প্রেমবসন্ত_২ ।৩৫।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
বাইরে মিষ্টি হাওয়া বইছে তখন।চৌধুরী বাড়ির বিশাল বড় জাম গাছের মোটা ডালে একটা দড়ি দিয়ে দোলনা বানানো হয়েছে।সেই দোলনায় বসে আছে এক শ্যাম পুরুষ।ঠোঁটে তার জ্বলন্ত সিগারেট।দৃষ্টি রেখেছে দোতলার সেই বিশাল বারান্দার দিকে।নাজনীনের বারান্দায় এক ষোড়শী চুল মেলে দিয়ে বসে আছে চুপচাপ।দেয়ালে হ্যালান দিয়ে তাকিয়ে আছে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে।এই চাঁদের মতো সবার জীবন এত উজ্জ্বল কেন হয় না?কিন্তু এই বোকা মেয়েকে কে বোঝাবে,চাঁদের গায়েও দাগ থাকে?
জয়া নাজনীনের ব্যপারে কথা বলেছে নিশা,নুসরাত,ফারিহার সাথে।এবং কায়নাতও বাদ যায়নি।নুসরাত আর ফাহিরা উল্টো-পাল্টা বোঝালেও তার কাছে সেটা সঠিক মনে হচ্ছে।জয়া উঠে দাঁড়াল।বারান্দার দরজা আঁটকে আলমারি খুলে কালো রঙের একটা পাতলা শাড়ি জড়াল গায়ে।এমন তো নয় যে সে একটা বাচ্চা মেয়ে।এক বিবাহিত পুরুষকে সে দিনের পর দিন উপেক্ষা করতে পারে না।এটা অন্যায়।শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে সে এগিয়ে গেল আয়নার নিকট।চোখে চিকন করে কাজল দিয়ে ঠোঁটে হালকা করে লিপস্টিক দিল যত্ন করে।খারাপ তো লাগছে না দেখতে।বরং কালো রংটা আজ বেশ মানিয়েছে ছোট্ট শরীরটায়।আজ কী জয়া নাজনিনের রাগ ভাঙাতে পারবে?তাদের মাঝে এই বড় দেয়ালটা ভাঙবে?
জয়া লম্বা শ্বাস নিয়ে আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। আজ যেন সে জয়া নয়, বরং নাজনীনের ‘বউ’। নিশা ও নুসরাতদের উস্কানি আর ফারিহার সেই রহস্যময় হাসিগুলো তার কানে বাজছে। তারা যা-ই বলুক, জয়া আজ স্থির করেছে—এই অবহেলার দেয়াল সে আর টিকতে দেবে না।
পা টিপে টিপে বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। চাঁদের আলোয় তার পরনের কালো শাড়িটা যেন এক রহস্যময় আভা ছড়াচ্ছে। নিচে জাম গাছের ডালের দিকে তাকাতেই দেখল সেই শ্যাম পুরুষকে। সিগারেটের ধোঁয়াগুলো জোনাকির আলোর সাথে মিশে নীলচে হয়ে বাতাসে বিলীন হচ্ছে। জয়া জানে, ওই দৃষ্টির লক্ষ্য সে নিজেই।
জয়া আলতো করে বারান্দার রেলিঙে হাত রাখল। নাজনীন প্রথমে একটু চমকাল, কিন্তু জয়ার পরনের কালো শাড়ি আর কাজলরাঙা চোখগুলো দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটুকু পায়ে পিষে দোলনা থেকে নামল।
মিনিট পাঁচেক পর জয়ার ঘরের দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। জয়া বুক ভরে দম নিয়ে দরজাটা খুলল। নাজনীন ঘরে ঢুকেই দরজাটা শব্দ করে আঁটকে দিল। ঘরের বাতিটা তখন নিভানো, কেবল জানালার পথে আসা চাঁদের আলোয় জয়াকে অপার্থিব সুন্দর লাগছে।
নাজনীন কাছে এগিয়ে এসে খুব নিচু স্বরে বলল,
“এত রাতে কালো শাড়ি পরে রূপ দেখানোর মানে কী? কী চাস তুই?নিজের সর্বনাশ নাকি আমার?”
জয়া একটু কাঁপল, কিন্তু পিছু হটল না। সে এগিয়ে এসে নাজনীনের শার্টের কলারটা নিজের আঙুলে জড়িয়ে ধরে ভেজা গলায় বলল,
“আপনি আমায় দিনের পর দিন এভাবে পুড়িয়ে আনন্দ পান কেন? আপনি আমায় অবহেলা করছেন।অবিশ্বাস করে আপনার অর্ধাঙ্গিনীকে অপমান করছেন।”
নাজনীন জয়ার চিবুকটা ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। তার নিশ্বাসে সিগারেটের গন্ধ, কিন্তু চোখে এক গভীর তৃষ্ণা। সে বলল,
“তোর নাম নাজনীন চৌধুরী ব্যতিত অন্য পুরুষের মুখে থাকবে কেন?”
“আপনি এখনও আমায় অবিশ্বাস করছেন?”
নাজনীন জয়াকে ছেড়ে দিয়ে বারান্দার নিকট এগিয়ে গেল।বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।জয়া নাজনীনের চওড়া পিঠ দেখতে পেল।নাজনীন বলল,
“অবিশ্বাস করছি না।”
“তাহলে কেন এত অবহেলা?”
“কাছে টানতে চাইলেই বা কবে কাছে এসেছিস?”
“আজ আসতে চাইছি।”
নাজনীন তবুও ফিরে তাকাল না।জয়ার ভয় হলো।গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে পেছন থেকে নাজনীনের চওড়া পিঠটা ছোট বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ভালোবাসা আছে কিনা জানি না,তবে আপনার অবহেলা আমায় জ্বালিয়ে মারছে।এই দহন আমার সহ্য হচ্ছে না।”
নাজনীন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জয়ার ছোট দুটি হাতের বাঁধন তার বিশাল পিঠের উপর যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়ল। নাজনীনের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, তবে সে নিজেকে ছাড়াল না। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে জয়া শুনতে পেল নাজনীনের তপ্ত নিঃশ্বাসের শব্দ।
নাজনীন এবার ধীরে ধীরে জয়ার বাঁধন আলগা করে ঘুরে দাঁড়াল। জয়াকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে তার চোখের গভীরে চোখ রাখল। নাজনীনের চোখের সেই প্রখর চাউনি আজ যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সে নিচু স্বরে, অনেকটা হিসহিসিয়ে বলল,
“এই মেয়ে,দহনের কী দেখেছিস তুই? তুই তো শুধু আগুনের শিখা দেখছিস, ভেতরে আমি প্রতিদিন যে কয়লা হয়ে পুড়ছি তার হদিস কী নিয়েছিস? ভালোবাসা থাক বা না থাক, তোর প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস আর প্রতি ফোঁটা চোখের পানি আমার নামে লেখা হয়ে গেছে। একবার যখন নাজনীন চৌধুরীকে কবুল করেছিস,তখন মৃ’ত্যু ছাড়া অন্য কোনো মুক্তি তোর নেই।”
জয়া অপরাধীর মতো তাকিয়ে রইল। নাজনীন ওর চুলের মুঠিটা আলতো করে ধরে মুখটা কাছে টেনে নিয়ে এলো। নিশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলল,
“কাছে আসতে চাস? জানিস তো, আমার কাছে আসা মানে নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দেয়া। মাঝপথে ফিরে যাওয়ার কোনো রাস্তা আমি রাখি না। আজ যদি এই অবহেলার দেয়াল ভেঙে তোর কাছে আসি, তবে মনে রাখিস—কাল থেকে তোর জীবন চলবে আমার হুকুমে। সহ্য করতে পারবি তো এই পরাধীনতা?”
জয়া কোনো উত্তর দিল না,বরং দিতে পারল না।কেবল দুহাতে নাজনীনের শার্টের বুকটা খামচে ধরল। নাজনীনের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে জয়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে শেষবারের মতো সতর্ক করল,
“তুই আমার অর্ধাঙ্গিনী—এই পরিচয়টা যেমন তোর গর্ব, তেমনি এই পরিচয়টাই তোর সবচেয়ে বড় শিকল। তোর ওই কাজলমাখা চোখে অন্য কারো প্রতিচ্ছবি দেখা তো দূর, অন্য কারো নাম তোর ঠোঁট স্পর্শ করার আগে আমি তোর রুহু টেনে ছিঁ’ড়ব।”
বাইরে তখন হঠাৎ করেই হাওয়ার বেগ বেড়ে গেল। ডালপালাগুলো নড়েচড়ে উঠে যেন জানান দিল, আজকের এই সমর্পণ জয়ার জীবনে নতুন কোনো তুফান নিয়ে আসছে।আজ জয়া বাঁধা দিল না।নাজনীজের অবাধ্য অনুভূতির সঙ্গী হলো সময়ের সাথে।নাজনীনের মতো এক অধৈর্যহীন পুরুষকে সামলানো কষ্ট হলেও জয়া সামলে নিল।
একান্ত মুহূর্তের সেই রেশ কাটেনি তখনও। জানলার ওপার থেকে আসা রূপোলি চাঁদটা আবছা আলো ছড়িয়েছে ঘরের ভেতর। জয়া নাজনীনের বুকের উপর মাথা রেখে স্থির হয়ে আছে, তার এলোমেলো চুলগুলো নাজনীনের বুকে ছড়িয়ে আছে। নাজনীনের তপ্ত নিশ্বাস জয়ার কানের লতিতে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে।
নাজনীন তার শক্ত বাহু দিয়ে জয়াকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তারপর জয়ার কানের একদম কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এভাবেই বাকি জীবন টুকু বুকের বা পাশে থেকে যাবি।আমার রাজ্যের একমাত্র রাণী বানিয়ে রাখব আজীবন।”
সকালে সবাই নাস্তা করার পর নুসরাত বাগানে এসেছিল আদিকে নিয়ে।মূলত শাওনের সাথে কথা বলার জন্যই বের হয়েছে।শাওন ঘনঘন কল দিয়ে তাকে পাগল বানিয়ে ফেলছে।শেষে বিরক্ত হয়ে নিজেই কল ব্যাক করল।ওপাশ থেকে কল রিসিভ করতে সময় লাগল না।নুসরাত গম্ভীর গলায় বলল,
“এত কল করছ কেন শাওন?”
শাওন বলল,
“তুমি আমার ছেলের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছ নুসরাত।তোমাকে কিন্তু জে’লের ভাত খাইয়ে ছাড়ব আমি।”
নুসরাত নরম গলায় বলল,
“তোমার ছেলে নিজেই তোমার সাথে সম্পর্ক রাখতে চায় না।শোনো,আমাকে প্লিজ বিরক্ত করা ছাড়ো।অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছি এবার।”
শাওন নিজেকে শান্ত করল।বলল,
“তোমরা নাকি আগামীকাল সিলেট যাচ্ছ?আমি সিলেটে যাচ্ছি।এখানে এসে লোকেশন পাঠাবে।আমি আদিকে দেখব।”
বলেই কল কেটে দিল শাওন।নুসরাত বিরক্ত হলো এতে।এই লোকটা কেন যে পিছু ছাড়ছে না তার!
আদি তখন দোলনায় গিয়ে বসেছে।নুসরাত তার পাশে বসল।বলল,
“আমরা তোমার মামুর সাথে সিলেট যাব না।তারা যাওয়ার সময় বায়না ধরবে না একদম।”
আদি বলল,
“তুমি না গেলে যেয়ো না।আমি আমার শ্বশুরের কোলে বসে যাব।”
“তোমার শ্বশুর?”
আদি উৎফুল্ল গলায় বলল,
“বড় মামুর মেয়েকে আমি বিয়ে করলে মামু তো আমার শ্বশুরই হবে,তাই না?আমার বউকে তাড়াতাড়ি এনে দিতে বলো মা।আমি ওকে নিয়ে ঘুরতে যাব।”
স্বার্থর মতো আদির মুখের লাগামটাও যেন দিন দিন ছুটে যাচ্ছে।এইটুকু বাচ্চা বিয়ের বোঝেই বা কী?এখনই যদি বিয়ের জন্য পাগল হয়,তাহলে বিয়ের পর কী হবে?নুসরাত ভীষণ চোটে আছে আদির উপর।এমনিতেই শাওনের সাথে ঝগড়া করে তার মেজাজ বিগড়ে আছে।আদি মায়ের রাগ দেখে ঠোঁট উল্টে বলল,
“তুমি শেহের ভাইকে বিয়ে করলে আমি আমার মামুর কাছে থাকতে পারব।স্বার্থ ভাই বলেছে,মামুর কাছে থাকলে আমাকে জামাই বানাবে।”
নুসরাত চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করে বলল,
“তোমাকে তোমার বাবার কাছে রেখে আসব আমি।তোমার সাথে কোনো কানেকশন রাখব না।”
আদি মুখ গম্ভীর করল।শাওনের কথা শুনলে তার রাগ হয়।আজও তাই হলো।গাল ফুলিয়ে বলল,
“তোমাকে আমি শেহের ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিব।তারপর আমি শেহের ভাইয়ের কাছে থাকব।”
“আবার বাজে কথা?কতবার বলেছি শেহের ভাইকে নিয়ে উল্টো-পাল্টা কথা বলবে না?সে তোমার মামা হয় আদি।”
আদি অর্ণর মতো কপাল কুঁচকে ঠোঁট চেপে বলল,
“আজ মামা হলেও কাল বাবা হবে।”
নুসরাত রেগে চিৎকার করার আগেই পাশ থেকে শেহের এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
“কণ্ঠস্বর নিচু রাখো রাতপাখি।”
নুসরাত শেহেরকে দেখে বলল,
“সবাইকে ছেড়ে-ছুঁড়ে আদিকে নিয়ে চলে গেলে খুশি হবে তোমরা?”
“আমাদের রেখে কোথায় যাবে রাতপাখি?”
“যেদিকে দুচোখ যায়।”
“যদি বলি দিন শেষে তোমার ওই দুচোখ আমার বুকে দৃষ্টি স্থির করবে?”
নুসরাত শেহেরের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দরা যেন গলায় এসে দলা পাকিয়ে গেল। শেহের দু-পা এগিয়ে এসে আদির মাথায় হাত রাখল। আদি তো খুশিতে ডগমগ! সে নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হাসল।
শেহের নুসরাতের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
“রাতপাখি, পালানোর পথ তুমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছ। যে আকাশের নিচে থাকো না কেন, তোমার গন্তব্য এই আমিতেই সীমাবদ্ধ।”
নুসরাত নিজেকে সামলে নিয়ে শেহেরের দৃষ্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে গলার স্বর যতটা সম্ভব শক্ত করে বলল,
“অহংকার তোমার চোখের মণি শেহের ভাই।জোর করে কাউকে নিজের করে রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু আগলে রাখা যায় না।”
শেহের একটু হাসল। সেই হাসিতে বিদ্রূপ নাকি অধিকারবোধ ছিল, তা বোঝা দায়। সে শান্ত গলায় বলল,
“আমি তো জোর করছি না। শুধু বলছি, সময় হলে তুমি নিজেই ধরা দেবে। যেমনটা আজ এই অবুঝ বাচ্চাটা আমাকে তোমার জীবনের সাথে জড়িয়ে দিচ্ছে। আদি যা বলেছে, সেটা কী ওর মনের কথা নাকি তোমার অবচেতনের প্রতিধ্বনি?”
নুসরাত রেগেবলল,
“আদি ছোট বাচ্চা, ও কী বোঝে? আর স্বার্থ ভাই ওর মাথাটা পুরো খাচ্ছে।তোমরা সবাই মিলে ওকে নষ্ট করছ!”
শেহের এবার নুসরাতের একদম কাছে এসে দাঁড়াল। নুসরাত পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু পেছনে তখন দেয়াল। শেহের দু-হাত দু-পাশে রেখে নুসরাতকে একপ্রকার খাঁচায় বন্দি করে ফেলল।ওর কানের খুব কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আদি হয়তো বাচ্চা, কিন্তু ওর স্বপ্নগুলো বড্ড স্পষ্ট। ও যা চায়, আমি তা-ই দেব। আর ও যদি আমাকে বাবা হিসেবে চায়, তবে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার সাধ্য তোমারও নেই রাতপাখি।আমার অধিকার যেদিন শুরু হবে, তোমার জেদ সেদিন হার মানতে বাধ্য।”
নুসরাতের হূদস্পন্দন বেড়ে গেল। শাওনের সাথে ঝগড়া, আদির পাগলামি আর এখন শেহেরের এই আক্রমণাত্মক সান্নিধ্য—সব মিলিয়ে সে যেন দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সে শেহেরকে ঠেলে সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“সরে দাঁড়াও! বাড়ির লোকজন দেখলে কী ভাববে?যখন তখন কাছে আসা বন্ধ করো।”
নুসরাত রেগে-মেগে হাঁটা ধরল বাড়ির দিকে।গায়ের নীল রঙের ওড়নাটা তখন বাতাসে দুলছে।শেহের ঠোঁট টিপে সেই দৃশ্য দেখে গলা উঁচিয়ে বলল,
“শোনো রাতপাখি,রেগে গেলে কিন্তু তোমায় বড্ড আদুরে পাখির মতো লাগে।”
নুসরাত পিছু ঘুরল না তবুও।আদি খিলখিল করে হেসে উঠল।শেহেরের কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,
“মাকে বিয়ে করবে কবে?তোমার বিয়ে হলে আমিও বিয়ে করব।”
শেহের নিচে বসে কপাল কুঁচকে বলল,
“তোর শ্বশুরের মেয়ে পৃথিবীতে আসতে এখনও অনেক দেরি।তুই বুড়ো হলে তোর শ্বশুর তোকে মেয়ে দেবে?”
আদি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“স্বার্থ ভাই বলেছে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করতে।যদি না বিয়ে করে গালের মধ্যে দেব এক চড়।বেয়াদব শাশুড়ির মেয়ে বেয়াদব হলে খুব মারব আমি।”
শেহের শব্দ করে হেসে উঠল।অর্ণর মিনি কপি হচ্ছে আদি।পা থেকে মাথা অব্দি পুরোটাই অর্ণর নকল।মন্দ হবে না অর্ণর জামাই যদি আদি হয়।
দুপুরের খানিক আগ দিয়ে ড্রয়িংরুমে সবাই আলোচনায় বসেছিলেন।মূলত চৌধুরী বাড়ি থেকেই অর্ণ সিলেট যাবে।মাশফিক চৌধুরীও বলছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সেরে ফেলতে।নুসরাত হাঁসফাস করছে খানিকক্ষণ ধরে।নিশা তা খেয়াল করে বলল,
“আপু কিছু বলবি?এমন করছিস কেন?”
নুসরাত ওড়না চেপে অর্ণকে বলল,
“আমি সিলেট যাব না ভাইয়া।কাজ শেষে তোমরা সবাই ঘুরে এসো।আমি আর আদি আব্বু-আম্মুর সাথে গুলশান চলে যাই।”
অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“কেন?আমি সবার যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি আগেই।আজ হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত কেন?”
আদি অর্ণর কোল থেকেই গাল ফুলিয়ে বলল,
“ওই পঁচা লোকটা মাকে কল করেছিল।ওই আঙ্কেল সিলেট আসবে বলেছে।”
মাশফিক চৌধুরী মেয়ের মলিন মুখের দিকে তাকালেন।নুসরাত বাবার পাশেই বসেছিল।তিনি হাত রাখলেন নুসরাতের মাথায়।পর-মুহূর্তে নুসরাতের ছোট ছোট হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেন,
“বাবা থাকতে এত ভয় কীসের আম্মু?বাবা আমি আছি না?আমি তোমায় স্বাধীনতা দিয়েছি,তুমি তোমার স্বাধীনতা উপভোগ করবে।আদিকে নিয়ে এত চিন্তার তো কিছু নেই।আমি আছি,তোমার মা আছে,তোমার চারজন ভাই আছে—তাহলে ভয় কীসের?”
নুসরাত ডুকরে উঠল।আদি মুখ ফুলিয়ে মায়ের কান্না দেখে অর্ণর বুকে মুখ লুকাল।মাশফিক চৌধুরী মেয়ের কাঁপতে থাকা হাত দুটো ফের নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরলেন। তিনি জানেন, এই মুহূর্তে নুসরাতকে মানসিকভাবে শক্তি জোগানোই সবচেয়ে বড় কাজ। তিনি অর্ণর দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু একটা বললেন।
অর্ণ আদির মাথায় হাত বুলিয়ে নুসরাতের পাশে এসে বসল।মাশফিক চৌধুরী শাসনের বদলে তার গলায় এখন রাজ্যের মায়া।তিনি মৃদু স্বরে বললেন,
“শোনো নুসরাত, পালিয়ে বেড়ানো কোনো সমাধান না। শকুনের ভয়ে যদি আকাশ ওড়া ছেড়ে দাও,তবে সে তোমায় মাটিতেই ছিঁড়ে খাবে।সিলেট তুমি যাচ্ছ,এটা আমার শেষ কথা। কার সাধ্য আছে আমার নাতির গায়ে হাত দেয়?”
অর্ণ বলল,
“নুসরাত, ভয়টা তুই মনে পুষে রাখছিস দেখেই ও সুযোগ পাচ্ছে। তুই কী ভাবছিস তোর ভাইরা থাকতে কেউ তোর কাছ থেকে আদিকে কেড়ে নিতে পারবে? শাওন যদি সিলেটে আসার সাহস করে, তবে সে আসবে কেবল নিজের অপমানটা সচক্ষে দেখার জন্য। তুই যাবি এবং মাথা উঁচু করেই যাবি।”
নুসরাত ভিজে গলায় বলল,
“ভাইয়া, ও যখন আদিকে নিজের ছেলে বলে দাবি করে সবার সামনে সিনক্রিয়েট করে, তখন আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি চাই না আদি এসব নোংরামির ভাগীদার হোক।”
মাশফিক চৌধুরী মেয়ের চিবুক উঁচিয়ে ধরলেন। তাঁর কণ্ঠে এক পাহাড় সমান দৃঢ়তা,
“বাবা হিসেবে আমি তোমায় বলছি—অতীতের কোনো ছায়া যদি তোমার বর্তমানকে গ্রাস করতে চায়, তবে সেই ছায়াকে মুছে ফেলার ক্ষমতা এই মাশফিক চৌধুরী রাখে। তুমি মাশফিক চৌধুরী বাড়ির মেয়ে, এটা ভুলবে না। শাওন বা অন্য কেউ, কারো সাধ্য নেই তোমার এই অধিকার আর আদিকে তোমার থেকে বিচ্যুত করার। আমার উপর কী তোমার ভরসা নেই?”
নুসরাত বাবার বুকে মাথা রাখল। বাবার গায়ের চেনা ঘ্রাণ আর অর্ণর পাশে থাকাটা তাকে একটু সাহস জোগাল।কায়নাত পাশেই ছিল।পেটের কথা চেপে রক্তে না পেরে সাহস নিয়ে বলল,
“আদির বাবারও তো অধিকার আছে আদির উপর।”
মাশফিক চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন,
“তা আছে।তবে ডিভোর্সের সময় শাওন একবারও বলেনি সে আদিকে নিজের কাছেও মাঝে মধ্যে রাখবে।আজ এত বছর পর আদিকে নিয়ে কেন এত টানা-টানি করছে সত্যিই বুঝতে পারছি না।”
কায়নাত আদির দিকে তাকাল।আদি চোখ ডলতে ডলতে ফের অর্ণর কোলে উঠে ওর গলা জড়িয়ে ধরল।অর্ণ নরম চুমু খেল ওর গালে।নাক কুঁচকাল সে।সেখানে আলোচনা শেষ হওয়ার পর রাতে জামা-কাপড় গোছানো শুরু হলো।নিশা,জারা আর নিধি ছাদে এসেছিল খানিকক্ষণ আগে।সবাই যাচ্ছে সিলেট,তবে নিধির মন টানছে না।কাল থেকে সোহান ছেলেটা বড্ড জ্বালাচ্ছে তাকে।ফোন নাম্বার দিয়ে বড্ড বড় ভুল করে ফেলেছে বেচারি।বিরক্ত হয়ে ফোনই বন্ধ করে রেখেছে।জারা চাঁদের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“আচ্ছা,আদির মা-বাবার ডিভোর্স হয়েছিল কেন?”
নিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“শাওন ভাইয়ার চরিত্র খারাপ।”
“তাই বলে ডিভোর্সের পর ছেলেকে ভুলে যাবে?আর এখন ওইটুকু বাচ্চাকে নিয়েই এত ঝামেলা?”
নিশা ঠোঁট উল্টাল।সে নিজেও বুঝতে পারছে না আদিকে দিয়ে শাওনের কাজ কী!আজ এত বছর পর হুট করেই ছেলের প্রতি ভালোবাসা উতলেই বা পড়ছে কেন?তখন ছাদে এলো প্রেম,আদাল,আয়মান আর স্বার্থ।স্বার্থ হেলে-দুলে এসে সোজা নিশার পাশে এসে বসল।পর পর নিশার কোলে মাথা রাখতেই প্রেম দাঁত চেপে বলল,
“তোমার ভু’ড়ি কেটে চটকে ফেলব কিন্তু স্বার্থ ভাই।আমার সামনে আমার বোনের কোলে মাথা রেখেছ কেন?”
স্বার্থ ‘চ’ শব্দ উচ্চারণ করল।
“প্রেমটাও কী এখন করতে পারব না ভাই?তোর বউ নিয়ে পালিয়েছি আমি?সতীনের মতো সব সময় গলায় ঝুলে থাকিস কেন?”
আদাল ওদের থামিয়ে দিয়ে বলল,
“উফ!থামবে তোমরা?”
প্রেম দাঁত কটমট করে নিধির পাশে গিয়ে বসল।আদাল চোরা চোখে জারাকে দেখে নিকটে এগিয়ে এসে বলল,
“চড়ুই পাখির পাশে বসা যাবে?”
জারা জায়গা করে দিল বড় পাটিতে।সবাই সেখানে বসতেই স্বার্থ নিশার লাজুক মুখের দিকে তাকাল।গাল খানা লাল টুকটুকে রূপ ধারণ করেছে।ভাইয়ের ভয়ে সে হাত গুটিয়ে রেখেছে।কিন্তু অবাধ্য মন তো চাচ্ছে স্বার্থর এই চুলের ভাজে আঙুল চালাতে।স্বার্থর নাকটা ছুঁয়ে দিতে।ইচ্ছে করছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এই লম্বা রাতটা পার করতে।
সবাই বড় পাটিতে বসে আড্ডায় মশগুল, অথচ সবার মাঝখানে বসেই স্বার্থ যা করছে তা রীতিমতো দুঃসাহস। সে আয়েশ করে নিশার নরম কোলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। নিশা আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে, কারণ একটু দূরেই প্রেম সতীনের মতো নজর রাখছে।
স্বার্থর তাতে কোনো হেলদোল নেই। সে নিশার গায়ের ওড়নাটার একটা কোনা টেনে নিজের নাকের কাছে ধরল। নিশা নিচু স্বরে ধমক দিয়ে বলল, “স্বার্থ ভাই, কী করছ? ভাইয়া দেখলে কিন্তু আজ আর রক্ষে নেই!”
স্বার্থ সে কথায় কানই দিল না। ওড়নার ভাঁজে নাক ঘষে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোর ওড়নায় বড্ড নেশা সোনা! একদম তোর মতো মিষ্টি। উফ! এই ঘ্রাণটা নিয়েই তো সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে।”
নিশা লজ্জা আর ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। স্বার্থ এবার একটু মাথা তুলে নিচু স্বরে বলল,
“এই সোনা, চল না আজ রাতেই পালিয়ে বিয়েটা করে ফেলি? এই সবার আড়ালে প্রেম-প্রেম খেলা আর ভালো লাগছে না। তোকে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে কোলে তুলে নিয়ে চলে যাই? যাবি আমার সাথে?”
নিশা দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল,
“পাগলামি ছাড়ো তো! ভাইয়ার সামনে থেকে আগে উঠে দেখাও তো, তারপর বিয়ের কথা ভাববে।”
স্বার্থ মুচকি হাসল। সুযোগ বুঝে নিশার কানের একদম লতির কাছে ঠোঁট ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“প্রেম শুধু তাকিয়েই থাকবে, কিছু করতে পারবে না। কারণ ও জানে, এই নিশু শুধু এই স্বার্থরই। কাল সিলেট গিয়ে কিন্তু তোকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল হতে দেব না। রেডি থাকিস আমার বউ হওয়ার জন্য!”
নিশার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। সে আলতো করে স্বার্থর চুলে আঙুল চালিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“খুব তো বড় বড় কথা! দেখা যাবে সিলেটে গিয়ে কার সাহস কতটুকু।”
ছাদের আড্ডা তখন জমে উঠেছে, কিন্তু প্রেমের বুকের ভেতরটা কাল থেকেই দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। নিধি পাশে বসে থাকলেও তাদের মাঝে যেন এক যোজন দূরত্ব।
প্রেম পাটি আঁকড়ে বসে আছে। সে বারবার আড়চোখে নিধির দিকে তাকাচ্ছে। নিধি আজ বড্ড শান্ত, তার চঞ্চলতা যেন ওড়নার ভাঁজে কোথাও হারিয়ে গেছে। প্রেমের সেই প্রখর, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিধির মুখশ্রীতে গেঁথে আছে—যেন সে নিধির মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতাটুকু খুঁড়ে বের করতে চায়।
নিধি একবার সাহস করে প্রেমের দিকে তাকাল। অমনি দেখল, প্রেমের সেই তপ্ত চাউনি সরাসরি তার চোখে গিয়ে বিঁধছে। নিধির চোখ দুটো মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল। ওই এক পলকের চাহনিতে কত হাজারও অভিযোগ, কত না বলা কথা! কিন্তু প্রেমের ওই প্রখর দৃষ্টির সামনে সে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারল না। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠতেই নিধি দ্রুত দৃষ্টি নামিয়ে নিল।
নিধির এই অসহায়ত্ব দেখে প্রেমের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে নিচু স্বরে, কেবল নিধি শুনতে পায় এমনভাবে বলল,
“কাল যারা এসেছিল, তাদের খুব পছন্দ হয়েছে বুঝি? তাই চোখমুখ এমন অন্ধকার করে রেখেছিস?”
নিধি উত্তর দিল না, কেবল নখ দিয়ে পাটির একটা কোনা খুঁটতে লাগল। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। প্রেম এবার একটু ঝুঁকে নিধির কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“তোর মৌনতা আমায় পোড়াচ্ছে নিধি। সাহিত্যিকেরা বলে বিরহ সুন্দর, কিন্তু তোর এই বিষণ্ণ মুখ আমার কাছে বিষাদসিন্ধু।তোর হাসির সবটুকু অধিকার আমি অনেক আগেই নিজের নামে করে রেখেছি। কালকের ওই বসন্তের বাতাস তোকে ছুঁতে পারলেও, তোর মনটা ছোঁয়ার অধিকার কেবল এই প্রেমের।”
নিধি অসহায় কণ্ঠে বলল,
“সব কিছু আমাদের হাতে থাকে না।”
“কেন থাকবে না?বিরহে পাগল হয়ে যাচ্ছিস?আমি বলেছি না,আমি থাকতে চিন্তার কোনো কারণ নেই?”
“দাদা যে বিয়ে ঠিক করে ফেলল?”
“তোর দাদাকেই বিয়ে দিব,দাঁড়া।”
“আজ বেয়াদব মহিলার মুখ কালো কেন?”
কায়নাত চোখ কটমট করে বলল,
❝আপনি শুধু আদিকে আদর করেন।আমিও তো ছোট,তাহলে আমায় শুধু বকেন কেন?আমার খারাপ লাগে না?❞
অর্ণ ঠোঁট নেড়ে বলে,
❝আপনার আদর লাগবে ম্যাডাম?❞
“হুম।”
“কাছে আসেন।”
কায়নাত ভাবল স্বামী বোধহয় একটু সোহাগ করবে।মেয়েটা লজ্জা নিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল।অর্ণ যেহেতু সোফায় বসে ছিল,তাই কায়নাত নিকটে আসতেই হঠাৎ হাত টেনে নিজ কোলে বসাল কায়নাতকে।উষ্ণ ঠোঁট ঘাড়ে রাখতেই কায়নাত ঠোঁট কামড়ে ধরল।কাঁপাকাঁপি শুরু হলো মেয়েটার।ঘাবড়ে গেল এত গভীর ছোঁয়ায়।শিরশির করছে পায়ের পাতা।অর্ণ নাক ঘষলো গলায়।কায়নাত জড়াল গলায় বলল,
“কী করছেন?”
অর্ণ নিভু কন্ঠে বলল,
“আদর করছি।”
“আমি এমন বেহায়াপনা আদর চাইনি।”
“তাহলে কেমন আদর চাই আপনার?”
লজ্জায় লাল হলো গাল।মিনমিন কণ্ঠস্বর ভেঁসে এলো গলা দিয়ে,
“আদিকে যেমন করে কোলে নিয়ে চুমু খান,অমন আদর।”
কথা খানা বলে যেন নিজেই বড্ড লজ্জায় পড়ল।অর্ণ সত্যি সত্যি আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল কায়নাতের গালে।মেয়েটা লজ্জায় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ধরফড়িয়ে উঠে বসল সোফা থেকে।হতভম্ব হয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে বুকে থুথু দিল কয়েকবার।ঘরে তো কেউ নেই।ওই বজ্জাত লোকটা তার স্বপ্নে এসেও শান্তি দিচ্ছে না?কী বেহায়া লোক!
শীঘ্রই রুমের দরজায় টোকা পড়ল। কায়নাত নিজের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে নিয়ে গলা ঝেড়ে বলল,
“কে?”
বাইরে থেকে আদি ছোট ছোট পায়ে ঢুকে এলো।প্যান্ট এর পকেটে হাত গুঁজে গম্ভীর হয়ে ঘরে ঢুকে কায়নাতকে দেখে হেলে-দুলে বিছানার চাদর খামছে উঠল বিছানায়।কায়নাত চোখ পাকাল।এই বিচ্ছুটা তার স্বামীর ভাগ বসিয়েছে।কায়নাত আঁচল গুঁজল কোমরে।কোমরে হাত রেখে চোখ পাকিয়ে বলল,
“এখানে কী চাই?”
আদি চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“মামু বলেছে আজ আমাকে এখানে ঘুমাতে।”
নাক ফুলে উঠল কায়নাতের।
“এই ছেলে!তুমি এখানে ঘুমাবে কেন?তুমি তোমার মামুকে নিয়ে ঘরের বাইরে ঘুমাও।”
“এটা আমার মামুর ঘর।”
“এটা আমার ঘর।”
“আচ্ছা?তা ম্যাডাম আপনার নাম লেখা আছে এই ঘর যে আপনার?” অর্ণর কণ্ঠস্বর পেয়ে কায়নাত ফট করে দরজার দিকে তাকাল।অর্ণ বুকে হাত গুঁজে দেয়ালের সাথে হ্যালান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কায়নাত শুষ্ক ঢোক গিলে মুখ ঘুরিয়ে নিল।বলল,
“আপনার আদুরের ভাগ্নে এখানে ঘুমাবে কেন?”
“আমি বলেছি তাই।”
অর্ণর সোজাসাপ্টা উত্তরে কায়নাতের মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে গাল ফুলিয়ে আদিকে একবার দেখল, যে কিনা বিজয়ী হাসি হাসছে। কায়নাত রাগে গজ গজ করতে করতে বলল,
“হ্যাঁ, আপনার তো ভাগ্নেই সব। আমি তো এই বাড়িতে কেবল শোপিস হয়ে থাকতে এসেছি, তাই না?”
অর্ণ একটু বাঁকা হেসে কায়নাতের সামনে এসে দাঁড়াল। আদির সামনে খুব একটা ঘনিষ্ট হতে পারছে না দেখে একটু দূরত্ব বজায় রেখেই ফিসফিস করে বলল,
“হিংসা হচ্ছে ম্যাডাম? পিচ্চি একটা বাচ্চার সাথে পাল্লা দিচ্ছেন?”
কায়নাত মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
“হিংসা হবে কেন? বয়েই গেছে আমার! আপনি বরং আপনার ওই আদরের আদি সোনাকে নিয়ে সারা রাত গল্প করুন, আমি পাশের রুমে গিয়ে ঘুমাচ্ছি।”
কথাটা বলে কায়নাত হনহনিয়ে চলে যেতে চাইলে অর্ণ চট করে ওর কবজি চেপে ধরল।অর্ণর শক্ত হাতের বাঁধনে কায়নাত থমকে দাঁড়াল। মোচড় দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে ঝাঁঝাল গলায় বলল,
“হাত ছাড়ুন বলছি! আমি নিচে গিয়েই শোব। আপনাদের এই মামা-ভাগ্নের ন্যাকামি দেখার ধৈর্য আমার নেই।”
অর্ণ হাত না ছেড়ে কায়নাতকে নিজের দিকে একটু টেনে এনে গম্ভীর মুখে বলল,
“বেয়াদবি করবেন না। আদির সামনে এসব কী হচ্ছে? ও ছোট বাচ্চা,ও কী ভাববে?”
“ও কী ভাববে তা দিয়ে আমার কাজ নেই!” কায়নাত এবার সত্যিই রেগে আগুন।এইটুকু একটা বাচ্চাকে কেউ এত হিংসা করে?তাও আবার শুধু মাত্র অর্ণ ওকে আদর করে বলে!ও ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে আলমারি থেকে একটা পাতলা তোষক আর বালিশ টেনে বের করল। তারপর বিছানার ঠিক পাশেই সশব্দে মেঝেতে বিছানা পাততে শুরু করল।
আদি এতক্ষণ চুপচাপ ওদের কান্ড দেখছিল। কায়নাত যখন বালিশটা মেঝেতে আছাড় দিয়ে রাখল, তখন আদি বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে নখ কামড়াতে কামড়াতে খুব চিন্তিত মুখে বলল,
“ভাবি,তুমি মামুর সাথে না শুয়ে নিচে গেলে কেন? স্বার্থ ভাই তো বলেছে তোমরা একসাথ না থাকলে আমার বউ তাড়াতাড়ি পৃথিবীতে আসবে না।”
আদির কথা শুনে কায়নাত আর অর্ণ—দুজনেই যেন পাথরের মতো জমে গেল। কায়নাত থতমত খেয়ে মেঝেতে বসা অবস্থাতেই আদির দিকে তাকিয়ে তোতলামি করে বলল,
“কী… কী বললে?”
আদি খুব সিরিয়াস মুখে আবার বলল,
“স্বার্থ ভাই বলেছে, তোমরা যদি আলাদা ঘুমাও বা ঝগড়া করো, তবে আল্লাহর কাছে সিগন্যাল যাবে না। আর সিগন্যাল না গেলে আমার বউ পৃথিবীতে আসবে না।মামু,ভাবিকে উপরে নিয়ে আসো না! আমার বউ না আসলে আমি কার সাথে খেলব?”
অর্ণর অবস্থা তখন শোচনীয়। ও এক হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল, হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না। কায়নাতের গাল লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে গেছে। ও চট করে উঠে দাঁড়িয়ে আদিকে বকা দেওয়ার জন্য মুখ খুলল,
“আদি! এসব ফালতু কথা কে শিখিয়েছে তোমাকে?”
অর্ণ ঠোঁট টিপে বলল,
“বাচ্চাটার খুব শখ একটা বউয়ের। ওর শখ পূরণ করবেন না ম্যাডাম? নাকি সারারাত এভাবে হিংসা করেই কাটিয়ে দেবেন?”
(বিশাল বড় পর্ব দিয়েছি।রেসপন্স করুন বেশি বেশি।#প্রেমবসন্ত বই প্রি-অর্ডার চলবে আর কিছুদিন।যারা বই অর্ডার করেননি এখনই করে ফেলুন।)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩১.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৩৪.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮