দীপ্র ভাই এগিয়ে এসে বললেন,”তোকে বিয়ে করা সম্ভব নয় কুহু। বিয়েটা হচ্ছে না।”
সদ্য বাবা হারানো যুবতী মেয়ে কুহু। পারিবারিক চাপেই চাচাতো ভাই দীপ্র’র সাথে বিয়ের আসরে বসেছিল। অথচ তার মন পড়েছিল মরহুম পিতার কাছে। যে পিতার আদরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিশটি বছর কেটেছে। তাই তো পিতার গত হওয়ার সত্তর তম দিনেও শোক কাটিয়ে ওঠতে পারেনি সে। বিয়ের আসর থেকে দীপ্র’র ওঠে যাওয়ায় আশেপাশে থাকা মানুষ গুলোর চোখে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। কথা পৌঁছে গেছে কুহুর মা ববিতার কাছেও। তিনি নিজেও এখনো শোক কাটাতে পারেননি। মেয়েকে একটা শক্তপোক্ত ভবিষ্যত দেওয়ার ইচ্ছে থেকেই এই বিয়ের আয়োজন। অথচ দীপ্র কি না বিয়ে করবে না বলে জানিয়েছে!
“দীপ্র, বাবা কী বলছিস এসব? বিয়ে করবি না মানে?”
ছুটে এসে দীপ্রর বাহু খানা চেপে ধরলেন তিনি। চোখ দুটোয় শঙ্কা। দীপ্র’র ছেলেবেলা এখানে কাটলেও, বড়ো হওয়াটা বাহিরের দেশেই।
“ক্ষমা কোরো ছোট চাচি। আমার পক্ষে বিয়েটা সম্ভব না। সিদ্ধান্তটা আগে নেওয়া উচিত ছিল। শেষ সময়ে নেওয়ার জন্য, কুহুর সমস্ত দায়িত্ব আমি নিতে প্রস্তুত। কিন্তু এই বিয়েটা সম্ভব না।”
কথা খানা শুনে পিছিয়ে গেলেন ববিতা। দীপ্র পা বাড়াতেই, ওনি তাকালেন মেয়ের পানে। কুহুর মাঝে কোনো পরিবর্তন নেই। একটুও নেই। যেন কিচ্ছুটি ঘটেনি। অথচ সবথেকে বড়ো ক্ষতি তো তারই হলো।
দেওয়ান বাড়ির বড়ো কর্তা, অথার্ৎ দবীর দেওয়ান, ছেলের সাথে আলোচনায় বসেছেন। তিনি যে মোটেও খুশি নন, তা চেহারায় বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে। গম্ভীর মুখে তিনি শুধালেন,”এই কাজটি কেন করলে দীপ্র?”
বাবার দিকে চাইল দীপ্র। লোকটার বয়স ষাটের কাছাকাছি। তবে চেহারায় সেই মলিনতাটুকু একদমই আসেনি।
“কথা কেন বলছো না? যদি বিয়ে করার ইচ্ছে নাই থাকত, তবে আগে কেন বললে না?”
“সেটার জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করেছি বাবা। আর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কুহুর সব রকম দায়িত্ব নিতেও প্রস্তুত।”
“মজা করছো তুমি? একটা মেয়ের মন ভেঙে, বিয়ের আসর থেকে ফিরিয়ে দিয়ে তার সব দায়িত্ব নেবে?”
এই পর্যায়ে দীপ্র চুপই রইল। দবীরের চোখ দুটো অস্থির। একটু সময় নিয়ে দীপ্র বলল,”আমি সিদ্ধান্ত জানিয়েছি বাবা।”
“আরেকবার ভাবো দীপ্র। তোমার চাচি দিশেহারা হয়ে আছেন। তার মুখের দিকে চেয়ে একটু ভাবো।”
“ভাবার কিছু নেই। তিনি অনেক বেশি সাহসী। এই ধাক্কা সামলাতে পারবেন।”
“বড়ো বেশি বুঝলে তুমি।”
“আমার দুঃখ হচ্ছে না সেসবের জন্য। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল।”
“এতটা বেপরোয়া, তো তুমি ছিলে না। কী হয়ে গেল তোমার?”
“কিছুই হয়নি বাবা। আমার জীবনটা, সাজানোর দায়িত্ব কিন্তু আমারই। কুহুকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। এটা দুটো জীবনের বিষয়।”
বলেই বেরিয়ে গেল দীপ্র। বসার ঘরে তখনো সবাই উপস্থিত। পারিবারিকভাবেই আয়োজন হয়েছিল। তাই পরিবার পরিজন ব্যতিত বাইরের কেউই নেই।
দীপ্রকে আসতে দেখে সব গুলো চোখ এদিকে নিক্ষেপ হলো। দাদিজান বসে আছেন। কুহুর ঠিক পাশটায়। তিনি নাতির দিকে চাইলেন।
“তুমি কি তোমার সিদ্ধান্ত বদল করবা না দীপ্র?”
“আমি একবারই যা বলার বলে দিয়েছি দাদিজান।”
“দাদিজানের কথাও রাখবা না?”
“আমাকে মাফ করবেন দাদিজান। এটা রাখতে পারব না।”
“আনোয়ার, দবীর’কে ডেকে আন। সিদ্ধান্ত যা হওয়ায় হয়ে গেছে। এই বিয়ে হবে না।”
বলেই তিনি মেজো ছেলেকে আদেশ করলেন। ছোট ছেলেকে হারিয়ে তিনি নিজেও কি কম শোকাহত? পৃথিবীর কোনো মা’ই চান না তার চোখের সামনে সন্তানের লা শ বহন হোক। কিন্তু ভাগ্যে লেখা থাকলে, তা বদলের সাধ্য কার?
“আম্মা, এটা হতে দেবেন না। আমার কুহু। আমার কুহুর জীবনটা শেষ হয়ে যাবে।”
একদম শাশুড়ির পায়ের নিকট বসে পড়লেন ববিতা। তার জীবনের রং হারিয়ে গিয়েছে। কুহু আর ছোট মেয়ে কণা, এই দুই কন্যাই তার সবটুকু। এখন যদি কুহুর জীবনটাও অশান্ত হয়ে যায়, তবে যে বেঁচে থাকাটা তার নিকট বি ষে র মতন হয়ে যাবে। তিনি বড়ো অশান্ত অনুভব করলেন।
“কান্না থামাও ছোট বউ। এভাবে বিয়ে হয় না।”
“আম্মা, আমার কুহুর জীবনটা। ওর জীবনটা শেষ হয়ে যাবে আম্মা।”
“কীসের শেষ? কোনো শেষ হবে না। তুমি শক্ত হও। দবীর আসুক। এভাবে বিয়ে দেওয়া মানে সমস্যা আরো বাড়ানো।”
বলে তিনি চুপ হলেন। ববিতা ছটফট করতে লাগলেন। কয়েক মুহূর্ত পর দবীরকে আসতে দেখা গেল। তিনি আসতেই বৃদ্ধা বললেন,”যা হবার তা হয়ে গেছে। তোমার ভাই বড়ো অসময়ে পৃথিবীর মায়া হারাল। রেখে গেল বউ আর দুইটা মেয়ে। তোমরা দুই ভাই যখন নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে দূর শহরে, দূর দেশে চলে গেলা, তখন কাদেরই পড়ে রইল এখানে। আমার জেদ, স্বামীর বাড়ি ছেড়ে যাব না কোথাও। তাই তো আমার জন্য, রয়ে গেল কাদের। বউ,বাচ্চার ভবিষ্যতে নিয়ে একবারও ভাবল না। কষ্ট করেছে, তবে কষ্টের মাঝে সুখ ছিল ঠিকই। তুমি এসে ছেলের জন্য কুহুর হাত চাইলা। সব দিক বিবেচনা করে আমিও মত দিলাম। যাই হোক, এখন দীপ্র চায় না বিয়েটা হোক। আমিও মনে করি,না হওয়াই ভালো। কিন্তু যেটা বলছে সেটা যেন ঠিক ঠাক হয়। কুহুর সব দায়িত্ব দীপ্রকে নিতে হবে।”
দবীর মায়ের কথা শুনলেন। তিনি আসলেই লজ্জিত। ছেলের এই কাজটি তার পুরাতন কর্মকেও আজ টেনে নিয়ে এসেছে। ববিতা চোখ মুছে কিছু বলতে যেতেই বৃদ্ধা বললেন,”যা বলার আমি বলে দিছি ছোট বউ। এখানেই সব শেষ।”
এ কথার পর ববিতাও আর কিছু বলতে পারলেন না। কুহুর গলাটা শুকিয়ে এসেছে। রাত্রি পাশেই ছিল। কুহু শুকনো গলায় বলল,”একটু পানি দিবে রাত্রিপু? গলাটা ভীষণ শুকনো লাগছে।”
বিয়ে ভাঙার পর কেটে গিয়েছে তিনটি ঘন্টা। এই তিন ঘন্টায় কুহু তার বিয়ের পোশাক, মেকাপ সব কিছু তুলে নিয়ে বেশ সময় নিয়ে গোসল করেছে। এখন তার চুল ভেজা। সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্ত। ওদের বাড়িটা বেশ খানিকটা পুরোনো হলেও, বিশালতার দিক থেকে রাজকীয় মহলের অনুরূপই বটে। ছাদে শেওলা জমলেও, সেই শেওলার মাঝেও আভিজাত্য আছে। থাকারই কথা। বহু বছর পূর্বে কুহুর পূর্ব পুরুষেরা তো এই গ্রামে জমিদারের ভূমিকায় ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সম্পত্তির পরিমাণ কমে এল। জমিদারি ভাঙল। কেউ কেউ চলে গেল শহরে। কেউ বা দূর দেশে। সব মিলিয়ে, আভিজাত্যে ভাটা পড়ল। কিন্তু বাড়িটায় তার ছোঁয়া আজও পাওয়া যায়। কুহু ধীর পায়ে শেওলা পড়া ছাদে এসে পৌঁছাল। সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত হওয়াতে,আকাশটা হলদেটে হয়ে আছে। দূর আকাশে কিছু পাখি ওড়ে বেড়াচ্ছে। বাড়ির চারপাশে বিশাল সব গাছ লাগানো। কোনো কোনো গাছের উচ্চতা এই বিশাল দোতলা বাড়ির ছাদে এসেও ঠেকেছে। হালকা একটা বাতাস কুহুর ত্বক ছুয়ে যেতেই চোখ দুটো বন্ধ করল কুহু। তারপর শেষ বিকালটা কুহু কাটিয়ে দিল শেওলা পড়া ছাদে, চোখ বন্ধ করেই। আজানের ঠিক আগ মুহূর্তে ওর মুদিত চোখ জাগ্রত হলো। তাও একটি পরিচিত কণ্ঠের ডাকে। সেই কণ্ঠের মালিক দীপ্র ভাই। যার পরনে টি শার্ট আর টাউজার। গাল জুড়ে কালো কালো রোমরাজি, ত্বক উজ্জ্বল রঙের। চোখের মনি বুদ্ধিদীপ্রতার প্রমাণ। কুহু এক মুহূর্তের জন্য থমকে থাকলেও,সেই থেমে থাকায় ধাক্কা লাগল দীপ্র’র দ্বিতীয় ডাকে। দীপ্র ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,”এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তাও চুল খুলে! তোকে তো ভূত ভেবে ভয় পাচ্ছিলাম আমি।”
দীপ্র’র কণ্ঠের স্বাভাবিকতায় কুহুর অন্তর কেঁপে ওঠে। ও যেন কোথাও একটা বাঁধা পড়ে। দীপ্র আবারো বলে,”আজান দেবে। দ্রুত নিচে যা।”
বলতে বলতে দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে ওঠে। কুহু চটপট মাথায় ঘোমটা টানে। পা বাড়ায় নিচে নামার জন্য। ঠিক তখনই দীপ্র বলে,”কুহু।”
থামে কুহু। তবে ঘুরে তাকায় না। দীপ্র একটু কাছাকাছি আসে। বলে,”যা হয়েছে তা ভুলে যা। আমি কথা দিলাম, তোর কোনো অভাব রাখব না।”
বলেই পকেট থেকে হাজার টাকার বেশ কয়েকটি নোট বের করল দীপ্র। কুহুর হাতে তুলে দিতেই মেয়েটির গলা শুকিয়ে এল। মনে মনে প্রশ্ন করল, দায়িত্ব নেওয়া মানেই,কি টাকা দেওয়া দীপ্র ভাই?
| অনেকদিন পর গল্প নিয়ে এসেছি। প্রিয় পাঠক, আপনাদের রেসপন্স আমি আশা করছি। পুরো গল্পটা ফেসবুকে আসবে ইনশাআল্লাহ। পরের পর্ব মিস না দিতে পাঠকমহলে জয়েন করে নিন। 👇
https://facebook.com/groups/2944711092471263/ |
প্রণয়ের_রূপকথা (১)
লেখক : #ফাতেমাতুজনৌশি
চলবে….
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৪
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৭
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৮