Golpo romantic golpo তোমার সঙ্গে এক জনম

তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৪


তোমার সঙ্গে এক জনম (১৪)

সানা_শেখ

লামহা মলিন মুখে বিছানায় বসে আছে। ওর এখন গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। বাবার বাড়ি থেকে আসার পর শ্বশুরবাড়িতে তো তাও অনেক মানুষ ছিল, অতটাও একা একা লাগেনি, কিন্তু এখানে তো হিমেল ছাড়া কেউ নেই। এই অসভ্য ছেলের সঙ্গে একা একা থাকতে হবে ভেবেই আরো কান্না পাচ্ছে।

হিমেল ড্রয়িং রুম থেকে বেডরুমে এসে দেখে লামহা চোখ মুছছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেই লামহার দিকে তাকিয়ে রইল। স্মরণ হয় বিয়ের দিনের সব ঘটনা। কি কি বলেছিল, কেমন আচরণ করেছিল সেসব মনে হতেই নিজের কাছে নিজেকেই ছোটো মনে হয়।
ধীর পায়ে এগিয়ে এসে লামহার পাশে বসে। লামহা ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে সরে যেতে নেয়, হিমেল লামহার হাত মুঠো করে ধরে লামহার গা ঘেঁষে বসে। লামহার সরে যাওয়ার আর জায়গা নেই, একপাশে খাটের হেডবোর্ড, অন্যপাশে হিমেল। উঠে যেতে নিলে হিমেল আটকে দেয় ওকে। জোর করে নিজের পাশে বসিয়ে রাখে। বাম হাতে লামহার এক হাত মুঠো করে ধরে রাখা, অন্য হাত লামহার গালে রেখে লামহার মুখ নিজের দিকে ফেরায়।
লামহার চোখজোড়া হতে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে কান্না জড়ানো গলায় বলে,

“ঘৃণা লাগছে না আমাকে ছুঁতে?”

লামহার কথা শুনে শকড হিমেল। ওর চেহারার রঙ পাল্টে গেছে। লামহা কাঁদতে কাঁদতে আবার বলে,

“এই কথা শুনে এত অবাক হওয়ার তো কিছু হয়নি। আমি ছোটো মানুষ বলে যে কিছুই বুঝতে পারি না এমন নয়। বিয়ের দিন আপনার অমন আচরণ আর কথার কারণ আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলাম। আর আপনার বর্তমান আচরণের কারণও বুঝতে পারছি।”

“সরি। ওই দিন মাথা ঠিক ছিল না, কি করেছি, বলেছি সত্যিই বুঝতে পারিনি তখন।”

“আপনার মাথা ঠিকই ছিল, কি বলেছেন আর করেছেন সেসবও বুঝতে পেরেছেন শুধু মানতে পারেননি আমাকে। একজন ধ/র্ষি/তা আপনার বউ হয়েছে এটা মেনে নিতে পারেননি।”

“প্লীজ লামহা, এই কথাগুলো উচ্চারণ কোরো না।”

“কেন? শুনতে খারাপ লাগে? আমারো অনেক খারাপ লেগেছে, কষ্ট হয়েছে যখন মানুষজন আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে, ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়েছে, বারবার বলেছে এই মেয়ে ধ/র্ষি/তা।”

হিলেম লামহার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। লামহা নিজের গাল থেকে হিমেলের হাত সরিয়ে দেয়। হিমেলের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয় নিজের হাত। পুনরায় চোখ মুছে বলে,

“দোষ ধ/র্ষি/তার নাকি ধ/র্ষ/কের? কোনো মেয়ে কী ইচ্ছে করে ধ/র্ষি/ত হয়? দেখেছেন কোথাও? তাহলে এই সমাজ কেন ধ/র্ষি/তার দিকে আঙুল তোলে? কেন তাকে দোষী সাব্যস্ত করে? কেন তাকে পস্তাতে হয়? আমি ধ/র্ষি/তা না হয়েও আজ সমাজের চোখে
ধ/র্ষি/তা। মানুষজন বাকা চোখে তাকায় আমার দিকে।”

বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে ওঠে। হিমেল বলতে পারছে না কিছু, মাথা নিচু করে বসে আছে।
লামহা কাঁদতে কাঁদতে উঠে যায় হিমেলের পাশ থেকে।

বেশ কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে লামহা। হিমেল এখনো আগের মতো বসে আছে মাথা নিচু করে। লামহা হাতমুখ মুছে বিছানায় উঠে চুপচাপ শুয়ে পড়ে একপাশে।

“না খেয়ে শুয়ে পড়লে কেন?”

লামহা চুপ করে থাকে। হিমেল লামহার দিকে ঘুরে বসে বলে,

“লামহা, খেয়ে ঘুমাও।”

“খাব না, আপনি খান।”

হিমেল আর কিছু না বলে বসা থেকে উঠে ব্যাগ থেকে ট্রাউজার টিশার্ট বের করে নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। ফ্রেশ হয়ে এসে চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
লামহা শুয়ে থেকেই দরজার দিকে তাকায় একবার।
বাবা-মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। ইচ্ছে করছে ছুটে বাড়িতে চলে যেতে।

প্লেটে বিরিয়ানি আর এক গ্লাস পানি নিয়ে রুমে ফিরে আসে হিমেল। প্লেট আর গ্লাসটা সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে বিছানায় উঠে লামহাকে ডেকে বলে,

“লামহা, উঠে খেয়ে ঘুমাও।”

“খাব না।”

“জেদ করবে না, ওঠো।”

“বলছি তো খাব না।”

“রাগীও না আমায়, ওঠো।”

“আমি না খেলে আপনার কী?”

“তুমি আমার ওয়াইফ, তুমি না খেয়ে থাকলে অবশ্যই আমার অনেক কিছু।”

“ওয়াইফ বলে মানেন আমাকে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে প্রথম দিনই মানেননি কেন? কেন আমার কাছ থেকে সব অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন?”

“লামহা, পুরোনো কথা বাদ দাও।”

“বেশি দিন তো হয়নি, আমি ভুলতে পারছি না সেই কথাগুলো, আচরণ আর ঘটনা।”

“ভুল করেছি আমি, আমার পুরো পরিবার করেছে, সকলের পক্ষ থেকে আমি মাফ চাইছি তোমার কাছে।”

“এই ছোটো নগণ্য একটা মেয়ের কাছে কেন মাফ চাইছেন বারবার?”

“তুমি ছোটো হতে পারো তবে নগণ্য নয়, তুমি আমার একাংশে জুড়ে গেছো।”

“আমি থাকবো না এখানে।”

“এক কথা বারবার বোলো না, ওঠো এখন।”

হিমেল জোর করে টেনে শোয়া থেকে তুলে বসায় লামহাকে। লামহা হিমেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে চলেছে।

“তোমার মাথায় অনেক বুদ্ধি, আমাকে নাকানি চুবানি খাওয়াবে সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারছি। আমাকে নাকানি চুবানি খাওয়ানোর আগে নিজের খাবারটা খেয়ে নাও এখন।”

“আমি বাড়িতে যাব।”

“এখন কি রাস্তায় রয়েছ?”

“আমি আমার বাবার বাড়িতে যাব।”

“সামনের মাসে নিয়ে যাব।”

“অ্যাহ! আমি এতদিন থাকবো না এখানে। আপনি আব্বুকে কল করে বলুন আমাকে নিয়ে যেতে।”

“আগে খাও তারপর ভেবে দেখব।”

“খাব না।”

“খাইয়ে দিতে হবে?”

“না।”

“তাহলে খাও, এই যে প্লেট হাতে নাও।”

হিমেল লামহার হাতে প্লেট তুলে দেয়। লামহার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখমুখ মুছিয়ে দেয়।
কে বলবে এই মেয়ের ষোলো বছর বয়স? কথা শুনলে আর রাগ জেদ দেখলে বলবে ছাব্বিশ বছরের মেয়ে। দেখতে মিষ্টি পুতুলের মতো হলে কি হবে স্বভাবে তো আস্ত একটা রিনা খান। কীভাবে কথা বলে আর তাকায় ওর দিকে। প্রথম প্রথম তো ভেবেছিল আসলেই সহজ-সরল, বোকা-সোকা, শান্ত-শিষ্ট একটা মেয়ে।

লামহা হেঁচকি তুলতে তুলতে খাওয়া শুরু করে। বিরিয়ানি ওর পছন্দের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে তাই খাচ্ছে নয়তো এখন কিছুই খেতো না। হিমেলের উপর ভীষণ রেগে আছে।

খেতে খেতে প্লেটের সবটুকু বিরিয়ানি খাওয়া শেষ করে লামহা। হিমেল পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। পানি খেয়ে হাত ধুয়ে আবার শুয়ে পড়ে। মনের ভুলেও একবারও হিমেলকে বলেনি খাওয়ার জন্য।

হিমেল প্লেট আর গ্লাসটা হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। হিমেল বেরিয়ে হওয়ার পর স্মরণ হয় হিমেল খায়নি। হিমেল ওকে এভাবে খাওয়ালো আর ও একবারও হিমেলকে বললো না খাওয়ার জন্য? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে লামহা। একটু একটু খারাপ লাগছে। একবার বলা উচিত ছিল খাওয়ার জন্য।
উঠে যাবে কি যাবে না করতে করতে শোয়া থেকে উঠে বসে। বিছানা ছেড়ে নামতে গিয়েও না নেমে শুয়ে পড়ে আবার। একটুও যাবে না ওই ব্যাটা খচ্চরের কাছে।

হিমেল খাওয়া শেষ করে রুমে এসে দেখে লামহা ঘুমিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ ঘুমন্ত লামহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ফোন হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। ব্যালকনিতে বসার মতো কিছুই নেই।
ফোন আনলক করতেই লামহার বাবার কল আসে। কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকে রিসিভ করে সালাম দেয়। লাবিব ইসলাম সালামের জবাব দিয়ে হিমেলের ভালো মন্দের খোঁজ খবর নেন। হিমেল নিজেও শ্বশুরবাড়ির সকলের খোঁজ খবর নেয়।

“লামহা কোথায়?”

“ঘুমিয়েছে। ডেকে দেব?”

“থাক। ঘুমিয়েছে যখন আর ডাকতে হবে না, সকালে ফোন দেবো আবার।”

“আচ্ছা।”

“আচ্ছা, ভালো থেকো।”

“আপনিও ভালো থাকবেন, আব্বু।”

কল কে’টে রুমে ফিরে আসে হিমেল, ব্যালকনিতে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না।
লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে লামহার পাশে। কাত হয়ে তাকিয়ে রইল লামহার মুখের দিকে। ওর ভাবতেই অবাক লাগে এত ছোটো একটা মেয়ে ওর বউ। বউ তো নয়, জীবন্ত একটা পুতুল। যেই পুতুল রাগ করে, জেদ ধরে, মেজাজ দেখায় আর রিনরিনে গলায় গুছিয়ে কথা বলে। অভিমানী দৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে, কখনো কখনো রাগী খ্যাপাটে দৃষ্টিতেও তাকায়। রিনরিনে গলার স্বরও কর্কশ হয়ে যায়। লামহার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মুচকি হাসে। ভাগ্যিস বাপে জোর করে বিয়েটা করিয়েছিল নয়তো এমন মিষ্টি পুতুলের মতো বউ কোথায় পেত?

চলবে………….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply