Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৮


প্রণয়ের_রূপকথা (৬৮)

দীপ্র ঠোঁট কামড়ে চেয়ে আছে। অরণ্যর টাইমিং সেন্স এত বাজে কেন? এলো তো এলো একদম ঐ সময়েই এলো। এদিকে বিয়ের বর শুধু দাঁত কেলাচ্ছে। বন্ধুর রোমান্সে বারোটা বাজিয়ে সে নিজেও তো খুশি নয়। ও এলো দীপ্রর কাছে। মুখটা শুকনো করে বলল,”সরি ব্রো। আমি কি জানতাম ওখানে কী চলে?”

“তুই আর কথাই বলিস না অরণ্য।”

“দীপ্র, ভাই আমার শোন।”

চলে গেল ও। অরণ্য বন্ধুর যাওয়ার পানে চেয়ে রইল। দুই জুটির হলুদের অনুষ্ঠান একই স্টেজে করা হবে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল আলাদা আলাদা করে করবে। কিন্তু ধৈর্য ধরতে ধরতে দুই বরেরই মাথা নষ্ট। দুজনেই বউদের কাছে যাওয়ার জন্য নানান বাহানা পাকাচ্ছিল। তাই আর আলাদা করে করার ভাবনা টেকেনি। এখন চারজনকে একই মঞ্চে বসানো হয়েছে। একটু বাদে হলুদ ছোঁয়ানো শুরু হবে। কুহু নিজের ঘরে গিয়েছিল। এখনো আসেনি। দীপ্র ওর অপেক্ষা করতে করতে আয়ানার আগমন হলো। বাহির থেকে সেজে এসেছে ও। এটা বলতেই হয় দেওয়ান বাড়ির মেয়েরা সব আগুন সুন্দরী। ছেলেরা সুদর্শন। আয়ানাও তার ব্যতিক্রম নয়। ভীষণ রকমের সুন্দরী সে। ওর দিকে সকলের নজর গেল। দীপ্র অবশ্য সেদিকে নজর রাখল না। ও উল্টো পথে চলতে লাগল।

আয়ানা এসেই সকলের সাথে হাসি খুশি ভাব দেখাচ্ছে। ওর ভাব এমন যেন কিছুই হয়নি। রাত্রির পাশে বসে বলল,”খুব সুন্দর লাগছে।”

ওর হাসি দেখে রাত্রির মন কিছুটা গলল। ও বলল,”তোকেও। মনে হচ্ছে অপ্সরা উঠে এসেছে।”

“থ্যাংঙ্কিউ। তবে বাকিরা কোথায়? কুহু আর কণাকেও তো দেখছি না।”

কণা সবার থেকে আলাদা বসেছিল। এক কোণে। নজর ঘুরিয়ে রাত্রি ওকে খুঁজে নিল। বলল,”ঐ তো।”

কণার মুখে হাসি নেই। আয়ানা ওঠে গিয়ে বলল,”মুখটা ওমন কেন?”

“এমনি।”

সোজা করে জবাব দিল ও। আয়ানা কিছু মনে করল না। ও বর‍ং বলল,”বিয়ের অনুষ্ঠানে কেউ মন খারাপ করে? চল তো।”

ওর হাত ধরে নিয়ে গেল আয়ানা। কণাও যেতে লাগল। পুরো বিষয়টা দেখে অরণ্য বলল,”বুঝলাম না।”

“কী বুঝলে না?”

“শালিকার হলোটা কী? এমনিতেও তো আমার বন্ধুর প্রেমের লাইফে বারোটা বাজানোর পায়তারা করে। আজ এত ভালো রূপ।”

“অরণ্য! এভাবে বলছো কেন? আয়ানা কিন্তু অতও খারাপ নয়।”

“হুম, সেটা আর বলতে।”

বলে অরণ্য কেমন একটা চেহারা করল। রাত্রি কিছু বলল‍ না। ওদিকে আবির আর হেরা চুপচাপ বসে আছে। দুজনে শুধু প্রার্থনা করে বিয়েটা যেন ঠিক ঠাক হয়।

“কুহু।”
মেয়েটি চমকে তাকাল। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। দীপ্র এগিয়ে এসে বলল‍,”এত লেট করছিস কেন?”

“এখনই যেতাম।”

বলে ও নজর ফেরাল। দীপ্র এগোল। তবে তাতেও রাখল দূরত্ব। কুহুর নজর মাটির দিকে। ছেলেটি হাতের সাহায্যে থুতনি উঁচু করে ধরল। চোখাচোখি হলো দুজনের। তবে চোখ সরিয়ে নিল মেয়েটি।
“লজ্জা পাচ্ছিস?”

“না তো।”

“তাহলে চোখ সরালি কেন?”

“এমনি।”

“তাকা।”

“না তাকাই,প্লিজ।”

“উহু। তাকা একটু।”

কুহু দৃষ্টি উঁচু করল এবার। দীপ্র ভাইয়ের ঐ চোখের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে। দীপ্র বলল‍,”সরি।”

বিস্মিত হলো মেয়েটি। দীপ্র ফের বলে,”তুই এসেছিলি। কিন্তু আমাকে আটকে যেতে হলো।”

এই পর্যায়ে কুহু আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। নজর ঘুরিয়ে ফেলল। কেমন লজ্জা লাগছে। একই সাথে বুকের ভেতরটা অশান্ত হয়ে পড়েছে। ও সত্যিই গিয়েছিল? সত্যিই গিয়েছিল দীপ্র ভাইয়ের কাছে। একটুখানি ভালোবাসা পাবার লোভে? বিষয়টা ভাবতে গেলেই কেমন হোঁচট লাগছে। কুহু বুক ভরে দম নেয়। দীপ্রর হাত খানা মেয়েটির গাল ছোঁয়। দূরত্ব কমায়। ফিসফিসিয়ে বলে,”যেদিন তোকে ভালোবাসব, কথা দিচ্ছি সবটুকু দিয়ে বাসব। অভিযোগের সুযোগ থাকবে না জান।”

সবাই অপেক্ষায়। দীপ্র আর কুহু এখনো আসেনি। রাত্রি বলল‍,”এই অরণ্য। গিয়ে দেখো না। ওরা কোথায়।”

“আমি? কখনোই না। একবার গিয়েই…

“কী না, না করছো?”

“না মানে…

ওর দোমনা দেখে আবির বলল,”আমি দেখছি।”

যেই না ওঠবে, ওমনি দীপ্র-কুহুকে আসতে দেখা গেল। পাশাপাশি হেঁটে আসছে দুজনে। সকলের চোখ গেল ওদের দিকে। এত সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে। চারপাশ থেকে প্রশংসা ভেসে এল। সবার মাঝে কুহুর কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। ও বার বার হাত কচলাচ্ছে। হেরা বলল,”কাপল অফ দ্য ইয়ার।”

কথাটা কানে এসে পৌঁছাল আয়ানার। ও তাকানোই ছিল। এবার চোখ দুটো নামিয়ে ফেলল। মনটা পুনরায় বিষিয়ে যাচ্ছে। তবু নিজেকে সামলে নিল। এদিকে কুঞ্জ হৈ হৈ করছে। দাদাভাই এসেছে, দাদাভাই এসেছে বলে আনন্দ শুরু করছে। ওর উল্লাস, অনুষ্ঠান মঞ্চটিকে আরো দারুণ মাত্রায় নিয়ে গেল।

হলুদ ছোঁয়ানোর পর, সবাই দুই বরকে ধরল গান করার জন্য। আবির পিছিয়ে গেল। বলল,”ভাই, অসম্ভব। আমি এসব পারব না।”

“কী বলেন ভাই? আমি তো শুনেছি আপনি খুব ভালো গান করেন।”

অরণ্য শুধু শুধু বলল কথাটা। এসব কথা ও অবশ্য শোনেনি। তবু বলার জন্য বলা। যাতে উৎসাহ পায়। তবে উৎসাহ পাবার বদশে, আবিরের মুখটা বাংলার পাঁচের মতন হলো। ও বলল,”এই, একদম মিথ্যে বলবে না। আমার গলায় গান শুনল সবাই ঠিক পালিয়ে যাবে।”

“ভাইয়া কিন্তু মিথ্যে বলেছে ন। আমিও এগ্রি এ কথার সাথে।”

রাত্রি জোর দিল কথাটার। আবির বলল,”এই প্রথম আমার বোনের কোনো অপমান ও আমার ভালো লাগছে।”

সবাই হেসে উঠল এবার। আবির ফের বলল,”আমার কথা বাদ। গান গাইবে অরণ্য।”

গানের কথা শুনেই অরণ্য বলল,”এসব কি আমার কাজ ভাই? এগুলো দীপ্র ভালো পারো। ও কত গান করেছে ভার্সিটিতে।”

দীপ্র চোখ রাঙাল। অরণ্য মঞ্চ থেকে উঠে এসে বলল,”আজকে কোনো মাফ নেই।”

“অরণ্য তুই…

“ভাই, তোকে চান্স দিচ্ছি। তুই বুঝিস না? আজ গান করে কুহুকে পাগল করে দে।”

“তুই এবার বেশি করছিস অরণ্য।”

“কোনো কথা নয়। এই দীপ্র গান গাইবে।”

বলে ও চ্যাঁচাল। এ কথায় সবাই হৈ হৈ করে উঠল। মুহূর্তেই পরিবেশ হলো জমজমাট। পুরো বিষয়টায় দীপ্র হতাশ হয়ে পড়ল। এদিকে কুহু তাকিয়ে। সত্যিই কী দীপ্র ভাই গান গাইবেন?

কয়েকবার নাকোচ করার পর, অরণ্য এসে কুহুকে ধরল। বলল‍,”এই কুহু। তুমি বলো গান গাইতে।”

“আমি?”

“তো তুমি বলবে না তো কে বলবে?”

“কিন্তু…

“আমি তোমার হয়ে বলে দিচ্ছি। এই দীপ্র,কুহু চাচ্ছে তুই গান কর।”

দীপ্র তখনো নাকোচ করায় ব্যস্ত। গানের আসর হওয়াতে বড়ো’রা তখন ভেতরে চলে গিয়েছে। যাতে বাচ্চারা মজা করতে পারে। এখন সব ওদের বয়সী আর বাচ্চাকাচ্চারা আছে। দীপ্র তাকাল কুহুর দিকে। কুহুও চেয়ে আছে। দীপ্র ইশারায় শুধাল,”সত্যি?”

কুহু কী বলবে ভেবে পায় না। দীপ্র ভাইয়ের কণ্ঠে, গান তো শুনতে মন চাচ্ছে। তবে বলার বিষয়টায় ও আটকায়। রাত্রি এসে এবার যোগ দেয়। ফিসফিস করে বলে,”কুহু, এটাই সুযোগ। এরপরে আর কখনো দীপ্র ভাইকে দিয়ে গাওয়াতে পারব কী না জানা নেই। তুই প্লিজ হ্যাঁ কর।”

দীপ্র তখনো উত্তরের অপেক্ষায়। কুহু শুকনো ঢোক গিলে। মিনমিনে সুরে বলে,”সবাই যখন চাচ্ছে….

ওর কথা পুরো হতে পারে না। অরণ্য বলে উঠল,”ব্যাস। হয়েই গেল। এবার দীপ্র গান গাইবে।”

কুহুর দৃষ্টি নত। তবে দীপ্র চেয়ে আছে। দেখছে কুহুর দৃষ্টির নড়ন। উসখুস অনুভূতি। যা দীপ্রকে এলোমেলো করে দেয় মুহূর্তেই।

অবেশেষে দীপ্র গান গাইবে বলে ঠিক হলো। অরণ্য খুব দারুণ গিটার বাজাতে পারে। ভার্সিটিতে থাকাকালীন ওরা গান করত প্রায়ই। বিদেশি বন্ধুরা তখন অবাক হয়ে শুনত। মিউজিকের ব্যবস্থা থাকায় গিটারের অসুবিধা হলো না। দীপ্র মঞ্চে উঠেছে। পাশেই গিটারের সুর ধরল অরণ্য। কুহু ঠিক বরাবর দাঁড়িয়ে। আশেপাশে আরো সবাই রয়েছে। একদম শান্ত একটা পরিবেশ। সবাই অপেক্ষায়। হুট করেই দীপ্রর নত দৃষ্টি উঁচু হলো। কুহুর দিকে তাকিয়ে ও গাওয়া শুরু করল….

তেরে হি সাহারে, সারে তারে
চামকে চামাকে রেহতে হ্যায়
তু জো কভি যায়ে, কৌন শিখায়ে?
দিল কি কাইসে শুনতে হ্যায়?

কভি জো হো মঞ্জিল না আসান
রঞ্জিশ কৌন দরমিয়ান
খাত হ্যায় জো তুঝকো লিখে
শায়াদ মিল না সাকেঁ
খাইর তু আব জো মিলে
সুন লে ইয়ে সদা

কেইসি দিল্লাগি হ্যায় তু?
কেইসি বেবসি হ্যায় তু?
মেরি জিন্দেগি হ্যায় তু
মেরি জিন্দেগি হ্যায় তু

আঁখোঁ কি নামি হ্যায় তু
সব হ্যায় পর কামি হ্যায় তু
মেরি জিন্দেগি হ্যায় তু।

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply