Golpo romantic golpo প্রণয়ের রূপকথা

প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৯


প্রণয়ের_রূপকথা (৯)

দীপ্র, কুঞ্জ আর কণার খাবারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর তাদেরকে চিয়ার্স করে যাচ্ছে রাত্রি। কুহু একবার পেছন ফিরে তাকাল। দেখে নিয়ে আয়ানাকে বলল,”মন খারাপ করেছ নাকি?”

কুহু আসলে ভালো মনের মানুষ। আর ভালো মানুষরা এমনই হয়। এদিকে আয়ানা, কুহুর বলা কথাটা ভালো ভাবে তো নিলই না,উল্টো বলল,”তোর তো খুশি হওয়ারই কথা কুহু।”

“এমন করে বলছো কেন আয়ানাপু? খুশি হব কেন?”

“খুশি হোসনি বলছিস?”

“আজব কথা তো।”

বলেই কুহু চলে আসল। ওর মেজাজটা এবার খারাপই হলো। ও এসেছিল ভালো করতে। আর আয়ানাপু সেটাকে কেমন ভাবে নিল। ও বিরক্তি নিয়ে পুনরায় ভেতরে প্রবেশ করল। বাইরেও ভালো লাগছে না। দীপ্র ভাইয়ের কথাকে পাত্তা দেয়া যাবে না। এই লোক কুহুর কোনো কিছুরই যোগ্য না। ও যখন ভেতরে আসল ঠিক তখনই প্রতিযোগিতা শেষ হলো। দেখা গেল কণা সবথেকে কম খেতে পেরেছে। কুঞ্জ দ্বিতীয় আর দীপ্র প্রথম। কুঞ্জর কিন্তু এতে একটুও মন খারাপ হয়নি। ও বরং দারুণ মজা পেয়েছে। কুহুকে দেখেই নিজের খুশিটা প্রকাশ করে ফেলল।

“কণাপু আমার সাথে পারেনি। ইয়ে, পারে নি। পারে নি।”

“পারলাম না কীভাবে? খেয়েছি তো তোর থেকে বেশি। শুধু নিয়মের বেড়াজালে পড়ে হারতে হলো।”

“ওসব তো আমি জানি না। আমি জিতেছি। তুমি হেরেছ।”

“নিজেও তো হেরেছিস। দীপ্র ভাইয়া তো তোকে হারাল।”

“তাতে কী? আমারই তো ভাই।”

বলেই দীপ্রর বাহু খানা জড়িয়ে ধরল কুঞ্জ। ছেলেটা সবথেকে মিশুক আর আদুরে। দীপ্রর সাথে ওর এই প্রথমই দেখা হয়েছে। অথচ, মনে হচ্ছে কত জনম ধরে একসাথে থাকছে ওরা।

দীপ্র বিল মিটিয়ে দিয়ে বলল,”কারো আর কিছু লাগবে? ড্রিঙ্কস আইটেম?”

রাত্রি বলল‍,”নিয়ে নিই কিছু। পথে খাওয়া যাবে। রোদ এখনো পড়েনি। এই কুহু ড্রিঙ্কস তো খাবি?”

কুহু হ্যাঁ না কিছুই বলল না। দীপ্র ইশারা করল কুহুর জন্যও নিতে। রাত্রি ড্রিঙ্কস নিতে নিতে বলল,”আয়ানার জন্য নেব?”

দীপ্র তাকাল বাইরের দিকে। আয়ানার চোখে মুখে বিরক্তি। এসব কিছুই তার আর ভালো লাগছে না।

ড্রিঙ্কস নিল না আয়ানা। তবে কুহু নিয়েছে। ওর গলাটা একদমই শুকিয়ে এসেছিল। তাছাড়া দীপ্র ভাই এখন আর কিছু বলেনি এই বিষয়ে। অবশ্য বলল‍েও ও পাত্তা দিত না। লোকটা ভারী শ য় তা ন। বোতল খুলতে গিয়ে কুহু বুঝল অনেক শক্ত। কয়েকবার চেষ্টা করেও খুলতে পারল না ও। রাত্রিও চেষ্টা করল। হলো না। মেয়েটির ভাগ্যই বোধহয় খারাপ। তাই তো দীপ্র’র সাহায্যেই বোতলের ক্যাপ খানা খোলা হলো। রাত্রি যখন বোতলটা ওর হাতে দিল ও ছোট করে নিশ্বাস ফেলল। আসলে ভাগ্য বড়ো কঠিন জিনিস। একে এড়ানো যায় না।

আয়ানা পারলে এখনই ছুটে চলে যায় বাসায়। তবে ও যাচ্ছে না। কারণ এখানে দীপ্র ভাই রয়েছে। এই মানুষটার সাথে রাত্রিপুর ভাব একটু বেশিই বটে। ওদিকে কুহু, যদিও দীপ্র ভাই নিজ থেকেই বিয়েটা ভেঙেছে, তবু বলা যায় না কিছু। ওর আসলে চিন্তাই হয়। কোনো দরকারই ছিল না কুহুর দায়িত্ব নেওয়ার। ছোট চাচা তো হেডমাস্টার ছিলেন। রোজগার করেছেন নিশ্চয়ই। তবে কেন দীপ্র ভাইকেই দায়িত্ব নিতে হবে? অসহ্য লাগে আয়ানার। আর এরই মধ্যে ওর পা হড়কে যায়। অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিল। তার ওপর হিল পরা। ও চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকারে ঘুরে তাকায় সবাই। আয়ানাকে বসে থাকতে থেকে ছুটে আসে তৎক্ষণাৎ। আয়ানা কেঁদে ফেলে শব্দ করে।

“কীভাবে পড়লি আয়ানা? উফ, দেখি দেখি।”

বলেই রাত্রি ওর পা ধরে হালকা টান দিল। এতে করে আরেক দফায় চিৎকার করে ওঠল মেয়েটি। বলা বাহুল্য রাত্রির চিকিৎসা জ্ঞান আছে টুকটাক। ও এই বিষয়ে একটা কোর্স করেছিল। এতে করে আয়ানার পায়ের ব্যথাটা কমেই গেল। কিন্তু শেয়ানা মেয়েটি এবার নাটক শুরু করল। দীপ্র এবার চিন্তিত হয়ে বলল,”কী রে,পা ভাঙল নাকি?”

“বুঝতে পারছি না। ব্যথা তো কমে যাওয়ার কথা।”

জবাব দিল রাত্রি। আয়ানা কাঁদতে কাঁদতে বলল,”কমছে না। মনে হচ্ছে পা খুলে পড়ে যাবে।”

বলেই মৃদু গোঙানি দিয়ে ওঠল ও। কুহুর কপালে চিন্তার ভাজ। হিলের সাইজ দেখেই তো অস্থির লাগছে। তার ওপর কি চিকন! কণার কেন যেন তেমন প্রতিক্রিয়া নেই। ও শুধু বোনের কানে কানে এসে বলল,”যতটা ব্যথা পেয়েছে তার থেকে বেশি ঢং ধরেছে।”

কুহু বিরক্ত হলো। বলল,”চুপ কর তো।”

“আমাকে চুপ করিয়ে লাভ নেই। আমার সিক্স সেন্স বলছে, দীপ্র ভাইয়ের কোলে চড়ার ইচ্ছে হয়েছে। তাই এমন করছে।”

কুহু আসলেই বিরক্ত হলো। তার বোন একটু বেশিই করছে। আর সব কথায় দীপ্র ভাইকে টানে! কেন রে? কী দরকার?ওমন অসভ্য লোককে সব কথায় টানার। ও চোখ রাঙিয়ে আয়ানার কাছে আসল। পা নাড়িয়ে চাড়িয়ে বলল,”আর ঘুরতে হবে না। চলো আমরা ফিরে যাই।”

“সেটাই ভালো হয় রে। আয়ানা, হাত ধরে ওঠে আয়।”

“ওঠব কীভাবে? আমি তো পা নাড়াতেও পারছি না রাত্রিপু।”

বলে আয়ানা তাকাল দীপ্রর দিকে। দীপ্রর মুখের ভঙ্গিমা স্বাভাবিক। আয়ানা আশায় আছে, দীপ্র ভাই তাকে কোলে নেবে। হয়তো নিতও। ঠিক তখনই কুঞ্জ বলে ওঠল,”আমরা আপুকে হাত পা তুলে ধরে নিয়ে যাই চলো। দুজন হাত ধরবে আর দুজন পা।”

কুঞ্জর কথা শুনে আয়ানার ইচ্ছে করল ঠাটিয়ে চ ড় বসাতে। তবে ভাবনাটা দীঘল হওয়ার পূর্বেই কণা দিল আরেক চাল। বলল,”দারুণ বুদ্ধি রে কুঞ্জ। চলো সবাই। আয়ানাপুকে ওঠিয়ে নিই।”

বলেই হাত পা ধরে ওঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিল কণা। আয়ানা তড়িৎ গতিতে প্রতিবাদ করে বলল,”একদম না। আমাকে ওঠতে সাহায্য করলেই হবে। আমি পারব।”

হুট করেই ওর চিন্তা গেল বদলে। বিষয়টা সবারই চোখে পড়ল। তবে কেউ তেমন পাত্তা না দিলেও কণা ঠিকই বোনের কানের কাছে এসে বলল,”যেটা বলেছিলাম। তাই হলো। ফলে তো গেল। তাই তো বলে গরিবের কথা বাসি হলেও সত্য হয়। আয়ানাপু বড়ো শেয়ানা। দীপ্র ভাইকে পটাতে চাচ্ছে। তুই বুঝতে পারছিস না কেন আপু?”

কুহু জবাব দিল না। স্থির রইল। ও নিজেও বেশ কিছু জিনিস বুঝতে পারে। তবে ও আমলে নেয় না। এখন ও নিল না। নেবেই বা কেন? দীপ্র দেওয়ান তার কে হয়? কেউ না। কেউ না মানে কেউ না। র ক্তের সম্পর্কটি না থাকলে, এই লোকটার মুখও দেখত না ও।

আয়ানাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরতেই মোটামুটি একটা শোরগোল হয়ে গেল। ওর মা ছুটে এসে একদম কেঁদে ফেললেন। সেই কান্না চলল প্রায় দশ মিনিট। দশ মিনিট পর কান্নার বিরতি এল। তিনি দীপ্রর দিকে চাইলেন।

“এটা কীভাবে হলো দীপ্র? তুই সাথে থাকতেও কীভাবে পড়ল?”

কতটা অযৌক্তিক প্রশ্ন! আয়ানা তো ছোট বাচ্চা নয়। এমন ও না যে তাকে কোলে রাখা হয়েছিল। আর সে কোল থেকে পড়ে গিয়েছে। দীপ্র একটু গলা পরিষ্কারের মতন করে বলল,”ও হিল পরে গিয়েছে মেজো চাচি। কীভাবে পড়ল সেটা তো আয়ানাই ভালো বলতে পারবে।”

আচ্ছা, দীপ্র ভাই কি আয়ানাকে অবজ্ঞা করছে? নতুবা এভাবে কেন বলল? নাকি কুঞ্জকে তখন কথা শোনানোতে দীপ্র ভাই রেগে আছেন। আয়ানা বিশাল ভাবনায় পড়ল। ওর খারাপ লাগছে খুব। এটা মেনে নেওয়া যায় না। ও ঠোঁট কামড়ে ধরল।
“অভ্যাস নেই গ্রামের রাস্তায় হিল পরে হাঁটার। তাই হয়তো পরে গিয়েছ। মেজো মামি ওকে বরং ঘরে নিয়ে যাই। রেস্ট করুক।”

রাত্রির সাথে তাল মিলিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন,”তাই চল। কি একটা ঘটনা। ইস মেয়েটার পায়ের চেকাপ দরকার। ওর বাবাকে কল করতে হবে। আমার আর ভালো লাগে না।”

বলেই তিনি আরেক দফায় কাঁদতে লাগলেন। শহরের আবহাওয়া, এসির হীম শীতল বাতাস, ঝকঝকে তকতকে ঘর বাড়ি। সব কিছু তিনি ভীষণ মিস করেন। ইচ্ছে হয়, এক ছুটে চলে যেতে। কিন্তু সেই কপালটি নেই। তিনি কান্না থামালেন। রাত্রির সাহায্যে আয়ানাকে ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। কণা মুখ টিপে হাসছিল। ওর কেন যেন মজা লাগছে। সেটা মা লক্ষ্য করলেন। মেয়ের কাছাকাছি এসে বললেন,”এসব হাসাহাসির মানে কী কণা? এ কেমন বেয়াদবি?”

“উফ মা, তুমি জানোই না। সব ঢং। বিরক্ত লাগে আমার।”

কণার মুখের ভঙ্গিমায় বদল এল। ভদ্রমহিলা মেয়েকে প্রশ্রয় দিলেন না। বরং কঠিন সুরে বললেন,”এমন বেয়াদবি আর করবে না। যাও,ঘরে যাও। বেশি বড়ো হয়ে গিয়েছ না? যাও ঘরে।”

মায়ের হঠাৎ রেগে যাওয়াটা কণাকে বিস্মিত করল। ও কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল। তবে মা এমন ভাবে তাকালেন যে আর কিছুই বলার সাহস হলো না। কণা দ্রুত পায়ে দোতলার দিকে ছুটল। কুহুও ওর পেছন পেছন যেতে নিচ্ছিল। ঠিক তখনই মায়ের ডাক পড়ল। ও থামল। মা কাছে এলেন। তার চোখ দুটোয় কঠিন কিছু ভাসছে। কুহু সেই রহস্য ভেদের চেষ্টা করল। তবে ব্যর্থ হলো।

“কিছু বলবে মা?”

“হ্যাঁ।”

“বলো। শুনছি আমি।”

“তুমি এখন থেকে দীপ্র’র থেকে দূরে থাকবে কুহু। সে তোমার চাচাত ভাই। তাই আমি চাইলেও পুরো দূরে থাকার কথা বলতে পারব না। তবে, তবে দূরে থাকবে। বুঝলে তুমি?”

কুহু ছোট করে বলল,”আমি তো দূরেই থাকি মা।”

সত্যিই তো। কুহু দূরেই থাকে। তবু তিনি বলার জন্য বললেন কথাটা। একটা নিশ্বাস ফেললেন। এগিয়ে এসে মেয়ের গাল ছুঁয়ে বললেন,”একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। তোমাকে দীপ্রর সাথে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তটা আমাদের অনেক ভোগান্তি দেবে। তবে এটা ধরে বসে থাকলে তো চলবে না। তুমি পড়াশোনায় মন দাও কুহু। আর কেঁদে লাভ নেই। অনেক তো কান্নাকাটি হলো। তোমার বাবা নেই আজ কত গুলো দিন হলো বলো তো।”

বলেই কেঁদে ফেললেন নারীটি। কুহু কি বলবে বুঝল না। শুধু তাকিয়ে রইল। একটা সময় পর অনুভব করল, ওর খুব ইচ্ছে করছে মাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু দ্বিধা কাজ করছে। পরিবারের বড়ো মেয়ে হওয়াতেই এই দ্বিধা। ও চাইলেও মাকে জড়িয়ে ধরতে পারল না। তবে মাথাটা নত করে বলল,”দীপ্র ভাই আমার দায়িত্ব না নিলে, তোমার কি খুব অসুবিধা হবে মা? আমি কিছু একটা করে নেব না হয়? ওনার থেকে টাকা নিতে আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়।”

টাকা নিতে অস্বস্তি হয়! কথাটা একটু সময় নিয়ে বুঝলেন নারীটি। তারপর বললেন,”দীপ্র তোমাকে টাকা দিয়েছে?”

“হ্যাঁ।”

“বলোনি তো!”

“বলব বলব করে বলা হয়নি। আমি রেখে দিয়েছি। কিচ্ছু করিনি।”

মেয়ের কথা শুনলেন নারীটি। তারপর ছোট করে নিশ্বাস ফেললেন। বললেন,”তোমার দাদির সাথে কথা বলব আমি। আমিও চাচ্ছি না দীপ্র তোমার দায়িত্ব নিক। সে তোমার চাচাতো ভাই। স্বামী তো নয়।”

দীপ্র এসেছিল পানি নিতে। ঠিক তখনই শেষ কথা গুলো শুনতে পেল। কুহুর নজর ছিল নত করা। ও চাইতেই মানুষটার চোখের সাথে চোখের মিলন ঘটল। কেন যেন কেঁপে ওঠল মেয়েটির শরীর। অথচ দীপ্র’র দৃষ্টিতে কোনো উত্তাপই নেই। বরং ভীষণ স্থির।

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply