প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_১৫
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
পুরো হাইওয়ে ঘুরে এসে গাড়ি থামল কুলসুমদের বাড়ির সামনে। পমিলা বেগম গুনগুনকে বরণ করার জন্য মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ওর সাথে কুলসুম, বিপ্লব, মাসুদও আছে। গাড়ি থেকে নামার পর বরণ পর্ব শেষ হলে গুনগুনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য কুলসুম ওর হাত ধরল। প্রণয় বাঁধা দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী করছিস?”
কুলসুম বলল,
“কী করছি মানে? ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি।”
“আমার বউকে কি এখন হাঁটিয়ে নিয়ে যাবি নাকি?”
কুলসুম চোখ পিটপিট করে বলল,
“তুই মনে হয় ভুলে গেছিস যে, এই বাড়িতে লিফ্ট আছে।”
“ভুলিনি। ও নতুন বউ। লিফ্ট পর্যন্ত হেঁটে যাবে কেন?”
পাশ থেকে মাসুদ বলল,
“তাহলে এখন এই চালের বস্তাটাকে কি মাথায় করে নিয়ে যাব আমরা?”
প্রণয় ধমক দিয়ে বলল,
“মুখ সামলে কথা বল শা’লা! আমার বউ হয়।”
মাসুদ ভেংচি কাটল। প্রণয় গুনগুনকে কোলে তুলে নেওয়ার সময়, এই সুযোগে গুনগুন ঠাস করে মাসুদের গালে একটা থা’প্প’ড় বসিয়ে দিল। মাসুদ হকচকিয়ে তাকিয়ে আছে বিপ্লবের দিকে। দৃশ্যটা বিপ্লব ছাড়া আর কেউ দেখেনি।
বিপ্লব হেসে মাসুদের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ডোন্ট ওয়্যারি, আমি ছাড়া কেউ দেখেনি।”
মাসুদ গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিয়ের দিনও এভাবে গুনগুন ওকে মা’র’তে পারল? এত নির্দয়, নিষ্ঠুরও হয় কোনো মেয়ে মানুষ?
“ভাই কামডা হইল কী? ওয় আমারে মারল ক্যান?” অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকে বলল মাসুদ।
বিপ্লব হেসে বলল,
“ওকে চালের বস্তা বলেছ বলে কথা। তোমার মনে হয় ও তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দিত?”
“আমি তো ভাই এইডাই ভাবছিলাম। নতুন বউ মানুষ। সবার সামনে তো আর মা’র’তে পারব না। কিছু বলতেও পারব না। তাই সাহস দেখাইয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে গেছিলাম। ওয় তো ভাই লগে লগে প্রতিশোধ নিয়া নিল।”
বিপ্লব এবার শব্দ করে হাসল। মাসুদকে সাথে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“এটাই হলো গুনগুন।”
“আমার তো এহন প্রণয়ের লেইগা মায়া লাগতাছে। ছেম্রায় জাইনা-শুইনা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতাছে।”
“রবী ঠাকুরের গানের লাইনটা শোনোনি, ‘জেনেশুনে বি’ষ করেছি পান’? প্রণয়ও মনে করো এটাই করেছে।”
“হ, ভাই ঠিকই কইছেন।”
“তবে এই বি’ষ কিন্তু উপকারী। প্রণয় ভালো থাকবে তুমি চিন্তা কোরো না। চলো এখন।”
বিপ্লব, মাসুদ ভেতরে গিয়ে দেখে কুলসুম আর পমিলা বেগম লিফ্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
“যাওনি তোমরা?” জিজ্ঞেস করল বিপ্লব।
কুলসুম বলল,
“তোমরাই তো আসতেছ না। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?”
“মাসুদের সাথে একটু কথা বলতেছিলাম। প্রণয় আর গুনগুন চলে গেছে?”
“লিফ্ট নামতে দেরি করতেছিল, তাই প্রণয় গুনগুনকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি দিয়েই চলে গেছে।”
মাসুদ মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“হায় খোদা!”
কুলসুমদের ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে বসে আছে প্রণয় আর গুনগুন। প্রণয় বসে একটু হাঁপাচ্ছে। গুনগুন উঠে পানি নিয়ে এলো। পাশে বসে পানি এগিয়ে দিয়ে বলল,
“কী দরকার ছিল কোলে নিয়ে চার তলা পর্যন্ত ওঠার?”
“তাহলে কী করতাম?”
“আর একটু অপেক্ষা করলেই তো লিফ্ট নিতে নামত।”
প্রণয় পানিটুকু পান করে বলল,
“ততক্ষণে তোমাকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে চলা আসাটাই বেটার মনে হয়েছে।”
“ছাই! উদ্দেশ্য তো খারাপ আপনার।”
প্রণয় অবাক হয়ে বলল,
“উদ্দেশ্য খারাপ মানে?”
“এইযে কোলে নেওয়ার অজুহাতে একটু ছুঁয়ে দিতে পারলেন আমাকে।”
প্রণয় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকিয়ে আছে। বিস্মিতকণ্ঠে বলল,
“তোমার কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, তুমি কোনো পরনারী আমার জন্য।”
কুলসুমরা চলে আসার জন্য দুজনের কথা আর সামনে আগাল না। কুলসুম জানত যে, গুনগুনদের বাসায় খাওয়ার কোনো আয়োজন হবে না। তাই সে নিজের বাড়িতেই ওদের জন্য রান্নাবান্না করেছে। তাছাড়া পমিলা বেগম এসেছেন। তার জন্যও তো খাবারের আয়োজন করতে হতো। রাতে গুনগুনের একদম ক্ষুধা ছিল না। কিন্তু পমিলা বেগম নিজে যখন খাবার হাতে নিয়ে গুনগুনের মুখের সামনে ধরেছেন, তখন আর গুনগুন ফিরিয়ে দিতে পারেনি। কতদিন সে কারো হাতে খায় না!
গুনগুন খাবার মুখে নিয়ে কান্না করে ফেলে। উপস্থিত সবাই হকচকিয়ে গেল। যেই মেয়ে বিদায়বেলায় কাঁদেনি, সে এখন কেন কাঁদছে? পমিলা বেগম আদুরেকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী ব্যাপার, মা? কাঁদছ কেন?”
গুনগুন তখনো কাঁদছে। তিনি বললেন,
“খাবার মুখে নিয়ে এভাবে কাঁদতে হয় না। আমাকে বলো, কী হয়েছে? আমি খাইয়ে দিলে সমস্যা?”
গুনগুন এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,
“মা মা’রা যাওয়ার পর কেউ আমাকে আদর করে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়নি।”
সবার মন ব্যথিত হয়ে উঠল গুনগুনের কথা শুনে। পমিলা বেগমের এত খারাপ লাগছে! তিনি তো চাইলেও সবসময় গুনগুনকে খাইয়ে দিতে পারবেন না। আজ যদি প্রণয়ের বাবা বেঁচে থাকত, আর সবাই একসাথে থাকত তাহলে কতই না ভালো হতো। গুনগুনের মায়ের অভাবও তিনি পুষিয়ে দিতেন। কিন্তু ভাগ্য তো সর্বদা সহায় হয় না।
তিনি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে গুনগুনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“আমি যখনই তোমাদের কাছে আসব, নিজের হাতে তোমাকে খাইয়ে দেবো। কেমন?”
গুনগুন টলমলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে মৃদু হাসল। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে পমিলা বেগম প্রণয়কে বললেন,
“তুই তাহলে বউমাকে নিয়ে এখন ঘরে যা। কুলসুম তুমি, একটু সাথে গিয়ে গুনগুনকে দিয়ে আসো।”
কুলসুম হেসে বলল,
“আমার কি যাওয়ার আর দরকার আছে, আন্টি? প্রণয় তো গুনগুনকে কোলে করেই নিয়ে যাবে।”
প্রণয় লজ্জা এড়াতে বলল,
“যাওয়া লাগবে। ফ্ল্যাটের তালা কে খুলে দেবে? চল তুই।”
মাসুদ বলল,
“ঠিক আছে, আমিও তাহলে উঠি এখন।”
এরপর গুনগুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার বন্ধুকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিয়েছ। তোমাকে আমার শ’ত্রু কম সতিন বেশি মনে হচ্ছে।
পমিলা বেগম মাসুদের পিঠে চাপড় দিয়ে হেসে বললেন,
“ফাজিল একটা!”
প্রণয় যাওয়ার আগে মাকে বলল,
“মা, তুমি তাহলে ঘুমিয়ে পড়ো। আমি সকালে তোমায় দিয়ে আসব।”
“ঠিক আছে।”
বিপ্লব বলল,
“আমি আন্টিকে দিয়ে আসবনে। তুমি চিন্তা করো না।”
প্রণয় বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
কুলসুমদের বাড়ির চার তলায় ডান পাশের অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছে প্রণয়। গুনগুন এটা জানত না। গেইটের তালা খুলে দিয়ে কুলসুম চলে গেছে। প্রণয় গুনগুনকে কোল থেকে নামিয়ে নিজে আগে ঢুকল। দরজা থেকে সরে গিয়ে এক হাত বুকে রেখে, অন্য হাত দিয়ে রুমে ঢোকার ইশারা দিয়ে বলল,
“আমার প্রিয় সম্রাজ্ঞী, এই ছোট্ট সাম্রাজ্যে আপনাকে স্বাগতম।”
গুনগুন গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকল। দুই রুমের একটা ফ্ল্যাট। কুলসুমদের ফ্ল্যাটের মতোই। প্রয়োজনীয় যতটুকু আসবাবপত্র প্রয়োজন সবকিছুই আছে। একদম সাজানো-গোছানো ফ্ল্যাট। স্মুথিং লাগছিল সবটা। গুনগুন যেমন অবাক হয়েছে, তেমনই আবার দেখতেও ভালো লাগছে। ওর যেমন পছন্দ, ঠিক সেভাবেই ফ্ল্যাট সাজিয়েছে প্রণয়। কিন্তু গুনগুন তো কখনো প্রণয়কে নিজের পছন্দ-অপছন্দ বলেইনি!
মাস্টার বেডরুমে একটা ডাবল খাট। এক কর্ণারে বড়ো সিঙ্গেল একটা আয়না। অন্যপাশে একটা ওয়ারড্রব এবং খাটের এক সাইডে জানালার পাশে একটা স্টাডি টেবিল। সিঙ্গেল আয়নাটি আর্টিফিশিয়াল মানিপ্ল্যান্ট ও গোলাপ ফুলের লতাপাতা দিয়ে সাজানো, যেরকমটা গুনগুনের রুম সাজানো ঠিক তেমনই। জানালার পর্দা, বিছানার চাদর সব স্কাই ব্লু কালার। বাড়ির দেয়াল সাদা রঙের, ফ্লোর সাদা টাইলসের। গুনগুনের মনে হচ্ছে এক টুকরো আকাশ অথবা সমুদ্রে আছে সে।
পুরো খাটটি ফুল দিয়ে সাজানো। বেলিফুল ও গোলাপের ঘ্রাণে পুরো রুম ভরে গেছে। গুনগুন ফুল দিয়ে সাজানো খাটের এক কর্ণারে বসে জিজ্ঞেস করল,
“এই বাসা ভাড়া নিলেন কবে?”
“তুমি যখন আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছ তখনই। কুলসুমকে বলার পর, ও বলেছিল এই ফ্ল্যাটটা খালি আছে। তাই নিয়ে নিয়েছি।”
“ভাড়া তো অনেক।”
“তোমার তো পছন্দ। খোলামেলা পরিবেশ তুমি পছন্দ করো আমি জানি।”
“আপনি আরো অনেক কিছুই জানেন খেয়াল করেছি। পুরো বাড়ি সাজিয়েছেন আমার পছন্দমতো। কিন্তু আমি তো কিছু শেয়ার করিনি আপনাকে।”
“তোমার রুম তো দেখেছি। রুম দেখেই আইডিয়া করেছি। সবটা হয়তো মিলেনি। তবে আমি চেষ্টা করেছি।”
“কেন?”
“যাতে তুমি একটু আরামে থাকতে পারো, ভালো থাকতে পারো।”
“টাকা-পয়সার ব্যাপারে এখন একটু হিসাব করে চলতে হবে।”
“অবশ্যই। কিন্তু তোমার বেলায় আমি কোনো হিসাবের দিকে নজর রাখতে পারব না। আগে তোমার স্বস্তি, পরে বাকিসব।”
গুনগুনের মাথা-ব্যথা করছে। কথা বলতে আর ভালো লাগছে না। তাই ছোটো করে বলল,
“আচ্ছা।”
“তুমি শোও আমি লাইট নিভিয়ে আসছি।”
লাইট নেভানোর কথা শুনেই গুনগুনের বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেছে। সাহসী গুনগুনও হঠাৎ যেন ভয় পাচ্ছে। একটা ছেলের সাথে লাইট নিভিয়ে একসাথে, এক বিছানায় থাকবে ভাবতেই গুনগুন ভয়ে ঘামতে শুরু করেছে। নার্ভাস লাগছে। প্রণয় জিজ্ঞেস করল,
“ঠিক আছো তুমি?”
“হ্যাঁ? হুম শরবত…”
“শরবত? শরবত কী?”
“খাব।”
“এখন? কিন্তু ঘরে তো কিছুই নাই শরবত বানানোর। আচ্ছা দাঁড়াও আমি কুলসুমের কাছ থেকে নিয়ে আসি।”
“ঠিক আছে।”
প্রণয় চলে যেতেই গুনগুন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। ও ফিরে আসার আগেই ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকতে হবে। কোনোভাবেই প্রণয়ের ডাকে সাড়া দেওয়া যাবে না।
প্রণয় দশ মিনিটের মধ্যেই শরবত নিয়ে চলে এসেছে। রুমে এসে দেখে গুনগুন শুয়ে পড়েছে। শরবতের গ্লাস টেবিলের ওপর রেখে প্রণয় গুনগুনের পাশে বসল। গুনগুন তখনো ঘুমায়নি। ভয়ে ঘুম আসছে না। ঘুমের ভান ধরে শুয়ে আছে শুধু। প্রণয় পাশে বসেছে এটা টের পেতেই বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ভয়ে শরীর কাঁপছে। এর আগেও তো প্রণয়ের সাথে গুনগুনের অসংখ্যবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। কই গুনগুন তো তখন ভয় পায়নি। তাহলে আজ হঠাৎ এত ভয় করছে কেন? রাতে এবং একা বলে? যা-ই হয়ে যাক, গুনগুন আজ কিছুতেই উঠবে না বলে মনস্থির করে শুয়ে রইল।
প্রণয় প্রথমে নাম ধরে দুবার ডাকল। এরপর গুনগুনের হাতের ওপর হাত রেখে ডাকল,
“গুনগুন? ওঠো। তোমার জন্য শরবত এনেছি।”
গুনগুন তবুও ব্যাঙের মতো ঘুমের ভান ধরে পড়ে আছে। প্রণয় হাল ছাড়েনি। আবার ডাকছে,
“এই? ওঠো।”
গুনগুন বুঝতে পারছে, এই নাছোড়বান্দা খুব সহজে হাল ছাড়বে না। তাই সে এপাশ থেকে ওপাশে ভিড়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“উম…না!”
প্রণয় আর জোর করল না। উঠে গিয়ে পাঞ্জাবি খুলে টি-শার্ট পরল। লাইট নিভিয়ে গুনগুনের পাশে শুতেই, গুনগুনের ইচ্ছে করছিল দৌঁড়ে পালিয়ে যেতে। এই ইচ্ছে আরো দৃঢ় হলো, যখন প্রণয় গুনগুনের কোমরে হাত রেখেছে। ঘুম আসছিল না ওর একদম। তাই কাছে গিয়ে গুনগুনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে ডাকছে,
“এই? ঘুমিয়েছ? ওঠো না!”
গুনগুন পাথরের মূর্তির মতো শুয়ে আছে। নড়ছে-চড়ছে না। প্রণয়ের স্পর্শ গাঢ় হচ্ছে। শাড়ি ভেদ করে কোমর থেকে পেটে হাত রাখতেই গুনগুন শরীরের সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ করে এক ধাক্কা মারল প্রণয়কে। এরপর আবার ঘুমের ভান ধরে এপাশ-ওপাশ নড়েচড়ে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। একটুর জন্য নিচে পড়ে যায়নি প্রণয়। বুকে হাত দিয়ে দোয়া পড়ছে ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ্!’ ভয় পেয়ে গিয়েছিল বেচারা। একদম বিছানার কর্ণারে চলে গিয়েছিল। গুনগুন এখন যেভাবে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়েছে, তাতে ওরই আর শোয়ার জায়গা নেই। গুনগুনের পায়ে হাত রাখতেই গুনগুন এবার ঘুমের ভান ধরে এক লা’ত্থি মারে প্রণয়ের পায়ে। প্রণয় এবার সত্যি সত্যি নিচে পড়ে গেছে। ব্যথা পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করে উঠল,
“ওরে বাবারে!”
ওর চিৎকার শুনে গুনগুন অনেক কষ্টে হাসি সংযত করেছে। প্রণয় বিড়বিড় করে বলছে,
“নেহাৎ বউ বলে কিছু বললাম না।”
কিন্তু একটু ভয় লাগছে। গুনগুনের গায়ে এত শক্তি এলো কোত্থেকে? ঘুমন্ত মানুষের এত শক্তি থাকে নাকি? নাকি আবার জ্বী’নে আ’ছ’ড় করেছে! প্রণয় তড়িঘড়ি করে আবার এগিয়ে গেল গুনগুনের কাছে। ব্যস্ত হয়ে ডেকে বলল,
“গুনগুন, এই গুনগুন? তুমি কি ঠিক আছো?”
অনেকক্ষণ ডাকাডাকি পর গুনগুন ঘুমের ভান ধরেই বিরক্তি মিশিয়ে বলল,
“আহ্! ঘুমুচ্ছি তো। খুব মাথা-ব্যথা করছে। ডাকবেন না।”
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,
“আচ্ছা!”
এরপর একটা কম্বল গুনগুনের গায়ে দিয়ে নিজেও পাশে শুয়ে পড়ল চুপচাপ। বাসররাতেও বউয়ের হাতে মা’ই’র খেতে হলো। সোহাগরাত নাকি মা’ই’র রাত এটা প্রণয় ঠিক বুঝতে পারছে না এখনো।
গুনগুনের সকালে ঘুম ভাঙল প্রণয়ের ডাকেই। ভয়ে ভয়ে অনেকটা রাত জেগে ছিল গুনগুন। এরপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল আর খেয়াল নেই। সে পিটপিট করে চোখ মেলে দেখে, প্রণয় জানালার পর্দা সরিয়ে দিচ্ছে। একফালি ঝলমলে রোদ্দুর জানালার কাচ ভেদ করে রুমে ঢুকেছে। রৌদ্রজ্জ্বল রুমে প্রণয়কে দেখে গুনগুন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। প্রণয়ের পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। শার্ট ইন করে পরেছে, হাতা ফোল্ড করা। টপ তিনটা বোতাম খোলা। চুলগুলো ভেজা কিন্তু পরিপাটি। কী যে সুন্দর লাগছে প্রণয়কে আজ!
প্রণয় এটা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল,
“কী দেখছ?”
গুনগুন শোয়া থেকে উঠে বসল। খোলা চুলগুলো হাতখোপা করতে করতে বলল,
“সাদা শার্টে আপনাকে বেশ হ্যান্ডসাম লাগে।”
প্রণয় বুকে হাত দিয়ে বলে,
“প্লেজার, মাই ওয়াইফ।”
একটু থেমে ওয়ারড্রব থেকে মেরুন রঙের শাড়ি, ম্যাচিং পেটিকোট, ব্লাউজ সব বের করে বলল,
“গোসল করে আসো। বিয়ের শাড়ি পরেই তো রাতে ঘুমিয়ে গেলে।”
“এগুলো কবে কিনলেন?”
“বিয়ের আগেই। তোমাদের বাড়ির জিনিসপত্র কেনার দিন আমাদের বাড়ির জন্যও কিনেছিলাম। আর তোমার জন্য কেনাকাটা করেছিলাম কুলসুমকে সাথে নিয়ে।”
গুনগুন শুধু অবাক হচ্ছে ঠিক তা নয়, প্রণয়কে দেখে, ওর যত্ন দেখে মুগ্ধও হচ্ছে। অবিশ্বাস্য ও স্বপ্নের মতো লাগছে সবকিছু।
মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে গুনগুন ওয়াশরুমে চলে গেল। পেছন থেকে প্রণয় বলল,
“গোলাপি কালার ব্রাশটা তোমার। আর সাদাটা আমার।”
গুনগুন থমকাল, তবে দাঁড়াল না। ওয়াশরুমে ঢুকে দেখে দুটো ব্রাশ, টুথপেস্ট পাশাপাশি রাখা। বেসিনের ওপর গুনগুন যেই শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, বডিওয়াশ ব্যবহার করে সেগুলো রাখা। সবকিছু এত সাজানো-গোছানো! কোথাও যেন অভিযোগ করার কোনো জায়গা নেই।
গুনগুন গোসল করে ব্লাউজের ওপর তোয়ালে পেঁচিয়ে রুমে এলো। ভেজা চুলের পানি টপটপ করে পড়ছে। প্রণয় রুমে নেই দেখে সে জলদি গিয়ে দরজা লক করে দিল। শাড়ি পরার সময় কখন আবার রুমে ঢুকে যাবে তার তো কোনো ঠিক নেই। তোয়ালে দিয়ে চুলগুলো পেঁচিয়ে গুনগুন বিছানা থেকে শাড়িটা নিতে গিয়ে দেখে দুই মুট মেরুন রঙের কাচের খাঁচকাটা চুড়ি, লিপলাইনার, লিপস্টিক, ফেইস পাউডার, আইলানার, কাজল মাশকারা, আইশ্যাডো প্যালেট সব রাখা। গুনগুন স্বগতোক্তি করে,
“আরে! এই ছেলে পাগল নাকি?”
বিস্ময় কাটিয়ে গুনগুন শাড়ি পরে হালকা সাজল। চুড়িগুলো পরার সময় প্রণয় দরজায় নক করে।
“হয়েছে তোমার?”
গুনগুন গিয়ে দরজা খুলে দিল। প্রণয় গুনগুনকে দেখে পড়ে যাওয়ার ভান ধরে বলল,
“হায় আল্লাহ্! ম’রে যাচ্ছি। এ কোন রূপবতী আমার রুমে?”
গুনগুন কিছু বলল না। মাথা থেকে তোয়ালে খুলছিল। প্রণয় পিছু পিছু যেতে যেতে বলল,
“তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে, বউ।”
গুনগুন এবার ঘুরে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এত টাকা কেন খরচ করেছেন বলেন তো?”
প্রণয়ের নির্লিপ্ত জবাব,
“তোমার জন্য।”
গুনগুন হাল ছেড়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। গুনগুনের ভেজা চুল থেকে পানি পড়তে দেখে প্রণয় বলল,
“তুমি ঐ টুলটাতে বসো তো।”
গুনগুন জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
“বসো।”
প্রণয় ওয়ারড্রবের নিচের ড্রয়ার থেকে একটা হেয়ার ড্রায়ার বের করল। গুনগুন অবাক হয়ে বলল,
“আপনি এটাও কিনেছেন!”
“তোমার যেই লম্বা চুল! শুকাতে তো সময় লাগে। ভেজা চুলে বেশিক্ষণ থাকলে যদি ঠান্ডা লেগে যায়?”
“এগুলো খুব বাড়াবাড়ি রকমের পাগলামি।”
“তাই? হলে হোক। প্রয়োজনে তোমার জন্য সর্বোচ্চ পাগলামির রেকর্ড গড়ব আমি।”
গুনগুন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। প্রণয় ওকে জোর করেই আয়নার সামনের টুলে বসাল। হেয়ার ড্রায়ারের সুইচ লাগিয়ে বলল,
“শোনো, আমি কখনো কারো চুল কিন্তু শুকিয়ে দেইনি। তুমিই ফার্স্ট। ইউটিউবে দেখে শিখেছি। ভুলভাল হলে কিন্তু কিছু বোলো না।”
“আপনি এত কিছু জানেন কীভাবে বলেন তো?”
“কুলসুমের থেকে জেনেছি। মেয়ে ফ্রেন্ড থাকার সুবিধা আছে। শুরুতে মনে হতো, কুলসুম কীভাবে যে আমার বন্ধু হয়ে গেল! কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস ও আমার বন্ধু হয়েছিল! নয়তো এতকিছু আমি জানতাম কীভাবে? ইন্টারনেট ঘেটে আর কতটুকুই বা মেয়েলি বিষয় সম্পর্কে জানা যায়?”
“ব্লাউজের মাপও কি কুলসুম আপু বলেছে?”
“বলেনি। সাথেই ছিল। ওকে সাথে নিয়েই তো তোমার সব জিনিস কিনেছি। তুমি একদিন ওর শাড়ি, ব্লাউজ পরেছিলে মনে নেই?”
গুনগুন মনে মনে বলল,
“হায় আল্লাহ্!”
প্রণয় হেসে বলল,
“আচ্ছা শোনো, বিয়ের পরে তোমাকে আরো বেশি সুন্দর লাগছে। কেন বলো তো?”
“আপনি কেন এসব বাড়তি খরচাগুলো করেছেন আমাকে আগে সেসব বলবেন একবার?”
“বাড়তি খরচা কোথায়? এগুলো তো সব প্রয়োজনীয়। আমি তো চাই, আমার বউ সবসময় সুন্দর করে সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে থাকুক। আমি তাকালেই যেন আমার চোখ দুটো শীতল হয়ে যায়, মনটা ঠান্ডা হয়ে যায়।”
একটু থেমে হঠাৎ কিছু মনে হয়েছে এমনভাবে প্রণয় বলল,
“আচ্ছা গুনগুন, তোমার সাথে কি কোনো জ্বী’ন আছে নাকি?”
আয়নাতে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে গুনগুন বলল,
“না তো! কেন?”
প্রণয় মনমরা হয়ে বলল,
“তুমি আমাকে রাতে ধাক্কা দিয়েছ, লা’ত্থি দিয়ে ফেলে দিয়েছ। মনে হচ্ছিল তোমার গায়ে অ’সু’রে’র শ’ক্তি।”
গুনগুন মুখ টিপে হেসে বলল,
“ওহ! আসলে আমার ঘুম একদম ভালো না। এজন্য কেউ কখনো আমার সাথে ঘুমুতে পারে না।”
“কিন্তু তুমি এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলে কেন আমাকে রেখেই? তোমাকে কতবার ডেকেছি। উঠলে না।”
“খুব টায়ার্ড ছিলাম! মাথাব্যথাও করছিল।”
“হুম, এজন্যই আর ডাকিনি। এখন ভালো লাগছে?”
“হুম।”
“নাস্তা করলে পুরোপুরি ভালো লাগবে। চুল শুকানো হয়েছে কিনা দেখো তো।”
“হ্যাঁ, হয়েছে।”
“আচ্ছা, বসো। আসছি আমি।”
প্রণয় রুমের বাইরে গিয়ে আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এলো। এক হাতে খাবারের প্লেট। অন্য হাতে পানির গ্লাস। টেবিলের ওপর গ্লাস রেখে প্রণয় খাবার নিয়ে খাটে বসল। গুনগুনকে বলল,
“বসো।”
গুনগুন বসতে বসতে দেখল প্লেটে পরোটা, আলু ভাজি আর ডিম ভাজা। প্রণয় বলল,
“এখনো ডাইনিং টেবিল, সোফা কিনিনি তো। তাই রুমে বসেই খেতে হবে। টাকা গোছানো হলে ঐগুলো কিনে ফেলব। শোনো, আমরা খেয়ে ঘুরতে বের হবো। ওকে?”
“ঠিক আছে। কিন্তু আপনার প্লেট কোথায়? আপনি খাবেন না?”
“একসাথেই খাব। তোমাকে খাইয়ে দিয়ে আমি খাব।”
গুনগুন বিস্মিত হয়ে বলল,
“আমাকে খাইয়ে দিবেন মানে?”
“এখন থেকে আর তোমাকে নিজের হাতে খেতে হবে না। তিনবেলাই আমি খাইয়ে দেবো।”
“কেন?”
“মায়ের আদর তো আর তোমায় দিতে পারব না। তবে চেষ্টা করব, মায়ের অভাবটা যেন কম বোঝো তুমি। আশা করছি, আমাকে কোনো বাঁধা দেবে না।”
গুনগুনের গলা আটকে আসছে। চোখ টলমল করছে। গতকাল রাতে সবার সামনে বলেছিল, মা মা’রা যাওয়ার পর আর কেউ ওকে আদর করে খাইয়ে দেয়নি। এই কথাটাও প্রণয় মনে রেখেছে। খালি জায়গা ও আফসোস মিটিয়ে দিচ্ছে। গুনগুনের না করার সাহস হলো না। বিবেক তাকে সায় দেয়নি। তাই প্রণয় যখন খাবার মুখের সামনে ধরল, গুনগুন একদম কোনো জেদ ধরেনি। চুপচাপ খেয়ে নিয়েছে। গুনগুন কোনো ঝামেলা করেনি বলে প্রণয় নিজেও খুশি। গুনগুনকে খাইয়ে দেওয়ার সময় সে গল্প বলছিল। গুনগুন খেতে খেতে চোখে পানি নিয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে বলল,
“আম্মু আমাকে খাইয়ে দেওয়ার সময় যে গল্প বলতো এটা আপনি জানলেন কী করে?”
“জানিনি। আন্দাজ করেছি। বলতে গেলে ছোটোবেলাতেই তো শাশুড়ি আম্মুকে হারিয়েছ। তাই মনে হলো, বাচ্চাকালে হয়তো তোমায় তিনি গল্প শুনিয়ে খাওয়াত।”
“হ্যাঁ, খুব বাচ্চা যখন ছিলাম তখন গল্প শুনিয়ে খাইয়ে দিত। বড়ো হওয়ার পর তো আর গল্প বলত না আর এখন তো আরো বড়ো হয়ে গিয়েছি।”
“না, তুমি বাচ্চা-ই। আমার কাছে বাচ্চা হয়েই থাকো। ভালো লাগবে আমার।”
“আপনি গল্প জানেন কী করে?”
“আম্মু ছোটোবেলায় যেসব গল্প শোনাত ঐগুলাই কিছু কিছু মনে আছে। আজ একটা শোনালাম। রাতে আরেকটা শোনাব।”
গুনগুন হাসছে। প্রণয় মুগ্ধ হয়ে ওর হাসি দেখছে। এই হাসি এবং হাসিমুখটাই তো সে সবসময় দেখতে চেয়েছিল।
গুনগুন হাসতে হাসতে বলল,
“দিন, প্লেট ধুয়ে রাখি।”
“উঁহুম। আমি ধুতে পারব। কিন্তু হ্যাঁ, তুমি চাইলে আমার সাথে থাকতে পারো। থাকবে?”
“ঠিক আছে।”
কিচেনে প্রণয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে গুনগুন। প্রণয় প্লেট মাজার সময় গুনগুন বলল,
“আপনার পুরো নামটা যেন কী?”
“কেন?”
“বিয়ে পড়ানোর সময় কাজী বলেছিল। আমার এখন খেয়াল নেই। এত প্রেশারের মধ্যে ছিলাম তখন!”
প্লেট ধুয়ে হাত মুছতে মুছতে প্রণয় বলল,
“ইফতেখার প্রণয় রেহমান।”
নাম শুনে গুনগুন কিছুক্ষণ প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রণয় ভ্রু কুঁচকে হেসে জিজ্ঞেস করে,
“কী?”
গুনগুন দুহাত বগলদাবা করে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো পিটপিট করে বলল,
“হুম! নামের মধ্যে তো একটা কিছু আছে।”
“কী আছে?”
“আছে কিছু একটা! লাইক পাওয়ার টাইপ কিছু।”
প্রণয় শার্টের কলার টেনে পেছনে নিল। ভাব নিয়ে বলল,
“তোমাকে আমার বউ হিসেবে পেয়েছি। পাওয়ার তো থাকবেই। লাভ ইউ।”
গুনগুন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“হেইট ইউ! গেলাম আমি।”
গুনগুন চলে যাচ্ছিল। প্রণয় তখন পেছন থেকে বলল,
“হেই মিসেস ইফতেখার রেহমান, প্রণয় লাভস ইউ মোর দ্যান ইউ হেইট হিম।”
চলবে…
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৩
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১০
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১২
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২