Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫১


প্রণয়ের_রূপকথা (৫১)

বাড়িতে আজ সবাই উপস্থিত। সবাই মানে সবাই। রাত পোহালেই আয়ানার জন্মদিন। আয়োজন করা হচ্ছে বিশাল ভাবে। আয়ানা বরাবরই বাবা-মায়ের আদরের। ওর জন্মদিন, ও যেভাবে চায় সেভাবেই করা হয়। আজ সারাদিন বাড়ির ডেকোরেশন করা হলো। আয়ানা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব আয়োজন করে চলেছে। সব পারফেক্ট হতে হবে। আগামীকাল শুধু ওর জন্মদিন নয়। দীপ্রকে পাওয়ার দিন ও হতে হবে। তাই ওর মাঝে এত উল্লাস। কুহু ফিরল ভার্সিটি থেকে। আজকাল পড়াশোনায় বেশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ওর স্কুলের জয়েনিং ও পিছিয়ে নেওয়া হয়েছে। কদিন বাদেই ফাইনাল। পরীক্ষাটা ঠিক ঠাক দিতে হবে। ও বাড়িতে প্রবেশ করেই এলাহি আয়োজন নজরে এল। খানিকক্ষণ বাড়ির ভেতর উঠানের মতন পাকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ও চলে এল নিজের ঘরে। সেখানে গিয়ে দেখল কণা বসে আছে। তার মন খারাপ। ব্যাগ রাখতে রাখতে কুহু বলল,”মন খারাপ কেন?”

কুহু বোধহয় আগে থেকেই বুঝতে পারল। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করল। কণা মনটা খারাপ রেখেই বলল,”বাড়িতে কত আয়োজন।”

“হ্যাঁ, ভালো তো।”

“হুম ভালো। অথচ আমার জন্মদিনে সেভাবে কোনো কিছুই হলো না।”

কদিন আগে কণার জন্মদিন গিয়েছে। কোনো আয়োজন ছিল না। সেভাবে সবাই মিলেমিশে শুভেচ্ছাও জানানো হয়নি। শেষে, সন্ধ্যার দিকে দীপ্র ভাই একটা কেক নিয়ে এসেছিলেন। সেই কেক পেয়েই কণার কি আনন্দ ছিল। তবু আজ ওর খারাপ লাগছে। ওকে এটা সেটা বুঝ দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিল কুহু। ঘরে এসে যেই না একটু বিছানায় গা এলাবে ওমনি ফোনটা বেজে ওঠল। স্কিনে রাগীবের নামটা দেখা গেল। কণা ঠোঁট কামড়ে ফোন রিসিভ করল।

“হ্যালো, কণা বলছো?”

“নাম্বার আমার, তো আমিই তো বলব তাই না?”

“না, না সেটা বলিনি। তবু কনফার্ম হলাম। রাত্রির নাম্বারে কল দিলেও তো তাকে সবসময় পাওয়া যায় না।”

রসিকতার ছলে খোঁচাটা ভালোই দিল রাগীব। ওর মেজাজ খারাপ হলো। কণা ঠোঁট কামড়ে বলল,”বলেন, কী বলবেন।”

“রাত্রির সাথে কথা বলব।”

“আপুকে কল দিন।”

“দিয়েছি, পাচ্ছি না। তুমি ওকে একটু দাও তো।”

“আমি এখন মাত্র রুমে এসেছি। আমি পারব না। পরে আবার আপুকে কল করিয়েন।”

“এখনই দরকার ছিল।”

“পরে মিটিয়ে নিয়েন। আমি রোজ রোজ এ কাজ করতে পারব না।”

রাগীব বুঝল মেয়েটি সহজ কথায় শুনবে না। ওর কাছেও চাল আছে। ও হেসে বলল,”তার আগে শোনো।”

কল না কেটে মৌন হয়ে রইল কণা। রাগীব ওপাশ থেকে হেসে বলল,”এই যে তুমি যে, রাত্রির ফোন ধরে আমাকে জান বলেছিলে, এসব কিন্তু কাউকে বলিনি। এখন যদি আমার কথা না শোনো, তবে…..

কণা বুঝল রাগীব তাকে চাল দিল। যদিও এ কথা অন্য কোথাও যাওয়ায় সম্ভাবনা নেই। তবু একটা সংকট,লজ্জা থেকে ও হার মানল। রাগ মিশ্রিত সুরে বলল,”দিচ্ছি।”

“গুড। এই না হলে ভালো মেয়ে।”

রাগীব হাসলেও কণা কিন্তু হাসল না। এমনিতেই আয়ানার জন্মদিনের এত আয়োজনে তার মন মেজাজ ভালো নেই। তার ওপর এই লোক হুমকি দিচ্ছে!

রাত্রি শুয়ে আছে। জানালা দিয়ে আকাশে ওঠা বিশাল চাঁদখানা দেখা যাচ্ছে। কুহুর সময় হয়নি এ ঘরে আসার। ও ভার্সিটি থেকে ফিরেই পড়তে বসে গিয়েছিল।

“রাত্রিপু।”

না তাকিয়েই রাত্রি বলল,”হুম।”

“এই ভরা সন্ধ্যায় এভাবে শুয়ে আছ কেন? শরীর খারাপ নাকি?”

শরীর খারাপের কথা বলে ওর হাত দুটো ছুঁয়ে দিতেই কেঁপে ওঠল কুহু। জ্বরে নাজেহাল অবস্থা।

“খুব জ্বর তো।”

“জ্বর?”

“হ্যাঁ, জ্বর। তুমি বুঝতে পারছো না?”

রাত্রি আসলেই টের পায়নি। ওর মস্তিষ্ক আজকাল ঠিক ভাবে কাজ করছে না। ও শোয়া থেকে ওঠে বসল।
“কী হয়েছে তোমার?”

গাল ছুঁয়ে বলল কুহু। রাত্রি ওর দু চোখের দিকে তাকাল। কোনো কথাই বলল না।

“রাত্রিপু, যা হবার হয়েছে। এখন অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছ। আর পেছনে যাবার সুযোগ নেই। রাগীব ভাইয়া মানুষটা ভালো। তোমাকে পছন্দ করে।”

রাত্রি সামান্য হাসল। বলল,”হুম।”

“তুমি কিছু খাবে?”

“স্যুপ খেতে ইচ্ছে করছে। বানাতে পারবি?”

“হ্যাঁ, পারব।”

“আচ্ছা, যা তবে।”

“ঠিক আছে।”

রাত্রিকে রুমে রেখে স্যুপ বানাতে গেল কুহু। রান্না ঘরে তখন উপস্থিত হলো আয়ানা। সে ভীষণ ব্যস্ত।

“কফি খাব। পানি বসা তো কুহু।”

কুহু পানি বসিয়ে দিল। আয়ানা কাপে কফি আর চিনি মিশিয়ে নিয়ে চামচ দিয়ে নেড়ে ফোম তৈরি করে নিল।

“এ বাড়িতে কফি বিটারও নেই।”

কুহু কিছু বলল না। এ বাড়িতে অনেককিছুই তো নেই। তবে শান্তি ছিল। ছিল বাবার ভালোবাসা। কিন্তু এখন সেটাও নেই। ও স্যুপ বানিয়ে নিয়ে সিঁড়িতে আসতেই অরণ্যর সাথে দেখা। অরণ্য এসেছে আজ সকালে। কুহুকে দেখে হাসল।

“স্যুপ কার জন্যে?”

শুধাল অরণ্য। কুহু ওভাবেই বলল,”রাত্রিপুর জন্য। তার জ্বর হয়েছে।”

কে জানে। কুহু চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারত জ্বরের বিষয়টা। তবু ওর বলতে ইচ্ছে হলো। অরণ্য ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। আর তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল কুহু।

মা হিসেব নিকেশ করছেন। সময় ধীরে চলছে নাকি গতিতে তা বোঝা মুশকিল। হয়তো ধীরে ধীরে চলতে চলতেই বেশ কটা মাস পেরিয়ে গেল। মায়ের হোটেলটার বয়স তিন মাস হয়ে গেল। এই তিন মাসে নানান সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এমন না কোনো কিছু থেমে থেকেছে। সব সমস্যার সমাধান ও হলো। কণা মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। কুহু এল শনপাপড়ি নিয়ে। মা এটা খুব পছন্দ করেন। ফেরার পথে ও আজ কিনে এনেছে।

“এসব আবার কিনতে গিয়েছিস কেন?”

“ইচ্ছে হলো। তোমার তো পছন্দ।”

“আর পছন্দ। আজকাল কোনো পছন্দ নেই রে।”

সত্যিই নেই। মায়ের জীবন থেকে শখ, আহ্লাদ সব হারিয়ে গিয়েছে। দিন রাত তিনি পরিশ্রম করছেন।

“লাভ একেবারে খারাপ হচ্ছে না রে কুহু। দাম কম রাখায় দিনকে দিন মানুষের আগ্রহ বেড়ে চলেছে।”

“হ্যাঁ। তবে আমাদের এলাকার বাহিরেও ক্রেতা তৈরি করতে হবে। তা হলে ব্যবসা তো বাড়বে না। সেই জন্য আমাদের আউটলেট বাড়াতে হবে।”

“ধুর, কি যে বলিস। একটা সামাল দিতেই এই অবস্থা। আর কত টাকার বিষয় বল তো।”

“হবে, হবে। একটা সময় পর ঠিকই হবে মা। তুমি তো সব পারো। সব মানে সব।”

ববিতা হাসলেন। তিনি স্বপ্ন দেখতে ভয় পান। সারাজীবন স্বামীর সংসারের জন্য খেটে গিয়েছেন। স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে কিংবা সুযোগ কোনোটাই হয়নি। এসব নিয়ে অবশ্য অভিযোগ নেই। ভালোই তো ছিল সব। সুন্দর একটা সংসার ছিল। অথচ একটা মানুষ হারিয়ে যাওয়াতে সব শেষ হয়ে গেল।

“মা।”

মেয়ের ডাকে চাইলেন ববিতা। কুহু তাকাতেই তিনি বললেন,”সে সব না হয় হবে কোনো এক সময়। তার আগে তোদের দু বোনের একটা গতি করতে হবে।”

“কীসের আবার গতি? আমাদের তো সব ঠিকই আছে।”

মায়ের কোল থেকে কণা বলল,”বুঝিস নি আপু? গতি মানে তোর বিয়ে, আমার বিয়ে। মায়ের মাথায় তো সারাক্ষণ এসবই চলে।”

“তো এসব চলবে না? তোরা বড়ো হয়েছিস না?”

কুহু মায়ের দিকে চায়। মিনমিন সুরে বলে,”আমি বিয়ে করব না। তুমি কণার বিয়ে দাও।”

কণা এবার মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে। বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,”বললেই হলো নাকি? আমি এসব বিয়ে টিয়েতে নাই। আমি সবসময় মায়ের কাছে থাকব। মায়ের সাথে থাকব।”

“বাহ! ভালো তো। তুই একাই কেন থাকবি? আমিও থাকব। সব সময় মাকে নিজের ভাগে নিয়ে নেওয়া তাই না?এটা আর হবে না। বুঝেছিস? মা আমারও। সমান, সমান।”

একই সুরে কথা গুলো বলে ওঠল কুহুও। দু বোনের এহেন কথায় ববিতার দুটো চোখে পানি চলে এল। তিনি এমনই একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই তো দীপ্রর সাথে কুহুর বিয়েতে মত দিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন এতে সবটা সহজ হবে। কিন্তু বিধাতা যা লেখেননি, তা ঘটানোর সাধ্য কার?

রাত তখন গভীর। সবাই ঘুমিয়ে। ঠকঠক আওয়াজ হলো। রাত জাগার স্বভাব থাকলেও, ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল দীপ্রও। তবে ঘুম পাতলা হওয়াতে খুব সহজেই দরজার ঠকঠক টের পেল। ও ওঠে এসে দরজা খুলতেই কুহুকে দেখতে পেল। কিছু বলার পূর্বেই হুড়মুড় করে রুমে ঢুকে গেল কুহু। দীপ্র ভালো মতন চাইল। রুমে তখনো পুরো আলো জ্বলেনি। হালকা টিমটিমে আলোতে মেয়েটিকে ভীষণ চিন্তিত ঠেকছে।

“কুহু। কিছু হয়েছে? তুই ঠিক আছিস?”

কথাটা বলতে গিয়ে দীপ্র আনমনেই মেয়েটির গাল ছুঁয়ে ফেলল। সে স্পর্শে কুহুর সর্বাঙ্গে কম্পন ধরে গেল।

“ঠিক আছিস তুই? কাঁপছিস যে!”

ভয়, আতঙ্কে কুহুর মুখ থেকে একটা টু শব্দ ও আসে না। ওর থুতনি ধরে উঁচু করে দীপ্র। এতে করে দুজনের চোখে দৃষ্টি একে অপরকে স্পর্শ করে।

“বল আমায়। কী হয়েছে?”

কুহুর দুটো চোখই জ্বালা করছে। ভয়ে শরীর কাঁপছে। গলাও শুকিয়ে এসেছে। কথা আসছে না।
“পানি খাবি?”

জবাব না দিয়ে কুহু কেবল মাথা নাড়ায়। দীপ্র দ্রুত পানি ঢেলে দেয়। গ্লাসটি তুলে নিয়ে নিমিষেই এক গ্লাস পানি পান করে ফেলল ও।

“বোস তুই। ভয় পাবি না।”

ওকে বসিয়ে বরাবর বসে দীপ্রও। কিছু যে ঘটেছে তা বোঝা যাচ্ছে। তবে দীপ্রর মাথায় ঠিকঠাক আসছে না। ও চেয়ে থাকে উত্তরের আসায়। কিছু সময় পর কুহুর শরীরে স্থিরতা আসে। ও দীপ্রর দিকে চেয়ে আতঙ্ক নিয়ে বলে,”রাত্রিপুকে পাচ্ছি না। কোথাও পাচ্ছি না।”

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply