Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩


অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৪৩)

সোফিয়া_সাফা

​“মাস্টার আমি স্পাই নই। বিশ্বাস করুন আমি সেখানে আপনাদের পিছু পিছু যাইনি।” রুমা ফ্লোরে হাঁটু মুড়ে উদ্যানের সামনে হাতজোড় করে আকুতি-মিনতি করছে।

​উদ্যান কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “বিশ্বাস? যেখানে আমি স্বয়ং নিজেকে বিশ্বাস করতে পারি না, সেখানে তোর মতো একটা স্ল্যা’টকে বিশ্বাস করব?”

​লুহান এক কোণে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; তার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। সোহম আর অনিও সেখানে উপস্থিত। সোহম বলল, “তুই এক্সকিউজ একটু কম দিয়ে তাড়াতাড়ি বল কোন কোন তথ্য রিহানের কাছে পাচার করেছিস।”

​রুমা কান্নায় ভেঙে পড়ল। “আমি বলছি তো আমি স্পাই নই। আমি নাদিয়াকে ফলো করতে করতে সেখানে গিয়েছিলাম।”

​অনি খেপে গেল। “নাদিয়াকে কেন ফাঁসাতে চাইছিস? তেহ তোকে সেখানে দেখেছে। নাদিয়াও যদি থাকত তেহ নিশ্চয়ই দেখত ওকে।”

​উদ্যান কোনো এক গভীর ক্ষোভে দগ্ধ হচ্ছিল; রুমার আর্তনাদ তার কানে পৌঁছাল কি না বোঝা গেল না। হঠাৎই সে বাম হাতে থাকা গানটা রিলোড করে রুমার মুখ বরাবর তাক করল। তার রক্তচক্ষুর বিপরীতে রুমা নিজেকে বড্ড অসহায় অনুভব করতে লাগল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে লুহান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।

​“তেহ আগে ওর কথাটা একবার শোন। আমি বুঝতে পারছি তুই অনেক পিসড হয়ে আছিস, কিন্তু নাদিয়ার বিরুদ্ধে আনা ওর অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়।”

উদ্যান তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। কিছু বলতে যাবে তার আগেই লুহান ফের বলল, “তুই নিজের পাওয়ার ব্যবহার করে আমাকে চুপ করিয়ে দিস না, কয়েকদিন সময় দে। রুমা এখানেই বন্দি থাকুক। যদি সব প্রমাণ ওর বিরুদ্ধেই যায় কিংবা আমি ওকে নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারি, তখন নাহয় তুই ওকে মে’রে ফেলিস।”

​লুহানকে যুক্তি উপস্থাপন করা দেখে সোহম অবাক হলো। “প্রমাণ? তেহ ওকে নিজের চোখে দেখেছে, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?”

​লুহান মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ আমি জানি, ওকে মে’রে ফেলার জন্য এই একটা প্রমাণই যথেষ্ট। তবুও এটা ভুলে গেলে চলবে না তেহুর সন্দেহের তালিকায় নাদিয়াও ছিল।”

​অনি ভাবল এভাবেই লুহান কথা বলতে থাকলে উদ্যান রিদমের মতো লুহানের ওপরেও চটে যাবে, তাই সে বলল, “তুই চুপ থাক, আমি আর সোহম তেহুর পক্ষে; ও যা বলবে তাই হবে। তুই একটাও বাড়তি কথা বলবি না।”

​সোহম সায় দিল, “হ্যাঁ তুই ওকে শ্যুট করে দে তেহ।”

​রুমা আঁতকে উঠল। অশ্রুসিক্ত নয়নে একবার সবার দিকে তাকিয়ে লুহানের দিকে তাকাল। লুহান তার আরজি অনুমান করতে পারলেও নিশ্চুপ হয়ে গেল।

উদ্যান চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করল। গান নামিয়ে লুহানের উদ্দেশ্যে বলল, “আমি তোকে তিন দিন সময় দিলাম লুহান।”

​উদ্যান আর দাঁড়াল না। উল্টো ঘুরে পানিশমেন্ট রুম ত্যাগ করল।
​তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে পরিবেশ হালকা হলো। এতক্ষণ যাবত চেপে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়ল লুহান। রুমা তখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

​উদ্যানের প্রস্থানের পরপরই অনি আর সোহমও পা বাড়াল বাইরের দিকে। তাদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই লুহান গলা খাঁকারি দিল। ধীরস্বরে বলল, “আমাদের হাতে বেশি সময় নেই, সেদিন কী হয়েছিল বলো আমাকে।”

​রুমা হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে হাঁটু আঁকড়ে ধরে বসল। “আপনি কেন আমাকে সাহায্য করতে চান লুহান স্যার?”

​লুহান চেয়ারে বসতে বসতে উদাস গলায় বলল, “আমি একা চাইলে সম্ভব হতো না। তেহ নিজেও সুযোগ করে দিয়েছে।”

​“আপনি এড়িয়ে গেলেন লুহান স্যার, আপনি না আটকালে মাস্টার আমাকে মে’রে ফেলতেন।”

​লুহান বিরক্তিসূচক শব্দ উচ্চারণ করল, “অপ্রাসঙ্গিক কথা বলার সময় নেই এখন। আমাদের হাতে সময় খুব কম।”

​রুমা আবারও তাকাল তার দিকে। লুহান দৃষ্টি ফ্লোরে নিক্ষেপ করে কিছুটা কঠোর স্বরে বলল, “তুমি একটু বেশিই আশা করছ। আমার জাস্ট মনে হচ্ছে তুমি এমন কিছু করতে পারো না, সেই জন্যই তোমার পক্ষ নিয়েছি।”

​“আপনার কি তাহলে মনে হয় নাদিয়া এমন কিছু করতে পারে?”

​“হ্যাঁ আশঙ্কা আছে, কারণ খুব স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ও রিহানের পার্সোনাল মেইড ছিল।”

​রুমার বুকের ভেতর যে আশার প্রদীপটুকু জ্বলছিল, লুহানের হিমশীতল যুক্তিতে তা নিভে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য চোখে তাকাল।

​“সময় নষ্ট না করে বলো, সেদিন কী হয়েছিল।” লুহান তাগাদা দিল।

​রুমা বলতে শুরু করল, “সেই রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখি নাদিয়া পাশে নেই। ওয়াশরুমের দরজা খোলা থাকায় বুঝতে পারি ও রুমের কোথাও নেই। ওকে খুঁজতে খুঁজতে আমি রুমের বাইরে বেরোতেই দেখতে পাই ও চুপিচুপি কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমার একটু সন্দেহ হয়েছিল সেই জন্যই ওর পিছু নিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই আমি বুঝতে পারি নাদিয়া মাস্টার আর মিস্ট্রেসাকে ফলো করছে। ট্রি হাউসের সামনে আসার পর মিস্ট্রেসা বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই নাদিয়া উধাও হয়ে যায়। আমি আর খুঁজে পাই না ওকে। ভাগ্যিস পথিমধ্যে আমি চিহ্ন রেখে এসেছিলাম, নইলে আমি হয়তো আর এস্টেটে ফিরেই যেতে পারতাম না।”

​লুহান মন দিয়ে সব কথা শুনে বলল, “এই ব্যাপারে আমাদের কাউকে বলোনি কেন?”

​রুমা শুকনো ঢোক গিলল। মানসপটে ভেসে উঠল সেই রাতের চিত্র। রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “আমি ফিরে এসে নাদিয়াকে রুমে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিলাম। ও এমনভাবে শুয়ে ছিল যেন দিন-দুনিয়া সম্পর্কে কিছুই জানে না। আমি ভেজা কাপড় চেঞ্জ করে আসতেই ও চোখ মেলে তাকায়। আমাকে ভয় দেখিয়ে প্রশ্ন করে, ‘এত রাতে তুই কোথায় গিয়েছিলি রুমা?’ আমি থতমত খেয়ে যাই। কিছুই বলে উঠতে পারি না। নাদিয়াও আর কোনো প্রশ্ন করে না। তারপর আপনারাও মিস্ট্রেসাকে খোঁজার মিশনে বেরিয়ে গেলেন। যার কারণে নাদিয়ার ব্যাপারে বলার সুযোগ পাইনি। মিথ্যা বলব না, আমি বিষয়টা নিয়ে আতঙ্কেও ছিলাম। মনে হচ্ছিল, ওর বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে উল্টো আমি নিজেই ফেঁসে যাব। আর দেখুন তাই হলো, সবসময় আমার সাথেই কেন এমন হয় লুহান স্যার? বলতে পারেন, কেন কিছু না করেও আমার জীবনটাই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে?”

​রুমা ফের হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে লুহান বলল, “আমি যেভাবেই হোক সত্যিটা সামনে আনব, তার বিনিময়ে তোমাকে একটা কথা দিতে হবে।”

​রুমা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল। লুহান বলল, “তোমাকে কথা দিতে হবে যে, তুমি চলে যাবে এখান থেকে। আর কখনো নিজের দুর্ভাগ্যের জন্য আমাকে দোষারোপ করবে না।”

​রুমার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। উপলব্ধি করতে পারল লুহানের মনের কোথাও তার জন্য একটুও অনুভূতি নেই, একটুও না। সে ক্ষীণ স্বরে বলল, “চলে যাব! হ্যাঁ, আর কখনো মুখোমুখি হব না আপনার। দোষারোপও করব না আপনাকে, শুধু মিথ্যা অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে ম’রতে চাই না আমি।”

​লুহান আর দাঁড়াল না। দরজার দিকে এগোতে এগোতে বিড়বিড়িয়ে বলল, “আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। আর হ্যাঁ, থাকা-পড়া নিয়ে চিন্তা করবে না। সেসবের ব্যবস্থাও আমি করে দেব।”

​রুমা মিছেমিছি হাসল। একধ্যানে তাকিয়ে রইল লুহানের মিলিয়ে যাওয়া ছায়ার দিকে।


​ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অন্যমনস্কভাবে হাতে ক্রিম মাখছিল ফুল। তার দৃষ্টি আয়নার ওপর স্থির থাকলেও মনটা বিচরণ করছিল ভাবনার কোনো এক গহীন জগতে। কী যে এত ভাবছে, তা শুধু সেই জানে। হঠাৎ দরজা খোলার খচ শব্দে চমকে পেছনে ফিরতেই দেখল, উদ্যান দাঁড়িয়ে আছে।

​ফুল বসা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। উদ্যানকে নিজের দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে আসতে দেখে সে এক অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভব করল। সরে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো; উদ্যান দুই হাত দিয়ে তাকে ড্রেসিং টেবিলের সাথে একপ্রকার অবরুদ্ধ করে ফেলল।

​“কী… কী করছেন?” ফুল অস্ফুটস্বরে আওড়াল।
​উদ্যান ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করল, “রোমান্স।”

​ফুল কিছু বলার জন্য মুখ খুললেই উদ্যান হামলে পড়ল তার ঠোঁটের ওপর। অতর্কিত হামলায় ফুল বিস্মিত হয়ে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে একপাশে ঢলে পড়তে চাইলে উদ্যান চুম্বনের মাঝেই তাকে তুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। সেই ধাক্কায় টেবিলের ওপর থাকা প্রসাধন সামগ্রীগুলো ঝনঝন শব্দে মেঝেতে ছিটকে পড়ল।

​ফুল বুঝতে পারল না উদ্যান তার ওপর কিসের ক্ষোভ ঝাড়ছে। স্রেফ বুঝতে পারল; এটাকে রোমান্স নয়, টর্চার করা বলে। ফুল উদ্যানকে সরিয়ে দিতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। উদ্যান আরও আক্রোশের সাথে নিজের সবটুকু রাগ উগড়ে দিতে উঠেপড়ে লাগল।

​“আহ্!” অকস্মাৎ কারো চিৎকারে উদ্যানের কাজে বাগড়া পড়ল। সে পাশ ফিরে তাকাতেই উর্বীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। মুহূর্তেই অভিব্যক্তি পাল্টে গেল তার। ফুলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “ওই মেয়েটা এখানে কী করছে?”

​এ সুযোগে ফুল উদ্যানের হাতের নিচ দিয়ে বেরিয়ে এল। ঝাপসা চোখে উদ্যানের দিকে তাকিয়ে নিচের ঠোঁটে হাত ছোঁয়াল। ইতোমধ্যেই ঠোঁট কেটে র’ক্ত বের হয়ে গেছে। ফুলের নাসারন্ধ্র স্ফীত হলো। চড়া গলায় বলল, “এমন করে কেউ চুমু খায়? কী চাইছেনটা কী আপনি?”

​উদ্যান দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “আমি উত্তর পাইনি, পেটাল। ওই মেয়েটা এখানে কেন?”

​ফুল নাক টেনে ঠোঁট মুছতে লাগল। মৃদু স্বরে বলল, “এ বাড়িতে আমাকে ছাড়া উনি আর কাউকে চেনেন না। একা একা থাকাটাও তার জন্য সেফ নয়।”

​উদ্যানের চোয়াল শক্ত হলো। “কেন, রিদম ওকে নিজের রুমে রাখতে পারেনি? যদি প্রয়োজনই না হয় তাহলে এস্টেটে এনেছে কেন?”

​“কী বললেন আপনি? রিদম স্যার ওনাকে কোন যুক্তিতে নিজের রুমে রাখবেন?”

​তর্জনী আঙুল দিয়ে কপাল আর ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে উদ্যান বলল, “আমি বলতে চেয়েছি ওর বাপ-মা কেউ নেই? মেয়েটা রিদমের পরিচিত না হলে সেখানে রেখে আসলেই পারত।”

​ফুল উর্বীর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই উর্বী ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে ফুলের বাহু শক্ত করে চেপে ধরল।

​“সেটা আপনিই গিয়ে বরং জিজ্ঞেস করুন। আমারও মনে হয় তাকে তার বাড়িতে রেখে আসাই ঠিক হবে। মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে তার বাবা-মাও হয়তো অনেক চিন্তায় আছেন।”

​উদ্যান বিনাবাক্যে চলে যেতে নিলে ফুল উর্বীর হাত সরিয়ে দিয়ে তার পথরোধ করল। “আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে।”

​উদ্যান ঘাড় কাত করে ফুলের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। ফুল হড়বড়িয়ে গেল। উদ্যান তার মুখের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আগে ওই মেয়েটার ব্যবস্থা করি, তারপর তোমার কথা শুনব কেমন? ওই মেয়ের উপস্থিতি বিরক্ত করছে আমায়।”

​উদ্যান তাকে সরিয়ে দিয়ে চলে যেতে চাইলে ফুল বলে ওঠে, “রিদম স্যারের কাছে যাচ্ছেন?”

​উদ্যান পিছু না ফিরেই বলল, “সোহম রেখে আসবে ওকে। রিদমের প্রয়োজন পড়বে না।”

​উদ্যান ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই উর্বী ছুটে এল। সে আচমকা ফুলের গালে দুহাত রেখে অস্থির হয়ে প্রশ্ন করল, “তোমাকে উনি ব্যথা দিয়েছেন, তাই না?”

​ফুলের গাল গরম হয়ে উঠল। চোখ নামিয়ে বলল, “হ্যাঁ খুব ব্যথা দিয়েছেন।”

​উর্বীর অস্থিরতা বেড়ে গেল। “হ্যাঁ আমাকেও সেই লোকগুলো ব্যথা দিত খুব। তুমি আর ওনার কাছে যাবে না কেমন?”

​ফুল হতচকিত নয়নে তাকাল। তড়িঘড়ি করে বলল, “না তেমনটা নয়। আসলে উনি জেনে গেছেন, আমি ভালোবাসি ওনাকে। এটা জেনে যাওয়ার পর, ওনাকে আটকানো সহজ কথা নয়। সর্বোপরি উনি আমার স্বামী হন, অধিকার আছে আমার ওপর।”

​ফুলের মুখে ‘স্বামী’ শব্দটা শোনামাত্র উর্বী হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরল। তার চেহারায় এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠল। বিড়বিড়িয়ে বলল, “আমারও স্বামী ছিল, কই সে তো ব্যথা দেয়নি আমাকে। ওই লোকগুলো তো আমার স্বামী ছিল না, তাও কেন ব্যথা দিল?”

​উর্বীর অস্বাভাবিক আচরণ দেখে ফুল ঘাবড়ে গেল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে উর্বীর কাঁধে হাত রাখল। তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, “ম্যাম, আপনি এসব কথা বাদ দিন। আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন, ঘুমাতে চলুন।”

​ফুল কোনোমতে উর্বীকে আবারও পাশের সুইং বেডওয়ালা রুমটার দিকে নিয়ে গেল।


​“রিদমের থেকে মেয়েটার বাড়ির অ্যাড্রেস কালেক্ট করে মেয়েটাকে রেখে আয়।” উদ্যানের কথাগুলো শুনে সোহম বিছানা থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল।

​“আরে কী হয়েছে? ভেতরে এসে বল।”

​উদ্যান গটগট করে ভেতরে ঢুকে সোহমের বিছানার একপাশে ধপ করে বসে পড়ল। তার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। “যা বললাম তাই কর।”

​এমন কথার সারাংশ বুঝতে পারল না সোহম। হাসার চেষ্টা করে বলল, “মেয়েটা একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর, রিহান ওর সাথে যা করেছে তা তোর অজানা নয়। এই অবস্থায় বাড়িতে রেখে আসা সেফ হবে?”

​উদ্যান গম্ভীর গলায় বলল, “হ্যাঁ, কিন্তু এটা কি আর পেটালকে বলতে পারব? ও তো বলবে পুলিশ কেস হলে হোক, তাতে আমাদের সমস্যা কী। আমরা তো কিছুই করিনি, যা করার রিহান করেছে।”

​“হ্যাঁ তা তো ঠিকই, রিহান খুব খারাপ করেছে মেয়েটার সাথে; কিন্তু ভেবে দেখ মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পেছনে রিহানের উদ্দেশ্য ঠিক কী ছিল।”

​উদ্যান নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “রিদমের সাথে মেয়েটার সম্পর্ক আছে সেটা বুঝতে পারছি; কিন্তু মেয়েটাকে পেটালের রুমে রাখাটা পছন্দ হয়নি আমার।”

​“এখানে রিদমের দোষ নেই, ও মেয়েটাকে নিজের কাছেই রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু মাঝখান থেকে ফুল নিয়ে গেছে মেয়েটাকে। আমরাও কিছু বলতে পারিনি।”

​উদ্যান সোহমের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আমি কিছু শুনতে চাই না। মেয়েটাকে রিদম নিজের কাছে রাখতে না চাইলে মে’রে ফেলব।”

​সোহম বেডসাইড থেকে ফোন তুলে নিল। “আমি রিদমকে জিজ্ঞেস করে দেখছি।”


​উর্বীকে ঘুম পাড়িয়ে রুম থেকে বেরোতেই ফুলের দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। ফুল দুপা এগোতেই দরজা ঠেলে মেলো উঁকি মারে, “ভেতরে ঢুকব?”

​ফুল তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ে। মেলো ভেতরে ঢুকেই সরাসরি জিজ্ঞেস করে, “উর্বী কোথায়?”

​ফুল হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিতেই মেলো হনহনিয়ে চলে যায় সেদিকে। ফুলও তাকে অনুসরণ করে। মেলো উর্বীর হাত ধরে টেনে ওঠাতে গেলে ফুল বলে ওঠে, “আহা! ওনার ঘুম ভাঙাচ্ছেন কেন?”

​মেলো বরাবরের মতো নিরাসক্ত কণ্ঠে বলল, “ওকে ওর বাবা-মায়ের কাছে রেখে আসব, তাই নিয়ে যাচ্ছি।”

​ফুল হতভম্ব হয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। “এত রাতে?”

​“হ্যাঁ কেন, তুমি চাও না ও নিজের বাড়িতে ফিরে যাক?”

​ফুল হালকা হেসে বলল, “হ্যাঁ চাই তো। কিন্তু সকালে নিয়ে যাওয়া যেত না?”

​মেলো একটু তেতো গলায় বলল, “তোমার হাজব্যান্ডের তর সইছে না। সে একান্তে তোমার সাথে সময় কাটাতে চাইছে। উর্বী এখানে থাকলে তার সমস্যা হবে।”

​ফুল চোখ বড় বড় করে তাকাল। “এগুলো কোন ধরনের কথাবার্তা? মাস্টার আপনাকে বলেছেন এসব?”

​“উঁহু বলেনি, না বললেও বুঝি আমি। অনেক বছর ধরে একসাথে আছি তো তাই।”

​ফুল স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আলতো পায়ে মেলোর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। খুব সংকোচ নিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে বলুন না, উনি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন তো?”

​মেলো অনুভূতিশূন্য চোখে তাকাল। “ও যখন বলেছে ভালোবাসে, তখন ভালোবাসে এটাই মেনে নাও।”

​“আপনি হ্যাঁ বা না-এর মাধ্যমেই উত্তর দিতে পারতেন।”

​মেলো উত্তর দেওয়ার আগেই উর্বীর ঘুম ছুটে গেল। মেলোকে দেখে ছিটকে দূরে সরে যেতে চাইলে ফুল আশ্বস্ত করে বলল, “ভয় পাবেন না, উনি মেলো ম্যাম। আপনার ক্ষতি করবেন না। উল্টো আপনাকে উনি বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। আপনি যেতে চান না বাবা-মায়ের কাছে?”

​উর্বীকে না-সূচক মাথা নাড়তে দেখে মেলো আর ফুল দুজনেই বিমূঢ় হলো। ফুল জিজ্ঞেস করল, “কেন যেতে চান না?”

​উর্বী ম্লান হাসল, “ওনারা আমাকে পছন্দ করেন না। ভাবেন আমি অপয়া, সেই জন্যই আমার স্বামী ছেড়ে দিয়েছে আমায়। আর সত্যি বলতে আমারও এখন তাই মনে হয়।”

​উর্বীর কথা শুনে ফুল আর মেলো বুঝতে পারল উর্বী স্বাভাবিক হচ্ছে। একই সাথে তার কথা শুনে খারাপ লাগল ফুলের।

​“তুমি এখানে থাকতে পারবে না, চলো আমার সাথে।” মেলো একপ্রকার টেনেই নামাল তাকে।

​উর্বী হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, “আমি যাব না, ফুলের সাথেই থাকব। ছেড়ে দাও আমাকে।”

​ফুলের অনেক খারাপ লাগল উর্বীর জন্য। দরজার অভিমুখে আসতেই ফুল মেলোকে আটকানোর প্রয়াস করল। “মেলো ম্যাম ছেড়ে দিন, আমি বুঝিয়ে শুনিয়ে ওনাকে বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাজি করাব। তারপর নাহয় আপনি কাল ওনাকে দিয়ে আসবেন।”

​মেলো মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ঐদিকে তোমার হাজব্যান্ড অধৈর্য হয়ে পড়েছে। আর এদিকে তুমি ওকে রেখে দিতে চাইছো? হাহ! উর্বী এখানে থাকলে মে’রে ফেলবে ওকে।”

​ফুলের মেজাজ খারাপ হলো। “ওনাকে আমি দেখে নেব। আপনি ছেড়ে দিন উর্বী ম্যামকে।”

​মেলো শুনল না। উর্বীকে নিয়ে রিদমের দরজার সামনে আসতেই থেমে দাঁড়াল। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল, “ফুল তুমি পিছু পিছু আসছো কেন? নিজের রুমে যাও।”

​ফুলের একটু খটকা লাগল। সে বলল, “আমি উর্বী ম্যামকে বাড়ির বাইরে পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসব।”

​মেলোর আর কিছুই করার রইল না। সে রিদমের রুমের দরজা ঠেলে উর্বীকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। ফুল বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। ঘটনার আকস্মিকতায় তার চিন্তাভাবনা অবিন্যস্ত হয়ে পড়ল।
​“এটা কী করলেন আপনি? উর্বী ম্যামকে রিদম স্যারের রুমে কেন ঢুকিয়ে দিলেন?”

​মেলো নিজের রুমের দিকে হাঁটা ধরে বলল, “আমি উর্বীর বাড়ির ঠিকানা জানি না; রিদম আর উর্বী একে অপরের বন্ধু, তাই রিদমই পৌঁছে দেবে ওকে।”

​ফুল মেলোর পিছু পিছু গেল ঠিকই কিন্তু আর কিছু জানতে পারল না। রিদম উর্বীর বন্ধু হয় জেনে ফুলের অদ্ভুত লাগল। বন্ধু হলেও বা কী? রিদম লোকটা সুবিধাজনক নয়। ফুল কীভাবে উর্বীকে এমন একটা লোকের সাথে এক রুমে ফেলে রেখে চলে যাবে?
​ফুল ঘুরে এসে রিদমের দরজায় নক করতে লাগল। কয়েকবার নক করার পর একজন মহিলা দরজা খুলে দিল। মহিলাটাকে দেখে ফুল হোঁচট খেল। সে চেনে তাকে, ইনি একজন ডাক্তার।

​“জি মিস্ট্রেসা কিছু বলবেন?” ডাক্তারের প্রশ্নে ফুলের ভাবনার তরী ঘাটে ভিড়ল।

​“হ্যাঁ, উর্বী ম্যাম ভেতরে আছেন?”

​ডাক্তার সরে যেতেই ফুল দেখল উর্বীকে বিছানায় শুইয়ে হাতে একটা ইনজেকশন পুশ করা হচ্ছে। হয়তো ইনজেকশনের প্রভাবেই উর্বী ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ছে। ফুল আলতো পায়ে ভেতরে ঢুকল। রুমে ৩-৪ জন মেইড উর্বীকে ঘিরে বসে আছে। ফুল আশেপাশে চোখ বুলাল কিন্তু রিদম নজরে এল না।

​তখনই ফুল হাতে হ্যাঁচকা টান অনুভব করল। উদ্যান তাকে টেনে রুমের বাইরে এনে বলল, “ওই মেয়ের চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। চলো, রুমে চলো।”

​ফুল হাত সরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু উদ্যানের সাথে পেরে উঠল না। উদ্যান তাকে টেনে রুমে নিয়ে এল। বিছানায় ছুড়ে মেরে দরজা লাগিয়ে দিল। উদ্যানকে এগিয়ে আসতে দেখে ফুল শুকনো ঢোক গিলল। প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল, “রিদম স্যারের রুমে উর্বী ম্যামকে রেখে আসা কতটুকু যৌক্তিক বলে মনে করেন? আপনি না বললেন সোহম স্যার ওনাকে ওনার বাড়িতে রেখে আসবে?”

​উদ্যান বিছানায় হাত রেখে ধীরে ধীরে উঠে বসল। ফুল পিছিয়ে যেতে লাগল। উদ্যান মোহাচ্ছন্ন কণ্ঠে বলল, “সোহম ওর বাড়ির ঠিকানা জানে না। রিদমও এস্টেটে নেই; বললাম তো তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। সবচেয়ে বড় ফ্যাক্ট, মেয়েটা রিদমের গার্লফ্রেন্ড।”

​ফুল তব্দা খেয়ে চেয়ে রইল। “আপনি কী যা-তা বলছেন? উনি কখনোই রিদম স্যারের মতো লোকের গার্লফ্রেন্ড হতে পারেন না।”

​উদ্যান ঠোঁটের কোণ প্রসারিত করে বলল, “গার্লফ্রেন্ডের মানে মেয়ে বন্ধু বোঝাতে চেয়েছি; বাংলায় কী বলে একে—বান্ধবী, রাইট?”

​ফুল পিছোতে পিছোতে খাটের কিনারায় চলে গেলে উদ্যান তার পা ধরে টান দেয়। ঠাস করে খাটের ওপর শুয়ে পড়ে ফুল। উদ্যানকে আটকানোর চেষ্টায় বলে ওঠে, “আকসারাও আপনার গার্লফ্রেন্ড, তাই না?”

​উদ্যানের চাহনি স্থির হলো ফুলের ওপর। আকসারার কথা এই মুহূর্তে হয়তো আশা করেনি সে।

“প্রসঙ্গবহির্ভূত কথা বলবে না। আমি আগেই ওর সাথে নিজের সম্পর্কের কথা ক্লিয়ার করেছি।”

​ফুল ভয়ে ভয়ে বলল, “মিথ্যা বলেছেন, আপনি আসলে বন্ধুত্বের মতো সম্পর্কগুলোকে সহ্য করতে পারেন না।”

​উদ্যান ফুলের ওপর থেকে সরে গিয়ে সোজা হয়ে বসল। দৃষ্টি একদিকে নিক্ষেপ করে বলল, “হ্যাঁ ঠিক বলেছ, আমার সাথে যায় না এসব। আকসারাকে বন্ধু বলার কারণ হলো; তুমি যাতে ওকে আর আমাকে নিয়ে উল্টোপাল্টা চিন্তা না করো।”

​ফুল ছাড়া পেয়ে ওড়না ঠিকঠাক করতে করতে উঠে বসল। “এত শত অজুহাত না দিয়ে সত্যিটা বলে দিলেই পারেন।”

​উদ্যান অকস্মাৎ ফুলের হাত চেপে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। ফুল অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। উদ্যানের কোলে বসে কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে তার। উদ্যানের সাথে চোখাচোখি হতেই ফুল মাথা নিচু করে নিল। মিনমিনিয়ে বলল, “আপনি বলেছিলেন, ভালোবাসি বলে দিলেই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেবেন।”

​উদ্যান তার থুতনি উঁচু করে ধরে বলল, “অফারটা সীমিত সময়ের জন্য ছিল। তখন ভালোবাসি বলে দিলেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতে।”

​ফুলের শরীর কাঁপতে লাগল। “আপনি খুব চতুর লোক, ঠিক নিজের ক্ষমতার জোরে কাজ হাসিল করে নেন।”

​উদ্যান বৃদ্ধাঙ্গুলে ফুলের ঠোঁটে স্লাইড করতে লাগল। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল ফুল। “ব্যথা পাচ্ছি।”

​উদ্যান গভীর গলায় বলল, “বিয়ের কয় মাস হলো পেটাল?”

​ফুল ব্যথাতুর কণ্ঠে বলল, “প্রায় সাড়ে নয় মাস।”

​“এখনো কাছে যেতে নিষেধ করছ?”

​“নিষেধ করলেই শুনবেন আপনি?”

​উদ্যান ধৈর্যহারা হয়ে আওড়াল, “নিষেধ কেন করবে, হ্যাঁ? ভালোবাসো না আমায়?”

​ফুল ঠোঁট চেপে বলল, “কাছে আসতে দেওয়ার মধ্য দিয়েই কি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হবে?”

​উদ্যান কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে রইল ফুলের লজ্জামাখা মুখখানার দিকে। “আগেও বলেছি পেটাল, ভালোবাসা প্রমাণ করার জিনিস নয়। খুব কাছে গিয়ে অনুভব করে নিতে দাও।”

​ফুল চোখ তুলে উদ্যানের চোখের দিকে তাকাল, “কাছাকাছি গিয়েই ভালোবাসা অনুভব করতে হয় বুঝি?”

​“হ্যাঁ, আমি তোমার কাছাকাছি গিয়েই ভালোবাসা অনুভব করে নেব।”

​“এর মধ্য দিয়ে কি আমিও আপনার ভালোবাসা অনুভব করতে পারব?”

​উদ্যান একদৃষ্টে ফুলের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটজোড়া তার রুক্ষতার চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে। সে উত্তর না দিয়েই ফুলের ঠোঁটে ঠোঁট দাবিয়ে দিল। ফুল একহাতে খামচে ধরল উদ্যানের শার্টের বুকের অংশ। চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা শীতল অশ্রুকণা; সে কেন উদ্যানের গভীর স্পর্শে কামুকতা ছাড়া আর কিছুই অনুভব করতে পারে না? এটা কি তারই ব্যর্থতা? হবে হয়তো!

​উদ্যান ক্রমশই সীমানা পেরিয়ে ফুলের শরীরে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। ফুল প্রথমে সহ্য করে নিতে চাইলেও সহ্য করতে পারল না। সুদীর্ঘ চুম্বনের পর উদ্যান তার ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে গলায় ঠোঁট ছোঁয়াতেই ফুল হাঁসফাঁস করে উঠল, “আমি সহ্য করতে পারছি না।”

​উদ্যান তাকে শুইয়ে দিয়ে ঘর কাঁপিয়ে আদেশ দিল, “অ্যালেক্স, টার্ন অফ দ্য লাইটস!”

​সঙ্গে সঙ্গে পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। উদ্যান এক হাতে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে আরেক হাতে ফুলের ওড়না সরিয়ে দিল। হাস্কিটোনে বলল, “ইউ উইল এনজয় ইট, ডোন্ট ওয়ারি!”

​ফুলের শরীর শিউরে উঠল। তার মাঝে উদ্যানকে বাধা দেওয়ার মতো শক্তি নেই। প্রচণ্ড মানসিক চাপে তার মাথাব্যথা যেন কয়েকশো গুণ বেড়ে গেছে। উদ্যান শার্টের বোতাম আলগা করে ফুলের ঘাড়ে চুমু খেতে খেতে উপলব্ধি করল ফুলের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। সে মুখ তুলে ফুলের মুখাবয়বে চোখ রাখল। মেয়েটা মাথাব্যথায় গোঙাচ্ছে শুধু।

​উদ্যান নিরাবেগ কণ্ঠে বলল, “তুমি কি থেমে যেতে বলছ?”

​ফুল ভাঙা গলায় বলল, “থেমে যেতে বলার সাহস নেই।”

​“অ্যালেক্স, টার্ন অন দ্য লাইটস।” উদ্যানের আদেশে রুম পুনরায় আলোকিত হয়ে উঠল।

​“জোর করে কিছু করার ইচ্ছা থাকলে আরও আগেই করে ফেলতাম।”

​উদ্যান শার্টের বোতামগুলো লাগিয়ে উঠে চলে যেতে চাইলে ফুল তার হাত ধরে ফেলে। উদ্যান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ফুল কান্না চেপে বলে, “আপনি বলেছিলেন ট্যুর থেকে ফিরে এসে আমাকে খানজাদা নিবাসে নিয়ে যাবেন।”

​উদ্যান ফুলের হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিল। “কখন কোন কথা বলতে হয় তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই তোমার! ইউ আর কেয়ারলেস।”

​“আমি কেয়ারলেস হতে পারছি না; আবেশ ভাই আমার জন্য কান্নাকাটি করছে। আমি এখনো তাকে সত্যিটা বলতে পারিনি। হয়তো তার ভালোবাসাই আপনার আর আমার মাঝে দেয়াল তুলে রেখেছে।”

​উদ্যানের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। সে ঘুরে এসে ফুলের হাত মুচড়ে ধরে বলল, “এই দেয়াল ভেঙে ফেলতে আমার দু সেকেন্ডও লাগবে না পেটাল।”

​ফুল ছলছল চোখে তাকাল। “জোর করে ভেঙে ফেলুন তবে।”

উদ্যান নিরুত্তর রইল। ফুল প্রায় ফিসফিসিয়ে বলল, “সেটা করতে না চাইলে আমাকে নিজ হাতে এই দেয়াল ভাঙতে দিন। যেতে দিন আমাকে; এই দেয়াল ভাঙা বাঞ্ছনীয় হয়ে উঠেছে।”

​উদ্যানের হাতের বাঁধন আলগা হলো। টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পুরোটা পানি খেয়ে নিল। এসির ঠান্ডা বাতাসেও ঘামছে সে। ফুলের পাশে ধপ করে বসে পড়ল উদ্যান। চাপা স্বরে বলল, “সকালে যাচ্ছি আমরা খানজাদা নিবাসে।”

​ফুল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ধীরপায়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেল। বেরিয়ে এসে আর উদ্যানকে দেখতে পেল না। খুব খারাপ লাগল তার, “ক্ষমা করবেন আমায়, ফিরে এসে আমি নিজে আপনার কাছে যাব। তাতে আমার মস্তিষ্ক সায় দিক বা না দিক।”

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৩৩০০+

(১৫ই ফেব্রুয়ারী প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আমার প্রথম ই-বুক #চন্দ্রগ্রহণের_অন্তিমক্ষণ বইটই এর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে; বিস্তারিত জানানো হবে আগামীকাল)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply