Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৩(প্রথমাংশ+শেষাংশ)


কাছেআসারমৌসুম!

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

(৫৩)

আইরিন সারা শপিংমল খুঁজে খুঁজে হয়রান। সার্থ কোথাও নেই। আর না আছে ইউশারা। এদিকে হাতে এতগুলো ভারি ব্যাগ! গোটা মার্কেট তল্লাসি শেষে বাইরে এসে দাঁড়াল আইরিন। সার্থকে ফোন করল, আর দুম করে লাইনটা মুখের ওপর কেটে দিলো সে। আইরিন থামল না, ফের কল দিলো। এই তো, একটু আগেই সবাইকে দেখেছিল ফুডকোর্টের ওখানটায়। এর মাঝে কোথায় সব হাওয়া হয়ে গিয়েছে? আর গিয়েছে যখন ওকে নিয়ে যেতে পারেনি?
কিন্তু কল এবারেও রিসিভ হলো না।
লাইন ফের কাটল সার্থ। আইরিন মেজাজ খারাপ করে ম্যাসেজ পাঠাল,
“ আপনি কোথায়? আমার শপিং শেষ। আমাকে এসে নিয়ে যান।”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো মিনিট দুয়েক পর,
“ আমি কোথায় জানার দরকার নেই। তুমি একটা উবার ডেকে বাড়ি চলে যাও।”
আইরিনের ব্রক্ষ্মতালু অবধি রাগে পুড়ে গেল। মগের মুল্লুক পেয়ে বসেছে। ও উবার ডেকে চলে যাবে মানে!
নিশ্চয়ই সার্থ তুশির সাথে আছে। ওকে নিয়েই চলে গেছে বাড়িতে।
আচ্ছা যাক। কতদূর আর যাবে? কাল পার্টিতে বিয়ের এনাউন্সমেন্টটা হোক,তারপর কোথায় কোথায় পালাবে সার্থ সেও দেখে নেবে।


এখন রাত বাজে বারোটা। ঘড়ির কাঁটা হাঁপাতে হাঁপাতে একেক ঘরে ছুটছে। কপালের ঘাম মুছে সেদিকে আরেকবার দেখল তুশি। রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বাসার সবাই শুতে গিয়েছে। বসার ঘর খা-খা করছে এখন।
তুশির বুক কাঁপছে সেই শূন্যতার চেয়েও শতগুণ বেশি। মনের ভেতর উৎকণ্ঠা থাকলেও মাথা ভরতি তার জেদ। সার্থ মাঝরাতে ছাদে যেতে বলেছিল,কিন্তু তুশিও গোঁ ধরেছে কিছুতেই যাবে না।
এতদিন ওকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে,ওকে যা ইচ্ছে তাই বলেছে তাও তুশি চুপ করেছিল। কিন্তু ওর চোখের সামনে আইরিনকে সাথে নিয়ে আজকের এই উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য, সবার সামনে আমার হবু বউ হবু বউ করে ঢং করা,ভীষণ সম্মানে লেগেছে তুশির।
এতই যদি হবু বউ নিয়ে আনন্দে থাকে, তাহলে ওকে ছাদে ডাকবে কেন? আর ওই বা কুকুরের মত ছুটবে কেন সেখানে?
তুশি বসেছিল সোফায়। ওর এই স্টোর রুমের ঘরটার নকশা বদলে গেছে বিগত কটা দিন হলো। একটা দু সিটের সোফা,ড্রেসিং টেবিল, ভালো আলমারি সহ কিছু নতুন ফার্নিচার তুলে দিয়েছেন সাইফুল। ভেবেছেন,মেয়েটা যখন ঠিক করেছে এখানেই থাকবে,তখন ভালোভাবেই থাক।
তুশির ধ্যান ভাঙল পায়ের শব্দে। নিস্তব্ধ বাড়ির সিঁড়ি পেরিয়ে দাপুটে বেগে হেঁটে আসছে কেউ একজন। তুশি এই হাঁটার গতি চেনে। নিশ্চয়ই সার্থ! ও ছাদে না যাওয়াতে কি ওর কাছেই আসছে?
তুশি তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। সন্দেহ নিয়ে বসে থাকতে পারল না। ধড়ফড় করে ছুটে এলো দরজায়। দু আঙুলে একটুখানি পর্দা সরিয়ে চোরের মতো এক চোখ দিয়ে উঁকি দিলো বাইরে। ওমা,কেউ তো নেই। কিন্তু ও যে পায়ের আওয়াজ স্পষ্ট শুনেছিল। কেউ এলে তো দেখা যেত! এর মধ্যে কোথায় উড়ে যাবে? তুশি নিজেই বিভ্রান্ত। ভাবল,হয়ত মনের ভুল। মাথা চুলকে ফোস করে শ্বাস ফেলে ঘরের দরজা লাগাতে গেল,কোত্থেকে ভূতের মতো এসেই এক হাতের তালুতে দরজার কাঠ চেপে ধরল সার্থ।
ছ্যাৎ করে উঠল তুশির বুক। চমকে-থমকে নিঃশেষ হয়ে প্রকট চোখে চাইল তার পানে।
সার্থর চিবুকে নম্রতা নেই। আবেগের কোনো ছায়া নেই চোখে। কেমন ঠান্ডা নজরে চেয়ে রইল,বললও শান্ত গলায়,
“ ছাদে এসো তুশি।”
তুশি ভীতসন্ত্রস্ত চোখে বলল,
“ ক-কেন?”
“ আমি বলেছি তাই।”
মেয়েটা ভয়ে ভয়ে বলে,
“ যাব না, যাব না আমি।”
“ চুপচাপ এসো।”
সার্থর কণ্ঠের জোর বাড়ছিল। বাড়ছিল তেজে দীপ্ত চোখের তাপ। তুশি চুপসে গেলেও,ছাদে ও যাবে না। কিছুতেই না। উলটে গায়ের জোর দিয়ে দরজা ঠেলতে গেলেও,সার্থর ঐ এক হাতের সাথে কূলোতে পারল না।
অসহায় চোখে বলল,
“ দরজা ছাড়ুন। আমি ঘুমাব।”
সার্থ দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ আগে ছাদে আসবে,কথা শুনবে তারপর। নাহলে আমি যদি ভেতরে এসে ধরি,
ঘুম কিন্তু হারাম করে দেবো।”

হুমকি শুনে তুশির অন্তরাত্মা ভয়ে উড়ে গেল। ঢোক গিলে কিছু ক্ষণ চুপ করে রইল সে। আচমকা সার্থর পেছনে চেয়ে বলল,
“ দিদুন!”
সার্থ ফিরল সেদিকে। ভাবল,জয়নব এসেছেন। হাতটা তখন শিথিল হলো একটু,আর অমনি ঝট করে দরজা আটকে দিলো তুশি। মেয়েটা যে ওকে কী দারুণ ভাবে বোকা বানিয়ে ফেলল,ভাবতেই সার্থর গায়ের রক্ত আগুন হয়ে যায়। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে দরজায় লাথি মারল সে। তর্জন দিলো স্থূল স্বরে,
“ দরজা ভাঙব, না খুলবে?”
ওপাশে দাঁড়ানো মেয়েটা ভয় পেলেও গলায় জোর কমেনি। একটু তুতলে বলল,
“ ভা ভাঙুন না ভাঙুন, আ আমিও দেখি আপনার গায়ে কত জোর। মারপিট কিন্তু আমিও পারি বুঝেছেন। আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।”
তারপর বিড়বিড় করে বলল,
“ শালার পুলিশ তুই পারলে ভেতরে আয়। আজ তুশি তোকে ওর কুস্তির পাওয়ার দেখিয়ে ছাড়বে। শালা মারব এখানে,
তোর বডি পড়বে উঠোনে।”

সার্থ এসব শোনেনি। প্রথম টুকুর জবাবেই চটে কিছু বলবে, হঠাৎ কেউ পেছন থেকে ডাকল,
“ ভাইয়া!”
ও থামল,ফিরল পেছনে। ধোঁয়া ওঠা কফির মগটা হাতে নিয়ে হেঁটে এলো অয়ন। খুব আশ্চর্য চোখে বলল,
“ তুমি এখানে কী করছো?”
সার্থ চুপ, কপালে ভাঁজ। পাথুরে চোখে অয়নের কফি মগের দিকে চেয়ে রইল সে। অয়ন খেয়াল করল সেটা।
মগটা ওর সামনে ধরে সরল গলায় বলল,
“ কফি খাবে নাকি?”
সার্থ নিজের রাগ ঝাড়ার মোক্ষম জিনিস পেয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মগটা ওর হাত থেকে ছো মেরে নিয়েই প্রকাণ্ড এক আছাড় মারল ফ্লোরে। অয়ন হকচকিয়ে গেল। ভড়কে বলল,
“ ও গড,কী করলে! কতক্ষণ ধরে বানিয়েছি, মাই ক্যাপুচিনো! ভালোবেসে সাধার এই প্রতিদান দিলে?
সার্থ রেগেমেগে বলল,
“ আমাকে কেন সাধবি? আমি কি এখানে কফি খাওয়ার জন্যে এসেছি?”
“ তাহলে কেন এসেছ?”
সার্থ কিছু বলতে গিয়েও থামল,বলল না। খ্যাপাটে মেজাজে সাপের মতো ফুঁসতে ফুঁসতে রওনা করল ঘরে। অয়ন নাক-চোখ কুঁচকে বলল,
“ সেদিন নিজেরটা ভেঙেছে। আজ দিলো আমারটা ভেঙে। কেন যে সাধতে গিয়েছিলাম!”
তারপর সচকিতে পাশ ফিরল সে। তুশির ঘরের বন্ধ দরজায় তাকাল একবার। এতক্ষণে যেন হুশে এলো অয়ন। আবার সার্থর যাওয়ার দিকে দেখল,পরপর সেই ঘরের দিকে। চোখ ঘুরিয়ে কিছু একটা ভেবে হঠাৎ ঠোঁট কামড়ে হাসল সে।


সন্ধ্যে নেমেছে। বাড়ির সবার মাঝে এক ধরণের হুটোপুটি সেসময়। একেবারে সবাই একসাথে রেডিশেডি হয়ে পার্টিতে যাওয়ার তাড়া। পার্টির জন্যে নাসীর বড়োসড় ক্লাব ভাড়া নিয়েছেন। রাত আটটার মধ্যে সেথায় পৌঁছানোর কথা। যে যার মতো যার যার ঘরে তৈরি হতে গিয়েছে। তুশি ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়েছে সবে। চেয়ে দেখল এখনো ঘর ফাঁকা। ইউশা আসেনি তাহলে?
কাল নামে মাত্র শপিং-এ গেলেও নিজের জন্যে তুশি কিচ্ছু কিনতে পারেনি। সেই মন-মেজাজই তো ছিল না। কেবল ইউশা দুটো জামা নিয়েছে। বলেছে ও থেকেই একটা পরতে দিয়ে যাবে। তুশির হঠাৎ চোখ পড়ল খাটের ওপর। একদম মাঝ-বরাবর কিছু একটা প্যাকেট করে রাখা। ও দ্রুত পায়ে এসে হাতে তুলল। প্যাকেট খুলতেই চিরকুট মতো কিছু ঝুপ করে পড়ল সেখান থেকে।
তুশি কৌতূহলে হাতে নিয়ে মেলল। এখন অবশ্য সে ঝরঝর করে বাংলা পড়তে পারে। বেশ গোছানো হাতে লেখা,
“ কাল তো রাগ করে চলে এলে। নিজের জন্যে কিছু নিলেই না। তাই আমি নিজ দায়িত্বে তোমার জন্যে এই গাউনটা কিনলাম তুশি। পরো এটা। সাথে মন ভরে সেজো। জেনে রেখ এই গাউনে কেউ একজন তোমাকে দুচোখ ভরে দেখার আশায় অপেক্ষা করে আছে।”
( অয়ন)
পুরোটা পড়ে তুশির ভেতরটা নড়বড়ে হয়ে গেল। ক্লান্ত শ্বাস ফেলল সে। অয়ন ভাই নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ। হয়ত ওকে খুব ভালোও বাসেন। কিন্তু তুশির জেনেবুঝেও লোকটাকে ঠকাতে হবে। খারাপ লাগলেও,বিবেকে বাঁধলেও করতে হবে এমনটা। কারণ,এই ভালোবাসা তুশি চায় না। এই ভালোবাসা তুশির জন্য নয়। এই ভালবাসায় ওর শুধু অস্বস্তি হয়,ঘৃণা লাগে। যতবার অয়ন ওর দিকে অন্যরকম নজরে তাকায় ততবার বিব্রতবোধে মরে যায় সে।
অয়নের ভালোবাসার দাবিদার শুধু ইউশা। এতগুলো বছর যে মেয়েটা তাকে চুপটি করে লালন করে গেল,অয়ন শুধু সেই ইউশারই হোক।
ইউশার নাম উঠতেই তুশির মাথায় চট করে একটা দুষ্টু বুদ্ধি এলো। চিরকুট ফেলে,জামার প্যাকেটটা নিয়েই চপল পায়ে ছুটে গেল বাইরে।
যাওয়ার সময় সামনে হাসনা পড়লেন। জয়নবের সাথে বসার ঘরের সোফায় বসেছিলেন তিনি। কদিনে দুজনের খুব জমেছে।
ওকে দেখেই বললেন,
“ কী রে,তুই অহনও তৈরি হসনাই?”
তুশি ছুটতে ছুটতে জানিয়ে গেল,
“ এইত একটু পরেই হব দাদি।”
তুশি একদম সোজা ইউশার রুমে গিয়ে ঢুকল। জয়নব সেদিক চেয়ে হাসলেন। বললেন,
“ ওদের দেখলে নিজেদের বয়সের সময়টা মনে পড়ে যায়। এই বয়সে তো আমার শওকতের বয়স চার বছর ছিল। আর ওরা দেখুন এখন অবধি কে কাকে বিয়ে করবে সেটাই ঠিক করতে পারছে না।”
হাসনা গা নাড়িয়ে হেসে উঠলেন। পান বানিয়ে একদম মুড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“ নেন খান। আমগো বস্তির স্পিশাল পান এইডা। অনেক মজা!”

“ আরে তুশি,তুমি চলে এলে? আমি তো এখনই যাচ্ছিলাম।”
তুশি ভারি ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ তোমাকে আর যেতে হবে না। নাও,এটা রাখো।”
কোলের প্যাকেটটা ইউশার হাতে ধরিয়ে দিলো সে। ইউশা বের করতে করতে শুধাল,
“ কী আছে এতে?”
পরপর গাউনটা দেখেই অবাক হয়ে বলল,
“ ওমা,এটা কী সুন্দর! কোথায় পেলে?”
তুশির উত্তর তৈরি,
“ বাবা দিয়ে গেছেন। আমি তো কিছু কিনিনি সেজন্য বোধ হয়। কিন্তু আমার এত ভালো লাগেনি। তোমার যখন লেগেছে তুমি পরে ফেলো।”
“ কিন্তু বাবা তো অনেকক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেলেন। বললেন আমাদের হলে ওনাকে কল করে দিতে।”
“ হ্যাঁ, তো আমি কখন বললাম এটা বাবা নিজে দিয়ে গিয়েছেন? রহিম চাচাকে কে দিয়ে পাঠাল।”
“ ড্রাইভার চাচা?”
“ হ্যাঁ। তুমি এটাই পরো হ্যাঁ? আর আমি তোমার জামাটা পরি।”
ইউশা অবশ্য আপত্তি করল না। দুবোন,একটা পরলেই হলো। তুশি জামা নিয়ে বেরিয়ে এলো তাড়াহুড়ো করে। ঠোঁটে বিজয়ের হাসি নিয়ে যখন ঘরে গেল,হোচট খেল আরেকবার।
আবার বিছানার ওপর একটা নতুন প্যাকেট রাখা। এটার সাইজ আগেরটার থেকেও বড়ো।
তুশি আশ্চর্য হয়ে এগিয়ে আসে। অয়ন কি আবার পার্সেল রেখে গেল?
সে কি তবে দেখে ফেলল ও জামা ইউশাকে দিয়ে এসেছে? না, দেখার তো কথা নয়। ইউশার ঘরে যাবার সময় ওনার ঘরের দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ দেখল তুশি। এটা তাহলে কে রাখল এখানে?
এক ঝাঁক প্রশ্ন মনে চেপে মেয়েটা এগিয়ে এসে বিছানায় বসল। হাতে তুলে নেড়েচেড়ে দেখল প্যাকেটটা। গায়ে একশ স্কচটেপ, হাত দিয়ে টানলেও ছুটবে না। ও কেচি নিয়ে আরাম করে বসল এবার।
পুরো প্যাকেট খুলতেই কোটর ফুড়ে চোখ ছিটকে এলো তুশির। একটা ধবধবে সাদা গাউন, একটা হেড পিস, পার্লের নেকলেস,এক জোড়া হিল জুতোর সাথে আরো একটা ছোটো বাক্স আছে এতে। কিন্তু এত কিছু! এত কিছু কে দিলো ওকে?
তুশি তড়িঘড়ি করে পাশের অন্য বাক্সটা খুলল। ব্যস্ত হাতে ঢাকনা তুলতেই মাথা চক্কর কাটল তার। গোটা বাক্স ভরতি চুড়ি। কাচের,পাথরের,পার্লের থেকে শুরু করে সব আছে। তুশি বিস্ময়ে কিছুক্ষণ মূর্তি বনে রইল। একেকটা জিনিস দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব দামি। তুশি বোকা বোকা চোখদুটো ঘোরাল এদিক-সেদিক।
কোনোভাবেই যখন কূল-কিনারা পেলো না,হুট করে নজর পড়ল চুড়ি ভরতি বাক্সের গায়ে। ঢাকনার তলায়
একটা চারকোণা কাগজ স্কচটেপ দিয়ে লাগানো। লেখা,
“ অ্যাই চোর,রাতে ছাদে আসোনি মাফ করে দিয়েছি। মুখের ওপর দরজা আটকে দিয়ে বেয়াদবি করেছ সেটাও মাফ করে দিয়েছি। কিন্তু ভুল করেও যদি ভেবে থাকো আমার পাঠানো জিনিসগুলো পরবে না, তাহলে মাফ তো দূর আজকে তোমাকে জ্যান্ত খেয়ে ফেলব আমি। এন্ড ইটস মাই প্রমিস টু ইউ বে**….”

তুশি বাকরুদ্ধ,স্তব্ধ। এসব সার্থ পাঠিয়েছে,ওর জন্যে? কিন্তু এই বে তে কী? বে-এর পর আর কিছু লেখেনি কেন? কোনোভাবে কি ওকে বেয়াক্কেল বলল! নাকি বেয়াদব বলল! যাই বলুক। জিনিসগুলো সার্থর দেয়া ভাবতেই তুশির মুখচোখ শক্ত হয়ে গেল। সব হাত থেকে ঝট করে নামিয়ে রেখে উল্টোদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো সে।
ঢং! পশুর মতো আচরণ করে,ওর বুকটা ভাজাভাজা করে এখন গিফট দেয়া হচ্ছে। তুশি চেয়েছে গিফট? পরবে না এসব তুশি। কিছুতেই না।


তনিমা সবাইকে ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। একজন আসছে,তো আরেকজন নামছে না। এখানেই তো সাড়ে সাতটা বেজে গেল প্রায়। ওদিকে শওকতও ফোন করছেন, তাড়া দিচ্ছেন বারবার। ভদ্রমহিলা আরেকবার ডাকলেন,
“ ইউশা,তুশি, হলো তোদের?”
দুবোনের কেউই এলো না,সাড়াও দিলো না। তবে অয়ন নামল দ্রুত। পরনে কালো স্যুট-প্যান্ট। গলায় সাদা রঙের টাই, হালকা লম্বা চুল পরিমিত যত্নে সেট করা। বা হাতে সিলভার চেইনের ঘড়ি।
এসেই দুহাত দুদিকে মেলে বলল,
“ দিদুন,হাউ লুকিং আই এ্যাম?”
জয়নব মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,
“ দারুণ দারুণ। বয়স থাকলে তো আমি আজ তোমার প্রেমেই পড়ে যেতাম দাদুভাই।”
অয়ন হাসল। নিঃশ্বাস ঝেরে বিড়বিড় করল,
“ আপাতত যার পরার কথা সে পরলেই চলবে।”

বসার ঘরে তনিমা, রেহনূমা, জয়নব, মিন্তু আর হাসনা ছিলেন। তবে বৃদ্ধারা যাচ্ছেন না। বাচ্চাদের অনুষ্ঠান,ওনাদের কী কাজ? এই বয়সে পার্টি টার্টি পোষায়! অত উচ্চ শব্দের গানবাজনা শুনলেই তো মাথা ধরে যায়।
শওকত আর সাইফুল আগেভাগে চলে গিয়েছেন। নাসীর একা মানুষ,ব্যবস্থাপনায় যদি কিছু লাগে!
রেহণূমা জিজ্ঞেস করলেন,
“ সার্থ কোথায় রে অয়ন?”
“ রেডি হচ্ছে বোধ হয়।”
তনিমা বললেন,
“ মেয়েদের নাহয় সাজগোজে দেরি হয়,ও এত কী রেডি হচ্ছে?”
“ পার্টির মেইন ফোকাসই তো সে মামুনি। একটু মেক-আপ অন্তত লাগাতে দাও।”
তক্ষুনি সার্থ বেরিয়ে এলো। সিঁড়ির ঝকঝকে টাইলসে তার মসমসে জুতোর শব্দে ফিরল সবাই। ওর পরনেও একইরকম কালো স্যুট-প্যান্ট। শুধু খোলা বুক হতে দুটো বোতাম খোলা সাদা শার্ট উঁকি দিয়ে আছে। টাই পরেনি। হাতের ব্র‍্যান্ডেড ঘড়িটায় কালো লেদারের স্ট্র‍্যাপ। ট্রিম করা চুলগুলো নরম জেল দিয়ে ব্যাকব্র‍্যাশ করে ওপর দিকে ওঠানো।
অয়ন অবাক হয়ে বলল,
“ এ কী, ভাইয়া তুমি ব্লাক স্যুট কেন পরেছ? তোমাদের ড্রেসকোড তো হোয়াইট। আইরিন বলে গেল শোনোনি?”
“ তো,শুনলেই বা। আমি সেটাই করব যেটা আমার ইচ্ছে হবে।”
অয়ন আর তর্কে গেল না। কাঁধ উঁচিয়ে বলল, ,
“ ওকেহ।”
সার্থর এই আহামরি নিঁখুত সুতনু মুখখানা দেখে হাসনা ভীষণ মন খারাপ করলেন। আহারে,কত সুন্দর একটা ছেলে তার নাত জামাই হয়েছিল। কতই না মানাত তুশির পাশে৷ ভাগ্যের দোষে
আজ সব শেষ!
সার্থ হাত ঘড়ি দেখল। মাঝে উদগ্রীব অথচ শান্ত নয়নে এক পল চাইল স্টোর রুমের পথে। চোরটা ওর দেয়া জিনিস পরবে তো? যেই ঘাড়ত্যাড়া মেয়ে,দেখার পর কী করবে কে জানে!
অয়নেরও সেদিকেই নজর। তার চেহারায় উৎকণ্ঠা। অন্তঃপটে এক প্রস্থ উত্তেজনা সাথে। ওর দেয়া গাউন পরে তুশি আসবে,প্রথমবার ওর দেয়া কিছু পরবে ! এ যে নিঃসন্দেহে বুক জুড়িয়ে দেয়া ব্যাপার।

রেহণূমা এবার ধৈর্যের খেই হারালেন। সবাই এসেছে,কিন্তু এই রাজকন্যাদের খবর নেই। হাঁ করলেন ডাকবে বলে,তক্ষুনি দরজা দুহাতে ঠেলে বেরিয়ে এলো তুশি।
কুঁচকে থাকা কপাল ঘুরিয়ে ফিরে চাইল সার্থ। তার তীক্ষ-ধারালো চাউনিরা আটকে গেল অমনি। ভাঁজ ফেলা কপাল তুরন্ত শিথিল হয়ে গেল। তুশির পরনের ফুল হাতা ফ্লাফি সাদা গাউনটা, লম্বায় একেবারে মাটি ছুঁয়ে গেছে। গলায় চিকণ পার্লের নেকলেসের সাথে, কানে দুটো পার্লের ছোটো ছোটো টপ।
ঠোঁটে লাইট ওয়াইন শেড লিপস্টিক। খোলা চুলের ওপর একটা বান্ডানা জড়ানো। আগাগোড়া সাদায় মোড়া মেয়েটার রূপে চারদিক ধাঁধিয়ে গেল আজ। যেন স্নিগ্ধতার এক জীবন্ত প্রতিমা। প্রত্যেকের সাথে দৃষ্টি মিলিয়ে মূক চোখে চেয়ে রইল সার্থ। তার দুচোখ ছাপানো মুগ্ধতার জাল। যা পুরুষালি নয়ন ছড়িয়ে শেষমেষ নেমে এসে বুক শুকিয়ে দিলো। এক ধাক্কায় অপরূপ মেয়েটার সৌন্দর্য যেন কেটেছিঁড়ে বসে গেল হৃদয়ে।
নিষ্পলক চেয়ে চেয়েই একটু ঢোক গিলল ছেলেটা। অস্পষ্ট আওড়াল,
“ স্যানোরিটা!”

কিন্তু মুখ অন্ধকার করে ফেলল অয়ন। এতক্ষণের স্ফূর্ত হাসি ঝট করে নিভে গেল তার। তুশি ওর দেয়া জামাটা পরল না?
তুশি গাউনের দু মাথা দুইহাতে একটু তুলে এগিয়ে আসে। সেই পুরোটা সময় সার্থ ধীরুজ গতিতে চোখ নামিয়ে মেয়েটার পা থেকে মাথা অবধি মাপল। তুশি গিয়ে
মায়েদের সামনে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে হেসে হেসে,
“ আমাকে কেমন লাগছে?”
তনিমা গদগদ হয়ে বললেন,
“ এটা আমাদের তুশি? মা গো,কী সুন্দর লাগছে।”
মা,বড়ো মা,দিদুন, দাদি সবাই মিলে ওর খুব প্রসংশা করলেন। অতি বিস্ময় আর আহ্লাদে বেমালুম ভুলে গেলেন, মেয়েটার পরনের সাদা জামার কথা।
কথা বলতে বলতে তুশি আড়চোখে এক পল সার্থকে দেখল। মানুষটা তখনো চেয়ে। নেশার সুর দৃষ্টিতে। অথচ ঠোঁটে বিন্দুমাত্র হাসি নেই। তুশি জানে এই গম্ভীরতার নাটক ওপর ওপর থেকে। হুহ,এতক্ষণ তো ঠিকই ওকে হাঁ করে দেখেছে। কী ভাবছে বিটকেলটা, ওনার হুমকির ভয়ে তুশি ওনার দেয়া জামা পরল? হুহ! তুশি একবার জেদ ধরলে,ওনার হুমকিতেও কাজ হতো না। কিন্তু ও পরেছে কেন নিজেই জানে না। কতবার মনকে শাসাল, বোঝাল,কতবার করে বলল যে মানুষ তোর নয় তার আনা কিচ্ছু তোর নয়। তাহলে তুই কেন পরবি? ছুঁবি না এসব। আধ ঘন্টা আগে অবধি ঠায় বসেছিল সে।
কিন্তু তুশির মন আজ কোনো কথা শুনল না। একটু বেশিই বেহায়া হতে চাইল আজ। জীবনে প্রথমবার বিটকেল ওর জন্যে কিছু একটা এনেছে। কিছু একটা!
ও কী করে ফেরাতো? তুশির অভিমান বেড়েছে রাগ বেড়েছে কিন্তু ভালোবাসা তো কমেনি। সেই ভালোবাসার একেকটি প্ররোচনায় আজ তুশি নির্লজ্জ না হয়ে পারল না। এতে কেউ ওকে ন্যাকা বলুক,বলুক আত্মসম্মান নেই তাতে ওর কিচ্ছু যায় আসে না।

তুশির হঠাৎ চোখ পড়ল অয়নের ওপর। ছেলেটার মাথা নিচু, বিমর্ষ চেহারা। মানুষটাকে দেখে তুশির নিজেরই মুখ কালো হয়ে গেল। নিশ্চয়ই ওনার দেয়া জামাটা না পরাতে কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু এক্ষুনি ধরা দিলে হবে না। অয়নকে বুঝতে দেয়া যাবে না,তুশি ইচ্ছে করে পরেনি। জানতে দেয়া যাবে না ওর মনে কী আছে। হওয়ার আগেই সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে তাহলে। তুশি নিজেই অয়নের সামনে এসে দাঁড়াল। অমনি নীরস চোখ তুলে চাইল ছেলেটা। মন খারাপ করে বলল,
“ আমার দেয়া গিফট পছন্দ হয়নি?”
সার্থ কপাল কুঁচকে ফেলল। অয়নও গিফট পাঠিয়েছিল? তুশি তবে সেটা রেখে ওর দেয়া গাউন পরেছে! ভাবতেই তার চেহারা টানটান হয়ে যায়। সেই মূহুর্তে সার্থর মনে হলো ও একটা বিশাল বড়ো যুদ্ধ জিতে গিয়েছে। দুপাশে একবার চোখ ঘুরিয়ে গালের ভেতর জিভ ঠেলে হাসল সে। তুশি তক্ষুনি বলল,
“ আসলে আপনার দেয়া জামাটাই পরতাম। কিন্তু ইউশা ওটা দেখেই পছন্দ করে ফেলেছিল,তাই ওকে দিয়ে দিয়েছি। এই জামাটা হাতের কাছে পরেছিল,সেজন্য দ্বায় পড়ে পরতে হলো আরকি। এতে এমন বিশেষ কোনো ব্যাপার নেই।”

তুরন্ত হাসিটা দপ করে মুছে গেল সার্থর।
অয়ন অবাক হয়ে বলল,
“ ইউশা, আমার দেয়া গাউন পরেছে?”
“ হ্যাঁ ঐ তো দেখুন।”
ইশারা অনুযায়ী পিছু ঘুরল অয়ন। ইউশা সত্যিই সেজেগুজে নামছে। কুচকুচে কালো রঙের গাউন,চুলটা মেসি বান করে ওপর দিকে তোলা। সামনের কিছু চুল কার্ল করে গাল ছুঁয়ে নেমেছে। গলা খালি,ঠোঁট ভরতি রেড রোজ শেড লিপস্টিক। কদিন ধরে ইউশার মন মরা হয়ে ঘুরে বেড়ানো মুখটার সাথে,আজকের এই হাস্যোজ্জ্বল আদুরে মুখের বড্ড তফাত। অয়নের সব খারাপ লাগা নিমিষেই উধাও হয়ে গেল।
তুশি চাপা কণ্ঠে বলল,
“ সুন্দর লাগছে না ওকে?”
অয়ন ঘাড় নাড়ল,
“ হু।”
“ আপনার দেয়া জিনিসে ইউশার তো অধিকার আছে বলুন। ওকে দেয়ায় আপনি নিশ্চয়ই রাগ করেননি?”
ও মুচকি হেসে বলল,
“ ইটস ওকে। কিন্তু তুমি পরলে আমি বেশি খুশি হতাম।”
তুশি খুব কষ্টে ঠোঁটের হাসি ধরে রাখল। বলল না কিছু।
সার্থর এত ন্যাকামো ভালো লাগল না। ঠিক মুখোমুখি অয়ন-তুশির মাঝে দাঁড়িয়েছিল সে। একবার খিটমিটে চোখে চেয়ে দুজনকেই দেখল। বিড়বিড় করে বলল,
“ ইরিটেটিং।”
তারপর দুম করে ঠিক ওদের মাঝখান থেকে চলে গেল সার্থ। যেতে যেতে ছুড়ে দিলো,
“ গাড়ি বের করছি, যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে আসা হোক।” অয়ন ইউশার হাসিমুখ দেখে নিজের খারাপ লাগা গিলে নিলো। ফোস করে শ্বাস ফেলে চলল ভাইয়ের পেছনে। তনিমা, রেহণুমা, মিন্তুও এগোল পরপর।
ইউশা, তুশিকে দেখেই তাজ্জব হয়ে বলল,
“ একী, তুশি তুমি দেখি হোয়াইট পরেছ। কোথায় পেলে এটা? অর্নামেন্সটও তো খুব এক্সপেন্সিভ মনে হচ্ছে।”

তুশি উত্তর দেয়ার আগেই আবার বলল,
“ আইরিন আপু না বলল এটা ওনাদের ড্রেসকোড? এবার যদি সবার সামনে রিয়্যাক্ট করে বসে!”
তুশি যেন আকাশ থেকে পড়ল।
চোখ দুটো বিকট করে ভাবল,
“ তাইতো,এই কথাটা তো আমার মনেই ছিল না।”
ইউশা নিজেই বলল,
“ আচ্ছা মেজো ভাইয়া কালো স্যুট পরল কেন? তুমি পরেছ সাদা,যার সাদা পরার কথা সে-ই পরেনি, এসব কী হচ্ছে?”
তুশির নিজেরই সব গুলিয়ে গেল।
বিচলিত হয়ে বলল,
“ তাহলে কি আমি চেঞ্জ করে আসব?”
জয়নব বললেন,
“ না, দরকার নেই। সেজেছ,সুন্দর লাগছে। আর সার্থ নিজেই ওর হবু স্ত্রীর ঠিক করা ড্রেসকোড মানেনি,তোমার আর মেনে কী কাজ? যাও,এমনিই দেরি হচ্ছে। যাও এভাবে।”
তুশি একটু ভরসা পেলো।
মিন্তু তখন আরেকবার এলো দরজায়। ডাকল হূলস্থূল করে,
“ আরে সাদা-কালো পেত্নীরা তাড়াতাড়ি এসো। মেজো ভাইয়া তো হর্ন বাজিয়ে বাজিয়ে আমাদের সবার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।”
তুশি তাড়াহুড়ো পায়ে এগোলো ঠিকই,তবে বুকের দুরুদুরু ভাব গেল না। কোথাও গিয়ে মনে হলো পার্টিতে আজ নিশ্চয়ই ওর সাথে খারাপ কিছু ঘটবে!

চলবে।

কাছেআসারমৌসুম!

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

(৫৩-খ)
সৈয়দ বাড়ি থেকে আসা বড়ো মাইক্রো-টা একদম সোজা এসে থামল ক্লাবের সামনে।
সাথে সাথে নাসীর এগিয়ে গেলেন। সাথে তার বড়ো বোনের স্বামী ওয়াসিফ। শওকত আর সাইফুলও ছিলেন এখানে।
ততক্ষণে গাড়ির দরজা খুলে একে একে বের হলো সকলে। বড়োদের কুশলাদি বিনিময়ের মাঝে তুশি হাঁ করে দেখছিল চারিদিক। এসব চকমকে জমকালো পার্টি-টার্টি ওর জীবনে প্রথম। একেবারে চোখ ধাধানো ব্যাপার-স্যাপার। ইস,সারাজীবন এসব দূর থেকে দেখেছে। কখনো কোনো ক্লাবের ভেতরে ঢোকার সাহসও হয়নি। কোনোদিন ভেবেছিল,ওর জীবনেও ঘটবে এসব? তুশির ধ্যান ছুটল পাশ থেকে আসা পুরুষালি আওয়াজে।
উঁচু বিল্ডিং হতে চোখ এনে ফিরে চাইল সে। অয়ন হাসে,হাতটা পেতে বলে,
“ এসো।”
তুশির মুখে অস্বস্তির একটা লম্বা দাগ পড়ল। হাতটা ধরবে না ভাবলেও,ইউশা হতে দিলো না এবার। চট করে তুশির হাতটা তুলে অয়নের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“ অয়ন ভাই, ওকে তোমার সাথে সাথে রাখো। আসলে আইরিন আপু কেমন জানোই তো!”
বলতে বলতে মেয়েটা এক বার দেখল গাড়ি পার্ক করে সদ্য হাজির হওয়া সার্থর পানে। তক্ষুনি ভেতর হতে সেখানে ছুটে এলো আইরিন। কোনো দিকে না চেয়ে সোজা গিয়ে থামল ওপাশে সার্থর সামনে।
খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ এসেছ তুমি? আমি কখন থেকে অপেক্ষা করছিলাম। এমা,কালো কোর্ট কেন? আমি সাদা কোর্টের কথা বলেছিলাম, সার্থ।”
ইউশা চোখ কপালে তুলে বলল,
“ ইইই সার্থ! ভাইয়াকে নাম ধরে ডাকছে।”
অয়ন বলল,
“ তো ওর উড বি,ও ডাকবে না? আমিও তো চাই তুশি আমাকে এভাবে ডাকুক। কী তুশি ডাকবে না?”
তুশি চুপ করে থাকে।
ইউশা আগ বাড়িয়ে বলল,
“ ডাকবে তো,কেন ডাকবে না? একটু সময় দাও। ও তো আইরিন আপুর মতো এত ফাস্ট না।”
“ সময় দিয়েই যাচ্ছি। ম্যাডামের যে কবে একটু দয়া হবে কে জানে!”
তুশির কান কথার দিকে রইলেও চোখটা সার্থ আর আইরিনের ওপর। মেয়েটা অতি খুশিতে এখনো খেয়াল করেনি তুশির পরনেও সাদা গাউন। নিজের মতো আহ্লাদে নেতিয়ে পড়ে বলল,
“ তুমি আমার একটা কথাও শোনো না। আচ্ছা ছাড়ো, কেমন লাগছে আমায়?”
সফেদ গাউনের দুপাশটা ধরে একবার নেড়েচেড়ে দেখাল আইরিন। সার্থ কপালের সাথে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল।
তক্ষুনি ওর পকেটে গুজে রাখা হাতের বাহুতে হাতটা গলিয়ে দিলো আইরিন।
“ চলো ভেতরে যাই৷ তোমাকে আমার বন্ধুদের সাথে আলাপ করাব!”
তুশির মুখ অমনি কালো হয়ে গেল। শরীর মুচড়ে উঠল, ফুঁসে ওঠা অধিকারবোধের দরুণ। ডাইনিটা এভাবে ওনার বাহু জাপটে ধরেছে! তুশির মন চাইল এক ছুটে গিয়ে ছাড়িয়ে দিতে। দুহাতে আইরিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলতে মাটির ওপর।
অথচ কাতর চাউনির ফাঁক গলে মেয়েটা দেখলই না আরো দুটো তপ্ত চোখের আগুন।
অয়নের হাতের মুঠোয় থাকা তুশির হাতটা,
অয়নের তিনটে আঙুল দিয়ে চেপে রাখা সেটা, সব মিলিয়ে চোয়াল শক্ত করে আইরিনের সাথে ভেতরে ঢুকে গেল সার্থ।
তুশি কষ্ট পেলো,বুক জ্বলে গেল তার। সাদা গাউন আর কালো কোর্ট পরা এক জোড়া কপোতির প্রস্থান শূন্য চোখে দেখল কিছু পল। পরপরই রাগে নিজের ওপর বিতৃষ্ণা ধরল ভীষণ। কেন পরলো ও সার্থর দেয়া জামা? সেইত ঠিকই আইরিনের হাত প্যাঁচিয়ে চলে গেলেন উনি। তাহলে ও কেন পরল? কেন আজ জামাটা রেখে আসতে পারল না? কেন ও আবার সার্থর প্রতি দূর্বলতা প্রকাশ করে নিজেকে এমন ছোটো করে ফেলল? অয়ন হাতে টান বসায় তখনই,
“ কী হলো, চলো?”
ততক্ষণে বড়োরা ভেতরে চলে গিয়েছেন।
তুশি হাত ছাড়াতে গেলেই ও বলল,
“ থাক না। কাপলদের এভাবেই এন্ট্রি নিতে হয়।!
তুশি আর তর্কে গেল না৷ মনে হলো ক্লান্তিতে শরীর নেতিয়ে যাচ্ছে। শুধু পাশ ফিরে মেজাজ খারাপ করে এক পল দেখল ইউশাকে। মলিন চোখে হাসল ইউশা। বলল,
“ আমাকে পরে দেখো,চলো তো এবার।”

আইরিন আর সার্থ ঢুকতেই ওপর থেকে বেলি ফুলের পাপড়ির বৃষ্টি হয়। এটা আগে থেকে বলাই ছিল ক্লাবের কর্তৃপক্ষের কাছে। মাত্রাতিরিক্ত ফরসা মেয়েটার ঠোঁটের হাসি, আর সুদর্শন খেতাবে এগিয়ে থাকা বলিষ্ঠ গড়নের যুবক সবার মনোযোগ কেড়ে নিলো। হাসিহাসি মুখ করে চেয়ে রইল সকলে। সার্থর মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ। মুখে হাসি তো দূর,একটু শিথিলতা অবধি নেই। আইরিন বাহু প্যাঁচিয়ে রাখলেও,ওর চোখে অয়নের ওই তিন আঙুল দিয়ে তুশির হাত ধরে রাখার দৃশ্যই ভেসে গেল শুধু।
আইরিন বলল
“ চলুন,আমার বন্ধুরা ওদিকটায় আছে। ওরা আপনাকে দেখার জন্যে ভীষণ এক্সাইটেড।”
“ ওদের এখানে আসতে বলো। আমি কারো কাছে যেচে আলাপ করতে যাই না। আমার কাছে সবাই আসে।”

আইরিন রাগ করল না,হাসল উলটে। মনে মনে বলল,
“ আপনার এই এটিটিউডেই আমি প্রথম মরেছিলাম সার্থ। তারপর থেকে একটু একটু করেই আমাকে মারছেন আপনি।”
মুখে বলল,
“ আচ্ছা, ডেকে নিয়ে আসছি।”
সার্থ দাঁড়িয়ে রইল। হুট করে
একজন পাশ থেকে বলল,
“ ওয়াও, এত দেখছি আরো একটা কাপল!”
অমনি চকিতে ফিরে চাইল সে।
অয়ন আর তুশি আসছে। সেই একই থিমে,ধবধবে গাউন পরিহিতা মেয়েটার পাশে সুতনু অয়ন হাত ধরে এগোচ্ছে। ফুলের বৃষ্টি তখনো থাকায় ওদের গায়েও পড়ল কিছু কিছু । আশপাশ থেকে চাপা গুঞ্জনে যখন দু একটা শব্দে নাইস কাপল, কী দারুণ মানিয়েছে শুনতে পেলো সার্থ গায়ের চামড়া সহ পুড়ে গেল তার।
একবার কটমট করে দুজনকে দেখে সেখান থেকে গজগজে চিত্তে সরে গেল সে।

মিন্তু ভেতরে এসে দেখল চারিদিকে শুধু জোড়া জোড়া সবাই। বড়োদেরও কেউ আছে,মাঝবয়সিদেরও কেউ না কেউ আছে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ সবার একটা করে কাপল আছে। শুধু আমার আর তোর নেই। আমরা হোলাম এই বিরিয়ানির মতো পার্টিতে এলাচের মতো বেমানান।”
ইউশা নাক কুঁচকে বলল,
“ তুই কোন ক্লাসে পড়িস? এই বয়সে কাপলের কী বুঝিস তুই!”
মিন্তু বুক ফুলিয়ে বলল,
“ আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার গোফ উঠেছে। দুদিন পর দাড়ি উঠবে। তুই সব সময় আমাকে বাচ্চা বানিয়ে দিবি না। এবার কোচিং-এ একটা মেয়ে আমাকে লাভলেটার দিয়েছে জানিস!”
“ কীহ,তোর মত ফেলুদাকে চিঠি দিয়েছে? ইয়াক, এই মেয়ের পছন্দ দেখে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।”
“ তো যা না। গিয়ে ঐ পুলে ঝাপ দে। ওখানে পরলে মনে হয় না বাঁচবি।”

ইউশা ওর আঙুল মেপে ফিরে তাকাল। ওই কোণে একটা টলটলে সুইমিংপুল আছে। পানির রং কালো,নিচে কালো টাইলস থাকায় দেখতে ভূতুড়ে বেশ। পাশে আবার ছোটো বিলবোর্ডে লেখা,
“ আট ফুট গভীর জল। সাঁতার না জানলে দূরে থাকুন।”

ইউশার নাম ধরে মা ডাকলেন তখনই।
মিন্তুকে নিয়েই এগোলো সে।
এদিকে অয়ন তুশিকে ছাড়ছে না। একদম সাথে নিয়ে হাঁটছে। আলাপ করাচ্ছে এর ওর সাথে। তুশির আর ভালো লাগছে না এসব। বিশেষ করে অয়ন যখন বলছে, ওর হবু বউ, অস্বস্তিতে মুচড়ে উঠছে ভেতরটা। ও
আস্তে করে বলল,
“ অয়ন ভাই এবার হাতটা ছাড়ুন।”
“ তুশি, আমি ধরলেই তুমি এমন ইরিটেট ফিল করো কেন?”
“ আমার ভালো লাগছে না।”
অয়ন দাঁড়িয়ে গেল।
“ এখন তো এটা বললে হবে না তুশি৷ আমাদের বিয়ে ঠিক হয়েছে। আজ পার্টির পরে এংগেজমেন্টের তারিখ পড়বে। অফিসিয়ালি আমার বাগদত্তা তুমি। আমি তোমার হাত ধরব না তো কি অন্য কেউ ধরবে?”
তুশি খেয়াল করল অয়নের কথা বলার ভঙ্গিমা অন্যরকম। চোখ দুটো জ্বলছে। শক্ত হচ্ছে মুখের পেশী। ধরে রাখা হাতটায় আঙুল দাবিয়ে দিচ্ছে আরো। এই রূপ অচেনা তার। ও ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আপনার কি রাগ হচ্ছে আমার ওপর?” মুহূর্তেই অয়ন হেসে ফেলল,বলল
“ তোমার ওপর আমার রাগ হবে? ধ্যাত।
আচ্ছা শোনো এমন করতে নেই। থাকো না আমার সাথে। চলো তোমাকে আংকেলদের ফ্যামিলির সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, ওনারা তো তোমাকে তেমন করে চেনেনই না।”

জুসবারে একটা টুলের ওপর বসেছিল সার্থ। হাতে জুসের গ্লাসটা টেবিলের ওপর ঘোরাতে ঘোরাতে তার ঠান্ডা, নির্লিপ্ত চোখ এদিকেই আটকে।
তখনই আইরিন এসে বলল
“ আপনার আইস লাগবে?”
“ লাগলে আমি নিতে পারব।”
“ আমি দিয়ে দিই?”
উত্তর দেয় না সার্থ।
আইরিন খেয়াল করল ওর চোখ অন্য কোথাও। ওহ, নিশ্চয়ই তুশিকে দেখছে। এই বস্তিটার কথা তো ওর মাথাতেই ছিল না। কী পরে এসছে আজ? মল থেকে কী কিনল দেখা হয়নি তো। আইরিন সাথে সাথে ঘুরে তাকাল ওদিকে। অমনি প্রকাণ্ড বাজ পড়ল মাথায়। সে ছাড়া গোটা কালোয় ছেঁয়ে যাওয়া পার্টির মাঝে তুশি সাদা গোলাপের মতো ফুটে আছে। ও আর্তনাদ করে বলল,
“ এ কী! ও হোয়াইট পরেছে কেন? আমি বারবার বলেছিলাম এটা আমাদের থিম। ও কোন সাহসে পরল?”
আইরিন তেড়ে যেতে নিলেই সার্থ হাতটা টেনে ধরল। গর্জন ছুড়ল তপ্ত চোখে,
“ চুপ করে বসে থাকো।”
“ কিন্তু ও..”
“ এখন ওকে একটাও কথা শোনালে এই সুস্থ পার্টি আমি অসুস্থ বানিয়ে দেব,আইরিন। সো কিপ ইয়র মাউথ কমপ্লিটলি শাট।”
আইরিন থম মেরে গেল। বলল,
“ গাউনটা কি আপনি ওকে দিয়েছেন?”
“ তাতে তোমার কোনো অসুবিধে? আমার টাকায় আমি কাকে কী দেব,ইটস ডেফিনেটলি মাই চয়েস। তুমি যে সবার সামনে আমাকে নাম ধরে, তুমি তুমি করে আহ্লাদ করছো, এটুকুতেই শান্ত থাকো। এর বেশি গভীরে যেও না।”
“ কিন্তু এভাবে আমার আনন্দটা ভেস্তে না দিলেই পারতেন। এটা কথা ছিল না।”

“ পার্টি রাখা হবে,সেখানে বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হবে,এটাও কিন্তু কথা ছিল না।
তাও হচ্ছে। কিছু বলেছি এ নিয়ে?”
আইরিন আর কথা খুঁজে পেলো না। মুখ কালো করে বসে রইল। তবে ভেতর ভেতর তুশির প্রতি চাপা রাগটা গাঢ় হলো আরো। খুব সেজেগুজে আসা হয়েছে না,একটা সুযোগ আসুক শুধু। সবার সামনে এমন নাস্তানাবুদ করবে,কেঁদে কূল পাবে না।

নাসীরের আম্মা আসেননি। শুধু ওনার বড়ো বোন,আর তার পরিবার এসেছে। তবে ইউশা আর তুশির চোখ কপালে গিয়ে ঠেকল রোকসানার সাজসজ্জা দেখে। এতদিন ছেড়া ফাঁটা জিন্স আর টপসে দেখে আসা নারী,আজ একটা কালো শাড়ি পরেছেন। চুলটা খোলা, মুখে ভারি সাজ। ইউশা ফিসফিস করে বলল,
“ ফুপিকে দেখেছ তুশি, বিদেশ থেকে এসে যা রঙ দেখাচ্ছিল,শ্বশুর বাড়ি এসেই ভোল পালটে ফেলেছে।”
তুশি মিটিমিটি হাসল। রোকসানার তক্ষুনি ওর দিকে চোখ পড়ল। সাথে সাথে বললেন,
“ হোয়াট দ্য হ্যেল,
তুমি হোয়াইট কেন পরেছে? পার্টির থিম কালো শোনোনি? হোয়াইট তো শুধু সার্থদের জন্যে।”
এইত, এই ভয়টাই পাচ্ছিল তুশি। মুখ কাচুমাচু করে ও ইউশাকে দেখল। সে বলল,
“ মেজো ভাইয়াও তো কালো স্যুট পরেছে ফুপি।”
“ সেটা পরের কথা। তুশি কেন থিম অনুযায়ী ড্রেস পরেনি? তোমার মা দেখেনি এসব? কোথায়,কোথায় ছোটো ভাবি কোথায়?”
তুশির ভেতরটা গণগণ করে উঠল। এখন ওর জন্যে মা কথা শুনবেন নাকি!
ভুল তো ওর,মায়ের নয়। তুশি এইবার স্পষ্ট ভাবে বুঝল সার্থর ওকে এই গাউন দেয়ার মানে। এখন মা কথা শোনাচ্ছে,এরপর মেয়ে শোনাবে একে একে সবাই শোনাবে সেজন্যেই বুঝি ইচ্ছে করে এমন করলেন উনি? নিজে সারাদিন অপমান করে হয় না, এখন ইনিয়েবিনিয়ে লোক ভাড়া করেছে।

“ তোমার মা তুশিকে কথা শোনাচ্ছেন, যাও।”
আইরিন অবাক হয়ে বলল,
“ আমি গিয়ে কী করব?”
“ গিয়ে বলবে ,তুশিকে সাদা গাউন পরতে তুমি বলেছ।”
আইরিন আকাশ থেকে পড়ল,
“ কীহ?
আমি পারব না।”
সার্থ বলল,
“ তাহলে আমি এক্ষুনি পার্টি রেখে বেরিয়ে যাব। তখন যে বেইজ্জতিটা তোমাদের হবে,আই থিংক সেটা হজম করতে পারবে।”
“ আপনি আমাকে ব্লাকমেইল করছেন, সার্থ ভাই?”
“ করছি আইরিন। তুমি তো জেনেশুনেই ব্লাকমেইলড হচ্ছো। আমাদের মধ্যে কিন্তু কোনো লুকোচুরি নেই। যাবে কিনা,সেটা বলো!”

আইরিন উঠে দাঁড়াল,
“ যাচ্ছি।”

রেহণূমা ডাক শুনে এসে দাঁড়ালেন। কিছু বুঝতে না পেরে বললেন,
“ কী হয়েছে রোকসানা, এভাবে ডাকছো কেন?”
“ ভাবি প্লিজ,এখানে অন্তত সানা বলে ডাকো। আর তোমার মেয়ে…”
তক্ষুনি আইরিন এসে দাঁড়াল। ছটফটিয়ে বলল,
“ মাম্মাম মাম্মাম,তুশির দোষ নেই। ওকে হোয়াইট গাউন আমি দিয়েছিলাম।”
রোকসানা অবাক হয়ে বললেন,
“ কী বলছো কিউটি,তুমি! কিন্তু কেন? এটা তো তুমি তোমাদের জন্যে স্পেইশাল থিম করলে।”
তুশি তাজ্জব হলো। চোখটা ঝাপটাল দুবার। ইউশা,রেহনূমা দুজনেই ভীষণ চমকে গেলেন। আইরিন কিছু দেবে তুশিকে?
আইরিন বলল,
“ সার্থ ভাই তো হোয়াইট স্যুট পরবেন না বলেছিলেন। ভাবলাম আমি একা হোয়াইট পরে ঘুরব,তাই একটা গাউনের পিস তুশির জন্যে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কী তুশি,নিশ্চয়ই তোমার খুব পছন্দ হয়েছিল? হবেই তো,আমাদের দুজনের পছন্দই তো এক।”
শেষ লাইন চিবিয়ে চিবিয়ে বলল মেয়েটা। তুশি স্তব্ধের ন্যায় চেয়ে রইল। রোকসানা আর কথা বাড়ালেন না। কিন্তু মুখ দেখে বোঝা গেল,মেয়ের কাজে বেজায় চটেছেন তিনি।
ইউশা হাঁ করে বলল,
“ এই ড্রেস তোমাকে আইরিন আপু দিয়েছে তুশি? আমাকে বললে না কেন?”
তুশির নিজেরই সব প্যাঁচ বেঁধে গেল। ওই চিরকুটে তো সার্থর মতো করে লেখা ছিল সব। সার্থর সেই “ এ্যাই চোর” ডাক। সেজন্যেই তো এত অভিমান সত্ত্বেও আজ বেহায়া বনে গিয়েছিল মেয়েটা। ওসব তবে ওনার দেয়া ছিল না?
আইরিন কি ওনার নাম করে পাঠিয়ে মজা নিয়েছিল? কিন্তু ওর বিছানার ওপর কীভাবে রাখবে! ডাইনিটা তো বাড়িতেই ছিল না।
তুশি আর ভাবতে পারল না। মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। আজ যদি কেউ এই মূহুর্তে ওকে একটা জাদুর কাঠি দিয়ে বলতো ও কী চায়, তুশি নির্ঘাত ওর সেই আগের জীবন ফেরত চাইত। চাইত আবার সেই বস্তির চোর হয়ে থাকতে। এই অশান্তি, এই যন্ত্রণা,এই মানসিক টানাপোড়েন আর সহ্য হচ্ছে না,আর না।

জামিল পার্টিতে এসেছে মাত্র। সোজা এসে এখানেই ভিড়ল। বড়ো প্রফুল্ল স্বরে বলল,
“ হ্যাল্লো এভ্রিওয়ান,হোয়াটস আপ?”
এই ছেলেকে রোকসানার ভীষণ মনে ধরেছে। আইরিন সার্থ সার্থ না করলে কিছু একটা নিশ্চিত ভেবে ফেলতেন। খুব গদগদ হয়ে বললেন,
“ আরে জামিল,এসছো বেটা? আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম।”
জামিল দ্বিগুণ গদগদ হয়ে বলল,”
“ আওও, সো সুইট অফ ইউ আন্টি। আপনাকে তো আজ একেবারে জীবন্ত ফুল মনে হচ্ছে। এখানে এত এত বাচ্চা মেয়ে অথচ সৌন্দর্যে আপনাকে কেউ বিট করতে পারবে না। সাচ আ ন্যাচারাল বিউটি।”
সবাই মাথা নুইয়ে ঠোঁট টিপে হাসল। রোকসানা খুশিও হলেন,লজ্জাও পেলেন। বললেন,
“ যাহ, কী যে বলো না! এই এই ওয়েটার জামিলকে এখানে ড্রিংকস সার্ভ করো।”

“ না আন্টি,এক্ষুনি এসব ড্রিংক্স ফ্রিংক্স নয়। আমি আসলে সার্থকে খুঁজছি । মিস আয়োডিন হোয়ার ইজ সার্থ?”
আইরিন ফুঁসে উঠল,
“ আমার নাম আইরিন।”
“ ওপ্স সরি,সরি।”
আইরিন মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। রোকসানাও গেলেন কোথাও একটা। এতক্ষণে সুযোগ পেয়ে হুহা করে হেসে উঠল ইউশা। হাসির আওয়াজে ধ্যান ছুটল তুশির। ফিরে চেয়ে বলল,
“ কী হয়েছে?”
জামিল নিজেও হাসছিল। উত্তরে বলল,
“ মিস আয়োডিনের মেজাজটা খুব গরম বোধ হয়। অল্পের জন্যে পুড়ে যাইনি।”
“ আয়োডিন! সেটা আবার কে?”
“ আইরিন আপুর কথা বলছে।”
ফিক করে হেসে ফেলল সেও। জামিল বলল,
“ বাই দ্য ওয়ে,ইউশা ইউ আর লুকিং সো গর্জিয়াস। এতদিনে মনে হচ্ছে সেই আগের ইউশাকে দেখছি।”
“ থ্যাংকিউ,ভাইয়া।”
জামিল এক পল থেমে পকেট থেকে একটা ছোটো প্যাকেট বার করল। এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ দিস ইজ ফর ইউ।”
ইউশা একটু চমকায়। এক বার তাকায় তুশির পানে। কিছু বলার আগেই বাক্সটা হাতে ধরিয়ে দিলো জামিল। খুব তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বলল,
“ সার্থকে খুঁজে আসি। পরে কথা হবে।”
ও গেল,আর ক্রস লাইন কেটে একই পথ দিয়ে হেঁটে এলো
অয়ন। ব্যাপারটা দেখে বলল,
“ কী দিয়েছে?”
ইউশা কাঁধ উঁচাল,
“ কী জানি!”
অয়ন নিজেই প্যাকেট নিয়ে নিলো।
খুলল টেনেটুনে। ভেতরে পাথরের ব্রেসলেট দেখে বলল,
“ ব্রেসলেট, তোকে কেন দিলো?”
“ আমি কী করে বলব?”
অয়ন ভ্রু কুঁচকে একবার জামিলের যাওয়ার পথে দেখল। ইউশা বলল,
“ তোমাকে বলেছিলাম তুশির সাথে থাকতে। তুমি কেন এদিক ওদিক যাচ্ছ?”
অয়ন তুশির দিকে চেয়ে বলল,
“ আমি সাথে থাকতে চাইলেই হবে? হাত ধরলেই সে মোচড়াচ্ছে।”
“ আসলে, ও তোমাকে প্রথম থেকে এরকম নজরে দেখেনি তো তাই ওর অস্বস্তি হচ্ছে। সময় দাও ঠিক হয়ে যাবে।”

চারদিকে ছড়ানো ছিটানো লোকজনের মাঝে সার্থকে খুজে পাওয়া মুশকিল হলো বটে। সে দাঁড়িয়ে ছিল পুলের কাছে। সাউন্ডসিস্টেম এখানেই বসানো। চারপাশের নীল-সবুজ লাইটিং,আর বাতাসে ঘুরে বেড়ানো সফট মিউজিকের সাথে হঠাৎ-ই পেছন থেকে এসে পিঠে চাপড় মারল জামিল।”
“ হ্যান্ডসাম বয়,এখানে কী করছিস? ”
“ কখন এলি?”
“ মাত্র। কী খাচ্ছিস?”
“ জুস।”
“ মদ খাচ্ছিস?”
“ বললাম জুস।
“ জুসের ভেতর মদ খাচ্ছিস?”
সার্থ কটমটিয়ে তাকালে, হেসে ফেলল জামিল। পরপর কপাল কুঁচকে বলল,
“ কী রে,তুই ব্লাক সু..
সার্থ কথা টেনে নিলো,
“ ফর গড শেইক এই প্রশ্ন আর করিস না। শুনতে শুনতে কান ধরে গেছে।”
“ কান আবার কে ধরল?”
সার্থ বিরক্ত হয়,
“ জামিল!”
জামিল ফের হাসল। চাপা গলায় বলল,
“ তুশিকে দেখলাম। ঝাক্কাস লাগছে ভাই। তোর কপাল দেখে আমার হিংসে হয়। এক্স,প্রেজেন্ট সব একেকটা…
আবার ইউশা, ওতো পুরো…
মাঝপথেই সার্থ কড়া গলায় বলল,
“ ভুলেও আমার বোনের দিকে নজর দিবি না জামিল। আমি কিন্তু তোকে খুব ভালো করে চিনি।”
“ তোর বোন বোন,আর অন্যের বোন বোন নয়? তুই যে ইউশার বোনের দিকে নজর দিয়ে রেখেছিস,তার বেলা? বেচারি তুশি, নিজের স্বামীর শ্বশুর বাড়ির পার্টি দেখতে এসেছে। এই কপাল আমার শত্রুরও না হোক,তবে তোর হোক।”
সার্থ কিছু বলতে গেলেই অয়ন এসে দাঁড়াল। থেমে গেল ওরা।
“ ভাইয়া তোমাকে খুঁজছে সবাই। এখন কেক কাটা হবে।”
“ কীসের কেক?”
জামিল বলল,
“ কেক তো ডিমের হয়। কেন, তুই জানিস না?”
সার্থ রেগে তাকাল। অয়ন হাসল,বলল
“ আরে, এমনি কাটছে। চলো তো।”

একটা উঁচু চার কোণা কেক ঘিরে সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্থ আসতেই রোকসানা বললেন
“ এসো, বেটা এসো। তোমার আর আইরিনের জন্যে কেক এরেঞ্জ করেছি। সবাই মিলে আনন্দ করব,এটুকু বাদ যাবে কেন!”
সার্থর চেহারায় অঢেল বিরক্তি। যেন না পারছে কিছু বলতে,না পারছে কথা মতো চলছে। বেচারার মুখ দেখে জামিল মিটিমিটি হাসল। থুত্নী ঘষতে ঘষতে গুনগুন করল,
“ আমি ফাইসা গেছি,
আমি ফাইসা গেছি মাইনকার চিপায়।”

সার্থ চোখ রাঙাল। তারপর গিয়ে দাঁড়াল এক পাশে। ক্ষুরধার দৃষ্টি সাথে সাথে গিয়ে ঠেকল তুশির ওপর। মেয়েটা হাস্যহীন ঠিকই,তবে ভীষণ স্বাভাবিক একটা মুখ। এই যে একইসাথে সার্থ আর আইরিন কেক কাটবে,কেকের গায়ে লেখা ❝ কাপল টু বি…❞
এসব যেন খুব সাবলীল ব্যাপার-স্যাপার। বাকি প্রতিটা মানুষ যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে,সেও ঠিক একইরকম ভিড়েছে এখানে। মেয়েটার এই নিষ্পৃহতা,এই নিরুৎসাহিত হাবভাবই সার্থ নিতে পারে না। আইরিন ছুরি এগিয়ে দিলো,
“ ধরো।”
তুশির দিকে ক্ষিপ্ত চোখ রেখেই ছুরিসহ আইরিনের হাতের কব্জি ধরল সে। পোচ বসাল সেই একইরকম ওর দিকে চেয়ে৷ অথচ ঠোঁট টেনে হাসল তুশি। নির্লিপ্ত চোখে বাকিদের সাথে তাল মিলিয়ে হাত তালি দিলো। সার্থর চোখা নাক ভীষণ রাগে ফেঁপে উঠল আরো।
চেতে টেতে কী করবে বুঝল না। এক টুকরো কেক তুলেই আইরিনের মুখে ঠুসে দিলো সে। জামিল দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল দুপাশে,
“ শালা নিজের জালে নিজেই প্যাঁচাচ্ছে। এখন লেজে গোবরে হ।”
কেকের পালা মিটল। নাসীর বললেন,
“ তাহলে ভাইজান, ঘোষণাটা দিয়ে দেই?”
শওকত মাথা নাড়লেন। মেয়ে আর সার্থকে দুপাশে নিয়ে মধ্যমণি হয়ে দাঁড়ালেন নাসীর।
খুব প্রফুল্ল স্বরে ঘোষণা দিলেন,
“ সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, আপনারা হয়ত জানেন না আজ একটা বিশেষ কারণে আমি এই পার্টিটা রেখেছিলাম। আসলে,আমার একমাত্র মেয়ে আইরিনের সাথে আমার স্ত্রীর বড়ো ভাই সাবেক মেজর শওকত আলীর মেজো ছেলে সৈয়দ সার্থ আবরারের বিয়ে ঠিক হয়েছে। ও কিন্তু একজন এ এস পি। এই অল্প বয়সে দু দুবার রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অবধি পেয়েছে।”
পাশ থেকে অনেকেই বললেন,
“ হ্যাঁ ওনাকে তো রুস্তমের ছেলের কেস থেকেই চিনি।”
নাসীর গর্বের সাথে বললেন,
“ তাহলে ভাবুন, এমন একজন বীর আমি মেয়ের জামাই হিসেবে পেয়ে কতটা আনন্দিত!”
তনিমা এক পল তুশির পানে চাইলেন। তুশির মাথা নিচু। দেখে মনে হচ্ছে, সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। কিন্তু তিনি বোঝেন,ভেতর ভেতর নিশ্চয়ই কষ্ট পাচ্ছে মেয়েটা! অন্তত একটু হলেও সার্থর জন্যে মেয়েটার পাগলামি, ছোটাছুটি আর ছটফটানি তো দেখেছেন তিনি।

একই সময় সার্থও আড়চোখে তুশির পানে দেখল। ঐ মেদুর চেহারার অন্ধকার দেখে ক্রুর হাসিটা ওষ্ঠপুটে ছুটে এলো অমনি।
“ কষ্ট হচ্ছে? কষ্ট পাও তুশি,কষ্ট পাও।
তুমি কষ্ট না পেলে আমি যা চাইছি তা হবে কী করে?”
তার নজর ফিরল শওকতের আওয়াজে। হঠাৎ-ই হাত বাড়িয়ে ডাকলেন,
“ অয়ন, তুশি এসো,তোমরা দুজনও এসো।” তুরন্ত সার্থর মুখ কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেল। অয়ন- তুশি দুজনেই আস্তেধীরে গিয়ে দাঁড়াল ওনার পাশে। শওকতের বামে তুশি,ডানে অয়ন। অয়নের পাশে আইরিন,তার পাশে নাসীর,নাসীরের অন্যপাশে সার্থ ছিল।
শওকত বললেন,
“ খুশির খবর কিন্তু একটা নয়,দুটো। আসলে ঐ একইদিনেই আমার ছোটো ছেলে সৈয়দ অয়ন আবসারের সাথে আমার একমাত্র ভাই সাইফুল ইসলামের ছোটো মেয়ে মেহরিন রহমান তুশির বিয়েও ঠিক করা হয়েছে। আজ আপনাদের উপস্থিতিতেই আমরা আগামী ১৫ই ডিসেম্বর ওদের এনগেজমেন্টের ডেট ফিক্সড করছি।
বুঝতেই পারছেন,দু দুটো বিয়ে। কাজেই আনন্দও দ্বিগুণ। আপনারা কিন্তু সবাই নিমন্ত্রিত! প্লিজ আসবেন,ভালো লাগবে আমাদের।”
হাত তালি ফের আরেকবার পড়ল। প্রায় সবার মুখে রংবেরঙের হাসি। শুধু হাসল না তিনটি মানুষ। পকেটে দুই হাত ভরে আরো কঠিন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল সার্থ। যদিও সে হাসে কম, তবে এই মূহুর্তে তুশি আর ইউশার মতো দুটো উচ্ছ্বল মেয়ের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা একটা ভ্যাপসা বাতাস তার পাখায় বেঁধে উড়তে উড়তে কোথাও একটা উধাও হয়ে গেল। না চাইতেও চোখ টলমল করে উঠল ইউশার। তাকাতে তাকাতে জলের তোড়ে অয়নের স্ফূর্ত মুখ আস্তেধীরে ঝাপসা হয়ে অশ্রুটা গড়িয়ে পড়ল গালে।
নাসীর ওপাশে গিয়ে সার্থকে আইরিনের পাশে আনলেন। শওকত সরে গিয়ে তুশিকে দিলেন অয়নের পাশে।
কত জন ‘মেইড ফর ইচ আদার’ বলে বলে মুখে ফ্যানা তুলল। আইরিন পারল না আনন্দে লাফিয়ে চড়িয়ে গলে যেতে। রোকসানা মেয়েকে দেখে দেখে তৃপ্তির হাসি টানলেন ঠোঁটে। অয়ন এক ফাঁকে তুশির হাত চেপে ধরল। ফিসফিস করে বলল,
“ ফাইনালি,তুশি ফাইনালি তুমি আমার হচ্ছো।”
তুশির টু শব্দ নেই। রোবটের মতো চিবুক নামিয়ে রাখল সে।
দ্রুত শ্বাস টানতে টানতে গাউনের এক পাশ এক হাতের মুঠোয় খামচে রাখল কিছুক্ষণ। তারপর কী ভেবে মাথা তুলে এক পল পাশ ফিরে চাইল। সার্থর তীক্ষ্ণ নজর অয়নের ওই হাত থেকে উঠে এসে আস্তেধীরে এসে পড়ল তার মুখে। পাষন্ড মানুষটার ভেতর কী হচ্ছিল তুশি জানে না,তবে ওর হৃদয় গুমড়ে উঠল বিবশ কোনো ব্যথায়। বুক তোলপাড় করা কান্নাটা গলায় এসে দাঁড়াল। জমতে জমতে ওরা
স্রোতের প্রতিকূলে ভাসতে ভাসতে বলল,

“ আমার দরজায় খিল দিয়েছি,
আমার দারুণ জ্বর!
তুমি অন্য কারোর সঙ্গে বেঁধো ঘর।”

চলবে…

(এই গল্পের যে পাট টা পাবেন না সে ইনবক্সে নক দিবেন। যদি না পড়ে থাকেন।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply