Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৬


প্রেমবসন্ত_২।৩৬।

হামিদাআক্তারইভা_Hayat

অর্ণ ওদের মাঝখানে শুয়েছিল।দুজন যেভাবে ঝগড়া করে,পরে দেখা গেল মারামারি শুরু হবে।কায়নাত বিরক্ত হলো এতে।অর্ণ আদর করে আবার আদির মাথায় হাতও বুলিয়ে দিচ্ছে।আদি হালকা মাথা উঁচু করে উকি মারল এদিকে।দেখল,কায়নাত মুখ কালো করে তাকিয়ে আছে।আদি আবার বালিশে মাথা রেখে ঠোঁট চেপে হাসল।সকালে যখন অর্ণর ঘুম ভাঙল,তখন দেখল দুই বিচ্ছু এক প্রকার যুদ্ধ করে বুকের উপর উঠে এসেছে।
অর্ণর বলিষ্ঠ এক হাত আদিকে পাশে শুইয়ে দিয়ে কায়নাতের এলোমেলো চুল একপাশে সরিয়ে দিল। কায়নাত বুকের উপর উঠে গলা জড়িয়ে ধরে আরাম করে ঘুমাচ্ছে। অর্ণর পাথুরে বুকে কায়নাতের নিশ্বাসের উষ্ণতা এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগাচ্ছে। সে গম্ভীর মানুষ, সহজে আবেগ প্রকাশ তার ধাতে নেই, কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে এলো।
অর্ণর ঘুম ভাঙলেও সে নড়ল না। সে জানে, একটু নড়াচড়া করলেই এই গভীর ঘুমের আমেজটা ভেঙে যাবে। আদি একপাশে মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছে, আর কায়নাত ওকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে—যেন ছেড়ে দিলেই অর্ণ কোথাও হারিয়ে যাবে।
অর্ণর দৃষ্টি কায়নাতের শান্ত মুখের উপর নিবদ্ধ। মেয়েটা অনেকটা শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া। অর্ণর খড়খড়ে হাতটা কায়নাতের গালের উপর স্থির হলো। অমসৃণ তপ্ত হাতের স্পর্শে কায়নাত ঘুমের ঘোরেই একটু উসখুস করে উঠল। সে চোখ না খুলেই অর্ণর বুকে মুখটা আরও ভালোভাবে গুঁজে দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“যেতে দেব না… একদম না।”

অর্ণর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখা দিল না ঠিকই, কিন্তু তার চোখের চাউনি নরম হয়ে এলো। সে নিচু স্বরে নিজের মনেই বিড়বিড় করল,
“পালাইনি তো বেয়াদব মহিলা।”

অর্ণর সেই ‘বেয়াদব মহিলা’ ডাকটা কায়ানাতের কানে পৌঁছাল কি-না জানা নেই, তবে সে অর্ণর বুক খামচে ধরল ঘুমের ঘোরেই। যেন ওইটুকু শাসনের প্রতিবাদ জানাল সে। অর্ণ এক মুহূর্তের জন্য শ্বাস চেপে রাখল। তার এই শক্তপোক্ত পাথুরে জীবনে কায়ানাত এক পশলা বৃষ্টির মতো, যে ভিজিয়ে দিলেও অর্ণর গাম্ভীর্যের ছাতাটা সরানোর সাধ্য কারো নেই।
ঠিক সেই মুহূর্তে আদি হঠাৎ নড়েচড়ে উঠল। বিচ্ছুটা ঘুমের মধ্যেও যেন চুম্বক লাগিয়ে রেখেছে। সে অর্ণর অন্য হাতটা টেনে নিজের পেটের উপর নিল আর আধবোজা চোখে একবার কায়ানাতের দিকে তাকিয়ে আবার বালিশে মুখ গুঁজল। অর্ণ দেখল, এই ছোট ছোট দুটো মানুষ তার পুরো অস্তিত্ব দখল করে বসে আছে।

সকাল বাড়ছে। জানালার পর্দা ভেদ করে রোদের একটা সরু রেখা এসে কায়ানাতের চোখের উপর পড়ল। সে বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাল, কিন্তু চোখ মেলল না। বরং অর্ণর বুকের উপর থুতনি রেখে আদো-আদো গলায় বিড়বিড় করল,
“আদি কী উঠে গেছে? ওকে সরান তো,বেয়াদব ছেলে একটা।”

অর্ণর গলার স্বর আগের মতোই গম্ভীর, তবে তাতে আজ এক চিমটি প্রশ্রয় মেশানো। সে কায়ানাতের কপাল থেকে অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল,
“নিজের ভাগ্নেকে হিংসে করতে লজ্জা করে না তোমার? আদি তো এখনো ঘুমোচ্ছে, তুমিই বরং অসভ্যতামি করে আমার বুকটাকে বালিশ বানিয়ে রেখেছ।”

কায়ানাত এবার চোখ মেলল। অর্ণর সেই ভাবলেশহীন, গভীর চোখের দিকে তাকাতেই একটু কেঁপে উঠল।অর্ণর সেই পাথুরে চাউনি কায়নাতকে আরও উসকে দিল। সে উঠে বসল। অর্ণ নির্বিকারভাবে আধশোয়া হয়ে রইল, যেন কায়নাতের এই চঞ্চলতা তাকে স্পর্শই করছে না। কায়নাত কিছুক্ষণ একা একাই বকবক করতে লাগল,
“মানুষের ধৈর্য কতটা হতে পারে তার প্রমাণ আমি। সারাদিন যে আপনি এমন গাম্ভীর্যের চাদর মুড়ি দিয়ে থাকেন, একবারও কী মনে হয় না আমারও কিছু ইচ্ছে আছে? আমি কথা বলছি, আর আপনি এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যেন আমি কোনো ভিন্ন দেশের প্রাণী। এই যে আপনার কোনো হেলদোল নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই—এটা কী স্বাভাবিক? আপনার কী রক্তমাংসের হৃদয় বলে কিছু নেই?”

অর্ণর দিক থেকে কোনো উত্তর নেই। সে শুধু শান্ত চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। অর্ণর এই পিনপতন নীরবতা কায়নাতের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। সে নিজের গায়ের অগোছালো শাড়িটা একটু টেনে ঠিক করে নিল। তারপর একঝাঁক তপ্ত নিশ্বাস ছেড়ে বাঁকা হেসে ইঙ্গিতপূর্ণ স্বরে সরাসরি অর্ণর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“সারাদিন যে এমন কাঠখোট্টা হয়ে থাকেন, আপনার কী সত্যিই কোনো পুরুষত্ব আছে নাকি ভেতরে কোনো সমস্যা আছে? মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ হয়, আমি কী কোনো মানুষের সাথে ঘর করছি নাকি পাথরের মূর্তির সাথে যার কোনো অনুভূতিই কাজ করে না!”

কথাটা বলেই কায়নাত অদ্ভুত দৃষ্টিতে অর্ণর দিকে তাকাল। অর্ণর চোয়াল কিছু মুহূর্তের জন্য শক্ত হলো,চোখের মনিতে আগুনের ফুলকি দেখা দিল। অর্ণর সেই রাগী-তপ্ত চাহনি দেখে কায়নাত ঠোঁট কামড়ে ধরল।জেদ করে অর্ণর গায়ের উপর অনেকটা ঝুঁকে এলো। কায়নাত অর্ণর গলার খুব কাছে নিজের মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী হলো? রাগ হচ্ছে? উত্তর দিচ্ছেন না কেন?”

কায়নাত যখন একদম অর্ণর ঠোঁটের কাছে নিজের নিশ্বাস ফেলছে, ঠিক তখনই মাঝখান থেকে তড়াক করে সেই বিচ্ছুটা মাথা তুলে উঁকি দিল। আদি বড় বড় চোখ করে ওদের দুজনের একদম নাকের ডগায় নিজের মুখটা ঢুকিয়ে দিয়ে নিষ্পাপ স্বরে বলে উঠল,
“তোমরা কী করো?”

মুহূর্তের মাঝে কায়নাত আর অর্ণ দুজনেই যেন ছিটকে সরে গেল। কায়নাত লজ্জায় আর অস্বস্তিতে বিছানা ছেড়ে নামতে গিয়ে প্রায় হোঁচট খেল। অর্ণর গম্ভীর মুখে তখন বিরক্তি আর রাগের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। সে দাঁত চিবিয়ে ডাকল,
“আদি!”

আদি এক গাল হেসে অর্ণর পেটের উপর আয়েশ করে বসে কায়নাতকে ভেংচি কাটল।কায়নাত বিরক্ত হয়ে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে হনহন করে ওয়াশরুমে চলে গেল।বিচ্ছুটা শান্তি মতো একটু প্রেমও করতে দেবে না।কায়নাতের মন চাইল তুলে বারান্দা দিয়ে ছুড়ে মারতে।বিচ্ছিটা শুধু তার পেছনেই লেগে থাকে।


সকালে খাওয়া-দোয়া শেষ হলে সবাই তৈরি হওয়ার আগে জয়া জেদ ধরেছে।নাজনীন চোখ ছোট ছোট করে ওর গাল ফুলিয়ে রাখা রাগ দেখছে কাল থেকে।লজ্জায় অর্ণদের বলতে না পারলেও স্বামীর কাছে ঠিকই আবদার করেছে।নাজনীন বলল,
“ওদের সাথে গিয়ে লাভ নেই।তোকে নিয়ে একা ঘুরে আসব।”

জয়া কটমটে স্বরে বলল,
“তোমাকে আমি চিনি না ভেবেছ?তোমার কাজই জীবনে শেষ হবে না।হয় তুমি ওদের সাথে আমাকে একা পাঠাবে নাহলে তুমিও যাবে সাথে।”

নাজনীন ভাবল এক ধমক দিয়ে ওকে চুপ করিয়ে দিবে।কিন্তু অর্ণও তাকে যাওয়ার কথা বলেছিল।তা-ছাড়া ছোট্ট বউটা সবে হাতে এসেছে।এখনই যদি ঝগড়া-টগড়া করে,তাহলে দেখা যাবে রাত হলেই এর যত কাহিনী শুরু হবে।বেচারা ঠোঁট কামড়ে খানিকক্ষণ ভেবে রাজী হলো।যাওয়ার আগে বাড়ির বাইরে বের হতেই আব্দুর চৌধুরী দুই মেয়ের পাশে দাঁড়ালেন।অর্ণ আর নাজনীন গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তখন।তারা বড় গাড়ি নিয়ে সবাই এক সাথে যাচ্ছে।শ্বশুরের ভাব-সাভ বুঝল না অর্ণ।দুই মেয়ের হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।সে খুঁকখুঁক করে কেঁশে বলল,

“আপনার মেয়েকে ছেড়ে দিলে যেতে পারতাম।”

আব্দুর চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
“এত তাড়াহুড়োর কী আছে?তোমার বউকে আমি রেখে দিচ্ছি?”

“তাহলে ছাড়ছেন না কেন?দিয়ে দিয়েই তো বিদায় নিব।”

অর্ণ হাত বাড়িয়ে কায়নাতের হাত ধরতেই আব্দুর চৌধুরী কায়নাতের হাত ছেড়ে দিয়ে বললেন,
“ঝগড়া করবে না একদম।যদি শুনেছি তোমরা দুই ভাই মেজাজ দেখিয়েছ,তাহলে কিন্তু মেয়ে তোমাদের কাছে রাখব না।”

অর্ণ দাঁত কটমট করে কায়নাতকে গাড়ির ভেতর তুলে দিতে দিতে ফিসফিস করে কায়নাতকে বলল,
“তোমার হাড়’গুড় ভেঙে নদীতে ভাসিয়ে দিব।তোমার বাপ বেশি কথা বলে।”

কায়নাত মুখ কালো করে গাড়িতে বসতেই অর্ণ পাশে বসল।একে একে সবাই গাড়িতে উঠতেই বিদায় নিল তারা।আদি শেহেরের কোলে বসেছে সামনে।সে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে কায়নাত আর অর্ণ পাশাপাশি বসেছে।নিশা আলাদা করে বসতে চাইলেও বজ্জাত স্বার্থ ঠিক সুযোগ বুঝে পাশে বসেছে।এখন জ্বালাচ্ছে চুপি চুপি।

গাড়ি তখন সিলেটের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায়। জানলার বাইরে দিয়ে দ্রুত সরে যাচ্ছে চা-বাগানের সবুজ দৃশ্য আর ম্লান আলো। কিন্তু গাড়ির ভেতরের আবহাওয়া বাইরের প্রকৃতির মতো শান্ত নয়।
স্বার্থ বরাবরই একটু চঞ্চল। ও নিশার কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে খোঁচা দিয়ে বলল,
“কিরে সোনা, তুই কী সারাটা রাস্তা এভাবে মুখ গোমড়া করেই রাখবি? এখানে এসেও যদি এমন করিস, তবে কিন্তু তোকে জাফলংয়ের পানিতে ডুবিয়ে দেব!”

নিশা কড়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“তোমার সাহস তো কম না স্বার্থ ভাই! তুমি সবার সামনে আমাকে তুই-তোকারি করছ কেন? একটু তো ভদ্রতা শেখো।কদিন পর না আমাকে বিয়ে করবে?”

স্বার্থ হাসল, সেই বাঁকা হাসি যা নিশার পিত্তি জ্বালিয়ে দেয়। ও আয়েশ করে বসে বলল,
“প্রেমের ক্ষেত্রে আবার ভদ্রতা কিসের? তুই আমার চিরকালের ‘তুই’, বুঝেছিস?”

খুলনা থেকে সেই সকালে রওনা হওয়ার পর দীর্ঘ বারো ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। যানজট আর আঁকাবাঁকা রাস্তার ধকল শেষে যখন গাড়িটা সিলেটের সীমানায় ঢুকল, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা পার করে দিয়েছে। শহরের ব্যস্ততা অনেকটাই ঝিমিয়ে এসেছে,রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় চা-বাগানের নিস্তব্ধতা এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে।
অর্ণ সিলেটের সবচেয়ে বিলাসবহুল একটি পাঁচতারা হোটেলের বেশ কয়েকটি ডিলাক্স রুম আগেই বুক করে রেখেছিল। গাড়ি যখন হোটেলের বিশাল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল, ক্লান্তির মাঝেও সবাই একবার চোখ মেলে তাকাল। ঝলমলে আলোর ফোয়ারা আর আভিজাত্যে ঘেরা এই হোটেলটি সত্যিই দেখার মতো।
স্বার্থ গাড়ি থেকে নেমে বড় একটা হাই তুলে নিশার দিকে তাকাল। নিশার চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু। স্বার্থ ওর একদম কাছে গিয়ে বলল,
“কিরে নিশু,তুই কী এখানেই ঘুমিয়ে পড়বি?”

নিশা বিরক্ত হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখন রাত বারোটার বেশি বাজে স্বার্থ ভাই। তোমার এই ফালতু কথা থামিয়ে একটু ব্যাগগুলো ধরতে সাহায্য করো।”

“খুব বেয়াদবি শিখেছিস নেশার বাচ্চা।শুধু একটাবার বিয়েটা হোক,এর হিসেব আমি নেব।”

নিশা মুখ বাঁকাল।এদিকে অর্ণ গাড়ি থেকে নেমে গম্ভীর মুখে চেক-ইন ফর্মালিটিজ সারল। কায়নাত গাড়ি থেকে নামার পর ওর শাড়ির আঁচলটা একটু ঠিক করে নিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সারা দিনের যাত্রায় ও ক্লান্ত, কিন্তু অর্ণর সেই রাগী চেহারাটা মনে পড়তেই ওর ক্লান্তি যেন ভয়ে রূপ নিচ্ছে।লোকটা যা শুরু করেছে।সারাটা রাস্তা মুখটা একটু করে রেখেছিল।হাসে না,নাকি মুখটাই এমন?
আদি তখন শেহেরের কোলে মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শেহের ওকে কোলে নিয়েই হোটেলের লবিতে সোফায় বসল। অর্ণ চাবি হাতে নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সবাই নিজের নিজের রুমে যাও। ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে ঘুম দাও। কাল সকালের আগে কেউ যেন আমাকে বিরক্ত না করে।”

অর্ণর কণ্ঠস্বরে একটা চূড়ান্ত গাম্ভীর্য। ও কায়নাতের দিকে একবার তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে ইশারা করল লিফটের দিকে। কায়নাত মাথা নিচু করে ওর পিছু পিছু হাঁটা দিল।
রুমের দরজায় কার্ড টাচ করতেই ক্লিক শব্দে দরজা খুলে গেল। বিশাল রুম, কিং সাইজ বেড আর জানলার ওপাশে দূরের পাহাড়ের উপর চাঁদের আলো—সব মিলিয়ে পরিবেশটা ছিল অপার্থিব সুন্দর। কিন্তু কায়নাত ভেতরে ঢুকতেই অর্ণ সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিল।
কায়নাত চমকে পেছনে তাকাল। অর্ণ কোটটা খুলে সোফায় ছুড়ে ফেলে কায়নাতের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে। ওর চোখের দৃষ্টি এখন আরও বেশি রহস্যময়। ও নিচু স্বরে বলল,
“সারা রাস্তা তো চুপ করে ছিলে। এখন বলো, তোমাকে নিয়ে আমি কী করব? এই যে এত রাতে আমরা এখানে পৌঁছালাম, আমার পুরো মেজাজটা কিন্তু এখনো বিগড়ে আছে। তোমার কী কোনো আইডিয়া আছে তোমাকে কীভাবে শাস্তি দেব?”

কায়নাত দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে রইল। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তখন ওর গলার কাছে এসে ঠেকেছে। অর্ণ ওর ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল, ওর গায়ের পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ কায়নাতের নিঃশ্বাসে মিশে যাচ্ছে।অর্ণ যখন কায়ানাতকে কোণঠাঁসা করে দাঁতে দাঁত চেপে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছিল, তখন কায়ানাত বুঝল—ভয় পেয়ে পিছিয়ে থাকলে আজ রক্ষে নেই। অর্ণর এই গম্ভীর শাসনকে ভাঙতে হলে তাকে অপ্রস্তুত করে দিতে হবে।
অর্ণ তখন কায়ানাতের একদম কাছে, ওর এক হাত দেয়ালের গায়ে রাখা। কায়ানাত হুট করে ওর চোখের দিকে তাকাল। সেই ভেজা ভেজা ভয়ার্ত চোখের বদলে সেখানে এখন এক চিলতে দুষ্টুমি। অর্ণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কায়ানাত ঝট করে নিজের ডান পা-টা অর্ণর জুতো পরা পায়ের উপর রাখল। তারপর সেই পায়ের উপর ভর দিয়ে নিজেকে একটু উঁচু করে ছোঁ মেরে অর্ণর গলা জড়িয়ে ধরল।
অর্ণর শরীরটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। ও একদম হতভম্ব! যে মেয়েটা একটু আগে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সে হুট করে এমন আক্রমণ করে বসবে, সেটা ওর কল্পনাতেও ছিল না। অর্ণর দুহাত তখন শূন্যে ঝুলে আছে, ও বুঝতে পারছে না হাত দুটো দিয়ে কায়ানাতকে সরিয়ে দিবে নাকি শক্ত করে জড়িয়ে ধরবে।
কায়ানাত অর্ণর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী হলো লাটসাহেব? শাস্তি দেওয়ার খুব শখ ছিল না? এখন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? দিন না আপনার সেই ভয়ংকর শাস্তি!”

অর্ণর গাম্ভীর্যের দেয়ালটা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ও একটা শুকনো ঢোক গিলল। কায়ানাতের চুলের সুবাস আর ওর গায়ের ওম অর্ণর মস্তিষ্কের সব রাগ নিমেষেই ধুইয়ে মুছে দিচ্ছে।বেয়াদব বউটা ভারী বজ্জাত।ও একটু তোতলামি করে বলল,
“তুমি… তুমি কী পাগল হয়ে গেলে? ছাড়ো আমাকে।”

কায়ানাত আরও শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরে জেদ ধরল,
“ছাড়ব না। আগে বলুন যে আর রাগ করবেন না, আর মেজাজ দেখাবেন না। তবেই ছাড়ব।”

অর্ণর ঠোঁটের কোণে এবার একটা হার মানা হাসি ফুটে উঠল। ও বুঝতে পারল, এই ছোট্ট মেয়েটা ওকে জব্দ করার মোক্ষম অস্ত্রটা চিনে ফেলেছে। ও আলতো করে কায়ানাতের কোমর জড়িয়ে কাছে টানতেই কায়নাত ভীতু হলো একটু।অর্ণ পর পর ওকে ছেড়ে দিয়ে হনহন করে ঢুকল ওয়াশরুমে।

__

ভোরের আলো ফুটতেই সিলেটের প্রকৃতি এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আসা কুয়াশার চাদর তখনো চা-বাগানগুলোর উপর বিছিয়ে আছে। দূর থেকে আসা নাম না জানা কোনো পাখির ডাক আর পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া যেন পুরো শহরকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ডুবিয়ে রেখেছে। হোটেলের জানলা দিয়ে তাকালে মনে হয়, সবুজ মখমলের পাহাড়ে কেউ যেন রুপালি ধোঁয়া ঢেলে দিয়েছে।
সকাল সাড়ে আটটা। হোটেলের বিশাল লবিতে শেহের আদিকে নিয়ে পায়চারি করছে। আদির পরনে ছোট একটা জ্যাকেট, কারণ সিলেটের ভোরে বেশ ভালোই ঠান্ডা।
স্বার্থ আর নিশা হোটেলের বাগানের দিকের টেবিলটাতে মুখোমুখি বসে আছে। স্বার্থের পরনে সাদা টি-শার্ট আর জিন্স, আর নিশা একটা বাসন্তী রঙের কামিজ পরেছে যা ভোরের রোদে ঝিলমিল করছে। স্বার্থ কফির কাপে চুমুক দিয়ে জানলার ওপারে মেঘের আনাগোনা দেখছিল। হঠাৎ ও নিশাকে বলল,
“কিরে নেশার বাচ্চা, তুই কী দেখছিস? এই কুয়াশা আর পাহাড়ের মধ্যে তোকে জাস্ট একটা ‘পাহাড়ি কন্যা’ মনে হচ্ছে। তোর কী ইচ্ছা করে না এই সৌন্দর্য দেখে আমাকে একটা চুমু খেতে?”

নিশা একটা বাঁকা চাহনি দিয়ে বলল,
“তুমি তোমার এই ড্রামা বন্ধ করবে? সকালে উঠে প্রকৃতি দেখব না কী তোমার এই ন্যাকামি শুনব?”

স্বার্থ হাসল,
“তোর যে কী হাল করব।”
ও চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল।
শেহের ওদের কাছে এসে বলল,
“অর্ণর রুমের কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছিস? কাল তো রাত ১২টায় ঢুকেছে। এখনো বেরোনোর নাম নেই।”

স্বার্থ এবার সুযোগ বুঝে ফোড়ন কাটল,
“তুই কী বিয়ে করেছিস?বিয়েটা কর,নাহলে বুঝবি কী করে?”

“তুই করেছিস?তোর এত অভিজ্ঞতা এলো কোত্থেকে?”

থমথমে খেল স্বার্থ।নিশা বাঁকা চোখে তাকাল।স্বার্থ শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,
“আশ্চর্য!বয়স কী এমনি এমনি বেড়েছে?”
ঠিক তখনই লিফটের দরজা খুলে গেল। কালো সানগ্লাস চোখে, ধবধবে সাদা পাঞ্জাবীতে অর্ণ বের হয়ে এলো। ওর পেছনে গুটি গুটি পায়ে আসছে কায়নাত। কায়নাতের পরনে হালকা গোলাপি শাড়ি, চোখে কাজল—ওকে দেখতে একদম স্নিগ্ধ লাগছে। তবে অর্ণর মুখটা এখনো সেই আগের মতোই গম্ভীর, যেন পুরো পৃথিবীর ভার ওর কাঁধে।

অর্ণ ওদের সামনে এসে দাঁড়াতেই পুরো জায়গায় একটা থমথমে নীরবতা নেমে এলো। ও হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“সবার কী নাস্তা শেষ? দেরি হলে কিন্তু আমি কাউকে ছাড়াই বেরিয়ে যাব।”

শেহের অবাক হয়ে বলল,
“একা বের হবি মানে?মিটিং তো কালকে।”

অর্ণ হাত ঘড়িতে আরেকবার টাইম দেখে বলল,
“আলতাফ দেওয়ানের মেয়ে আসছে দেখা করতে।”

কায়নাত চোখ বড় বড় করে তাকাল ঘাড় উঁচু করে।কোনো মেয়ের সাথে দেখা করতে যাওয়ার জন্য এত সেজে বের হয়েছে অর্ণ?শেহের ঠোঁট চেপে বলল,
“উনার মেয়েও এসেছে?”

“নেক্সট CEO মেয়েকে বানালে মেয়েকেই তো এখন থেকে সব দেখতে হবে।”

“ডেকেছে কোথায়?”

“গ্র্যান্ড সিলেট হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে (Grand Sylhet Hotel & Resort)”

কায়নাত পেছন থেকে অর্ণর হাতা টেনে ধরে নিভু স্বরে বলল,
“আপনি কোন মেয়ের সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন?”

অর্ণ বলল,
“আপনার হবু সতীনের সাথে।”

পর-মুহূর্তে অর্ণ হনহন করে বেরিয়ে গেল কানে ফোন চেপে।সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা পরেছে লম্বা চওড়া লোকটা।কী সুন্দর লাগছে!যার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে,সে নিশ্চয়ই অর্ণকে দেখে নজর দেবে?

__
শাওন ঠিক নুসরাতকে খুঁজে বের করেছে।মেয়েটা শান্তি পাচ্ছে না শাওনের জ্বালায়।
শাওন আদিকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছে বাসার পাশেই।আদি পিছু ফিরে দেখল শেহের বুকে হাত গুঁজে একজায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।পাশেই স্বার্থ আর আদাল দাঁড়িয়ে।আদির মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে শেহেরের কোলে চড়তে।সে গাল ফুলিয়ে বলল,

“আমি হিসু করব।”

শাওন ওকে নিয়ে রাস্তার একপাশে একটা গাছের নিচে দাঁড় করাল।আদি মাথা উঁচিয়ে কপাল কুঁচকে বলল,
“চেইন খুলে দাও।”

শাওন চেইন খুলে দেয়ার পর আদি হিসু সেরে ঘুরে দাঁড়াল।হঠাৎ ঠোঁট টিপে হেসে উঠল শাওনকে দেখে।নুসরাত গাড়ির ওপাশ থেকে বলল,

“হয়েছে তোমাদের?”

আদি দৌঁড়ে গেল মায়ের কাছে।শাওন কলে কথা বলছিল রোডের অন্যপাশে।তখন শেহের’রা এগিয়ে এলো নুসরাতদের কাছে।নুসরাত আশ্চর্য হয়ে ওদের দেখে বলল,

“তোমরা এখানে কী করছো?”

শেহের গম্ভীর গলায় বলল,
“তুমি এখানে কী করছো?”

নুসরাত শুকনো গলা ভিজিয়ে বলল,
“আদির বাবা ওকে নিয়ে এসেছে।”

“আদিকে এনেছে,তোমাকে তো নয়?তুমি কী করছো এখানে?”

নুসরাত উত্তর দিল না।আদি শেহেরের কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,
“ওই লোকটা মার সাথে ঝগড়া করেছে বাবা।”

শেহের চোখে কাঠিন্যতা বজায় রেখে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে রইল।আদি উকি মেরে স্বার্থকে বলল,
“স্বার্থ ভাই,একটু নিচু হও।”

স্বার্থ আর আদাল দু’জনেই নিচু হলো।আদি ফিসফিস করে বলল,
“জানো আমি কী দেখেছি?”

আদাল বলল,
“কী দেখেছিস?”

“ওই লোকটার এত্ত ছোট।আমার সাথে দাঁড়িয়ে হিসু করছিল।”

স্বার্থ আশ্চর্য হয়ে বলল,
“কী ছোট?”

“পাখি।”

আদাল নাক ছিঁটকে উঠে দাঁড়াল।স্বার্থ থমথমে মুখে সোজা হয়ে আদালকে ফিসফিস করে বলল,
“এই বজ্জাত’কে আমরা একটু বেশি’ই পাকিয়ে ফেলেছি।”
[#প্রেমবসন্ত বই প্রি-অর্ডার করুন আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে।গল্পে রেসপন্স করুন বেশি বেশি।]

চলবে…?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply