Golpo romantic golpo প্রণয়ে গুনগুন

প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১৩


প্রণয়ে_গুনগুন

পর্ব_১৩

মুন্নি আক্তার প্রিয়া


প্রণয় ও গুনগুন বসে আছে রুফটপ রেস্টুরেন্টে। সময়টা এখন সন্ধ্যা। সুন্দর কিছু লাইট জ্বলছে ছাদে। আবহাওয়াটাও মৃদুমন্দ। গুনগুনকে কিছুটা গম্ভীর দেখাচ্ছে। প্রণয় জিজ্ঞেস করল,

“সবকিছু কি ঠিকঠাক?”

গুনগুন দীর্ঘশ্বাস নিল। প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“উঁহুম! কিছুই ঠিকঠাক নেই। গতকাল থেকে বাবা আর সৎ মা আমার সাথে কথা বলছে না।”

“তাদের কথা বলাটা কি জরুরি?”

“না। কিন্তু আব্বু যেই কথাটা বলেছে সেটা আমার জন্য জরুরি।”

“কী বলেছে?”

“সে আমাকে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলেছে।”

“এমনিও তোমাকে আমি ঐ বাড়িতে রাখব না। তুমি চলে আসো।”

গুনগুন জেদ ধরে বলল,

“না।”

প্রণয় অবাক হয়ে বলল,

“না মানে?”

“সবসময় তারা যা বলবে তা-ই হবে নাকি? আমি চাই, আপনি আমাকে বিয়ে করেই ঐ বাড়ি থেকে সসম্মানে নিয়ে আসেন।”

“আর?”

গুনগুন বলল,

“আর কী?”

“আর কিছুই না? ব্যস এটুকুই চাও?”

“হু।”

“হয়ে যাবে। তুমি যা চাইবে তা-ই হবে।”

“আপনি যতটা সহজ ভাবছেন সবকিছু ততটাও সহজ হবে না। আব্বু কিন্তু রাজি হতে চাইবে না।”

“তার রাজি হতে হবে কেন? আমি তো তার অনুমতি নিতে যাব না। আমি যাব তার মেয়েকে আনতে। আমার বউকে আনতে। ভালোই ভালো আমার হাতে তুলে দিলে ভালো। আর তা না হলে আমাকে একটু খারাপ হতে হবে। তাছাড়া এমনিও আমি খারাপ ছেলে। ভালো ছেলে না।”

গুনগুন গম্ভীর হয়ে বলল,

“হুম, দেখেছি কাল।”

“এই খারাপ ছেলেটাকে বিয়ে করতে আপত্তি নেই তো?”

“আপত্তি থাকলে কী করবেন?”

“তুলে নিয়ে চলে আসব। একবার যখন হ্যাঁ বলেছ, তখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।”

গুনগুন ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ভয় দেখাচ্ছেন?”

প্রণয় শার্টের কলারটা একটু টেনে পেছনে নিয়ে বলল,

“দেখাচ্ছি।”

“কিন্তু আমি তো ভয় পাচ্ছি না।”

“ভয় পেতে হবে না। শুধু বিয়ের দিন কবুলটা বলে দিও। তাহলেই হবে।”

“হু। এখন চলুন উঠি।”

“এখনই?”

“হুম বাসায় যাব।”

প্রণয় মন খারাপ করে বলল,

“ঠিক আছে, চলো। বউয়ের কথা না শুনে আর কোথায় যাব?”

মাসুদ বসে ছিল ওদের পাশের টেবিলে। প্রণয়ের শেষের কথা শুনে ফিসফিস করে বলল,

“শা’লা বউয়ের গো’লা’ম একটা!”

গুনগুন কথাটা শুনে ফেলেছে। সে মাসুদকে শুনিয়ে প্রণয়কে বলল,

“সবসময় এই চালু মা’ল’টাকে নিয়ে আসেন কেন সাথে?”

মাসুদ বি’স্ফো’রি’ত হয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। চোখ পিটপিট করে বলল,

“এই তুমি মা’ল বললে কাকে?”

“আপনাকে।”

মাসুদ অবাক হয়ে মুখ হা করে তাকিয়ে আছে। প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“দেখলি, দেখলি তোর বউ আমাকে কী বলল? আমি মা’ল? আমি মা’ল বল তুই? আমি কি কোনো জড়বস্তু নাকি দ্রব্যসামগ্রী?”

গুনগুন ভ্যানিটি ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বলল,

“আপনি একটা কুমড়োপটাশ।”

এরপর হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নিমে গেল। মাসুদ ন্যাকা কান্নার সুরে বলল,

“তোর সামনে তোর বউ আমাকে মা’ল, কুমড়োপটাশ বলে গেল। অথচ তুই কিছুই বললি না ওকে।”

প্রণয় ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,

“থাক দোস্ত মন খারাপ করিস না। বউয়ের মুখে মুখে তর্ক করে অস’ভ্য স্বামীরা। কিন্তু আমি তো ভালো স্বামী। বউকে কিছু বলা যাবে না।”

মাসুদ চোখ গরম করে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুই ভালো স্বামী না ছাই! তুই হইলি বউ পাগল।”

“তা অবশ্য মন্দ বলিসনি। বিয়ের পর বউয়ের আঁচল ধরে ধরে হাঁটব।”

মাসুদ রাগে কাঁধ থেকে প্রণয়ের হাত সরিয়ে বলল,

“ধুর শা’লা! কথাই বলিস না তুই আমার সাথে।”

এরপর মাসুদও রাগ দেখিয়ে নিচে নেমে গেল। প্রণয় ওর সাথে সাথে নিচে নেমে কুলসুমের বাসায় গেল ওকে নিয়ে।

দরজা খুলে দিয়েছে বিপ্লব। প্রণয়কে দেখে খুশি হয়ে বলল,

“আরে প্রণয় যে! কী অবস্থা তোমার?”

প্রণয় বিপ্লবের সাথে কোলাকুলি করে বলল,

“ভালো ভাই। আপনি?

“ভালো। ভেতরে আসো।”

সবাই মিলে ড্রয়িংরুমে গেল। বসে বিপ্লব বলল,

“আমি কী শুনলাম?”

“কী শুনেছেন?”

“তুমি নাকি গুনগুনদের বাড়িতে গিয়ে ভা’ঙ’চু’র করেছ?”

প্রণয় মাথা চুলকাচ্ছে। বিপ্লব হেসে বলল,

“নায়ক হয়ে গেছ একদম।”

পাশ থেকে মাসুদ বলল,

“হুম বা’ল হইছে, ভাই। ও একটা বউ পাগলা।”

প্রণয় ধমক দিয়ে বলল,

“চুপ থাক!”

বিপ্লব বলল,

“কী ব্যাপার মাসুদ? এত রেগে আছো কেন তুমি? তোমার তো বন্ধুকে বাহবা দেওয়া উচিত। কিছু শেখো বন্ধুর থেকে। নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য কীভাবে ফাইট করতে হয় দেখেছ না?”

“ওর থেকে এখন আর শেখার মতো কিছু নাই রে ভাই। প্রণয় এখন বউ ছাড়া কিছুই বুঝে না।”

“এটা তো ভালো। খারাপ কী?”

কথার আওয়াজ পেয়ে কু্লসুম রুম থেকে বেরিয়ে এলো। প্রণয়কে দেখে হেসে বলল,

“কীরে রোমিও খবর কী তোর?”

“ধুর! তুই আর ভাইয়া কী শুরু করছিস?”

“কী শুরু করলাম আবার? আমরা তো ইমপ্রেস।”

প্রণয় প্রসঙ্গ পালটিয়ে বলল,

“আচ্ছা এখন এসব বাদ দে। আমি কিছু জরুরি কথা বলতে এসেছি তোকে আর ভাইয়াকে।”

কুলসুম বিপ্লবের পাশে বসে বলল,

“বল।”

“আমার কিছু টাকা ধার লাগবে। গুনগুনদের বাড়ির জিনিসপত্র যা ভেঙেছি ঐগুলো আবার কিনে দেবো। এরপর মা আর তোদেরকে নিয়ে যাব ওর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দিতে। গুনগুন চায় ওকে বিয়ে করেই ঐ বাড়ি থেকে নিয়ে আসি সসম্মানে। এখন আমার কাছে জমানো টাকা যা আছে তাতে হবে না। কিছু টাকা শর্ট পড়ে যায়। চাইলে আম্মুর থেকে নিতে পারি। কিন্তু আমার ইচ্ছে নেই নেওয়ার। পরে ফেরত দিলেও আম্মু নিবে না।”

বিপ্লব বলল,

“কত লাগবে ঐটা বলো। টাকা নিয়ে তোমাকে এত ভাবতে হবে না। তুমি আমার ছোটো ভাই। আমার কাছে কখনো সংকোচ করবে না।”

প্রণয় কৃতজ্ঞতার সুরে বলল,

“ধন্যবাদ ভাই। আপনার টাকা আমি ফিরিয়ে দেবো সমস্যা নাই।”

“আহা! আবার এসব কথা কেন? তুমি দিও তোমার সুযোগ-সুবিধামতো। কোনো চাপ নাই।”

কুলসুম বলল,

“বাড়ির জিনিসপত্র কি গুনগুন কিনে দিতে বলছে?”

“না। ওর বাবা ওরে বলছে আবার বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে। গুনগুন এভাবে আসবে না। পরে মনে হলো, ক্ষতিপূরণটাও দিয়ে দেই। শত হোক, শ্বশুরবাড়ি বলে কথা।”

কুলসুম হেসে বলল,

“গুনগুন তোর জীবনে সত্যিই অনেক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আগের প্রণয় হলে কখনোই তোর মাথায় এসব আসতো না। দেখা যেত, যেগুলো ভা’ঙি’স’নি সেগুলোও এখন গিয়ে ভে’ঙে আসতি।”

প্রণয়ও হেসে ফেলল। বিপ্লব বলল,

“আজ তো আর ব্যাংক খোলা পাব না। রাত হয়ে গেছে। আগামীকাল আবার শুক্রবার। দুদিন ব্যাংক বন্ধ থাকবে। রবিবার ছাড়া টাকা তুলতে পারব না তো। এক কাজ করো, তুমি আন্টিকে নিয়ে কাল গুনগুনদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাও। শনিবার রাতে আমি আবার সিলেট চলে যাব। কুলসুমের কাছে চেক সাইন করে রেখে যাব। তুমি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে যা যা লাগে মাসুদ আর কুলসুমকে সাথে নিয়ে কিনে নিও।”

প্রণয় মাথা নাড়িয়ে বলল,

“ঠিক আছে। আমি তাহলে আম্মুকে কল দিয়ে কথা বলি। আর সাথে কিন্তু আপনি আর কুলসুমও যাবেন।”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। তা না হয় যাব। তুমি আগে আন্টির সাথে কথা বলো।”


সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গুনগুন রান্নাবান্না করছে। সুমনা বেগম এতসব আয়োজন দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

“এত রান্না করছিস কেন?”

“প্রণয় আসবে।”

“ঐ গুণ্ডাটা আবার বাসায় আসবে কেন? আবার কী চায়?”

গুনগুন চোখ রাঙিয়ে বলল,

“ওকে একদম গুণ্ডা বলবে না। ও ওর মাকে নিয়ে আসবে বিয়ের প্রস্তাব দিতে।”

সুমনা বেগম হেসে শ্লেষোক্তি করে বললেন,

“হাহ্! বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার কী দরকার? কিছু তো করতে বাকি রাখছিস বলে মনে হয় না। এখন চলে গেলেই তো পারিস।”

গুনগুন মরিচ কাটছিল। হঠাৎ কথাগুলো শুনে ওর হাত থেমে গেল। ছু’ড়িটা চপিং বোর্ডের ওপর রেখে সুমনা বেগমের দিকে তাকাল। তার চোখে রাগ টগবগ করছে। সে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে সুমনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি যেমন বিয়ের আগেই আমার বাবার সাথে সব করেছিলে তেমন ভাবছ আমাকেও?”

সুমনা বেগম চাপা চিৎকারের সুরে ধমকে উঠলেন,

“গুনগুন!”

গুনগুন সাথে সাথে ছু’ড়িটা হাতে তুলে নিয়ে সুমনা বেগমের গলার কাছে ধরে বললেন,

“চুপ! একদম চিৎকার করবে না নি’র্ল’জ্জ মহিলা। তুমি কি ভেবেছ আমি জানিনা কিছু? তোমার জন্য আমাদের সাজানো-গোছানো সংসারটা শেষ হয়ে গেছে। তোমার জন্য আমার মা আমাকে ছেড়ে অসময়ে চিরতরে চলে গেছে। তোমার জন্য আমার বাবা এখন আমাকে চোখের বি’ষ মনে করে। সবকিছুর পেছনে তুমি দায়ী তুমি! নিজের রূপ, শ’রী’র দেখিয়ে আমার বাবাকে পাগল করেছ। অবশ্য আমার বাবাও কোনো স’চ্চ’রি’ত্র’বান তুলসীপাতা নয়। তুমি যদি ন’ষ্ট মহিলা হও, তাহলে সে ন’ষ্ট পুরুষ। তুমি শরীর দিয়েছ, সে শরীর নিয়েছে। সেই হিসাবে তো তোমরা দুজনই এক। তোমাকে আমি এতদিন কিছু বলিনি শুধুমাত্র শিহাবের জন্য। আর শিহাব যে তোমাদের বিয়ের আগেই পেটে এসেছিল এটাও কিন্তু আমার অজানা নয়। কাজেই আমার মুখ ছুটাইও না। তাহলে তুমি আর মুখ দেখাতে পারবে না কোথাও বলে দিলাম।”

সুমনা বেগম হাত মুষ্ঠি করে দাঁড়িয়ে আছেন। গুনগুনের দিকে তাকাতে পারছেন না তিনি। কিছু বলার মতোও ভাষা নেই। এমনকি নিজের পক্ষেও বলার মতো কোনো শব্দ তার কাছে নেই। কারণ গুনগুন এই পর্যন্ত যা বলেছে সবগুলো কথাই সত্যি।

গুনগুন ছু’ড়িটা নামিয়ে বলল,

“যাও এখন আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও। নিজে তো কিছু করবে না আর। আমাকেই করতে দাও। যাও।”

সুমনা বেগম আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

গুনগুনের সব কাজ শেষ হতে হতে দুপুর হয়ে গেছে। রান্নাবান্না শেষ করে, বাড়ি গুছিয়ে সে গোসল করতে গেছে। আজও সে প্রণয়ের দেওয়া শাড়িটা পরেছে।

প্রণয়রা আসার পর শিহাব গিয়ে দরজা খুলে দিয়েছে। প্রণয়ের সাথে ওর মা পমিলা বেগম, বিপ্লব, কুলসুম আর মাসুদ এসেছে। সবাইকে ড্রয়িংরুমে বসতে দেওয়া হয়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওসমান গণি এবং সুমনা বেগম এসে ওদের সাথে বসেছেন। শিহাব রান্নাঘর থেকে খাবার-দাবার আনছিল। কুলসুম তখন বুঝতে পেরে শিহাবকে বলল,

“চলো আমি তোমাকে সাহায্য করি।”

যেসব আপ্যায়ন সুমনা বেগমের করার কথা ছিল সেগুলো কুলসুম করল। শিহাবের মাথায় সে আদর করে হাতও বুলিয়ে দিল। ছেলেটা একদম বাবা-মায়ের মতো হয়নি। গুনগুনের মতো হয়েছে। ভালো বোনের ভালো ভাই। মা-বাবা কেউ আপ্যায়ন না করলে কী হবে, ছেলেটা ঠিকই বড়ো ভাইয়ের মতো দায়িত্ব পালন করতে নেমে গিয়েছিল। কুলসুম আজ বুঝতে পারল, গুনগুন কেন শিহাবকে এতটা ভালোবাসে এবং ওর কথা ভেবেই মেয়েটা কেন সুমনা বেগমকে কিছু বলে না!

নাস্তা-পানি দিয়ে কুলসুম আর শিহাব মিলে গুনগুনকে নিতে আসে। গুনগুন শিহাবকে জিজ্ঞেস করল,

“জান, সবাইকে খাবার দিয়েছ?”

শিহাব বলল,

“হ্যাঁ। কুলসুম আপু আমাকে সাহায্য করেছে।”

গুনগুন কুলসুমের দিকে তাকাল। কুলসুম হেসে বলল,

“তুমি আমাকে বোন না ভাবলেই বা কী? আমি তো তোমাকে নিজের বোন-ই মানি।”

গুনগুন মাথা নত করে বলল,

“এসব বলে লজ্জা দিবেন না আপু।”

“মজা করেছি।”

বলে কুলসুম গুনগুনের থুঁতনিতে হাত রেখে মুখটা উঁচু করে বলল,

“কী দারুণ লাগছে তোমাকে গুনগুন! ভীষণ মিষ্টি লাগছে ভীষণ।”

গুনগুন সলজ্জিত হেসে বলল,

“থ্যাঙ্কিউ, আপু।”

“চলো এখন। শুধু আমার মাথা নষ্ট করলে হবে? প্রণয় আর ওর মাকেও তো পাগল করতে হবে। চলো, চলো।”

গুনগুন মাথায় ঘোমটা টেনে বলল,

“চলেন।”

কুলসুম গুনগুনকে ড্রয়িংরুমে নিয়ে যাওয়ার পর পমিলা বেগম বললেন,

“ওকে আমার পাশে বসাও। এখানে বসো, মা।”

গুনগুন গিয়ে পমিলা বেগমের পাশে বসল। প্রণয় মুগ্ধ হয়ে দেখছে গুনগুনকে। পমিলা বেগমও মুগ্ধ হয়ে বললেন,

“মাশ-আল্লাহ্! মাশ-আল্লাহ্! ভীষণ সুন্দর তুমি। চাঁদের টুকরা। আমার ছেলের পছন্দ আছে মানতেই হবে।”

কুলসুমও সাথে যোগ দিয়ে বলল,

“ঠিক বলেছেন আন্টি। গুনগুন শুধু রূপবতীই না, গুণবতীও। আজকের সব রান্নাবান্না ও নিজে করেছে।”

পমলি বেগম আনন্দিত হয়ে বলল,

“তাই? এটা তো খুব ভালো। আমার ছেলেটা একদম পার্ফেক্ট মেয়েই পছন্দ করেছে। এখন আর আমার কোনো চিন্তা থাকবে না।”

ওসমান গণি এবং সুমনা বেগম এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। প্রণয়ের ভয়-ভীতিতে সামনে এসে বসতে হয়েছে। কিন্তু এখন অপমান করার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে আর হাতছাড়া করলেন না। প্রণয়কে বললেন,

“বাবা আসে নাই তোমার? কেন আসেনি? ওহ তোমার মায়ের তো ওটা দ্বিতীয় স্বামী।”

একটু থেমে আফসোস করে বললেন,

“আহারে! এজন্যই তো আসেনি।”

প্রণয়ের রাগে মাথার রগ টগবগ করে ফু’ট’ছে যেন। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। সে কিছু বলার আগেই গুনগুন মাথা তুলে ওসমান গণির দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমিও তো দ্বিতীয় বিয়ে করেছ। ওরা কিছু বলেছে?”

গুনগুনের জবাব শুনে কুলসুম মুখ টিপে হাসছে। প্রণয়ের মাথায় তখন র’ক্ত উঠে গেলেও গুনগুনের জবাব শুনে আবার মাথা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।

পমিলা বেগম অপমানে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন। গুনগুনের জবাব শুনে কলিজা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে তার। গুনগুন তখন পমিলা বেগমের হাত ধরে বলল,

“মা, আপনি ওদের কথায় কিছু মনে করবেন না প্লিজ! উনি আমার নামে মাত্র বাবা। বউয়ের কথা ছাড়া এক পা নড়েন না। আর ঐযে পাশে বসে আছে যিনি, উনি আমার সৎ মা। আমার বাবার দ্বিতীয় বউ। আপনার কি এ নিয়ে কোনো আপত্তি আছে?”

পমিলা বেগম হেসে বললেন,

“না, মা। কোনো সমস্যা নেই। তোমার বাবা কয়টা বিয়ে করেছেন এসব নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। দিনশেষে একসাথে থাকবে তুমি আর প্রণয়। সংসার করবে তোমরা। আমরা বাবা-মায়েরা আর ক’দিনই বা থাকব? তোমাদের সুখই আমার সুখ।”

গুনগুন বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“দেখলে? শুনেছ কী বলল? মনটাকে এবার অন্তত একটু বড়ো করো।”

ওসমান গণি অপমানে আর কথা বলতে পারলেন না। পমিলা বেগম বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে চলে গেলেন। ওসমান গণি ও সুমনা বেগমের চুপচাপ মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।

গুনগুন ওদেরকে বাড়ির নিচ পর্যন্ত এগিয়ে দিতে নেমেছে। সবাই গেইটের বাইরে যাওয়ার পর প্রণয় যাচ্ছিল। আবার ঝড়ের গতিতে ফিরে এলো। পেছনে তাকিয়ে দেখল, গুনগুনের সাথে শিহাবও আছে। শিহাবকে বলল,

“তোমার পেছনে ঐটা কী?”

শিহাব পেছনে তাকাতেই প্রণয় টুপ করে গুনগুনের গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,

“সুন্দর জবাব এবং সুন্দর লাগার জন্য দিলাম।”

শিহাব তাকাতে তাকাতেই প্রণয় আবার দৌঁড়ে চলে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে গুনগুন। শিহাব ওর হাত ধরে বলল,

“আপু, ভাইয়া আমাকে কী দেখতে বলল? পেছনে তো কিছুই নাই।”

গুনগুন নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,

“কিছু না। চল।”

রুমে গিয়ে ফোন হাতে নিয়ে দেখল প্রণয় মেসেজ করেছে,

“আবেগে একটা চুমু দিয়ে ফেলেছি। তুমি আবার রাগ কোরো না। ভালোবাসি।”

মেসেজটা দেখে গুনগুন রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেলল।


গুনগুন এখন আগের থেকেও বেশি পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে। একটা শক্তপোক্ত ক্যারিয়ার তৈরি করতে হবে তার। ভার্সিটি, টিউশনি এবং দিনশেষে প্রণয়ের সাথে ফোনে কথা বলা এটাই এখন তার নিয়মিত রুটিন। সারাদিন শেষে যে মাহবুবের কথা মনে পড়ে সে দুঃখ পাবে, সেই সুযোগটাও নেই। প্রণয় সেই সুযোগ দেয়ও না গুনগুনকে। গুনগুন বাড়িতে এলেই প্রণয় ভিডিয়ো কল দেবে। গুনগুন বিরক্ত হয়। কিন্তু প্রণয় তাও শোনে না। গুনগুনকে ভিডিয়ো কলে রেখে প্রণয় ওর কাজকর্ম করে। গুনগুন ওর কাজকর্ম করে। এভাবেই গুনগুনকে আগলে রাখে প্রণয়।

আজ পড়তে বসে বারবার ফোনে সময় দেখছে গুনগুন। সন্ধ্যা সাতটা বাজে। গুনগুন আজ সাড়ে পাঁচটা বাজেই বাড়িতে চলে এসেছে। আসার সময়ও দোকানে প্রণয়কে দেখেনি। অন্য দুটো ছেলে দোকানে ছিল। গুনগুন বাসায় পৌঁছে মেসেজও করেছে, ‘বাড়িতে এসেছি।’ কিন্তু প্রণয় কোনো উত্তর দেয়নি। ওর আবার হঠাৎ কী হলো? গুনগুন আর থাকতে না পেরে প্রণয়কে কল দেওয়ার জন্য ফোনের ডায়ালপ্যাডে যেতেই শিহাব দৌঁড়ে গুনগুনের রুমে এলো।

গুনগুন ফোন রেখে শিহাবকে ধরে বলল,

“কীরে? কী হয়েছে তোর? এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন?”

শিহাব হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“আমি নিচে গেছিলাম। আসার সময় দেখলাম প্রণয় ভাই…”

গুনগুন ভয়ে আঁতকে উঠে বলল,

“কী হয়েছে প্রণয়ের?”

শিহাব গুনগুনের হাত ধরে বলল,

“তুমি আসো আমার সাথে।”

শিহাব ওকে টেনে বারান্দায় নেওয়ার সময় খুব কাছ থেকে গানের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। বারান্দায় গিয়ে দেখল প্রণয় পিকআপে আসবাবপত্র নিয়ে আসছে। গাড়িতে বক্সে গান বাজতেছে ‘তেরে ঘাড় আয়া, ম্যায়নে আয়া তুঝকো লেনে…’

শিহাব কিছুটা স্থির হয়েছে এখন। হেসে বলল,

“দেখেছ? প্রণয় ভাইয়া এসেছে।”

গান শুনে মানুষজন জড়ো হয়ে গেছে। আশেপাশে থাকা বাড়ির মানুষজনও বারান্দায়, ছাদে চলে গেছে ওর কাহিনি দেখতে।

প্রণয়ের হাতে অনেকগুলো গোলাপফুল। সে বারান্দার দিকে তাকিয়ে গানের তালে তালে ফু্লগুলো দেখিয়ে নাচছে। সাথে মাসুদসহ প্রণয়ের আরো বন্ধুরা তো আছেই। গুনগুন এতদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব দেখত। কিন্তু এরকম কোনো সারপ্রাইজ যে সে কখনো পাবে এটা কল্পনাও করেনি। লজ্জায় ও আনন্দে গুনগুন ঠোঁট টিপে হাসছে। চোখে ভাসছে প্রণয়ের নাচ, কানে ভেসে আসছে কুমার শানুর কণ্ঠে গাওয়া গান,

“Tere ghar aaya main aaya tujhko lene
Dil ke badle mein dil ka nazrana dene,
Meri har dhadkan kya bole hain
sun sun sun sun,
Sajanji ghar aaye, sajanji ghar aaye
Dulhan kyu sharmaye, sajanji ghar aaye.”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply