কি_আবেশে (০৯)
জেরিন_আক্তার
মেরাব স্নেহার কাধে হাত রেখে শান্তনা দিয়ে বলে,
‘ কেদো না। কেদে আর কি করবে। যা হয়েছে তা তো আর পাল্টাতে পারবে না। ’
স্নেহা কাদতে কাদতে বলে,
‘ কিন্ত আব্বু এইটা কেনো করলো? ’
‘ তা উনিই ভালো জানেন। ’
‘ আপনি জানেন না। ’
‘ না। আমি শুধু এইটুকুই অব্দি জানি। ’
‘ কেমন করে জানলেন? নাকি আপনি এখনও মিথ্যে বলছেন। ’
‘ তোমাকে এগুলো দেখার পরও মিথ্যে বলছো? ’
স্নেহা মাথা নত করে দুকরে কেঁদে উঠে। কেঁদে কেঁদে বলে,
‘ আম্মু এগুলো শুনলে সত্যি আর বাঁচবে না ।’
বলেই আবারও কাদতে থাকে । মেরাব স্নেহাকে সোজা করে বলে,
‘ চলো ,বইগুলো গুছিয়ে নাও। একটু পরেই বের হবো। ’
স্নেহা ওইভাবেই কাদতে থাকে। মেরাব স্নেহাকে ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে একটু ঝুঁকে বলে,
‘ আমি তো জানতাম তুমি ভেঙে পড়ার মেয়ে নও। এত সহজে ভেঙে পড়ছো। সবে মাত্র একটু জানিয়েছি এতেই যদি এতটা ভেঙে পড়ো তাহলে পুরোটা জানার পরে কি অবস্থা হবে তোমার। ’
স্নেহার কান্না থামিয়ে কিছু বলবে ঠিক তখন ছাদে আসেন নাফিসা বেগম। মেরাব স্নেহাকে আড়াল করে দাড়িয়ে আস্তে করে বলে,
‘ চোখ মুছে স্বাভাবিক হও!’
বলেই মেরাব নাফিসা বেগমের দিকে এগিয়ে বলেন,
‘ ফুপ্পি তুমি এখানে কিছু বলবে?’
‘ তোদের নিচে দেখতে পেলাম না তাই দেখতে এলাম তোরা এখানে নাকি। তোরা গল্প করছিলি নাকি?’
মেরাব হালকা হেসে বলে,
‘ আর বলো না ফুপ্পি তোমার এই মেয়ে কাদছে। আর বলছে তোমাকে ছেড়ে যেতে নাকি কষ্ট হবে। ’
নাফিসা বেগম হেসে এগিয়ে এলেন স্নেহার দিকে। স্নেহা নিজের কান্না আটকাতে পারে না তার মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। নাফিসা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে শুধানো গলায় বলেন,
‘ এইভাবে কাদতে হয়না। প্রত্যেক মেয়েকেই তো তার বাবার ঘরে ছেড়ে চলে যেতে হয়। তোর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। তোকেও যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি। আর ওইটা তো তোর নিজেরই বাড়ি এখন। সবাই আমাদের কাছের লোক। আর মেরাব ওর কথা আর কি বলবো, ও তোকে অনেক ভালো রাখবে মা। তুই কাদিস না। ’
স্নেহা মনে মনে বলে,,,আম্মু তোমাকে যদি বলতে পারতাম আমি কেনো কাদছি তুমি সহ্য করতে পারবে না আম্মু। আব্বু এইরকম একটা কাজ করবে আমার কল্পনাতেই ছিলো না। আব্বু আমাদের সথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এত সুন্দর একটা সংসার থাকতে আব্বু। ছিহ্।
মেরাব গলা খাকারি দিয়ে স্নেহাকে বলে উঠে,
‘ স্নেহা তুমি তোমার বইগুলো গুছিয়ে ফেলো আমরা একটু পরেই বের হয়ে যাবো। ’
নাফিসা বেগম স্নেহাকে ছেড়ে বলেন,
‘ আর কাদিস না মা। চল বইগুলো গুছিয়ে দেই।’
স্নেহা তার মায়ের সাথে নিচে এসে বইগুলো গুছিয়ে গাড়িতে তুলে রাখলো। এর মাঝে আফনান মির্জা আর বাড়ি ফিরেনি। স্নেহাও আর তার বাবাকে খুজেনি বা তার কথা জিজ্ঞাসা করেনি।
সন্ধ্যা ছয়টা,,, মেরাব গাড়ি ড্রাইভ করছে। পাশে স্নেহা বসে আছে। চোখ-মুখ ফোলা ফোলা অনেক কেঁদেছে।এখনও চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। মেরাব একটু পরপর তাকাচ্ছে।
এর মাঝে মেরাবের ফোন বেজে উঠে। আসিফ ফোন দিয়েছে।
‘ হ্যালো! আসিফ বল? ’
‘ ভাই কই তুই? শ্বশুরবাড়ি নাকি এখনও? ’
‘ না,বাড়িতে যাচ্ছি। ’
‘ ওহ। তাহলে উকিলের সাথে দেখা করতে যখন বের হবি তার আধঘন্টা আগে আমাকে টেক্সট নাহয় কল দিস। আমি আব্বুর সাথে একটু কাজে যাচ্ছি। তাই বিষয়টা তোকে জানিয়ে দিলাম। ’
‘ ঠিক আছে। আধঘন্টা আগেই জানাবো। ’
‘ আচ্ছা, রাখছি তাহলে! ’
‘ হুমম ! ’
মেরাব ফোন রেখে স্নেহার দিকে তাকালো। নীরবতা ভেঙে নিজেই বলে উঠে,
‘ তুমি এখনও কাদঁছো? কেদে আর কি করবে। যা হওয়ার তাতো হয়েছেই। ’
স্নেহা নাক টেনে বলে,
‘ এমনটা তো না হলেও পারতো! ’
‘ কিন্ত হয়ে তো গিয়েছে। ’
স্নেহা নিশ্চুপ। মেরাব ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘ আচ্ছা তোমরা কি টের পাওনি এমন কোনো কিছু হবে? একটুর জন্যও কি তার চলাফেরা দেখেও আন্দাজ করতে পারোনি? তাও আবার এতোগুলো বছর । ’
স্নেহা মাথা নত করে বলে,
‘ না। আন্দাজ করতে পারিনি। ’
মেরাব থমথমে মুখে বলে,
‘ স্নেহা এখন যদি তোমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী এসে তোমার মায়ের সংসারে ভাগ বসায় তখন কি তুমি তাকে ছোট মা বা যাই হোক সে তো তোমার মায়ের মত হয়। তাকে কি তুমি মায়ের সমতুল্য কিছু বলে ডাকতে পারবে? ’
স্নেহা চোখ-মুখে কঠোরতা ফুটিয়ে তুলে বলে উঠে,
‘ অসম্ভব! মরে যাবো তবুও অন্য কাউকে মা ডাকবো না। ’
বলেই স্নেহা মেরাবের দিকে তাকায়। মেরাব যেনো এই তাকানোরই অপেক্ষায় ছিলো। সাথে সাথে বাকা হেসে বলে,
‘ এখন তোমার কথার প্রসঙ্গে যদি বলি, তাহলে আমি এই কারণেই আমার খালাকে মা বলিনা। ’
স্নেহা চোখ ছোট ছোট করে বলে,
‘ আমার আর আপনার বিষয়টা তো আলাদা। আপনার মা মারা যাওয়ার পর তো আপনার বাবা বিয়ে করেছে। তাহলে তাকে মা ডাকতে তো সমস্যা থাকার কথা না। ’
মেরাব গম্ভীর গলায় বলে,
‘ আমার মা একজনই ছিলো সে নেই আর কাউকে মা বলতেও ইচ্ছে করে না। ’
স্নেহা মেরাবের কথা শুনে চুপ করে থাকে। আর কিছু বলেনা। এর কিছুক্ষণ পরে মেরাব খান বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামায়।স্নেহাকে নেমে যেতে বলে। স্নেহা নেমে গিয়ে বলে,
‘ আপনি নামবেন না? ’
‘ না,একটা জায়গায় যাবো। ’
‘ এখন আবার কোথায় যাবেন? ’
‘ কাজ আছে। ’
‘ ঠিক আছে যান। ’
‘ আর শোনো, তুমি কিন্তু কাদবে না। আর এগুলোও কাউকে বলার দরকার নেই। ’
স্নেহা মাথা দুদিকে হালকা নাড়িয়ে বলে,
‘ ঠিক আছে। ’
‘ হুম,এখন যাও! আর কিছু লাগলে কল দিও। রিচার্জ করে দিয়েছি। ’
‘ ঠিক আছে। ’
মেরাব চলে যায় গাড়ি নিয়ে। স্নেহা হালকা হেসে উঠলো। মনে মনে বলল,,,লোকটা কে ভেবেছিলাম রাগী হবে,গুরুগম্ভীর হবে। এখন দেখি আমার কেয়ারও করছে।
স্নেহা একা একা বাড়িতে ঢুকলো। সাহারা খান স্নেহাকে দেখে এগিয়ে এসে বলেন,
‘ একি স্নেহা তোমরা চলে এসেছো? ’
‘ হুম। আম্মু থাকতে বললো কিন্তু উনি রইলেন না। ’
‘ ওহ। তো মেরাব কোথায়? ’
‘ উনি আমাকে নামিয়ে দিয়ে অন্য এক জায়গায় যাবেন বলে চলে গেলেন। ’
‘ ওহ। হয়তো কাজে গিয়েছে। যাও তুমি রুমে যাও। ’
‘ ঠিক আছে। আর মা কোথায়? ’
‘ রুমে আছে মনে হয়। ’
রাত দশটা,,,স্নেহা এখনও বসে বসে তার বাবার কথা ভাবছে। এত বড় সত্যিটা আজ মেরাব না বললে অজানাই রয়ে যেতো। স্নেহার ভয় হচ্ছে যদি এই কথাগুলো তার মায়ের কানে যায় তাহলে কি হবে। একটা মানুষ কখনই চাইবে না তার জায়গাটা অন্য কেউ নিয়ে যাক অথবা কখনই চাইবে না তার প্রিয় মানুষটা অন্য কারো হোক। আর বিষয়টা আরও জটিল হয়ে গিয়েছে। তার বাবা বিয়ে করেছে আবার সে ঘরে একটা মেয়েও আছে। এগুলো শোনার পর তার মা নিশ্চই কিছু একটা করে বসবে।
স্নেহার ভাবনার মাঝেই তার ডাক পড়ে যায়। ফাহমিদা খান ডাকছেন। স্নেহা রুম থেকে বের হলো। সামনেই দেখলো তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। ফাহমিদা খান স্নেহাকে দেখে বলেন,
‘ স্নেহা, মেরাব এলে ওকে সাথে নিয়ে খেয়ে নিস। আমি ঘুমাতে গেলাম। আর জেগে থাকতে পারছিনা। ’
‘ ঠিক আছে মা। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। উনি এলে একসাথে খেয়ে নিবো। ’
দুজনের কথা শেষ হওয়ার আগেই মেরাব আসে।দুজনের দিকে একপলক তাকিয়ে নিজের রুমে ঢুকে যায়। ফাহমিদা খান চলে যান। স্নেহা রুমে ঢুকে দেখে মেরাব কিসের যেনো ফাইল দেখছে। স্নেহা বিছানায় বসে বলে,
‘ রাতে খাবেন না? ’
‘ হুম। ’
‘ খাবার বাড়বো? ’
‘ হুম যাও! ’
স্নেহা উঠে চলে যায়। ডাইনিং টেবিলে এসে দেখে সবকিছু এখানেই রাখা আছে। স্নেহা একটা চেয়ারে বসে থাকে। মেরাব এলে শুধু খাবার বেড়ে দিবে।
মেরাব ড্রেস চেঞ্জ করে ফ্রেস হয়ে বের হয়। পোশাক-আশাকের দিক দিয়ে ব্যাড স্নেল বা ঘামের স্মেল পেলেই চেঞ্জ করবে। বলতে গেলে এগুলো নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। তিন বেলাই জামা চেঞ্জ করবে।
দুজনে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রুমে চলে আসে। মেরাব বিছানায় বসে স্নেহাকে বলে,
‘ তুমি কি কালকে থেকে কলেজে যাবে? ’
‘ হুমম। ’
‘ কি পরে যাবে? কলেজ ড্রেস? ’
‘ হুমম। ’
‘ কেনো কলেজ ড্রেসের সাথে ম্যাচ করে বোরখা বানাওনি? ’
‘ বানিয়েছি! ’
‘ তাহলে বোরখা পড়েই যাবে! ’
স্নেহা মেরাবের থেকে কিছুটা দুরুত্ব নিয়ে সামনাসামনি বসে জিজ্ঞাসু কন্ঠে বলে,
‘ আপনি হঠাৎ বোরখা নিয়ে কথা বলছেন কেনো? সারাবছর তো কলেজ ড্রেস পরেই গিয়েছি। এখন আবার বোরখা পড়বো কেনো? ’
মেরাব তপ্ত স্বাস ছেড়ে বলে,
‘ আগে ছিলে অন্য বাড়ির মেয়ে। আর এখন খান বাড়ির বউ। এখন বোরখা পড়ে যেতে বলেছি মানে তাই যাবে।’
স্নেহা ভ্রু কুচকে বলে উঠে,
‘ আসলেই? ’
মেরাব গম্ভীর গলায় বলে,
‘ হুম। আর কালকে আমার সাথেই যাবে। ’
‘ আপনি শুধু শুধু যাবেন কেনো? আমি মৌয়ের সাথে চলে যেতে পারবো তো। ’
মেরাব আগের ন্যায় বলে উঠে,
‘ কালকে থেকে আমিই তোমাদের নিয়ে যাবো। আর ওই কলেজের ইংলিশ টিচার হিসেবে কালকে থেকে জয়েন করছি আমি। সেক্ষেত্রে তোমরা আমার সাথে যেতেই পারো। ’
স্নেহা কপালে ভাঁজ এনে বলে,
‘ সিরিয়াস? ’
‘ হুম। আর কালকে থেকে দেখবো খান বাড়ির পুত্রবধূ কেমন পড়া পারে। না পারলে সবার সামনে কানে ধরিয়ে রাখবো। আই প্রমিস। ’
স্নেহা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় মেরাবের শেষ বাক্য শুনে।
সত্যিই কি তাই করবে?
চলবে….
পরবর্তী পর্ব কালকে দুপুর ৩ টায় আসবে। এর আগে আসবে না।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে গল্পের লিংক
-
চোরাবালির পিছুটানে ৩
-
কি আবেশে পর্ব ৬
-
কি আবেশে পর্ব ৭
-
কি আবেশে পর্ব ৫
-
কি আবেশে পর্ব ৪
-
কি আবেশে পর্ব ৩
-
কি আবেশে পর্ব ৮
-
কি আবেশে পর্ব ১০(স্পেশাল পার্ট)
-
কি আবেশে পর্ব ২