Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১০


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব – ১০
লেখনীতে – Sanjana

তরী যখন ইনায়াকে কথা শুনিয়ে দিয়ে, মনের আনন্দে নাচতে নাচতে নিচে নামলো , তখনই ড্রয়িং রুমে নীলা চৌধুরীকে বসে থাকতে দেখে তরীর চোখদুটো ঝলমল করে উঠল এক মুহুর্তে। পরপর ও , আম্মুউউউউউ! বলেই দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল নীলা চৌধুরীর বুকে।

নীলা চৌধুরীও মেয়েকে এতদিন পর কাছে পেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। চোখের কোণে জমে উঠল আবেগের জল।

__আম্মু তুমি কখন আসলে? আমাকে তো জানালে না!

নীলা বেগম আদর করে মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
__আম্মু তো গিয়ে ছিলাম তোমার রুমে সোনা, গিয়ে দেখি তুমি ঘুমাচ্ছো, আর হৃদয় বলল কাল রাতে নাকি অনেক দেরি করে ঘুমিয়েছো , তাই আর ডাকি নি।

তরীর চোখ মুহুর্তেই ছলছল করে উঠল, আজ কতদিন পর ও ওর আম্মুকে দেখলো।

__ আই মিস ইউ আম্মু…

জবাবে নীলা চৌধুরী হেসে বললেন,

__আম্মু মিস ইউ টু সোনা।

এই দৃশ্যটা দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে নীলা চৌধুরীর পৃথিবী বলতে আসলে এই একটা মানুষই।
উনার নিজের মানুষ, পরিবার থাকলেও, উনার বিপদের দিনে সবাই যেখানে উনাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তখন এই খান পরিবারের সদস্যরাই তাঁকে আপন করে নিয়েছিল। অনিমা বেগমের হাত ধরেই এই বাড়িতে তার আশ্রয়। আর তারপর ধীরে ধীরে সবাই তাঁকে নিজের মানুষ করে নিয়েছে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পরিস্থিতি এতটা সহজ ছিল না, কিন্তু উনি হেরে যাননি। নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেন আর আজ উনি জনসম্মুখে খুব পরিচিত। আজ নীলা চৌধুরীর পরিবার বলতে, উনার মেয়ে আর এই খান বাড়ির মানুষগুলোই । এখন উনার জীবনে উনার মেয়ে ছাড়া আর কোনো পিছুটান নেই। তরীই উনার একমাত্র সুখের কারণ।

তখনই মা মেয়ের হাসি কান্নার মাঝে অনিমা বেগম হাসিমুখে কাছে এসে বলতে লাগলেন—

__ আচ্ছা আচ্ছা অনেক হয়েছে মা মেয়ের । এইবার এইসব বন্ধ করে খেতে বস তরী মা ভার্সিটি যাবি তো নাকি? হৃদি মনে হয়না যেতে পারবে আজ।

তৎক্ষণাৎ তরী কপাল কুঁচকে বলল—
__কেন মামনি? কেন যাবে না ও।

__ হৃদির তো জ্বর এসেছে কাল রাতে। মনে হয় না যেতে পারবে।

__কি! হৃদির শরীর খারাপ? কই আমাকে তো কেউ একবারও জানালে না?

তরীর এমন পাকা কথা শুনে হৃদয় নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল—

__ কেন, তুই ডাক্তার? চুপচাপ নাস্তা করতে বস গিয়ে। তোকে ড্রপ করে দিয়ে আমার কাজ আছে।

হৃদয়ের তেড়া কথায় তরী তরী মুখ ভেঙচাল।
পরমুহূর্তেই হৃদয়ের কুঁচকানো ভ্রু চোখে পড়তেই তরী অহেতুক অন্য দিকে তাকাতে লাগল। সেই মুহূর্তে ওর চোখের সামনে কাল রাতের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠলো, ও মুখ ভেংচিয়ে ছিল বলেই তো হৃদয় ওর গালে কামড়ে দিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ তরীর হাত চলে গেল ওর গালে। এইসব ভেবেই শরীর জুড়ে অদ্ভুত একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল ওর। একবার লজ্জায় চোখ নামিয়ে আবার তাকালো হৃদয়ের দিকে। সেই মুহূর্তে দুজনের চোখাচোখি হল। হৃদয় তখনও ভ্রু কুঁচকে ওর দিকেই তাকিয়ে। কিন্তু তাদের এই চোখের আদানপ্রদানে বাঁধ সাধলো প্লাবন। সে এসে সরাসরি তরীর চোখের সামনে দাঁড়ালো। হঠাৎ করে হৃদয়ের মুখের সামনে প্লাবনের মুখ ভেসে উঠতেই তরী ভড়কে গেল। এতক্ষণ ও হৃদয়কে নিয়ে ভাবছিল! এই ভেবে তরী নিজেই নিজেকে ধীক্কার জানালো। নিজের উপর নিজের খুব রাগ হলো ওর। পরপর নিজের মনেই বলে উঠলো —

__প্লাবন ভাইয়া কে ভালোবাসলে আমি অন্য কাউকে নিয়ে কিভাবে পারি। তাও যাকে তাকে নয়! তরী তুই এতক্ষণ এই জল্লাদকে নিয়ে ভাবছিলি? ছিহ ছিহ। যদি এই বজ্জাত লোক তোর এই ভাবনার এতটুকুও বুঝে ফেলে? তাহলে আজই তোর এই পৃথিবীতে শেষ দিন হবে! তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না আর।

অতঃপর ও নিজের অযাচিত ভাবনাগুলো কে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলো। আর সাথে সাথেই হৃদয়ের উপর রাগ জমে উঠল।
সব দোষ এই অসভ্য নির্দয় লোকটার! কাল এইভাবে কামড়ে দিয়েছিল বলেই তো তরীর মনটা এখন স্থির নেই। তরীর ভাবনার মাঝেই প্লাবন বলে উঠলো তখন—

__নয়না আমার সাথেই ভার্সিটি চলে যেতে পারবে। তাই না নয়না?

সাথে সাথেই হৃদয়ের মুখের ভাব পরিবর্তন হল। অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্লাবনের দিকে।

ঐদিকে তরী তো খুশিতে আটখানা। ওর মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠেছে, কিন্তু হৃদয়ের দিকে তাকাতেই সেই আনন্দ মিইয়ে গেল সাথে সাথে।
হৃদয়ের চোখ এখন ওর উপরই, হয়তো তরী কি বলবে সেটাই শুনতে চাইছে সে। তরী কিছু বলবে বা করবে তার আগেই অনিমা বেগম ডেকে উঠলেন।
__ তরীমা! তাড়াতাড়ি খেতে আয়। নাস্তা ঠান্ডা হয়ে যাবে।

উনার বলতে দেরি তরীর ছুটতে দেরি নেই। ও সঙ্গে সঙ্গেই ডাইনিংয়ের দিকে দৌড়ে গেল। পেছন থেকে হৃদয়ের দৃষ্টি তখনও ওর উপরেই আটকে।
আর সেই দিকে প্লাবনের চোখে জমে উঠল একরাশ অসন্তোষ।


তরী নাস্তার টেবিলে বসে ক্রমাগত প্লেটে চামচ চালিয়ে যাচ্ছে, হৃদি ভার্সিটি যাবে না শুনে এখন আর ওর ও যাওয়ার ইচ্ছে নেই। কিন্তু হৃদয়কে কিভাবে ম্যানেজ করবে ভাবতে ভাবতেই ও অনিমা বেগমের দিকে তাকালো। পরপর ঠোঁট ফুলিয়ে আদুরে গলায় অনিমা বেগমের হাত ধরে বলতে লাগল—

__মামনি। আজ আমিও ভার্সিটি যেতে চাই না। তুমি একটু তোমার জল্লাদ ছেলেকে বলো না। প্লিজ.. প্লিজ.. প্লিজজজজজ।

অনিমা বেগম হেসে ফেললেন তরীর বাচ্চামোতে।

__ আচ্ছা আচ্ছা, আর প্লিজ বলতে হবে না। দাঁড়া, আমি বলছি। তারপরই উনি হৃদয়কে উদ্দেশ্যে করে বললেন—

__ হৃদয়, তরী আজ ভার্সিটি যেতে চাইছে না। তোর আর অপেক্ষা করতে হবে না।

অনিমা বেগমের কথায় হৃদয় ভ্রু কুঁচকে তরীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো—

__ কেন যাবি না?

তরী জবাব দেয় না মাথা নামিয়ে রাখে, তখনই অনিমা বেগম তরীর হয়ে বলে উঠেন —

__আরে বাচ্চা মানুষ তো। যেতে ইচ্ছে করছে না। তাই যাবে না।

নিজের মায়ের কথার জবাবে হৃদয় ঠাণ্ডা গলায় বলল—
_ পড়াশোনা করার ইচ্ছে আদৌ আছে ওর। নাকি সেটাও নেই। ইচ্ছে না থাকলে বলে দিতে বলো, ওর বিয়ের ব্যবস্থা করছি আমি। অতঃপর হৃদয় নীলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,,, _মনি তোমার মেয়ের মনে হয় না আর পড়াশোনার করার ইচ্ছা আছে, দ্রুত এর বিয়ের ব্যবস্থা করো।

— তুই থাকতে আমার কেন ব্যবস্থা করতে হবে? নিজেরটা নিজে কর গিয়ে। আমাকে এইসব ঝামেলায় টানবি না একদম।তোর প্যারা তুই নিয়ে যা। আমার বয়স হয়ে গেছে এখন আমি শুধু চেয়ারে বসে আরাম করবো ব্যস । বলেই উনি ফাজলামো ভঙ্গিতে বললেন,,,,
__তোর ঝামেলা তুই সামলা বাবা। এই ফাঁকে আমিও একটু চিন্তামুক্ত হয়।

অনিমা বেগমের মুখে এমন কথা শুনে হৃদয়ের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল।


কিন্তু এদিকে তরীর নিজের মার উপর খুব অভিমান হল এইবার। ও একদিন ভার্সিটি যাবে না বলে ওকে সবাই বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছে। সেই সাথে তরীর মনে মনে হৃদয়ের উপর খুব হিংসেও হল। ওর আম্মু সবসময় হৃদয়ের কথাকেই প্রাধান্য দেয়, যেখানে তরী হৃদয়কে একদম পছন্দই করে না সেখানে ওর আম্মুর কাছে হৃদয়ের বলা সব কথা হচ্ছে পাথরের লকির। উনার বিশ্বাস— এই দুনিয়ায় সবাই ভুল হতে পারে, উনি নিজেও ভুল হতে পারেন, কিন্তু হৃদয়? না। সে কখনোই ভুল হতে পারে না।

তবে যদি তরীর মনোভাব দেখা যায় তাহলে বলা যায় ওর চোখে সৌন্দর্যের দিক থেকে হৃদয় সত্যিই অতুলনীয়। হৃদয়ের সৌন্দর্যে বরাবরই মুগ্ধ হয়‌ ‌ওর অষ্টাদশী মন। কিন্তু….
এই লোকটা যখনই মুখ চালায়? সেই সৌন্দর্য যেন এক নিমিষেই ছাই হয়ে যায়। তরীর চোখে তখন সে আর সুদর্শন নয়, বরং তখন সে এক জল্লাদ, অসভ্য, হিটলার , নির্মম, নির্দয় লোকে পরিনত হয়। এইসব ভেবে মনে মনে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠলো ও,
__ পাষণ্ড লোক একটা।

তরীর ভাবতে দেরি হল , কিন্তু হৃদয়ের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসতে দেরি হল না—

__ পাষণ্ড কাকে বলছিস তুই?

তৎক্ষণাৎ তরী চমকে তাকালো তার দিকে।
হৃদয় সোফা ছেড়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তরীর চোখে চোখ রেখে বলল—

__ সময় হলে তোকে বুঝিয়ে দেবো অসভ্যতা কাকে বলে।

ব্যস এতটুকুতেই তরীর সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply