“তোর বাবা তোদের ছেড়ে দেওয়ার পর একদিন আমি তোকে আর তোর মাকে এই বাড়িতে,আমার সংসারে ঠাঁই দিয়েছিলাম।আর তুই পারবি না? আমার মেয়েকে তোর সংসারে ঠাঁই দিতে? আমি তোকে মানুষ করেছি ফুল।এভাবে প্রতিদান দিবি?”
মামীর আবদার শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ফুল।মাস খানেক আগে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে, এখনো তুলে নেয়নি।গত দুই দিন যাবত অনুষ্ঠান চলছে এই বাড়িতে। ফুলের বিয়ের অনুষ্ঠান। নিজের বাবার বাড়িতে পাওয়া সম্পত্তির অংশ দিয়ে ফুলের মা মেয়েকে বিদায় দিবে। সেই বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে তিথী এবং ফুলের স্বামীকে অনৈতিক অবস্থায় দেখেছে কেউ কেউ।শুরুর দিকের ঘটনাকে সবাই হাসি ছলে নিয়েছিল।বলেছিল শালী দুলাভাই এমন একটু আধটু করবেই। গায়ে লাল শাড়ি। অথচ মামী বলছে তার মেয়েকে সংসারে ঠাই দিতে।
“কি হিসেবে নিবো মামি? আমার কি ক্ষমতা আছে ওকে আশ্রয় দেওয়ার?আমি নিজেই তো আশ্রিতা তোমাদের বাড়ির।”
“তুই অনুমতি দে। তুই অনুমতি দিলেই আমার তিথিটা বেঁচে যাবে। আমি তোর কাছে হাত জোড় করে চাইছি। আচল ফেলে চাইছি।দিবি না?”
ফুল মামির ফেলে রাখা আচলের দিকে চাইলো।ঠিক এমনি ভাবে আঁচল ফেলে একদিন তার মা সংসারটা ভিক্ষে চেয়েছিল তার বাবার কাছে। বাবা সেদিন তিন তালাকে মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।ফুলের হাত ধরে তার মা আসে এই বাড়িতে। তারপর?
মামি যতোটা সহজে বলছে ততোটা সহজে কি তাদের আগলে নিয়েছিল?গোয়াল ঘরের পাশে ছিল একটা ভাঙ্গা ঘর। লাকড়ি রাখার ঘর, সেই ঘরে উঠেছিল ফুল আর ফুলের মা।শীতের রাতের উত্তুরে বাতাস, গরমে সাপের ভয় আর বৃষ্টিতে বাড়ির কুকুরটা তাদের ঘরে এসে ঠাঁই নিতো। অথচ বিষয়টা উল্টো ছিল।মূলত ওই ঘরটাই ছিল কুকুরদের জন্য।ওরা রাতে ঘুমাতো, একদিন হুট করে ফুলরা থাকা শুরু করলো।মাদী কুকুরটা কিছুই বলল না। নিজের বাচ্চাদের নিয়ে কেবল একটা পাশে সরে গিয়েছিল।হয়তো বুঝেছিল আসলেই এতিম দুজন এসেছে। প্রতিটা বেলায় খাবারের জন্য সংসারে টিকে থাকার লড়াই করেছে ফুলের মা।আর আজ কি না মামি বলছে তাদের প্রতিদান?
“আর যদি সেই অনুমতি আমি না দেই? মনে পড়ে মামি?আমার মা কতোটা আকুতি করেছিল তোমাদের কাছে। তোমরা শুনেছিলে?ছেলে মানুষের একটু আধটু দোষ থাকে।তুমিই বলেছিলে না বিয়ে ঠিক হওয়ার আগে?তাহলে কেন এখন চাইছো?একটু আধটু দোষ তো তোমার মেয়ের সাথেই করেছে।”
“পুরো গ্রামে ছি ছি পড়ে যাবে। আমি মুখ দেখাবো কিভাবে?তোর মামার কথা ভাব।হার্টের রোগ মানুষটার।”
“আর আমি?রাত পোহালেই যে আমার বিয়ে। তুমি বলছো আমায় নিয়ে ছি ছি করবে না? আমি কবুল বলিইনি তার আগেই তুমি এমন আবদার করলে?”
“তুই কি চাইছিস?আমরা এখন গলায় দড়ি দেই?”
“তোমরাই তো চেয়েছিলে বিয়েটা আমি করি। মাত্র দেড় লাখ কাবিনের টাকার বিনিময়ে আমাকে ওই লোকের কাছে বিয়ে দিচ্ছিলে।”
ফুলের মামি মাথা নিচু করে রইল।কখনো চিন্তাও করেনি এই ফকিন্নির বাচ্চার কাছে হাত পাততে হবে।কিন্তু এই মুহুর্তে এছাড়া উপায় নেই। তার নিজের মেয়েটা বোনের হবু বরের সাথে পুকুর পাড়ে হাতে নাতে ধরা খেয়েছে।ছেলের বাড়ির লোকজন ইতিমধ্যে ফুলকে হলুদ দিতে চলে এসেছে। এই মুহুর্তে যদি ফুল নিজ থেকে না সরে তাহলে পুরো গ্রামে ছি ছি পড়ে যাবে। তাই একা ঘরে ফুলকে নিয়ে এসেছিল কথা বলতে। তার পরিকল্পনা খুব নিখুঁত। চেয়ারম্যানের ছেলে, দুই বিয়ে করলে কোনো সমস্যা নেই।তার মেয়েটার যা বুদ্ধি, কাজ করে খাটিয়ে মারতে পারবে এই ফুলকে।ধরা বাধা দাসী পাবে কিন্তু…..
“তোমার মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে আমি মরতে পারবো না।তোমরা বলেছো এই বিয়ে না করলে আমাদের এই ভিটে বাড়ি ছাড়া করবে।সামান্য আয়োজনের জন্য আমার মায়ের নামের শেষ সম্বল লিখে নিয়েছো।এখন অনুরোধ করো না।”
“তুই যাওয়ার পর তোর মায়ের কি হবে সেটা ভেবে বলিস ফুল।”
“আমার কিছুই হবে না ভাবী। তুমি বাহিরে যাও,গ্রামের অধিকাংশ মানুষ চলে এসেছে।আমার ফুলের সাথে কথা আছে।”
পরদিন ভোরবেলা, ফুল নিজের ঘরটায় মায়ের পাশ থেকে ঘুম থেকে উঠলো। গতকাল রাতের পর এই বাড়িতে তাদের অবস্থান আরো নড়বড়ে করে দিয়েছে।এতে তার কোনো আফসোস নেই।শাড়িটার আঁচল ঠিক করে হাত খোঁপা করতে করতে মাকে ডাকলো ফুল।একবার ডাকলেই যে মা উঠে যেত সেই মা আজ আর উঠলো না।আতঙ্কিত ফুল মায়ের দিকে ঝুঁকে দেখতেই বুঝলো ‘এই পৃথিবী থেকে তার একমাত্র সন্ধ্যা প্রদীপটাও নিভে গেছে আলগোছে।’
চলবে?
(আগামীকাল #বিমাইলাভার দিবো।রেসপন্স করবেন।আর হ্যাঁ #এককাপচায়ে_তুমি এটা সামনের বই মেলায় বই হিসেবে আসবে)
ও_ফুল
পর্ব-১
সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)
Share On:
TAGS: ও ফুল, সাদিয়া খান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE