বজ্রমেঘ . ❤
পর্বসংখ্যা_২৫ .
ফাবিয়াহ্_মমো .
আক্রোশে ফেটে পড়ছে শাওলিন। রাগে রক্তাভ দেখাচ্ছে মুখ। চোখের কোলে আসন্ন অশ্রুর পূর্বাভাস। নিচের ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে খিঁচে আছে ও। রুমের দরজাটা ধাম করে লাগাবে তা যেন আর পারলই না। কপাল কুঁচকে গেছে। কী হল? দরজা লাগছে না কেন? কী সমস্যা? কী ঝামেলা? চোখে অশ্রু আসি আসি ভেজা ভাব নিয়ে দেখল দুহাতে ঠেললেও দরজাটা লাগছে না। নবের ঘরটায় সিলভার নবটা বসাতে চাইছে, কিন্তু কী একটা শক্তি জোরপূর্বক বাঁধা দিচ্ছে আঁটকাতে। এবার চোখ নিচু করতেই আসল কীর্তিটা দেখতে পেল শাওলিন। দরজা ও পাল্লার মাঝের ফাঁকটাতে হাত! একটা মানব হাত! একহাতেই ভয়ংকর ভারি দরজাটা খামচে ধরে আছে কেউ। মেজাজ তপ্ত রেখেই দরজা ঠেলা হাতদুটো শিথিল করল শাওলিন। অমনেই দরজাটা সামান্য খুলে গিয়ে বাইরের দীর্ঘদেহি প্রকাণ্ড অবয়ব স্পষ্ট হল। বুকটা চিনচিন করে উঠল ওর! মৃদু শিরশিরে কেঁপেও উঠল। দুপুরের সেই নেভি ব্লু পোশাকটাই পরে আছে মানুষটা। চেহারায় নেই ক্লান্তি, জার্নি, ধকলের চিহ্নছাপ। ডান ভ্রুঁয়ের কাঁটা দাগটা সামান্য উঁচু করে বলল,
- ভেতরে আসতে দাও। এমন দুর্ব্যবহার কোরো না শাওলিন। সব কথা বোঝানোর মতো সিচুয়েশনটা রাখো। মেজাজটা হাইপার করে কিছুই শুনতে পাবে না। কাজেই শান্ত হও। এবং এক্ষুণি। পিছিয়ে যাও, দরজায় ধাক্কা খাবে।
উপর্যুপরি মেজাজে সাবধান করে বলল শোয়েব। চোখ অনড়, হাতের বাইসেপ্স ফুলে ওঠে দরজাটায় জোর ধাক্কা লাগাল সে। কিছুটা পিছিয়ে অটল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেল শাওলিন। চোখে তেজের স্ফুরণ ঘটছে। চোখ টলোমলো। বাঁহাত পাশের টেবিলটায় কী যেন খামচে ধরতে উদ্যত। শোয়েব তখন ওর দিকেই এগোচ্ছে, কিন্তু সেসময় আরো একটা দৃশ্য দেখে তীক্ষ্মভাবে সতর্ক হয় সে। কাঁচের ফুলদানিটা পাঁচ আঙুলে খামচে ধরেছে এই মানবী। চোখটা সরিয়ে ওর ক্রুদ্ধ চাহনিতে নজর বিদ্ধ করে বলল শোয়েব,
- ওসব বস্তু অন্যের ওপর ভেঙো শাওলিন। কোনো নিষেধ নেই, বাঁধা নেই, সোজা অনুমতি পাচ্ছ। কিন্তু আমার ওপরে প্রয়োগ নয়, রাখো। ওটা ওদিকে রাখো বলছি। তুমি—
তর্জনী উঁচিয়ে ঠোঁট শক্ত করে ফেলল শাওলিন। কাজল টানা চোখে টলটলে অশ্রুরা গাল গড়িয়ে ঝরছে। চোখে যেন বিশ্বাসঘাতকতার ছাপ। গলার ছোট্ট ঢোকটা বহুকষ্টে যেন নামল নিচে। শোয়েব ওর উজ্জ্বল গলাটায় সে দৃশ্যটুকু দেখল তখন। ও চোখদুটো কেমন স্থির করে কঠিনস্বরে বলল,
- বেরিয়ে যান, এক্ষুণি! একটাও কথা বলবেন না আমার সামনে! আপনার জবাবদিহি শোনার মেজাজে আমি নেই। আমাকে ভুল বক্তব্য বোঝানোর চিন্তা আপনি করবেন— বেরিয়ে যান! চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যান এক্ষুণি!
শেষ শব্দটা তীব্র চিৎকারে ঝাঁঝিয়ে বলল শাওলিন। স্থির চোখদুটো ঝাপসায় টলটল করে ঝরছে। দুফোঁটা মোটা অশ্রু গাল গড়িয়ে চিবুক ছুঁয়ে ঝরল ফ্লোরে। অবস্থা সমীচীন দেখেও অদ্ভুত স্থিরতায় শান্তই থাকল শোয়েব। সামান্যতম উত্তেজনা তার স্থৈর্য চেহারায় আঁচ ফেলল না। ভারি দম টেনে সেটা ছাড়তে ছাড়তে বলল,
- রাগ জায়েজ। অস্বীকার করার সুযোগ নেই তুমি রেগে আছ আমার ওপর। আমার ওপর প্রচণ্ড খেপে থাকাটা তোমার অধিকার। কিন্তু আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে তোমায় শাওলিন। বিপরীত দিকের মানুষ কী বলতে এদিকে এসেছে, কেন সবটা শুরুতেই জানাল না, সেটাও শুনতে হবে স্রেফ তোমারই। কাজেই চিৎকার করে পরিবেশ খারাপ কোরো না। কথা শোনো আমার।
কথাগুলো শান্তস্বরে বলেই দুহাত আত্মসমর্পণ ভঙ্গিতে শূন্যে তুলল শোয়েব ফারশাদ। যেন নিজেকে বুঝিয়ে দিল সে উপযুক্ত দোষী, সমস্ত ভুল ও অপরাধ একমাত্র তারই। কিছুটা থেমে ফের শুরু করল কথা বলতে। এবার সেটা যেন অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে,
- দরজা বন্ধ করে কথাবার্তা বলাটা বেশ জঘণ্য। তুমি আমার বিবাহিতা নও। নিশ্চয় চার দেয়ালে আবদ্ধ থাকার সম্পর্ক তোমার সঙ্গে এখনো পাকা হয়নি। নিশ্চয় জানো, এই মুহুর্তে যে কেউ চলে আসতে পারে। কেউ যদি শোনে আমি দাদীর কাছে না গিয়ে তোমার ঘরে এসেছি, এটা ভালো আভাস দিবে না। যতক্ষণ দরজা খোলা রেখে কথা বলছি, ততক্ষণ অবধি শোনো শাওলিন। আমি স্বীকার করছি আমার ভুল। আমার সমস্ত দোষ, এবং একমাত্র তোমার রাগের কারণ আমিই। আমি তোমাকে সম্পর্কের জায়গাগুলো খুলে বলিনি। কিন্তু এটা এমন এক প্রসঙ্গ, যা তোমাকে গাড়িতে খুলে বললে তুমি নিশ্চয়ই স্বাভাবিক থাকতে পারতে না। আর আমি চেয়েছিলাম তোমার সঙ্গটা নীরব-সরব সবভাবেই উপভোগ করতে। যেমনটা, খাগড়াছড়িতে একটা সময় কাটিয়ে এসেছ।
কথাগুলো বলার ফাঁকে ফাঁকে সমুখে পা বাড়াচ্ছিল শোয়েব। ওদিকে তর্জনী তখনো উঁচু করা শাওলিনের, কিন্তু আঙুলটা তখন থরথর করে কাঁপছে। চোখের কোলদুটো অশ্রুতে থইথই, নিচের ঠোঁটে দাঁত চেপে কঠোর। ঠোঁটের নিচে ছোট্ট থুতনিটা ক্রমশ কাঁপুনি দিচ্ছে। নাকের অগ্রভাগ রক্তাভ। তবু শোয়েব ঝুঁকিপূর্ণ একটা চেষ্টায় নিজের জায়গা থেকে বলে গেল,
- অতিরিক্ত বুদ্ধিমানরা সবচেয়ে বাজে ধরণের ধোঁকাটা খায়। তারা বুঝে উঠতে পারে না, যাদের সে বিশ্বাস করছে, তারা সেটুকুর কেমন ভয়ানক মূল্য চুকাচ্ছে। তোমার সরল বিশ্বাসটাকে কিছু মানুষ নিজেদের খেলনা বস্তু বানাচ্ছে। যখন মন চাইছে সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে। যখন মন চাইছে সেটাকে চুরচুরে কাঁচের মতো গুঁড়ো করবে রীতিমতো। তোমার সঙ্গে কার কী সম্পর্ক সেটা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কিন্তু অমর্জির বিয়েতে মত কেন? এটা কীসের ভিত্তিতে? নিজের মা বাদে অন্য নারীর উপর অন্ধবিশ্বাস! কেন এটা, শাওলিন?
কথাটা বুলেটের মতো ছুঁড়েই দুহাত আস্তে আস্তে নিচে নামাল শোয়েব। কাছাকাছি এসে পড়েছে ওর। বুকের ঠিক কাছটায় ধরা দিচ্ছে ওর মুখ। ওই মুখ সামান্য উঁচু করে লম্বা উচ্চতার মানুষটার দিকে শক্তচোখে তাকানো শাওলিন। কখন যে ওর কম্পনরত তর্জনীটা নিচে নেমে গেছে তা ওরও খেয়ালে নেই। শুধু দেখতে পাচ্ছে এবার শোয়েবের কপালেও রাগের ছটা। চশমাটা না পরলে বুঝি ওই নীল তীক্ষ্ম চোখ ওর দিকে ধারালো ছুরির মতো ফালাফালা চাহনিতে চাইতো। কিন্তু না, চোখের চাহনি কেমন কঠোর অবস্থা থেকে সহজ অবস্থায় রূপান্তর ঘটে গেল সহসা। নিজের ডানহাত প্যান্টের ডান পকেটে ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করল শোয়েব। ধবধবে সাদা পরিষ্কার রুমালটা ভাঁজ খুলে ওর আর্দ্র গালে আলতো করে ছোঁয়াল। একফোঁটা বড়ো অশ্রু, সঙ্গে কাজল গলা কালো রঙ, দুটোই শুভ্র রুমালে অশ্রু-কাজলের চিহ্ন এঁকে দিল। রুমালটা যে নষ্ট হল কাজলের কালো কলঙ্কে, তা শোয়েবের কাছে গ্রাহ্যই হল না। ভেজা ডানগালটা রুমালের শুষ্কতায় মুছে দিল ওর। এই সুযোগে ওর মসৃণ উজ্জ্বল ত্বকে আঙুল ছোঁয়াল শোয়েব। যদিও রুমালের ওপাশে সেই নরম-কাতর ত্বক, আর এপাশে রুক্ষ কঠিন আঙুল। এমন সময় শোয়েব খেয়াল করল পিছিয়ে যাচ্ছে শাওলিন। প্রশ্নাত্মক চাহনি ফুটাবে তার আগেই বীভৎস বিস্ফোরণটা ঘটে গেল! চোখের পলকে ভয়ংকর ভারি আওয়াজে ভাঙচুর হল কিছু। কাঁচের চূর্ণবিচূর্ণ আওয়াজে সমস্ত ঘর ফেটে পড়লেও চোখ কুঁচকে আঘাতটা সহ্য করল শোয়েব। বাঁহাতটা তৎক্ষণাৎ নিজের ডান বাহুতে উঠে গেছে। প্রবল যন্ত্রণায় অসাড় অনুভব হচ্ছে জায়গাটা! চশমা পরা চোখ শাওলিনের দিকে ছুঁড়তেই সহনশীল ঠাণ্ডা মেজাজেই বলল,
- কী পরিমাণ অন্ধ তুমি নিজেই ভাবো। তোমাকে এলাম চোখ খুলে দিতে। তুমি আমাকেই আঘাতটা করে দিলে।
তপ্ত উনুনের মতো টগবগ করছে ক্রোধ। ক্রোধের অঙ্গারে তখনো ক্ষোভিত মুখে চেয়ে ছিল শাওলিন। নিজের নিয়ন্ত্রণহীন মেজাজ আজও সামলাতে হিমশিম খায় ও। এমন বীভৎস কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে, যা কল্পনাতীত আজও। চোখটা ঝাপসা দৃষ্টিতে টলটল করতে থাকলে হঠাৎ ডানচোখ থেকে টুপ করে একফোঁটা অশ্রু গড়াল। সেই ফাঁকেই যেন দেখতে পেল কত বড়ো বিপজ্জনক কাজটা করে ফেলেছে। ফুলদানি ভাঙার বিকট শব্দে দোতলায় প্রচণ্ড শোরগোল পড়ে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে ধুপধাপ আওয়াজ। কয়েক মুহুর্তের জন্য দুহাতের তেলোয় নিজের ক্ষিপ্ত, ত্যক্ত মুখটা ঢেকেছিল ও। যখন হাত সরিয়ে চোখ খুলে তাকাল, তখন দেখল পুরো ঘর ফাঁকা। শূন্য ঘরে কেউ নেই! চলে গেছে অজ্ঞাতসারে।
.
রাত পৌণে দশটার সময়। দোতলার একপাশে বিরাট বড়ো খাবার ঘরে জড়ো হয়েছে দ্বিতীয় স্তর। প্রথম স্তরে খাওয়ার পাট চুকেবুকে গেছে বড়োদের জন্য। দ্বিতীয় স্তরে লম্বা টেবিলজুড়ে যার যার চেয়ার টেনে বসেছে বারোজন। রেবেকা খাবার বেড়ে দেয়ার দায়িত্ব নিয়োজিত। সঙ্গে আছে দুটো ভৃত্য শ্রেণীর মহিলা। সদ্য পাকাপাকি হওয়া আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের পর বর-কণে একসঙ্গে খেতে বসেছে পাশাপাশি। পর্যাপ্ত দূরত্ব দু চেয়ারের মধ্যবর্তী স্থানে রেখে নিজের নির্বিকার সত্তা বজায় রেখেছে শাওলিন। বাঁপাশেই বসেছে তাহমিদ। বারবার প্লেটে এটা ওটা চেয়ে রেবেকাকে ডাকার উছিলায় চেয়ারটাকে কাছে আনছে সে। বিষয়টা সাদা চোখে সচল মস্তিষ্কে ধরতে পারছে শাওলিন। কিন্তু নিজের চেয়ারটা আর পাশে চাপানোর মতো জায়গা অবশিষ্ট নেই। ওর ডানপাশে তাহিয়া বসা। সম্পর্কে তাহমিদের সেজো মামাতো ভাইয়ের বউ। অথচ এতোদিন ও চিনতো বনকর্মী লোকটার আপন সেজো ভাবী রূপে। শুকনো গলায় ঢোক গিলে চুপচাপ প্লেটের খাবারটুকু শেষ করার চিন্তা করল শাওলিন। কিন্তু পারল না। পাশ থেকে আবারও কর্কশ গলায় ডাক ছুঁড়েছে তাহমিদ,
- ক্যাশুনাট সালাদটা পাস করো প্লিজ!
আরেকধাপ ঠেলে চেয়ারটা প্রায় নিকটে এনে ফেলল তাহমিদ। হাঁটুতে, পায়ে, উরু থেকে উরুতে স্পর্শ লাগছে এবার। বিকৃত আনন্দে চোখ, ঠোঁট উদ্ভাসিত দেখাচ্ছে তার। ব্যাপারটা টেবিলের অপরপ্রান্ত থেকে পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে দেখছিল শোয়েব। চাইলে এক্ষুণি গা ঘেঁষে বসার শিক্ষাটা বুঝিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক আগে নিজের ডান বাহুতে যে কঠিন জব্বর বখশিশটা পেয়েছে, সেটার দরুন এই মুহুর্তে কিছু করার চিন্তা ফলাচ্ছে না। ঠোঁট থেকে পানির গ্লাস নামিয়ে খাবারে সরাসরি মনোযোগ দিল শোয়েব। চোখে চশমা থাকার দরুন একটা আড়াল ভঙ্গির চাহনি ছুঁড়ে ফুপাতো ভাইয়ের নির্লজ্জপণা দেখতে থাকল সে। তাহমিদ সালাদের বোলটা নিতেই ডান বাহুটা ইচ্ছে করে শাওলিনের গায়ে চেপে দিল। ব্যাপারটা এমন যেন ভুলবশত লেগেছে। এদিকে তাহিয়া বাঁ চোখের কোণ দিয়ে শাওলিনের অবস্থা দেখছিল। কী ভেবে অন্যদিকে সাবধানে চাহনিটা ছুঁড়ল তাহিয়া। সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে শোয়েবের চোখটা প্রায় বিদ্ধ হল বুলেটের মতো! খানিক চমকে উঠতে গেল তাহিয়া। আমতা আমতা ভাব ফুটিয়ে অনিচ্ছুক হাসি ছুঁড়তেই শোয়েব খাবার চিবোতে চিবোতে চক্ষু ইশারা বোঝাল। চোখটা একবার ডালের বোলটায় ফেলল, এরপর টেবিল ক্লথ, এরপর পানির জগটায় নজর বুলিয়ে নিজের মতলব বোঝাল। দূর থেকে অমন দূরভিসন্ধি বুঝতে পেরে বিস্ময়ে ঢোক গিলল তাহিয়া। কী করতে চাইছে! না না! তাড়াতাড়ি মাথাটা ডানে-বামে নাড়িয়ে নিষেধ করল তাহিয়া। চোখে চোখে বলতে চাইল দেবরকে,
- সবাই এখানে আছে শোয়েব। অমন কিছু করলে তৎক্ষণাৎ বুঝে যাবে। কিচ্ছু কোরো না! আমি দেখছি! আমি দেখছি শোয়েব! আমি এক্ষুণি ওকে সরিয়ে দিচ্ছি, দাঁড়াও! আমার চেয়ারে বসানোর দ্রুয় ব্যবস্থা করছি! থামো!
মাথাটা একদম হালকা সীমায় ‘না’ বোঝাল শোয়েব। অর্থাৎ সে চেয়ার বদল চায় না। অতো সভ্য হিসেব তার পছন্দ নয়। হতাশায় ফোঁস করে দম ছাড়লে বাধ্য হয়ে সম্মতিটা দেয় তাহিয়া। ঢোক গিলে আড়নজরে দেখতে লাগল, শাওলিনের হাঁটুতে বারবার একটা বিশ্রী ধাক্কা লাগছে। মুখে খাবার নিয়ে আর চিবোতে পারছিল না শাওলিন। রাগে ঝিমঝিম করছিল সর্বশরীর! কঠোর কিছু বলার জন্য উদ্যত হবে, এমন সময় ওর চোখ গেল সামনের দিকে। ওঁত পেতে থাকা বুনো জানোয়ারের মতো তাকিয়ে আছে শোয়েব। মাথা নিচু, কিন্তু চশমার ওপর দিয়েই এমন চাহনি ছুঁড়েছে, শাওলিনের আর বুঝতে বাকি রইল না কী ঘটতে চলেছে! দমবন্ধ হয়ে এল তৎক্ষণাৎ! দ্রুত তাহমিদের দিকে তাকাবে তার আগেই ধোঁয়া ওঠা ডালের বোলটা সজোড়ে ছিঁটকে এল সহসা! সদ্য চুলা থেকে নামানো গরম ডালটা তাহমিদের ডানহাত ঝলসে পড়ল! তীব্র আর্তনাদে প্লেট উলটে দাঁড়িয়ে পড়েছে তাহমিদ। এদিকে শাওলিন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তাহিয়ার হাত খামচে স্থির! তাহিয়াও অবস্থা সমীচীন দেখে শাওলিনকে নিজের দিকে টেনে রেখেছে, যেন তাহমিদের ওপর উক্ত আঁচটা ওর উপর না আসে। এদিকে চামড়া জ্বলার বীভৎস যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল তাহমিদ, অনবরত ডানহাতটা ঝাঁকা দিতে দিতে চিৎকার করে বলল,
- বরফ, বরফ লাগবে আমার! কেউ বরফ আনো!
কথাগুলো বলতে বলতেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল তাহমিদ। ওর পিছু পিছু ছুটে গেল আরো কিছু ব্যক্তি। রেবেকা তৎক্ষণাৎ রান্নাঘরের দিকে ছুটেছে বরফ নিয়ে আসতে। অন্যদিকে বিচলিত মুখে উপস্থিত বাকিরা ফের খাবার টেবিলে বসে পড়েছে। কিন্তু এবার বিপত্তি পড়ল শাওলিনের দিকে। ডালের বোলটা উপুড় হয়ে ওর দিকের প্লেট ও টেবিলটা নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি খাওয়াটুকু যে শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পণ্ণ করবে, তা ওই আসনে বসে সম্ভব নয়। এমন সময় তাশফিয়া বিষয়টা লক্ষ করলে ঝটিতি চটপট বলে উঠল,
- ভাবী? তুমি ওই চেয়ারে আর বোসো না। তাহমিদ ভাইয়া ডালের বোল উলটে যে অবস্থা করেছে সেখানে আর বসাই যাবে না। টেবিল ক্লথ চুয়ে ডালের ঝোল গড়াচ্ছে, এভাবে তোমার জামার হাতাটা হলুদ হয়ে যাবে। তুমি উঠে ওই চেয়ারটায় বোসো ভাবী। আমি বুয়াখালাকে ডেকে দিয়েছি।
তাশফিয়ার কথায় নজর ঘুরল শাওলিনের। যে চেয়ারটায় তাশফিয়া ইঙ্গিত করে দিল, সেদিকে তাকিয়ে মুখে রক্তবর্ণ ছাপ পড়ল ওর। জায়গাটা শোয়েবের বাঁদিকের আসন। একমাত্র ওই চেয়ারটাই তাহমিদের পরপর খালি হয়ে গেছে। শাওলিনকে ইতস্তত করতে দেখে তাহিয়ার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপল। গলাটা খাকারি দিয়ে গম্ভীরসুলভ মেজাজে বলে উঠল,
- উনি সম্পর্কে তোমার ভাসুর হন। চেনো তো তুমি? একটু আগে পরিচয় হয়েছে না? যাও, বসে খাওয়াটা শেষ করো। রাত অনেক হচ্ছে। তাহমিদের হাতটার যে কী হলো!
মুখে কেবল খাবার পুড়েছিল শোয়েব। তাহিয়ার অমন ইতরবিশেষ ফাজলামিতে শোয়েব খাবার চিবাতে পারল না। মুখ নির্বাক! কে ভাসুর? নিজের আপন ভাবী এই মর্মান্তিক ক্ষতিটা করল? এটা বিশ্বাসযোগ্য? কার সামনে কী উচ্চারণ করল? এই মেয়ের এখন রাগ উঠলেই ভাসুর ভাসুর অস্ত্রটা চালাবে! শোয়েব খাবারটা গলা দিয়ে নামাতে পারল না। এদিকে তাহিয়া জব্বর হাসিটা আঁটকানোর যুদ্ধ করছে। ভাগ্যিস কেউ তাকায়নি তাহিয়ার দিকে, নয়ত সবাই হাঁ করে ভাবতো হাসার মতো কী হয়েছে! শাওলিন ততক্ষণে প্লেট নিয়ে উক্ত চেয়ারে বসে পড়েছে। ডানে তাকায়নি একবারও। দেখেনি একঝলক। যেন ডানে কোনো অস্তিত্ব বসে নেই। প্লেটের সবটুকু ভাত একটুখানি লেবু চিপে পাঁচমিশালি সবজি দিয়ে মাখাচ্ছে, এমন সময় ডান কানের কাছে ফিসফিস করল বজ্রগম্ভীর কণ্ঠ,
- তোমার মাখানো খাবার থেকে দু লোকমা নিলাম!
বলতে বলতেই দস্যুর মতো দু খাবলা গাপ করে দিল লোকটা। নিজের প্লেটে ওর মাখানো খাবার তুলে নিল অনায়াসে। সেটুকুই খেল পরম তৃপ্তি নিয়ে। যেন এতোক্ষণ অপেক্ষায় ছিল, কখন ওই চেয়ার থেকে এই চেয়ারে চলে আসবে। কখন ওই সাহচর্য থেকে এই সাহচর্যে বাঁধা পড়বে। কখন ওর কাছ থেকে একটুখানি অংশ চেয়ে নিবে সে! শাওলিন অমন কাজে কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু চেয়ে দেখল, ওর মাখানো খাবারটুকুতে লোকটার নীরব তৃপ্তি। প্লেটের বাকি খাবারটুকু তার প্লেটে রেখে দিবে কী?
.
রাত ঘন। ভাঙা চাঁদের আলো জানালার গ্রিল গলে ঢুকছে। বাইরে হিমেল হাওয়ার চঞ্চলতা। বাতি নেভানো বলে সমস্ত ঘর ঘুটঘুটে আঁধারে ডুবো। বিছানায় সটান লম্বা হয়ে, বাঁহাতের তেলোটা মাথার নিচে দিয়ে, চোখজোড়া চশমাহীন করে ছাদমুখো ফ্যানটায় তাকিয়ে আছে শোয়েব। ঘুম নেই আর স্বচ্ছ নীল চোখে। অপলক চাহনিতে ভাবছে বহুকিছু, নানা কথা, বিবিধ যুক্তি। মির্জা বংশের শেষ ঠিকানা উঠে গেছে বহু যুগ পূর্বে। সেই বংশের একমাত্র কন্যা ছিল তাহমিনা ফুপু। একরাতে নামাজের জন্য দাদা উঠে দেখলেন মেয়ের ঘরের দুয়ার খোলা। হাঁট করে কখনো দুয়ার খোলা দেখেননি দাদা খোরশেদ মির্জা। কী ভেবে অযু করার ইচ্ছাটা বিলম্ব দিয়ে ঘরটায় ঢুকলেন তিনি। মুহুর্তেই চোখের সামনে ধরা দিল সবটুকু নগ্ন সত্যি। কুমারি মেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। টেবিলের উপর জগের নিচে একটি ভাঁজ করা সাদা চিঠি। ওসময় দাদার চলছিল দূর্যোগকালীন সময়। ব্যবসায় ভরাডুবি, বাড়িটা বন্ধক, নিবিড় বন্ধুত্বে ধোঁকা, সমাজে মেয়ে পালানোর নিন্দা বাক্য। দাদা মুষড়ে পড়লেন। শক্ত-সমর্থ ব্যক্তিত্বের মানুষটা বাস্তবতার কষাঘাতে নুইয়ে পড়ল। সেদিনের পর দাদা আর কখনো ফুপুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। একপ্রকার ত্যাজ্য ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এরপর জীবনের শেষ বয়সের অন্তিম দিনগুলোতে মাফ করলেন ফুপুকে। সব আগের মতো ঠিক করে দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। আজ সেই ফুপুর বাড়িতেই বহু যুগ পর এভাবে বিশ্রাম নিচ্ছে শোয়েব। বাবা ফারদিন, মা দিলশাদ যদি আজও বেঁচে থাকতেন, তবে কেমন হতো আজকের দিনটা?
চট করে নজর গেল নিজের বন্ধ ল্যাপটপের দিকে। চার্জারটা গাড়িতেই রয়ে গেছে। আনা হয়নি এখানে। উন্মুক্ত দেহে একটি আর্মি গ্রিন টিশার্ট চাপিয়ে বেরল শোয়েব। তাহমিদের কাছে চার্জার থাকবে নিশ্চয়। সেই সঙ্গে দেখে আসবে ওর হাত কতখানি ঝলসানো সম্ভব হল। এদিকে নিজ ঘরে বিছানায় বসে দেয়ালে হেলান দিয়েছে তাহমিদ। কোলের ওপর খোলা ল্যাপটপ। সেখানে কিছু একটা দেখার প্রত্যাশায় অস্থির। কিন্তু না, এখনো আসেনি। হতাশ হয়ে সেই হোমস্ক্রিন থেকে বেরিয়ে অন্য একটাতে ক্লিক করল। অমনিই পুরো ল্যাপটপ জুড়ে ভেসে উঠল কিছু অশ্লীল দৃশ্যপট। পশ্চিমাদের বাজে বিকৃত খারাপ কাজ অবলীলায় উপভোগ করছে তাহমিদ। চরম উত্তেজিত এক দৃশ্য যখন এল, ঠিক তখুনি দরজায় ঠক্ ঠক্। চকিতে চোখটা ওদিকে ঘুরে গেলে ধপ করে বিছানা থেকে নামল মর্তুজা। নব মোচড়ে দরজা খুললে বাইরে দেখল শোয়েব। মুখে মেকি হাসি ঝুলিয়ে সৌজন্য কণ্ঠে বলল,
- কী ব্যাপার? এত রাতে অধমের কাছে কিছু দরকার? এসো ভেতরে এসো।
ঘরের বাইরেই দাঁড়াল শোয়েব। কী একটা কারণে ভেতরে এল না। পকেটে দুহাত গুঁজে ভেতরের ঘরটা বেআব্রুর মতো ছেঁকে দেখছে সে। সেই ভঙ্গিতেই হালকা প্রাবল্যে জবাব দিল শোয়েব,
- তোমার কাছে চার্জার হবে? আমার ল্যাপটপ শাট ডাউন। চার্জারটা গাড়িতে রয়ে গেছে। এই মুহুর্তে নিচে নামার ইচ্ছে নেই। আপাতত সাহায্য হিসেবে এটাই করো। গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাগলে সেটা আমিই চেয়ে নিব।
শেষ কথাটা ইঙ্গিতে ছুঁড়ে তাহমিদের দিকে নজর ফেরাল শোয়েব। কথা শুনে রসিকতায় হো হো করে হাসলো তাহমিদ। ঘরে ঢুকে ডেষ্কের কাছে চার্জার যখন খুঁজছিল, তখন দরজার বাইরে ভ্রুঁ কুঁচকালো শোয়েব। কিছু একটা দেখতে পাওয়ায় সাবধানে নিজের দৃষ্টিটা পরোখ সীমায় রেখে দিল। বিছানায় খোলা ল্যাপটপ, সেখানে যে দৃশ্যলীলা চলছে তা প্রত্যক্ষ করে নির্লিপ্ত রইল শোয়েব। বুঝতে দিল না তাহমিদকে, সে যে বিছানায় তাকিয়ে কিছু একটা দেখে ফেলেছে। তাহমিদ ততক্ষণে চার্জার এনে হাজির। সেটা বুঝে নিতেই দ্রুতবেগে নিজের ঘরে এসে সব প্রস্তুত করল শোয়েব। চার্জারটা সংযোগ করে মুহুর্তের ভেতর ল্যাপটপটা চালু করে নিল। কয়েকটি মিনিট পূর্ণ ধ্যানে কিছু একটা করল সে, এরপরই আয়ত্তাধীনে এল অন্যের ল্যাপটপ। পাশের ঘর থেকে তাহমিদ যা দেখছে, যেখানে ক্লিক করছে, সবটা নিজের ল্যাপটপে দেখতে পাচ্ছে তখন শোয়েব। ল্যাপটপের একটা নির্দিষ্ট দিকে বহুবার ক্লিক করছে তাহমিদ। কিন্তু জিনিসটা যে কী, সেটা ভাবতেই একপর্যায়ে নিজেও ক্লিকটা করল। শোয়েব দেখল, ল্যাপটপ জুড়ে কোনো এক ক্যামেরার ফুটেজ শো করছে। ফুটেজের এককোণে বতর্মান সময় ও তারিখ। অর্থাৎ এটা আজ এই মুহূর্তেই। ফুটেজের ভেতর জায়গাটা কেমন অদ্ভুত অদ্ভুত। যেন এটা কোনো ঘর। যেখানে বেসিন, সিলভার ট্যাপ, দেয়ালে আয়না . . . মনে মনে এসব ভাবতেই চকিতে স্থির হয়ে যায় শোয়েব! ল্যাপটপের দিকে নির্নিমেষ চাহনি মেলে শ্বাস নেয় একটা! হঠাৎ বুকের ভেতরে সশব্দে চাবুক পড়ল যেন! এটা কী ওয়াশরুম? জায়গাটা কী মেয়েদের ঘর? এটা কী কোনোভাবে . . প্রশ্নটা আর ভাবতে পারল না শোয়েব। ঝড়ের বেগে বিছানা ছেড়ে ছুট দিল বাইরে। আঁধারের মধ্য দিয়েই চোখ সইয়ে তাড়াতাড়ি পৌঁছুল তৃতীয় তলায়। দ্রুত নির্দিষ্ট একটি রুমের কাছে ধাম ধাম ঘুষি হাঁকালো শোয়েব। যখন বুঝতে পারল এখন রাত, সবাই গভীর ঘুমে, তখন নিজের অস্থির উত্তেজনা প্রশমন করল সে। দ্বিতীয় দফায় শব্দ করতে যাবে, তার আগেই দরজাটা খুলে দেয় শাওলিন। চোখে প্রবল বিস্ময় নিয়ে আশ্চর্য সুরে বলল,
- আপনি এভাবে দরজা ধাক্কাচ্ছেন! রাত কটা বাজে? কী সমস্যা আপনার? কেন প্রচণ্ড জোরে—
বাকি কথা মাঝপথে হারিয়ে গেল ওর। শাওলিন আর একটা কিচ্ছু বলতে পারল না। ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে চুপ করতে বলল শোয়েব। ভঙ্গিটা এমন ভীতিকর দেখাল যে, অজানা কারণে চুপ হয়ে গেল ও। শাওলিনকে পাশ কাটিয়ে ওর রুমের ভেতর ঢুকে পড়েছে শোয়েব। ও যে এতো রাত অবধি এখনো ঘুমের জন্য বিছানায় শোয়নি, তা জানালার কাছে চায়ের কাপ দেখে বুঝল। কাপটা থেকে এখনো গরম ধোঁয়া উঠছে। একপাশে একটা ফ্লাক্স। শোয়েব সমস্ত ঘরটা নিরীক্ষণ চালিয়ে আস্তে করে ওকে ইশারায় ডাকল,
- এদিকে এসো ইয়াং লেডি। প্রশ্ন কোরো না। এই দরজাটা সাবধানে খোলো। কোনো সন্দেহজনক আচরণ করবে না। টোটালি রিল্যাক্স। কাম ডাউন ফেস। আমি নেই এখানে, পরিষ্কার?
শঙ্কা, প্রশ্ন, কৌতুহল মাখিয়ে একটা প্রতিক্রিয়া দিল শাওলিন। ইতস্তত গলায় বলে উঠল,
- কী হয়েছে?
উত্তরে তখনো ঠোঁটের ওপর আঙুল দেখাল শোয়েব।কিছু বুঝতে পারছিল না শাওলিন। তবু কথামতো ওয়াশরুমের দরজাটা বাতি জ্বালিয়ে খুলল। ভেতরে পা বাড়িয়ে ঢুকতেই পেছন থেকে আবার শুনতে পেল ও। তেমনি নির্দেশসূচক গলায়, তেমনি সাবধানী স্বরে বলল,
- পেছনে তাকাবে না। আমি নেই। তুমি দরজা খুলেছ, এখন চুপচাপ বেসিনের কাছে দাঁড়াও। ট্যাপ ছাড়ো। দুটো হাত পানির নিচে দাও।
এবারও কথা মোতাবেক কাজ করছে ও। শোয়েব হাঁটুতে বসে দরজার বাইরে থেকে পুরো ওয়াশরুমটা দেখছিল। তার স্পষ্ট মনে আছে, ওয়াশরুমের পুরোটা ক্যাপচার হয়নি। শুধুমাত্র বেসিন বরাবর কিছু অংশ। তার মানে উক্ত ডিভাইসটা বেসিনের আশেপাশে লুকোনো আছে। চোখটা চর্তুপাশে ঘুরাতেই বেসিনের ডানপাশের দেয়ালে আঁটকাল, চটের তৈরি থাক থাক পকেট ক্রাফট দেখা যাচ্ছে। আস্তে করে ফিসফিসানো স্বরে বলল শোয়েব,
- পকেট ক্রাফটটা দেখতে পাচ্ছ? যেকোনো ভাবে ওটাকে ফ্লোরে ফেলো। শাওলিন, প্রশ্ন কোরো না। ওটার দিকে না তাকিয়ে ফেলো নিচে!
কথাটা বলতেই সেকেণ্ডের ভেতর হাতের বারি দিয়ে পকেট ক্রাফটটা মেঝেতে ফেলল। ঝুপ করে শব্দ হতেই শাওলিন কয়েক পা প্রশ্নাতুর চোখে সরে যায়। ভেজা ফ্লোরের ওপর ছোট্ট কালো কী একটা জিনিস উলটে পড়েছে। সেটা ঠিকমতো দেখার আগেই বজ্রমুঠিতে এক ঘুষি মারল শোয়েব। বস্তুটা ওখানেই চ্যাপটা খেয়ে টুকরো। বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতেই জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
- এটা কী বুঝতে পারছ?
শাওলিন ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ল। হতবাক মুখে বলল,
- না। কী এটা?
- তুমি তো খাস অন্ধ। অন্ধকে আলোর মহত্ত কী করে বোঝাব! এখনো বুঝতে পারছ না, এটা কী? তাহমিদ ওর ঘরে ক্যামেরা দিয়ে কী করছে? তোমার ওয়াশরুমে ক্যামেরার কী কাজ?
শাওলিনের চেহারায় প্রশ্ন ঘনানো ছাপ। যেন কী একটা অনুসন্ধানী চোখে টের পাচ্ছে। চোখজোড়া খাটো করে সন্দেহের ছাঁচে বলল,
- আপনি এতো রাত করে অন্যের হাঁড়িতে নজর বুলাচ্ছেন? কে কার ঘরে কী করছে, এটা আপনি কী করে জানলেন? আমি এখন জেগে থাকব, একটু পর ওয়াশরুমে যাব, আর ওয়াশরুমটাও যে তিনতলার এই ঘরের, এসব আপনি এতো নিখুঁত জানলেন কী করে?
উপকার করতে এসে মহা মসিবতে পড়ে যাচ্ছে শোয়েব। বুঝতে পারছে একটা উত্তর দিতে গিয়ে আরো দশটা জবাব তৈরি করতে হবে। সে যে সত্যিই ওঁত পেতে অন্যের ভদ্রলীলা দেখেছে, এটা তো সরাসরি ওকে জানানো যাবে না। প্রমাণ ব্যতীত এই মেয়ে বিশ্বাসও করবে না। এমনিতেই বিশ্বাসটা ভেঙে দুই খণ্ড করে দিয়েছে, এখন বিপদ যেন ঘাড়ের উপর গরম নিঃশ্বাস ফেলছে। শোয়েব ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতিটা বুঝে বেশ শান্তস্বরে বলল,
- তোমার হবু বর তো কামেল ব্যক্তি ভদ্রলোক। সামনে এলে তিনবার সালাম দেয়া লাগবে। দোষ করলেও দোষ নেই। ভুল করলেও ভুল নেই। এরা হচ্ছে তোমার দৃষ্টিতে সৎ, ভদ্র, সত্যবাদী। ফোন অন রাখুন। যেটা নিচ থেকে পাঠাব, ওটা নির্দ্ধিধায় ক্লিক করবেন।
কথা কটা বলেই পা ঘুরিয়ে প্রস্থান করল শোয়েব। নির্জীব অন্ধকারে নিঃশব্দে হারিয়ে গেল সেই বলিষ্ঠ অবয়ব। রুমে তখন নীলচে ড্রিমলাইট জ্বালানো ছিল। সেই নীল আলোয় দরজা আঁটকে ওয়াশরুমের বাতি নেভাতেই টুং টুং দুটো শব্দ এল। ফোনের আলোয় বিছানার একদিকে উজ্জ্বল হয়েছে। শাওলিন দ্রুত ফোনটা তুলে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ একাউন্টে একটা অজ্ঞাত নাম্বার দেখতে পেল। সেখান থেকে পাঠানো দুটো টেক্সট ঠিক এরকম,
‘Check it.’
Link : …….. .
শাওলিন উক্ত লিংকে বৃদ্ধাঙুল চাপল। লিংকটা ওপেন হয়ে দেখল কোনো এক ফুটেজ। যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অন্ধকার ওয়াশরুম। ভেন্টিলেটর জানালাটা দিয়ে যেটুকু বাইরের আলো আসছে, তাতে বুঝতে অসুবিধে হল না ওয়াশরুমটা এই ঘরের। অর্থাৎ রাতে কোনো এক ফাঁকে তাহমিদ এই ঘরে ঢুকেছে। কিছু একটা ভয়ানক ঘটিয়ে গেছে। আর নিচে গিয়ে রাতে সেই শুভক্ষণের অপেক্ষায় বসে আছে। চোখ বিস্ফোরিত করে থমকে রইল কিছুক্ষণ! বুকের ভেতর মুচড়ে উঠল অস্থির হৃৎপিণ্ডটা! কতখানি স্পর্ধা! কতটা দুঃসাহস! রাগে ঝিঁ ঝিঁ করে উঠল কানদুটো! নাকটা রাগের হলকায় ফুলে উঠছে ওর। এমন সময় আরো একটি বার্তায় টুং টুং করল ফোন। চোখ নিচু করে দেখল আরো একটি লিংক।
‘ চার্জার আনতে গিয়েছিলাম। বিছানায় ল্যাপটপ খোলা। ভদ্রলীলার আরেক নমুনা পাঠিয়ে দিলাম।’
বুকে দম টেনে উক্ত লিংকটায় ক্লিক করল শাওলিন। ওটা ওপেন হতেই যে দৃশ্য দেখতে পেল, তাতে তৎক্ষণাৎ সারামুখ খিঁচিয়ে ফেলেছে ও! হাত থরথর করে কাঁপছে অনবরত! কানে আসছে কিছু বিশ্রী আওয়াজ! গা গুলিয়ে উঠতেই ফোনটা অজান্তে হাত ফসকে ছেড়ে দিল শাওলিন! দুহাতের আড়ালে ঢেকে ফেলল মুখ! বারবার অস্ফুটে স্বরে চ্যাঁচিয়ে উঠছিল,
- ছিঃ! ছিঃ! ছিঃ!
.
নোটবার্তা— কেমন লাগল এই পর্ব, জানাবেন দ্রুত। পর্বে থাকা ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। আজ একেবারেই রিচেকের সময় পাইনি। টুপ করে পাবলিশ। দেরির জন্য ভীষণ দুঃখিত। মন্তব্য, বক্তব্য, প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়! দ্রুত পাঠকবাসী! ❣
Share On:
TAGS: ফাবিয়াহ্ মমো, বজ্রমেঘ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৮
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২২
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৪
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১১
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৭
-
বজ্রমেঘ পর্ব ৬
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২১(২১.১+২১.২)
-
বজ্রমেঘ পর্ব ১৫
-
বজ্রমেঘ পর্ব ২