প্রণয়ের_রূপকথা (৭০)
কুহু শুয়েছে বিছানায়। দীপ্র এত সময় বারান্দায় ছিল। যাতে মেয়েটির অসুবিধা না হয়। তবে ও এসে দেখল কুহু তখনো ঘুমোয়নি। তাই শুধাল,”ঘুমালি না?”
“ঘুম আসছে না।”
বলে কম্বল টেনে নিল গায়ে। বিড়াল ছানার মতন গুটিশুটি হয়ে,ওভাবেই শুয়ে রইল। দীপ্র এগোল। ফট করেই কপালে হাত ছোঁয়াল। তাপমাত্রা মেপে বলল,”জ্বর তো লাগছে না।”
“হু।”
“খারাপ লাগছে?”
“হু।”
“অনেক?”
“হু।”
ওর ছোট ছোট জবাব। দীপ্র একটু থেমে থেকে বলল,”পাশে বসব?”
কুহু আর পারে না। এই মানুষটা এমন কেন? পাশে বসার অনুমতি চাচ্ছে! ও তাকিয়ে থাকে। জবাব দেয় না। দীপ্র বলে,”আচ্ছা, বসব না।”
“না।”
“কী?”
“বসেন।”
দীপ্র কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে ওর পাশে বসে। কুহুর অস্থিরতা কমার বদলে বাড়ে। ও ছটফট করে। দীপ্র বলে,”কী হলো?”
“মাথা ব্যাথা, মাথা ব্যাথা করছে।”
ইচ্ছে করেই মিথ্যেটা বলল ও। দীপ্র কথা না বাড়িয়ে শক্ত হাত খানা কপালের কাছে রাখল। আদরের স্পর্শ। কুহুর চোখ আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে এল। ধীরে ধীরে কপালে মালিশ করতে শুরু করল দীপ্র। এই পর্যায়ে কুহুর মনে হলো, পৃথিবীর সবটুকু সুখ সৃষ্টিকর্তা যেন ওর নামেই বরাদ্দ করেছেন। রুমে তখনো পুরোপুরি আলো নেই। বারান্দা থেকে যা আলো আসে, তাতে মুখশ্রী আরো মায়াময় লাগে। কুহু মুদিত চোখ খুলতেই দেখতে পায় দীপ্রর মুখখানা। অদ্ভুত সুন্দর দুটি চোখ। সরু নাক। গাল জুড়ে ছোট করে রাখা রোম। আর ঐ ঠোঁট, ঐ ঠোঁট যেন এক বুক তৃষ্ণার কারণ। ওর মন মস্তিষ্ক মিলিত ভাবে আজ অন্য রকম হাওয়া তৈরি করছে। শুকনো ঢোক গিলে ওভাবেই চেয়ে থাকে। দেখতে থাকে গোটা মানুষটাকে। যখন বোধ হয় তখন লজ্জা এসে আটকায়। চোখ নামিয়ে ফেলে দ্রুত। দীপ্র এত সময় ধরে ওর নজর খেয়াল করেছে। তবে মেয়েটিকে বিব্রত করেনি। চোখ নামানোয়,এবার বলল”চোখ সরালি কেন?”
আচমকা প্রশ্ন আসায় কুহু জবাব দিতে পারে না। মিনমিনে সুর তুলতেই দীপ্রর হাত কপাল থেকে গালে এসে থামে। পুরো হাতটাই ওর গালের সাথে মিশে যায়।
“তাকাতে ভয় পাস?”
“পাই না তো।”
ফট করে জবাব দেয় কুহু। ওর এভাবে দেয়া জবাব দেখে দীপ্র ঠোঁট টিপে হাসে। ফের বলে,”তাহলে ভয় না পেলে কী পাস? লজ্জা?”
কুহু আর পারে না। জবাব আসে না ভেতর থেকে। কী বলবে? কীভাবে বলবে? ও চোখ নামিয়েই রাখে। দীপ্র সামান্য ঝুঁকে। নিশ্বাস এসে পড়ে মেয়েটির মুখে। ধীর গলায় দীপ্র বলে,”ভয়, লজ্জা যাই পাস না কেন, আমি কথা দিলাম কিচ্ছু করব না।”
কথা শেষ করে দীপ্র যখনই সরে নিতে যায়, কুহু শোয়া থেকে আধশোয়া হয়ে বলে,”এর আগেও তো কথা রাখেননি।”
থেমে যায় দীপ্র। বুক ভরে সমীরণ টেনে নেয়। বলে,”এবার রাখব।”
“কেন?”
এই এক কেনই যেন দীপ্রর মস্তিষ্ক খুলে দেয়। ও খানিক থেমে থাকে। তারপর পেছন ফেরে। কুহুর নজর উঠানো ছিল। ও ঘুরতেই তা নামিয়ে ফেলল। দীপ্র ঠিক যতপা এগিয়ে গিয়েছিল, এবার ঠিক ততপা পিছিয়ে আসে।
“কুহু।”
মেয়েটি জবাব দেয় না। ওভাবেই আধশোয়া হয়ে রয়। হাত কচলাতে থাকে। চোখ ঘুরায় এদিক সেদিক। দীপ্র ফের বলে,”তুই কি চাচ্ছিস, আমি প্রমিস ব্রেক করি?”
মেয়েটির বুকের ভেতর বিশাল একটা ধাক্কা লাগে। হৃদয়ের গতি বাড়ে। চোখ দুটো হয় অশান্ত। বিপরীতে দীপ্রর চোখ দুটো একদম স্থির। ও দেখছে কুহুর চোখের পাপড়ির নড়ন। ঘনঘন নিশ্বাস নেয়া। শুকনো ঠোঁট বার বার ভেজানোর চেষ্টা। দীপ্র এক পা এগোয়। কুহুর হৃদয় এবার বেরিয়ে আসার উপক্রম। ও স্থির থাকার চেষ্টা করে। তবে পারে না। জায়গাটি থেকে সরে যেতে নিলেই খপ করে দীপ্র ওর হাতটা ধরে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো মুদিত করে ফেলে ও। দীপ্র এক টানে মেয়েটিকে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। একটি হাত ছুঁয়ে যায় কোমর। ইষৎ চাপের সৃজন হয়। পুরুষালি স্পর্শে কুহুর নারী মনও ব্যাকুল হয়ে উঠে। একাধিক অনুভূতিতে ও পারে না কেবল মাটির সাথে মিশে যেত। দীপ্র ফিসফিসিয়ে বলে,”তুই কী চাচ্ছিস জানপাখি? চাচ্ছিস আমি ভালোবাসি? সব ভাবে ভালোবাসব, বাসব সোনা? বল প্লিজ,বল জান। ভালোবাসব?”
বলতে বলতে মেয়েটির কানের কাছে মুখ ঠেকায় দীপ্র। কুহুর মুদিত চোখ খুলে যায়। বুকের ভেতর ঝড় এসে আটকায়। ওর হাত দুটো দীপ্রর বুকের কাছে এসে আটকায়। মেয়েটির কোমরে রাখা দীপ্রর হাত আরো গভীর ভাবে ছুঁয়ে যায়। কুহু খামচে ধরে পোশাকটি। দীপ্রর খোঁচা দাড়ি ওর গলায় এসে লাগে। সুরসুরি লাগতেই মেয়েটি কেঁপে উঠে। দীপ্র ফট করেই চুমু খায় গলায়। একবার, দুবার, তিনবার, অনেকবার। কুহু তখনো অনুমতি দেয়নি। বাঁধাও দেয়নি। দীপ্র বুঝে না কী করবে। ওর মন সুযোগ পেয়েছে। সে তো মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণে নেই। দীপ্র অশান্ত হয়ে যায়। কুহু নিজেও হারিয়ে যায় দীপ্রর মোহে। পুরুষটির হাত তখনো জানান দিচ্ছে নিজের ক্ষমতা। অশান্ত ভাবে কাছে টানছে। সায় দিচ্ছে মেয়েটির শরীরও। অশান্ত দীপ্র, অশান্ত কুহু। দীপ্র ফের গলার কাছে আসে। ঠোঁট ছোঁয়ায়। কম্পিত হয় কুহুর ছোট্ট শরীর। দীপ্র সেই কম্পন বুঝে। ওর বুকেও অস্থিরতা নামে। এবার যখন লাভ বাইট বসাতে যায়, তখন ওর ধ্যান ভাঙে। নিয়ন্ত্রণ ফেরে। ও চোখ মুদিত করে ফেলে। নিজের ভুল বুঝতে পারে। বুঝতে পারে ও কী করতে চলেছিল। এদিকে কুহু অপেক্ষায়। খানিক বাদেও যখন, দীপ্রর ঠোঁটের পরশ আসে না। ছুঁয়ে দেয় না। ও অশান্ত ভাবে চোখ খুলে। কোমর ছেড়ে দেয় দীপ্র। কুহু অবাক চোখে তাকিয়ে রয়। দীপ্র বড়ো করে নিশ্বাস নেয়। বলে,”সরি। আমার বোঝা উচিত, তুই অনুমতি দিচ্ছিস না।”
ওর চোখ বিধ্বস্ত হয়। দু ঠোঁটের মাঝে দূরত্ব আসে। দীপ্র ভাই কেন অবুঝের মতন করছেন? তিনি জানেন না, নীরবতা অনুমতির শামিল? তিনি কি বুঝেন না? নাকি বুঝেও না বোঝার ভান ধরছেন? ওকে কষ্ট দিতে চাচ্ছেন? শোধ নিতে চাচ্ছেন? ভাবতে ভাবতে কুহুর দু চোখে অশ্রু এসে নামে। দীপ্র বুক ভরে দম নেয়। পাশ থেকে উড়না তুলে দিয়ে কুহুর গালে হাত রাখে। দুঃখিত সুরে ফের বলে,”ঘুমা। আমি আর আসব না।”
এইবার কুহু আর পারে না নিয়ন্ত্রণ করতে। কেঁদে ফেলে। তাও শব্দ করে। ওর কান্নার শব্দে দীপ্র ফিরে চায়। আলো-আঁধারে কুহুর চোখের জল মুক্তোর মতন লাগে। দীপ্র ব্যস্ত হয়।
“কুহু, কাঁদছিস তুই? সরি, সরি সোনা। আমি বুঝিনি। আমি ভাবলাম তুই চাচ্ছিস। তাই, তাই এগিয়েছিলাম। আমার বোঝা উচিত ছিল জান। সরি আমি। মাফ করে দে। মাফ করে দে জানপাখি। আমি চলে যাচ্ছি। আর তোকে কষ্ট দেব না। চলে যাচ্ছি আমি। চলে যাচ্ছি।”
দীপ্র সত্যিই চলে যেতে নেয়। কুহু কান্না থামিয়ে বলে,”আপনি নীরবতা বুঝেন না দীপ্র ভাই? সব বুঝেন কিন্তু অনুমতি বুঝেন না? কেন বুঝেন না?”
ফের থেমে যায় দীপ্র। ও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। কুহু নাক ফুলিয়ে বলে,”আপনি আসলেই বোঝেন না, আমি কি চাই।”
দীপ্র সত্যিই বুঝে না। ওভাবেই চেয়ে রয়। কুহু চোখের জল না মুছেই বলে,”আমি চাই ভালোবাসা পেতে। চাই ভালোবাসেন। সব ভাবে ভালোবাসেন। ভালোবাসবেন দীপ্র ভাই?”
এটা কুহু? সত্যিই ও? দীপ্রর বুকের ভেতর ছন্দ তোলে। ও এগিয়ে আসে। দু হাতে মেয়েটির মুখশ্রী তুলে নেয়। ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,”বাসব সোনা। ভালোবাসব তোকে। অনেক বেশি, অনেক বেশি আদর করব জানপাখি।”
বলতে বলতে দীপ্র ওর আরো কাছে আসে। কুহু চোখ নামিয়ে ফেলে। দীপ্রর অধরে মৃদু হাসি এসে আটকায়। দু হাতে মেয়েটির মুখ তোলা ছিল। ও এবার থুতনি ধরে খানিকটা উঁচু করে ধরে। তারপর ঝুঁকে এগোয় গলার কাছে। মেয়েটির নিশ্বাসের গতি বাড়ে। দীপ্র আদর মিশিয়ে বলে,”কুহু, সোনা। আমার জানপাখি।”
কুহু মিশে যায় দীপ্রর বুকে। ওর দু চোখে ভয়। এই ভয় নতুনত্বের। খানিকটা লজ্জাও। সেটা লুকাতে, সয়ে নিতে দু হাতে আকড়ে ধরে নিজের মানুষটাকে। দীপ্র হাসে। ঘাড় থেকে চুল সরিয়ে দেয়। উন্মুক্ত হয় জায়গাটা। দীপ্রর ছোঁয়া গভীর হয়। ও কানের কাছে এসে বলে,”আই প্রমিস দিস ফ্লিটিং আকের উইল ফেইড ইন্টু আ সুইটনেস…. ইউ’ল নেভার ফরগেট….জাস্ট হোল্ড অন টু মি…মাই লাভ। অনেক বেশি ভালোবাসব। অনেক, অনেক আদর করব জান। কথা দিচ্ছি তোকে।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৯