নতুন প্রেমের গান
পর্ব_০২
নুজাইফা_নূন
“আমি নোরাকে নয় ,সুপ্রভাকে বিয়ে করতে চাই।”
সুপ্রভার হাতে মিষ্টির প্লেট ছিল।সিয়াদাতের কথাটা কর্ণগোচর হতেই আচানক তার হাত থেকে প্লেট টা নিচে পড়ে যায়।সেই সাথে কেঁপে ওঠে তার জীর্ণশীর্ণ বুক।হাসি ,খুশি আনন্দে মেতে থাকা ড্রয়িং রুমে সহসা নীরবতা নেমে আসে। মোহনা শেখের মুখে চমক, নোরা স্তব্ধ, ঈশিতা চৌধুরী ,রওনক চৌধুরী দুজনের চোখেই কৌতূহল মিশ্রিত বিস্ময়। মোহনা শেখ হতভম্ব ভাব সামলিয়ে সিয়াদাতের দিকে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। ক্রুদ্ধ স্বরে বলেন –
“একটা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করবে? আর ইউ ক্রেজি? ডু ইউ হ্যাভ অ্যানি আইডিয়া হোয়াট ডিড ইউ সে?”
সিয়াদাত এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। ড্রয়িং রুমের বাতাস যেন আরো ভারী হয়ে ওঠে।মোহনা শেখের কঠিন দৃষ্টির ভেতরেও সে চোখ সরায় না। তার চোখে চোখ রেখে আগুনঝরা গলায় বলে–
“ইয়াহ!আই নো হোয়াট আই সেড।”
মোহনা শেখের চোখ র’ক্তবর্ণ ধারণ করে।তিনি তিক্ত গলায় বলেন–
“ তোমার মাথার ঠিক নেই। তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ।”
সিয়াদাত অস্পষ্ট ভাবে হাসে। গম্ভীর গলায় বলে–
“ তুমি ঠিকই বলেছ আম্মু।আমার মাথার ঠিক নেই।ভীত তরুণীর চোখের গভীর খাদে পড়ে আমার ব্রেইন সর্ট সার্কিট হয়ে নেগেটিভ পজেটিভ সব এক হয়ে গিয়েছে।তবে আমি পাগল নই। পাগল হলে এই মুহূর্তে আমি পাবনা থাকতাম। তোমাদের সকলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সাধ্য আমার ছিলো না।”
মোহনা শেখের হতভম্ব ভাব আরো প্রবল হয়।তিনি নিজের চোখ, কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
এ কোন সিয়াদাতকে দেখছে সে? যে সিয়াদাত সর্বদা মেপে মেপে কথা বলে, সেই সিয়াদাত আজ অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। বিরক্তিতে ঠোঁট বেঁকে আসে তার।তিনি বারকয়েক শ্বাস টেনে নিজের রাগ সংবরণ করার চেষ্টা চালান। কিন্তু তার রাগ ক্রমশ বাড়ছে বৈ কমছে না। ইচ্ছে করছে মেয়েটার গালে ঠাটিয়ে চড় দিতে। শুরুতেই মেয়েটার জন্য ঈশিতা চৌধুরীর কাছে নাক কাঁটা গেছে তার। এখন আবার নিজের ছেলে তাকে কথা শোনাচ্ছে! মোহনা শেখের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়।তিনি র’ক্তচক্ষু নিয়ে এগিয়ে আসেন সুপ্রভার দিকে। চোখ মুখ শক্ত করে কঠিন গলায় কিছু বলতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে ঈশিতা চৌধুরীর ঝাঁঝালো গলা শোনা যায় –
“ মোহনা তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছো , তুমি এই মুহূর্তে চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িং রুমে দাড়িয়ে রয়েছ। আর সুভা চৌধুরী বাড়ির’ই বউ।সুভাকে কিছু বলার রাইট তোমাকে দেওয়া হয়নি।সো বি কেয়ারফুল।”
মোহনা শেখ কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে তাকিয়ে রইলেন। চোখে র’ক্ত, মুখে ক্রোধ নিয়ে তেড়ে আসেন সিয়াদাতের দিতে।সিয়াদাত সোফায় বসে অবলীলায় পা নাচাচ্ছে।এমন ভাব করছে যেন কিছুই হয়নি।সিয়াদাতের এমন নির্লিপ্ততা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন মোহনা শেখ।বিরক্ত গলায় বলেন–
“ অনেক নাটক হয়েছে সিদায়াত।এবার প্লিজ বাড়ি চলো।”
সিয়াদাত ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে –
“ বাড়ি যাবো মানে? বিয়ের পাকা কথা বলবে না?”
মোহনা শেখের গলার স্বর খাদে নেমে আসে– “ তোমার হুট করে কী হলো বেটা?তোমাকে আজ বড্ড অচেনা লাগছে।তুমি তো এমন ছিলে না। আমি বরাবরই তোমার কাঠখোট্টা রুপ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু আজ এ কোন রুপ দেখছি তোমার?এমন বাচ্চামো করছো কেন বেটা?”
সিয়াদাত শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল— “ লাইক সিরিয়াসলি? একজন প্রফেসরকে বাচ্চা মনে হচ্ছে তোমার? তোমার কি মনে হয় আমি বিশ , বাইশ বছরে প্রফেসর হয়েছি? আমি থার্টি প্লাস আম্মু।এখন আমার বাচ্চার বাচ্চামো করার বয়স।আমার না।”
মোহনা শেখ প্রসঙ্গ পাল্টে বলেন– “ আমার বড্ড মাথা ব্যাথা করছে। বিশ্রামের প্রয়োজন আমার। প্লিজ বাড়ি চলো।”
সিয়াদাত কঠিন গলায় বলল— “ এখানে আসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিলো না আমার।তুমি আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে নিয়ে এসেছে। মেয়ে দেখতে এসেছি, মেয়ে পছন্দও হয়েছে।তাহলে আর কিসের অপেক্ষায় রয়েছো? বিয়ের দিনক্ষণ
পাকা করছো না কেন?”
মোহনা শেখ সিয়াদাতের হাত ধরে টানতে টানতে বলেন– “ বিয়ে করতে হবে না।চলো।”
সিয়াদাত মুখ অন্ধকার করে বলে– “ বিয়ে করতে হবে না বললেই হলো।ভাগ্য ফেরাবার জন্য হলেও পুরুষ মানুষের বিয়ে করতে হয়।কথায় আছে না স্ত্রী ভাগ্য ধন।”
মোহনা শেখ কটমটে দৃষ্টিতে সিয়াদাতের দিকে তাকান।সিয়াদাত কুটিল হেসে বলে–
“ এটা আমার কথা নয় আম্মু। হুমায়ূন আহমেদের কথা।”
“ ভাগ্য ফেরাতে বিধবা মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে, এটা নিশ্চয়ই হুমায়ূন আহমেদ বলে দেন নি?”
“আমি কোনো বিধবাকে বিয়ে করতে চাই না আম্মু। আমি সুপ্রভাকে বিয়ে করতে চাই। একজন মানুষকে বিয়ে করতে চাই। তুমি জানো না কবি বড়ু চণ্ডীদাস বলেছেন ,
“ সবার উপরে মানুষ সত্য , তাহার উপরে নাই।”
সো প্লিজ বারবার বিধবা, বিধবা শব্দটা উচ্চারণ করো না আম্মু ।আমার কানে লাগছে।”
সুপ্রভা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।চোখ বেয়ে আপনাআপনি গড়িয়ে পড়ছে নোনাজল। তাকে ঘিরে এতো কথা, এতো চিৎকার চেঁচামেচি সহ্য করতে পারছে না সে। অবশ্য তার জন্য এই দৃশ্য নতুন না।এর আগেও সে এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। নোমান মা’রা যাওয়ার পর সুপ্রভা ঘরকুনো হয়ে যায়। নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে সারাক্ষণ ঘর অন্ধকার করে বসে থাকে। ঈশিতা চৌধুরী চিন্তিত হয়ে পড়েন।তার নাড়ী ছেঁড়া ধন তাকে ছেড়ে চলে গেছে।যদি মেয়েটাও ধুঁকে ধুঁকে মা’রা যায়, তখন তিনি কী নিয়ে বাঁচবেন? সুপ্রভাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। প্রকৃতির নিয়মে দিন যায়,রাত আসে।দেখতে দেখতে নোমানের মৃ’ত্যুর দুই মাস পার হয়ে যায়।
সহসা একদিন ঈশিতা চৌধুরীর বাবার বাড়ি থেকে জরুরী তলব আসে।তার ভাইয়ের মেয়ে পুনমের বিয়ে ঠিক হয়েছে। দু’দিন বাদেই এনগেজমেন্ট হবে। রওনক চৌধুরী তখন দেশের বাইরে থাকায় ঈশিতা চৌধুরী নোরা আর সুপ্রভাকে নিয়ে বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।সুপ্রভাকে দেখে সবাই খুব খুশি হয়।তাকে আপন করে নেয়।।সুপ্রভাও নিজের ভেতরের দুঃখ কষ্ট বালিশ চাপা দিয়ে সবার সামনে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে। সবই ঠিক ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে পুনমের এনগেজমেন্টের দিন।পুনমের হাতে রিং পরানোর আগ মুহূর্তেই বেঁকে বসে পাত্র।সে পুনমকে নয়, সুপ্রভাকে বিয়ে করতে চায়।এই নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। লজ্জায় পরাস্ত সৈনিকের মতো মাথা নিচু হয়ে যায় সুপ্রভার। এক পর্যায়ে পুনমের বিয়েটাই ভেঙ্গে যায়।
“ তুমি আসলেই একটা অপয়া , অলক্ষ্মী। তুমি শুধু ভাঙ্গতেই জানো, গড়তে জানো না। একসময় আমার ভাইয়ার সব স্বপ্ন তুমি ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিলে।আর আজ আমার স্বপ্ন ভেঙ্গে দিলে তুমি।তোমার কখনো ভালো হবে না।কখনোই না।আমি তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি।”
নোরার তিক্ত কণ্ঠে ভাবনার সুতা কাটা গেল সুপ্রভার।সে সন্তর্পণে চোখের পানি মুছে নেয়। শুকনো হাসি হেসে বলে–
“ তুমি আমাকে অপয়া ,অলক্ষ্মী বলতেই পারো। সেই রাইট আছে তোমার। কিন্তু আমি না তোমার ভাইয়ার স্বপ্ন ভেঙ্গেছি, আর না তোমার স্বপ্ন ভাঙ্গতে চাইছি। সুতরাং আমাকে অযথা ব্লেম করা বন্ধ করো।”
নোরার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠে।সে দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করে উঠে —
“ আমার তিলে তিলে গড়ে তোলা স্বপ্নকে তুমি এক নিমিষেই শেষ করে দিয়েছ।আবার বড় মুখ করে বলছো তুমি কিছু করো নি?”
“ হ্যাঁ।আমি কিছু করি নি।”
“ইউ ব্লাডি বিচ! আমার মুখে মুখে তর্ক করো তুমি। তোমাকে তো…” বলেই নোরা সুপ্রভাকে থাপ্পড় দিতে যায়। কিন্তু দিতে পারে না।তার আগেই একটা শক্ত পুরুষালী হাত এসে নোরার হাত আটকে দেয়।”
চলবে ???
[ সবাই ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিবেন।গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। না হলে উৎসাহ হারাব 🥹]
Share On:
TAGS: নতুন প্রেমের গান, নুজাইফা নূন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ১
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৩
-
নতুন প্রেমের গান পর্ব ৪
-
নতুন প্রেমের গান গল্পের লিংক