ে আবার নে।”

সোহা মুখের পানি ফেলে আবার পানি মুখে নেয়। টিস্যু পেপার দিয়ে নাক মুছে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণ সোহার মাথার উপর হাত রেখে বলে,

“কাঁদিস না, বোম্বাই মরিচ ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে জুস বানিয়ে খাওয়াবো রোজ।”

সোহা দুদিকে মাথা নেড়ে মুখের পানি ফেলে দেয় আবার। শ্রবণ হাতে থাকা বাকি হাওয়াই মিঠাই সোহার মুখে পুরে দেয়।
সোহা তিনটা হাওয়াই মিঠাই খেয়ে ফেলেছে। এখন ঝাল কমে গেছে। দুই প্লেট ফুচকা আর পানি খেতে খেতেই পেট ভরিয়ে ফেলেছে, রাতে আর কিছু খেতে হবে না।
শ্রবণের বাহুর সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে আছে এখন। ঝাল কমে গেলেও মাথা ঝিম ঝিম করছে এখনো। ঝাল খাওয়ার ইচ্ছে জন্মের মতো মিটে গেছে। জীবনে আর কোনোদিন এমন ঝাল খাবে না।

“শ্রবণ।”

শ্রবণ আর সোহা দুজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। শ্রবণের বন্ধুরা আর রিতা দাঁড়িয়ে আছে। শ্রবণ মুখ খোলার আগেই সিফাত আফসোসের সুরে হ্যাঁ হুতাশ করে বলে,

“বিয়ে করে দেখছি আমাদের পর করে দিয়েছিস, বন্ধু। আগে যেখানে আমাদের সঙ্গে ঘুরতি এখন সেখানে বউ নিয়ে এসে এখানে বসে জোস্না বিলাস করছিস। এই দুঃখ কই রাখি? আল্লাহ, উঠায় নেও।”

শ্রবণ গম্ভীর গলায় বলে,

“হয়েছিস পুরুষ মানুষ কিন্তু নাটক করিস মহিলা মানুষের মতো। এত নাটক কোথা থেকে আসে?”

“তোর কাছে নাটক মনে হচ্ছে? বহুত কষ্ট পেলাম, বন্ধু। বোতলের পানি টুকু দে, ডুবে ম’রে যাই।”

হাসান বলে,

“নাটকবাজ মহিলা, নাটক বন্ধ কর।”

সিফাত বিস্ফোরিত চোখে হাসানের মুখের দিকে তাকায়। সঙ্গে বাকিরাও ওর দিকে তাকিয়ে আছে বড়ো বড়ো চোখে।
সিফাত আঙুল তুলে বলে,

“অ্যাই, কী বললি তুই? আমি মহিলা? আমাকে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে মহিলা মনে হচ্ছে তোর? আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট একজন সুস্থ সবল পুরুষ মানুষ, আমার টুনটুনি আছে, আমি দাঁড়িয়ে মুততে পারি। তাতেও যদি তোর সন্দেহ থাকে তাহলে দেখাতেও পারি, দেখবি?”

সিফাতের কথা শুনে সোহা বিষম খেয়েছে। শ্রবণ তাড়াহুড়ো করে পানির বোতলের ছিপি খুলছে।
রিতা দম ফাটা হাসিতে ফেটে পড়েছে। বেচারি হাসতে হাসতে দূরে সরে গিয়ে বসে পড়েছে ঘাসের উপর। বাকি পাঁচজন সিফাতের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সিফাত জোর পূর্বক হেসে বলে,

“সব হাসানের দোষ। ও আমাকে মহিলা বলেছে আর আমি উত্তেজনায় ভুলে গেছি এখানে দুজন বউ আছে। অ্যাই, তুই আমাকে মহিলা বললি কেন?”

হাসান গম্ভীর হয়ে বলে,

“মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে তো ভুলে মামাকেও বলে ফেলি। সব দোষ এই নাটকবাজ মহিলার, মাথা খারাপ করে ফেলেছে আমার।”

সোহা এতক্ষণ নিজের হাসি আটকে রাখলেও এবার ফিক করে হেসে ওঠে। শ্রবণের ভয়ে কোনো রকমে হাসি দমানোর চেষ্টা করলেও সফল হয় না।
রাফি অবাক হয়ে বলে,

“ভাই, তুই তোর শ্বশুরকেও মহিলা বলিস?”

“দোষ তো আমার না, দোষ শ্বশুরের মেয়ের।”

রিতা নিজের হাসি থামিয়ে বসে থেকেই বলে,

“অ্যাই ব্রিটিশ পুরুষ, একদম মিথ্যে দোষারোপ করবে না। আমি বলেছি তোমাকে শ্বশুর আর বন্ধুকে মহিলা বলতে?”

“তোর জন্যই তো হচ্ছে এসব। তুই আমার মাথা খারাপ করে ফেলেছিস তাই উল্টাপাল্টা ভুলভাল কথা বেরিয়ে যায় মুখ ফসকে।”

রিতা কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু তার আগেই সাকিব বলে,

“তোদের ঝগড়া তোরা বাড়ি ফিরে সারারাত করিস, এখন এসব থামা। সবাই চল ঝাল মুড়ি খাই।”

শ্রবণ বসে থেকেই বলে,

“তোরা খা, আমি খাব না।”

“কেন, তোর আবার কী হলো? তুই তো ঝাল মুড়ি পছন্দ করিস।”

“এখন খেতে ইচ্ছে করছে না।”

“তুই না খেলি, ভাবীকে নিয়ে আয়; ভাবী খাবে।”

সোহা দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,

“না না না, আমি কিছু খাব না। আপনারা সবাই খান।”

রিতা উঠে এসে সোহার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

“খাবে না কেন? ফুচকা তো তোমার অনেক পছন্দ।”

“আমি অলরেডি দুই প্লেট ফুচকা খেয়ে নিয়েছি, এখন পানি খেতে খেতে পেট ফেটে যাওয়ার দশা।”

“আমরা আসার আগেই একা একা খেয়ে নিলে?”

“আমি তো জানতাম না তোমরা আসবে, জানলে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করতাম।”

হাসান শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তুই না খেলে আমি খাব না।”

রিতা বলে,

“তুমি না খেলে আমিও খাব না।”

সিফাত বলে,

“কী প্রেম একেক জনের। এ না খেলে ও খাবে না, ও না খেলে সে খাবে না। আমাদেরই শুধু পীড়িত দেখানোর মানুষ নেই।”

রাফি শ্রবণের হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করে বলে,

“আয়, ভাই। বেশি না খেলে অল্প খাস, বাকি টুকু আমাকে দিয়ে দিস।”

শ্রবণ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। রাফির হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সোহার হাত ধরে বলে,

“আয়।”

সোহা হাওয়াই মিঠাই দুটো হাতে নিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। রিতা সোহার দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে বলে,

“সোহা, তুমি আজকে মেক্সি পরেছ! আমি তো এতক্ষণ খেয়ালই করিনি, সুন্দর লাগছে তোমাকে।”

রিতার কথায় মৃদু হাসে সোহা। বাকিরা সোহার দিকে তাকায়। শ্রবণ সরু চোখে তাকিয়ে আছে সকলের দিকে। ওর ইচ্ছে করছে সকলের চোখে পট্টি পরিয়ে দিতে নয়তো সোহাকে সকলের চোখের আড়ালে সরিয়ে নিতে।
হাসান শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে সকলের দিকে তাকায়, তাড়া দিয়ে বলে,

“ঝাল মুড়ি খেতে চল এখন।”

সবাই ঘুরে হাঁটা ধরে ঝাল মুড়ির দোকানের দিকে। রিতা হাসানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“আমি ঝাল মুড়ি খাব না, ফুচকা খাব।”

“আচ্ছা।”

সবাই একটু দূরে দাঁড়ায়। হাসান কাছে এগিয়ে এসে বলে,

“মামা, ছয় প্লেট ঝাল মুড়ি আর এক প্লেট ফুচকা দিয়েন। চার প্লেট ঝাল মুড়িতে ঝাল কম বাকি দুই প্লেটে ঝাল বেশি। ফুচকায়ও ঝাল দিয়েন।”

“আচ্ছা, মামা।”

সোহার এক হাত এখনো শ্রবণের হাতের মুঠোয়। সোহা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিতার সঙ্গে কথা বলছে।
সাত/আট মিনিট পর ঝাল মুড়ি আর ফুচকার প্লেট হাতে পায় সবাই। রিতা সোহাকে ফুচকা খেতে বললে সোহা নিষেধ করে দেয়, আর খাবে না।

“আমরা সবাই খাচ্ছি আর তুমি না খেয়ে থাকবে?”

“সমস্যা নেই। আমি তো খেয়েছি, তোমরা খাও।”

সোহার এক হাতে হাওয়াই মিঠাই, অন্য হাতে পানির বোতল। শ্রবণের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
শ্রবণ ঝাল মুড়ি তুলে মুখে নেয়। সবাই খাচ্ছে আর গল্প করছে একে অপরের সঙ্গে।
শ্রবণ সোহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,

“হা কর।”

সোহা মুখ তুলে তাকাতেই কার্ডে ঝাল মুড়ি তুলে মুখের সামনে ধরে বলে,

“হা কর।”

সোহা দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,

“খাব না, তুমি খাও।”

“ঝাল বেশি না, খা।”

“আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।”

“অল্প খা।”

সোহা হা করে, শ্রবণ ঝাল মুড়ি খাইয়ে দেয় ওকে তারপর আবার নিজে খায়। এভাবে শ্রবণ নিজেও খায় সোহাকেও খাওয়ায়। খাওয়ার মাঝে পুরোটা সময় সোহা শ্রবণের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিল। শ্রবণ-ও তাকিয়ে ছিল তবে ওকে বারবার চোখ সরাতে হয়েছে।
সোহা মৃদু স্বরে শ্রবণকে বলে,

“হাওয়াই মিঠাই একটা রিতাকে দেই?”

“দে।”

রিতার পানি পান করা হতেই সোহা একটা হাওয়াই মিঠাই ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,

“এটা তোমার।”

রিতা ঝালে হু হা করতে করতে বলে,

“ধন্যবাদ, সোহা। এখন আমার মিষ্টি কিছুরই প্রয়োজন ছিল। আহ কী ঝাল!”

মৃদু হাসে সোহা।

রাত প্রায় দশটা বাজতে চলল। বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে সোহাকে নিয়ে গাড়ির দিকে আগায় শ্রবণ। বাকিরা যার যার বাইকে চড়ে বসেছে।
শ্রবণ সোহাকে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে উঠে বসে। বাকিরা বাইক নিয়ে ছুটে চলতেই শ্রবণ নিজেও গাড়ি নিয়ে ছুটে চলে ওদের পেছন পেছন।

কিছুটা রাস্তা আসতেই সোহা শ্রবণকে গাড়ি থামাতে বলে। শ্রবণ রাস্তার একপাশে দাঁড় করায় গাড়ি।

“কী হয়েছে?”

“শিমের ভাজা বিচি খাব।”

“কার বিচি?”

সোহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাসতে হাসতে বলে,

“শিমেদের বিচি।”

“এই, এসব কী কথা? অন্যদের বিচি কেন খাবি?”

“খেতে ভালো লাগে।”

“ইন্না লিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ।”

“এমন করছো কেন? এনে দাও না, ওই যে সামনে বিক্রি করছে গরম গরম বিচি।”

“এইসব অন্যের বা/ল-ছাল, বিচি-টিচি কিনতে যেতে পারবো না আমি। দুনিয়ায় এত খাবার থাকতে তোর কেন বিচিই খেতে ইচ্ছে করল?”

“শিমের বিচি ভাজা ভালো লাগে খেতে। আমি আগে খেয়েছি অনেকবার। কিপটামি না করে এনে দাও না?”

শ্রবণ বিস্মিত হয়ে বলে,

“আমি কিপ্টা?”

“কিপ্টা না হলে এই দশ বিশ টাকার বিচি এনে দিচ্ছ না কেন?”

শ্রবণ কটমট করে তাকিয়ে রইল সোহার মুখের দিকে। ওকে বলছে কিপ্টা? ও কিপ্টা? ওকে কিপ্টা মনে হয়? ফোস ফোস করতে করতে বলে,

“ডাইনির বাচ্চা, তুই আমাকে কিপ্টা বললি? গত এক মাসে তোর পেছনে কোটি টাকার বেশি খরচ করেছি আর তুই আমাকে কিপ্টা বলছিস?”

চলবে……….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply