Golpo romantic golpo প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা

প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা পর্ব ২


প্রেমের নিঃশব্দ সূচনা

ইরিন_নাজ

পর্ব_২

“শুনুন, আপনাকে আমি মোটেও বিয়ে করতে চাই না।”

আরসালানের নিকট পৌঁছানো মাত্র রাগী, তেজী কণ্ঠে কথাটা বলে উঠল তোহফা। অতঃপর অধর কামড়ে একরাশ বিরক্তি নিয়ে আরসালানের দিকে তাকিয়ে রইল উত্তরের আশায়। মাথায় তোলা শাড়ির আঁচলটা সেই কখন যেনো খসে পড়েছে তোহফার। বাতাসে কোমর অবধি লম্বা, সিল্কি চুলগুলো দুলছে। কিছু চুল উড়ে উড়ে মুখের উপরও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে। এতে বেশ বিরক্ত হচ্ছে তোহফা। শীতটাও বোধহয় আজ একটু বেশিই পড়েছে। শরীরটা মৃদু কাঁপছে তোহফার। কাঁপছে অধরজোড়াও। এই কম্পন শৈত্তপ্রবাহের কারণে নাকি অতিরিক্ত নার্ভাসনেসের ফলে, বুঝতে পারছে না সে।

আরসালান শীতল দৃষ্টি নিঃক্ষেপ করল কম্পনরত তোহফার পানে। বেশি না, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। অতঃপর পুনরায় দৃষ্টি সামনে ফিরিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,

“আমারও কোনো ইচ্ছা নেই তোমার মতো চাইল্ডিশ, ইম্যাচিউর মেয়েকে বিয়ে করার।”

ব্যাস, রাগের মাত্রাটা যেনো আকাশ ছুঁলো। মনে মনে আরসালানকে তুইতোকারি অবধি করল তোহফা। চিৎকার করে বলতে চাইল,

“আমি চাইল্ডিশ! ইম্যাচিউর! তাইলে আমারে বিয়ে করতে রাজী হলি কেন বেদ্দপ বেটা? ফালতু কোথাকার!”

কিন্তু মনের কথাগুলো মনেই রয়ে গেল তোহফার। মুখ ফুটে আর বলা হলো না। কেবল শক্ত কণ্ঠে বলল,

” তাহলে রাজী হচ্ছেন কেনো? আমাকে তো আপনার একটুও পছন্দ না, একটুও না।”

“কারণ তুমি আমার বাবা-মায়ের পছন্দ। আমার তো ইচ্ছা ছিল একজন ম্যাচিউর, সেনসিবল এবং আন্ডারস্ট্যান্ডিং মেয়েকে বিয়ে করার। কিন্তু আমার বাবা-মায়ের তোমার মতো একটা বাচ্চা মেয়েকে পছন্দ হয়ে গেল। হোয়াটএভার…”

দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো হজম করল তোহফা। জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

” দেখুন, আপনি আমাকে পছন্দ করেন না। আমিও আপনাকে পছন্দ করি না। আপনার মতে আমি মোটেও আপনার যোগ্য নই। আমি সত্যিই আপনার মতো একজন মহান, জ্ঞানী মানুষের যোগ্য নই। এবার প্লিজ, বিয়েটা ভেঙে দিন। আঙ্কেল-আন্টিকে গিয়ে বলুন আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান না। প্লিজ।”

আরসালান এই পর্যায়ে তোহফার দিকে ফিরে দাঁড়াল। সোজাসুজি তোহফার চোখে চোখ রাখল। সামান্য ঝুঁকল ওর দিকে। ভয়ে মাথা পিছিয়ে নিলো তোহফা। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। রেডি হলো ভালো কিছু শোনার জন্য। আরসালানের অধর কোণে অস্পষ্ট হাসির রেখা দেখা দিলো। সে তোহফাকে হতাশ করে দিয়ে কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলল,

“আই ডোন্ট হ্যাভ অ্যানি প্রবলেম। গরু-ছাগল মানুষ করার এক্সপেরিয়েন্স আমার আছে। অ্যান্ড, ইউ নো ইট ভেরি ওয়েল। রাইট? ইফ ইউ হ্যাভ আ প্রোবলেম, ইউ ক্যান গো অ্যান্ড কল অফ দ্য ওয়েডিং।”

রাগে-দুঃখে চোখে পানি চলে আসলো তোহফার। লোকটা তাকে ঠান্ডা মাথায় আবারও অপমান করল! সে ভয়-ডর ছেড়ে আঙুল উঁচিয়ে মৃদু চিৎকার করে বলল,

“দেখুন, আমি মোটেও ভালো মেয়ে নই। একদমই আপনার মনের মতো না। আমার বয়ফ্রেন্ড না থাকলেও, কতগুলো ক্রাশ আছে জানেন! কয়েক ডজন তো হবেই। এরপরও আমাকে বিয়ে করলে পস্তাবেন, বলে দিলাম।”

“আই হ্যাভ ম্যানি ওয়েজ…”

ওয়েজ আছে মানে! পানিশমেন্ট বুঝালো! তারমানে আরসালান নামক রাক্ষস পুরুষ বিয়েটা ভাঙবে না! তোহফা মাথা নিচু করে এগুলোই ভাবছিল। এরপর আরসালানকে আরও কিছু বলার জন্য মাথা উঁচু করতেই দেখলো আরসালান বড় বড় পা ফেলে ছাদ থেকে নিচে চলে যাচ্ছে। এই পর্যায়ে কেঁদেই ফেলল তোহফা। কেমন লোক! তার কথা শেষ হওয়ার আগেই না বলে কয়ে নিচে চলে গেল! এরসাথে নাকি সে করবে সংসার!

তোহফা কাঁদতে কাঁদতে নিচে চলে আসলো। নিজের রুমে ঢুকতেই দেখতে পেলো তার বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছে শাম্মী। তোহফাকে কাঁদতে কাঁদতে রুমে আসতে দেখে দ্রুত উঠে দাঁড়াল সে। তোহফাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে প্রশ্ন করল,

“কাঁদছিস কেনো, তোফু? ভাইয়া কি তোকে হার্ট করার মতো কিছু বলেছে?”

তোহফা ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলল,

“হার্ট করার মতো কিছু বলেছে, মানে কি? সে তো আমাকে পুরোটা টাইমই ইনসাল্ট এর পর ইনসাল্ট করেছে। আমি নাকি চাইল্ডিশ, ইম্যাচিউর। তার নাকি ইচ্ছা ছিল ম্যাচিউর, আন্ডারস্ট্যান্ডিং কাউকে বিয়ে করার। তো আমি বললাম বিয়েটা ভেঙে দেন তাহলে। সে আমাকে কি বলেছে জানো! বলেছে, গরু-ছাগল মানুষ করার এক্সপেরিয়েন্স তার আছে। আমাকে গরু-ছাগল মিন করেছে। এই লোকের সাথে আমি কেমনে সংসার করব আপু? আমাকে বাঁচাও। কত স্বপ্ন ছিল আমার বিয়ে নিয়ে। একটা লাভিং, কেয়ারিং হাজবেন্ড হবে আমার। অথচ পেতে যাচ্ছি জল্লাদ হাজবেন্ড। আমি নিশ্চিত বিয়ের পরও এই লোক আমাকে টর্চার করবে। উঠতে বসতে ধমকাবে আর পানিশমেন্ট দিবে। আমি ওই রাক্ষসকে বিয়ে করতে চাই না, চাই না।”

তোহফার মুখে ইন ডিটেইলসে সব শুনে কেনো যেনো হাসি আসলো শাম্মীর। তবে বেচারি কাঁদছে দেখে মুখ চেপে হাসি কন্ট্রোল করল সে। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে ঠাট্টার স্বরে বলল,

“কাঁদিস না, বোন। বিয়ের পর আর পানিশমেন্ট দিবে না। আদর-সোহাগ করবে। চিললললল।”

কেঁদেকেটে অলরেডি ফর্সা, ছোট্ট মুখটা লাল হয়ে গেছে তোহফার। এরমধ্যে শাম্মীর এই ঠাট্টা তার কান্নার তীব্রতা বাড়িয়ে দিলো। সে চোখের পানি মুছতে মুছতে রাগী কণ্ঠে বলল,

“মজা করছো আমার সাথে! ভালো লাগছে না আমার। এই বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করছে। কেউ বুঝতে চাচ্ছে না আমাকে।”

শাম্মীর মায়া হলো। তোহফাকে বুকে জড়িয়ে নিলো সে। বলল,

“কি আর করবি বল! তোর তো লাভারও নেই, যে তাকে দেখিয়ে বিয়ে ভাঙবি। তবে চাচ্চু-চাচীমাকে একবার বলে দেখতে পারিস।”

তোহফা, শাম্মীর বুকে মুখ গুঁজে বিড়বিড় করে বলল,

“মানবে না, আপু। আমার কথা শুনবে না। লাস্ট বছরগুলোতে কম চেষ্টা করেছি ওই লোকের থেকে পিছা ছাড়ানোর! শুনে নি।”

তোহফা কথা শেষ করতে না করতেই রুমে আসলো তোহফার বাবা-মা, ফারুক আহমেদ এবং নাইসা আহমেদ। শাম্মী, তোহফাকে ছেড়ে পিছিয়ে দাঁড়াল। শাম্মীর স্থানে বসল নাইসা আহমেদ। উনি বুকে জড়িয়ে নিলেন তোহফাকে। তোহফা আহ্লাদী বাচ্চার ন্যায় মুখ গুজল মায়ের বুকে। ঠিক করল বাবা-মাকে বলবে যে সে আরসালানকে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু তার আগেই নাইসা আহমেদ তোহফার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলে উঠলেন,

“কাজী সাহেব আসছে, মা। আজই তোমার আর আরসালানের কাবিনটা করিয়ে রাখতে চাচ্ছি আমরা।”

হুট করে এমন একটা ডিসিশন বাবা-মা নিয়ে নিয়েছে শুনে তব্দা খেয়ে গেল তোহফা। মায়ের বুক থেকে সরে আসলো সে। মিনিট দুই নীরবে শূন্য দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর শেষবারের মতো চেষ্টা করতে ভাঙা স্বরে বলে উঠল,

“আমি উনাকে বিয়ে করতে চাই না, আম্মু-আব্বু।”

ফারুক আহমেদ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলেন তোহফার মুখের দিকে। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

“আমরা কথা দিয়ে দিয়েছি, মা। আমাকে উনাদের সামনে ছোট করো না। আর একটা জিনিস মাথায় রেখো, আমরা তোমার ভালোই চাই। তোমার খারাপ কখনো চাই নি।”

স্তব্ধ হয়ে গেল তোহফা। অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। আর একটা শব্দও অপচয় করল না।

এরপর সবটা হলো খুব দ্রুত। কাজী সাহেব আসলেন। কবুল বলতে বলা হলো তোহফাকে। তোহফা দুটো মিনিট নীরব থেকে এক নিঃশ্বাসে তিনবার কবুল বলে ফেলল। বাবা-মায়ের দিকে একটিবারও ফিরে তাকাল না। সবটাই করল সে অভিমানে। নাইসা আমহেদ মেয়ের অভিমান বুঝতে পারলেন। মনটা ভার হলো উনার। স্বামীর পেছন পেছন রুম থেকে বেরিয়ে আসলেন উনি। মলিন মুখে বললেন,

“মেয়েটার সাথে এমন করাটা কি ঠিক হলো? মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছে।”

ফারুক আহমেদ স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন,

“দেখো নাইসা, তোহফা আমাদের একমাত্র সন্তান। ও আমাদের অনেক আদরের। আমরা কি ওর খারাপ চাই, বলো! আরসালান ছেলেটা তো ভালো। নিজের চোখে ওকে বড় হতে দেখলাম। কোনো খারাপ অভ্যাস নেই ওর মধ্যে। মানুষ হিসেবে ভালো। ভালো জবও করে। আনোয়ার এবং ভাবিও ভালো মানুষ। আমাদের মেয়ে ভালো থাকবে ওখানে। আর সবচেয়ে বড় কথা, ও আমাদের চোখের সামনেই থাকবে। ঘটক লাগিয়ে খুঁজলেও কি আমরা এমন পেতাম! আজকাল মানুষ চেনা যে বড্ড কঠিন! সেখানে আমরা তো মেয়ের জন্য পরিচিতর মধ্যে ভালো ঘর পেয়েছি। ও ভালো থাকবে, সুখে থাকবে। এটাই তো আমাদের চাওয়া। আমাদের মেয়েটার বয়স কম। বড্ড অভিমানী ও। অভিমান করেছে। কিন্তু ঠিকই একটা সময় আমাদের দিকটা বুঝবে। বুঝবে আমরা যা করেছি, সবটাই ওর ভালোর জন্য করেছি। সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা করো না।”

নাইসা আহমেদ মাথা ঝাকালেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়ালেন ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে।

চলবে?

(প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ, দয়া করিয়া গল্প পড়ে ইগনোর করিবেন না। রিএক্ট এবং গঠনমূলক কমেন্ট করিয়া যাইবেন। ধন্যবাদ।🥹🤍)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply