১৩.
ডার্কসাইডঅফ_লাভ
দূর্বা_এহসান
— আর না… প্লিজ, থামুন। আমি আর পারছি না।
কণ্ঠ কাঁপছে। অনুনয়ের চেয়ে ক্লান্তি বেশি। শরীরটা আর সায় দিচ্ছে না, সেটা তরু নিজেই টের পাচ্ছে।
— আরেকটু… শুধু আরেকটু। প্রায় হয়ে এসেছে।
মৃন্ময়ের গলায় সেই একরোখা জেদ। এমন এক জেদ, যেটা কথা শুনে না, সময় বোঝে না। ওর দুই হাত তরুর কোমরের পেছনে শক্ত হয়ে চেপে আছে।নড়ার সুযোগ নেই। পালাবার কোনো রাস্তা নেই।
সিটে গা ছেড়ে চোখ বন্ধ করে আছে মৃন্ময়। কপাল কুঁচকে আছে। নিঃশ্বাস ভারী, অনিয়মিত। তরু নিজেকে ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করছে। পিঠ সোজা রাখার শক্তিটুকুও যেন ফুরিয়ে আসছে। মৃন্ময় হঠাৎ তাকে নিজের দিকে টেনে নেয়। দূরত্ব বলে কিছু থাকে না। ওর প্রতিটা নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে তরুর বুকে। ভারী, অস্থির, আগুনের মতো।
তরুর শরীর জ্বলছে। ভেতরটা যেন ক্রমাগত টানটান হয়ে উঠছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, গলার কাছে আটকে যাচ্ছে। নিজের শরীরে আর শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না সে। বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতার রেশ। ঠিক ভয় না, আবার শান্তিও না। এমন একটা অনুভূতি, যেটার নাম সে জানে না। তবে ওর মস্তিষ্ক বলছে এই সময়টাকে,এই মানুষটার প্রতি ঘৃণার অনুভূতি কাজ করা উচিত এখন।
“আরেকটু।”
শব্দটা আবার শোনা যায়। খুব সাধারণ শব্দ, কিন্তু সেটাই সময়কে টেনে লম্বা করে দিচ্ছে। মুহূর্ত গড়িয়ে যায়। মিনিট না ঘণ্টা,তরু বুঝতে পারে না। মনে হয়, এই মুহূর্ত আটকে গেছে। মনে হয়, এই জনমে তাকে আর ছাড়বে না মৃন্ময়।
তরুর মাথার ভেতর চিন্তা আসে, আবার মিলিয়েও যায়। হাত দুটো কোথায় রাখবে বুঝতে পারে না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ করেই তরুর শরীর ছটফট করে ওঠে। একটা অজানা স্রোত যেন ভিতর থেকে ধাক্কা দেয়। শেষটুকু শক্তি জড়ো করে সে হাত ছাড়িয়ে নেয়। সিটের দুইদিকে রাখে হাত। ব্যালেন্স করার চেষ্টা করে নিজেকে।
মৃন্ময় তখনও অস্থির। আঁকড়ে ধরে আছে তাকে। ছেড়ে দিতে পারছে না, কিংবা চাইছে না। এক মুহূর্তের জন্য তার শরীর শক্ত হয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে সেই টান আলগা হয়।
তরু আর প্রতিরোধ করে না। ক্লান্ত শরীরটা ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে মৃন্ময়ের উপর। নিস্তেজ। চোখ বন্ধ। নিঃশ্বাস এলোমেলো। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।
দুই হাতে তরুর পিঠ আঁকড়ে ধরে মৃন্ময়। শক্ত করে বুকে মুখ চেপে রাখে। হঠাৎ তীব্র একটা ঝাঁকি মারে ওর শরীর। গভীর করে নিশ্বাস ছাড়ে। এক মুহূর্তের নীরবতা।
চারপাশে কোনো শব্দ নেই। শুধু দু’জনের শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ।
ওভাবেই সিটে হেলান দেয় মৃন্ময়। তরুকে বুকে নেয়। বুকের ভেতরের উত্তাপ ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। তরুর মাথা ওর বুকে ঠেকানো। চুল ঘামে ভিজে গেছে। মৃন্ময় চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড বসে থাকে। যেন নিজের শরীরটাকে আবার চিনে নিচ্ছে।
বিকেল নামছে প্রায়।
আকাশের রঙটা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। বাইরে রাস্তায় শব্দ বাড়ছে। মানুষ ফিরছে। স্বাভাবিক একটা বিকেল। অথচ এই গাড়ির ভেতরে সময়টা যেন একটু আগেই থেমে ছিল।
মৃন্ময়ের বুকের উপর লেপ্টে থাকা তরুর পিঠে হাত ধীরে ধীরে বুলিয়ে দিচ্ছে মৃন্ময়।চোখ বন্ধ ওর। আশেপাশে কি হচ্ছে দেখার প্রয়োজন মনে করছে না। তরু ক্লান্ত শরীরে একটুও শক্তি নেই বেশ বুঝতে পারছে।নাহলে বুকের উপর এত শান্ত হয়ে থাকতো না। চোখ খোলে মৃন্ময়। তরুর মুখ পানে চায়। কেনো যেনো তাঁকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে।
বাইরে হঠাৎ কোলাহল শোনা যায়।তরু চমকে চোখ খুলে জানালার দিকে তাকায়। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে সঙ্কুচিত হয়ে আসে। দূরে দু–তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একজন বয়স্ক লোক আর দুজন কৌতূহলী ছেলে। তিনজনই গাড়িটার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
তরু তখনই বুঝে যায়। গাড়িটার অবস্থা সত্যিই… awkward। জানালার কাঁচে প্রতিফলনে নিজের মুখ দেখে সে। গাল লাল। চুল এলোমেলো। জামা ঠিকঠাক নেই।
তাদের গাড়ীর দিকেই তাকিয়ে বিশেষ সমালোচনা শুরু হয়েছে মানুষগুলোর মধ্যে।
— আজকালকার পোলাপান… রাস্তায়ই সব শুরু করে দেয়।
— কাকা, প্রেম তো আর সময়-জায়গা দেখে হয় না।
একটা ছেলে হেসে বলে।অদ্ভূত ভাবে তাকিয়ে আছে ওরা গাড়ীর দিকে। ভিতরে কিছু দেখা না গেলেও কি হয়েছে সব কিছুই স্পষ্ট।
তরু এক ঝটকায় নিজেকে সামলে নেয়। যতটা সম্ভব ঠিকঠাক করে বসার চেষ্টা করে। জামা টানে, চুল গুছোয়। বুকের ধুকপুকানি আবার শুরু হয়েছে।
— বাইরে… লোক আছে।
খুব আস্তে বলে।মৃন্ময় বাইরে তাকায়। পুরো সিনটা বুঝে নিতে এক সেকেন্ডও লাগে না। তার ঠোঁটের কোণে একটা বিরক্ত হাসি উঠে আসে।
— গ্রেট। অডিয়েন্সও জুটে গেছে দেখি।
মৃন্ময়ের কোথায় চোখ কুচকে তাকায় তরু। শার্ট নেই গায়ে।উন্মুক্ত বডি। হাজার বার দেখেছে সে শার্ট ছাড়া মৃন্ময়কে। তবে আজকে নতুন কিছু চোখে পড়েছে।
তরু লক্ষ্য করে, কিছুটা আচরের দাগ লাল হয়ে আছে মৃন্ময়ের শরীরে, বুক আর কাঁধের কাছে। নিঃশ্বাসের সঙ্গে পেশিগুলো কিছুটা টানছে, আর দাগগুলো সেই টান আরও স্পষ্ট করে তুলছে। এগুলা এই মাত্র তরুর করা।
তরু যেনো সামান্য কাঁপে, তবে চোখ সরাতে পারে না। এই দাগগুলো, শরীরের লাইন আর পেশি সবকিছু মিলিয়ে মৃন্ময়ের বডি এক মুহূর্তের আবহ হয়ে ধীরে ধীরে তরুর মনকে ঘিরে ফেলছে।
মৃন্ময় হালকা কাশে। তারপর স্টিয়ারিং সোজা করে গাড়ি স্টার্ট দেয়। তরুর বুকটা একটু হালকা হয়। গাড়ি চলতে শুরু করতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা বন্ধুকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে বলে,
— দেখছিস? সিনেমা শেষ।
গাড়ির ভেতরে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। কেউ কিছু বলে না। তরু নিজেকে ঢেকে ফেলেছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
— তরু, আজ যদি কেউ আমাদের ভিডিও বানাতো…
একটু থামে। তারপর বলে,
— শুনশান রাস্তার মাঝে একটা ব্ল্যাক কার একা একা নড়াচড়া করছে। ব্যাপারটা কেমন হতো বলো তো?
কথা বলার শক্তি নেই তরুর মধ্যে।তবুও বলে,
– জঘন্য।
গা ছেড়ে দেয় তরু।চোখ বন্ধ করে রাখে। যাই হয়ে যাক না কেন পৌঁছানোর আগে আর চোখ খুলবে না।
গাড়ি চালানোয় মন দিলো মৃন্ময়। একটা হাত স্টিয়ারিং এ আরেকটা ছোট মিয়ার উপর। হালকা করে বুলিয়ে যেনো আদর করছে।
- বাঘের বাচ্চা তুই, মিয়া ভাই।
প্রশংসায় সারা দিলো ছোট মিয়া।ভাব নিয়ে বলল,
- হাঃ জানা আছে।😼
- শান্তি লাগছে এখন? দুবার হয়ে গেছে।
- তোর বউকে সামলা আগে। দেখ কিভাবে আছে। এরকম দেখলে কি শান্তি লাগে?
মৃন্ময় তাকালো তরুর দিকে।জামা সরে গেছে কিছুটা। মুখ ঘুরিয়ে নিল। ছোট মিয়াকে শান্তনা দিয়ে বলল,
- উম বাসা যেতে দে। বেচারি ক্লান্ত।
বাড়ীর সামনে এসে থামলো গাড়িটা। তরু গা ছেড়ে দিয়েছিল। মৃন্ময়ের কোলে কখন যে মাথা রেখেছে বুঝতে পারেনি। হঠাৎ ব্রেক করায় চোখ খুললো।মৃন্ময় অদ্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
- মুখ কোথায় তোমার খেয়াল আছে?
বাঁকা হেসে বলল মৃন্ময়। ঠোঁটের কোণে ওই হাসিটা তরুর চেনা। আশেপাশে দেখতে গিয়ে তরু বাম দিকে মাথা ঘুরালো। নজরে পড়ল বেল্ট,কালো প্যান্ট। তৎক্ষণাৎ নিজের অবস্থান বুঝে ফেললো।
মনে মনে সাংঘাতিক একটা ফন্দি এটে ফেললো তরু। ডান হাতটা ছোট মিয়ার উপর ভর দিয়ে, শরীরের সবটুকু শক্তি কাজে লাগিয়ে হঠাৎ উঠে বসলো। মুহূর্তেই মৃন্ময়ের চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। স্টিয়ারিং-এ থাকা হাতটা দ্রুত সেই সংবেদনশীল জায়গায় চলে এলো।
ঠিক সেই সময়ে তরু চটজলদি হাত সরিয়ে নিল। চোখ পিটপিট করে ভান ধরলো যেন,
- ওহ! ভুল বশত হয়েছে…সরি
মৃন্ময় কুচকানো মুখ নিয়ে হতবাক, অস্থির। চোখে ক্ষুদ্র বিস্ময়। তার পেশি টানটান, শরীর কিছুটা শক্ত হয়ে গেছে। ঠিক বুঝতে পারলো না তরু ইচ্ছে করে কাজটা করলো নাকি।
-ইশ ব্যথা দিয়ে ফেললাম বুঝি আপনার বেয়াদবটাকে। আমি বুঝতে পারিনি।
মৃন্ময় কি করবে বুঝতে পারছে না। ব্যথায় ভিতরটা ছটফট করছে। তরু আড়ালে হাসলো।
মনে মনে বলল,
- শরীরে শক্তি নেই জন্য বেঁচে গেলো বেয়াদব টা। নেক্সট বার আর বাঁচতে পারবে না।
চলবে………
(নেক্সট পার্ট বড় করে আসবে।অসুস্থতার কারণে ঠিক ভাবে লিখতে পারিনি। জানেন তো কত রিয়েক্ট হলে আসবে)
Share On:
TAGS: ডার্ক সাইড অফ লাভ, দূর্বা এহসান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৯
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১০
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১৩
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব – ২
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৪
-
ডার্ক সাইড অফ লাভ পর্ব ৮
-
প্রিয়া আমার পর্ব ২
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ১১
-
প্রিয়া আমার গল্পের লিংক
-
ডার্ক ডিজায়ার পর্ব ৮