প্রণয়ের_রূপকথা (৫৬)
ঘরে প্রবেশ মাত্রই নাকে দারুণ এক ঘ্রাণ পৌঁছাল। এই ঘরে দীপ্রর আলাদা ঘ্রাণ পায় কুহু। আগেও পেয়েছে। তবে আজ যেন তীব্রতা বেশি। ও দাঁড়িয়ে যাওয়াতে দীপ্র বলল,”মিসেস দেওয়ান, কোলে করে বাকিটা পথ পৌঁছে দেব?”
কুহু ঘোর ভেঙে হাবুলের মতন চাইল। ওর মুখটা ভীষণ শুকনো। চা বাদে পেটে তেমন কিছুই পড়েনি। কি থেকে কি হয়ে গেল ভাবতেই শরীর শিরশির করে ওঠল। দীপ্র বুঝি ওর হৃদয়ের সব কথাই বুঝতে পারল।
“ক্ষুধা পেয়েছে না? বাইরে থেকে কিছু তো খেলি না। কিছু আনতে বলি, ওয়েট।”
দীপ্র বের হতে নিতেই কুহু ডেকে ওঠল। দাঁড়াল দীপ্র। ফিরে বলল,”কী?”
“তখন কী বলেছিলেন?”
“কী বলেছি?”
“মিসেস দেওয়ান।”
“তো?”
“আমি তো আগে থেকেই দেওয়ান।”
দীপ্র এবার একটু ভাবুক হওয়ার ভান করল। কুহু যেহেতু ওর থেকে উচ্চাতেও বেশ অনেকটা ছোট। তাই খানিকটা ঝুঁকে চোখের বরাবর চোখ রাখল।
“কী শুনতে চাচ্ছিস কুহু? কীভাবে ডাকব বল। বেবি, জান নাকি সোনাপাখি?”
এবার কুহুর চোখ গুলো বড়ো হয়ে গেল। ও তো এসব বোঝাতে চায়নি। ও দ্রুতই পেছন ফিরে নিল। দীপ্র হেসে বলল,”আমি ডাকলে, তুই সহ্য করতে পারবি না কুহু। তাই যতটুকু সুযোগ দিচ্ছি, নিয়ে নে। পরে….
ওর কথাটা পূরণ হওয়ার আগেই দরজার কাছে একটি ছায়া পড়ল। দীপ্র থেমে গেল। টান টান হয়ে দাঁড়াতেই দেখল আয়ানার প্রবেশ ঘটেছে। কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই সে প্রবেশ করেছে ঘরে। দীপ্র নিজেকে নরম রাখতে পারল না। কঠিন সুরে বলে উঠল,”ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতির দরকার হয় আয়ানা। এটা ভদ্রতা।।”
আয়ানার গলায় কান্না এসে জমেছে। ও সহসাই বলে উঠল,”ভদ্রতা, ভদ্রতা মাই ফুট।”
মেয়েটার আচরণ যে স্বাভাবিক নয় তা ভালোই বুঝল দীপ্র। চোখ মুখ কঠোর রেখেই বলল,”ঘরে যা আয়ানা। কোনো রকম অভদ্রতা চাইছি না।”
এবার ওর দু চোখ থেকে পানি নেমে এল। কুহুর দিকে চেয়ে বলল,”ভদ্রতা করতে গিয়েই তো সবটা হারালাম আমি। আমার থেকে সবটা কেড়ে নিল কুহু। সবটা কেড়ে নিল ও।”
কুহুর হৃদয়ে ভয় ছিল। খানিকটা দোমনাও ছিল। তবে এই দোমনা কাটিয়ে সম্পর্কটিতে হ্যাঁ বলেছে সে। কিছুটা অপরাধবোধ কাজ করছে। আয়ানার মুখশ্রী দেখে তা আরো বেড়ে গেল। আয়ানা কুহুর বরাবর এসে বলল,”তোকে বলেছিলাম কুহু। তুই শুনলি না। শুনলি না আমার কথা।”
দীপ্র ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকানো। ও এবার বাঁধ সাজল। কুহুর বরাবর এসে বলল,”কুহু এখন তোর শুধু কাজিন নেই আয়ানা। ও আমার স্ত্রী। আর তোর….
হাতের সাহায্য থামিয়ে দিল আয়ানা। দীপ্র থামল। বোঝার চেষ্টা করল। আয়ানা চোখের পানি মুছে নিয়ে চাইল দীপ্রর দিকে। দীপ্রর চোখে কোনো ব্যথা নেই। অনুভূতি নেই। আয়ানার কান্নাটা বেড়ে গেল। হুট করেই ঝাপিয়ে পড়ল দীপ্র’র বুকে। কুহু পিছিয়ে গেল দু পা। দীপ্র দু হাতে আয়ানাকে সরাল।
“কী হচ্ছে কি আয়ানা? মাথা গেছে তোর?”
“হ্যাঁ, গেছে। মাথা গেছে আমার। তুমি তো বুঝতে আমি তোমায় পছন্দ করতে শুরু করেছি। তুমি তো জানতে সবটা। তবে, তবে কেন করলে এমনটা? কেন করলে এমনটা?”
আয়ানা চ্যাঁচিয়ে উঠল। কুহু পিছিয়ে গিয়ে একদম দেয়ালের সাথে মিশে রইল। ওর কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে। খারাপ লাগা একই সাথে ভয় ও হচ্ছে। এই অনুভূতি বিরল। দীপ্র আয়ানার মাথায় হাত রাখল।
“আয়ানা, আমার কথা শোন তুই।”
“কোনো কথা শুনব না। আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি তোমাকে চাই। তোমাকে চাই আমি।”
দীপ্র চাইল কুহুর দিকে। মেয়েটি এলোমেলো। আয়ানাও পাগল পাগল। দীপ্র আবারো বলল,”আয়ানা, এমন অবুঝের মতন করে কেউ বল? তুই বোঝার চেষ্টা কর প্লিজ।”
আয়ানা কাঁদতে লাগল। পিছিয়ে গিয়ে নিজের চুল টেনে ধরল। নিজেকে দোষ দিয়ে বলল,”আমি দেখতে খারাপ? বলো, খারাপ আমি? তবে কেন চাইলে না আমায়। কেন চাইলে না আমায়?”
দীপ্র নিজেও অসহায় বোধ করল। আয়ানার বদলে অন্য কোনো মেয়ে হলে সমস্যা হোতো না। সামলে নিত পরিস্থিতি। কিন্তু আয়ানা, আয়ানা তো ওর বোন হয়। স্নেহের। আদরের।
কান্না নিয়েই কক্ষ থেকে বের হলো আয়ানা। দীপ্র চাইল কুহুর দিকে। কুহু কেমন একটা হয়ে আছে। দীপ্র ফোঁস করে দম ফেলল। এগিয়ে এল কুহুর কাছে। হাত বাড়িয়ে বাহু স্পর্শ করতেই, ঘোর ভেঙে বেরিয়ে এল কুহু। দীপ্র বলল,”ঠিক আছিস?”
“আছি।”
আছি বলে খুব একটা সময় পেল না কুহু। নিচ থেকে চ্যাঁচামেচির আওয়াজ ভেসে এল। মায়ের গলা। কুহু চাইল দীপ্রর দিকে। দীপ্র ওর গাল ছুঁয়ে বলল,”সব ঠিক আছে। একদম ভয় পাওয়া যাবে না। ঠিক আছে?”
ওরা নিচে এসে দেখল ববিতা এসেছেন। নারীটি উন্মাদ হয়ে আছেন। কুহু আসা মাত্রই চড় বসাতে গিয়েছিলেন। তবে পারলেন না দীপ্রর হস্তক্ষেপে।
“চাচি, ওকে মেরে লাভ কী?”
“দীপ্র, আমি আমার মেয়ের সাথে বুঝব। তুমি এখানে আসবে না।”
“আসব চাচি। কুহু তোমার মেয়ে হলেও, এখন আমার বউ।”
এক ঘর লোকের সামনে কথাটা বলল দীপ্র। কুহুর দু চোখ বেয়ে পানি নেমে যাচ্ছে। ববিতা মেয়ের দিকে চাইলেন। তারপর চাইলেন দীপ্রর দিকে। বললেন,”এসব কী নাটক? কী নাটক এসব? ওর বাবা নেই বলে, যা ইচ্ছে করবে তোমরা? বিয়ের আয়োজন করাবে। তারপর বিয়ে ভেঙে দেবে। আবার না জানিয়ে বিয়ে করবে। তোমরা কি পেয়েছ আমাদের?”
দীপ্র জবাব সাজাতে পারল না। কুহুর ভারী অসহায় লাগছে। তবে চোখ তুলে চাইতেও পারছে না। বৃদ্ধা এখানেই উপস্থিত। ববিতা ছুটে গেলেন শাশুড়ির নিকট।
“আম্মা, আর কত সইতে হবে বলেন। অপমান, অপদস্ত হওয়ার পর ও আমি চুপ ছিলাম। কিছুই তো করিনি। একসাথে সংসার করে চলেছি। সব সয়ে যাচ্ছি। অথচ প্রতিবার আমাদের সাথে এমন হচ্ছে। আজ আমার স্বামী নেই বলে, যে যেভাবে পারবে নাচাবে তা আমি মানব না। একদমই মানব না।”
বৃদ্ধা নিজেও কথা খুঁজে পেলেন না। চ্যাঁচামেচি পেয়ে নিচ তলায় এসেছেন আবিদাও। তিনি এসে শেষ কথা গুলো শুনলেন। আয়ানা ঘরে দরজা দিয়ে আছে। কেঁদে চলেছে সমানে। মেয়েটির এমন রূপ তিনি নিতে পারছেন না। ভীষণ রাগ হচ্ছে। তার ওপর এসব কথা শুনে, সেই রাগের আগুনে ঘি পড়ল যেন। তিনি জ্বলে উঠলেন।
“এসব ইমোশনাল খেলা বন্ধ করো ববিতা। তোমার মেয়ে এতদিন খেলেছে। আর আজ তুমিও শুরু করলে।”
ববিতা জল ভরা চোখে চাইলেন। কিছুই বুঝলেন না। দীপ্র বোধকরি বুঝতে পারল। তাই বাঁধা দিতে চাইল।
“চাচি, আর কোনো ঝামেলা নয়। একটুও না।”
“আমি কোনো বাঁধা শুনব না দীপ্র। আমার আর কোনো পিছু টান নেই।”
“চাচি…
“কী লুকাতে চাইছিস দীপ্র? মেজো আপাকে বলতে দে।”
দীপ্রকে আটকালেন ববিতা। দীপ্র তবু শুনল না। আবিদার দিকে এগিয়ে বলল,”চাচি, রিকোয়েস্ট করছি।”
ববিতা এবার আরো জোর দিলেন। এগিয়ে এসে বললেন,”আমার মেয়ে ইমোশনাল খেলেছে। কী বোঝাতে চাইছ?”
“সেটা নিজের মেয়েকেই জিজ্ঞাসা করো।”
ববিতা চাইলেন মেয়ের দিকে। কুহু মুখ দিয়ে একটা রা ও করছে না। পাথর হয়ে আছে। দীপ্র বুঝল আজ আর রক্ষা নেই। কিছু করার নেই। ও এসে দাঁড়াল কুহুর পাশে। আবিদা এবার মুখ খুললেন। কুহুর দিকে দৃষ্টি রেখে বললেন,”বিয়েটা দীপ্র নয়, তোমার এই গুণবতী ভোলাবালা মেয়ের জন্যই ভেঙেছে।”
ববিতা বুঝলেন না। বুঝলেন না উপস্থিত বাকি সদস্যওরাও। কারো কোনো কথা নেই। সবাই থেমে আছে। আবিদা তিরস্কার করে বললেন,”কুহু তো বিয়ের দিন পালাতে চাইছিল। জিজ্ঞেস করো,আমি মিথ্যে বলছি কি না।”
পুরো বসার ঘরে বিস্ফোরণ হলো কথাটা। কুহুর চোখ থেকে একটা বিন্দু জল নেমে গেল। ববিতা মেয়ের নিকট আসলেন। অবিশ্বাস ভরা কণ্ঠে শুধালেন,”এসব কী কুহু?”
কুহু চাইল মায়ের দিকে। মমতাময়ী মা। দু চোখে ঘুম না হওয়ার ছাপ। শরীর জুড়ে ক্লান্তি। ব্যথা অন্তরে। মায়ের চোখের দিকে চেয়ে কুহু আর কথা বলতে পারল না। ববিতার দু চোখে অবিশ্বাস। বুকের ভেতর হাহাকার। কুহু ছোট করে ডাকল।
“মা।”
“চুপ। একদম চুপ। এই মুখে মা ডাকবি না আমায়। একদমই ডাকবি না।”
বলে চিৎকার করে উঠলেন তিনি। কুহু আবারো ডাকল।
“মা।”
ববিতা ঘৃণা ভরা নয়নে চাইল। দীপ্র পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল,”চাচি, কথাটা শোনো।”
তিনি শুনলেন না। শুনলেন না একটা ও শব্দও। ভীষণ ঘৃণা হচ্ছে নিজের ওপর। নিজের গর্ভের উপর। লজ্জা হচ্ছে। এত গুলো মানুষের সামনে নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে। তিনি আর দাঁড়াতে পারলেন না। ছুটে পালালেন নিজের ঘরে। তার পেছন পেছন ছুটে গেল কণাও। কান্না তার দু চোখ জুড়ে। কুহু এবার শব্দ করে কেঁদে ফেলল। দীপ্র খুব অসহায় অনুভব করছে। ও চাইল কুহুর দিকে। কিন্তু সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা পেল না।
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১১
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৬৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫৯