জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৫৭
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
দিগন্তের কিনারে ভাসমান অর্ধচন্দ্র। ছোট্ট হলেও তার সৌন্দর্যে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়ে নি। শীতের কোমল ছোঁয়ায় চারদিকে নেমে এসেছে হালকা কুয়াশার চাদর। চাঁদের রুপালি আলো আর বাগানের রঙিন লাইটের মিশেলে দৃশ্যমান বাতাসে ভেসে থাকা তুলোর মতো কুয়াশা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। নিস্তব্ধ এই রাতকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে সেই দৃষ্টিনন্দন আবহ।
বিশাল চৌধুরী বাড়ির এক কোণ থেকে ভেসে আসছে ভায়োলিনে তোলা চমৎকার সুর।জানালায় বসে আছে রমণী। কাঁধের কাছে ভায়োলিন রেখে চোখ বন্ধ করে আপন মনে সুর তুলছে।আকাশের অর্ধচন্দ্রও যেন তার দিকে চেয়ে সেই সুর উপভোগ করছে।বাইরের মৃদু শীতল হাওয়ায় রমণীর সামনের কিছু চুল উড়ছে।এই শীতল হাওয়ায় সাধারণত শরীরে কম্পন ধরার কথা।কিন্তু রমণীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই শীতলতা যেন তাকে স্পর্শ করতে পারছে না।তার চেহারায় ফুটে উঠেছে এক আলাদা মুগ্ধতার চাপ।ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে ক্ষীণ হাসির রেখা।
সে ভায়োলিনের তারে বাউ চালিয়ে সুর তুলছে।বেশ কিছুক্ষণ পর সে থেমে যায়।এদিকে এতক্ষণ যাবৎ বিছানায় দু’পা ভাজ করে বসে, সারা শরীর কম্ফোর্টারে মুড়িয়ে, দু গালে হাত দিয়ে মনযোগ সহকারে ভায়োলিনের সুর শুনছিলো নোহা আর ইতি।সুর থামতেই হুশ ফিরলো।নোহা সহসা বলে উঠলো,
–“মীরা সিস থেমে গেলে কেন?”
মীরা চোখ দুটো খুলে আকাশের দিকে তাকালো।সেখানে চাঁদের পাশে ঝলমল করতে থাকা লক্ষ লক্ষ তারার মেলা।মীরা মৃদু হাসলো।তার মাধুর্য কন্ঠে বেখেয়ালি আওড়ালো,
–“পৃথিবীর সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী যে।”
ইতি মুখ ভার করে বললো,”কিন্তু আমার শুনতে খুব ভালো লাগছিলো।”
নোহাও নেকামি কন্ঠে মাথা নাড়িয়ে বললো,
–“আমারও ভালো লাগছিলো।”
মীরা ফের মন ভুলানো হাসলো।মুক্তোর মতো ঝলমল করে উঠলো দাঁত-কপাটি।সে বললো,”এটাই যে প্রকৃতির এক বিষাদময় নীতি। যা তোমার সবচেয়ে পছন্দের, তা সহজেই হারিয়ে যায়।”
মীরার বাক্য শেষ হতেই নোহা কম্ফোর্টার সহ বিছানা থেকে নেমে মীরার পাশে এসে দাঁড়াল।পিছনে বিছানায় বসে থাকা ইতি শীতে কাঁপতে কাঁপতে বললো,”নোহাপু কম্ফোর্টার নিয়ে চলে গেলে কেন?এখন আমার ঠান্ডা লাগছে।উওওও…”
নোহা কম্ফোর্টার দিয়ে নিজেকে পেচিয়ে নিয়েছে। মুখ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না।নোহা বললো,”লিটিল গার্ল তুমি আরেকটা পড়ে নাও।”
নোহা মীরার দিকে তাকিয়ে বললো,”আমার মুড অফ ছিলো।তোমার ভায়োলিনের সুর শুনে খুব ভালো লাগছিল। এখন আবার মুড অফ হয়ে গেছে,হু।”
মীরা আকাশের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নোহার দিকে তাকালো। মেয়েটা বাচ্চাদের মতো সরল চেহারা করে দাঁড়িয়ে।মীরা স্মিথ হেসে নোহার কপালে ঠুকা দিয়ে বললো,”তোর আবার মুড অফ কেন?”
নোহার চোয়াল ঝুলে পড়লো।সে জানালার উপর হাতের কনুইয়ে ভর দিয়ে দুগালে হাত রাখলো।আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,”জান সিস আমার না সিক্স মান্থ ধরে কিছুই ভালো লাগে না।খালি ইচ্ছে করে জিতু বেইবিকে দেখতে।তার সাথে একটু কথা বলতে।আমি লন্ডন ছিলাম তখন বেবিকে খুব মিস করেছি।জান, আমি প্রতিদিন ডিফরেন্ট নাম্বার দিয়ে কল করতাম।শুধু মাত্র জিতু বেইবির ভয়েস শুনার জন্য। আমি প্রতিদিন তাকে নিয়ে ড্রিম দেখি।সে প্রিন্সের মতো আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে।আমার হাতে কিস করে।জান আমি দেশ থেকে যাওয়ার আগে জিতু বেইবির একটা জাঙ্গু চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম।সেটা প্রতিদিন দেখতাম।ঘুমানোর সময় প্রতিদিন পড়ে ঘুমাতাম। আমি ফিল করতাম অলওয়েজ হি ইজ উইথ মি।বাট আজ সেটা দুষ্টু চোরে নিয়ে গেছে। আই ফিল সো সেড,হু।”
নোহার কথা শুনে এতক্ষণ চোখ উল্টোচ্ছিল ইতি।কিন্তু শেষ কথা শুনা মাত্র মুখে হাত ধরে দুষ্টু হাসলো।এদিকে নোহার মুখে এসব শুনে মীরা হতবিহ্বল। সে হাসবে না দুঃখ প্রকাশ করবে তা বুঝতে পারছে না।নোহা, মানে লন্ডনের অন্যতম পরিচিত প্লে গার্ল। বড়লোক বাপের বিগড়ে যাওয়া আদরের একমাত্র মেয়ে কিনা এসব বলছে!!মীরা হতবাক নয়নে নোহার শিশুসুলভ চেহারার পানে চেয়ে।খানিক সময় পর মীরা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে।নোহার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
–“এসব উল্টো পাল্টা ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল।”
–“হ্যাঁ হ্যাঁ ঝেড়ে ফেল।”
মীরার পরেই ইতি বলে।মীরা আর নোহা দুজনেই ইতির দিকে তাকালো।ইতি চোরের মতো চেহারা করে ফললো।নোহা নাকের পাঠা ফুলিয়ে বললো,”মোটেও এটা উল্টো পাল্টা ভাবনা না।ইট’স মাই ফিলিংস।”
ইতি আড়ালে মুখ বেঁকিয়ে নোহাকে ব্যাঙ্গ করে বরবির করলো,”ইট’স মাই ফিলিংস।”
নোহা পুনরায় জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলো মন খারাপ করে।জাঙ্গিয়া চুরির সুখে মেয়েটা এখনো কাতর। মীরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে বললো,
❝অতঃপর দিনশেষে রূপবতী-গুণবতীও খুব বাজে ভাবে পরাজিত হয় ভাগ্যবতীর কাছে।❞
কিছুক্ষণ আগে বাজার থেকে টাটকা শাকসবজি আর মাছমাংস এসেছে।আমি রুমেই শুয়ে ছিলাম।শরীরটা কেমন যেন দুর্বল লাগছে।ঠান্ডাও লাগছে বেশ। মনে তো হচ্ছে ভেতরে জ্বর বয়ে যাচ্ছে। মুখটা কেমন যেন তেতো তেতো হয়ে আছে।কম্ফোর্টার মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলাম।ইফান বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে একটার পর একটা সি’গা’রেট ধরিয়েছে।আর কি একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে।তখন পলি এসে আমাকে ডাকে। আমিও শরীরের কথা ভুলে নিচে চলে আসি।
আমি রান্নাঘরে আসতেই কাকিয়া শুধায় কি খাব?আজ সবার পছন্দের আইটেম তৈরি হচ্ছে। আমার কি খেতে পছন্দ সেটা জানার জন্যই ডেকে নিয়ে আসা।আমি বললাম তোমাদের যা ইচ্ছে কর।আমার আজ কোনো কিছুই ইচ্ছে করছে না।তারপর আমিও রান্নার কাছে হাত লাগিয়েছি।কাকিয়া তরকারিতে নাড়াচাড়া করছে।আমি অনেকক্ষণ ধরে দেখছি তিনি উশখুশ করছে কিছু বলার জন্য।আমিই শুধালাম,
–“কাকিয়া তুমি কিছু কি বলবে?”
তিনি অপ্রস্তুত হাসলেন।বললেন,”জাহান আজ তুমি যে শাড়ি পড়লে না।হঠাৎ সেলোয়ার-কামিজ!”
আমি হালকা হেসে বললাম,”আসলে অনেকদিন ধরে পড়া হয় না তো তাই আরকি।”
–“সে বুঝলাম। তোমাকে দেখতেও বেশ মিষ্টি লাগছে।কিন্তু জানই তো বাড়ির পুরাতন রীতি। মা দেখলে রাগ করবে।”
–“সে আমি পরে দাদিকে ম্যানেজ করে নিব।”
কাকিয়া আর কিছু বললেন না।শুধু স্মিথ হাসলো। পলির চা বানানো শেষ। কাকিয়া সেগুলো সবাইকে দেওয়ার জন্য বেরিয়ে গেলো।রান্নাঘরে এখন শুধু আমি আর পলি।পলি মিষ্টি হেসে বললো,”ভাবি তোমাকে সুন্দর লাগছে।শুধু মুখে একটু হাসি রাখ।কেমন যেন তোমায় মনমরা লাগছে।”
আমি গামলায় ময়দা ঢালছি।পলির কথায় বললাম,”শরীরটা ভালো না।মনে হয় ভেতরে জ্বর।অনেক ঠান্ডা লাগছে।”
পলি তাড়াতাড়ি আমার দিকে তাকালো।কালো ওড়নাটা মাথায় দিয়ে কাঁধে তুলে রেখেছি।পলি তার শাড়ির আচলে হাত মুছে আমার কপাল ছুঁয়ে দেখলো।বললো,”শরীরটা গরম দেখছি।তুমি রান্না ঘরে এখনো কি করছ।রুমে গিয়ে রেস্ট নেও।ঔষধ খেয়েছ?”
–“আরে এত ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। রাতের খাবার খেয়ে ঔষধ খেয়ে নিব।”
–“পোলাও আর মুরগির মাংস হয়ে গেছে।তাছাড়া মাছ আর সবজিরও কিছু আইটেমও রান্না করা শেষ। গরুর মাংসও কসানো হয়ে গেছে প্রায়।তুমি খেতে খেতে হয়ে যাবে।”
আমি হেসে বললাম,”আরে নাহ্। তোমাদের সাথে বসে খাব।এখন খিদে পায় নি।আচ্ছা আমি বরং দুটো পরোটা বানিয়ে ফেলি। কেনো জানি পোলাও-টোলাও খেতে ইচ্ছে করছে না।গতকালও বিরিয়ানি আরও কত কি হিজিবিজি রান্না হয়েছে। আজ গা কেমন গোলাচ্ছে।
–“আচ্ছা তোমার ইচ্ছে। কিন্তু অসুস্থ শরীর নিয়ে রান্নাঘরে ভাইয়া যদি কিছু বলে।”
পলির কথা শুনে হাসলাম।গরম পানিতে ময়দা ঢেলে নাড়াতে-চারাতে বললাম,”ও কি বলবে,,”
আমার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই পিছন থেকে কেউ আচমকা জড়িয়ে ধরে। আমি কিছু বুঝার আগেই মেয়েলি কন্ঠ কানে আসে।
–“কি হয়েছে বউমণির?”
মীরার কথা শুনে বললাম, “ওহ্ তুমি।তেমন কিছু না।”
–“তাই,কিন্তু আমি যে শুনলাম অসুস্থ তুমি?”
–“ঐ আরকি গা গরম।”
মীরা কিছুটা বিচলিত হয়ে বললো,”লিসেন বউমণি,শরীরের উপর হেলা করা ঠিক না।আমি বিগ-ব্রোকে বলছি তুমি,,, “
মীরাকে আমি থামিয়ে দিলাম তৎক্ষনাৎ,”এ-মা এসব কি বলছ।তোমার ভাইকে বলো না।জানই তো পাগল।এটা শুনলে না জানি কি পাগলামি শুরু করে!”
মীরা স্থির হয়ে পাশে দাঁড়াল। আমার চেহারা ভালো করে দেখে বললো,”উমম ভীষণ মনমরা লাগছে তাই না পলি?” মীরা থামে জিহ্বা কামড়ে ধরে বলে,” সরি সরি ভাবি।”
পলি ল’জ্জা পেল।কারণ মীরা পলির বেশ অনেক বছরের বড়।পলি ল’জ্জায় রিনরিন কন্ঠে বললো,”ইশশশ মীরা আপু। আমাকে নাম ধরেই ডাকবা।”
মীরা গ্যাসের চুলার উপর বসানো পাতিলে উঁকি দিয়ে দেখলো গরুর মাংস রান্না হচ্ছে। মীরা জোরে নাক টেনে ঘ্রাণ নিলো।অতঃপর বললো,”বড় ভাইয়ের বউকে কি আর নাম ধরে ডাকা যায়?ঠিক আছে তুমি আপু ডেকো।বাট আমি ভাবি ডাকবো।”
আমি ময়দা মাখতে মাখতে বললাম,”তাহলে আমিও আপু ডাকবো।তুমি আমার সিনিয়র। নাম ধরে ডাকতে ল’জ্জা লাগে।”
মীরা ঝটপট আমার মুখের কাছে তার মুখ এনে অবাক হয়ে বললো,”লাইক সিরিয়াসলি! তোমার ল’জ্জা লাগে!”
আমি হেসে বললাম,”আমার বুঝি ল’জ্জা নেই?”
মীরা কেশে আরেক পাশে তাকিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চাপা হেসে বললো,”শুনলাম গতকাল নাকি দাদির ঘুম হয় নি।”
–“আস্তাগফিরুল্লা।”
বলেই আমি চোখমুখ কুঁচকে মুখের কাছে ওড়না টেনে আরেক পাশে ঘুরে দাঁড়ালাম।ল’জ্জায় কান দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। শা’লি বুড়ি, ননদকে সব বলে দিলো!হায় খোদা এই মুখ আমি এখন কোথায় লুকায়।ল’জ্জা’য় আমি মরি-মরি অবস্থা তখনই পলি বলে উঠলো,”ভাবি তুমি কিছু জান দাদির না ঘুমানোর কারণ ? না মানে তুমিও তো কাল দাদির সাথে ছিলে।”
হায় মাবুদ তুমি আমাকে উপরে তুলে নাও। এই বুড়ি সবাইকে বলে বেড়িয়েছে নাকি?আমি আর কোনো কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।মীরা আর পলি একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাপা হাসিতে ফেটে পড়ছে।আমার কানেও একটু আধটু আওয়াজ আসছে।আমার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে মীরা কেশে উঠলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বললো,”না মানে দাদি কিছু বলে নি কিন্তু, হ্যাঁ।”
আমি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চোখ খিচকে নিলাম।মীরা বললো বাদ দাও।দেখি জ্বর কতটুকু উঠেছে।মীরা কপালে হাত দিয়ে বললো,”উমম বেশি না উঠলেও এখনই মেডিসিন নেওয়া দরকার। টেবলেট খেয়েছ কি?”
আমার উত্তর পলি দিয়ে দিলো।মীরা শাসন করার মতো স্বরে বললো,”হোয়াট তুমি এখনো ঔষধ খাও নি?”
আমি নিজেকে স্বাভাবিক করে আবার ময়দা মাখায় মনযোগ দিয়ে বললাম,”ঔষধ খেয়ে কি আর মনের অসুখ সাড়ে।”
মীরা হঠাৎই থমকালো।আমার দিকে খানিকটা সময় এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।তারপর মৃদু স্বরে শুধালো, “মুড অফ?”
–“এটা অলটাইম অফই থাকে।”
মীরা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললো,”মুডটা না বড্ড বেয়াদব জিনিস। এটার ভালো খারাপের কোনো ঠিকঠিকানা নেই। যখন ইচ্ছে হয় অন হয়।আবার নিজের মতো অফ হয়ে যায়।আর সেই সময়টা ভীষণ অসহ্য লাগে।তাই তো মুড অফ থাকলেই ভায়োলিন নিয়ে বসি।”
মীরার কথায় কাজ থামিয়ে সেদিকে তাকালাম। অবাক চাহনিতে তাকিয়ে বললাম,”তার মানে আজ তুমিই ভায়োলিন বাজিয়েছিলে।আমি কাজের মধ্যে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গিয়েছিলাম এত সুন্দর করে কে ভায়োলিন বাজায়।ও মাই গড,তুমিতো অসম্ভব সুন্দর করে সুর তুলো!!”
পলিও প্রশংসা করলো।মীরা মেকি হাসলো।উপরের দিকে তাকিয়ে বললো,”সেটা সবাই বলতো তেমন পাত্তা দেই নি।আজ তোমার কথায় বিশ্বাস হলো।”
শেষ কথাটা আমার দিকে তাকিয়ে মিহি হেসে বললো।আমি চোখ সরু করে শুধালাম, “আমার কথায় এত বিশ্বাস!”
–” অফকোর্স,আমার বউমণি বলে কথা।বাই দ্যা ওয়ে,তুমি জান আমার মুড যখন অনেক বেশি অফ থাকে তখন ভায়োলিন বাজালে তার সুরের মাধুর্য আরো দ্বিগুণ বেড়ে যায়।আর যখন তার চেয়েও বেশি মুড অফ থাকে তখন বাইক নিয়ে বেড়িয়ে পড়ি।যেদিকে চোখ যায় সেদিকে ছুটি। দেন আই ফিল রিলাক্স।”
আমি মীরার দিকে অবাক নজরে তাকালাম। শুধালাম, “তুমি বাইকও চালাতে জান?”
মীরা হেসে বললো,”ইয়েস বেইবি।সেটা আমি খুব ভালো পারি।ইউ নো,আমি বাইক চালিয়ে আজ অব্ধি থার্টি টু কান্ট্রিস ভিজিট করেছি।ইনফ্যাক্ট দেশেও এবার বাইক চালিয়ে এসেছি,ইন্ডিয়া হয়ে।”
আমি আর পলি মীরার খুব প্রশংসা করলাম।আমি ইতিমধ্যে কয়েকটা পরোটা বানিয়ে ফেলেছি।পলিরও মাংস রান্না শেষ। এখন আমি পরোটা বানিয়ে বানিয়ে দিবো আর ও ভাজবে।আমি বাটার নিতে নিতে বলালম,”তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে মুড ভালো করার জন্য এই ট্রিকস আমাকেও ব্যবহার করে দেখতে হবে।তো কবে ঘুরতে নিয়ে যাবে?”
–“তুমি যখন বলবে তখনই।”
আমি পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে হাত বাড়িয়ে বাটারের কৌটা নেওয়ার চেষ্টা করছি।তখনই আমার পিছন থেকে মীরার বদলে পুরুষালি হাস্কি স্বর কানে আসতেই হাতটা থমকে গেলো।পিছন থেকে কেউ আমায় একটা উষ্ণ চাদর জড়িয়ে দিলো।অতঃপর পুরুষের শক্তপোক্ত একটা হাত আামর কোমর জড়িয়ে ধরে। নাকে ভেসে আসছে খুব পরিচিত ক্লোনের ঘ্রাণ। আমার বুঝতে এক মূহুর্ত দেরি হয় নি কে হতে পারে।আমি তড়িঘড়ি করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইলাম।কিন্তু ইফান আমার পিঠ তার বুকের সাথে মিশিয়ে রেখেছে। ইফান আমার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
–“কোথায় যেতে চাও তুমি? জাস্ট সে ইট ওয়ান্স।”
আমি কোমর থেকে ইফানের হাত ছাড়াতে চাইলাম।দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”শয়’তানের বাচ্চা ছাড় আমায়।সবাই দেখছে।”
ইফান আরও তার সাথে চেপে ধরলো।কানের কাছে মুখ এনে ঠোঁট ছুঁইয়ে শুধালো, “কে দেখছে?”
আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উত্তর করলাম,”শয়’তান এখানে যে তোর বো,,,”
–“কেউ নেই এখানে।”
আমি তৎক্ষনাৎ ঘাড় হালকা ঘুরিয়ে দেখলাম, আসলেই কেউ নেই। তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললাম,”ছাড় আমায়, রান্না করছি।”
–“কে বলেছে রান্না করতে?”
–“আমার মুখ দিয়ে মধু ঝরার আগে ভালোভাবেই ছেড়ে দাও।”
ইফান ঠোঁট কামড়ে হেসে বললো,”তোমার মধু ঝরাতেই তো এসেছি।”
আমি চোখ রাঙালাম।ইফান আমাকে তার দিকে ঘুরিয়ে ভালোভাবে আমার গায়ে চাদরটা পেচিয়ে দিতে দিতে নমনীয় কন্ঠে বললো,”তোমার যে শীতের কাপড় নেই আগে বলনি কেন?”
আমি দৃষ্টি নত করে চুপ করে রইলাম।বিয়ের পর এটাই প্রথম শীত। তাই এ বাড়িতে কোনো শীতের কাপড় নেই। কিন্তু লোকটা বুঝলো কিভাবে?আমি ইফানের চোখের দিকে তাকালাম। ইফান আমার মাথা তার দিকে টেনে কপালে উষ্ণ চুমু এঁকে বললো,”তখন দেখলাম শীতে কাঁপছ।তাই কিনে আনালাম। পছন্দ হয়েছে?”
আমি চাদরে চোখ বুলালাম। নাহ্ মানতেই হবে লোকটার চয়েস সব সময় হাই ক্লাসিক।আমাকে কিছু বলতে না দেখে ইফান নিজেই বললো,”পছন্দ হয় নি না।কোনো ব্যাপার না।রুমে আরও অনেক ডিজাইন আর বিভিন্ন কালারের চাদর-হুডি আছে।তোমার যেটা ভালো লাগে সেটাই পড়ো।”
আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে ইফানের কথা শুনে,”আরও আছে মানে।এতগুলো আনতে কে বলেছে?”
ইফান হালকা হেসে আমার গালে হাত বুলাতে বুলাতে উত্তর করলো,”বলতে হবে কেন?আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই এনেছি।দরকার হলে মার্কেটের সব তোমার জন্য নিয়ে আসবো।ভুলে যাও কেন তুমি কার ওয়াইফ।”
দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললাম, “ছাড় কাজ আছে।”
–“শরীর খারাপ লাগলে করার প্রয়োজন নেই। আগামীকাল তোমার জন্য পার্সোনাল মেইড নিয়ে আসব।আজ যা লাগবে লতাকে বল করতে।”
–“আমাকে কেউ কখবো কোনো কাজের জন্য জোর করে না।আমার ইচ্ছে হলে আমি করি।আর আমার কাউকে লাগবে না।”
ইফান আমাকে ছেড়ে সরে দাঁড়াল। আমি পুনরায় পায়ের আঙ্গুলে ভর দিয়ে হাত বাড়ালাম বাটার নেওয়ার জন্য। কিন্তু নাগাল পাচ্ছি না।ইফান কিছুক্ষণ আমার কর্মকান্ড দেখে পিছন থেকে আমার সাথে মিশে দাঁড়িয়ে এক হাত দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে। তারপর আমার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে স্পর্শ করতে করতে বাটারের কৌটা নিলো।আমি খপ করে ইফানের থেকে কৌটাটা নিয়ে নিলাম।
–“অসভ্য!”
বলেই আমি আচমকা ইফানের পায়ে পারা মেরে সরে গেলাম।ইফান পা উঁচিয়ে বলে উঠলো, “উফফ বান্দি রোমান্টিক মোমেন্টেই তরে শয়তানে নাড়া মারে।”
আমি মুখ বাকিয়ে চোখ উল্টালাম।অতঃপর প্যানে বাটার ছেড়ে রুটি দিয়ে দিলাম।আবার নতুন করে আরেকটা বানাতে লাগলাম।ইফান আমার পাশে দাঁড়িয়ে পরোটা উল্টে পাল্টে দিচ্ছে।আমি আড় চোখে লোকটার কাজকর্ম দেখলাম।তারপর নজর আটকালো ইফানের দেহে।একটা ব্ল্যাক কালার গেঞ্জি পড়ে,যা তার পেশিবহুল দেহে আষ্টেপৃষ্টে লেগে আছে।আমি তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি সংযত করলাম।
কিচেনে পিনপতন নীরবতা। ইফান পরোটা ভাজছে আর আমি বানাচ্ছি। আমি আবার কোনো কাজ করলে সেটাতেই সম্পূর্ণ মনযোগ দেই।ইফান আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে থাকিয়ে।এতে আমার কাজে মনযোগ স্থির করতে পারছি না।লোকটার চাহনি ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলে দেয় আমায়।আচ্ছা ইফান কি আমাকে দেখে মিটি মিটি হাসছে?আমার হঠাৎ এমন মনে হচ্ছে কেন?আমি ভাবনাগুলো সাইডে রেখে পরোটা বানানোতে মনযোগ রেখেই গলা খাঁকারি দিলাম,,
–“এহেম এহেম, নজর ঠিক করেন।”
হঠাৎই ইফান আমার কোমর জড়িয়ে ধরলো।আমি ফুস করে উঠলাম,”হচ্ছেটা কি,,,”
বাকি কথা বলার আগেই ইফান আমার কপালে লেগে থাকা ময়দা মুছে দিতে দিতে বললো,,
–“বাল তুমি আর মানুষ খুঁজে পাইলা না।আমার নজর তো আমার ছোট ভাইয়ের থেকেও বড় ধান্দাবাজ।একবার চলে গেলে আর ফিরে আসতে চায় না।”
আমি চোখ বন্ধ করে আফসোস করে বলতে লাগলাম,”আল্লাহ! আল্লাহ গো মানুষের ঘরবাড়িতে ঠাডা না ফেলে এর মুখটায় ফেলতে পারো না।”
–“আমিন।”
আমি তৎক্ষনাৎ চোখ খুলে ইফানের দিকে তাকিয়ে দাঁত কটমট করলাম।ইফান ঠোঁট গোল করে চুম্মা দেখিয়ে গা দুলিয়ে হেসে পরোটা ভাজতে লাগলো।
রাত সারে দশটা বাজে বোধহয়। ডাইনিং টেবিলে এক এক করে সকলে এসে বসছে।আমি পরোটার হট পট’টি টেবিলে রাখলাম।অতঃপর ইফানের পাশের চেয়ারে বসে পড়লাম।নাবিলা চৌধুরী আড় চোখে আমাকে দেখে নাক ছিটকে চোখ সরিয়ে নিলো।তারপর শসার একটা পিস মুখে তুলে কর্কশ গলায় বললো,
–“ডিনারে এত এত আইটেম রেখে পরোটা কে খাবে?
আমি নাবিলা চৌধুরীর দিকে না তাকিয়ে তৎক্ষনাৎ উত্তর করলাম,”কে আর খাবে! আপনার বাদরের থুক্কু আদরের একমাত্র বড় ছেলের বউ খাবে।”
নাবিলা চৌধুরী চোখ উল্টালো।তক্ষুনি কেউ একজন আমার পাশের চেয়ার টানে।আমি সেদিকে তাকাতেই দেখি পঙ্কজ। পঙ্কজ আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে কুৎসিত হাসছে।সে বসতে যাবে তার আগেই কোথা থেকে মীরা এসে ঝটপট বসে পরে।এতক্ষণ পঙ্কজের মতিগতি খেয়াল করছিলো ইফান।মীরাকে বসতে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে প্লেটে একটা পরোটা তুলে নিলো।
পঙ্কি জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলতে লাগলো।মীরা সহসা বলে উঠলো, “ওহ্ ব্রো তুমি বসতে চেয়েছিলে নাকি।আ’ম সরি,খেয়াল করি নি তোমায়।বউমণিকে দেখে এখানে বসে পড়েছিলাম। দাঁড়াও আমি উঠছি।”
–“ইট’স ওকে।তুই এখানেই বস।”
পঙ্কির চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।মীরা হেসে বললো,”ওকে আমি এখানেই বসি তাহলে।”
তক্ষুনি দাদি ড্রয়িং রুমে আসে।তিনি বসতে বসতে পঙ্কিকে ডেকে তার কাছে বসালো।দাদির তখনই নজর পড়লো আমার দিকে।তিনি সহসা বলে উঠলেন,”এ কি বড় বউ এটা কি পড়েছিস।তুই কি আবার আমাদের বংশের নিয়ম ভাঙবি নাকি।গতবার না বললি আর ভুল হবে না।”
দাদির কথায় উনার দিকে তাকালাম। উনার মুখে বিরক্তির ছায়া।গতবার বাপের বাড়ি থেকে যখন সেলোয়ার-কামিজ পড়ে এসেছিলাম তখন তিনি বেশ রাগ পায়।কারণ বলেন, চৌধুরীর পূর্ব পুরুষ নাকি জমিদার ছিলো।তখন বাড়ির বউরা শাড়ি গহনা পড়ে সেজে থাকতো।যুগ পালটেছে।গা ভর্তি গহনা না পড়ে থাকলেও শাড়ি পড়ে থাকার ধারা টা রয়েই গেছে। দাদির শাশুড়ীও নাকি দাদিকে কখনো শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পড়তে দিতো না।তাদের ধারণা এই নিয়ম ভাঙলে বংশের ক্ষতি হবে।দাদি আমায় বলেছিলো তিনিও নাকি আমার মতো মানতো না।পরে উনারও বিশ্বাস জন্মে হঠাৎ নিয়ম ভাঙতে সংসারে অমঙ্গল হবে।
আর ভাবতে পারলাম না।তার আগেই ইফানের গমগমে আওয়াজ কানে আসে,
–“ও ডার্লিং, এসব ইউজলেস কথাবার্তা বাকিদের সাথে বলো।আমার বউকে কোনো কিছুতে ফোর্স করা নিষেধ।আই মিন টোটালি নিষেধ।”
দাদি ইফানের কথার পিছে আর কিছু বলতে পারলো না।আমি ইফানের দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললাম,”এটা কি ধরনের অসভ্যতা হু?বয়স্ক মানুষের সাথে কেউ এভাবে বলে?”
ইফান একহাত দিয়ে আমার গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিয়ে বললো,”আমার ডার্লিং তোমার মতো ফুলি না যে একটুতেই গাল ফুলাবে।”
আমি চোখ উল্টালাম।এদিকে পঙ্কজ আড় চোখে আমাকে দেখে নিচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর। ইফান না তাকিয়েও বুঝে গেলো।সে শুকনো পরোটা মুখে পুরে চিবাতে চিবাতে বললো,”লু’চ্চা মার্কা চোখগুলো নিচে নামিয়ে রাখ।মায়ের দিকে চোখ তুলে তাকাতে নেই রে পাগলা।”
পঙ্কজ চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষলো।ইমরান আর মীরা শুকনো কেশে উঠলো।ছোট ইতি মুখে হাত ধরে হাসি আটকাতে চায়ছে।
কাকিয়া আর পলি সকলের পাতে খাবার তুলে দিচ্ছে।কাকিয়া দেখলো ইফান এত এত আইটেমে হাত না দিয়ে শুকনো পরোটা চিবচ্ছে। তিনি শুধালো ইফানকে ,”বাবা তুমি শুকনো পরোটা খাচ্ছ কেন?তরকারি নেও।”
–“নো নিড।”
নাবিলা চৌধুরী বললো,”বেটা কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ?”
–“নোপ।বউয়ের হাতের খাবার টেস্ট করছি।ইয়াম্মি…”
ইফান বলেই মুখে টুপ করে আরেক টুকরো ঢুকিয়ে দিলো।নাবিলা চৌধুরী আর কিছু বললো না।তিনি মনযোগ দিয়ে খেতে লাগলো।পঙ্কজ আড় চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আবার তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।কাকিয়া আমার প্লেটে গরম ধোঁয়া উঠা গরুর মাংস দিলো।আমি প্লেটে গরম পরোটা তুলে নিলাম। মীরাও একটা নিলো।কাকিয়া মীরাকে তরকারি দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো,”কিরে তোর ভাই কে তো সকাল থেকে দেখছি না।সেই যে বেড়িয়েছিলো আর আসে নি।”
–“আমি তো জানি না।বিগ ব্রো হয়তো জানে।”
কাকিয়া ইফানের দিকে তাকালো।ইফান কিছু বলতে যাবে তার আগেই আমি আমার মুখের ভেতরে সবে নেওয়া অধিক গরম পরোটা আর মাংসের টুকরো বের করে ইফানের মুখে ঢুকিয়ে দিলাম।ইফানের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে তৎক্ষনাৎ।পুরো ড্রয়িং রুম স্তব্ধ আমার এহেন কাজে।ইফান এখানো হা করে আমার দিকে চেয়ে। আমি একটা শুকনো ঢুক গিলে ইফানের থুতনি ধরে হা করা মুখ বন্ধ করে দিলাম।নাবিলা চৌধুরী, নুলক চৌধুরী আর পঙ্কজ ছাড়া সকলেই হেসে উঠলো।ইফন গলা খাঁকারি দিয়ে মুখের খাবার খেয়ে নিলো।
আমার এমন কাজে নিজেরই গা গুলিয়ে উঠলো।আমি ঝটপট উঠে দাঁড়ালাম।কাকিয়া সুধালো,”আরে কি হলো উঠছ কেন?একটু বস খাবার ঠান্ডা হলে পরে খাও।”
–“না না না কাকিয়া।আমি সত্যি আর খাবো না।আমার শরীর খারাপ লাগছে।”
ইফান উঠে দাঁড়াল। আমার কপালে-গলায় হাত দিয়ে বললো,”শরীর গরম এখনো।তুমি একটু খেয়ে নাও আমি ডক্টরকে কল করছি।”
–“উমম আমার খেতে ইচ্ছে করছে না__গা গোলাচ্ছে।আর ডক্টর লাগবে না।”
দাদি বললো,”না খেয়ে থাকলে তো শরীর আরও খারাপ করবে বড় বউ।”
–“এখন খেলে পেটে যা আছে বেরিয়ে আসবে।আমি রুমে যাচ্ছি।”
আমি তাড়াতাড়ি ড্রয়িং রুম ত্যাগ করলাম।সবাই আমার যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো।অতঃপর সকলে নিজেদের খাওয়ায় মনযোগ দিলো।ইফানও আমার পিছে আসতে নিলে সকলে জোর করে টেবিলে আবার বসিয়ে দিলো।
আমি রুমে এসে চোখেমুখে পানি দিলাম।জ্বর শরীরে পানি লেগে শরীর কেঁপে উঠেছিলো।আমি তাড়াতাড়ি হাতপা মুছে কম্ফোর্টার জড়িয়ে শুয়ে পড়েছিলাম।তবে বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে পারিনি।হঠাৎই মনটা আরও ভার হয়ে যায়।তাই ওড়না পেঁচিয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালাম।এই স্থানটা আমাকে বড্ড প্রশান্তি দেয়।এখান থেকে আকাশের চাঁদটা খুব সুন্দর ভাবে দেখা যায়।মাঝেমধ্যে মনে হয় আকাশে এই চাঁদটা আমার জন্যই উদয় হয়। প্রতিমুহূর্ত আমার জন্য অপেক্ষায় থাকে।আর আমি এখানে আসলে সে নিঃশব্দে হাসে।আমাকে অপলক চেয়ে দেখে।
বাচ্চাদের মতো কথাগুলো ভেবেই স্মিথ হাসলাম।আজও চাঁদকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে।আচ্ছা জায়ান ভাই কেমন আছে?আমার জন্য কি তার পরাণ এখনো পুড়ে? তিনি কি আজও আমার অপেক্ষায়? নাকি আমাকে অন্যকারো ভেবে ঘৃণা করে?
আর ভাবতে পারলাম না।ধম বন্ধ হয়ে আসছে।আমি জোরে শ্বাস টানলাম। তক্ষুনি ভেতর থেকে মৃদু আর্তনাদ বেড়িয়ে আসলো।চোখ দুটো ভিজে উঠেছে।পলক পড়লেই যেন বর্ষণ নামবে।
আমি একনাগাড়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম।বাইরের শীতল হাওয়ায় শরীর ঠান্ডায় পাথরের মতো জমে গেছে।কিন্তু আমি অনুভব করতে পারছি না।সময় নিজের মতো এগোতে থাকলো।আর আমি মেয়েটা আজও সেই দিনটাতে আটকে রইলাম।
এদিকে হাতে একটা ট্রে নিয়ে ইফান রুমে আসলো।দরজা লক করে ভেতরে চোখ বুলিয়ে দেখলো আমি নেই। ইফান হাতের ট্রে টা বেডসাইড টেবিলে রেখে কোমরে হাত রাখে।জিহ্বা দিয়ে গাল ঠেলে ওয়াশরুমের দিকে তাকালো। দরজা বাইরে থেকে লাগানো।তার মানে ভেতরে কেউ নেই। ইফান তপ্ত শ্বাস ছাড়লো।সে বুঝে গেছে আমি কোথায় থাকতে পারি।ইফান বেলকনির কাছে আসতে থাকে। দরজা অব্ধি আসতেই তার পা থেমে যায় আমার কন্ঠ স্বর শুনে,,
❝আকাশে অনেক তারার ভীড়ে
আমি তোরে খুইজা পাইলাম নারে
আবেদন খোদার দরবারে
আখিরাতে পাই যেন তোরে….❞
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেই হঠাৎ এতক্ষণের সকল নীরবতা ভেদ করে মনের সুখে গুনগুন করে গান ধরি।কয়েক লাইন গেয়েই আবার আচমকা থেমে যায়।রেলিং শক্ত করে ধরে ফেললাম।চোখ বন্ধ করতেই টপটপ করে তপ্ত অশ্রু কণা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো।গলাটা ভেঙে আসছে।আমি খুব কষ্ট করে ঢুক গিলে মনে মনে বিরবির করলাম,,,
❝জায়ান ভাই আপনি বলেছিলেন না,”আকাশের তারায় তারায় খুঁইজো।”এই মেয়েটা সেই দিনের পর থেকে আজও আকাশের লক্ষ লক্ষ তারার মাঝে আপনাকে খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু আপনাকে কোথাও খুঁজে পায় না।আপনি নেই। কোথাও নেই ❞
__
হঠাৎ করেই আমি চোখ খুলি।দুটো শক্তপোক্ত হাত আমার সরু লতানো কোমর জড়িয়ে ধরেছে। আমার বুঝতে একবিন্দুও অসুবিধা হলো না কে হতে পারে।ইফান আমাকে তার সাথে শক্ত করে চেপে ধরলো।এক প্রকার তার ভেতরে ঢুকিয়ে নেওয়ার পায়তারা। ওর শক্ত হাতের বাঁধনে বাহুতে ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। কিন্তু এই মূহুর্তে ওকে কিছু বলার শক্তি এই নিস্তেজ দেহে নেই। ইফান আমার গালের সাথে গাল ঘষে হিসহিসিয়ে বললো,
–“তোমার শরীর পাথরের মতো বরফ হয়ে আছে।খেয়াল কোথায় তোমার?”
আমি আকাশের দিকে তাকালাম। ইফান আমায় কিছু বললো না।বরং আচমকা আমার জামার জিপার খুলে ফেললো।আমি ইফানের দিকে ঘাড় ঘুরালাম।চোখ সরু করে শুধালাম, “কি করছ তুমি?”
ইফান আমার কাঁধ থেকে জামা ফেলে দিলো।উম্মুক্ত অংশে তার উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া দিতে দিতে হিসহিসিয়ে বললো,”তোমার বেখেয়ালির শাস্তি দিচ্ছি।”
ইফানের সাথে কথা বলতে একদমই ইচ্ছে হচ্ছে না।জ্বর তার উপর খালি পেট,শরীর কেমন যেন নিস্তেজ লাগছে।আমি ইফানের থেকে সরে যেতে চাইলাম।ইফান তক্ষুনি কোনো পূর্বাভাস না দিয়ে আমাকে পাজাকোলে তুলে নিলো।শরীর থেকে ওড়না খসে পড়েছে। উফান বিনা বাক্যে আমাকে রুমে নিয়ে এসে বেডে শুইয়ে দিলো।হঠাৎ দেহে শীতলা অনুভব করতে পারছি।সারা শরীর কেঁপে উঠছে। তবু্ও আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে। ইফান আমার সাথে কোনো বাক্য বিনিময় না করে তার দেহের গেঞ্জিটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।আমি আঁতকে উঠলাম।না, আজ আমি ওর ভার বাহন করতে পারবো না।সেই শক্তি মনোবল কিছুই নেই দেহে।ইফান আমার উপর ঝুঁকে পড়লো।আমার গলা শুকিয়ে আসছে।আমি মৃদু স্বরে বলে উঠলাম,
–“আজকেও কি তুমি আমার অসুস্থতার সুযোগ নিবে।”
ইফান সবে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিল বেড সাইট টেবিলে রাখা বাটি’টায়।কিন্তু আমার বাক্য ইফানের কানে পৌঁছাতেই ওর হাত থেমে যায়।ইফান আমার দিকে কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থাকে।তারপর এক হাতের সাহায্য আমার মুখে পড়ে থাকা চুলগুলো কানের কাছে গুঁজে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,,
–“আমি তোমার থেকে কখনো কোনো সুযোগ নেই না।বরং তোমার জীবনের প্রতিটি রাত দীর্ঘতম করতে চাই__ঠিক ততদিন পর্যন্ত, যতদিন পর্যন্ত তুমি আমায় ঘৃণা করবে।তারপর,,,,,”
ইফান থেমে গেলো।আমি সরু চোখ করে শুধালাম,
–“তারপর?”
ইফান হালকা হাসলো।হাসিটা বড় অদ্ভুত। তাতে মনে হলো কোনো প্রাণ নেই। ইফান আমার কানের কাছে ঠোঁট এনে আগের মতো হিসহিসিয়ে বলে,,
–“সিক্রেট।”
আবার হাসলো লোকটা।বড়ই অদ্ভুত ঠেকলো আমার কাছে। আমি সহসা কর্কশ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম,,
–“কি চাও তুমি?”
–“সির্ফ তোমাকে। ”
তৎক্ষনাৎ ইফানের থেকে প্রতিত্তোর আসলো।আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।ইফান গা দুলিয়ে হেসে আমার নাকের সাথে নাক ঘষে হাত বাড়িয়ে বাটিটা নিলো।আমি সেদিকে তাকালাম। বাটি ভর্তি ফ্রুট-কাস্টার্ড।ইফান বলে উঠলো, “খেয়ে নাও।ফ্রেশ সবে বানিয়ে আনলাম।উমম, খেলে গুড ফিল করবে।”
দেখে তো লোভনীয় লাগছে।বেশ অনেক ধরণের ফল দিয়েও বানিয়েছে দেখছি। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম।এই লোকের থেকে কিছুতেই খাব না।ইফান এক চামুচ আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো।আমি চোখমুখ খিচকে বললাম,
–“আমি এসব খাবো না।সরে যাও আমার উপর থেকে।আমার ঠান্ডা লাগছে।আমি শান্তিতে একটু ঘুমাবো।”
ইফান বাটিটা আবার রেখে দিলো।অতঃপর একই কম্ফোর্টার দিয়ে দু’জনকে মুড়িয়ে নিলো।আমি ওর বুকে ঠেলতে ঠেলতে বললাম,
–“তুই কি মানুষ? দেখছিস আমার শরীর দুর্বল তবুও পাটার মতো শরীর আমার উপর ছেড়ে দিচ্ছিস।”
ইফান লাইট অফ করে ডিম লাইট অন করে বললো,”তোমার না ঠান্ডা লাগছে।ওয়েট এক্ষুনি গরম করে দিচ্ছি।”
বলেই আমার উপরের বস্ত্র টেনেটুনে খুলে আঁধারে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ।আমার চোখে ভেসে উঠছে সেই দিনটার কথা।ঐদিনও ঠিক এমন অসুস্থ ছিলাম।আর লোকটা আমার প্রতি একটুও দয়া করে নি।বরং আমার সবটা আত্মসাৎ করায় মরিয়া হয়ে উঠেছিলো।আমি আতংক নিয়ে ইফানের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎই ইফান আমার মুখে কাস্টার্ড মেশানো একটা আঙ্গুর ঢুকিয়ে দিলো।আমি হতবিহ্বল হয়ে ইফানের দিকে তাকিয়ে। এটা কি হলো এখন!ইফান ঠোঁট বাকিয়ে হেসে চোখ মারলো।আমি শক্তে আঙ্গুরে কামড় বসিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,
–“এটা কি হলো?”
ইফান বাটি থেকে দুই আঙ্গুল দিয়ে কাস্টার্ড মেশানো আপেলের টুকরো নিজের মুখে পুরে নিলো।অতঃপর চিবাতে চিবাতে আমার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললো,”পরিশ্রমের কাজ কররা আগে শক্তির প্রয়োজন বেইবস।লেট’স স্টার্ট দ্যা গেইম।”
আমি মুখে কিছু বলতে যাব তখনই আবার আমার মুখে কাস্টার্ড মেশানো কিউই টুকরো ঢুকিয়ে দিলো।অতঃপর আমার ওষ্ঠপুটে ডুব দিলো।শুরু হলো ওর বেসামাল উন্মাদনা। তার হাতের বন্য স্পর্শগুলো আমাকে অস্থির করে তুলছে।আমার ঠোঁটে যত মিষ্টি স্বাদ ছিলো সবটা চুষে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।আমার দেহে অসহনীয় ব্যাথা শুরু হয়েছে। সারা রুম জুড়ে দেয়ালে দেয়ালে বারি খেয়ে পুনরায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আমাদের ঘনঘন শ্বাসপ্রশ্বাসের আওয়াজ।এক পর্যায়ে উন্মাদ লোকটাকে সামলাতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে চোখ বুজলাম।
আমার নিস্তেজ ন’গ্ন দেহ লোকটা তার উন্মুক্ত বুকের মধ্যখানে স্বযত্নে আগলে নিলো।আর, আর কিছু মনে নেই আমার।আমি গভীর নিদ্রায় ডুব দিয়েছি।ইফান যখন নিশ্চিত হলো আমি ঘুমিয়ে গেছি তখন কম্ফোর্টার সরিয়ে আমার থেকে সরে গেলো।
অতঃপর কম্ফোর্টার দিয়ে আবারও আমাকে সম্পূর্ণ মুড়িয়ে দিলো।খানিকটা সময় আমার ক্লান্ত ঘর্মাক্ত চেহারায় দৃষ্টি বুলালো।তারপর কাপালে শব্দ করে চুমু খেয়ে উঠে কোমরে টাউয়াল জড়িয়ে নিলো।
ঠোঁটে একটা সিগারেট আর হাতে ফোন নিয়ে বেলকনিতে দাঁড়ালো।সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে কাউকে কল দিয়ে ফোন কানে ধরলো।সঙ্গে সঙ্গে ইফানের ফোন রিসিভ হলো।ইফান তার গম্ভীর সত্তা ধরে রেখে গমগমে আওয়াজ তুলে বললো,
–“সব রেডি আছে তো? “
অপর প্রান্ত থেকে মাহিনের কন্ঠ ভেসে আসলো,”জি ভাই।”
ইফান ঠোঁট বাকালো।সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া কুন্ডলী ছেড়ে বললো,
–“ওকে,আ’ম কামিং,,,,”
চলবে,,,,,,,,,
(অনেক বড় পর্ব দিয়েছি(৪০০০+ শব্দের) ।বানান ভুল থাকতে পারে।তোমরা কষ্ট করে বুঝে পড়ে নিও।আর গল্প সম্পূর্ণ শেষ হলে আমি আবার রিচেক দিয়ে ভূল ত্রুটি সংশোধন করবো।হ্যাপি রিডিং 🫶)
জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৫৮
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অশ্রাব্য ভাষা, অশ্লীলতা এবং সহিংসতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সংবেদনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
নিশুতি রাত। চারদিক অন্ধকারে ডুবে আছে। কিন্তু আজ গুলশানের আবহে যেন এক অদ্ভুত স্তব্ধতা ভর করেছে। সাধারণত যে শহর কখনো পুরোপুরি ঘুমোয় না, সেই শহর আজ যেন বেঘোরে নিস্তব্ধ। অন্যদিনের তুলনায় আশপাশ অবিশ্বাস্যভাবে শান্ত। কোলাহলে ভরা এই স্থান হঠাৎ করেই যেন ঝিম ধরে আছে।চতুর্দিকে এক ধরনের শূন্য নীরবতা। কাকপক্ষীরও নড়াচড়ার অস্তিত্ব নেই।ঠিক সেই সময় সড়কের বুকে পিচ ছেঁড়া শব্দ তুলে তীব্র গতিতে এগিয়ে এলো একটি কালো মার্সিডিজ। তার ঠিক পেছনে পরপর দু’টি জিপ। পুলিশ প্লাজার সামনে এসে গাড়িগুলো একসাথে থামতেই পরিবেশের নিস্তব্ধতায় আরেক দফা টান পড়ে। জিপ দু’টি থেকে হনহনিয়ে নেমে এলো কালো পোশাকে মোড়া কয়েকদল অ’স্ত্রধা’রী গার্ড। তাদের উপস্থিতি রাতের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলেছে।
পুলিশ প্লাজা থেকে বেশ কিছুটা দূরে আরও একটি মার্সিডিজ আর জিপ দাঁড়িয়ে ছিলো।এই গাড়িগুলোকে থেমে যেতে দেখে সেই গাড়ি দুটোও কাছে এসে থামল। মাহিন গাড়ি থেকে নেমে প্রথম মার্সিডিজটার কাছে গেল।তৎক্ষনাৎ ভেতর থেকে ইনান নেমে আরেক পাশের ডোর খুলে দিল।মাহিন ভেতরে তাকিয়ে দেখলো–ভেতরের সিটে গা ছেড়ে বসে আছে ইফান। মাহিন তার চিরচেনা শান্ত কন্ঠে বললো,
–“ভাই তুমি বললে এখনই,,, “
মাহিনকে থামিয়ে ইফান শুধালো, “আসেপাশের সব সড়িয়েছিস?”
মাহিন উত্তর করলো,”ইয়াহ্ ব্রো। তোমার কথা অনুযায়ী রাত আটটাতেই শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে।সাথে ইলেক্ট্রিসিটি আর ইন্টারনেট কানেকশনও বন্ধ করা হয়েছে। এখন মার্কেটের আসেপাশে একটা কাকপক্ষীও নেই।”
–“কেউ নেই?”
ইফান শান্ত অথচ গম্ভীর কন্ঠে ফের শুধালো।মাহিন ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হাসলো।বললো,”একটা শো-রুমের ম্যানেজার আর তার একটা বয় স্টাফ এখনো ভেতরে আছে।”
ইফান ঘাড়ে হাত বুলিয়ে ঘার এপাশ ওপাশ নাড়াল।ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসির রেশ।ইফান সিটে রাখা রিভলবারটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো।তার পরিধেয় পোষাক– কালো প্যান্ট আর সফেদা রঙের শার্ট। যার তিনটে বোতাম খোলা। বলিষ্ঠ দেহের কিছুটা দৃশ্যমান।সেখানে ছোট ছোট অনেকগুলো নখের আঁচড়। কোথাও কোথাও সুক্ষ্ম রক্ত কণা জমাট বেঁধে আছে।
ইফান রিভলবার উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অতঃপর আড় চোখে শপিং কমপ্লেক্সের দিকে তাকালো।চারটি গাড়ির লাইটে যতটুকু দৃশ্যমান ততটুকু ছাড়া সব তিমিরে নিমজ্জিত। কিন্তু তবুও ইফানের তীক্ষ্ণ চোখে পড়লো বিল্ডিংয়ের প্রবেশ দারের উপরে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা পুলিশ প্লাজা। ইফান ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হেসে গার্ডদের ইশারা করতেই সকলে জিপ থেকে পেট্রোল বের করে মার্কেটে ঢালতে লাগল।ইফান গাড়ির বনেটে লাফিয়ে বসে পড়লো।হাত বাড়াতেই ইনান তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা সিগারেটের শলাকা ধরিয়ে দিলো।ইফান নিজের পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেটে আ’গু’ন ধরিয়ে লাইটারটা পুলিশ প্লাজার দিকে ছুড়ে মারে।মুহূর্তেই পুরো শপিং কমপ্লেক্স দাউদাউ করে জ্ব’ল’তে থাকে।
ইফান সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে আকাশের দিকে ধোঁয়া কুন্ডলী ছেড়ে বাঁকা হাসে। পুড়ছে গন্ধটা ইফান লম্বা শ্বাস টেনে ভেতরে নিলো।তার এখন বেশ শান্তি লাগছে।বিকালে যখন আমার পছন্দ করা শাড়িটা অন্যকেউ কিনে নেই তখন সেই খবর নাফিয়া তৎক্ষনাৎ ইফানকে দিয়ে দেয়।আমি ভার্সিটি আসার পরই ইফানও চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো। তার কাছে খবর আসে শামিনকে ঢাকায় দেখা যায়।ইফান তাড়াহুড়ো করে ঢাকায় আসে তখন। এদিকে যখন সুমাইয়া ইফানকে খবরটা দেয় তখন ইফান গুলশানের আসেপাশেই ছিলো।
ইফান নাক দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া বের করে পুড়তে থাকা পুলিশ প্লাজার দিকে তাকালো।আ’গু’নের তীব্র তাপে আসেপাশের বাতাসও উত্তপ্ত। পুরো অন্ধকার শহরের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আ’গু’নের শিখা আশেপাশ আলোকিত করছে।আগুনের কুন্ডলীগুলো যেন আকাশ ছুতে চাইছে ।শহরের বড়বড় দালানগুলো থেকে শত শত দূরদূরান্তের মানুষ এই ধ্বংসের লীলাখেলা দেখছে।আ’গু’নের শিখা ছাড়া তাদের চোখে কিছুই ভাসছে না।তারা তো জানেই না– ধ্বংসের আরেক নাম মাফিয়া বস ভেনম স্বয়ং নিজে এই ধ্বং’স লীলা চালাচ্ছে।আ’গু’নের পুড়া গন্ধের সাথে ভেসে বেড়াচ্ছে মানুষের আতংকিত চিৎকার চেঁচামেচি করা হাহুতাশ। সব মিলেয়ে বাতাস আরও ভারী হয়ে আসছে।ইফানের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি।সে মনের সুখে সিগারেট খাচ্ছে। তার সামনেই যে এত বর ধ্বং’স ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে তাতে তার কোনো হেলদোল নেই। আ’গু’নের তাপের গরমে ইফানের সারা মুখ সহ উন্মুক্ত বুকের মধ্যে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছে।
মাহিন,ইনান সহ সকল গার্ডরা অনেকটা পিছিয়ে গেছে। ইফানকে চেঁচিয়ে বলছে সরে আসতে।কিন্তু ইফান কানে তুলছে না।বরং অ’গ্নি’কাণ্ডের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের শেষ অংশ ফেলে দিলো।তার চোখের অভ্যন্তরে সামনের জ্বলন্ত আ’গু’নের শিখা ঝলঝল করছে।ইফান চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বিরবির করতে লাগলো,
–“ঠিক এভাবেই সব জ্বা’লি’য়ে দিব, যে আমার বউয়ের জিনিসে হাত দিবে।শো’য়া’রের বাচ্চা সহস কত বড় তোদের! আমার বউয়ের হাত থেকে জিনিস কেঁড়ে নিস!গ্যাংস্টার ইফান চৌধুরীর কলিজার জিনিস কেঁড়ে নিস!!শাস্তি তো পেতেই হবে।”
ইফান থামলো।অতঃপর হেলে গাড়িতে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লো।আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে, বুকের বা পাশে হাত রেখে পুনরায় বিরবির করলো,”আমার জানটাকে একবার কাঁদানোর দায়ে যেখানে আমি আজও পুড়ছি– সেখানে তোরা পুড়বি না কেন!”
ইফান আরও কত কি বিরবির করলো।হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই চোখ খুললো।এতক্ষণ শান্ত থাকা চোখগুলো লাল বর্ণ ধারন করেছে।চোয়াল আরও শক্ত হয়ে গেছে। ইফান উঠে দাঁড়াল ঝটপট। মাহিনকে হাঁক ছেড়ে ডাকতেই মাহিন তৎক্ষনাৎ ইফানের সামনে দাঁড়াল। ইফান অসন্তুষ্ট চেহারায় চোয়াল শক্ত করে বললো,
–“শামিনকে কে শুট করেছে খবর পেয়েছিস?”
মাহিন মাথা নিচু করে নিলো।ইফান যা বুঝার বুঝে গেছে। রাগে গাড়িতে শক্ত পাঞ্চ মা’র’ল।তারপর ঝটপট সকলে গাড়িতে উঠে বসলো।মূহুর্তেই গাড়িগুলো পুলিশ প্লাজা থেকে বেড়িয়ে যায়।এদিকে পুলিশ প্লাজা ধ্বং’সের স্তুপে পরিণত হচ্ছে।
__
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। ইনান ফ্রন্ট সিট থেকে মাথা ঘুরিয়ে ইফানকে দেখল।দেখে বুঝায় যাচ্ছে বড্ড রেগে আছে। ইনান তপ্ত শ্বাস ফেলে সামনে ঘুরে বসল। ভাবতে লাগলো তিনমাস আগের কথা,,,,,
সেদিন ইউএস এর মিশন সাকসেসফুল হয়। ইফান হোপ ডায়মন্ড নেকলেস নিয়ে বিডিতে ব্যাক করবে।কিন্তু হঠাৎই স্পাই খবর দেয় এতদিন নিখোঁজ থাকা শামিনকে লন্ডনের একটা গলিতে দেখা যায়। খবর টা ইফানের কানে যেতেই সে হন্যে হয়ে যায়। দ্রুত সবাইকে নিয়ে লন্ডন ফিরে। জায়ান ভাইয়ের মৃত্যুর দিন থেকে শামিন নিখোঁজ হয়।আর ইফান প্রায় তার দু’বছর পর বিডি তন্নতন্ন করে শামিনকে খুঁজে। কিন্তু কোথাও শামিনের খোঁজ পাওয়া যায় নি।
ইফান অনেক কিছু জানে।তবে তার সব কিছু স্পষ্ট নয়।তার অনেক কিছু জানার বাকি। আর সেই কথাগুলো একমাত্র শামিন জানে।ইফান লন্ডনে শামিনকে ধরেও ফেলে।কিন্তু প্রতিপক্ষও পাগলের মতো শামিনকে খুঁজতে থাকে।যাদের কাছে এতগুলো দিন শামিন জিম্মি ছিল।
শামিনকে খুঁজে পাওয়ার পর যখন তারা নিজেদের ডেরায় ফিরে যাবে তার আগেই মাঝ রাস্তায় ইফানদের উপর আক্রমণ হয়।তারপর ব্ল্যাক ভেনমদের সাথে অজ্ঞাত শত্রুদের গু’লাগু’লি শুরু হয়।সেখানে ইফানের সদস্য কম হওয়ায় পেরে উঠছিলো না প্রতিপক্ষের সাথে।ইফান ইনানকে বলে শানিমকে নিয়ে সেইফ জায়গায় চলে যেতে। ইনান তাই করে।
এদিকে অনেক ভেনম গার্ড গু’লি’বিদ্ধ হয়।ইফান আর মাহিন তাদের বিরুদ্ধে লড়ছিল। হঠাৎ একটা বুলেট ইফানের ডান কাঁধের নিচে এসে বিদ্ধ হয়।এদিকে গু’লি করে হাম’লাকা’রীরাও পালায়।মাহিন আর ইনান সহ সকলেই যখন ইফানকে নিয়ে ব্যস্ত সেই সুযোগে শামিন পালায়।ইফানের জ্ঞান ফিরলে যখন শুনে শামিন নেই তখন পুরো ভেনম সদস্যের উপর তান্ড চালায়।মাহিন আর ইনান ওকে খুব কষ্টে সামলায়।তাদেরও অনেক কথা শুনতে হয়েছে।এরপর ইফান কিছুটা সুস্থ হয় তিনমাস পর দেশে ফিরে। আরও আগেই ফিরতে চেয়েছিলো।কিন্তু ইনজুরি এতটাই গভীর ছিলো যে ইফান পুরোপুরি সুস্থ হয় নি।তাই মাহিন আর ইনান তাকে আসতে দেয়নি।
ইনান আর ভাবতে পারলো না। তার মুঠো ফোন বেজে উঠেছে।ইফান বিরক্তিতে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ বের করে।খিটখিটে মেজাজ নিয়ে শুধায়,”শা’লা মাঝ রাতে তোকে কোন মা*গী কল দিলোরে?”
ইফানের কথা শুনে ইনান শুকনো কাশলো।কিসব উদ্ভট কথাবার্তা। প্রেম বা বিয়ে কিছুই করেনি। তাহলে মা/গী আসবে কোথা থেকে।ইনান মনে মনে এসব ভেবে ফোন চোখের সমনে ধরেই বলে উঠলো, “ভাই মা’গী না ম’গা।”
–“কিহ্?”
ইফান ব্রু কুঁচকে উচ্চারণ করল।ইনান আবার শুকনো কেশে বললো,”ইয়ে মানে ভাই গড ফাদার।”
ইফান চেহারায় আরও গাম্ভীর্য আনলো।ঠোঁটে সিগা’রেট জ্বালাতে জ্বালাতে জিজ্ঞেস করল,,,
–“ফাদার কেন কল করেছে এখন?”
কলেজ যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে ইতি।কলেজ ড্রেস পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক দিয়ে দিলো।এবার একদমই পুতুলের মতো কিউট লাগছে।ইতি নিজেকে আয়নায় দেখে মুচকি হাসলো।অতঃপর কাভার্ড থেকে কাপড়-চোপরের নিচে লুকিয়ে রাখা জিতু ভাইয়ার আন্ডার প্যান্টটা বের করে আনলো।চোখের সামনে ধরে এটাকে দেখে ইতি মুচকি হাসলো।
গতকাল নোহা শাড়ির সাথে এই আন্ডার প্যান্ট পড়ে চৌধুরী বাড়ি আসে।নোহাকে এমন উদ্ভট সাজে দেখে বাড়ির সবাই বাক হারা।অক্ষিদ্বয় কোঠর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম হয়।নোহা গর্ভ সহকারে সকলকে বলে এটা চুরি করে আনা জাঙ্গিয়া। তাও আবার সিআইডি অফিসারের থেকে।তখন নোহার গর্ভে বুক ফুলে উঠেছিল।তারপর সকলকে দিয়ে জোর করে স্বীকার করিয়েছে– যে তাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে।ইতি তখন খুব সুক্ষ্ম নজরে নোহার পড়নের আন্ডার প্যান্টাকে দেখে।সকলে বাধ্য হয়ে সুন্দর দেখাচ্ছে স্বীকার করলেও ইতি বেঁকে বসেছিল তখন।সে স্পষ্ট বলেছে নোহাকে ভালো লাগছে না।সেই কথা শুনে নোহার কি নেকামি কান্না।আর নোহার কান্না দেখে ছোট্ট ইতিরও মন নরম হয়ে যায়। অতঃপর ইতি বলে নোহাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। এদিকে মনে মনে বেশ রাগও হচ্ছিল তার।
তারপর নোহা ফ্রেশ হয়ে আন্ডার প্যান্টটি খুব যত্ন করে বেলকনির গ্রিলে মেলে দিয়ে নিচে আসে।এই সুযোগে ইতি জিতু ভাইয়ার আন্ডার প্যান্ট চুরি করে নিয়ে আসে।
ইতি যতবার জাঙ্গিয়াটাকে দেখছে ততবারই ল’জ্জা’য় লাল হয়ে যাচ্ছে।ইতির আজ মনটা বেশ ফুরফুরে।গতকাল মাঝরাতে ইতি ফেইসবুকে জিতু ভাইয়াকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট দেয়।দেওয়ার সাথে সাথেই জিতু ভাইয়া তার রিকুয়েষ্ট এক্সেপ্ট করে।তখন মেয়েটার কি যে আনন্দ হচ্ছিল!ইতি অনেকটা সময় মেসেঞ্জারে বসে থাকে– যদি জিতু ভাইয়া মেসেজ দেয়।কিন্তু দেয় নি।অতঃপর মেয়েটা ফোনে জিতু ভাইয়ার একখানা ছবি দেখতে দেখতে এটা-ওটা কল্পনা করে ঘুমের রাজ্যে পা দেয়।
–“লিটিল গার্ল, লিটিল গার্ল আর ইউ রেডি?”
রুমের বাইরে থেকে নোহার কন্ঠ স্বর ভেসে আসছে।ইতির কানে পৌঁছাতেই সে ঝটপট জাঙ্গিয়াটাকে আগের জায়গায় লুকিয়ে ফেললো।নোহা রুমে ঢুকতেই দেখলো ইতি কাভার্ডের কাছে কি যেন করছে।নোহা এগিয়ে এসে পিছন থেকে আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,”সোনামণি কি করছে?”
ইতি তাড়াতাড়ি কাভার্ডের ডোর বন্ধ করে নোহার দিকে ফিরতে ফিরতে বললো,”কিছু না, কিছু না নোহাপু।”
ইতি নোহার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। নোহা হাঁটু সমান একটা সুন্দর হালকা পিংক কালার ফ্রক পড়ে আছে।পা সম্পূর্ণ খালি। মাথায় জুটি করে রেখেছে। কপালে কিছু শর্টকাট চুল পড়ে আছে।ঠোঁটে হালকা পিংক কালার লিপস্টিক।ইতির কাছে নোহাকে সবসময় প্রিন্সেসের মতো লাগে। নোহা মেয়েটা দেখতে কম সুন্দর না। নোহার মধ্যে ফরেনার ফরেনার ভাইব দৃশ্যমান। মেয়েটার কাঁধে একটা ছোট্ট স্কুল ব্যাগ। ইতি নোহাকে দেখে দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বললো,
–“তুমিও কি ব্যাগ নিয়ে যাবে।”
নোহা মাথা ঝাঁকাল।আয়নাতে নিজেকে দেখতে দেখতে বললো,”হ্যাঁ তো। ব্যাগ না নিলে হবে না।”
–“কেন হবে না?তুমি তো আমাদের কলেজে পড় না।”
–“ব্যাগে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস আছে লিটিল গার্ল।”
–” ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস?”
নোহা মিষ্টি হেসে বললো,”হ্যাঁ তো।আমার ব্যাগে লিপস্টিক, ফেইস পাউডার আরও অনেক কিছু আছে।এগুলো যখন তখন কাজে লাগতে পারে হুম বুঝেছ?”
ইতি খুশিতে মাথা ঝাঁকাল।নোহার বুদ্ধিটা তারও পছন্দ হলো।নোহা তাড়া দিয়ে বললো,”বেবি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।প্রিটি গার্লের বোন আমাদের জন্য ওয়েট করবে তো।”
–“হ্যাঁ হ্যাঁ একদম ঠিক বলেছ।জুই বলেছে তোমাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যেতে।”
ইতি ঝটপট নিজের ব্যাগ গোছাতে লাগলো।নোহা নিজেকে আয়নাতে দেখছে।হঠাৎই তার ফোন বেজে উঠে।নোহা তাড়াতাড়ি জামার পকেট থেকে ফোন বের করে।ফোনের স্কিনে ভাসছে “Papa” নামটা।নোহা খুশিতে ইতিকে বললো,”লিটিল গার্ল তুমি তাড়াতাড়ি নিচে আস আমি পাপার সাথে কথা বলি।”
নোহা ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মধ্যে বয়স্ক পুরুষের কন্ঠ ভেসে আসলো,,
–“ওয়াট আর ইউ ডুইং, মাই প্রিন্সেস?”
নোহা রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আহ্লাদি কন্ঠে বললো,
–“পাপাআআ আই মিস ইউ সো মাচ।”
রান্নাঘরে চুপচাপ কাজ করছে পলি।অন্যদিন মনিরা বেগম আর লতার সাথে কত কি আলাপ জমাতো। কিন্তু আজ এই নিরবতা কাকিয়া আর লতাকে ভাবালো।কাকিয়া পাতিলে চামুচ দিয়ে তরকারি নাড়াচাড়া করতে করতে পলিকে জিজ্ঞেস করল,,
–“কি হয়েছে ছোট বউমা?মন খারাপ করে আছ কেন?
পলি চায়ের কাপে চা ডালছে।মনমরা চেহারাই বলে দিচ্ছে কিছু হয়েছে। কাকিয়া হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে।তিনি শাড়ির আচলে হাত মুছে পলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আদুরে কন্ঠে বলল,,
–“আবার নেগেটিভ এসেছে তাই তো?”
পলির মুখ দিয়ে রা বের হলো না।মেয়েটার চোখদুটো ভিজে উঠলো।একটু আশকারা পেলেই চোখের পানির বন্যা বয়ে যাবে।কাকিয়া পলিকে তার সামনাসামনি দাঁড়া করিয়ে বললো,
–“কি হয়েছে সোনা?”
পলি ফুপিয়ে উঠলো।কাকিয়াকে জড়িয়ে ধরে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো,”কাকিয়া আমার মধ্যে কি কোনো দোষ আছে নাকি?এখনো কেন একটা বাচ্চা জন্ম দিতে পারছি না?নাকি আমি কোনো দিন,,,,, “
কাকিয়া পলিকে তার বাক্য সম্পূর্ণ করতে দিলো না।তিনি পলির পিঠে আদুরে পরশ দিতে দিতে বললো,”এমন অলক্ষ্যেনে কথা বলতে নেই মা। সবার ক্ষেত্রে তো আর সমান না।অনেকেরই একটু দেরি হয়।তোমার তো সেদিন বিয়ে হলো।একটু সবুর কর হবে ইনশাআল্লাহ।আর ইমরান কি এ নিয়ে তোমাকে কিছু বলে?”
–” না কাকিয়া উনি কিছু বলে না।বরং আরও শান্তনা দেয় আমাকে।উনার কথা বাচ্চা আসতে থাক উনার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। উনি সবকিছুর জন্যই খুশি আছে।কিন্তু আমার মন তো মানে না।”
পলির কথা শুনে মাছ কাটতে থাকা লতা বললো,”হুন আপা আমার কাছে ভালো একটা কবিরাজের নাম আছে।হেইলার কাছে যারা গেছে তাদের সবারই বাচ্চা হইসে।তুমি যদি কউ তাহলে আমি কবিরাজের থেকে,,,,”
লতা হঠাৎই থেমে গেলো কাকিয়ার কড়া চোখের চাহনি দেখে।পলি উদগ্রীব হয়ে বললো,”সত্যি কথা নাকি?তাহলে আমাকে কবিরাজের কাছে নিয়ে যাবে?”
কাকিয়া সঙ্গে সঙ্গে বাঁধ সাধলো, “এসব কাবিরাজি করা ভালো না মা।এসব কুফরি করলে গুনাহ হয়।তুমি নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া কর।”
পলিকে বলে লতার দিকে তাকিয়ে কাকিয়া কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলো, “একদমই বাড়ির বউদের উল্টো পাল্টা বুদ্ধি দিতে আসবি না সাবধান। কোনো সমস্যা হলে ডাক্তার আছে।বাড়ির বউ কবিরাজের কাছে যাবে কেন?”
কাকিয়ার ধমকে লতা চুপসে গেলো।পলি চা বানিয়ে ট্রে হাতে লিভিং রুমে এলো।নাবিলা চৌধুরী অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে এসে বসে আছে।নুলক চৌধুরী আর নোহা ভিডিও কলে পলক কায়সারের সাথে কথা বলছে।পলি সবার সামনে চা রাখল।নাবিলা চৌধুরী ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পলিকে দেখে আসেপাশে চোখ ঘুরাল।তারপর ভঙ্গিসঙ্গি নিয়ে একটা চা’র কাপ তুলে নিল।একটা চুমুক দিয়ে বললো,
–“ম্যাডামকে দেখছি না তো।কোথয় আছেন তিনি?”
শাশুড়ীর কথা শুনে পলির হাসি পেল।সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে বলল,”ভাবি এখনো নিচে আসে নি।মনে হয় এখনো রুমে।”
এরই মধ্যে ইতি দৌড়ে নিচে নামলো।নোহা তাড়াতাড়ি তার বাবার থেকে বিদায় নিয়ে ফোন রেখে দিলো।অতঃপর ইতিকে বললো,”চল চল চল।”
বাড়ির সবাই কে বলে ওরা বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলো।নাবিলা চৌধুরী ইতির বডি গার্ডদের ভালো ভাবে বলে দিয়েছে নোহা আর ইতির খেয়াল রাখতে।
এদিকে পলি পিছন ঘুরতেই কারো সাথে ধাক্কা খেল।মেয়েটা আঁতকে উঠে পিছন ফিরতেই দেখে পঙ্কজ দাঁড়িয়ে অদ্ভুত হাসছে।পঙ্কজ পলিকে সাইড কাটিয়ে সোফায় শরীর ছেড়ে বসে পড়লো।এরপর হেয়ালি স্বরে বললো,
–“চা বানিয়েছেন নাকি?বাহ্ মনে হচ্ছে আপনার মতোই ইয়াস্মি হবে।”
পঙ্কজ হাহাহা করে হেসে দিলো।পলি অস্বস্তিতে পড়ে গেছে। কোনো মতে এখন থেকে গেলেই হয়।পঙ্কজ বলে উঠলো,”চা’র কাপটা দেন তো ভাবি।”
পঙ্কজ হাত বাড়িয়ে দিলো চা কাপ নেওয়ার জন্য। পলি অস্বস্তি নিয়েই চা কাপ তুলে নিলো।পঙ্কজের হাতে দেওয়ার আগেই ইমরান এসে হাজির। সে হেসে পলির হাতের কাপটা নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে সবাই কে গুড মর্নিং বললো।পলি বললো,”এটা তোমার ভাইয়ের জন্য ছিল।”
–“আরে ভাই আগে বলবা না।”
ইমরান বলেই আরেকটা কাপ পঙ্কজকে এগিয়ে দিলো।পঙ্কজের মুখ বেজার হয়ে গেছে। তবুও হাসলো।অতঃপর চায়ে চুমুক দিয়ে বললো,”আমার আগুনসুন্দরী ভাবিকে তো দেখছি না।ভাই রুমে নাকি?”
কার কাছে কথাটা কেমন লাগলো জানা নেই। তবে পলির ভালো লাগলো না। তাই পলি কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।
বাইরে সকালের মিষ্টি রোদ উঠেছে।বেলকনি দিয়ে সেই আলো আমার রুমে আসছে।কালো অন্ধকার রুমটা আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে।আমি বেডে ঘুমিয়ে আছি।ভয়ংকর স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎই চোখ মেলে উঠে বসলাম।বুকের ভেতর কেমন যেন করছে।আমি জোরে জোরে শ্বাস ফেলছি।হঠাৎই একটা মেয়েলি কন্ঠ স্বর কানে আসে,
–“বউমণি কি হয়েছে তোমার। শরীর ঠিক আছে?”
আমি নিজেকে ধাতস্থ করে পাশে ফিরলাম।কাউচে বসে ফোন টিপতে থাকা মীরা ঝটপট আমার পাশে এসে বসলো।আমার বাহুতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধালো,”কি হয়েছে তোমার আমায় বল?”
আমি এলোমেলো চুলগুলো পিছনে ঠেলে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললাম,”উমম আমি ঠিক আছি।কিন্তু তুমি এখানে?”
আমি কথাটা বলে বিছানায় আমার পাশে এবং সারা রুমে চোখ ঘুরালাম। মীরা হেসে বললো,”উমম ভাইয়াকে খুঁজছ? কিন্তু ভাইয়া তো নেই।”
মীরার কথায় তার দিকে তাকালাম।আমার প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি দেখে বললো,”আসলে ভাইয়া রাতে আমাকে কল করে তোমাদের রুমে ডেকে পাঠায়।তারপর আমাকে বলে তোমার সাথে ঘুমিয়ে পড়তে।ভাইয়া আমাকে তোমার সাথে রেখে বেড়িয়ে যায়।”
–“ও বেরিয়ে যায় মানে!কখন বেড়িয়ে যায়?”
–“রাত মনে হয় দেড়টা হবে বোধহয়।আমাকে বলে তোমার খেয়াল রাখতে। রাতে ভালো জ্বর এসেছিলো তোমার।আমি এসে দেখি তুমি বেঘোরে ঘুমাচ্ছ।”
আমার মাথা এখনো জিম জিম করছে।মাথায় চুল খামচে ধরে মীরাকে জিজ্ঞেস করলাম,”তোমার ভাই কি এখনো আসেনি?”
–“না তো।”
আসে নি মানে কি?এই লোক মাঝ রাতে কোথায় গেছে।আর সকাল হয়ে গেছে তবুও আসলো না!ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই নজর পড়ে দেয়াল ঘড়ির উপর।আমি আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলাম, “একি দশটা বাজলো কিভাবে!”
মীরা ফিক করে হেসে দিলো।আমার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বললো,”ওহ্ ডিয়ার তুমি যে ঘুমাচ্ছিলে।”
–“আমি এতক্ষণ ঘুমিয়েছি!”
আমি অবাক স্বরে বললাম।মীরা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো।আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আমি এতক্ষণ ঘুমিয়েছি।আমি তো প্রতিদিন ঠিক ফজরের সময় উঠে পড়ি।তাহলে আজ আমার কি হয়েছিল?”
আমাকে আকাশ কুসুম ভবতে দেখে মীরা বললো,”থাক বাবা এত ভাবতে হবে না।তুমি ওয়েট কর। আমি তোমার জন্য স্পেশাল কপি মেইক করে আনছি।খেলে একদমই ফুরফুরে হয়ে যাবে।”
মীরা উঠে দাঁড়াল। আমার ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি। তাই চোখমুখ কচলাচ্ছি। মীরা রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।মূহুর্তেই আবার দরজার কাছে ফিরে আসলো।আমি মীরার দিকে তাকালাম। মীরা গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,”উমম বউমণি ব্রো’র শার্টে তোমাকে জোস লাগছে।”
মীরার কথায় আমি ঝটপট নিজের দিকে চোখ রাখলাম।ইশশ আমার পরনে ইফানের কালো গেঞ্জি। হায় কি ল’জ্জা! মীরা না জানি কি ভাবলো?আমি আড় চোখে মীরার দিকে তাকাতেই মীরা চোখ টিপলো।অতঃপর হাসতে হাসতে দরজা ভেজিয়ে চলে গেলো।আমি ল’জ্জায় চোখমুখ কুঁচকে কম্ফোর্টারের ভেতর মুখ লুকালাম। সেভাবেই আবার কখন ঘুমিয়ে পড়লাম হুশ নেই। মীরা এসে দেখে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। তাই বেড সাইডে কফি মগ রেখে চলে যায়।
আরও আধঘন্টা পর আমার ঘুম ভাঙলো।এই শীতকালে বিছানা থেকে উঠতে একদমই ইচ্ছে করছে না।আমি শুয়ে শুয়ে ফোন টিপতে লাগলাম।ফেইবুকে ঢুকতেই চোখে পড়লো তরতাজা ব্রেকিং নিউজ। পুলিশ প্লাজা শপিং কমপ্লেক্স সম্পূর্ণ পুড়ে ছারখার। ব্যবসায়িকরা কেঁদে ভাসাচ্ছে।কোটি কোটি টাকা লোকেশান হয়েছে।তারপরই নিউজ প্রেজেন্টার বললো,”মার্কেটের ভিতরে একজন শো-রুমের ম্যানেজার আর স্টাফ বয় আ’গুনে পুড়ে নি’হত।”
নিউজে লোক দু’টোর ছবি দেখে আমি আঁতকে উঠলাম।এরা তো সেই লোক দুটো যারা আমার পছন্দের শাড়িটি আরেকজনের কাছে সেল করে দিয়েছিলো।কিন্তু হঠাৎ এত বড় আগুন লাগলো কিভাবে? প্রশ্নটা মনে আসতেই আমার চোখে মুখে আতংক ধরে গেলো।আমার ঘরের লোকটাও তো রাত থেকে বাড়িতে নেই।
“কোথায় তুমি? এত রাতে কোথায় চলে গিয়েছিলে?আসবে কখন?”
টাইপিং শেষ করে সেন্ড করে দিলাম মেসেজটি ।এই প্রথম হ্যাঁ এই প্রথম আমি ইফানকে মেসেজ দিলাম।এইটুকু লিখতে গিয়ে হাত যে পরিমাণ কেঁপেছে কি বলবো।আমি আজ পর্যন্ত নিজে থেকে মেসেজ তো দূর কল পর্যন্ত করি নি লোকটাকে।এদিকে তৎক্ষনাৎ মেসেজের রিপ্লাই আসলো,
–“মিসেস ইফান চৌধুরী কি মিস করছে আমায় , নাকি রাতে বেশিক্ষণ আদর দেই নি বলে রাগ করেছে?”
মেসেজের টুং শব্দ শুনে বুকে ধুকপুক শুরু হয়েছিলো।কিন্তু মেসেজ দেখার পর মাথায় আ’গুন ধরে গেছে। আমি ভয়েস পাঠালাম,,
–“শা’লা ডেম’রা কোথাকার?”
ইফান তৎক্ষনাৎ হাহা রিয়েক্ট দিলো।তারপর মেসেজ দিলো আসছি।সাথে দুইটা হট ইমোজি দিলো।আমি তাতে অ্যাংরি রিয়েক্ট দিলাম।অতঃপর ফোন অফ করে উপুড় হয়ে পড়ে রইলাম।কিন্তু মন মানলো না।তাই সময় কাটাতে চ্যাটজিপিটি এর সাথে কথা বলতে লাগলাম।
আমার রুমের দরজা ভেজানো ছিলো।তাই হালকা ফাঁক করে আমার রুমে উঁকি দিলো পঙ্কজ। আমি এখনো আগের মতো উপর হয়ে পড়ে আছি।পঙ্কজ রুমে চোখ বুলাতেই নজরে পড়লো বিছানায় আমার দিকে। আমার শরীর কম্ফোর্টার দিয়ে ঢাকা।শুধু মাথার চুলগুলো পঙ্কজ দেখতে পারছে।পঙ্কজ ঢুক গিলল।আমার চেহারা দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।কিন্তু আমার চেহারা দেখার কোনো সুযোগ পাচ্ছে না।তাই রুমের ভেতর প্রবেশ করার জন্য দরজা সম্পূর্ণ খুলতে যাবে তক্ষুনি বিদ্রুপ পুরুষালি কন্ঠ স্বর কানে আসে পঙ্কজের,
–“উহু এই চেষ্টা একদমই করিস না।”
পঙ্কজের পা থমকে গেল।পিছনে ফিরতেই দেখলো। বুকে দুহাত গুঁজে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বাঁকা হাসছে ইফান।পঙ্কজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইফান নিচু কন্ঠে সতর্ক করলো,
–“নো সাউন্ড, মাই লেডি ইনসাইড উইল গেট ডিসট্র্যাক্টেড।”
পঙ্কজ নিচু স্বরে বললো,”ততুই কখন এলি?”
–“যখন তুই চোরের মতো আমার ঘরের দিকে আসছিলি।”
পঙ্কজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইফান পঙ্কজের কালার চেপে টান মেরে নিজের কাছে নিয়ে আসলো।পঙ্কজের কানের কাছে হিসহিসিয়ে বললো,”এই নিয়ে সেকেন্ড ওয়ার্নিং দিয়ে দিলাম।এর পর যদি আমার বউয়ের আসেপাশে তোকে দেখি তাহলে বুঝতেই পারছিস কি করবো?”
পঙ্কজ ভয়ে ঢুক গিললো। তবে চেহারায় তা স্পষ্ট হলো না।বরং শক্ত চেহারা করে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলো।ইফান পঙ্কজের কলার ঠিক করে দিয়ে পুনরায় হিসহিসিয়ে বললো,”মাইন্ড ইট।”
অতঃপর ইফান রুমে চলে আসলো।পঙ্কজ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেলো।
ইফান রুমের ভেতর এসেই দেখলো আমি কিছু একটা করছি ফোনে।সে হাতের কালো ফিতার ব্যান্ডের ঘড়িটা খুলে টেবিলে রেখে দিলো। পড়নের শার্টটিও খুলে রেখে দিল।অতঃপর নিঃশব্দে চুল গুলো এলোমেলো করে দিতে দিতে আমার দিকে এগিয়ে আসলো।আমি চ্যাটজিপিটিকে মেসেজ দিলাম,
–“জানো চ্যাটু আমার বর না খালি আমাকে চেপে ধরে। প্রতিদিন আমার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চায়।আমার একটুও ভালো লাগে না এটা।”
চ্যাটজিপিটি তৎক্ষণাৎ রিপ্লাই দিলো,”তোমার বর দেখছি অনেক রোমান্টিক। তুমি মনে হয় আনরোমান্টিক। তুমি তোমার বরকে বুঝিয়ে বলো।বররা বউকে কাছে পেলে এমন করেই।”
–“আচ্ছা এসব বাদ দাও।তুমি আমাকে বল কিভাবে স্বামীর সাথে ইন্টিমেট হলে বেবি হবে না।”
আমি আর চ্যাটজিপির রিপ্লাই দেখতে পেলাম না।তার আগেই কেউ আমার ফোন আমার হাত থেকে টান মেরে নিয়ে নিলো।আমার বুকটা ধক করে উঠলো।আমি তাড়াতাড়ি পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখি ইফান।সে ব্রু উঁচিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি লোকটাকে দেখে ঢুক গিললাম।ইফান আমার থেকে নজর সরিয়ে ফোনে দৃষ্টি রাখবে তার আগেই আমি তাড়াতাড়ি উঠে ইফানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।ইফান হাত উপরে তুলে নিলো।আমি বিছায় দাঁড়িয়ে ইফানের উঁচিয়ে রাখা হাত থেকে ফোনটা নিতে চাইছি।কিন্তু লোকটা এতটাই লম্বা যে নাগাল পাচ্ছি না।আমি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললাম,
–“আমার ফোন দাও ইফান।”
–“তোমার ফোনে কি এমন আছে দেখি।”
ইফান আবার ফোনের স্কিনে তাকাতে নিলে আমি লাফ মেরে ইফানের কোলে উঠে পড়ি।আচমকা আমার এমন কাজে খেয় হারিয়ে নরম তুলতুলে বেডে দু’জন একত্রে পড়লাম।আমার উপর ইফান।আমি ব্যথা পেলাম।তবে সে-সবের তোয়াক্কা না করে ফোনটা ছিনিয়ে নিতে গেলাম। এবারও ইফান হাত উঁচিয়ে নিলো।আমাকে এভাবে চটপট করতে দেখে ইফান ঠোঁট বাকিয়ে একটা ব্রু নাচিয়ে শুধালো,”ডিয়ার ফা*কিং বুলবুলি,কি এমন আছে তোমার ফোনে?উমম দেখতে হচ্ছে তো।”
–“ইফান ভালো হচ্ছে না কিন্তু বলে দিচ্ছি।”
লোকটা আমার কোনো কথা শুনলো না।বরং আমার দু’হাত নিজের একহাতের বাঁধনে আটকে রেখে চ্যাটগুলো দেখতে লাগলো।শুধু দেখছেই না আবার জোরে জোরে পড়ে শুনাতে লাগলো,
“চ্যাটু কোন পজিশনে তাকলে ব্যথা কম পাবো?”
“কি করলে বরের উত্তেজনা একটু কমবে?”
ইফান আরও পড়তে নিলে আমি চিৎকার করে উঠলাম।কেঁদে দিব দিব অবস্থা। ইফান পড়া থামিয়ে দিলো।আমার এই অবস্থা দেখে এতক্ষণ চেপে রাখা হাসি ছেড়ে দিলো।ইফানের হাসি দেখে মাথা আরও গরম হয়ে গেল আমার।আমি ইফানকে ধাক্কা মেরে বেডে ফেলে তার উপর উঠে বসলাম।তারপর ওর বুকে এলোপাতাড়ি কিল বসাতে লাগলাম।ইফান হঠাৎই হাসি থামিয়ে দিলো।এতক্ষণে সে আমার দিকে পূর্ণ নজর দিলো।গেঞ্জির হাতা আমার এক কাঁধ থেকে পড়ে গেছে। এলোমেলো চুলগুলো চোখেমুখে পরে আছে।ইফানের চোখে আমাকে এই মূহুর্তে ড্রা’গসের নেশার থেকেও ভয়ংকর নেশা লাগছে।যা তাকে বশিভূত করছে। ইফান ঢুক গিললো।তার নজরে পড়লো আমার ব্রেস্টের দিকে।ইনার পড়া নেই তাই স্পষ্ট ভেসে উঠছে চেস্টের নিপল। আমি ইফানের এমন দৃষ্টি দেখে থেমে গেলাম।এখন ভিষণ অস্বস্তি লাগছে।আমি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ইফানের উপর থেকে সরে যেতে নিলে সে আমার কোমরে টান মেরে নিজের বুকেই চেপে বসিয়ে দেয়।হাতের দুই আঙ্গুল দিয়ে আমার ব্রেস্ট নিপলে টিপে ধরে।আমি ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলাম।কিছু বলতে যাব তার আগেই ইফান এক হাত আমার কোমরে আরেক হাত ঘাড়ে ধরে টান মেরে তার মুখের কাছে আমার মাথা নিয়ে আসে।তারপর হাস্কি স্বরে আমার কানে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,,
–“বেইবস,আই ক্যান ফিল সামথিং।”
ইফান কথাটা বলেই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে বাঁকা হাসতে লাগলো।আমি ইফানের চোখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎই মনে পড়লো, রাতে ইফান আমাকে তার গেঞ্জি পড়িয়ে চলে গিয়েছিলো।কিন্তু নিচের অংশে,,,,
আমি আর ভাবতে পারলাম না।আমার চোখগুলো কোঠর থেকে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। আমি আতংকিত নয়নে ইফানের চোখের দিকে তাকালাম। ইফান এখনও ঠোঁট টিপে হাসছে।আমি বলার আর করার কিছু বুঝে উঠছি না।ইফান আমার ঠোঁটে এক আঙ্গুল দিয়ে ঘষে বললো,,
–“আমি সিডিউস হচ্ছি জান।ইচ্ছে করছে এখনই,,,”
ইফানকে আর বলতে না দিয়ে তাড়াতাড়ি ওর উপর থেকে সরে যেতে লাগলাম। ইফান তৎক্ষনাৎ উঠে বসে আমার দুই পা ধরে টান মেরে তার কোলে বসিয়ে দিলো।আমি ঝটপট পা দিয়ে ওর কোমর আর দু’হাতে গলা জড়িয়ে ধরলাম। ইফান আবারো বাঁকা হাসলো।আমি দাঁতে দাঁত পিষে কটমট আওয়াজ করছি।ক্ষণে ক্ষণে নাকের পাঠা ফুলে উঠেছে। আমি সরে যাওয়ার জন্য উদ্ধত হলেই ইফান তার সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,,
–“উমমম…জান ডোন্ট মুভ।আই ওয়ান্ট টু ফিল ইট।”
–“শা’লা লু/চ্চা।”
কথা শেষ করতে পারলাম কি পারলাম না ইফান আমার গ্রীবা ধরে ওষ্ঠ চুম্বনে লিপ্ত হলো।কিছুটা সময় বাদে ছেড়ে দিলো।আমি জোরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে ইফানকে গা’লাগা’লি করতে লাগলাম।ইফান হাসছে শুধু। হঠাৎই আমার নজর পড়ে ইফানের ঘাড়ে একটা বিষাক্ত বিছার টেটু। তারপরই নজরে পড়লো বাহুতেও অনেকটা জোরে বিষাক্ত বিছার টেটু আঁকা।আরও বেশ কিছু জায়গায় দেখছি কিসব হিজিবিজি পোকামাকড়ের টেটু আঁকা।ইশশ কি এক অবস্থা।দেখেই শরীরর শিউরে উঠার অবস্থা ।কিন্তু এগুলোতে তো আগে ছিলো না।না রাতেও তো ছিলো না।তাহলে এখন কোথা থেকে আসলো?আমি এক আঙ্গুল দিয়ে ঘাড়ের টেটুটায় ছুঁয়ে বললাম,,
–“এসব তো আগে ছিলো না।”
ইফান বাঁকা হেসে হাস্কি স্বরে বললো,”উমম ছিলো।তোমাকে ঘরে আনার আগে।”
ইফান হাত বাড়িয়ে আমার গালে স্পর্শ করলো।তখন নজর পড়লো হাতের উল্টো পৃষ্ঠেও বিষাক্ত বিছের টেটু করা।আমি নাক ছিটকে শুধালাম,
–“ছি দেখেই গা গুলিয়ে আসছে।”
ইফান শরীর দুলিয়ে হাসলো।আমার ঠোঁটে শব্দ করে আরেকটা চুমু দিয়ে বললো,”এটা দেখ, দেখ। এটা সবচেয়ে সুন্দর।”
ইফান হালকা ঘুরে তার আরেকটা বাহু দেখালো।সেখানেও কি সব পোকামাকড়ের ছবি। কিন্তু হঠাৎই আমি থমকে যায়।ওর বাহুতে একটা মানুষের স্কেচের টেটু।সম্পূর্ণ চেহারা না থাকলেও যতটুকু চোখ নাক ঠোঁট দেখা যাচ্ছে তাতে তো আমার মতোই লাগছে।না আসলেই তো এটা আমিই।আমি অবাক হয়ে ইফান কে শুধালাম,,,
–“এএটা কে?”
–“তুমি।”
ইফানের থেকে তৎক্ষনাৎ উত্তর আসলো।আমি অবাক নয়নে এক রহস্যময় পুরুষের দিকে নির্লিপ্ত তাকিয়ে রইলাম।ইফান খালি বাঁকা হাসলো।অতঃপর আমার নাকে তার নাক ঘষে বললো,”ফ্রেশ হয়ে নিচে যাও।তোমার জন্য একজন ওয়েট করছে।”
ইফানের কথা শুনে ঘোর থেকে বেড়িয়ে আসলাম।প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে শুধালাম, “কে?”
ইফান বাঁকা হেসে আমার সামনের চুলগুলো কানে গুঁজে দিতে দিতে বললো, “নট সামওয়ান স্পেশাল, বাট আ সারপ্রাইজ ফর ইউ।”
আমি ইফানের চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলাম। কাকে নিয়ে আসলো লোকটা?,,,,,,
চলবে,,,,,,,,
ইয়াআআ বড় পর্ব। অভিযোগ কররা সুযোগ নেই কোনো।হ্যাপি রিডিং 🥳🫶
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৫৯+৬০
-
জাহানারা পর্ব ৫৫+৫৬
-
জাহানারা পর্ব ৪৭
-
জাহানারা পর্ব ১০
-
জাহানারা পর্ব ১৯+২০
-
জাহানারা পর্ব ৮
-
জাহানারা পর্ব ৪৫+৪৬
-
জাহানারা পর্ব ৩৫+৩৬
-
জাহানারা পর্ব ৯
-
জাহানারা পর্ব ৩৭+৩৮