Golpo romantic golpo নির্লজ্জ ভালোবাসা

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৬


নির্লজ্জ_ভালোবাসা

লেখিকাসুমিচৌধুরী

পর্ব ৮৬ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)

আয়ানের ডাকে তিথি ধীরে ধীরে আয়ানের দিকে তাকায়। আয়ানের চোখ দুটো ফোলা মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে নেই সেই চিরচেনা উজ্জ্বল হাসি। আয়ানকে এমন বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখে তিথি আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“আয়ান তোমার মুখ এমন লাগছে কেন। তুমি কি খুশি হওনি।”

আয়ান তার ভেতরের সবটুকু ঝড় আর হাহাকার তিথির কাছ থেকে আড়ালে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। সে তিথির পাশে বসে প্রথমে তার দুই নবজাতকের কপালে পরম মমতায় চুমু খেল। তারপর তিথির কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে আয়ান বলল।

“আরে পাগলি তোকে কে বলেছে আমি খুশি হইনি। বাবা হওয়া যে কতটা খুশির মুহূর্ত সেইটা তুই বুঝবি না কেবল একজন বাবাই বুঝবে। আল্লাহর ওপর হাজার হাজার শুকরিয়া যে তিনি তোকে আর আমাদের সোনাদের সুস্থ রেখেছেন।”

আয়ানের কথা শুনে তিথি নিজের মাতৃত্বের পূর্ণতার আবেশে বিভোর হয়ে বলতে লাগল।

“জানো আয়ান। আজকে নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে সার্থক নারী মনে হচ্ছে। একটা শরীর থেকে যখন নতুন একটা প্রাণ পৃথিবীর আলো দেখে তখন যে কী অদ্ভুত শান্তি লাগে তা বলে বোঝানো যাবে না। আজ আমি সত্যি সার্থক যে আমি আমার সন্তানদের জন্ম দিতে পেরেছি। একটা মেয়ের কাছে এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে বলো।”

তিথির চোখের উজ্জ্বলতা দেখে আয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ভাবল ওদিকের কেবিনে রৌদ্র এখন নিথর হয়ে পড়ে আছে আর তুরা আইসিইউতে যমের সাথে লড়ছে। আয়ান নিজের ভেতরের হাহাকারটুকু চেপে রেখে তিথির দুই গাল আলতো করে টেনে দিয়ে আদুরে গলায় বলল।

“হুম। অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস তুই। আজ থেকে তুই শুধু আমার পাগলি বউটা না তুই আমার কলিজার টুকরো সন্তানদের মা। তোর দায়িত্ব এখন অনেক বেড়ে গেল তিথি।”

তিথি যন্ত্রণার রেশ কাটিয়ে ঠোঁটে দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটিয়ে চোখ টিপে বলল।

“উমম শুধু আমার দায়িত্ব বাড়েনি। তুমিও কিন্তু বুড়া হয়ে গিয়েছো। এখন তুমি শুধু আয়ান নও দুই বাচ্চার বাবা।”

আয়ান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে কৃত্রিম বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে ভ্রু নাচিয়ে বলল।

“কী। আমি বুড়া। এই মাত্র তো বাবা হলাম আর তুই এখনই আমাকে বুড়াদের তালিকায় ফেলে দিলি।”

তিথি খিলখিল করে হেসে উঠে মাথা নাড়িয়ে নিশ্চিত ভঙ্গিতে বলল।

“অবশ্যই। যার ঘরে দুটো ফুটফুটে বাচ্চা থাকে সে কি আর জোয়ান থাকে নাকি। সে তো অবশ্যই বুড়া।”

আয়ান তিথির কথা শুনে এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর ওর চোখের গভীরে গভীর এক নেশাতুর দৃষ্টি মেলে তাকাল। তিথির কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে খুব নিচু আর ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল।

“ঠিক আছে। তুই যখন বুড়োই বানাচ্ছিস তাহলে আমি বুড়োই। তবে এই বুড়ার তেজ কিন্তু এখনো কমেনি। আর সেই তেজের ঝাপটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোকেই সামলাতে হবে। তখন কিন্তু আবার পালাতে পারবি না।”

আয়ানের কণ্ঠের সেই মাদকতা আর চোখের তীব্র চাহনিতে তিথির সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। ও লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে নিজের দুর্বল হাতটা দিয়ে আলতো করে আয়ানের বুকে একটা চাপড় মারল। তিথি মুখটা সরিয়ে নিয়ে আধো-বোজা চোখে হাসল।আয়ান তিথির ওই হাসিমুখটা দেখে নিজের বুকের ভেতরের কালবৈশাখী ঝড়টাকে পাথরচাপা দিয়ে রাখল। ও জানে এই কেবিনের বাইরে শ্মশানের নীরবতা কিন্তু এই মুহূর্তে ও তিথিকে সেই আগুনের আঁচ দিতে চায় না। আয়ান হাসলো। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না ছিল এক বুক চাপা হাহাকার। ঘর জুড়ে তখন দুজনের দুষ্টুমিষ্টি খুনসুটি আর খুনসুটিমাখা আলাপ চলছিল। বাইরের পৃথিবীর সব বিভীষিকা যেন এই কেবিনের বন্ধ দরজার ওপাশেই থমকে দাঁড়িয়েছে।

সকাল ৬:০০ টা। দীর্ঘ কালো রাত ঘনিয়ে অবশেষে সকালের আলো ফুটল। খান পরিবারের সদস্যদের জন্য হাসপাতালে আলাদা রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সারা রাতের ধকল আর উৎকণ্ঠায় সবাই নিস্তেজ হয়ে চোখ বুজেছে। রৌদ্রের এখনো জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়েছেন অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে ওর শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। মস্তিষ্ক এই শোক আর ধকল সহ্য করতে পারছে না বলেই চেতনা ফিরতে দেরি হচ্ছে। তবে যেকোনো সময় ওর জ্ঞান ফিরে আসতে পারে।

ঠিক সেই মুহূর্তে ডাক্তার দ্রুতপায়ে আইসিইউ রুমে ঢুকলেন। ভেতরে ঢুকেই তিনি তুরার শারীরিক অবস্থা আর মেশিনের রিডিংগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন। হঠাৎ ই তাঁর গম্ভীর মুখে এক চিলতে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠল। তিনি অবাক চোখে তুরার দিকে তাকিয়ে নার্সদের উদ্দেশে দ্রুত গলায় বললেন।

“তাড়াতাড়ি পেশেন্টকে বের করার ব্যবস্থা করো। পেশেন্ট একদম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। হার্টবিট আর পালস এখন পুরোপুরি স্টেবল। স্বয়ং আল্লাহ সহায় হয়েছেন। দেরি না করে এখনি ওনাকে কেবিনে শিফট করো।”

তুরাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে শিফট করা হলো। যদিও এখনো তার পূর্ণ জ্ঞান ফেরেনি তবে শরীরের অবস্থা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। ডাক্তার তাড়াতাড়ি তুরার হাতে পুষ্টির স্যালাইনের সুঁই ঢুকিয়ে দিলেন। যেন তুরার নিস্তেজ শরীরে আবার শক্তি ফিরে আসে।

ডাক্তার বাইরে বেরিয়ে এসে দ্রুত খবরটা খান বাড়ির সবাইকে দিলেন। খবরটা শোনামাত্রই সবাই প্রাণ খুলে হাজার হাজার বার আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। আনোয়ার খান আর আশিক খান তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই দিলেন। কান্নারও যে একটা আলাদা সুখ আছে তা আজ তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। কথায় আছে বহু কষ্টের পর সুখ আসবেই। খান পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ের পর আজ যেন এক চিলতে সোনালী রোদ হেসে উঠল।

সবার মনে এখন একটাই প্রার্থনা যে রৌদ্রের জ্ঞানটাও যেন দ্রুত ফিরে আসে। তুরা ফিরে এসেছে এই খবরটা রৌদ্রের কানে পৌঁছালে ও হয়তো নিমেষেই সুস্থ হয়ে উঠবে। সবার মুখেই এখন পরম তৃপ্তির হাসি। বিষাদের কালো মেঘগুলো যেন একটু একটু করে কাটতে শুরু করেছে।

ধীরে ধীরে দুপুরের দিকে তুরার জ্ঞান ফিরে এল। নার্স খবরটা জানানো মাত্রই খান বাড়ির সবাই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। সবাই একে একে কেবিনে এসে তুরার সাথে কথা বলল। কিন্তু তুরা সবার সাথে কথা বললেও তার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। সে কেবল একটি মানুষকেই খুঁজছে আর সেই মানুষটি হলো রৌদ্র। রৌদ্রকে কোথাও দেখতে না পেয়ে তুরার মনের ভেতর অস্থিরতা বাড়তে লাগল। সে সবার উদ্দেশ্যে দুর্বল গলায় বলল।

“রৌদ্র কোথায়। ও কেন আসছে না। ওকে দেখছি না কেন।”

রৌশনি খান পরম মমতায় তুরার পাশে তার ছোট্ট রাজপুত্রকে শুইয়ে দিলেন। তারপর তুরার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার স্বরে বললেন।

“চলে আসবে। দেখবি একটু পরেই পাগলের মতো ছুটে আসবে।”

তুরা বাচ্চার দিকে একবার তাকিয়েই আবার রৌশনি খানের দিকে তাকাল। তার মিনমিনে কণ্ঠে একরাশ আকুতি ঝরে পড়ল।

“কিন্তু ও এখন আসছে না কেন আম্মু। ওর কি খুব রাগ হয়েছে। ওকে একটু ডাক দাও না। আমি ওকে একটু দেখতে চাই।”

তুরার অবুঝ প্রশ্ন শুনে সবার বুকটা কেঁপে উঠল। কেউ বলতে পারছে না যে রৌদ্র এখনো পাশের কেবিনে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে।আরশি তুরার হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় বলল।

“একটু পরেই আসছে ভাইয়া। তুই একদম চিন্তা করিস না তুরা। এই তো এখনই ভাইয়া তোর সামনে এসে দাঁড়াবে। দেখবি তোকে সারপ্রাইজ দেবে।”

সবাই তুরাকে কোনো না কোনো কথা বলে ভুলিয়ে রাখার এক ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তুরার মন কি আর ওসব কথায় মানে। তার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো দরজার প্রতিটি শব্দে কেঁপে উঠছে। রৌদ্র কেন আসছে না। কী হয়েছে রৌদ্রের। ও কি ঠিক আছে। নাকি সবাই তাকে কোনো বড় সত্যি থেকে আড়াল করছে। এই ভয়ংকর ভাবনাটা মাথায় আসতেই তুরার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে এল। সে হিক্কা তুলে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে তুরা পাগলের মতো বলতে লাগল।

“রৌদ্র কোথায়। ওকে ডাকো তোমরা। প্লিজ আমি ওকে এক পলক দেখব। ও না আসলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। প্লিজ রৌদ্রকে ডাকো। ওকে গিয়ে কেউ বলো তুরা ফিরে এসেছে। আমি মরে যাইনি। আমি ওর কাছে ফিরে এসেছি। রৌদ্র কেন আসছে না। ও কি আমার ওপর রাগ করেছে। ও কি আমাকে আর ভালোবাসবে না।”

তুরার কান্না এখন এক অবুঝ শিশুর করুণ আর্তনাদ হয়ে সারা ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে অস্থির হয়ে নিজের গায়ের স্যালাইনের পাইপ টানতে লাগল। সবাই তুরাকে জড়িয়ে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করছে কিন্তু তুরার জেদ আকাশচুম্বী। সে বারবার রৌদ্রকে দেখার জন্য ছটফট করছে। তুরার এই বুকফাটা কান্না আর আর্তনাদ যেন কেবিনের দেয়াল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল হাসপাতালের সেই নিস্তব্ধ করিডোরে।

তুরার সেই অস্থিরতা আর পাগলমির মাঝেই হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল এক উন্মাদ প্রেমিকের আর্তনাদ মেশানো কণ্ঠস্বর।

“তুরাআআ।”

মুহূর্তে তুরা তার সব ছটফটানি থামিয়ে স্থির হয়ে দরজার দিকে তাকাল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্র। বিধ্বস্ত শ্লথ দেহটা যেন যেকোনো সময় ভেঙে মেঝেতে লুটিয়ে পড়বে। এই মাত্র রৌদ্রের জ্ঞান ফিরেছে আর তুরার সুস্থ হওয়ার খবর শোনামাত্রই সে কারো বাধা না মেনে উন্মাদের মতো ছুটে এসেছে।

তুরা রৌদ্রকে দেখে একদম পাথর হয়ে গেল। রৌদ্রের চোখ দুটো কান্নায় একদম টকটকে লাল আর ফুলে আছে। সিল্কি চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে কপালে লেপ্টে আছে আর পরনের শার্টে এখনো কাল রাতের সেই ভয়াবহ রক্ত লেগে আছে। রৌদ্রের এই বীভৎস আর করুণ চেহারা দেখে তুরার কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

রৌদ্রকে সুস্থ শরীরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রৌশনি খান এবং উপস্থিত সবার চোখেমুখে এক পরম স্বস্তির হাসি ফুটল। সবাই বুঝতে পারলেন এই মুহূর্তে তাদের দুজনের একান্তে থাকা প্রয়োজন। রৌশনি খান ইশারায় সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। সবাই ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন রৌদ্র আর তুরাকে নিজেদের মনের সব না বলা হাহাকার ধুয়ে ফেলার সুযোগ দিয়ে।

কেবিনে তখন শুধু দুই বিষণ্ণ প্রেমিক আর তাদের মাঝখানে শুয়ে থাকা এক নতুন প্রাণ। রৌদ্র দরজায় দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। তার মনে হচ্ছে সে কোনো স্বপ্ন দেখছে। তার তুরা কি সত্যিই ফিরে এসেছে নাকি এটিও তার মস্তিষ্কের কোনো নিষ্ঠুর বিভ্রম।

রৌদ্রের টালমাটাল শরীরটা আর বইতে পারছিল না। ও কোনোমতে হেলতে-দুলতে দেয়াল ধরে রুমে ঢুকল। সোজা তুরার বেডের পাশে এসে ধপ করে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল সে। তুরার ফ্যাকাশে হাত দুটো নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে রৌদ্র বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কান্নায় আজ কোনো আভিজাত্য নেই, আছে শুধু এক বুক খালি করা হাহাকার। রৌদ্র ধরা গলায় পাগলের মতো কাঁপা কাঁপা ভাবে বলতে লাগল।

” তু তু তুরা। এইটা কি সত্যি । আমার তুরা সুস্থ আছে। আমি আমি কি সত্যি তোমাকে দেখছি নাকি আমি মরে গিয়ে তোমার কাছে চলে এসেছি। ব ব বলো না তুরা। তুমি কি এই পাগলটাকে সত্যি বাঁচিয়ে দিলে। তু ত তুমি সত্যি ফিরে এসেছো তো। আর আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ব বলবে না তো?।”

রৌদ্রের আকুতিমাখা কথাগুলো শেষ হতে না হতেই পাশের তোয়ালেতে মোড়ানো ছোট শিশুটি নড়েচড়ে উঠল। তাদের রাজপুত্র যেন বাবার গলার স্বর শুনেই জানান দিল নিজের উপস্থিতি। তীক্ষ্ণ স্বরে কেঁদে উঠল সে। তুরা সিক্ত চোখে রৌদ্রের বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে ফিসফিস করে বলল।

“নিজেই প্রমাণ নাও রৌদ্র। দেখো আমাদের সন্তান তোমাকে ডাকছে। ও কাঁদছে। কোলে নেবে না ওকে।”

রৌদ্র এবার ধীরলয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বাচ্চার দিকে তাকাল। সেই রক্ত-মাংসে গড়া ছোট্ট নিষ্পাপ মুখটা আর তুরাকে চোখের সামনে জীবন্ত দেখে রৌদ্রের বুকের ভেতরটা এক নিমিষেই শীতল হয়ে গেল। গত কয়েক ঘণ্টার সবটুকু দহন যেন এক লহমায় বৃষ্টির মতো ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। রৌদ্র দ্রুত নিজের চোখের পানি মুছে কাঁপা কাঁপা হাতে বাচ্চাটিকে পাজাকোলে তুলে নিল।আশ্চর্যের বিষয়। রৌদ্রের শক্ত বুকের ওপর মাথা ঠেকানো মাত্রই বাচ্চার কান্না একদম থেমে গেল। ঘর জুড়ে নেমে এল এক স্বর্গীয় নীরবতা। হয়তো সেই ছোট্ট প্রাণটি তার বাবার গায়ের ঘ্রাণ আর হৃদস্পন্দনের তাল চিনে ফেলেছে।

রৌদ্র বাচ্চাটির তুলতুলে কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। পরম মুহূর্তেই সে নিজের আবেগ ধরে রাখতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠল। এ কান্না কোনো যন্ত্রণার নয়, এ যেন এক দীর্ঘ অগ্নিপরীক্ষা শেষে বিজয়ী হওয়ার অবর্ণনীয় সুখ। রৌদ্র অত্যন্ত সন্তর্পণে বাচ্চাটিকে তুরার বুকের পাশে শুইয়ে দিল। যেন কাঁচের তৈরি কোনো অমূল্য ধন সে আগলে রাখছে। এরপর সে তুরার কপালে গভীর এক ভালোবাসার পরশ দিল এবং ওর স্যালাইন লাগানো নীল হয়ে যাওয়া হাতটা নিজের ঠোঁটের সাথে চেপে ধরল।রৌদ্র দুই চোখ বন্ধ করে মুখটা ওপরের দিকে তুলে ধরা গলায় বলতে লাগল।

“হে আল্লাহ। তুমি জানো না আজ তুমি আমার ওপর কত বড় দয়া করেছো। সত্যি তুমি পরম দয়ালু। তোমার কাছে কেউ হাহাকার ভরা মন নিয়ে কিছু চাইলে তুমি তোমার বান্দাকে কখনো খালি হাতে ফেরাও না। তোমার ওপর আমার হাজার হাজার শুকরিয়া। আমার পাখিকে আর আমার এই ছোট্ট প্রাণটাকে তুমি আমার শূন্য বুকে ফিরিয়ে দিয়েছো। আমি আজীবন তোমার কাছে ঋণী হয়ে থাকলাম মাবুদ।”

তুরা রৌদ্রের বিধ্বস্ত আর রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে একরাশ অভিমান নিয়ে দুর্বল গলায় বলল।

“তুমি এত পাগলামি কেন করো।”

রৌদ্র মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর তুরার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে এক দীর্ঘ তপ্ত নিশ্বাস ফেলল। ওর গলার স্বর নেশাতুর আর ধরা ধরা। সে ফিসফিস করে বলল।

“মন মানে না রে আমার তোমাকে ছাড়া। তাই করি। তুমি ছাড়া এই গোটা পৃথিবীটা আমার কাছে শ্মশানের মতো জমাট বাঁধা অন্ধকার। তোমাকে ছাড়া আমি আর কিচ্ছু ভাবতে পারি না তুরা। তুমি আমার শুধু ভালোবাসা নও। তুমি আমার আত্মার প্রতিটি কোষে মিশে গিয়েছো। তুমি জানো। গত কয়েক ঘণ্টা আমার এই বুকের ভেতরে ঠিক কতটা বিষাক্ত যন্ত্রণা হয়েছে। মনে হচ্ছিল কলিজাটা কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। কিন্তু এখন। এখন বড্ড শান্তি লাগছে। বিশ্বাস না হলে এই যে দেখো আমার বুকটা।”

বলেই রৌদ্র তুরার স্যালাইন লাগানো নীলচে হাতটা টেনে নিয়ে নিজের বুকের বাম পাশে ঠিক হৃদপিণ্ডের ওপর শক্ত করে চেপে ধরল। রৌদ্র চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ পরম শান্তির নিশ্বাস নিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল।

“আহহহ তুরা। অনেক শান্তি পাচ্ছি। অনেক শান্তি। একটু আগে এখানে বড্ড হাহাকার হচ্ছিল রে। সেই আগুনের ধকল আমি আর সইতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমি মরে…”

বাকিটুকু বলার আগেই তুরা নিজের সর্বশক্তি দিয়ে হাতটা রৌদ্রের ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। তুরার চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে নোনা জল। সে শাসনের স্বরে কিন্তু ভেজা গলায় বলল।

“একদম না। খবরদার এসব অলক্ষুণে কথা একদম মুখে আনবে না বলে দিচ্ছি আরেকবার বললে আমি নিজেই তোমাকে খুন করে মেরে দিবো?।”,

রৌদ্র তুরার হাতের তালুতেই এক তপ্ত চুমু খেল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিমোহিত হাসি ফুটিয়ে তুলল।তুরা অনেক কষ্টে একটু সোজা হয়ে বসে নিজের কাঁপা কাঁপা দুই হাত দিয়ে রৌদ্রের গাল বেয়ে পড়া নোনা জল মুছে দিতে লাগল। সে রৌদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির গলায় বলল।

“কাঁদবে না একদম। এখন আমাদের চোখে পানি মানায় না রৌদ্র। আল্লাহ আমাদের সাথে ছিল। তাই তো তিনি আমাদের এত বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন।”

রৌদ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সাথে সাথে তুরাকে নিজের বুকের গভীরে টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুরার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে রৌদ্র একরাশ আবেগ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।

“আই লাভ ইউ তুরা। লাভ ইউ সো মাচ।”

তুরাও রৌদ্রের চওড়া পিঠে হাত রেখে চোখ বুজল। পরম এক শান্তিতে সেও উত্তর দিল।

“আই লাভ ইউ টু।”

দুজনেই চোখ বন্ধ করে সেই মুহূর্তটাকে অনুভব করতে লাগল। গত কয়েক ঘণ্টার বিভীষিকা মুছে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। মনে হচ্ছে বহু কষ্টের পর তারা আজ সত্যি সুখের দেখা পেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তাদের দুজনের মাঝে শুয়ে থাকা ছোট্ট প্রাণটি আবার জানান দিল নিজের অস্তিত্ব। বাচ্চাটি আবার হালকা করে কেঁদে উঠল। তুরা রৌদ্রের বুক থেকে একটু সরে এসে বাচ্চাটির কপালে আদরমাখা এক চুমু খেয়ে বলল।

“জানো। আমি ওর নাম কী রাখব ভেবেছি।”

রৌদ্র কৌতূহল আর উৎসাহ নিয়ে তুরার দিকে তাকাল। তুরা বাবুটির মায়াবী মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল।

“ওর নাম তাহমিদ খান রৌশান রাখব আমি। ও আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন। আমাদের দুজনের নামের সাথেই ও জড়িয়ে থাকবে।”

রৌদ্রের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটল। সে নিচু হয়ে বাচ্চাটির একপাশের তুলতুলে গালে নিজের গাল ছোঁয়ালো। তুরাও ঠিক অন্যপাশের গালে নিজের গাল ছোঁয়ালো। মাঝখানে তাদের ছোট রাজপুত্র রৌশান। তিনজনের এই পবিত্র মিলন মেলায় হাসপাতালের সেই সাদা কেবিনটা যেন এক টুকরো জান্নাতে পরিণত হলো।

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply