Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫১


কাছেআসারমৌসুম!

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

(৫১)

সবাই আস্তেধীরে লনের পথ ধরল। ড্রাইভার চাবিটা এসে অয়নকে দিয়ে গেলেন। সেই চালাবে আজ। জামিল অয়নের পাশাপাশি হাঁটছিল, হঠাৎ ফোন বাজল ওর। নানু ফোন করেছেন। ডাকছেন দ্রুত। জামিল ফোনের লাইন কেটে বলল,
“ আমার যাওয়া হচ্ছে না অয়ন,তোমরা চলে যাও।”
ইউশা ছিল পেছনে। অমনি বলল,
“ এমা কেন? হঠাৎ কী হলো ভাইয়া?”
“ নানু ফোন করেছেন,মামা এসছেন দেখা করতে। অলমোস্ট চার বছর পর দেখা হবে। গুরুজন বসিয়ে রাখব? তোমাদের সাথে পরে কোলাব করব নাহয়!”

“ ইস,ভাবলাম সবাই যাব।”
জামিল ভ্রু উঁচিয়ে হাসল, বলল,
“ আমি না গেলে তোমার খারাপ লাগবে ইউশা?”
ইউশার সরল স্বীকারোক্তি,
“ হ্যাঁ, কেন লাগবে না? সবাই একসাথে হওয়ার আনন্দই তো আলাদা।”
জামিল বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। চোখেমুখে এক অন্যরকম আলো বসল সহসা। ঠোঁট ছড়িয়ে বলল,
“ বিয়ের আয়োজন তো মাত্র শুরু হলো। শপিং-টপিং আরো বাকি না? প্রতিদিন যাব, ইনশাআল্লাহ।”
“ ইনশাআল্লাহ।”
জামিল ঘাড় নাড়ে, অয়নের সাথে কোলাকুলি সেরে উঠে যায় স্বীয় গাড়িতে। ইউশা এমনিই চেয়েছিল সেপথে,
অয়ন ডাকল তখনই,
“ ইউশা…..”
ইউশার চোখজোড়া চমকে উঠল একটু। বুকটা কাঁপল সজোরে। কিন্তু তাকাল না,চুপটি করে গলার খাঁজে চিবুক নামিয়ে রাখল।
অয়ন মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“ ইউশা, তুই কি এখনো রেগে আছিস?”
বলতে বলতে হাতটা ধরতে গেলেই,তুরন্ত সরিয়ে নিলো মেয়েটা। কিছুটা ছটফট করে বলে,
“ এমনি কথা বলো অয়ন ভাই। হাত ধরছো কেন?”
অয়ন তাজ্জব হয়ে বলল,
“ ধরলে কী হবে?”
“ কদিন পর তোমার বিয়ে হতে যাচ্ছে। মানুষ খারাপ ভাববে।”
অয়নের কণ্ঠে উদ্বেগ,
“ ইউশা তুই আমার বোনের মতো। তোকে আমি জন্মাতে দেখেছি। মানুষ কী ভাববে আশ্চর্য!”
ইউশার বুকের ঘায়ে এ এক নিদারুণ খোচা। ধারে চকচক করা ছুরি দিয়ে হৃদয়টা খণ্ড হওয়ার অনুভূতি নিয়ে ঠোঁটের পিঠে ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখল সে। যে মেয়েটা বুঝ হবার পর থেকেই অয়নের বউ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বড়ো হয়েছে,ভালোবেসেছে। রাতের পর রাত সয়নে-শপনে ঘর বেঁধেছে মানুষটার সাথে। তার মুখে কি এসব শোনা যায়?

তুশির জুতো পরতে সময় লেগেছে।
এখন টুকটাক হিল পরে ও। তাও আবার একদম নিচু হিল। মা-ই জবরদস্তি পরান। তাহলে নাকি দেখতে একটু লম্বা লম্বা লাগে।
তুশি খুব তাড়াহুড়ো করে হাঁটছিল। অয়ন যাবার বেলায় ওর কানে কানে বলে গেছে,
“ সামনে বোসো,আমার পাশে।”
আর এটাই সে চাইছে না। অয়নের পাশে তো দূর,ওর থেকে এই জন্মে যত হাত দূরে থাকা যায় তত ভালো। কিন্তু এর জন্যে কিছু তো ভাবতে হবে!
ইস,ওরা বোধ হয় আগে আগে গিয়ে উঠেও পড়ল। এখন না আবার সত্যিই সামনে বস্তে হয়। তুশির পায়ের কদমে রাশ নেই। বাতাসের মতো চলছিল। হঠাৎ বাইকের হর্ন এলো কানে। ফিরে চাইতেও পারল না, সার্থ বাইক নিয়ে হুস করে সামনে থেকে ছুটে গেল সহসা। এত জোরে,যেন আরেকটু হলেই গায়ে তুলে দেয়। ছিটকে তুশি দূরে সরে গেল।
আর গিয়েই বাড়ি খেল লনে রাখা আরেকটা গাড়ির সাথে। কপালে ঠোকা লেগে, প্রচণ্ড ব্যথা পেলো তুশি। হাত দিয়ে ডলতে ডলতে মেজাজ খারাপ করে চাইল সার্থর পানে। মানুষটার এসবে যেন কিচ্ছু যায় এলো না। একদম গিয়ে আইরিনের সামনে থামল সে। সাথে সাথে আইরিন বাইকে উঠে বসল।
একবার ক্রুর হাসি নিয়ে পিছু ফিরে দেখল তুশির মুখটা। খুব আহ্লাদ নিয়ে বলল,
“ আস্তে চালাবে কিন্তু। আমার ভয় লাগে।”
সার্থ গুরুগম্ভীর মানুষ। উত্তরে বলল কেবল,
“ ধরে বোসো।”
সাথে সাথে তুশি চোখ সরিয়ে ফেলল। বুকের ভেতর গোল হয়ে ঘুরতে থাকা উত্তাপ,আর চোখে তেড়ে আসতে চাওয়া জলটা চেপে আগের মতো জোরে জোরে চলে গেল সামনে।
সার্থ ধরে বসতে বলায় যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলো আইরিন। দুহাত ছড়িয়ে সার্থর পেটানো শরীরটা জড়িয়ে ধরল সে। তুরন্ত জ্বলন্ত চোখে চাইল সার্থ।
আইরিন ঘাবড়ে যায়,হাত সরিয়ে নেয় ধড়ফড়িয়ে। সার্থ চিড়বিড় করে বলল,
“ ডোন্ট ক্রস ইয়র লিমিট। পেছনের স্ট্যান্ড ধরে বোসো। আমার গায়ে যেন টাচ না লাগে।”
বাধ্যের ন্যায় আইরিন ঘাড় কাত করল।
সার্থ বাইক ছোটাতেই পেছনের স্ট্যান্ড ধরল তাড়াতাড়ি। পরপরই শক্ত চিবুকে ভাবল,
“ খুব এ্যাটিটিউড দেখাচ্ছ সার্থ, দেখাও। আর তো কটা দিন। তারপর এমন ছাই দিয়ে ধরব, মরে গেলেও ছাড়া পাবে না।”


তুশি গাড়ির কাছাকাছি এসে একটু থমকাল। অয়ন-ইউশা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে । অয়ন খুব উত্তেজিত হয়ে কিছু বলছিল,অথচ মূর্তির মতো মাথা নুইয়ে শুনছে ইউশা।
তুশির শুকনো ঠোঁটে হাসি ফুটল অমনি। পেছনে ফেলে আসা বিদীর্ণ শোকের ঝুলি সরিয়ে শ্বাস নিলো বুক ভরে। তারপর হুড়মুড় করে এসেই গাড়ির পেছন সীটে উঠে বসল সে। শব্দ পেয়ে অয়ন- ইউশা নড়ে ওঠে, দুজনেই ফিরে চায় সেদিকে।
অয়ন সাথে সাথে গাড়ির কাছে এলো। জানলার ফাঁকে মাথা নামিয়ে দেখল,তুশি পেছনের সীটে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে। ও অবাক হয়ে বলল,
“ তুশি,তোমাকে তো আমি সামনে বসতে বলেছিলাম।”
তুশি চোখেমুখের এমন ভান করল, যেন খুব অসুস্থ!
“ আসলে আমার গাড়িতে উঠলে খুব মাথা ঘোরে, বমি পায়। তাই এখানে বসলাম। আমি এভাবেই পা ছড়িয়ে যাব।”
অয়ন আর কিছু বলল না। হয়ত একটু মন খারাপ হলো,তবে চুপচাপ গিয়ে বসল ড্রাইভ কর‍তে।
ইউশা এসে তুশিকে ভালো করে দেখল। সিটের আগাগোড়া পা মেলে বসে আছে। জিজ্ঞেস করল,
“ তুশি,তুমি কি এভাবেই বসবে?”
তুশির চোখ বন্ধ।
জানাল,
“ হ্যাঁ।”
“ তাহলে আমি কোথায় বসব তুশি? তুমি নাহয় আমি বসলে আমার কোলে পা রেখ।”
তুশি ফুঁসে উঠল অমনি,
“ কেন? গাড়িতে কি আর জায়গা নেই? যাও সামনে গিয়ে বসো।”
ইউশা ঠোঁট উলটে চেয়ে রইল। তুশি কি ইচ্ছে করে এরকম করছে? ওকে অয়ন ভাইয়ের পাশে বসানোর কোনো ফন্দি নয়তো?
তক্ষুনি তুশি খ্যাক করে বলল,
“ কী হলো, দাঁড়িয়ে আছো কেন? যাও। তুমি গিয়ে না বসলে আমরা যাব কীভাবে? আশ্চর্য, তাড়াতাড়ি…”
অয়ন এক কাঠি ওপরে গিয়ে দরজা ঠেলে দিলো। ইউশার সামনেই হাঁ করে খুলল সেটা। তারপর নরম স্বরে বলল,
“ ওঠ।”
ইউশা হাতের আঙুল কচলাল কিছুক্ষণ। অনীচ্ছা সত্ত্বেও নিরুপায় হয়ে গিয়ে উঠল গাড়িতে। তুশি বিজয়ী হাসে।
চোখ নাঁচিয়ে নাঁচিয়ে ভাবে
“ এই যেভাবে তোমাকে তোমার অয়ন ভাইয়ের পাশে বসালাম ইউশা,এভাবেই তোমাদের সারাজীবন আমি পাশাপাশি রেখে দেবো। দেখো,ঠিক পারব আমি।”


গাড়ি হাইওয়েতে উঠেছে অনেকটা সময়। এটা পার হলেই যমুনার বিশাল চত্বর পড়বে। তুশি পেছনে বসে শুধু ইউশাকে দেখছিল।
মেয়েটা কেমন জড়বস্তুর মতো এক ভাবে বসে আছে। শোকাহত মুখখানা কী বিমর্ষ ওর। তুশির তাতে মন খারাপ হয়,কষ্ট লাগে। কিন্তু এক্ষুনি ইউশাকে ও কোনো শোক থেকে পরিত্রাণ দিতে পারবে না। বরং ওর সামনে না চাইতেও তুশিকে অয়নের সাথে বিয়ের বন্দোবস্ত করতে হবে।
তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলার মাঝেই হঠাৎ চোখ পড়ল গাড়ির ভিউ মিররে। ঠিক অয়নের মনোযোগী চোখজোড়া ভেসে আছে তাতে। ড্রাইভিং এর ফাঁকে বারবার এদিকেই দেখছিল বোধ হয় । তুশি অস্বস্তিতে ডুবে গেল, বসল নড়েচড়ে। অনীহ চিত্তে মুখ ঘুরিয়ে নিলো জানলায়।
ঠিক তার দু সেকেন্ড পরই একটা তীক্ষ্ণ হর্ণের শব্দ শোনা গেল। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে চাইল তুশি। সার্থর বাইক আসছে। আইরিন পেছনে বসা। ওর চোখের সামনেই বাইকটা গাড়ির ছুঁইছুঁই হয়ে একটু সামনে চলে গেল। মেয়েটার বুক মুচড়ে উঠল দুজনকে ফের একসাথে দেখে। এই মূহুর্তে আইরিনকে পৃথিবীর সবথেকে ভাগ্যবতী মনে হলো তুশির। সার্থর বাইকে তো ও আজ অবধি ওঠেনি। কখনো ছুঁয়েও দেখেনি সেটা। অথচ দিব্যি আইরিন বসে গেল। তাও ওনার অত কাছে! অতটা! আচ্ছা যতবার গাড়িতে ব্রেক কষা হবে,মেয়েটা কি ওনার গায়ের ওপর পড়বে না? মিশবে না ওদের শরীর?
তুশির চোখ টলমল করে ওঠে। বুকের পাঁজর ছিঁড়ে যায়। প্রিয় মানুষের সাথে দ্বিতীয় নারী দেখা যায় কখনো?
তাহলে ও কীভাবে দেখবে? ও যে ভালোবাসে, খুব ভালোবাসে সার্থকে। ভেজা ছলছলে নয়ন মেলে সার্থর ছুটে যাওয়া বাইকের দিকে একভাবে চেয়ে রইল তুশি।
সার্থর চোখে সানগ্লাস। পরনে গাঢ় চেক শার্ট। তার মনোযোগ কি তখন ব্যস্ত রাস্তায় ছিল? উহু! রোদ চশমার পুরু কাচ ভেদ করে তীক্ষ্ণ নজর বারবার বাইকের লুকিং গ্লাসে ফেলছিল সে। যেখানে স্পষ্ট তুশির বিমর্ষ মেদুর চেহারা ভেসে আছে। খোলা জানলায় মাথাটা একটু ঠেসে রেখেছে মেয়েটা। কাঁধের দুপাশ থেকে চুলগুলো উড়ছিল হাওয়ায়। চেয়ে থেকে থেকে
সার্থর গোছানো কপাল টানটান হয় অচিরে । পালটে যায় চাউনি। চিবুকের শক্তপোক্ত গড়নে আহামরি বদল আসে।
তুশির চোখ সার্থর চওড়া পিঠে,আর সে পুরুষের নজর বাইকের মিররের ওপর। ঠিক এই অদ্ভুত এক চোখাচোখিতেই যেন বহু বছর কাটল। গুমড়ে গুমড়ে ওঠা কিছু বেদনারা গাইল,
“ কী যে বলব আর, এ দূরত্ব টার,
দেখিনি রে কোনো শেষ!
তবু দেখ না তুই, বসে পাশ-টাতেই
গেলি আলোকবর্ষ দেশ।
হারিয়ে গেলাম, ফুরিয়ে এলাম,
চোখে শুকিয়ে গেল জল।
বেঁচে থেকে লাভ কী বল,
তোকে ছাড়া আর….
খুঁজেছে জবাব অঁচল,
মন কোথাকার….
যা চলে তুই,ওহোওওও সব ভুলে তুই।”


গাড়ি একটা বিশালাকার মলের সামনে ভিড়ল। সব দিকে গিজগিজ করছে মানুষ। ব্যস্ত শহরের ততোধিক ব্যস্ত চারিপাশ। অয়ন আগে নামল,এরপর ইউশা। তুশি যখনই নামতে যাবে, কিছুতে বেঁধে জুতোটা উলটে গেল হঠাৎ।
অমনি থুবড়ে পড়তে নিলো মাটিতে। ইউশা দুহাত মেলে ধড়ফড়িয়ে ধরল। উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ তুশি,তুমি ঠিক আছ?”
মেয়েটা ব্যথায় ককাচ্ছে। পায়ের দুটো আঙুল উলটে মচকে গিয়েছে হয়ত। ও মৃদূ আর্তনাদ করে বলল,
“ উফ, পায়ে কী জোরে লাগল বাবারে?” অয়ন গাড়ি পার্ক করছিল। চোখেমুখে চিন্তা নিয়ে ছুটে এলো অমনি। একেবারে নিঃসংকোচে এক হাঁটুমুড়ে বসল ওর পায়ের কাছে। আঙুলে হাত পড়তেই তুশি থমকে চেয়ে রইল। অয়ন আঙুলে হাত বোলাচ্ছে। মালিশ করছে টেনে টেনে। মাঝে মুখ তুলে শুধাল,
“ একটু কমেছে,তুশি?”
মেয়েটা নড়ে উঠল। বিব্রতকর দৃষ্টি ঘুরিয়ে চাইল ইউশার পানে। ইউশার এলোমেলো চাউনি মাটিতে। তুশি মৃদূ কণ্ঠে বলল,
“ আমি,আমি ঠিক আছি। আপনি উঠুন।”
অয়ন খেয়াল করল তুশির এক পায়ে জুতো নেই। সাথে সাথে আশেপাশে চেয়ে খুঁজল সেটা। জুতো এক হাত দূরে পড়েছিল৷ অয়ন গিয়েই হাতে তুলে এনে রাখল ওর সামনে। তারপর নিজে পা ছুঁয়ে পরাতে চাইলে তুশি ছিটকে সরে যায়। বিরোধাভাস করে উঁচু স্বরে,
“ না না আমি পারব। আপনি রাখুন।”
“ রিল্যাক্স তুশি,এত অকোয়ার্ড ফিল করার কিছু নেই।”
তুশির কণ্ঠে অটল জেদ,
“ আপনি রেখে দিন প্লিজ!”
অয়ন হার মানল। জুতো রেখে উঠে দাঁড়াল ফের। শ্বাস ফেলে বলল,
“ আমি ভেতরে যাই,তোমরা এসো।”
ও চলে যায়। তুশি অসহায় চোখে তাকায় ইউশার পানে। নিশ্চয়ই যন্ত্রণায় মেয়েটার বুকের হাড় টনটন করছে এখন? অথচ মেয়েটা গাল ভরে হাসল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“ দেখেছ,অয়ন ভাই এখনই তোমাকে কেমন কুইন ট্রীট দিচ্ছে! জুতোও পরাতে চাইল। আর কী চাই বলো তো!”
তুশি জবাব দেয়ার আগেই চোখ পড়ল মলের গেইটে। টানটান শরীরটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সার্থ। মলের কাচের দোরের হাতলটা শক্ত করে চেপে রাখা মুঠোয়। চোখাচোখি হতেই মুখ ঘুরিয়ে সহসা ভেতরে ঢুকল সে। পেছন পেছন হাঁটল আইরিন। চেহারায় বড্ড বিরক্তি তার। দুজনের ওই প্রস্থান দেখে মলিন চোখে হাসল তুশি। ইউশার দিকে চেয়ে বলল,
“ আমি যা চাই,তা আমি কোনোদিন পাব না। আর তুমি যা চাও,তা আমি কোনোদিন নেবো না।”
শেষ লাইন তুশি মনে মনে বলল,ইউশার কান অবধি গেল না। তবে এক অন্যরকম পুরোনো ব্যথায় বিবশ চিত্তে আকাশের পানে চেয়ে রইল মেয়েটা।
আজ ওরা পার্টির জন্যে শপিং-এ এসেছে। কাল হয়ত বিয়ের জন্যেও আসবে। অয়ন ভাইয়ের বিয়ে,ওর অয়ন ভাই। তার বিয়ের শেরওয়ানিটা কি হাতে ধরে কিনতে হবে ইউশার? আহা,এমন বিষাক্ত মুহূর্ত ও সইতে পারবে পৃথিবী?


যেহেতু একই মল,তাই আলাদা এলেও পাঁচজন ঘুরেফিরে সেই একই জায়গায় এলো। এ দোকান ও দোকান ঘুরে জামাকাপড় দেখছিল আইরিন। তার উচ্ছ্বাস সবচেয়ে বেশি। পার্টির জন্যে মাম্মাম আলাদা করে গাউন মেক করে দেবে বললেও,আজ ও এখান থেকেও একটা নেবে। আর তা যদি সার্থ পছন্দ করে দেয়,তাও আবার তুশির সামনে তাহলে যে সোনায় সোহাগা।
অয়ন, তুশি, ইউশা একটা গাউনের শো রুমে ঢুকেছে। চারদিকে সব ডিজাইনার, ফ্লাফি গাউন একেক রকম ম্যানিকুইনের গায়ে পরানো। তুশি এত চকমকে বড়ো মল কোনোদিন দেখেনি। বাইরে থেকে বহুবার গেলেও একদম ভেতরে আসার কপাল হয়নি কখনো।
চোখ বড়ো করে, মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অবাক হয়ে সব দেখছিল তাই। একটা ম্যানিকুইন হাতাকাটা সাদা গাউন পরে দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল কোণে। দেখতে যেন জীবন্ত মানুষ! দুহাত কোমরে ভাঁজ করে রাখা,চুলে বেনুনি। তুশি এদিক-ওদিক দেখতে গিয়ে ধাক্কা লাগল ওটায়। সহসা জিভ কেটে বলল,
“ সরি সরি আপু, দেখিনি আমি।”
পরপর অবাক চোখে ম্যানিকুইনের পা থেকে মাথা অবধি দেখল সে। মুখে হাত দিয়ে বলল,
“ হায়হায়,তোমার তো ইয়ে দেখা যাচ্ছে আপু। হাতাটা আরেকটু বড়ো পরতে পারলে না? ছি ছি! ”
তুশি বিব্রত চোখে এদিক ওদিক তাকায়। যেন ভারি লজ্জা পেয়েছে। পরপর নিজের ওরনা নিয়ে মূর্তির উন্মুখ বাহুর নিচে ঢাকার চেষ্টা করতেই নড়েচড়ে পড়তে নিলো সেটা। অয়ন উল্টোপাশেই ছিল। তড়িঘড়ি করে চেপে ধরল অমনি।
হকচকিয়ে বলল,
“ তুমি ফেলছিলে?”
তুশির ঠোঁট ফাঁকা হয়ে গেল। ভ্রু কপালে তুলে বলল
“ এ এটা মূর্তি? আমি তো মানুষ ভেবেছিলাম।”
অয়ন ম্যানিকুইন সোজা করে রাখল। দু পাশে মাথা নেড়ে হেসে ফেলল সাথে। নিজের বোকামিতে তুশি ভারি লজ্জা পেলো। মাথা চুলকে হাসল সেও। অথচ দুজনের এই হাসাহাসি দেখে কোথাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পুড়ে ছাই হলো কেউ একজন।

ইউশা সারা মার্কেট চক্কর কেটেও কিছু পছন্দ করতে পারল না। ওর তো সেই ইচ্ছেই নেই। শপিং করতে অন্তত মন থাকা চাই,তাও আছে কি? ইউশা উদাস চোখে একটা টেডিবিয়ারের পানে চেয়ে রইল। এক পাশে ঠেসে রাখা পুতুলের ভিড় ছেড়ে,ওকে একদম আরেকপাশে রাখা হয়েছে। ইউশা গিয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল,
“ হ্যালো টেডি। আমি ইউশা! তুমি বুঝি একা? জানো,তোমার মতো আমিও অনেক একা। আশেপাশে সবাই আছে,কিন্তু তাও….”
সাথে সাথে কথা কেড়ে নিলো কেউ একজন,
“ কিন্তু তাও আমার একা লাগছে। কারণ আমি তো অনেক দরদী। নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে অন্য মেয়ের ধরেবেঁধে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি দেখলে? এই টেডি তুমি কিন্তু একদম আমার মতো হয়ো না। কারণ গাধা কখনো মানুষ হলেও, ইউশারা কিন্তু কখনো মানুষ হয় না।”
ইউশা ঠোঁট ফুলিয়ে চাইল।
“ তুমি আমার সাথে এমন করছো কেন তুশি?”
তুশি উত্তর দেয় না। ভেংচি কেটে চলে যায়। গিয়ে একদম একটা ফুড কোর্টের সামনের চেয়ার টেনে বসে। একটু পর অয়ন এলো সেথায়। পাশের চেয়ারে টান বসিয়ে বলল,
“ তুমি এখানে,আমি কখন থেকে খুঁজছি।”
“ কেন?”
“ ওদিকের ড্রেসগুলো সুন্দর। নতুন লঞ্জ হয়েছে। আই থিংক তোমার পছন্দ হবে।”
তুশি চুপ। মুখটা গোজ হয়ে আছে। টেবিলে রাখা তার হাতের ওপর হঠাৎ হাত রাখল অয়ন।
তুশি সাথে সাথে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। গলা তুলে ডাকল,
“ ইউশা, এদিকে এসো।”
মেয়েটা এতক্ষণ ওই একই জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়েছিল। অয়নকে দেখেই এগোয়নি। ডাক শুনে বাধ্য হয়ে এলো এবার। তুশি অয়নের পাশের চেয়ারটা আগেভাগে টেনে দিয়ে বলল,
“ বোসো বোসো।”
ইউশা তুশির পাশেরটায় বসতে গেলেই,দুম করে সেখানে কাঁধের ব্যাগ রাখল ও। রুক্ষ স্বরে বলল,
“ ওখানে বসতে বললাম না? যাও।”
ইউশা ক্লান্ত শ্বাস ফেলল। গিয়ে বসল কোনোরকম। অয়ন মেন্যু কার্ড ঠেলে দিয়ে বলে,
“ কী খাবি?”
ইউশা বলল “ কিছু না।”
অয়ন তাও শুধায়,
“ চকলেট স্মুদি?”
“ না।”
“ সফট ড্রিংক’’স?”

তুশি মুগ্ধ চোখে গালে হাত দিয়ে চেয়ে রইল। মনে হলো পৃথিবীর সেরা দম্পতি দেখছে ও। আহা কী সুন্দর লাগছে পাশাপাশি! এই কথাবার্তার সময় আরেকটু দীর্ঘ হওয়া উচিত না? ও চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ আমি একটু ওয়াশরুমে যাই।”
ইউশা উঠতে নেয়,
“ আমিও আসছি…”
“ না না, তোমরা কথা বলো।”
তুশি তড়িৎ হাঁটা ধরল।
সেই গতি থামল ঠিক ফুডকোর্টের বাইরে এসে। দুপাশে শো রুম,মাঝে খালি জায়গা। বাইরে তখন খুব বাতাস। চলাফেরায় হুহু শব্দ হচ্ছে। তুশি আড়ালে এসে দাঁড়াল। থাই গ্লাসের ফাঁকা দিয়ে হাসিমুখে চেয়ে রইল ওদের দিকে। অয়ন, ইউশার সাথে কিছু বলছে। সেই লনের মতোই উদ্বেগ চেহারায়। আর ইউশা এবারেও সেই একইরকম নিশ্চুপ বসে। তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মুখের সামনে এসে উড়ে পড়া চুল,পেছনে উড়ে যাওয়া ওরনার প্রান্ত ঠিকঠাক করতে থাকে। সার্থ ঠিক তক্ষুনি ওর পেছনে এসে দাঁড়াল । অমনি বাতাসে তুশির উড়ুউড়ু ওরনা গিয়ে বসে গেল মুখটায়। মূহুর্তে ওইটুকু কাপড়ে সার্থর চেহারা ঢেকে গেল। একটু থমকাল ছেলেটা। অথচ ওরনা সরাল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল অমন। আচমকা তুশির নজর পড়ল টেনে রাখা কাচে। ওরনায় মুখ ঢেকে থাকা একটা মানুষ দেখেই চকিতে ফিরে চাইল সে। পিলে সুদ্ধ চমকে গেল পরপর। তড়িঘড়ি করে ওরনা টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো সে।
সার্থ চোখ বুজেছিল। খুব আস্তেধীরে খুলে তাকাল এইবার। কপালে দুটো ভাঁজ তার সব সময় থাকে। তুশি ঢোক গেলে,এদিক ওদিক তাকায়। সার্থ যখনই বলতে নেয়,
“ লিসেন…”
পুরোটা না শুনেই তাড়াহুড়ো পায়ে হাঁটা ধরে তুশি। অমনি সার্থর মসৃণ চাউনি ভীষণ রাগে দপ করে উঠল।
দাঁত পিষে আওড়াল,
“ বেয়াদব!”
তুশি জোরে জোরে হেঁটে ওয়াশরুমে ঢুকল। ঝা চকচকে বিশাল ওয়াশরুম এটা। একপাশের মার্কেটের জন্যে বরাদ্দ। প্রথম অংশে চারটে বেসিন পাতানো!
পেছনে সাড়ি সাড়ি করে তিনটে টয়লেট রুম। ভেতরে একটা মেয়ে ছিল শুধু। বেসিনের আয়না দেখে ঠোঁটে লিপস্টিক পরছিল। তুশি আরেকটা বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে মুখে পানি দেয়। নীরস চোখ তুলে আয়নায় রাখে। মানস্পটে ভেসে ওঠে একটু আগের দৃশ্য। ওরনা সরানোর পর সার্থর সেই ধারালো চিবুক,সেই তীক্ষ্ণ চোখ মেলে তাকানো। তুশি ক্লান্ত চিত্তে মাথা নুইয়ে নিলো। এখনো বুক ধড়ফড় করছে। উফ,এই এক জ্বালা। ওনাকে দেখলেই অবুঝ হৃদয় নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আজও সে ভীষণরকম নার্ভাস হয়ে যায়। এখনো ইচ্ছে করে ওনাকে দুচোখ ভরে দেখতে। কিন্তু এসবে আর কী লাভ? উনি তো এখন অন্যের। সারাজীবনের জন্যে তুশির থেকে আলাদা হওয়ার জন্যে আইরিনকে বেছে নিয়েছেন। আবার ওকে দেখাতে হবু বউ নিয়ে শপিং করতে এসেছেন,নিজে কিনে কেটে দিচ্ছেন সব কিছু। তুশি কাষ্ঠ হেসে ওরনা তুলে মুখের পানি মুছল। আচমকা তেড়ে আসা ঝড়ের মতো দরজা দিয়ে ঢুকল সার্থ। তার ওই ভূতের মতো আগমনে এপাশের মেয়েটাও চমকে গেল খুব। আঁতকে বলল,
“ এ কী,এটা লেডিস ওয়াশরুম। আপনি কেন ঢুকেছেন?”
কথা শুনে ফিরল তুশি। হতবুদ্ধি হয়ে গেল সাথে।
সার্থ জবাব দিলো না। জ্বলন্ত চোখে চাইল তুশির পানে। মেয়েটা যখন প্রকট চোখে চেয়ে, অমনি ওর হাতটা টেনেই বেসিনের দেওয়ালে চেপে ধরল সার্থ। তুশির কোমর থেকে পিঠটাও ধরাম করে লাগল গিয়ে সেথায়। ফের এক চোট ব্যথায় চোখ বুজে ফেলল সে। দেওয়ালে ঠেসে ধরা মেদুর আননের সামনে একটু ঝুঁকে এলো সার্থ। তপ্ত শ্বাসের স্পর্শে অমনি তুশি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। সার্থ এতে আরো চটে যায়। নিমিষে হিঁসহিঁস করে বলে,
“ সাহসটা হঠাৎ এত বাড়ল কেন তুশি? কাকে দেখাচ্ছ এত তেজ?”

চলবে…
পেজের রিচ ডাউন। আপনারা সাড়া না দিলে হবে?

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply