Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৭


প্রণয়ের_রূপকথা (২৭)

দীপ্র কিন্তু গাড়ি নিয়ে আসেনি। ওরা আজ যাচ্ছে রিকশা নিয়ে। অনেক দিন কিংবা মাস পর রিকশায় ওঠা হয়েছে ওদের। রিকশার ওপরে বসেছে দীপ্র। আর নিচে বসা কণা আর কুহু। এই অবস্থাটা কুহুকে ছেলেবেলায় নিয়ে গেল। কুহু বরাবরই দীপ্রর পাগল। হবে নাই বা কেন? বাড়িতে বাবা মায়ের পর যে মানুষটা কুহুকে সবথেকে স্নেহ করে, সেই মানুষটা তো দীপ্র ভাই। তখন কুঞ্জর জন্ম হয়নি। কণা ছোট। দুধ ভাত টাইপ। রাত্রি বর‍াবরই নানা বাড়িতে এসে থেকেছে। মেলা বসেছে। পাশের গ্রামে। দীপ্র ভাইকে লিডার করে, সাথে যাচ্ছে রাত্রি আর আয়ানা। কুহুকে মা যেতে দেবেন না। ওর যে কি কান্না। ওরা ছোট থাকাতে এক রিকশায় তিনজন বেশ ভালো করেই বসতে পারত। কুহুকে বলা হলো চারজন যাওয়া যাবে না। কিন্তু ছোট্ট কুহু কি সেসব কথা মানে? না তো। কুহুর কান্নাকাটি চলতে লাগল। দীপ্র মাঠে খেলতে গিয়েছিল। এসেই সব সমাধান করে ফেলল। কুহুকে বলল তাকে ছাড়া কোথাও যাওয়া হবে না। অবশেষে কুহুকে নেওয়া হলো। রিকশার সিটে চারজনের জায়গা হলো না। কুহুর মনটা খারাপ হলো। ও ভাবল ওকে এবার নামিয়ে রাখা হবে। কিন্তু না। তেমন কিছুই করা হলো না। দীপ্র ভাই রিকশার ওপরে ওঠে বসলেন। আর সিটে বসল কুহু, রাত্রি আর আয়ানা। সেই দিন খুব হৈ হৈ করে মেলায় ঘুরেছিল ওরা। দীপ্র সারাটা সময় কুহুর হাত ধরেছিল। নাগরদোলায় পাশে বসিয়েছিল। কুহু ভয় পাচ্ছিল না। একদমই পাচ্ছিল না। কারণ ও জানত, দীপ্র ভাই আছেন। আছেন দীপ্র ভাই। সেই সময়, সেই স্মৃতি কেমন করে হারিয়ে গেল যেন। কুহুর দুটো চোখ টলমল করে ওঠল। সহসাই কণা বলে ওঠল,”এই আপু, ফুচকা খাবি?”

বাবার স্কুলের সামনে এসে রিকশাটা থেমেছে। টিফিন টাইম চলছে। বাচ্চারা ভীড় জমিয়েছে। কুহুর ভেতরটা হু হু করে ওঠল। ওরা রিকশা থেকে নেমে স্কুলের বাইরে এসে দাঁড়াল। স্কুল ড্রেস পরা একদল বাচ্চা ফুচকার দোকানে ভীড় জমিয়েছে। একটা সময় খুব আসা হতো কুহুর।

ফুচকা খাওয়া প্রায় শেষ। ঠিক তখনই স্কুলের এক শিক্ষক এসে বললেন,”আরেহ, কুহু না?”

“আসসালামু আলাইকুম স্যার।”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কেমন আছ মা? এদিকে তো আসোই না।”

“আসা হয় না স্যার। আপনি কেমন আছেন? স্কুলের সব কেমন চলছে?”

“আছি ভালোই। আর স্কুল….

বলে হতাশার নিশ্বাস ফেললেন তিনি। কুহু ছোট করে বল‍ল,”সব ঠিক আছে স্যার?”

“আছে কোনো রকম। তোমার বাবার মৃ ত্যু র পর অনিয়মে ভরে গিয়েছে সবটা।”

এ কথার পরই পাশে থাকা দীপ্রকে নজরে পড়ল শাহ আলম স্যারের। চশমার ফাঁক দিয়ে ওকে দেখে বললেন,”ও কে?”

কুহু নামটা উচ্চারণ করতে গিয়ে কেমন একটা সংকোচ বোধ করল। খুব কষ্ট করেই বলল,”বড়ো চাচার ছেলে। দীপ্র ভাই।”

“আরে ও দীপ্র? কত বড়ো হয়ে গিয়েছে। তোমাকে সেই কবে দেখেছি। আমাকে চিনতে পেরেছ?”

শাহ আলম স্যারের চেহারায় বেশ একটা আনন্দ এসে ভর করল। দীপ্র হেসে বলল,”চিনেছি স্যার। ছোট বেলায়, আপনার ক্লাসে এসে বসে থাকতাম আমি। অথচ আপনি ছিলেন ভিন্ন গ্রুপের টিচার।”

শাহ আলম হো হো করে হেসে ফেললেন। অনেক স্মৃতিই স্মরণ হচ্ছে তার।
“তোমাকে দেখে বড়ো ভালো লাগল। তুমি খুব ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিলে। আমার বেশ মনে আছে। অবশ্য তোমরা সবাই বেশ ব্রাইট। এখন কী করছো? শুনেছিলাম তোমরা দেশের বাহিরে থাকো।”

“জি স্যার। আসা হয়েছে। ছোট একটা ব্যবসা করতাম। ভাবছি ওটা আর করব না।”

এ কথায় কুহু চমকাল। দীপ্র ভাই ব্যবসা করবেন না। কিন্তু কেন?

“সেকি? ভালো চলছে না নাকি?”

“ভালো চলছে স্যার।”

“তবে?”

“গ্রামে আসার পর, মনে হলো আর না ফিরে যাই। দেশের বাহিরে লাক্সারি আছে। কিন্তু গ্রামের মাটির যে সুবাস, যে আনন্দ, সেটা নাই।”

“আহ, তোমার চাচার মতন করে বললে। কাদের স্যারের হাতে কত সুযোগ ছিল। কত জায়গা থেকে অফার আসত। একদিন চা খেতে খেতে বললাম, এত বড়ো সুযোগ ছাড়া বোকামি হবে। তিনি হাসলেন। বললেন, আমি চলে গেলে অনিয়মে স্কুলটা ভরে যাবে। সত্যিই তেমনটা হলো। তার চলে যাওয়ার পর সবটা অনিয়মে ভরে গেল। যে যার মতন লুটে খাচ্ছে।”

শাহ আলম টানা কথা গুলো বললেন। তারপর আবার বললেন,”যাই হোক, তোমাদের দেখে ভালো লাগল। একদিন তোমরা আমার বাড়িতে এসো। ডাল ভাতের দাওয়ার রইল।”

“ধন্যবাদ স্যার। নিশ্চয়ই যাব। আপনিও যাবেন।”

“যাব।”

বলে বিদায় নিলেন শাহ আলম স্যার। কুহু একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে গিয়েছিল। ওর মনে একটাই প্রশ্ন। দীপ্র ভাই আসলেই গ্রামে থেকে যাবেন?

হোটেলের জন্য প্রয়োজনীয় যে সকল জিনিসপত্র আছে, তার অনেকটাই কেনাকাটা হলো আজ। সব জিনিসপত্র ভ্যানে তুলে দিতেই কণা বলল,”আমি ভ্যানে করে যাব। অনেকদিন হয় ভ্যানে যাই না।”

একজনের বসার মতন জায়গা ছিল। দীপ্রই যেত। তবে কণা ইচ্ছে করেই বিষয়টি ঘটাল। দীপ্র কিংবা কুহু, দুজনেই বিষয়টা ধরতে পারল। কুহুর বাঁধা দেয়ার কথা থাকলেও ও আজ বাঁধা দিল না। এর কারণ দীপ্র ভাইকে একটা প্রশ্ন করার আছে‍। যা কণার সামনে করতে পারছিল না। কণা হৈ হৈ মন নিয়ে ভ্যানে ওঠে বসল। দীপ্র ভ্যান ভাড়া দিয়ে বলল,”মামা, আমার বোন কিন্তু আমানত। এক‍দম দেখে শুনে নিবা।”

লোকটা দাঁত কেলিয়ে হাসল। বলল,”কী যে বলো মামা। কত বছর ধরে ভ্যান চালাই। নিশ্চিত থাকো মামা। তোমাদের বাড়ির সাথে সেই কতদিনের সম্পর্ক।”

ভ্যান ওয়ালাকে বলে দীপ্র এল কণার কাছে। কণা হাসি হাসি মুখে বলল,”আমার বোন ও কিন্তু আমানত রইল। দেখে শুনে নিও।”

এ কথায় একটুখানি পেছনের দিকে চাইল দীপ্র। কুহু সামনের দিকে তাকিয়ে। উদাসীনতা তার দৃষ্টি জুড়ে।
“তুই সাবধানে যাস। আর একদম লাফালাফি না। বুঝেছিস?”

“বুঝেছি। তুমি টেনশন নিও না তো।”

ভ্যান চলতে শুরু করল। কুহু অন্যমনস্ক ছিল। হুট করেই খেয়াল করে এগিয়ে এল,”এই কণা। সাবধানে যাস কিন্তু।”

পেছন ফিরে চাইল কণা। বলল,”সাবধানেই যাব। তুই চিন্তা করিস না আপু। তুই দীপ্র ভাইকে সাবধানে নিয়ে আছিস।”

শেষ কথায় বেকুব বনে গেল কুহু। চেয়ে রইল বলদের মতন। দীপ্র নিজেও মেয়েটার এহেন কথায়, ঠোঁট কামড়ে চাইল। কণাটা বেশ দুষ্টু আছে।

বেশ গরম পড়েছে। রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে ওরা। বাজারের দিকটায় লোকের ভীড় খুব। এদিকে রিকশা আসতেই চাইছে না। গরমে ঘেমেনেমে অবস্থা খারাপ। একটু দূরে আঁখের রস বিক্রি করছে। দীপ্র বলল,”আঁখের রস খাবি?”

কুহু ছোট করে বলল,”না।”

যদিও মেয়েটি না বলেছে। তবে দীপ্র শুনল না। ও এগিয়ে গিয়ে দু গ্লাস রস নিয়ে এল। কুহু গ্লাস নিয়ে বলল,”না বলেছিলাম।”

“আমি হ্যাঁ ধরে নিয়েছি।”

কথা বাড়াল না কুহু। গরমে মনটা ঠাণ্ডা রসের জন্য আনচানই করছিল। ও এক নিশ্বাসে পান করল। দীপ্র তখন গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে। ও চেয়ে চেয়ে দেখল। খাওয়া শেষে কুহু যখন চাইল তখন দীপ্রর সাথে চোখাচোখি হলো। ও একটু লজ্জাই পেল। গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে বলল,”গ্রামে কেন থাকতে চাচ্ছেন? আপনার ব্যবসার খুব প্রশংসা শুনেছি।”

“গ্রামে আলাদা শান্তি আছে।”

“বিদেশে তার থেকে বেশি শান্তি না? গ্রামে তো কিছুই নেই। দুঃখ আর দুঃখ।”

“যদি তেমনই হয়, তবে দুঃখকেই আপন করব না হয়।”

এ কথায় কুহু এক‍দম চুপ হয়ে গেল। একটা কথাও বলতে পারল না। দীপ্র রিকশা ডেকে আনল। গ্লাস ফিরিয়ে দিয়ে এসে বলল,”ওঠে বস।”

কুহু যন্ত্রের মতন রিকশায় ওঠে বসল। দীপ্র বসল পাশে। বেখেয়ালে মেয়েটির ওড়নার এক পাশ একদম চাকার দিকে নুয়ে পড়েছিল। দীপ্র চট করেই তা ওঠিয়ে ধরল। বিষয়টি বুঝতে পেরে, কুহু নিজেও ধ্যানে ফিরে এল। আজকাল একটু বেশিই ঘোরে ডুবে যাচ্ছে সে।

চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply