তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
১৭.
রইস উদ্দিন বলল, “সাহেব শেষ পর্যন্ত এখানে পৌঁছেই গেলেন।”
তার কথার ধরনে তাচ্ছিল্যের সুর স্পষ্ট। তবে আমি তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। সহজ গলায় বললাম, “আমাকে এই পর্যন্ত আনতে আপনার অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তাই না?”
“তা একটু তো বটেই। আপনার এই বন্ধুটিকে দিয়ে ওতো গুলো চিরকুট লেখানো সহজ কাজ ছিল না।”
“চিরকুটের নাটক করতে গেলেন কেন? সরাসরি নিয়ে এলেই তো পারতেন।”
“তা পারতাম। তবে উপর মহলের নিষেধ আছে। তাছাড়া আপনাকে একটু বাজিয়ে দেখতে ইচ্ছে করল।”
“বাদশার হাত পা খুলে দেন। ইতিমধ্যে যা করেছেন সেটাই সহ্যের বাইরে।”
“আমাকে হুকুম করছেন?”
“হুকুম মনে করলে হুকুম। আদেশ মনে করলে আদেশ। তবে হ্যাঁ, এতটুকু নিশ্চিয়তা দিচ্ছি যে– আমি অনুরোধ করছি না।”
আমার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট। কোথাও এতটুকু বাঁধছে না। এত সাহস কবে কোথায় পেয়েছি জানি না। বুঝে উঠতে পারছি না। বোঝার চেষ্টাও করছি না। কিছু জিনিসের উৎস খুঁজতে নেই। রইস উদ্দিন থমথমে মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কথা বলছে না। আমি বললাম, “আমার কথা কানে গেল না? বাদশার হাত পা খুলে দেন। এক্ষুনি! এই মুহুর্তে!”
“কেন রে? তুই কী এই জায়গার মালিক নাকি?”
মোটাসোটা চেহারার একটা লোক বেরিয়ে এলো। পান খাওয়া লালচে দাঁত বের করে বলল, “তুই কী এই জায়গার মালিক?”
“না, আমি এই জায়গার মালিক না। আমি বাদশার বন্ধু। আমি থাকতে কেউ ওর কোন ক্ষতি করতে পারবে না।”
“খুব করে মুভিটুভি দেখিস নাকি? সস্তা নায়কের মত করে কথা বলছিস।”
“নাহ! নাটক সিনেমা দেখা হয় না।”
“তা ভালো।”
লোকটা আমার দিকে এগিয়ে এলো। হাসি-হাসি মুখ করে বলল, “মা’র খেতে না চাইলে ভালো ছেলের মতো আমার কথা শোন।”
“কী কথা শুনতে হবে?”
“রইস উদ্দিন দড়ি নিয়ে আয়। বন্ধুর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের প্রমাণ দিক।”
রইস উদ্দিন দড়ি নিয়ে এলো। আমি কোন ঝামেলা করলাম না। চুপচাপ ওদের কথা মেনে নিলাম। দু’জন লোকের সাথে শক্তিতে পারব না। আরও কেউ আছে কি-না, আদো কতজন আছে, এসবের কিছুই জানি না। তাছাড়া এই জায়গাটা আমার পরিচিত না। এখন কোন ঝামেলা করা যাবে না। বাদশার জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর যা করার করব। তিমুকে বলে এসেছি। ঠিক সময়ে না ফিরলে সে কোন একটা ব্যবস্থা করবে। ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।
রইস উদ্দিন হাত পা বাঁধল। শেষ মুহুর্তে নরম চোখে এক পলক তাকালো আমার দিকে। পর মুহুর্তেই চোখ সরিয়ে নিলো।
ঘন্টা খানেক দাঁড়িয়ে থাকার পর বাদশা চোখ খুলল। আমায় দেখে হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “তুই এখানে?”
আমি হাসলাম। সহজ গলায় বললাম, “তোর টানে চলে এলাম। দিনকাল কেমন যাচ্ছে?”
“মজা করছিস?”
“না! মজা করছি না। সিরিয়াস।”
“অথচ কথা শুনে মনে হচ্ছে তুই মজা করছিস।”
“আমি আমার প্রশ্নের জবাব পাইনি।”
“দিনকাল যাচ্ছে দড়িতে ঝুলে ঝুলে।”
“তোকে কি’ড’ন্যা’প করল কেন?”
“আমি ঠিক জানি না।”
“জানিস না মানে? তোকে এইভাবে আটকে রেখেছে আর তুই কিছুই জানিস না?”
“না রে। হাজারবার জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু কেউ কোন জবাব দেয় না।”
বাদশার কথা আমার ভালো লাগল না। কোন কারণ ছাড়া এইভাবে এতদিন আটকে রেখেছে! বাদশা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হালকা গলায় বলল, “বিশ্বাস কর। আমি সত্যিই কিছু জানি না। কে কেন এইসব করছে– কোন কিছু বুঝতে পারছি না”
“তোকে এখান পর্যন্ত আনলো কীভাবে?”
“রইস উদ্দিন নামের একটা লোক।”
“রইস উদ্দিন!”
“এমন বিস্মিত হচ্ছিস কেন? চিনিস নাকি?”
“হ্যাঁ, চিনি। ভালো মতো চিনি। রইস উদ্দিন তোকে কীভাবে আনলো?”
“রাস্তার পাশে বসে ঝিমচ্ছিল আর কাঁদছিল। আমি দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেলাম। আমাকে বলে চারদিন ধরে কিছু খায় না। আমি যেন তাকে একটু খাবার কিনে দিই। হোটেলে নিয়ে গিয়ে ভাত তরকারি কিনে দিলাম। খাওয়া শেষে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে বলল।”
“তারপর?”
“তারপর ওর বাসা পর্যন্ত গেলাম। বাসা বলতে পাখির বাসা। ঝুপড়ি মতো। ময়লা তোষকের উপর বসতে দিলো। তারপর আর কিছু মনে নেই। চোখ খুলে দেখি এখানে। হাত পা বেঁ’ধে রেখেছে।”
“কিছু বুঝতে পারছি না।”
“আমি মনে হয় পারছি।”
বাদশার দিকে তাকালাম। ভ্রু কুঁচকে বললাম, “কী বুঝেছিস?”
“আমার মনে হয় ওরা আমাদের সন্দেহ করছে। এমন কোন বিষয়ে যেটা আমরা জানি না বা জানলেও বুঝতে পারছি না।”
“এমন কী আছে?”
বাদশা মাথা দোলালো। ছেলেটার মুখ শুঁকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে গেছে।
“পিপাসা পেয়েছে। তোকে পানি খেতে দেয় না?”
“পানি? তা দেয় মাঝেমধ্যে।”
“তুই এত কষ্ট সহ্য করে আছিস কীভাবে? প্রথম প্রথম অনেক কষ্ট হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।”
হঠাৎ আমার একটা হাতের বাঁধন খুলে গেল। খুলে গেল বললে ভুল বলা হবে। বাদশা খুলে দিয়েছে।
“পাশাপাশি বেঁধে ওরা খুব বড় ভুল করে ফেলেছে।”
বাদশা খুব তৃপ্তি নিয়ে কথাটা বলল। আমি বললাম, “আস্তে বল। শুনতে পাবে।”
“না পাবে না। এই সময়ে এখানে কেউ থাকে না।”
“তুই কীভাবে বুঝলি?”
“প্রথম ক’দিন অনেক ডাকাডাকি করতাম। তারপর রইস উদ্দিন একদিন বলল দিনের বেলা সবাই কাজে চলে যায়। অযথা চিৎকার চেঁচামেচি না করতে।”
“তোর হাতের শেকল খুলবে কীভাবে?”
“চাবি দেওয়া। চাবি খুঁজতে হবে।”
“কোথায় আছে জানিস কিছু?”
বাদশা মাথা দোলালো। সে কিছু জানে না। হঠাৎই একটা কথা মনে করে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। বাদশা বলল, “হাসছিল কেন?”
“তোর আমার সেই চাবির কথা মনে আছে?”
“কোন চাবি?”
“যে চাবি দিয়ে কলেজের সবগুলো তালা খোলা যায়।”
“চাবিটা তোর কাছে আছে?”
পকেট হাতড়ে চাবি বের করলাম। ভাগ্য খুব ভালো থাকায় শেকল খোলা গেল। বাদশা বলল, “এই চাবি কোথায় পেয়েছিস?”
“আমাদের ঘরে পুরনো একটা বাক্সের মধ্যে পেয়েছিলাম। দাদি বলত– ওই বাক্সে দাদার শখের জিনিস রাখা ছিল। খুব খুঁজে খুঁজে জিনিসগুলো জোগাড় করত।”
“এমন কী হতে পারে যে এই চাবির জন্য তোকে আর আমাকে কিডন্যাপ করেছে?”
“চাবির কথা কেউ কীভাবে জানবে?”
“জানি না। মনে হলো তাই বললাম।”
“জায়গাটা ঘুরে দেখতে হবে। খুব সাবধানে আমার সাথে চল।”
হাঁটতে শুরু করলাম। পা টিপে টিপে বিড়ালের মত হাঁটছি। বাদশা ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। আমি ওর একটা হাত ধরলাম। কোমল গলায় বললাম, “আস্তে আস্তে পা ফেল।”
জায়গাটা যতটা ছোট মনে করেছিলাম ততোটাই বড়। মাটির নিচের জমিদার বাড়ি বললেও কোন ভুল হবে না। বাদশা বলল, “এখানে কী হয় কিছু বুঝতে পারছিস?”
“কিছু একটা তো হয়। যা সবার চোখের আড়ালে করতে হয়।”
“এদিকে দেখ। মাটিতে তাজা ধুলো ছড়ানো। কেউ সম্প্রতি ঘরটা ব্যবহার করেছে।”
“মাটির সাথে কীসের সম্পর্ক থাকতে পারে?”
“জানি না। তবে আমরা এমন একধরনের জিনিস খুঁজছি, যেটা ওরা লুকাচ্ছে। আর আমরা জানি না কোথায় কীভাবে গেলে ওই জিনিসটা পাব।”
হঠাৎই, দেয়ালের পেছন থেকে কেমন একটা শব্দ এলো। মাটিতে কিছু পড়ে যাওয়ার মতো ধ্বনি। ঝনঝন শব্দ হচ্ছে। বাদশা আমার হাত চেপে ধরল। ফিসফিসিয়ে বলল, “ওই ঘরে কী কেউ আছে?”
গলার স্বর অনেকখানি নিচু করে বললাম, “জানি না। উঁকি দিয়ে দেখব নাকি?”
“না থাক। চল, ওইদিকটায় গিয়ে দাঁড়াই।”
আমি ওর কথা শুনলাম না। পা টিপে টিপে উঁকি দিয়ে ফেললাম। ঘরের ভেতরে কিছু নেই। সাজানো থালাবাসন মেঝেতে পড়ে গেছে। হাতের ইশারায় বাদশাকে ডাকলাম। সে এগিয়ে এসে বলল, “কেউ নেই?”
“না কেউ নেই।”
অনেক খুঁজেও প্রমাণ কিছু পেলাম না। রইস উদ্দিন বাদশাকে কেন ধরল, আমাকেই বা কেন নিয়ে এলো কিছুই বুঝতে পারলাম না। ক্লান্ত হয়ে এক জায়গায় বসে পড়লাম।
সন্ধ্যা নেমে গেছে। হাতের কব্জিতে বাঁধা ঘড়ির সময় তাই বলছে। তিমু আসেনি৷ কেন আসেনি বুঝতে পারছি না। এখান থেকে বের হওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি। লাভ হয়নি। দরজা বন্ধ। কোনভাবে খোলা যায়নি। হয়তো দরজার সিস্টেমই এমন। বাইরে থেকে খুলতে হয়। নয়তো আমরা দু’জনে বুঝে উঠতে পারিনি।
হুট করেই চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ কানে এলো। রইস উদ্দিন গলা পাওয়া যাচ্ছে। সে বলছে, “আমি কিছু জানি না স্যার। মতিন ছেলে দু’টোকে খুব ভালো করে বেঁধেছিল। কীভাবে খুলল বুঝতে পারছি না।”
কর্কশ একটা গলা বলল, “জানিস না মানে? তাহলে টাকা দিয়ে তোদের পুষি কেন? এইটুকু কাজ করতে পারিস না?”
গলাটা আমার পরিচিত। যেন আগে কোথাও শুনেছি। কিন্তু কার গলা বুঝতে পারছি না। বাদশার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, “দেখে আসব কে এসেছে?”
“গেলে ধরা পড়ে যাবি।”
“এমনিতেই ধরা পড়ব। তোর কী মনে হয় ওরা আমাদের খুঁজবে না?”
“তা খুঁজবে।”
বলতে বলতেই ধরা পড়ে গেলাম। অপরিচিত জায়গায় বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকা যায় না। পেট মোটা লোকটা আমাদের দেখেই উল্লাস করে উঠল। ঝলমলে গলায় বলল, “স্যার, ওদের পেয়ে গেছি। হাত পা খুললে কী হবে? বের হওয়ার রাস্তা তো জানে না।”
স্যার সম্মোধনে যাকে ডেকেছে সে আমাদের সামনে এলো। তাকে দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ! বিস্মিত মুখে বললাম, “আপনি?”
লোকটা তেমন বিস্মিত হলো না। যেন আগে থেকেই সবটা জানত। বাদশা বলল, “কে তুই চিনিস?”
“তানহার বাবা। তানহা বলতে আমার ছোট কাকার হবু শ্বশুর।”
“কিহ!”
বাদশা যেন আসমান থেকে পড়ল। শুধু সে না। আমিও আসমান থেকে পড়েছি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। দুঃস্বপ্নের কল্পনাতেও তাকে এখানে আশা করিনি। কিন্তু সে এমন কেন করল? আমার সাথে এমন করলে তো মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাবে। সব জেনে বুঝে কেউ এমন করতে পারে কীভাবে?
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৪
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৬
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি গল্পের লিংক
-
তোমার হাসিতে সূচনা পর্ব
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৯
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক